বুধবার, ফেব্রুয়ারি ২১

‘হেমিংওয়ের নারীরা’ : ভাঙনের নেই পারাপার

0

মার্কিন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ে তাঁর নির্মেদ, নিরাবেগী লেখনশৈলীর কারণে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পাঠকমহলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেন। তাঁর রোমাঞ্চপ্রিয় জীবনাবসান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তাঁকে প্রশংসিত করে তোলে। তবে বাষট্টি বছরের জীবনকালে বহু নারীর সঙ্গে তাঁর প্রেম, ঘনিষ্ঠতা এবং একাধিক বিয়ে নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। তবে একথা সত্য যে, একজন সাধারণ মানুষ আর একজন লেখকের মন ও জীবনযাপনে যে প্রথাগত পার্থক্য থাকবে এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। লেখক ফারুক মঈনউদ্দীন নোবেল বিজয়ী এই লেখকের জীবনে যেসকল নারী প্রভাব বিস্তার করেছিলেন তাঁদের দাম্পত্যজীবন, মান-অভিমান, বিবাহ-বিচ্ছেদ এবং প্রেরণা নিয়ে লিখেছেন— ’হেমিংওয়ের নারীরা’ বইটি।

বইটির মূল প্রতিপাদ্য হেমিংওয়ের ব্যক্তিগত জীবন এবং তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাববিস্তারকারী নারীগণ। কিন্তু পাঠান্তে উপলব্ধি করা যায়, বইটিতে প্রসঙ্গক্রমে উঠে এসেছে হেমিংওয়ের লেখক জীবনের নানা বর্ণিল উত্থানপতন। কখনো সেসব ঘটনায় ধরা দেয় বিশ্ববিখ্যাত একেকটি উপন্যাস লেখার নেপথ্যের গল্প। আরও দেখা যায় হেমিংওয়ের সাংবাদিকতা জীবনের বিভিন্ন যুদ্ধ বিগ্রহের চালচিত্র।

বইটির প্রতিটি অধ্যায় থেকে জানা যায়, পেশাগত কাজে বিভিন্ন দেশে ভ্রমণে গিয়ে হেমিংওয়ের পরিচয় হওয়া একাধিক নারীর গল্প। সেসব নারীরা প্রেমের পেয়ালা নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন সুঠামদেহী, কুস্তিগীর বহুগুণে গুণান্বিত রোমান্টিক এই লেখকের কাছে।

বইটির মূল প্রতিপাদ্য হেমিংওয়ের ব্যক্তিগত জীবন এবং তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাববিস্তারকারী নারীগণ। কিন্তু পাঠান্তে উপলব্ধি করা যায়, বইটিতে প্রসঙ্গক্রমে উঠে এসেছে হেমিংওয়ের লেখক জীবনের নানা বর্ণিল উত্থানপতন। কখনো সেসব ঘটনায় ধরা দেয় বিশ্ববিখ্যাত একেকটি উপন্যাস লেখার নেপথ্যের গল্প।

সেই নারীদের তালিকায় যেমন সাধারণ কেউ ছিলেন, তেমনি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল, অপরূপ সুন্দরী আর লেখক-সাংবাদিকের তালিকাও পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে একজন বিশেষ নারীর উল্লেখ করা যেতে পারে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্ত্রীও হেমিংওয়ের লেখাপত্রের খোঁজ-খবর নিতেন। আর তাঁদের দেখা সাক্ষাতও হয়েছিল কয়েকবার। তবে হেমিংওয়ের লেখকজীবনের দীর্ঘ সময় পাড়ি দিতে গিয়ে তাঁর জীবনটা সবুজ গালিচার মতো মসৃণ ছিল না মোটেও। অর্থনৈতিক সংকট, দারিদ্র্যের কষাঘাতে নিষ্পেষিত জীবনযাপন আর দাম্পত্য জীবনের নানান উত্থান পতন উঠে এসেছে ‘হেমিংওয়ের নারীরা’ বইটিতে।

