বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২২

সিন্ডারেলা একটি বিকেলের নাম : রুমা মোদক

0

Motif-01মহিম :
ব্যস্ততা ফুরিয়ে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া এই বিকেল বেলা মা বারবার ফোন দিচ্ছেন। কেন? মা তো আমার বাসায় ফেরার সময়টা জানেন। তবু বারবার ফোন দিচ্ছেন! আমার একটু সন্দেহ হলেও ফোন রিসিভ করি না। আমি এক্ষুনি বের হবো।

বিকেল বেলা অফিস থেকে বেরিয়ে যাবার মুহূর্তে কোনো ফোনকল এলে সেটাকে ভোররাতের লোভাতুর শেষঘুমে ব্যাঘাতের মতো মনে হয়। ভীষণ বিরক্তিকর। সবকিছু গোছানো শেষে, শেষবারের মতো সবকিছু চেক করে নেওয়া। ঠিকঠাক কম্পিউটার অফ হলো কি না, ড্রয়ারের লকগুলো লাগাতে কোনো ভুল হলো কি না… ইত্যাদি। বন্ধকাচের দরজা গলে ভেতরে ঢুকে পড়া বাইরের বাসামুখী ব্যস্ত গাড়ির সারিবদ্ধ দৃশ্য বের হওয়ার তাড়াকে আরও অস্থির করে তোলে এ সময়।

নিজের গাড়ির ড্রাইভারও কানে মোবাইল লাগিয়ে এদিক সেদিক হাঁটাহাঁটি করছে। এই হাঁটাহাঁটির দুটো মানে। সে প্রস্তুত আছে আর তারও ছুটির তাড়া আছে। বিকেল একটা অসহ্য সময়, বাধ্য হয়ে বাথরুম চেপে রাখার মতো। সারাদিন কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে চোখ ফেরাতে না পারা ছ্যাঁচোড় ক্লান্তিতে শরীর মন দুইই তখন অবসন্নতায় নেতিয়ে যায় বয়ামে পড়ে থাকা শেষ বিস্কুটের মতো। আর ভাল্লাগে না, তবু শেষ কাজগুলো করতে হয়। তখন কারো ভালো কথা শুনতেও বিরক্ত লাগে।

কিন্তু ফোনে মা যে সংবাদ দেন, শুনে আমার এই ক্লান্ত বিকেলে বিরক্তির নিয়ন্ত্রণহীন পারদ চরচর করে বেড়ে যায়। মায়াকে পাওয়া যাচ্ছে না। ঘড়িতে বাজে সাঁড়ে পাঁচটা। জ্যৈষ্ঠ তীব্র কাঁঠাল-পাকা গরমে বিকেলের আয়ু প্রায় সাতটা, সাড়ে সাতটা পর্যন্ত। আরও দু ঘন্টা। হয়তো গেছে কোথাও; ফিরবে। এটা ফোন দিয়ে বলার মতো কোনো ব্যাপার?

মায়ের ফোনকলটা প্রথমবার আমি রিসিভ করি না। বাজতে দেই। মায়ের ফোন। হয়তো কিছু লাগবে। নইলে মা যখন তখন ফোন দিয়ে বিরক্ত করেন না। কী লাগবে, গাড়িতে উঠে জেনে নিলেই হবে, ভাবতে না ভাবতে মিনিট খানেকও বিরতি না দিয়ে মা আবার ফোন দেন, আবার। তিনবারের সময় সন্দেহ হয়। মা এই অসময়ে বারবার ফোন দিচ্ছেন কেন? এবার ফোনটা রিসিভ করি। কিন্তু ফোনে মা যে সংবাদ দেন, শুনে আমার এই ক্লান্ত বিকেলে বিরক্তির নিয়ন্ত্রণহীন পারদ চরচর করে বেড়ে যায়। মায়াকে পাওয়া যাচ্ছে না। ঘড়িতে বাজে সাঁড়ে পাঁচটা। জ্যৈষ্ঠ তীব্র কাঁঠাল-পাকা গরমে বিকেলের আয়ু প্রায় সাতটা, সাড়ে সাতটা পর্যন্ত। আরও দু ঘন্টা। হয়তো গেছে কোথাও; ফিরবে। এটা ফোন দিয়ে বলার মতো কোনো ব্যাপার? মায়ের এতো উদ্‌বিগ্ন হওয়ার তো কোনো কারণ নেই।

