রবিবার, এপ্রিল ১৪

সেলফিব্রিজ পেরিয়ে খোজারখলা : শেখ লুৎফর

0

১.
ব্যাংকের কর্মজীবী হলেও আফজল সাহেবের মনটা আকবর বাদশার মতো। বয়স চল্লিশ। এক ছেলে, সুন্দরী স্ত্রী ও গোছানো একটা সংসারে কর্তা তিনি। সুযোগ পেলে ছুটিছাটার বিকেলে বউ-ছেলেকে নিয়ে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হাঁটাহাঁটি করেন। ছোটো ভাইদের কেউ কেউ সালাম দেয়। তবু তার হিসেবি চোখের মণিতে হঠাৎ হঠাৎ আগুন ঝলক মারে। রঙিন টাইয়ে হাত দিয়ে নিজেকে অনুভব করেন। তারপর স্বপ্নপুরী জর্দা দিয়ে পান খান। সিগারেট ধরিয়ে হয়ে যেতে চান আনমনা। অফিসে যাওয়া-আসার পথে তাকে রোজ রোজ সেলফিব্রিজ পেরুতে হয়। সেখানে তিনি একটা ব্যাংকের ক্যাশিয়ার। বান্ডিল বান্ডিল টাকা মেশিনের হোগার মধ্যে ভরে দিয়ে মরা চোখে তাকিয়ে থাকেন। ফড়ফড়…শব্দ হয়। তার কামনা জাগে। মাথাটা খুব পরিষ্কার লাগে। ইচ্ছা করে এইসব নিয়ম-শৃঙ্খলার মুখে একবার হাত মেরে, সুন্দরী কলিগকে বগলদাবা করে, হাসতে হাসতে সিঁড়ি দিয়ে তড়তড় করে বেরিয়ে যেতে। কিন্তু তিনি অফিসের ঠান্ডা ঘরে বসে বহু দূর থেকে ভেসে আসা কলুর তেলের ঘানির ক্যাঁড়র…ক্যাঁড়…শব্দ শুনতে পান। মনটা একটু উদাস হয়। মুখটা মা-মরা ছেলের মতো শুকনা শুকনা লাগে। আফজল সাহেব কী নিজেকে কলুর বলদ ভাবতে শুরু করেছেন?

তারপর স্বপ্নপুরী জর্দা দিয়ে পান খান। সিগারেট ধরিয়ে হয়ে যেতে চান আনমনা। অফিসে যাওয়া-আসার পথে তাকে রোজ রোজ সেলফিব্রিজ পেরুতে হয়। সেখানে তিনি একটা ব্যাংকের ক্যাশিয়ার। বান্ডিল বান্ডিল টাকা মেশিনের হোগার মধ্যে ভরে দিয়ে মরা চোখে তাকিয়ে থাকেন।

 

২.
শেখ ঘাট হয়ে কাজীর বাজারের দিকে হাঁটতে থাকলে দেখা যায় সুরমা নদী আড়াল করে শুয়ে আছে সেলফিব্রিজ। বিকেলে এখানে মেলা জমে। রেলিং ঘেঁষে সারি সারি চটপটির দোকান বসে, রঙিন হিজাব আর জিন্সের লীলা। মোকামে মোকামে কামের বাতি জ্বলতে থাকে। সেলফি ওঠে দশ-বিশ…। মাজারের দিক থেকে শাহজালালের কবুতরের ঝাঁক সবার মাথার উপর দিয়ে, শাহপরাণের দরগার দিকে পতপত করে ছুটে যায় আর জগতের আলো-অন্ধকার লাইটপোস্টের মাথা থেকে গড়িয়ে পড়ে। নিচে সুরমা নদীর মরা বুক, জলকষ্টে প্রাণ যায় যায়, কড়কড়ে বালু আর ছত্রভঙ্গ আলো, তার মাঝে স্বপ্নেভঙ্গে দিশেহারা নদীটা বালু চরের ফাঁকফোঁক দিয়ে, নগরের সমুদয় লোভ-কাম নিয়ে, দূর্গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে যায়।

 

৩.
সেলফিব্রিজ পেরুলেই খোজারখলা। হাজার বছর আগে খোজারখলায় ইরানিরা বসত করত। বাজার থেকে তাগড়া তাগড়া ক্রীতদাস কিনে এনে লিঙ্গ কেটে বলদ বানাত। তারপর জাহাজ বোঝাই করে দিল্লী কিংবা মুর্শীদাবাদ। একজন আকবর বাদশার বেগম ছিল পাঁচ হাজার। জেনানা মহলের খরচ বাবদ বরাদ্দ ছিল সোবেবাংলার সবটুকু আয়।

 