Hemingway 3

নববিবাহিত হেমিংওয়ে ও হ্যাডলি


বইটির বর্ণনামতে একজন লেখকের জীবনে চারজন স্ত্রী, অসংখ্য জানা-অজানা প্রেমিকা আর বারবণিতার যে বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে যে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন একজন পুরুষের এক জীবনে কতজন নারী প্রয়োজন! তবে হেমিংওয়ের মৃত্যুপরবর্তী জীবনে জীবনীকারেরা অনেকেই মত দিয়েছেন, তাঁর প্রত্যেকটি বিখ্যাত উপন্যাস লেখার পেছনে প্রেরণাদাত্রী হিসেবে ছিলেন একেকজন নারী। লেখক সেইসব প্রেরণাদাত্রী নারীদের জীবনের খণ্ডাংশ একত্র করেছেন কয়েকটি বিশেষ অধ্যায়ের শিরোনামে। লেখক ফারুক মঈনউদ্দীন জানিয়েছেন, হেমিংওয়ে তাঁর জীবনে বিয়ে করেছিলেন চারবার। যা অন্যান্য জীবনীকারদের মতামত থেকেও সমর্থিত। এঁরা হচ্ছেন হ্যাডলি রিচার্ডসন, পলিন ফেইফার, মার্থা গেলহর্ণ আর মেরী ওয়েলস। এই চারজন নারীর সঙ্গে তিনি দাম্পত্য জীবনযাপন করেছেন। তবে বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরেও তাঁর জীবনে আরও যেসব নারী এসেছিলেন তাঁদের নামও উল্লেখ করেছেন বইটিতে। আর তাঁদের মধ্যে আছেন অ্যাগনেস কুরোওস্কি, জেন ম্যাসন, সারাহ মারফি, মার্লিন দিয়েত্রিচ, লিওপোল্ডিনা, জেনোফোবিয়া এবং আদ্রিয়ানা ইভানচিচ প্রমুখ। এছাড়া জীবনীকারেরা আরও কয়েকজন অনালোচিত নারীর নাম ইংগিত করেছেন যদিও সেসবের পেছনে যথেষ্ট তথ্য প্রমান পাওয়া যায় না। আর সেইসব নারীদের নিয়ে কয়েকটি অধ্যায়ে সাজানো হেমিংওয়ের নারীরা। বলতে গেলে বইটিকে হেমিংওয়ের জীবনীও বলা যায়।

অধ্যায়ের শুরুতেই পাওয়া যায় দ্বিতীয় স্ত্রী পলিন ফেইফারের এক ভারাক্রান্ত জবানবন্দি। যেখানে তিনি বলেছেন, ‘আর্নেস্টের প্রেমে পড়া নিয়ে আমি কিছু মনে করি না, কিন্তু প্রেমে পড়লে সব সময় সেই মেয়েকেই তাঁর বিয়ে করতে হবে কেন?’

বইটির প্রথম অধ্যায়ের নাম ‘প্রথম প্রেম’। এই অধ্যায়ের শুরুতেই পাওয়া যায় দ্বিতীয় স্ত্রী পলিন ফেইফারের এক ভারাক্রান্ত জবানবন্দি। যেখানে তিনি বলেছেন, ‘আর্নেস্টের প্রেমে পড়া নিয়ে আমি কিছু মনে করি না, কিন্তু প্রেমে পড়লে সব সময় সেই মেয়েকেই তাঁর বিয়ে করতে হবে কেন?’

হেমিংওয়ের বাষট্টি বছরের জীবনকালে ধারাবাহিক দাম্পত্য, অস্থিরতা, বিবাহ বিচ্ছেদ, বিবাহবহির্ভূত অস্থায়ী প্রেমের অসফল সমাপ্তি তাঁর জীবনীকারদেরও করেছে ব্যতিব্যস্ত। আর এভাবেই হেমিংওয়ের দাম্পত্য জীবনের কেটে গেছে একচল্লিশটি বছর।