মায়ার মাথায় ছিট আছে এ নিয়ে চেনাজানা পরিবেশের কারো কোনো সন্দেহ নেই। যেখানেই যাক, চেনাজানার বাইরে কোথাও সে যাবে না, যায় না কখনোই। পথ চিনে ফিরে না আসার মতো উন্মাদও সে নয়। মাথায় সামান্য ছিট। পোশাক-আশাক, শান্ত স্নিগ্ধ মুখশ্রী, নীরবে নিঁখুত সব সাংসারিক কাজ করে যাওয়া, মেহমান এলে ট্রে সাজিয়ে নাস্তা আনা ইত্যাদি দেখে ঘুণাক্ষরেও বোঝার উপায় নেই তার দেহে-মনে-মাথায় কোথাও কোনো সমস্যা আছে। কিন্তু মাঘ মাসের দশ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় হঠাৎ সে যখন ওয়াশরুমে গিয়ে মাথায় পানি ঢালতে শুরু করে, কিংবা একাধারে তিন চারদিন দানাপানি পর্যন্ত মুখে নেয় না তখনই সবাই বোঝে যে তার মাথায় ছিট আছে। প্রথম প্রথম মা, আমি আমার বউ পরিবারের সবাই জিজ্ঞেস করতাম, কিরে তোর কী হইছে? রাতদুপুরে ওয়াশরুমের দরজায় দিরিম দিরিম কিলের শব্দে পাড়া-পড়শিদের ঘুম ভেঙে যেত। এভাবেই দিনে দিনে সারা এপার্টমেন্ট জেনে গেছে মায়ার মাথায় ছিট আছে। মায়া যেন কিছুই হয়নি এভাবে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে উত্তর দিত, আইজ আমার সিন্ডারেলারে অনেক মাইর দিছে। আমার শইলডা জ্বলতাছে। নইলে বলত আমার সিন্ডারেলারে খাওন দেয় নাই, মাইয়াডা খিদায় অনেক কষ্ট পাইতাছে।

সিন্ডারেলা মায়ার মেয়ের নাম নয়। মায়ার মেয়ের নাম অহনা। মায়ার বর অমিয় খুব শখ করে মেয়ের নাম রেখেছে অহনা। অমিয়র মেয়ে অহনা। মাথায় ছিট না থাকলে মায়া রানির মতো আধিপত্যে অমিয়র সংসার করতে পারত। অমিয়র মতো ছেলে হয় না। সেল্ফ মেইড ম্যান। ছাত্র হিসাবে খালি হাতে রাজধানীতে এসে বয়স তিন দশকের ঘর ছোঁয়ার আগেই সফল ব্যবসায়ী। গাড়ি বাড়ির মালিক। এমন সোনার টুকরো ছেলে হাজারে একটা মেলে— এর সঙ্গে ঘর করতে পারল না মায়া! দোষটা মায়ারই। কাছে-দূরের আত্মীয়-স্বজন চেনা জানা সমাজ সংসার চালানো সুস্থ মানুষদের এ ব্যাপারে কোনো মতদ্বৈততা নেই। মায়ার মাঝে সংসার না করার মতো দৃশ্যমান কোনো উগ্রতা না পেয়ে মাথায় ছিট আছে— অমিয়র এই অভিযোগ নির্দ্বিধায় সবাই মেনে নিয়েছে। মাথায় ছিট না থাকলে কেউ দুই মাস বয়সী সন্তান কোলে নিয়ে স্বামীর সংসার করবে না বলে গোঁ ধরতে পারে?

কিন্তু মায়া সেটা মানতে নারাজ। মুখে হৈ-হল্লা না করলেও তার ধারণা বাকি সবাই অসুস্থ, সে নিজেই একমাত্র সুস্থ। সবাই মিথ্যা জেনেও মিথ্যাকে সত্য বলে। বলে বলে জীবন কাটিয়ে দেয়। সত্য জেনেও সেটাকে মিথ্যা হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করে। জেনেশুনে করে। সংসারে এরাই সুস্থ? মোটেই না। এরা সবাই অসুস্থ। সে নিজে সুস্থ।

