বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৮

স্বপ্নাতুর : পূজা মিত্র

0

Eid Motifশেষমেষ স্যান্ডেলটা খুলে হাতেই নিতে হলো মিলিকে।

আর মাত্র কয়েক পা এগুলেই একটা অটো ধরে সে সহজেই পৌঁছে যেতে পারত। অথচ এমন জায়গায় এসে বিপদটি ঘটল যে এখন ত্রিশ টাকা বাড়তি খরচ করে রিকশা নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

গুলিস্তানের হোলসেল মার্কেট থেকে গত সোমবারেই সে কিনেছিল সাড়ে তিনশো টাকা দিয়ে এই স্যান্ডেল। ঠিক কিনেছিল তা বলা যায় না। এক ফচকে লোক বুঝিয়ে সুজিয়ে গছিয়ে দিয়েছিল।

‘আরে আপা! মোটা ঝিলওয়ালা চালও আপনি পঞ্চাশ টাকার কমে পাবেন না কোথাও। এক কেজি ত্যালের দাম একশো বিশ। সেই তুলনায় সাড়ে তিনশো টাকায় এই স্যান্ডেল। এক বছরের মধ্যি যদি একটুও আঁঠা ওঠে নিয়ে আসবেন। নতুন দিয়ে দেব একজোড়া।’

মিলিরও পছন্দ হয়েছিল স্যান্ডেলজোড়া। তাই আর কথা না বাড়িয়েই টাকা গুনে দিয়ে চলে এলো সে। তারপর তিনদিন পার হতে না হতেই এই বিপদ। স্যান্ডেলের কোনায় উঁচু হয়ে থাকা পেরেকের মতো শক্ত কী এক বস্তুতে লেগে বুড়ো আঙুলের পাশ ঘেঁষে কেটে রক্তারক্তি কাণ্ড। ফুলেও গিয়েছে পায়ের পাতা। সারাদিন কুটকুট করলেও সে পায়ের দিকে ফিরে তাকানোর অবসর পায়নি। এখন রাস্তায় বেরোতেই এই অবস্থা।

মিলি উবু হয়ে ক্ষতস্থানটির চরপাশে আঙুলের টিপ বসাল। প্রচণ্ড ব্যথা। ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল ওর। টঙ্কার ফঙ্কার হয়ে না যায়! টিটেনাসের টিকার ডোজগুলো তো শেষ করতে পারেনি সে। তার কী ডাক্তার দেখানো উচিৎ? কিন্তু হাতে যা টাকা আছে তাতে তো সংসার খরচটাই চলবে না। বাড়তি খরচ এখন সে কীভাবে করবে? যা হয় হোক, বাসায় ফিরে ভালো করে ডেটলজলে ধুয়ে ফেললেই হবে।

মিলি উবু হয়ে ক্ষতস্থানটির চরপাশে আঙুলের টিপ বসাল। প্রচণ্ড ব্যথা। ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল ওর। টঙ্কার ফঙ্কার হয়ে না যায়! টিটেনাসের টিকার ডোজগুলো তো শেষ করতে পারেনি সে। তার কী ডাক্তার দেখানো উচিৎ? কিন্তু হাতে যা টাকা আছে তাতে তো সংসার খরচটাই চলবে না। বাড়তি খরচ এখন সে কীভাবে করবে? যা হয় হোক, বাসায় ফিরে ভালো করে ডেটলজলে ধুয়ে ফেললেই হবে। মনে বল আনার চেষ্টা করে মিলি এবং একহাতে স্যান্ডেল নিয়ে ত্রিশ টাকার পরিবর্তে পঁচিশ টাকায় একটা সাইকেল রিকশা ডেকে উঠে পড়ে।

খুব কাছে বস্তি থাকলেও মিলিদের পাড়াটি ভদ্র। সকালে কিংবা মধ্যদুপুরে কিংবা পড়ন্ত বিকেলে ছাদে দাঁড়ালেই শোনা যায় বস্তিবাসীর মুখ থেকে ছোটা অনর্গল অশ্রাব্য শব্দ। তবু মিলিরা ভদ্রলোক। ওই আগলহীন মানুষগুলোর থেকে যে তারা উন্নত— এটা ভাবতেও ভালো লাগে মাঝে মাঝে। একটি ছোটোখাটো তিনতলা বাড়ির নিচতলার অন্ধকার রাজ্যের তিনখানা মাত্র ঘরে ছয়জন মানুষ ঠেঁসেঠুঁসে আছে প্রায় সাতবছর ধরে। উপায় নেই তাই অন্য কোথাও যাওয়ার নাম না করে কেন্নোর মতো গুটিয়ে রেখেছে তারা নিজেদের। ড্রেন আর সেপটি ট্যাংকের তীব্র দুর্গন্ধ, মশা-মাছি-পোকামাকড়ের উৎপাত সহ্য করে কোনোরকমে বেঁচে আছে এই ক’টা প্রাণি।

মিলিকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঘরে প্রবেশ করতে প্রথমে দেখল ওর ছোটোভাই অজিত। যেহেতু সে দিদির সাথে কথা বলা বন্ধ করেছে প্রায় দুবছর, তাই দ্বিতীয়বার আর তাকাল না ফিরে। মিলির মা ছুটে এলো হাঁপাতে হাঁপাতে।

‘কী হইছে তোর? ও মনি! পাও খোঁড়াচ্ছিস ক্যানো?’