রোমান্টিক আর সুদর্শন পুরুষ হেমিংওয়ের জীবনে প্রথম প্রেম আসে আঠারো বছর বয়সে। ১৯১৮ সালে রেডক্রসের সদস্য হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন ইতালির রনাঙ্গনে। সেই যুদ্ধে হেমিংওয়ে পায়ে মর্টার সেলের মারাত্মক আঘাত নিয়ে ভর্তি হন মিলানের আমেরিকান রেডক্রস হাসপাতালে। আর সেখানেই পরিচয় হয় হাসপাতালের দয়ালু, প্রনোচ্ছ্বল আর টগবগে নার্স অ্যাগনেস কুরোওস্কির সঙ্গে। সুঠামদেহী, সুদর্শন হেমিংওয়ে নবযৌবনের চিরায়ত ধর্মে মনের অজান্তেই আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন কালো চুলের দীর্ঘাঙ্গী মায়াবতী নারী কুরোওস্কির প্রতি। অগ্রজাতুল্য সেবিকার ভেতরও এক ধরণের আকর্ষণ তৈরি হয় অনুজতুল্য হেমিংওয়ের প্রতি। তবে পরিণত বয়সী কুরোওস্কি ভালোবাসার তুলনায় ছিল অনেক বেশি সংযত ও বাস্তবমুখী। হেমিংওয়ে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাওয়ার পর এ্যাগনেস কুরোওস্কি বদলি হয়ে যান অন্য হাসপাতালে। আর তখন মাঝেমধ্যেই হেমিংওয়ে চিঠি লিখতেন তাঁকে। তবে হেমিংওয়ের সেবা শুশ্রুষার সময়টুকুকে এ্যাগনেস ঠিক প্রেম বলে স্বীকার করেননি কখনো। ১৯১৯ সালে লেখা এক চিঠিতে এ্যাগনেস কুরোওস্কি তাঁর দিক থেকে সম্পর্কের সত্য প্রকাশ করে এক দীর্ঘ চিঠিতে হেমিংওয়ের মোহভঙ্গ ঘটান। আর এই ঘটনায় হেমিংওয়ে মানসিকভাবে মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েন। তবে এই বিরহ কাটিয়ে উঠাও একজন প্রেমিক পুরুষের জন্য অসম্ভব কিছু ছিল না। কুরোওস্কির সঙ্গে বিচ্ছেদের ঠিক আড়াই বছরের মাথায় বিয়ে করেন প্রথম স্ত্রী হ্যাডলিকে। আর এই হ্যাডলি ছিলেন হেমিংওয়ের চেয়ে আট বছরের বয়সে বড়ো। তবুও হেমিংওয়ের মনে সর্বদা একটা সুপ্ত বাসনা ছিল, যদি সুযোগ আসে তাহলে অ্যাগনেস কুরোওস্কির সঙ্গে সম্পর্কটা পুনঃস্থাপন করতে পারেন। কেননা ততদিনেও প্রথম প্রেমকে একেবারেই ভুলতে পারেননি তিনি। প্রথম প্রেমের স্মৃতিবহ দিনগুলি তাঁকে এত বেশি তাড়িত করেছিল যে ‘ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ উপন্যাসে ক্যাথেরিন বার্কলে চরিত্রটির মধ্যে প্রথম প্রেমিকা অ্যাগনেস কুরোওস্কিকে প্রায় খোলামেলাভাবে উপস্থাপন করেছেন হেমিংওয়ে।

শিকাগোর একটা এ্যাপার্টমেন্টে এক পার্টিতে হ্যাডলি রিচার্ডসনের দেখা পান হেমিংওয়ে। এর আগে তাঁকে কোনো এক অনুষ্ঠানে পিয়ানো বাজাতে দেখেছিলেন তিনি। প্রথম পরিচয়, তারপর আলাপ এবং শেষ পর্যন্ত প্রেমে পড়ে যান হেমিংওয়ের চেয়ে বয়সে পরিণত হ্যাডলি রিচার্ডসনের।

বইটির দ্বিতীয় পর্ব ‘প্রথম উপন্যাস দ্বিতীয় প্রেমের পর’। শিকাগোর একটা এ্যাপার্টমেন্টে এক পার্টিতে হ্যাডলি রিচার্ডসনের দেখা পান হেমিংওয়ে। এর আগে তাঁকে কোনো এক অনুষ্ঠানে পিয়ানো বাজাতে দেখেছিলেন তিনি। প্রথম পরিচয়, তারপর আলাপ এবং শেষ পর্যন্ত প্রেমে পড়ে যান হেমিংওয়ের চেয়ে বয়সে পরিণত হ্যাডলি রিচার্ডসনের। মায়ের অতি শাসনে থাকা হ্যাডলি তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর পারিবারিক শাসনের নিগড় থেকে মুক্ত হয়ে জীবনকে উপভোগ করার অনায়াস সুযোগ পেয়োছিলেন তখন। হেমিংওয়ের সঙ্গে প্রেম পুরোপুরি পাকা হবার পর হেমিংওয়েকে এক চিঠিতে তিনি লেখেন- পৃথিবীটা হচ্ছে একটা জেলখানা, আমরা দুজনে মিলে ওটা ভাঙতে যাচ্ছি। হেমিংওয়ের সাথে প্রণয়পূর্ণ সময় হ্যাডলি যেন তাঁর নবযৌবন ফিরে পান। আবার পুরোদমে মন দিতে থাকেন সংগীতচর্চায়। স্কেটিং, সাঁতার, আর্ট গ্যালারী, কনসার্ট, নাচ সান্ধ্যপার্টি ইত্যাদিতে দারুণ উচ্ছ্বল হয়ে ওঠেন তিনি। মধুচন্দ্রিমার পর শিকাগোতে একটা ভাড়া বাসায় সংসার শুরু করেন এই দম্পতি। আর তখন মফস্বল শহর সেন্ট লুইস থেকে আসা হ্যাডলি রিচার্ডসন শিকাগোতে বড়ো নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। কারণ তখন হেমিংওয়ে নিজের পেশাগত কাজে প্রায় বাইরে বাইরেই থাকতেন। সেসময় নববধুটির কাছের মানুষ হয়ে ওঠেন পাড়ার মুদি দোকানী।