মায়ার এই অতিরিক্ত সুস্থতা সংসারের সবাইকে অসুস্থ করে দিয়েছিল। বাচ্চা নিয়ে কই যাবে, কী করবে ইত্যাদি নানাবিধ উৎকণ্ঠায় আমার সংসারে দুশ্চিন্তার ছায়া যখন দীর্ঘস্থায়ী হতে যাচ্ছিল, তখনই আশাতীত এক পরিস্থিতি সবকিছু ঠিক করে দেয়। ভাই আর ভাই-বউয়ের পরিকল্পিত সাজানো সংসারে সে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা, সেটা উপলব্ধি করে চুপচাপ নির্ঝঞ্ঝাটই থাকে মায়া। কাউকে ভোগায় না। ও যে একটা জলজ্যান্ত মানুষ ঘরে আছে আমরা মাঝেমধ্যে ভুলে যাই। জিজ্ঞেস না করে যে একটা মাছের টুকরা পাতে নেয় না, সে কাউকে কিছু না বলে একা বাড়ির বাইরে যাবে কল্পনাই করা যায় না। কিন্তু আজ কী হলো…

 

মায়া :
ভালো ঘর ভালো বরে আমার বিয়ে হয়েছিল। ঘটকের ঘটকালি। প্রথম দেখাতেই আমাকে পছন্দ করে ফেললে কারো আপত্তি করার কোনো যৌক্তিক কারণই ছিল না। আমি দেখতে যেমন মধ্যম মানের, গুণেও মধ্যম মান। বাড়ির সবচেয়ে কাছের কলেজে বি এ ক্লাসে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে আর কোথাও ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা নেই বলেই। অবশ্য এই ভর্তিটা খুব জরুরি ছিল তা-ও নয়। পড়াশোনায় আমি বরাবরই শেষ বেঞ্চের ছাত্রী। ভর্তি করার মূল কারণই ছিল বিয়ের বাজারে মেয়ে ‘বি এ ক্লাসে পড়ে’ বিষয়টা বলা। আর একটা কারণও ছিল। সময় ক্ষেপন। ঘরে বসে থেকে আমি করতামই বা কী। এমন ফুরাতে না চাওয়া উদ্দেশ্যহীন সময়ে এমন একটা বিয়ের প্রস্তাব, আবার এক দেখাতেই পছন্দ, বিষয়টি ছিল হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো। সেল্ফ মেইড ম্যান। বাবা মা জেলা সদরের স্কুল মাস্টার, ওখানেই থাকে। ঢাকা শহরে তার একাই প্রতিষ্ঠা পাওয়া। গাড়ি বাড়ি সব নিজের করা। কেউ আর তলিয়ে কিছু খোঁজ করার প্রয়োজনই বোধ করেনি। না না, তলিয়ে খোঁজ নিয়ে পাওয়ার মতো খুব যে একটা কিছু ছিল, মোটেই তা নয়। সুখেই ছিলাম বছরখানেক।

খোদ রাজধানীতে তখন নিজের একটা মোবাইল ফোন অনেক ধনী ব্যক্তির কাছেও স্বপ্নের মতো। ঘটনাটা জানাজানি হলে আমার পরিচিত মহলের অন্দরে-বাহিরে শোরগোল পড়ে যায়। সেই গরবে আমি খুব মনোযোগে অমিয়র সংসার করি। আমার রূপের ঘাটতি তো ঘোচাবার নয়, গুণের ঘাটতি ঘোচাতে চেষ্টার কমতি থাকে না।

বিয়ের রাতে সে আমাকে চমকে দিয়ে একটা নোকিয়া ফোন উপহার দিয়েছিল। খোদ রাজধানীতে তখন নিজের একটা মোবাইল ফোন অনেক ধনী ব্যক্তির কাছেও স্বপ্নের মতো। ঘটনাটা জানাজানি হলে আমার পরিচিত মহলের অন্দরে-বাহিরে শোরগোল পড়ে যায়। সেই গরবে আমি খুব মনোযোগে অমিয়র সংসার করি। আমার রূপের ঘাটতি তো ঘোচাবার নয়, গুণের ঘাটতি ঘোচাতে চেষ্টার কমতি থাকে না। আমি মায়ের কাছে গিয়ে গিয়ে এটা ওটা রান্না শিখি। চিংড়ি মালাইকারি, খাসির রেজালা রান্না করি। অমিয়র ওই এক গুণ— যা রান্না করি, তাই অসম্ভব মজা লাগে তার। লবণ না দিলেও বলে খুব মজা, মরিচ বেশি দিলেও বলে খুব মজা।

