রবিবার, এপ্রিল ১৪

সুকুমার মণ্ডলের দীর্ঘ কবিতা : ছায়া

0

আহা, এরকমই হয়
মনে হয়, আমারই শরীর নিয়ে
পথিক সেজেছে কেউ, যেন কোনো ছায়া
আমি শুধু তার পিছু পিছু হাঁটি

এভাবেই গ্রাম পেরিয়ে আলপথ,
বড়ো বড়ো মাঠ আর রোদ্দুর পেরিয়ে
মারি ও মড়ক পেরিয়ে
অবশেষে, মেঘের
নিচে নিচে
আমরা দুজন হেঁটে হেঁটে যাব
কোথায় যাব স্পষ্ট নয়
ছায়ার বাঁ-কাঁধে লাঙল, মাথার ওপর
ময়ূরপালক, ডানহাতে ধরে আছে
রাখালের বাঁশি
ছায়া বলছে, বনে থাকে বাঘ
আমি ভয় পাচ্ছি
ছায়া বলছে, আমি তো আছি
আর পাখি আছে বনে

পথে পথে এত যে ধুলোবালি,
এত হাওয়া আসছে
চারিদিক থেকে,
আমাদের চুল উড়ছে
এলোমেলো
দুলে উঠছে গাছেদের পাতা
টুপটাপ বটফল পড়ছে
পুকুরের জলে,
তরঙ্গ তটিনীর ছোটো ছোটো
খেয়া, পারাপার
আহা, এরকমই হয়!

ছায়া বলে, যাও, বাড়ি থেকে নিয়ে এসো
গাঁইতি-কোদাল, নিয়ে এসো বীজধান
আমি ভয়ে ভয়ে নিজের ছায়াকে
ছেড়ে
বিপরীত দিকে তবু
স্থির বিশ্বাসে হাঁটি
যে পথ ধরে এতক্ষণ হেঁটে এসেছি
সেই রাস্তায়
শুধু মনে হয়, পথের চারপাশে
এসে বসেছে
অন্যরকম সবুজ, পুষ্পপল্লবশোভা
মাঠের পরে মাঠ ঝিঙেফুল
অজস্র কচুরিপানায়
সেজে উঠেছে পুকুর
আহা, এরকমই হয়!

হঠাৎ-এসে-পড়া সুড়ঙ্গের মধ্যে আমি
ঢুকে পড়ছি, তার ওপর দিয়ে
ঝমঝম করে চলে যাচ্ছে ট্রেন
মনে পড়ছে, মাঝরাতে
আমি একদিন ভুল ট্রেনে
উঠে পড়েছিলাম
গন্তব্যের বদলে নতুন একটি স্টেশন
তবু, সহস্র ভ্রমণের মাঝে
বুকের মধ্যে ভেসে উঠছে সেই
অচেনা স্টেশনের নিশি, ঝিঁঝিডাক
মনে পড়ছে,
অচেনা রাস্তার যাবতীয় ফুল
হয়তো আমার সেখানে কোনোদিন
নামাই হতো না
তবু সেই যে ভুল করে এসে পড়লাম
সেই যে আরও অন্য ট্রেনের জন্য
অপেক্ষারত এলোমেলো যাত্রীরা
তাদের এত নিখুঁত করে
দেখা হতো না কোনোদিন
যে এক-দুজনের সঙ্গে কথা হলো
তাদেরকে হঠাৎ করে
এত আপন মনে হয়
সেই দিন থেকে আমি জেনেছি
এরকমই হয়!

হাঁটতে হাঁটতে পথের সম্মুখে
কে যে এলো একজন
বহুবিধ দাবিসহ
সে বলছে, আমি
নির্ঘাত ভুলে গেছি পথ
কোনো প্রেতাত্মা বাসা বেঁধে বসে আছে
মাথার ভেতর
সে বলছে, আমারই গ্রামে তাঁর বসবাস
আমি নাকি গ্রাম ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছি
অন্য কোনো পথে
জোর করে সে আমাকে
সঙ্গে নেবে সঠিক রাস্তায়

দেখি, ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে পথ
পুকুর থেকে মুছে যাচ্ছে
যাবতীয় জল, স্থলের সবুজ
কার সঙ্গে যে হেঁটে চলেছি আমি
তাঁর কাঁধে লাঙল নেই
হাতে নেই কোনো বাঁশি
মাথায় আছে রুক্ষ রুক্ষ চুল
যেন কোনো মারি ও মড়ক এসেছে

এর পরে তবে কতদূর, কোথায় চলেছে
এই পৃথিবীর পথ
তেষ্টায় বুজে আসে চোখ, বসে পড়ি
মাথায় ওপরে মেঘ ভেসে ভেসে যায়
তুমুল গর্জন, বজ্রাঘাত
জ্ঞান ফিরে দেখি, মারি ও মড়ক
পুড়ে ছাই

আমার নিজস্ব ছায়া বহুদূর থেকে
হেঁটে হেঁটে আসে
মাথায় সে-ই ময়ূরপালক, হাতে বাঁশি
যে যাই বলুক আমাকে
আহা, এরকমই হয়!

 

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ১৯৭৫ সালের ২০ নভেম্বর, পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার সরবড়ি গ্রামে। লেখালেখির শুরু কলেজবেলায়। মূলত কবিতা ও কবিতা বিষয়ক গদ্য, এবং ছোট গল্প। সম্পাদনা করেন সাহিত্য বিষয়ক পত্রিকা ‘আমানি’ ও ‘পাখিরা’। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: ‘রূপশ্রী দত্ত’ (২০০১), ‘যে নদী গিয়াছে ডুবিয়া অস্তরাগ জলে’ (২০১২), ‘সমস্ত দিন ফুলগাছ’ (২০১৭), ‘জলজ কবিতা’ (২০২১)। কবিতার জন্য পেয়েছেন ‘সাহিত্য মন্দির পুরস্কার ২০১৭’ ও ‘সোনাঝুরি সাহিত্য সম্মান ২০২০’।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।