Hemingway 6

কোনো এক শিকারে পুত্র জ্যাক ও হেমিংওয়ে


এর কিছুদিন পর হেমিংওয়ে দম্পতি প্যারিসে পাড়ি জমান। সেখানে গিয়ে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য আয় ছিল না লেখকের। হ্যাডলির পারিবারিক বিনিয়োগ থেকে সামান্য কিছু আয় দিয়ে অনেক কষ্টেসৃষ্টে কোনোমতে চলে যাচ্ছিল দু’জনার জীবন। আর তখনই সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েন হ্যাডলি। আর ওদিকে হেমিংওয়ে ধারণা করতেন, বাচ্চাকাচ্চা হলে তাঁর চলাফেরায় আর লেখালেখির স্বাধীনতা বাধাগ্রস্থ হবে। হেমিংওয়ের পিতা হওয়ার সংবাদের অস্বস্তি এতটাই ছিল যে, খবরটি তাঁর বাবা-মাকে পর্যন্ত জানাননি। আর এ কারণেই সন্তান জন্মানোর আগে স্ত্রীকে নিয়ে হেমিংওয়ে আবার টরেন্টো চলে আসেন। সংসারের টানাটানি, বাচ্চার কান্নাকাটি আর একঘেয়ে জীবন নিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন হেমিংওয়ে। এসব লক্ষ করে হ্যাডলি সন্তানকে নিয়ে প্যারিস ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর এতে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পান হেমিংওয়ে। এই সুযোগে বৃটিশ নারী ডাফ টু্ইসডেনের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন হেমিংওয়ে। লেখক ফারুক লেখেন, সেই ডাফ ও ছিলেন হেমিংওয়ের থেকে ছয় বছরের বড়ো। তবে শেষ পর্যন্ত সেই প্রেম আর পরিণতি পায়নি।

প্যারিস জীবনে হেমিংওয়ে দম্পতি যখন চরম দারিদ্র্যসীমায়, হ্যাডলি তলা ক্ষয়ে ফুটো হয়ে যাওয়া একজোড়া জুতা নিয়ে চলাফেরা করতেন। তখন ওই দুঃসময়ে বিশেষ অভিসন্ধি নিয়ে হেমিংওয়ের সংসারে আবির্ভূত হন পলিন ফেইফার। অর্থনৈতিক সাপোর্ট দিতে গিয়ে ধীরে ধীরে সংসারের তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে ঢুকে পড়েন হ্যামিংওয়ের জীবনে।

‘হেমিংওয়ের গৃহদাহ’ পর্বটা যেকোনো সাধারণ মানুষের কাছেও বেদনার মনে হবে। কেননা, হ্যাডলি ছিলেন হেমিংওয়ের দুঃখের দিনের সাথী। যখন হেমিংওয়ে ছিলেন ছন্নছাড়া, নামডাক ছড়ায়নি আর অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। হ্যাডলি তখন পারিবারিকভাবে পাওয়া অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন হেমিংওয়েকে। প্যারিস জীবনে হেমিংওয়ে দম্পতি যখন চরম দারিদ্র্যসীমায়, হ্যাডলি তলা ক্ষয়ে ফুটো হয়ে যাওয়া একজোড়া জুতা নিয়ে চলাফেরা করতেন। তখন ওই দুঃসময়ে বিশেষ অভিসন্ধি নিয়ে হেমিংওয়ের সংসারে আবির্ভূত হন পলিন ফেইফার।