বছরে দুইবার দুই ঈদে শ্বশুর বাড়িও নিয়ে যায়। প্রথমবার শাশুড়ি মুখ দেখে হাতে সোনার একগাছা চুড়ি পরিয়ে দেয়। এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই ছিল। সমস্যাটা শুরু হলো সিন্ডারেলা পেটে আসার পর। বমি করতে করতে আমার নাড়িভুড়ি তো বটেই, যেন পেটের বাচ্চাটাও বের হয়ে আসে অবস্থা। পানি শূন্যতার কারণে আমাকে স্যালাইন লাগিয়ে দেয় ডাক্তার। আমাকে দেখাশোনাসহ গেরস্থালি কাজ করার জন্য দেশের বাড়ি থেকে একজন মহিলা আনা হয়। আমি সকালের নাস্তায় রুটি ভাজি, দুপুরের খাবারে রুই মাছের ঝোল আর তিতা করলার ভাজি… রান্নার আয়োজন ভালো করে বোঝাতে না বোঝাতেই সাতদিনের মাথায় সে থাকবে না বলে চলে যায়। আমার কোনো পীড়াপীড়িতেই সে একবেলা দেরি করতে রাজি হয় না। এভাবে একজন দুজন তিনজন চলে যায় পরপর কয়েক মাসে। এদিকে প্রতি মাসে পাল্লা দিয়ে আমার প্রেসার, ডায়াবেটিস ইত্যাদি নানা গর্ভকালীন জটিলতা বাড়তে থাকলে সংসার প্রায় অচল হয়ে পড়ে। হাতের কাছে দুটি উপায় থাকে, এক. আমার মা-ভাইয়ের সংসারে চলে যাওয়া, দুই. মমতাকে কয়েক মাসের জন্য আমার বাসায় আনিয়ে নেওয়া।

ভাইয়ের ছোটো বাসা, ভাই-ভাবির ব্যস্ততা, মায়ের যখন তখন বয়সজনিত নানা অসুস্থতা ইত্যাদি সবদিক চিন্তা করে মমতাকে আনা হয় অচল ঘর সচল করার জন্য। এটিকেই সবচেয়ে সহজ সমাধান মনে হয় সবার।

একদিন গভীর রাতে অমিয়কে আমি আবিষ্কার করি মমতার সাথে ড্রয়িংরুমের ডিভানে। মমতা বাসায় আসার পর দুজনে রাতে বসে বসে ভি সি আরে কাভি কাভি, সিলসিলা সিনেমা দেখে, দেখা তো এক খোয়াব ও সে সিলসিলা হোয়া…সুরের রেশ আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। বেশ লাগে। সচরাচর মধ্যরাতে আমার ঘুম ভাঙে না। সেদিন ভাঙল। আমি ওয়াশরুমে ঢুকতে ঢুকতে দেখলাম রাখি গুলজারের চোখে জল আর অমিতাভ বচ্চন গাইছে, কাভি কাভি মেরা দিল মে…। অন্ধকার ঘরে টিভি ফুঁড়ে জ্বলতে থাকা আলোতে দুইজন আদিম নারী-পুরুষ। শেষ কাজের মেয়েটা চলে যাওয়ার সময় কিছুটা আঁচ দিয়ে গিয়েছিল আমাকে।