শেষ সন্তানটির জন্মের পর সূতিকা হয়েছিল এই মহিলার। তারপর থেকে চেহারা সত্যি সত্যি সুতোর মতো হয়ে গেছে। দারিদ্র্য, দুশ্চিন্তা আর তীব্র এক গ্লানির বোঝা মাথায় নিয়ে এই বদ্ধ ঘরে থেকে থেকে কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে সে। মনে হয় আঙুল দিয়ে একটুখানি নাড়া দিলেই ঢলে পড়ে যাবে। তবে চোখদুটো তার মমতায় ভরা। আর কেউ না বুঝলেও সে বোঝে তার এই নাড়িছেঁড়া সন্তানটকে।

‘কিছু হয়নি মা। স্যান্ডেলের ফিতেই লেগে আঙুলটা একটু ছিলে গেছে।’

মিলির মা ব্যস্ত হয়ে ওঠে।

‘ওষুধ লাগবে না? লাগবে তো। ইস্! আঙুল ফুলে কী হইছে দ্যাখ। আমি বাবলুরে পাঠাচ্ছি ওষুধ আনতি।’

মিলি বোঝে মায়ের এই ছলনা। তার চোখদুটো জলে ভরে ওঠে। তাড়াতাড়ি স্নান সেরে সে আঙুলটা চুবিয়ে নেয় ডেটলজলে।

আজকের মেনু শুধু ডাল আর আলুভাজা। ভাত খেয়ে তাড়াতাড়ি বিছনায় উঠে বসে মিলি। বোনটা গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। দিন দিন কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। এই বয়সে একটু ভালো খাবার দাবার না হলে শরীর ভালো হবেই বা কেমনে? সেই তুলনায় অজিতের চেহারা তাগড়া হয়ে উঠছে।
বাবা ফেরে আরও রাত করে। ঢাকা শহরে প্রাইভেট টিউশানির কদর থাকলেও মিলির বাবা অনিল বাবু যাদের পড়ান তাদের অনেকেরই ঠিকমতো পয়সা দেওয়ার সাধ্য নেই। মাসে-দুমাসে তারা তিনশো টাকা হাতে ধরিয়ে দিলে কিংবা না দিলেও অনিলের কিছু করার নেই। বাইরে বের হলে তবু মনে হয় কিছু একটা করছে। তাছাড়া পয়সা দিতে না পারলেও বিকেল অথবা সন্ধ্যায় তারা এককাপ চা কিংবা দুটো মুড়ির মোয়া ঠিকই জলখাবার হিসেবে দেয়। এও বা মন্দ কী? বদ্ধ ঘরে বসে বসে মশার কামড় খাওয়ার চেয়ে ছেলে পড়াতে গেলে তবু একটু শিক্ষক শিক্ষক ভাব জেগে ওঠে মনে। আজ বাসায় ফিরতেই চেপে ধরল মিলির মা।

‘মনির পাও কেটে রক্তারক্তি। কালকে অফিসে যাবে কেমনে? তুমি একটু ওষুধপত্র আনো।’

অনিল উদ্বিগ্ন হওয়ার পরিবর্তে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে ওঠে।

গোলযোগ শুরু হয় একটু পরেই। একটু তন্দ্রা এসেছিল মিলির। হঠাৎ থালা ছুঁড়ে ফেলার শব্দে সচকিত হয় মিলি এবং লিলি। ওদের সবচেয়ে ছোটো ভাইটিও ঘুম ভেঙে তাকিয়ে থাকে ভীতচোখে।

‘কেবল মেয়ে আর মেয়ে! ওর কারণেই তো আজকে আমাদের এই দুর্দশা। সেদিন একটার মুখে বিষ গুঁজে দিলে তে রক্ষা হতো বাকি প্রাণগুলো। সোহাগে আর বাঁচো না, না? পেচ্ছাপ করি আমি ওর কামাইয়ের ভাতে। সর্বনাশী নষ্ট মেয়ে! ওর জন্যে সব থাকতেও আমরা ভিখারি।’

মা হাতে-পায়ে ধরে থামাতে চেষ্টা করে। অনিল তবু নিশ্চুপ। ছেলের বাক্যে তারও সায় আছে কি না বোঝা যায় না স্পষ্ট। মা ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদে।

মা হাতে-পায়ে ধরে থামাতে চেষ্টা করে। অনিল তবু নিশ্চুপ। ছেলের বাক্যে তারও সায় আছে কি না বোঝা যায় না স্পষ্ট। মা ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদে।

‘মায়ের পেটের বোন। রক্তটুক জল করে ফ্যালল তোগে জন্যি। আর তারে নিয়ে এমন কথা মুখ দিয়ে সরে কেমনে?’

