বৃহস্পতিবার, মে ৩০

সাইকেল : কৃষ্ণ জলেশ্বর

0

Utsob-Songkha_Motif‘বহুদূর থেকে উঠে আসে তটিনীর স্বর
পাশাপাশি বসে ভাবি আমি আর ঈশ্বর’

অতঃপর ঘুম ভেঙে দেখি সন্ধ্যা সন্ধ্যা পৃথিবী। মনে হয়, কিছু যেন করার ছিল কিংবা আমাকে রেখে চলে গেল বুঝি সময়ের ট্রেন—এমন তাড়া অনুভূত হয়। নদীতীরে একটা কাঠের বেঞ্চে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আদতে কি সন্ধ্যা, নাকি ভোর! ভাঙা ঘুমের চোখে বিভ্রান্তি জাগে। বেঞ্চের পাশে রাখা একটা সাইকেল। নদীতীরে বন, বনের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে বহুদূরের পথ। পথ আমাকে ডাকে। আমি আর সাইকেল একটা গানের সুরে তাল দিতে দিতে সেই পথ ধরে কোথায় যেন চলে যেতে থাকি।

২.
বন শেষে পথের দুধারে ফসলের মাঠ। দূরে যেন কাদের গ্রাম! দ্বিধা ভেঙে গ্রামের আড়াল থেকে ভেসে ওঠে সকালের রোদ। আরও গতিশীল হয় সাইকেল। সকালে গ্রামের ব্যস্ততা। মাঠে মাঠে কৃষক আর কৃষাণীর দল। ফসল তোলার উৎসব। ছেলে-বুড়ো হইচই আর আনন্দরত। সাইকেল থামিয়ে কিছুটা তাদের দেখি, কিছুটা দেখি তাদের চোখে নিজেকে। না, বিস্ময় নেই। যেন প্রতিদিন আমি এ পথ ধরে এভাবেই চলে যাই। এক বুড়ো ডেকে বলল, ‘আসো, নিয়ে যাও কিছু মেটে আলু, লাল তরমুজ!’ এক কৃষাণী সাইকেলে গুঁজে দেয় বেগুনি দুটি ফুল। দারুণ সুগন্ধ ছড়ায়। আমি এইসব ফেলে আরও সামনে এগিয়ে যেতে থাকি। নাকি পেছনে? মানুষ যে দিকে হাঁটে তাকেই সামনের দিক ভাবে।

৩.
গ্রামের পরে গ্রাম। সূর্য অনেকখানি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। টের পাই ক্ষুধা আর তৃষ্ণা। অদূরে এক কৃষকের বাড়ি। বাড়ির পাশে কৃষক লাঙল ঠেলে চাষ দিচ্ছে ফসলের খেত। একটা শিশু আলে দাঁড়িয়ে দেখছে পৃথিবীর পথ, দূরের মাঠ, এদিক সেদিক। তার কণ্ঠে গুনগুন গান। আমি সাইকেল থেকে নেমে কৃষকের কাছে এগিয়ে যাই। বলি, ক্ষুধার কথা। শুনে, হাতের লাঙল ঠেলে দেয় আমার দিকে। বলে, ‘এইটুকু খেত চাষ দিয়ে আসো। ওই আমাদের ঘর।’ শিশুটি বাবার কাঁধে চড়ে ঘরের দিকে ফেরে। আমি লাঙল ঠেলে ঠেলে চাষ দেই। নরম মাটি। অনায়েসে ভেঙে চুরচুর। অল্প সময়ে চাষ দেওয়া শেষ হয়। কৃষকের বাড়ির দিকে যাই। বাড়ির উঠোনে কুয়ো। কুয়োর পাশে ফুলের বাগান। বারান্দা ঘেঁষে ডালিমের গাছ। লাল লাল ফুল বাতাসে দোল খায়। কুয়ো থেকে পানি তুলে হাতমুখ ধুই। কৃষকবউ বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে খাবার দিয়ে যায়। পোড়া মিষ্টি আলু, চিলতে শশা, শুঁটির হালুয়া, একটা কলা, দুধের গেলাস আর এক ফালি তরমুজ। খেতে খেতে কথা হয় কৃষকের সঙ্গে। বলে, ‘থেকে যাও। আমাদের ঘর আছে। ও পাশে আছে চাষের জমিন। ফসল ফললে আধেক তোমার, আধেক আমার। এই গ্রামে জুড়তে পারো সংসার।’ আমি বলি, ‘না, আমার তাড়া আছে। আমাকে অনেক পথ যেতে হবে।’ খাওয়া শেষে সাইকেল নিয়ে পথে নামি। পেছনে পড়ে থাকে কৃষকের ঘর, শিশুটির মায়া মাখা চোখ আর আমার না হওয়া সংসার।