সবার কাছে অসম্ভব ভালো ছেলে অমিয়। কেউ বিশ্বাস করেনি আমার কথা। মমতাও বেমালুম অস্বীকার করল। তারপরও আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করলাম আমি, সিন্ডারেলার জন্ম হওয়া পর্যন্ত। মাস দুয়েক পর আমি সিদ্ধান্তে স্থির হলাম। আমাকেই দোষী সাব্যস্ত করল সকলে। আমি মানসিক রোগগ্রস্ত, নির্বিবাদে এ মিথ্যা মেনে নিয়ে অমিয়র সংসার ছেড়ে এলাম। কাগজে-কলমে ডিভোর্স হয়ে গেল আমাদের। আর তার বছর না ঘুরতেই এমন সোনার ছেলে হাতছাড়া না করার হাতছানি অগ্রাহ্য করতে না পেরে ঘরের মেয়ে মমতার সাথে বিয়ে পড়িয়ে দেওয়া হলো অমিয়র। আমার সিন্ডারেলাকে নিয়ে অমিয়র সাথে সংসার করতে গেল মমতা। সংগত কারণেই আমার সিন্ডারেলা বাপের সংসারে গিয়েছিল। সন্তান ভরণপোষণের সামর্থ্য আমার নেই, আবার সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত যে আমার মাথায় সমস্যা। সিন্ডারেলাকে আটকানোর কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণই আমার পক্ষে ছিল না। বছর দুয়েক ভালোই ছিল আমার সিন্ডারেলা। সমস্যা শুরু হলো মমতার যমজ; দুটো মেয়ে জন্মের পর। মমতা আমার সিন্ডারেলাকে ঠিকমতো দেখাশোনা করে না। ঠিকঠাক খেতে দেয় না। মাত্র দু বছরের ব্যবধানে বাচ্চা তিনটা একসাথে বড়ো হলেও বাকি দুজন থেকে আমার মেয়ে বড়ো হয়েছে আলাদা অযত্নে। এই আলাদা যে ওর জন্যই আলাদা, সিন্ডারেলা বুঝত না। সিন্ডারেলা ভাবত এটাই স্বাভাবিক। মমতাকে ও নিজের মা জানত, আমাকে খালা। বাসায় এলে চুপিচুপি জিজ্ঞেস করলে ও কোনোদিন কোনো অভিযোগ করত না বাপ মায়ের নামে। কিংবা কিছু নিয়ে অভিযোগ করা যায় এটাই শেখেনি মেয়েটা। নিজের মেয়েদের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়তে দিলেও আমার সিন্ডারেলাকে তারা পড়িয়েছে বাড়ির কাছে সরকারি স্কুলে। কারো কাছে ব্যাপারটা অস্বাভাবিক মনে হয়নি। মমতা সবাইকে বিশ্বাস করিয়েছে আমার সিন্ডারেলার মাথাটাও আমার মতো। ভালো স্কুলে পড়ার যোগ্যতা নেই। অনেক কষ্টে ছিল আমার মেয়েটা ওদের সংসারে। কিন্তু আমার মেয়ের কষ্ট যে আমি বাসায় বসে টের পাই কেউ সেটা বিশ্বাস করে না। আমার মেয়ে সিন্ডারেলা নিজেও বিশ্বাস করে না। সে বিশ্বাসই করে না যে আমি তার মা।

 

শেষ বলে কিছু নেই :
মহিম দ্রুত ব্যাংক থেকে ফিরে মায়ের ওপর একচোট ঝাল ঝেড়ে প্রথম ফোনটা দেয় মমতাকে। মমতা বাসায় নেই। ফোন রিসিভ করে বুয়া। আপায় তো দৌড়াইয়া বাইরে গেল। কেন গেল, কোথায় গেল বলার আগেই নূরী ফোনটা কেটে দেয়। বিকেলে অমিয়ও বাসায় ফেরে। মমতারও তো বাইরে যাবার কথা নয় এই সময়ে। আজ বিকেলে ওরও বাইরে যেতে হলো? মায়ার ছেড়ে আসা সংসার কী স্বাচ্ছন্দ্যেই না করছে মমতা! বছরে বছরে থাইল্যান্ড ব্যাংকক ঘুরতে যায়। দুই ঈদে বাপের বাড়ি আসে। ভাবতে ভাবতে মমতার জন্য একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে মহিমের। একটা বিকেলে একটা মেয়ে বাড়ির বাইরে এটা এমন কিছু বিষয় নয়। কিন্তু মায়ার মাথায় ছিট আছে বলে ব্যাপারটা ভিন্ন। তারউপর কদিন থেকে বলছে, তার সিন্ডারেলার খুব কষ্ট। সিন্ডারেলাকে বাঁচাতে যেতে হবে তার। কেন বলছে কে জানে! কেউ গুরুত্ব দিয়ে জিজ্ঞেস করেনি। সংসারে আদতে মায়ার কথার কীই-বা গুরুত্ব থাকতে পারে? কেনই বা থাকবে?