মিলি কানে আঙুল গোঁজে। পাশের খাটে মশারীর ভেতরে লিলি বসা। সেও শুনছে সব নিশ্চুপ হয়ে। ছোটো ভাইটি আবারো ঘুমিয়ে গেছে।

এসব কথায় মিলির চোখে এখন আর জল আসে না। শুধু উত্তপ্ত হয়ে ওঠে দুটো কান। মাথার ভেতরটা কেমন বোঁ বোঁ করে। একটু বাথরুমে যাওয়া দরকার কিন্তু ওদের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে আবারও শুয়ে পড়ে সে। অজিতের ওপর রাগ হয় না তার, যেটা হয় তা হলো অপরাধবোধ। সত্যিই তো। সেদিন যদি চোখবুজে একটু বিষ মুখে পুরে নিতো, তাহলে বাকি পাঁচজন মানুষকে এই দুঃসহ জীবন যাপন করতে হতো না। সব থাকতে আজ তারা পথের ভিখারি! মিথ্যে বলেনি অজিত। কী ছিল না তাদের? গ্রামের খোলামেলা পরিবেশে চৌচালা টিনের ঘর, বিস্তৃর্ণ উঠোন, ফল-পাকুড়ের বাগান, পুকুর, দুই ফসলের জমি। একটুখানি দখিনা হাওয়া পেলেই লাল জামরুল টুপটাপ করে খসে পড়ত টিনের চালে। হাইস্কুলের গণিত শিক্ষক অনিল বিশ্বাস বেতনের পুরোটা স্ত্রীর হাতে গুঁজে দিয়ে বলতেন, ‘খবরদার! এখান থেকে এক পয়সাও খচর করবা না। সামনে মিলির বিয়ে। আমি এমন আয়োজন করব যে সাত গ্রামের মানুষ কব্জি ডুবিয়ে খাবে। বড়োমেয়ে আমার বংশের লক্ষ্মী।’

মিনতি হেসে বলত, ‘তা মাইয়ে য্যানো তোমার মাত্তর একটা। আরেকটার কথা ভাবতি হবে না?’

সাড়ে ছয় বিঘে জমির ধানে উঠোনে বান ডেকে যেত। পুকুরে জাল ফেললেই মাছ উঠত একেকটা তিন কেজির কম নয়। সুখের সংসার অনিলের। সেই সংসারের সমস্ত সুখ একদিন দমকা হাওয়ার মুখে উড়ে গেল।

আর ভাবতে পারে না মিলি। চোখকান বুজে পড়ে থাকে। পায়ের ব্যথাটা মনে হয় বাড়ছে। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে কাল একবার সরকারি ডাক্তার দেখিয়ে এলে খরচ বেশি হবে না। মিলির সব রাগ গিয়ে পড়ে সেই জুতোওয়ালার ওপর। কতো জিনিসের প্রয়োজন তার অথচ কিনতে গেল স্যান্ডেল। তার যে চাকরি সেখানে একটু স্নো-পাউডার, লিপিস্টিক না হলে চলে না। দুটো স্যালোয়ার কামিজই সম্বল। একটার রং উঠে বিশ্রি অবস্থা। একটা আন্ডারগার্মেন্টস তবু ধুয়ে ধুয়ে বেশ কিছুদিন চালিয়ে নেওয়া যায় কিন্তু বাইরে তো ছেঁড়া পোশাক পরা চলে না। সাড়ে তিনশো টাকায় একটা প্রিন্টের থ্রিপিছ কেনা যেত ফুটপাথ থেকে। তা না করে সে গেল সস্তায় স্যান্ডেল কিনতে। এখন গেল তো সব!

অফিসে এসেও বিপত্তি। মুখে গন্ধওয়ালা টাক সহকর্মীটি একগাদা হাতে লেখা চিঠি এনে বলল, ‘আধা ঘন্টার মধ্যে সবগুলো রেডি করা চাই। বসের আজকে মেজাজ খুব খারাপ। পাঁচটার আগে কেউ অফিস থেকে বের হতে পারবে না। দেখবেন যেন বানান ভুল না থাকে একটিও।’

লোকটির উঠে যাওয়ার কথা কিন্তু উঠছে না। এতো লোকজন চারদিকে! তবু সে কেমন গা ঘেঁষে বসার চেষ্টা করছে।

‘একটু সরে না বসলে কাজ করব কেমনে?’

মিলি কিছু না বললে হয়তো কোলের ওপরই উঠে বসতো লোকটা।

সে হাত চালায় দ্রুত। লোকটা কিন্তু বসেই থাকে এবং বসে বসে নানা কথা বলে যায়।

‘আজিজ সাহেব গতকালও ধরেছে আমাকে। বলে, আপনার সাথে তো মিলির বেশ কথাটথা হয়। বলবেন এভাবে বড়ো বড়ো টিপ পরে যেন অফিসে না আসে। মুসলমান মানুষ আমরা। পাঁচঅক্ত নামাজ পড়ি। টিপপরা মানুষ দেখলে আমাদের আবার অজু নষ্ট হয়। মিলি বিশ্বাসের চেহারা মাশাল্লাহ। শুধু টিপটা খুললেই সবকিছু ওকে। ’