৪.
পথ নিয়ে যায় গ্রাম ছেড়ে আরেক গ্রামে। তারপর মনে হয় কোনো এক উপশহরের মতো কোথাও এসে পড়েছি। নদীর তীর ঘেঁষে ঘনবসতি। দোকান-পাট। ছোটো বাজার। বাজারের কোণে ছোট্ট জটলা। সাপের খেলা দেখাচ্ছে এক সাপুড়ে। ‘খুলে ফেলে হাতের বাঁধন সোজা হয়ে দাঁড়াও, কোনো ভাঁজ রেখো না শরীরে, মন থেকে দূর করো সকল বিভাজন। এখন খেলা জমবে মোহিনীর কাল নাগিনীর ছোবল। মোহিনী! মোহিনী!! মোহিনী!!!’ ভিড় ঠেলে একটা বাক্স হাতে এসে দাঁড়ায় এক মোহনীয় নারী। তার সারা শরীর যেন ঢেউ খেলানো। পরিমিত, সুগঠিত, মনে হয় সুললিত। আমার চোখ গেঁথে যায়। আমি দৃষ্টি ফেরাতে পারি না। সে বাক্স থেকে ধীরে বের করে নিয়ে আসে ফনাতোলা সাপ। খেলা দেখায়। বৃদ্ধ সাপুড়ে কী যেন বলে। কিছুই শুনি না আমি, আর কিছু দেখি না। শুধু সেই নারীকে দেখি। কেউ একজন ধাক্কা দেয় আমাকে। বলে, ‘সাইকেল নিয়ে এখানে আসছো কেন? সাইকেল রেখে আসো। এইখানে সাইকেল নিয়ে আসা নিষেধ।’ আমি কোথাও সাইকেলটা রেখে আসতে যাই। অদূরে। যেখানটায় একটা বড়ো গাছ, তার ছায়ায়। গাছের ছায়ায় বেঞ্চিতে বসা এক লোক বলে, ‘এইটা সাইকেল রাখার জায়গা না। সাইকেল রাখতে হবে ওই দূরের দোকানটার পাশে ছাউনির নিচে। ওইখানে রেখে আসো।’ দ্রুত যাই দূরের দোকানের পাশে। আমার মন পড়ে থাকে সাপের খেলায়। ছাউনির নিচে সাইকেল রাখতে গেলে দোকানের লোক বলে, এইখানে সাইকেল রাখা নিষেধ। সাইকেল রাখতে হয় ওই গাছের ছায়ায়। আমি বিরক্ত বোধ করি। ফের ফিরে যাই গাছের কাছে। পূর্বের লোকটি আমাকে দেখে হাসে। বলে, ‘এত তাড়া কেন তোমার? সাপের খেলা দেখবা? খুব ভালো লাগে, না!’ আমি কিছু বলি না। দ্রুত সাইকেল স্ট্যান্ড করে ফিরে যেতে চাই সাপের খেলা দেখতে। কিন্তু লোকটি আমাকে ডাকে, ‘শোনো! সাইকেল রাখার একটা নিয়ম আছে।’ দৃষ্টিতে জিজ্ঞাসা নিয়ে তার দিকে তাকাই। সে বলে, ‘একটা জাদু দেখে যাও। আমি হচ্ছি জাদুকর। জাদু দেখাই। কিন্তু কেউ আমার জাদু দেখে না। সবাই দেখে শুধু সাপিনীরে।’ জাদুকর তার ঝোলার ভেতর থেকে কতগুলো পিংপং বল বের করে। হাতের তালুতে বলগুলো নাচাতে থাকে। আমার দেখতে ইচ্ছে হয় না। সে বলে, ‘দেখো দেখো, একটা একটা বল বাতাসে মিলিয়ে যাবে।’ তাই হয়। একটা একটা করে বল নাই হয়ে যায়। কিন্তু আমার বিস্ময় জাগে না। আমার মনে ভাসে সেই নারীর ছবি। জাদুকরকে রেখে ছুটে যাই সাপখেলা দেখতে। কিন্তু হায়! কেউ আর সেখানে নাই। ভিড় ভেঙে গেছে। দোকানে দোকানে লোকজন। আমি এদিক সেদিক অনেকক্ষণ খুঁজলাম। কোথাও যদি একবার তার দেখা পাওয়া যায়, সেই নারীকে আর বার দেখার সাধ হয়, বাতাসে জড়িয়ে ছিল সে যেন এক বল্লরি! কোথাও না পেয়ে সাইকেলের কাছে ফিরি। জাদুকর তখনো সেখানে বসা। আমাকে দেখে বলে, কী? খেলা শেষ? আমি কথা না বলে সাইকেল নিয়ে চলে যেতে থাকি। লোকটি বলে, ‘আমাকে তোমার সাথে নাও। আমিও যাব।’ আমি যেন তার কথা শুনিইনি। সাইকেলে চড়ে দ্রুত চলে যেতে থাকি উপশহর ছেড়ে।