নিজের মেয়ের নাম দিয়েছে সে সিন্ডারেলা। মহিম আর মহিমের বউ দুজনেই ব্যাংকে চলে গেলে তাদের একমাত্র ছেলে সাকিবকে সকালে কর্নফ্লেক্স আর দুপুরে খিচুড়ি খাওয়াতে খাওয়াতে সিন্ডারেলা অ্যানিমেশন ফিল্ম দেখে মায়া। সৎ মায়ের ব্যবহার দেখে সে। সাকিবের চেয়ে দ্রুতগতিতে কল্পনার রাজ্যে ঘুরে বেড়ায় মায়া, আর নিজেকে কল্পনা করে সেই জাদুর বুড়ির মতো— সিন্ডারেলার জন্য জামা কিনবে, জুতো কিনবে। সৎ মায়ের ঘর থেকে সিন্ডারেলাকে উদ্ধার করবে সে। মহিম মাঝে মাঝে এসব খবর পায় সাকিবের কাছে। খেলার ছলে সাকিব বলে, আব্বু বড়ো ফুপ্পি বলেছে সিন্ডারেলার মতো জুতা লাগবে অহনা আপুর জন্য। মহিম অন্য কোনো কাজের মনোযোগে বিড়বিড় করে বলে, যেমন তুই, তেমন তোর বড়ো ফুপ্পি। তারপর সংসারের হাজারো গুরুত্বপূর্ণ কাজের ভীড়ে একেবারেই অগুরুত্বপূর্ণ কথাটি যথারীতি হারিয়ে যায়।

ঘড়িতে সাড়ে ছয়টা। রংহীন বিকেল আরও পানসে হয়ে উঠছে মানুষের ব্যস্ততার রং হজম করে করে। রাজধানীর পথে ফসিল জটে ত্যাক্তবিরক্ত মানুষের জন্য বুঝি একটু থমকে দাঁড়িয়ে আছে এই বিকেল। সন্ধ্যা নামছে না। এখনো ফেরেনি মায়া।

ঘড়িতে সাড়ে ছয়টা। রংহীন বিকেল আরও পানসে হয়ে উঠছে মানুষের ব্যস্ততার রং হজম করে করে। রাজধানীর পথে ফসিল জটে ত্যাক্তবিরক্ত মানুষের জন্য বুঝি একটু থমকে দাঁড়িয়ে আছে এই বিকেল। সন্ধ্যা নামছে না। এখনো ফেরেনি মায়া। ভীষণ অধৈর্য আর অস্থির হয়ে পড়েন মা। কোনোদিন এভাবে কোথাও যায় না মায়া।

ড্রাইভার নিয়ে বের হয় মহিম। কাছের এক ‘ওয়ান টু নাইন্টি নাইন’ দোকান থেকে মাঝেমধ্যে এটা সেটা কিনতে যায় মায়া। ওরা বলল, আজ যায়নি সেখানে। গলির এমাথা ওমাথা হাঁটছে কি না, দেখার জন্য দুবার ঘুরল গলিটা। না নেই। কোথায় খুঁজবে আর? বিকেলের ঘণ্টা কয়েকের মধ্যেই থানা-হাসপাতাল করা ঠিক হবে কি না সিদ্ধান্ত নিতে পারে না মহিম। একটু পরে নিজেই হয়তো বাড়ি ফিরবে। কই যাবে! মায়ের কারণে ত্রস্ত হয়ে বের হতে হলো। একবার মনে হলো মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে যায়নি তো! কিন্তু মায়ার তো ওর মেয়ের শ্বশুরবাড়ি চেনার কথা নয়।

মেয়েটার বিয়ে নিয়েও যৎসামান্য ঝামেলা হয়েছে। মায়ার মেয়েকে দেখতে এসে ওরা পছন্দ করে বসল মমতার মেয়েকে। কিন্তু মমতা কিছুতেই বড়ো মেয়ে রেখে ছোটো মেয়েকে বিয়ে দেবে না। যত যাই হোক, মেয়েটাকে পেটে ধরেছে মায়া। ওকে একবার জিজ্ঞেস করা ভদ্রতা। কিন্তু জিজ্ঞেস করতে এলে তীব্র আপত্তি জানায় মায়া। কিছুতেই সে মেয়েকে এখানে বিয়ে দেবে না। কিছুতেই না। মমতা ইচ্ছে করে একটা বদ ছেলের সাথে বিয়ে দিচ্ছে সিন্ডারেলাকে। পাত্র এতো ভালো তো ওর মেয়েকে দেয় না কেন? মায়া যা-ই বলুক, মমতার কোনো দোষ নেই আসলে। নিজের মেয়ের মতোই আহ্লাদে-যত্নে রেখেছে মায়ার মেয়েকে। সৎ পাত্রে পাত্রস্থ করেছে সামাজিক রীতি মেনেই। মায়ারই যতসব অলীক অভিযোগ।