‘আজিজ সাহেব গতকালও ধরেছে আমাকে। বলে, আপনার সাথে তো মিলির বেশ কথাটথা হয়। বলবেন এভাবে বড়ো বড়ো টিপ পরে যেন অফিসে না আসে। মুসলমান মানুষ আমরা। পাঁচঅক্ত নামাজ পড়ি। টিপপরা মানুষ দেখলে আমাদের আবার অজু নষ্ট হয়। মিলি বিশ্বাসের চেহারা মাশাল্লাহ। শুধু টিপটা খুললেই সবকিছু ওকে। ’

মিলি বাম হাত কপালে ছুঁইয়ে টিপটা ঠাহর করে কিন্তু খোলে না। স্নো-পাউডার-লিপিস্টিক না পরলে নয় তাই পরা। কিন্তু টিপটি সে পরে শখ করে। গতরাতের সমস্ত ঝড়ের কথা ভুলে সে সকালে কপালে খয়েরি রঙের টিপ পরে যখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল, তখন নিজেই চমকে উঠেছিল। এতো কৃচ্ছ্রসাধনা! এতো গ্লানি! এতো বেদনা! তবু কেন সৌন্দর্যের মায়াজাল ছিন্ন হয় না?

মুখে গন্ধওয়ালা লোকটির নাম বাবুল। মিলি বাবুল সাহেবের কথায় কোনো উত্তর না করলেও তিন দিনের মাথায় ডাক পড়ল বসের কামরায়।

‘আপনার কাজকর্মে খুব সন্তুষ্ট আমি। ভাবছি টাইপিস্ট থেকে প্রমোশন দিয়ে ক্লার্ক করে নেব। বেতনও বাড়বে কিছু।’

বস তাকাল মিলির দিকে সোজা চোখে।

‘চমৎকার দেখাচ্ছে আপনাকে সবুজ টিপ পরে। তবে বোঝেন তো। ধর্মীয় কী ব্যাপার ট্যাপার নাকি আছে। কয়েকজন বলল টিপটা যদি একটু ছোটো করে পরেন। সুন্দরী নারী আপনি। বড়ো টিপ ওদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। কিছু মনে করবেন না।’

মিলির মুখে অনেকগুলো কথা এলো কিন্তু একইসাথে মুখ ভরে থুতু এসেছে বলে বলতে পরল না। তাছাড়া চাকরির প্রমোশনের একটা প্রসঙ্গ উঠেছে। দুইরকম উত্তেজনায় তার গা গুলিয়ে উঠল। সে একুটু বুঝল প্রমোশনের লোভ দেখিয়ে তাকে আপাতত টিপ পরা থেকে বিরত রাখতে চায় অফিসের বড়ো সাহেব।

বাড়িতে ফিরে আরেক বিপত্তির মুখোমুখি হতে হলো মিলিকে।

গলির প্রবেশমুখেই আবু তালেব সাহেবের সাথে দেখা। পেছনে বাবলু। তালেব সাহেবের ডিস্পেন্সারি আছে মোড়ের মাথায় এবং এলাকায় অসুখবিসুখ হলে প্রাথমিক চিকিৎসার কাজটি তিনিই করেন যতেœর সাথে। তালেব ডাক্তারকে দেখে চমকে ওঠার আগেই বাবলু চিৎকার করে বলল, ‘বাবার স্ট্রোক হইছে দিদি।’

মিলির মাথায় একটা চক্কর দিয়ে উঠল শুধু। তালেব ডাক্তার এগিয়ে এসে বললেন, ‘কিচ্ছু না রে। প্রেশার বেড়েছে একটু। ওষুধ দিয়েছি। এই গরমে ভালো মানুষই অসুস্থ হয়ে যায়!’

মিলি অন্তত এটুকু বুঝেছে যে এই পড়ে যাওয়া মানুষটি আর উঠবে না সহজে। বাবার সুস্থতার চেয়ে তার কাছে বড়ো হয়ে উঠল সংসারচিন্তা। কী করবে সে এখন? এতোগুলো মানুষের পেট সে একা কীভাবে ভরাবে? অজিত কিছুই করবে না সংসারের জন্য। এমনকি মিলির ধারণা সে নিশ্চয়ই কোনো অনৈতিক কর্মের দায়ে পুলিশের কাছে ধরা পড়বে। ধরা গলায় কথা বলে উঠল অনিল।

মিলি নিশ্চিন্ত হতে পারল না। ঘরে ঢুকেই দেখে বাবা শুয়ে আছে শিশুর মতো। মা পাশে বসে মাথা টিপছে। আজ দুপুরে তেমন কিছু খাওয়া হয়নি মিলির। ভেবেছিল ঘরে ফিরে সামনে যা পাবে গোগ্রাসে খেয়ে একটু এলিয়ে পড়বে। কিন্তু এখন আর তার খিদেবোধ হচ্ছে না। সোজা বাবার পাশে এসে বসল। মিলি অন্তত এটুকু বুঝেছে যে এই পড়ে যাওয়া মানুষটি আর উঠবে না সহজে। বাবার সুস্থতার চেয়ে তার কাছে বড়ো হয়ে উঠল সংসারচিন্তা। কী করবে সে এখন? এতোগুলো মানুষের পেট সে একা কীভাবে ভরাবে? অজিত কিছুই করবে না সংসারের জন্য। এমনকি মিলির ধারণা সে নিশ্চয়ই কোনো অনৈতিক কর্মের দায়ে পুলিশের কাছে ধরা পড়বে। ধরা গলায় কথা বলে উঠল অনিল।