৫.
পথ বয়ে নিয়ে যায়। পথের শেষে থাকে ঘর, ঠিকানা অপর। কেউ কেউ পথেই থেকে যায়। ভ্রাম্যমাণ। কিন্তু তাদেরও পথ কখনো ঘর হয় না। পথ পথই থেকে যায়। দীর্ঘ পথ ঠেলে আমি যেতে থাকি, পড়ে নিয়ে পথের দৃশ্য। দুপাশে এখন দূরের মাঠ ফসলহীন। আদিগন্ত শূন্যতা। সূর্য মধ্য আকাশে। ছায়া হ্রস্ব হয়েছে। ক্রমেই এক শহরের দিকে যেতে থাকি। যেতে থাকি আর যেতে থাকি। যেতে যেতে শহরে ঢুকে যাই। শহর মানে বাজার। দোকান আর দোকান। সবকিছু কেনা বেচা হয়। খাদ্য-আবাসন তো বটেই, পরিচর্যা, শিক্ষা, প্রাকৃতিক দৃশ্য, পানি ও অক্সিজেন। এমনকি ভালোবাসাও। সবকিছুরই বড়ো বড়ো দোকান। সেইসব দোকান দেখি। দেখি ব্যস্ত মানুষ। মানুষগুলো কেমন যেন চর্বিল। মানুষেরা কেউ কাউকে দেখে না, ব্যস্ত নিজেদের মতো। একটা দোকানে দেখি মোমের পুতুল। সাইকেল রেখে দোকানটাতে ঢুকে যাই। সেখানে মোটা মেয়ে মানুষের পুতুল বিক্রি হয়। সারি সারি বড়ো বড়ো পুতুল। মানুষজন কিনে কিনে নিয়ে যাচ্ছে। আমি দোকানি মোটা লোকটাকে বললাম, ‘সব পুতুল কেন মোটা, চর্বিহীন কোনো পুতুল হয় না?’ বলে, ‘এমন তো বলেনি কেউ? স্যাম্পল সব সাজানোই আছে। এর বাইরে কিছু নাই।’ আমাদের কথা শুনে এক মাঝবয়েসি লোক, ক্রেতা হবে, বহুক্ষণ ধরে পুতুল দেখছিল, বলে, ‘যেমনটা বলছ এমন একটা পুতুল হলে ভালোই হয়।’ আমি বললাম, ‘মোমের পুতুল তো, চাইলে কিন্তু মেদ কেটে ফেলে দেওয়া যায়।’ ‘তুমি পারবে?’ —জানতে চায় সে। আমি বলি, ‘এ আর এমন কী! একটা ছুরি হলেই হবে।’ লোকটা একটা পুতুল কিনে, একটা ছুরি ধরিয়ে দেয় আমার হাতে। আমার চোখে ভাসে সাপখেলা দেখানো সেই নারীটির ছবি। সেই ভেবে ভেবে কেটে চলি মোমের চর্বি। লোকটা বলে, ‘বাহ! দারুণ তো! বহুদিন পর এমন শরীরের অবয়ব দেখলাম। মন ভরে গেল!’ আমার হাতে দুটি মুদ্রা গুঁজে দিয়ে পুতুলটা নিয়ে চলে যায়। চর্বি কাটার সম্মানি। পাশ থেকে এক তরুণ এসে বলে, ‘আমারও এমন একটা পুতুল চাই।’ এক বৃদ্ধও বলল, ‘হ্যাঁ, ওমন একটা আমারও চাই।’ চাহিদা বেড়ে গেছে দেখে দোকানি আমার সঙ্গে চুক্তিতে আসে। প্রতি পুতুল কেটে চর্বিহীন করা দুই মুদ্রা করে। দুপুরের খাওয়া ফ্রি। দোকানের একপাশে আমাকে বসিয়ে দেয়। আমি ছুরি নিয়ে মনে রেখে সেই নারীর অবয়ব কেটে চলি মোমের পুতুল, সারা দুপুর। একটা দুইটা করে অনেকগুলো। এর মাঝে দোকানি আমাকে একটা টোকেন দেয়। বলে, ‘এটা নিয়ে যাও ওই দোকানে দুপুরের খাবার খেয়ে আসো।’ আমি টোকেন নিয়ে দুপুরের খাবার খেতে যাই। দোকানে থরে থরে টেবিল সাজানো। সেখানে কেউ কেউ খাচ্ছে, কেউ কেউ খাওয়া শেষে উঠে যাচ্ছে। আমি ওই দোকানিকে টোকেনটা দিয়ে একটি টেবিলে বসে পড়ি। একজন মোটা করে নারীও এসে বসে আমার টেবিলে অপর চেয়ারে। আমাদের দুজনকে একই খাবার দিয়ে যায়। পাখির রোস্ট, গমের রুটি আর পোড়া টমেটো। নারীটিকে এক গেলাস সবুজ শরবত দিয়ে যায়। আমাকে দেয় না। আমি জানতে চাই, ‘আমাকে কেন দেওয়া হলো না ওমন সবুজ শরবতের গেলাস?’ দোকানি বলে, আমার যে টোকেন, ‘তাতে ওই শরবত পানের মতো ক্রেডিট নাই।’ নারীটি তৃপ্তিভরে সবুজ শরবত পান করে। আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘নতুন আসছ?’ আমি কিছু বলি না। তার দিকে তাকিয়ে থাকি। কেমন মোটা নারী! সে বলে, ‘আমার বাসায় এর চেয়েও মজার শরবত আছে। সামনের পথ ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলে লালরঙের একটা বাড়ি। আমি ওই বাড়িতে থাকি, অবসরে এসো। তোমাকে শরবত খেতে দেবো।’ তার কণ্ঠের আন্তরিকতা আমার ভালো লাগে। খাওয়া শেষে পুতুলের দোকানে ফিরে আসি। আর কাটতে থাকি মোমের চর্বি। প্রথম প্রথম কাজটাতে আনন্দ পেলেও, ক্রমেই সেটাকে বিরক্তিকর মনে হতে থাকে। মনে হতে থাকে চর্বিতে দুই হাত চটচটে হয়ে গেছে। বিরক্তিতে কতগুলো পুতুলের গলা কেটে ফেলি। দোকানি দেখার আগে সেখান থেকে সাইকেল নিয়ে পালিয়ে যাই।