Hemingway 3

হেমিংওয়ে ও পলিন ফেইফার


অর্থনৈতিক সাপোর্ট দিতে গিয়ে ধীরে ধীরে সংসারের তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে ঢুকে পড়েন হ্যামিংওয়ের জীবনে। আর পলিনকে না ভালোবেসে কোনো উপায় ছিল না লেখকের। আর ওদিকে দুঃসময়ের প্রিয় সাথী হ্যাডলিকে ডিভোর্স না দিয়ে পলিনকে বিয়ে করারও উপায় ছিল না হেমিংওয়ের। কেননা, খ্রিষ্টধর্মে একই সময়ে দু’জন স্ত্রী রাখার নিয়ম নেই। আর যদি তা থাকত তবে হ্যাডলির সঙ্গে সতীনের সংসার করতে হতো পলিনকে। কারণ হেমিংওয়ে হ্যাডলিকেও যেমন ভালোবাসতেন তেমনি পলিন ফেইফারকেও ছাড়তে পারছিলেন না। ডেট্রয়েট ফ্রি প্রেস পত্রিকায় যখন হ্যাডলির সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের খবর ছাপা হয় তখন হেমিংওয়ের বাবা পুত্রকে চিঠি লেখেন। আর তাতে তিনি কামনা করেন যাতে সে স্ত্রীকে নিয়ে সুন্দরভাবে সংসার করতে পারেন। কিন্তু ততদিনে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। হ্যাডলির সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে পলিনকে বিয়ে করে নিয়েছেন হেমিংওয়ে। বিচ্ছেদের কিছুদিন পর হ্যাডলি পুত্র বামবিকে নিয়ে আমেরিকায় চলে যান। আর সেখানে তাকে কেউ বিধ্বস্ত অবস্থায় না দেখে বেশ অবাক হয়েই গিয়েছিলেন। কেননা হ্যাডলি ততদিনে নিজেকে মানসিকভাবে পোক্ত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। হেমিংওয়ের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের ছয় বছর পর হ্যাডলি আবার বিয়ে করেন মোরার নামে এক সাংবাদিককে। আর ততদিনে মোহভঙ্গ হয় হেমিংওয়ের; তিনি পলিনকে ছেড়ে পুনরায় হ্যাডলির কাছে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। অথচ, হ্যাডলির মনে হয়েছিল, এতদিনে তিনি একজন যোগ্য, ধীরস্থির এবং একজন পরিপক্ক স্বামী পেয়েছেন।

তবে বিচ্ছেদের পর বেশ কয়েকবার দেখাসাক্ষাৎ হয় হ্যাডলি ও হেমিংওয়ের। এ বিষয়ে জীবনীকারদের থেকে ভিন্ন ভিন্নভাবে তথ্য পাওয়া যায়।

চতুর্থ অধ্যায়— ‘ভাঙনের নেই পারাপার’। হ্যাডলির সঙ্গে বিচ্ছেদের পর হেমিংওয়ে পলিনের সঙ্গে ১৩ বছর বেশ ভালো ভাবেই কাটিয়েছেন। যদিও অনেকের ধারণা, পলিন একটা সুখি সংসার ভেঙে নিজের করে নিয়েছিলেন হেমিংওয়েকে। অবশ্য এটা হেমিংওয়ে নিজেও মনে করতেন। তিনি এক পত্রে লেখেন— সে প্রচীনতম কৌশল অবলম্বন করে আমাদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করেছিল। কায়দাটা হচ্ছে এক অবিবাহিতা তরুণী আরেক বিবাহিতা তরুণীর দু’দিনের বন্ধু বনে গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে বসবাস করতে আসে। তারপর অজান্তে, সরলমনে স্বামীটিকে বিয়ে করার নিরন্তর চেষ্টা করতে থাকে।

এমনকি বহুবেলা না খেয়েও কেটেছে হ্যাডলি আর হেমিংওয়ে দম্পতির জীবন। অথচ পলিনকে পাবার পর হেমিংওয়ে হয়েছিলেন সেইসময়ের আর্থিকভাবে সচ্ছ্বল বিশ্বের কয়েকজন লেখকের একজনে। দীর্ঘ রেলপথ পাড়ি দিয়ে যেতেন শ্বশুরালয়ে। আর সেখানকার সেই নির্জনে বসে লিখেছিলেন বিখ্যাত তিন উপন্যাস— ‘অ্যা ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’, ‘টু হ্যাভ এন্ড হ্যাভ নট’, ‘ফর হুম দ্য বেল টুলস’।