‘তোর ঘাড় এবার ভেঙে পড়বে মনি। একবার ভাবি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করি কিন্তু সে সাহস আমার নেই। থাকলে সেদিনই করতাম।’

মিলির বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায়। আবারও পেট গুলিয়ে উঠছে তার। প্রচণ্ড তৃষ্ণায় গলা প্রায় আটকে আসছে। বাবা আত্মহত্যার কথা বলছে। কিন্তু কেন? কে দায়ী এর জন্য? সে নিজেও কি দায়ী? মিলির মনে তখনও জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা জাগেনি। নইলে সে-ই তো আত্মঘাতী হয়ে পুরো পরিবারটিকে বাঁচাতে পারত। তার জন্য, শুধু তারই জন্য আজ এই অবস্থার মুখে দাঁড়িয়েছে সকলে।

খুব পুরাতন না হলেও সেদিনের ঘটনা কেমন ঝাপসা মনে হয় তার কাছে।

মিলি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছে সবে। রেজাল্ট বের হলেই সে গিয়ে ভর্তি হবে একটু দূরে দরিয়াপুরের কলেজে। ষোলো বছরের বাড়ন্ত দেহে উপচে পড়া সৌন্দর্য। বিয়ের সম্বন্ধ একের পর এক আসছে আর অনিল বাবু প্রত্যাখ্যান করছেন সবিনয়ে। শিক্ষক মানুষ তিনি। এতো অল্প বয়স্কা মেয়েকে পাত্রস্থ করলে নিন্দার আর অবধি থাকবে না। মিনতি উৎসুক হয়ে বলে, ‘এতো ভালো কাজগুলো ফিরিয়ে দিচ্ছ। বয়স বাড়লে আর ভালো কাজ আসবে?’

অনিল হেসে বলেন, ‘মেয়ে বুঝি তোমার বুড়ি হয়ে যাচ্ছে। তোমার বিয়ে এর চেয়ে বেশি বয়সে হয়েছিল।’

শেষপর্যন্ত কিন্তু এক জায়গায় হার মানতে হলো অনিল বাবুর। পাত্র তার নিজেরই প্রিয় ছাত্র। জেলার কৃষি অফিসের কর্মকর্তা হয়েছে সম্প্রতি। গর্ব করার মতো ছেলে বটে সে। তার অমত আর ধোপে টিকল না। আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মীরা চেপে ধরল, ‘এমন ছেলে হাতছাড়া করা ঠিক হবে না।’

বিয়ের আয়োজন শুরু হলো। এলাহি কাণ্ড। অনিল বাবু তার সমস্ত সঞ্চয় একত্রিত করে সাত গ্রামের মানুষকে নিমন্ত্রণ করার ব্যবস্থা করলেন। পাঁচবিঘে ধানী জমি হারিতে দেওয়া হলো। আত্মীয়-স্বজন একে একে আসছে। আশীর্বাদ হয়ে গেল চৈত্রের শেষে। বৈশাখের তিন তারিখে বিয়ে। পয়লা বৈশাখের দিনে মিলি বান্ধবীদের সাথে গেল পাশের গাঁয়ে মেলায়। বাড়ির সবাই অস্থির। মেয়ে এখনো ফিরছে না কেন! বিয়ের কনেকে এভাবে মেলায় পাঠানো ভুল হয়েছে বিবেচনা করে সকলে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল।

রাত গড়াচ্ছে আর দুশ্চিন্তার পাহাড় চেপে বসছে সকলের মনে। অনিল বাবু পাগলের মতো হন্যে হয়ে খুঁজছেন মেয়েকে। অজিত তার বন্ধুদের সাথে নিয়ে দিদিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে মেলার মাঝে। যাদের সাথে গিয়েছিল মিলি, তারা সকলে ঘরে ফিরলেও মিলি আর ফিরল না সেইরাতে।

পরনি সকালে শুকনো পুকুরের মাঝেই রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া গেল মিলিকে। জ্ঞান নেই কিন্তু প্রাণ আছে এখনো। বুকে জড়িয়ে নিয়ে হাসপাতালে ছুটলেন অজিত বাবু। ডাক্তার, চেয়ারম্যান, থানা-পুলিশ, সংবাদপত্র ইত্যাদি করতে করতে কবে যে বৈশাখের তিন তারিখ পেরিয়ে গেল কেউ টেরও পেল না। মিলি বেঁচে উঠলেও মৃত্যুমুখে দাঁড়াল তার পরিবার। সহানুভূতির পরিবর্তে এখন সকলের চোখে কেবল ঘৃণা আর ঘৃণা। অনিলের ছোটোভাই অসিত দরমার বেড়া টানিয়ে দিল উঠোনের মাঝ বরাবর। মিলি কাউকে চিনেছে কি না জানার জন্য পুলিশ এবং সাংবাদিক বাড়ি এলো কয়েকবার করে। উৎসুক দৃষ্টিতে পড়শীরা তাকাতে লাগল তাদের বাড়ির দিকে। পুলিশের প্রশ্নগুলো বড়ো অশ্লীল এবং অমানবিক। শত্রুরা মজা লুটতে লাগল। হেডমাস্টার সহানুভূতি জানিয়ে বললেন, ‘আপনার এখন কিছুদিন স্কুলে না আসলেও চলবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমিই ডেকে আনবো। তবে মাইনে নিয়ে কোনো অসুবিধা হবে না।’