৬.
পালানোর জন্য শহর খুব ভালো জায়গা। মনে হয় সবাই পালাচ্ছে, তাই কারো পালানো আলাদা করে চোখে পড়ে না। সাইকেলে করে যেতে যেতে চোখে পড়ে লাল একটা বাড়ি। আর মনে হয়, দুপুরে খাবার খেতে বসা সেই মোটা নারীটার কথা। বাড়ির সামনে সাইকেল রেখে ভেতরে খোঁজ করি। নক করতেই মোটা নারীটি দরজা খুলে মাথা বের করে। আমাকে দেখে বলে, ‘এসো।’ যেন আমি আসব সে তা জানত। আমি তার পেছন পেছন বাড়িতে ঢুকে যাই। বাড়ি ভর্তি ঘর। ঘরগুলোর কোনো জানালা নেই। হলুদ ক্যাটক্যাটে আলোর বাতি জ্বলছে। আমাকে একটা ঘরে বসতে দিয়ে বলল, ‘বসো। তোমার জন্য শরবত নিয়ে আসি। তারপর শরবত খেতে খেতে দুইজন বসে বসে টেলিভিশন দেখব। দারুণ মজা হবে।’ আমি বসি এবং সে শরবত নিয়ে আসে। আর টেলিভিশন ছেড়ে দেয়। শরবত আমার ভালো লাগে না। কেমন একটা গন্ধ। আর টেলিভিশন থেকে আসা জঘন্য দৃশ্য আর শব্দ বিরক্তিকর লাগে। আমি উঠে যেতে চাই। সে বলে, চাইলেই যাওয়া যাবে না। সবকিছুরই একটা মূল্য আছে। মূল্য মিটিয়ে তারপর যেতে হবে। আমার কাছে থাকা দুটি মুদ্রা তাকে দিয়ে দেই। কিন্তু সে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মুদ্রা দুটি ছুড়ে ফেলে। তাকে দেখে ভীষণ অসহ্য লাগে। ছুটে পালাতে চাই। কিন্তু ঘরের পর ঘর। কিছুতেই শেষ হয় না। এক সময় একটা দরজা খুলে বাহির দেখি। বাহিরে রাখা আমার সাইকেল। সাইকেল চড়ে দৌড়ে পালাতে চাই। কিন্তু দেখি সাইকেলের চেইন নাই। সাইকেল ঠেলে নিয়েই দৌড়ে পালাই।