পলিনের সঙ্গে দাম্পত্যজীবন গড়ার পর হেমিংওয়ে বেশ আয়েশি জীবন উপভোগ করতে শুরু করেন। ধনাঢ্য পরিবারের মেয়ে পলিনের সুবাদে লেখক বাড়ি, গাড়ি এমনকি ফিসিংবোটও লাভ করেন। আর এতে তাঁর পূর্ববর্তী জীবনের দারিদ্র্য অনেকাংশে লাঘব হয়ে যায়। অথচ, হ্যাডলিকে নিয়ে তাঁর জীবন ছিল অর্থনৈতিক কারণে দুর্বিষহ। একটা ছেঁড়া জুতা পরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ হেঁটেছেন। আর এমনকি বহুবেলা না খেয়েও কেটেছে হ্যাডলি আর হেমিংওয়ে দম্পতির জীবন। অথচ পলিনকে পাওয়ার পর হেমিংওয়ে হয়েছিলেন সেইসময়ের আর্থিকভাবে সচ্ছ্বল বিশ্বের কয়েকজন লেখকের একজনে। দীর্ঘ রেলপথ পাড়ি দিয়ে যেতেন শ্বশুরালয়ে। আর সেখানকার সেই নির্জনে বসে লিখেছিলেন বিখ্যাত তিন উপন্যাস— ‘অ্যা ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’, ‘টু হ্যাভ এন্ড হ্যাভ নট’, ‘ফর হুম দ্য বেল টুলস’। হেমিংওয়ের এই সৃষ্টিশীলতার সফল সময়ে দুই পুত্রের জন্ম হয়। আর আর্থিক সফলতার কারণে তিনি কিউবাকে বানাতে পেরেছিলেন সেকেন্ড হোম। তবে রুথ হকিন্স নামক এক জীবনীকার বলেছেন, পলিনের ছোটো বোন ভার্জিনিয়ার সাথেও প্রেম হয়েছিল হেমিংওয়ের। আর তিনি ঈর্ষান্বিত ছিলেন অগ্রজ পলিনের প্রতি। তবে হ্যাডলির ঘরে জন্ম নেওয়া জ্যাক হেমিংওয়ে তাঁর আত্মজীবনীতে সৎমা পলিনকে নিয়ে কোনো বিরূপ মন্তব্য করেননি। বরং তাঁর প্রশংসাই করেছেন। তিনি জানান, দুটো মা পেয়ে বরং তিনি খুব খুশি ছিলেন।