বিয়ের সময় হারির টাকা দেবে বলে জমি নিয়েছিল যে লোক সে টাকা শোধ না করেই জমিচাষ শুরু করল। অসিত পুকুরের পুরোটা দখল করে বসল। এবার আর সে দাদাকে ভাগ দিতে পারবে না। গ্রামে একটি বিয়ে হলো কিন্তু কেউই অনিল বাবুকে নিমন্ত্রণ জানাল না। তারা এখন একঘরে। গ্রামের মানুষ যতোই সামাজিক হোক না কেন ধর্ষিতা মেয়ের পরিবারকে নিয়ে পঙ্্ক্তিভোজন করতে পারবে না। অনিল বাবু কোনো কথা না বলে চুপচাপ দেখতে লাগলেন সব। তার বাক তো সেদিনই রুদ্ধ হয়ে গেছে। একটি রক্তাক্ত মৃতপ্রায় দেহ ছাড়া তার চোখের সামনে আর কিছুই ভাসছে না।

অসিত একদিন ডাকল অজিতকে।

‘তোর বুনরে অন্যকোনো জাগায় সরায়ে দে। তোর বাপরে বুঝা। আমার নিজের মাইয়ে আছে। ও বাড়ি থাকলি বিয়ে দিতি পারব না।’

‘তোমার মাইয়ের বিয়ে হোক না হোক আমাগে তাতে কী? আমার দিদি কেন বাড়ি ছাড়বে?’

ভীষণ নোংরা কথা বলে অসিত চড় কষায় নাবালোক ভাইপোর গালে। কাকা-ভাইপোয় মরামারি। শেষমেষ অনিল বাবু নিজে এসে ছাড়িয়ে নেন ছেলেকে।

মিলির রক্তহীন ফ্যাকাসে দেহ দিন দিন আরও ক্ষীণ হচ্ছে। মিনতি মাথা খুঁটে বলছে, ‘ওগো, আমার মেয়েরে তুমি বাঁচাও। ওর কী দোষ? একটু একটু করে শেষ হয়ে যাচ্ছে আমার সোনার পুতুল। সব ভেসে যাক আমার। তবু ওরে বাঁচাও তুমি। ও যে আমার প্রথম সন্তান। আমার বড়ো মেয়ে।’

অজিত কেঁদে বলল, ‘এতো অপমান সহ্য হচ্ছে না আর। চলো অন্য কোথাও যাই। এখানে থাকলে দিদি বাঁচবে না।’

মিলির বিয়ের জন্য যে টাকাগুলো জমানো হয়েছিল সেগুলো সম্বল করেই একরাতে তেমন কাউকে কিছু না জানিয়েই ট্রেনে চড়ল তারা। ছোটো ছেলে বাবলুর বয়স তখন মাত্র এক বছর। তারপর থেকে এই অন্ধ কুঠুরিতে বসবাস। খোলা হাওয়ার আহ্বান মাঝে মাঝে তাদের মনের দরজা পর্যন্ত আসে, নাকে লাগে পাকা ধানের গন্ধ।

বেশিকিছু ভাববার ছিল না অনিল বাবুর। মিলির বিয়ের জন্য যে টাকাগুলো জমানো হয়েছিল সেগুলো সম্বল করেই একরাতে তেমন কাউকে কিছু না জানিয়েই ট্রেনে চড়ল তারা। ছোটো ছেলে বাবলুর বয়স তখন মাত্র এক বছর। তারপর থেকে এই অন্ধ কুঠুরিতে বসবাস। খোলা হাওয়ার আহ্বান মাঝে মাঝে তাদের মনের দরজা পর্যন্ত আসে, নাকে লাগে পাকা ধানের গন্ধ। তবু কোনো উপায় নেই এই অন্ধকূপ ছেড়ে বাইরে যাওয়ার। আজ মনে হয় মুক্তির একটা সুযোগ আসছে। চোখ বোজেন অনিল বাবু। তিনি এখন দেহের বন্ধন থেকে মুক্তি চান।

বেশ কিছুদিন যাবত একটা প্রায় অসম্ভব চিন্তা ঘুর ঘুর করছে মিলির মনের কোণ ঘেঁষে। এভাবে কেঁচো-কেন্নোর মতো বেঁচে না থেকে যদি আবারও সংগ্রাম করা যায়। এমনিতে তো কম করতে হচ্ছে না এখানে। যদি এর চেয়ে আর একটু কঠিন পথে চলেও বেঁচে থাকা যায়। শেষ চেষ্টা করতে দোষ কী? বাড়িতে তাদের যথেষ্ট সম্পত্তি আছে যা এখন তার কাকা দখল করেছে। বাবা তো আর লিখে দেননি তাকে কিছু। একটু কাঠখড় পোড়ালে হয়তো ফিরে পাওয়া যাবে। সে বাবার একটি হাত যতেœ ধরে বলল, ‘যদি আমরা আবার গ্রামে ফিরে যাই!’