 

৭.
সাইকেল নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শহর শেষ হয়ে আসে। শহরের শেষে একটা গাছ। গাছের নিচে এসে থামি। সূর্য অনেকটা হেলেছে। ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে। কোথা থেকে যেন ঝোলা কাঁধে সেই উপশহরের জাদুকর এসে দাঁড়ায়। আমাকে দেখে হাসে। বলে, ‘সাইকেলের চেইন কোথায়?’ আমি বলি, ‘কেউ নিয়ে গেছে হয়তো।’ সে বলে, ‘আমি জাদু করে চেইন এনে দিতে পারি। তবে শর্ত আছে। আমাকে তোমার সাইকেলের পেছনে চড়িয়ে নিয়ে যেতে হবে।’ আমি রাজী হই। সে সত্যি সত্যি ছু-মন্তর বলে সাইকেলের চেইন এনে দেয়। আমি বিস্মিত হই। আবার সন্দেহ জাগে, বোধ হয় এ-ই সাইকেলের চেইনটা চুরি করে থাকবে! এখন ভেলকি দেখাচ্ছে! বলি না কিছু। তাকে সাইকেলের পেছনে বসিয়ে আবার সামনের দিকে চলতে শুরু করি।

৮.
ক্রমেই ভারী হয়ে ওঠে জাদুকর। বলি, ‘এবার তুমি চালাও সাইকেল। আমি পেছনে বসি।’ সে বলে যে, সে সাইকেল চালাতে পারে না। অগত্যা আমিই সাইকেল চালাতে থাকি। শ্রমকষ্টে ঘামতে শুরু করেছি। আর সে আরামসে পেছনে বসে বসে পৃথিবী দেখতে থাকে। কিছু পথ চলতেই পথের ধারে দেখা মেলে সেই সাপখেলা দেখানো নারীটির। একা বিব্রত দাঁড়িয়ে আছে। আমরা গিয়ে থামি তার কাছে। তার কাছ থেকে ফুলের সুঘ্রাণ আসে। সে জানায়, তার নাম মোহিনী। শহরে সাপুড়েকে হারিয়ে ফেলেছে সে। কিছু দুষ্ট লোক তাড়া করছে। সেখান থেকে পালিয়ে সে দূরে কোথাও চলে যেতে চায়। এত পথ হাঁটতে পারছে না সে। আমার সাইকেলে তিনজন ধরবে না। জাদুকরকে সাইকেলে চড়ানোর বিষয়টি চরম বাজে ব্যাপার হয়েছে—মনে হতে থাকে। আমরা তিনজন হেঁটে হেঁটে পথ চলি। আমি সাইকেল ঠেলে ঠেলে হাঁটি। কিছুপথ হেঁটে বিশ্রাম নেই। জাদুকর মোহিনীকে পিংপং বলের খেলা দেখায়। মোহিনী মুগ্ধ চোখে জাদুকরের খেলা দেখে। হাসে। আর তার সুঘ্রাণ যেন জাদুকরের দিকে ঠেলে নেয় বাতাস। আমার বড়ো ঈর্ষা হয়। আমি বলি, ‘পিংপং বলের খেলা কী আর এমন! আমি এক চাকায় সাইকেল চালাতে পারি।’ মোহিনী আমার কথায় আগ্রহী হয়। আমার ভালো লাগে। আমি তাকে দেখাই কী করে সাইকেল গতিশীল করে এক চাকা শূন্যে তুলে দিয়ে আর চাকায় সাইকেল চালাতে হয়। দেখে বিস্মিত হয় মোহিনী। আমার মন ভরে যায়। মনে হয়, আমিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খেলোয়ার। সারা পৃথিবী মুগ্ধ হয়ে আমার কসরত দেখছে। বাহবা দিচ্ছে। আমি আরও গতি তুলে সাইকেল শূন্যে ভাসিয়ে দিতে চাই। কিন্তু হঠাৎ সাইকেলের চেইন নাই হয়ে যায়। আমি সাইকেল থেকে ছিটকে পড়ি। হো হো করে হেসে ওঠে জাদুকর। মুখ টিপে হাসি তুলে মোহিনীও। লজ্জায় আমি মিশে যেতে থাকি মাটিতে। বুঝতে পারি জাদুকর এমনটা করেছে। এই ভেলকি তার। কিন্তু সে বলে, সে কিছু করিনি। জাদুর চেইন এমনই হয়। একটা সময় পর ভ্যানিশ হয়ে যায়। আমার তাকে খুন করে ফেলতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু করি না কিছু। চুপচাপ চেইনহীন সাইকেল ঠেলে নিয়ে হাঁটতে থাকি।