Hemingway 4

হেমিংওয়ে ও মার্থা গেলহর্ন


প্রথম সন্তান জন্মের পর সীমিত শারীরিক সম্পর্কের জন্য দূরত্ব তৈরি হয়েছিল পলিন আর হেমিংওয়ের। আর তখন হেমিংওয়ের সঙ্গে কিউবাতে পরিচয় ঘটে সোনালি চুল আর ডাগর নীলাক্ষির দীর্ঘাঙ্গী ম্যাসনের সঙ্গে। তখন হেমিংওয়েও খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারঙ্গম এক রমণীকে। তবে জেন ছিলেন সন্তান ধারণে অক্ষম কিন্তু হেমিংওয়ের সাথে মাছ শিকারের সঙ্গী। জেন হেমিংওয়ের সাথে মাছ শিকারে সঙ্গ দিতে মাঝেমধ্যে হাভানায় চলে আসতেন। পলিনের কাছে যে এ সংবাদ যেত না এমনটা নয়, তবে সে নিজেকে এই বলে প্রবোধ দিতেন যে, এটা নিছকই লেখক আর ভক্তের সাধারণ বিষয়। তবে চার বছরের সফল প্রেমের পর ভেঙে যায় জেন আর হেমিংওয়ের প্রেম। আর ভাঙনের যথার্থ কারণ জীবনীকারগণ খুঁজে পাননি। হতে পারে হেমিংওয়ে জেনকে তাঁর গল্প-উপন্যাসে উপস্থাপনের উপাদান হিসেবেই দেখতেন। অপরপক্ষে জেন মনে করতেন, তাঁর মতো সুন্দরী নারীকে বিয়ে করার মতো ধনে-ঐশ্বর্যে যথেষ্ট ছিলেন না হেমিংওয়ে। সে যা-ই হোক, স্পেনে যুদ্ধের খবর সংগ্রহ করার কাজে নিয়োজিত অবস্থায় হেমিংওয়ের পরিচয় ঘটে আরেক দুর্ধর্ষ নারীর সঙ্গে। আর তিনি ছিলেন মার্থা গেলহর্ণ। আমরা জানি প্যারিসবাসের সময় সারাহ মারফি দম্পতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন হেমিংওয়ে। পলিনের সঙ্গে দাম্পত্যজীবন যখন তলানীতে তখন এই মারফির প্রেমেও হাবুডুবু খাচ্ছিলেন হেমিংওয়ে। ঘটনা অন্যদিকেও ছিল বটে, মারফি বরাবরই হেমিংওয়ের পুরুষালি তেজ, আত্মবিনয়ী হাসি ইত্যাদি পছন্দ করতেন। আর জেনের পর হেমিংওয়ে একমাত্র মারফিকে পেয়েছিলেন, যিনি জেনের মতোই বোটে চড়ে স্বচ্ছন্দে মাছ শিকার করা পছন্দ করতেন। তবে মারফির সঙ্গেও শেষ পর্যন্ত ঘর বাঁধার মতো পরিণতি হয়নি।

হেমিংওয়ে মার্থাকে পলিনের সঙ্গে পরিচয় করে দিয়েছিলেন। পলিন বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন, উনত্রিশ বছরের এই তরুণীর সাথে তাঁর মতো বেয়াল্লিশ বছর বয়স্কা রমনীর যোগ্যতার প্রতিযোগীতায় টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। যেমনটা হ্যাডলির বেলায় ঘটেছিল পলিনকে নিয়ে। মার্থার সঙ্গে হেমিংওয়ের প্রেমের পূর্ণতা পায় স্পেন যুদ্ধক্ষেত্রে রিপোর্টার থাকার সময়।

‘নবপ্রেমজালে নতুন আবাসে’ এই পর্বে সাংবাদিক মার্থা গেলহর্ণের সঙ্গে হেমিংওয়ের পরিচয় ঘটে। প্রথম দেখাতেই স্বর্ণকেশী এই তরুণীর প্রেমে হাবুডুবু খেতে লাগলেন তিনি। ততদিনে হেমিংওয়ে মোটামুটি স্টার। ‘অ্যা ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ নিয়ে সিনেমা তৈরি হয়েছে। নামডাক ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। তবে আগের সব প্রেমের থেকে এবারের প্রেমে একটু ব্যতিক্রম দেখা গেল। আর সেটা হলো, পূর্বের নারীরা সবাই ছিলেন হেমিংওয়ের থেকে বয়সে বড়ো কিন্তু মার্থা ছিলেন হেমিংওয়ের আট বছরের ছোটো। রাজনীতিসচেতন, বিদুষী মার্থা আলাপে চৌকশ। সাংবাদিকতার পেশায় সিদ্ধহস্ত আর লেখালেখির সাথেও জড়িত। মহামন্দার করাল গ্রাসে জর্জরিত আমেরিকার মানুষের দুঃখ দুর্দশার প্রতিবেদন লিখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টপত্নীর সান্নিধ্যও পেয়েছিলেন মার্থা। হেমিংওয়ে মার্থাকে পলিনের সঙ্গে পরিচয় করে দিয়েছিলেন। পলিন বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন, উনত্রিশ বছরের এই তরুণীর সাথে তাঁর মতো বেয়াল্লিশ বছর বয়স্কা রমনীর যোগ্যতার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। যেমনটা হ্যাডলির বেলায় ঘটেছিল পলিনকে নিয়ে। মার্থার সঙ্গে হেমিংওয়ের প্রেমের পূর্ণতা পায় স্পেন যুদ্ধক্ষেত্রে রিপোর্টার থাকার সময়। একরাতে হোটেলে রকেট সেল এসে পড়লে মার্থা আর হেমিংওয়ে দু’জনে বের হন হোটেলের এক কামরা থেকে। তারপর আর গোপন থাকেনি এই প্রেম। বুল ফাইটার সিডনি ফ্রাংকলিনের থেকে স্বামীর নব প্রেমের খবরাখবর পেতেন পলিন। আর তাতে বুকটা ভেঙ্গে যাচ্ছিল তাঁর। তিনি নিশ্চিত হতে পেরেছিলেন তাঁর প্রিয় স্বামীটি দ্রুতই হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছেন। আর এই এক যুগের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে হাভানায়। হেমিওেয়ে ফ্রান্সিকো ডি পাউলা নামক স্থানে গ্রামীন পরিবেশে নতুন জীবন শুরু করেন। লেখক ফারুক মঈনউদ্দীন এই পর্বের শেষটা এভাবে লেখেন- হেমিংওয়ে জীবনের দীর্ঘতম সময় এই বাড়িতে বসবাস করে জীবনযাপনের সাচ্ছন্দ্য পেয়েছিলেন বটে, যে জীবন, ‘কোনো নারীর প্রেমে ব্যর্থ হয় নাই’ পেয়েছিলেন ‘মধু—আর মননের মধু’ সেই, ‘জীবনের এই স্বাদ-সুপক্ক যবের ঘ্রাণ হেমন্তের বিকেলের’ অস্থিরচিত্ত হেমিংওয়েকে কি আদৌ ‘দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল’?