আবার মমতাকে ফোন দেয় মহিম। না মমতাও এখনো ফেরেনি। সন্দেহ হলো মায়া আর মমতা কী একসাথে কোথাও বেরিয়েছে? কিন্তু ওরা দুজন তো দুজনকে এড়িয়ে চলে সযতনে। একসাথে কোথাও যাবার কথা নয়। মেয়েটাকে একটা ফোন দিলে হয়! অহনার ফোন বাজছে বাজছে… কেউ তুলছে না। আশ্চর্য এই বিকেলে সবার একসাথে হলো কী? মেয়ের শ্বশুরবাড়ির ঠিকানাও নেওয়া হয়নি। বৌভাত খেতে গিয়েছিল মিরপুরের দিকে একটা কমিউনিটি সেন্টারে। বাসাও মিরপুরের দিকেই হবে। ধুর এই রাস্তায় রাস্তায় লক্ষ্যহীন ঘোরার চেয়ে বাসায় গিয়ে মা আর বউকে নিয়ে একটা পরামর্শ করা যেতে পারে। ড্রাইভারকে বাড়িমুখি গাড়ি ঘোরাতে বলে মহিম।

গাড়ি গেটে ঢোকামাত্রই আননোন এক নাম্বার থেকে ফোন আসে। মমতা। তার অস্থির কণ্ঠ কাঁপছে। আতঙ্কের শ্বাস-প্রশ্বাসে বাধা পেয়ে পেয়ে কোনোরকমে বলতে পারে, মহিম তাড়াতাড়ি স্কয়ার হাসপাতালে আয়। অহনা গলায় ফাঁস দিয়েছে।

মহিম দ্রুত বাসায় ঢোকে, বউকে নিয়ে একসাথে যাবে হাসপাতালে। এসব কিংকর্তব্যবিমুঢ় সময়ে সে খুব ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ড্রয়িংরুমে ঢুকে থমকে যায় মহিম। সোফায় বসে অহনাকে প্লেটে ভাত মাখিয়ে খাইয়ে দিচ্ছে মায়া। মহিম এসেছিস। এই যে দেখ আজ যেভাবে ওর গলাটিপে ধরেছিল ওর বর। সময়মতো আমি না পৌঁছালে মেরেই ফেলত আমার মেয়েটাকে। বাইরে তখন দ্রুত শেষ হয়ে আসতে থাকে বিষণ্ন বিকেল।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

গল্পকার, নাট্যকার, মঞ্চাভিনেত্রী, শিক্ষক। বাংলাদেশ তার গল্পের আত্মা জুড়ে থাকে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আশা, স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গ, বেদনা ও বৈষম্যকে বিষয় করে তিনি গল্প লেখেন, যা একই সঙ্গে ডকুমেন্টেশন এবং শুধু ডকুমেন্টেশনই নয়, আখ্যান; কথাসাহিত্য। তার গল্পে জীবনের বাঁকবদল স্পষ্ট এবং অন্যদের থেকে আলাদা এক স্বর, যে-স্বর আমাদের আত্মা খমচে ধরে, বেদনাহত করে। সমকালীন বাংলাদেশ তার সমস্ত রকমের ঘা, রক্তপুঁজ নিয়ে উপস্থিত থাকে। ব্যবচ্ছেদের গল্পগুলি (২০১৫), প্রসঙ্গটি বিব্রতকর (২০১৬), গোল (২০১৮), সেলিব্রেটি অন্ধকারের রোশনাই (২০২০), নদীর নাম ভেড়ামোহনা (২০২০) তার উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত বই। মঞ্চ তার অদ্বিতীয় সত্ত্বা। গড়েছেন নাট্যদল- জীবন সংকেত নাট্যগোষ্ঠী। মঞ্চায়িত হয়- কমলাবতীর পালা, বিভাজন, জ্যোতি সংহিতা ইত্যাদি নাটক।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।