সূর্য অনেকখানি হেলে পড়েছে। এখন পাহাড়ি পথ। ক্লান্তি নেমে আসে। মনে মোহিনীর জন্য ভালোবাসা। তারচেয়েও বেশি জাদুকরের প্রতি ঈর্ষা আর ক্ষোভ। ফলে ভারী হয়ে ওঠে জীবন। চলতে ইচ্ছে হয় না। থামি। মোহিনী তৃষ্ণার কথা বলে। আমি জলের খোঁজে যাই। জাদুকর আর মোহিনী বসে থাকে গাছের ছায়ায়।

৯.
জল নিয়ে ফিরে এসে দেখি সাইকেল নিয়ে একা দাঁড়িয়ে আছে জাদুকর। মোহিনী নেই। আমি এদিক সেদিক মোহিনীর খোঁজ করি। জাদুকর জানায়, মোহিনীকে নিয়ে গেছে দুষ্টু লোকেরা। আমি বিস্মিত হয়ে জানতে চাই, ‘তুমি নিতে দিলে! আটকাওনি?’ জাদুকর ভাবলেশহীন। মনে হয় মুচকি হাসে। বলে, ‘আমি আটকাব কেন? দুষ্টু লোকেরা আমাকে একটা সোনার আপেল দিলো। আর তোমার সাইকেলের চেইন।’ বুঝলাম মোহিনীকে বেচে দিয়েছে সে। ‘ছি!’ জাদুকর হাসে। বলে, ‘প্রেম? পৃথিবীর কিছুই কিছু নয়। কিছু কি তোমার ছিল? যেটুকু পেয়েছ, সেটুকুই প্রাপ্য। এই নাও তোমাকেই দিয়ে দিলাম সোনার আপেল ফল।’ রাগে ফেটে পড়তে ইচ্ছে হলো আমার। ‘ফাজিলের ফাজিল ভাবের কথা বলছিস!’ সোনার আপেল ফলটি সজোরে ছুড়ে দিলাম জাদুকরের দিকে। তার মাথায় লেগে রক্তরক্তি অবস্থা। মাথা চেপে মাটিতে পড়ে গেল সে। সূর্য বোধহয় পাহাড়ের আড়ালে চলে গেছে, তাই কিছুটা অন্ধকার হয়ে আসে পৃথিবী। জাদুকরের মাথা থেকে রক্ত গড়িয়ে যেতে থাকে। ঝোঁপ থেকে, বন থেকে অসংখ্য কুকুর যেন হাঁক তুলে ধেয়ে আসে আমার দিকে। আমি সাইকেল নিয়ে পালাতে থাকি, পালাতে থাকি। দিকশূন্যহীন। সামনে নদী। আমি সাইকেলসমেত নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ি। আর ডুবে যেতে থাকি।

১০.
নদীর সবুজ জলে তলিয়ে যেতে যেতে টের পাই কেউ একজন টেনে তুলছে। একটা নৌকায়। চোখ মেলে দেখি। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। থির পানিতে নৌকা চলছে। আমার পাশেই সাইকেলটা। মাঝি গম্ভীর হয়ে নৌকা বেয়ে যায়। চুপচাপ। বনের ভেতর নদী। শুধু জলের শব্দ। তারপর বনের পাশে নদীতীরে নৌকা ভেড়ায়। আমি সাইকেল নিয়ে নৌকা থেকে নামি। মাঝি নৌকা নিয়ে নদী ধরে কোথায় যেন চলে যায়। আমার ভীষণ ক্লান্তি লাগে। চোখ ভেঙে ঘুম আসে। নদীতীরে একটা বেঞ্চির পাশে সাইকেলটা রেখে বেঞ্চিতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। পৃথিবীর কিছুই আর মনে থাকে না আমার।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম বাংলাদেশে। প্রকাশিত গল্পের বই 'আনোহাবৃক্ষের জ্যামিতি'।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।