অনিল বাবু কোনো কথা না বলে কেবল ফ্যালফ্যাল চোখে তাকালেন।

সেই রাতেই একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল মিলি।

দুটি ভাইকে নিয়ে মাঠে নেমেছে মিলি। এক ভাই লাঙল চষে যাচ্ছে আর মিলি সেখানে ছড়িয়ে দিচ্ছে রাশি রাশি সোনারঙের ধান। আস্তে আস্তে সেই সোনারং সবুজ রঙে রূপান্তরিত হচ্ছে। এখন মিলির চোখের সামনে দিগন্তবিস্তৃত সবুজ। এতো সবুজ যে চোখ ঝলসে যায়। মিলির পরনে ধানীরঙের শাড়ি। চারদিকে কেবল ধান আর ধান। উপচে পড়ছে তাদের উঠোন। মায়ের মুখে হাসি আর ধরে না। বাবা একটা বিড়ি ধরিয়েছে। এখানেই খটকা লাগল মিলির। বিড়ি তো বিড়ি! বাবা কোনোদিন পানও মুখে দেননি।

সে ধড়ফড় করে উঠে বসল। স্বপ্নের রেশ আর কাটতেই চায় না। এক অভিনব পুলকে শিহরিত হয়ে উঠছে সে। সবকিছুই মনে হচ্ছে সত্যি। সত্যি-সত্যি। এই স্বপ্নকে সত্যি করা যায় না? মিলির চোখ-কান দিয়ে আগুনের হলকা বের হচ্ছে। নারীলোভী একদল পিশাচের দ্বারা সে ধর্ষিত হয়েছিল বিয়ের দুদিন আগে। অপরাধীদের না খুঁজে গাঁয়ের লোক দোষী করল তাদের। তারা ঘর ছাড়ল লজ্জায় মাথানত করে। কিন্তু তার বাবা কি কখনো মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল? না, অসম্মানের আঘাতে তিনি মৃতপ্রায় হয়ে পালিয়ে এসেছিলেন চোরের মতো। আর নয়। মিলি এবার ফিরে যাবে গ্রামে। এখানে যে অভাব আর লাঞ্ছনা তারা ভোগ করছে তার চেয়ে ঢের ভালো গ্রাম। তাছাড়া একদল নরপশু তাকে স্পর্শ করেছে বলেই কি সত্যি সত্যি অপবিত্র হয়ে গেছে? সে নারী। নারী তো মাটির মতো। তাদের অপবিত্র করে এমন সাধ্য কার? সে বোঝাতে চেষ্টা করবে সকলকে। না হলে সংগ্রাম করবে। ফিরে সে যাবেই। আর কিছু না হোক একটু মুক্ত আলো-হাওয়ায় নিশ্বাস তো নেওয়া যাবে।

একটা তরতাজা প্রাণ নিয়েই সে পরদিন অফিসে গেল। টিপ আজ সে আর পরেনি। বহুদিন পূর্বে কেনা পাতার শেষ টিপটা সে যত্ন করে রেখে দিয়েছে কাপড়ের ভাজে।

মুখে গন্ধওয়ালা লোকটা আজও মিলির গা ঘেঁষে বসে পড়েছে। আশ্চর্য! আজ তার মুখ থেকে দুর্গন্ধের পরিবর্তে একটা সুগন্ধ আসছে। নিশ্চয়ই ভালো কোনো জর্দা দিয়ে পান খেয়েছে। একগাল হাসল লোকটা।

‘আপনার চেয়ার নাকি ওপরে উঠে যাচ্ছে? ঘটনা কী?’

মিলিও মিষ্টি করে হাসল। এদের সাথে আর কোনো রূঢ় ব্যবহার সে করবে না। যে যা বলে বলুক। সে এককাপ চা খাওয়ালো বাবুল সাহেবকে।

এরপর দু-তিনটি দিন মিলি এমন ব্যস্ততার মাঝ দিয়ে গেল যে বাড়ি কী হচ্ছে তা দেখার সময় পেল না। অনিল বাবু শুয়েই থাকলেন। বস্তির একটা ছেলে টিজ করে গেল লিলিকে। সেই ছেলের সাথে মারামারি করে মাথা ফাটাল অজিত এবং পরদিনই পাশের বস্তির আর একটি ঘর থেকে পুলিশ তাকে ধরল মাদকসহ। বেতন দিতে না পারায় বাবলুর স্কুলে যাওয়া বন্ধ হলো।

কয়েকদিন ধরে মিলি কেবল ছুটছে তার এক পরিচিত উকিলের কাছে। গ্রামে সে ফিরবেই এবং ফিরে যদি কোনো আইনি সমস্যার সম্মুখীন হয়, তাহলে তার সমাধান আগেই ভেবে রাখতে হবে। অফিসের এক ভদ্রলোককে সব খুলে বলায় তিনি কিছু টাকাও দিতে চেয়েছেন ধার হিসেবে। কয়েকদিনের ছুটোছুটিতে মিলির পায়ের ব্যথা আবারও বেড়েছে।