৪.
আফজল সাহেব একজন ভদ্রলোক। অফিসে লাঞ্চ টাইমে জোহরের নামাজ আদায় করেন। মিনি ভুরিসহ এসির বাতাসে বসে থাকতে থাকতে শরীরের চামড়া কুনো ব্যাঙের পেটের মতো ফ্যাকাশে। সন্ধ্যায় অফিসের ঠান্ডা ঘর থেকে বেরুতেই ড্রেনের পচা গন্ধ-গরমের সাথে নাকে লাগে নদীর দিক থেকে ভেসে আসা পানির আঁশটে গন্ধ। দুষ্ট বালকের কৌতুহলে মনটা নেচে ওঠে। দেহযন্ত্রের হার্ডডিস্ক-মাদারবোর্ড সব বুঝি ভাইরাসে অচল করে দিচ্ছে! চিন্তা লাগে। তাই তিনি হাঁটেন। পান চিবাতে চিবাতে সিগারেটে টান দেন। মিষ্টি ধোঁয়ার সাথে বেরিয়ে আসে স্বপ্নপুরী জর্দার সুঘ্রাণ। এইরকম স্বপ্নস্বপ্ন মুহূর্তে তিনি সেলফিব্রিজে ওঠেন। ইতিহাস তাকে তাড়া করে। অহেতুক একটা আতঙ্কে তার হাত চলে যায় নিচের একটা বিশেষ অঙ্গে। ব্রিজ থেকে তার চোখ চলে যায় খোজারখলার দিকে। মন চলে যায় হাজার বছর আগে ইরানিদের ঘরে ঘরে। কানে লাগে টগবগে তরুণ ক্রীতদাসের আর্তনাদ। চোখে ভাসে ছুরির একটানে কেটে ফেলা লিঙ্গের মুণ্ডু। মনে মনে তিনি আরেকবার কেঁপে ওঠেন।

তবু এইসবের মধ্যে ইদানিং সিএনজি স্ট্যান্ডে প্রায়ই তার সাথে দেখা হয় প্রাথমিকের এক শিক্ষিকার। মহিলার উঁচু বুক ও ভারি পেছন দিকটার দিকে তিনি বারবার চোরা চোখে তাকান। মেয়েটি চুরি করে তাকে হাসি উপহার দেয়। হাসি দেখে তিনি লজ্জা পান। হাসির মাঝে মেয়েটি তাকে বুঝি বলছে, আমি বুঝেছি আপনার চোখে কী? তার শরীর-মনে শিহরন লাগে। বুক ভরে দম টানতে ইচ্ছা করে।

 

৫.
ভদ্রলোক একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ দেওয়া মানুষ। তিন বছর প্রেমের পর বান্ধবীকে বিয়ে করেছেন। বর্তমানে তিনি তাঁর এক মহিলা কলিগের সাথে চুমোচাট্টার মতো কিঞ্চিত পাপে লিপ্ত। বিষণ্নতায় ভোগা, চারপাশের সবকিছু বাজে বাজে লাগা কিংবা নিজের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলা তার নিয়তি। তবু এইসবের মধ্যে ইদানিং সিএনজি স্ট্যান্ডে প্রায়ই তার সাথে দেখা হয় প্রাথমিকের এক শিক্ষিকার। মহিলার উঁচু বুক ও ভারি পেছন দিকটার দিকে তিনি বারবার চোরা চোখে তাকান। মেয়েটি চুরি করে তাকে হাসি উপহার দেয়। হাসি দেখে তিনি লজ্জা পান। হাসির মাঝে মেয়েটি তাকে বুঝি বলছে, আমি বুঝেছি আপনার চোখে কী? তার শরীর-মনে শিহরন লাগে। বুক ভরে দম টানতে ইচ্ছা করে। একজন আকবর বাদশা একা সামলাতেন পাঁচ হাজার। বর্তমানে তিনি সামলাচ্ছেন মাত্র দুইজন। অবশ্য আফজল সাহেব মনে মনে তিন নম্বর জনের কথাও ভাবতে পারেন। সেইটা সময় দেখবে। শ্যামল দাদার একটা বই আছে, ‘সময় বড় বলবান’।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ময়মনসিংহরে গফরগাঁওয়ে ১৯৬৬ সালে। বিএসসি সম্পন্ন করে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত আছেন। র্বতমানে থাকনে সুনামগঞ্জে। প্রকাশতি গল্পের বই: ‘উল্টারথে’ [২০০৮], ‘ভাতবউ’ [২০১৩] ‘অসুখ ও টিকনের ঘরগিরস্তি’, [২০১৭]। উপন্যাস: ‘আত্মজীবনের দিবারাত্রী’ [২০১১], ‘রাজকুমারী’ [২০১৯]।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।