রাত করে বাসায় ফিরলে মা করুণকণ্ঠে বলল, ‘একটু দেখবি নাকি চেষ্টা করে? হাজার হলিও ছোটো ভাই তো তোর। ক্ষমাঘেন্না করে ছাড়িয়ে আন মা।’

মিলি তাকায় লিলির দিকে। না খেয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা নাকি অন্য কিছু? তার জীবন তো শেষ হয়েছে। কিন্তু এই ভাইবোনগুলোর জীবনে সে সুখ ফিরিয়ে আনবে। অজিত! তার স্নেহের অজিত কতো ভালোই না বাসতো একসময় দিদিকে! দিদির অপমান সইতে না পেরে সে হাত তুলেছিল গুরুজন কাকার গায়ে। জল এলো মিলির চোখে। সে আস্তে আস্তে মায়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘মা সব ব্যবস্থা আমি করেছি। অজিত ছাড়া পাবে। আর শোনো আমরা ফিরে যাব গ্রামে। তোমাদের এভাবে আর শুকিয়ে মরতে হবে না। সব ঠিক করে দেব আমি। কাল ভোরের ট্রেনে বাবলুকে নিয়ে আমি গ্রামে যাচ্ছি। তুমি শুধু ঈশ্বরকে ডাকো।’

ভয়ে বুক শুকিয়ে এলো মিনতির। একের পর একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। মিলি পায়ে জড়িয়ে আবার কোনো বিপদ ডেকে আনবে তা কে জানে! সে হাতজোড় করে প্রণাম করল অদৃষ্টকে।

এতো ফসল থাকতে এদেশের মানুষ না খেয়ে মরে কীভাবে তা কে জানে? ট্রেনের জানালা দিয়ে যেদিকেই চোখ যায় কেবল সবুজ আর সবুজ— মিলির সেদিনকার দেখা স্বপ্নের চেয়ে আরও বেশি সবুজ চারদিকটা। প্রচণ্ড আশা তার হৃৎপিণ্ডকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আনন্দের আতিশয্যে মিলির দেহে একটু একটু কম্পন। বাবলুর চোখে রাজ্যের বিস্ময়। তার বেড়ে ওঠা অন্ধকুঠুরিতে।

বৈশাখের বেলা এগারোটা মানে অনেক। চড়চড়ে রোদে ফেটে পড়ছিল চারদিক। হঠাৎ একখণ্ড কালো মেঘ এসে আচ্ছন্ন করে ফেলল আকাশকে। গরমের ধান এবার ফলেছে প্রচুর। এতো ফসল থাকতে এদেশের মানুষ না খেয়ে মরে কীভাবে তা কে জানে? ট্রেনের জানালা দিয়ে যেদিকেই চোখ যায় কেবল সবুজ আর সবুজ— মিলির সেদিনকার দেখা স্বপ্নের চেয়ে আরও বেশি সবুজ চারদিকটা। প্রচণ্ড আশা তার হৃৎপিণ্ডকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আনন্দের আতিশয্যে মিলির দেহে একটু একটু কম্পন। বাবলুর চোখে রাজ্যের বিস্ময়। তার বেড়ে ওঠা অন্ধকুঠুরিতে। এতো আলো, এতো মুক্তপ্রাণ সে আগে দেখেনি। সে শক্ত করে ধরে আছে দিদির হাত।

‘আর এক স্টেশন পরেই আমাদের গ্রাম।’

‘আমাদের গ্রাম?’—বাবলুর চোখে একঝুড়ি প্রশ্ন।

মিলি আদর করল তাকে।

অন্যকোনো ভালো পোশাক না থাকায় বের হওয়ার সময় মিলি পরেছিল অফিস থেকে বিজয়ের উপহার পাওয়া একটি সবুজ শাড়ি। পাতায় থাকা অবশিষ্ট লাল রঙের টিপটি সে আজ যত্ন করেই এঁটেছে কপালের ঠিক মাঝখানে।

ট্রেন থেকে নেমেই সে পাখির মতো মেলে ধরল ডানহাতখানি। আকাশের মেঘ কেটে যাওয়ায় আবারও শুরু হয়েছে বৈশাখী হাওয়া। মিলির সবুজ শাড়ি বাতাসে উড়ছে। একবুক আশা আর মনোবল নিয়ে মিলি এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। তার অন্যহাতে নতুন দিনের প্রতিনিধি। কপালে লাল টিপ, পরনে সবুজ শাড়ি। ঠিক বাংলাদেশের মতো দেখাচ্ছে তাকে।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ১৯৯৩ সালের ১২ অক্টোবর বাগেরহাটের মোংলায়। পড়াশোনো করেছেন ভেকটমারী বেলাই মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সুন্দরবন ডিগ্রি মহিলা কলেজ এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে বাংলার প্রভাষক হিসেবে কাজ করছেন ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ। প্রকাশিত গ্রন্থ; প্রবন্ধ: ‘বৈষ্ণব পদাবলী: নারীবাদী বীক্ষণ’, ‘বাউলপদাবলীতে চৈতন্যপ্রভাব’, উপন্যাস:  ‘ময়নাঢিপির কথকতা’।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।