হেমিংওয়ের সঙ্গে মার্থার সম্পর্ক কোনোভাবেই অন্য স্ত্রীদের সাথে তুলনীয় নয়। দুর্ধর্ষ সমর সাংবাদিক মার্থা ছিলেন লেখক। আর হেমিংওয়ের সঙ্গে পরিচয়ের আগেই ছিল তাঁর একাধিক প্রকাশনা। এসব কারণে হয়তো প্রেমিকা থেকে স্ত্রী হবার পরও মার্থার ব্যাপারে হেমিংওয়ের ছিল বিশেষ ঈর্ষা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন চীন রনাঙ্গনে সংবাদ সংগ্রহে যান তখন বর্মার রেঙ্গুনেই চিড় ধরতে শুরু করে এই দম্পতির দাম্পত্য জীবনের। অনেক জীবনীকারের মতে, যৌন জীবনে মার্থা ছিলেন শীতল। আর হয়তো একজন লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতেই তিনি হেমিংওয়েকে বিয়ে করেছিলেন।

এই সময়ের পর মেরী ওয়েলশ নামক আরেক নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েন হেমিংওয়ে। বিষয়টি মার্থার নজরে এলে তিনি বেপরোয়াভাবে ডিভোর্স চাইতে থাকেন হেমিংওয়ের কাছে। তবুও মানবিক কারণে হোক বা অন্য যে কোনো কারণে মেরী যখন পরজীবী ছত্রাকে আক্রান্ত হন, হেমিংওয়ে স্ত্রীকে যথেষ্ট শুশ্রুষা করে সুস্থ করেন। এতকিছুর পরও শেষ পর্যন্ত মার্থা আর হেমিংওয়ের দাম্পত্য জীবনের ইতি টানতে হল। কেননা, ১৯৪৫ সালের জুলাই মাসে মার্থা আনুষ্ঠানিকভাবে হেমিংওয়ের সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন। ওদিকে হেমিংওয়ের নতুন প্রেমিকা মেরী আর তাঁর স্বামী নোয়েলের দাম্পত্য জীবনের ইতি ঘটে একই বছরে। মার্থার সঙ্গে আদালতের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে হেমিংওয়ে ১৯৪৬ সালে প্রেমিকা মেরীকে বিয়ে করেন।

Hemingway 5

নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর হেমিংওয়ে ও মেরি


মেরীকে বিয়ে করার পর লিওপোল্ডিনা নামে আরেক মহিলার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েন হেমিংওয়ে। আর এই মহিলা ছিলেন হেমিংওয়ের বন্ধু বা তার থেকে বেশি কিছু। তবে একথাও জানা যায়, লিওপোল্ডিনা ছিলেন হেমিংওয়ের আমৃত্যু রক্ষিতা। এই নারীর মৃত্যুর পর ‘আইল্যাণ্ড ইন দ্যা স্ট্রিম’ উপন্যাসে লিওপোল্ডিনার চরিত্রটি খুঁজে পাওয়া যায়। জীবনীকারেরা লেখকের মৃত্যুর পর তাঁর জীবনী নিয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করলেও কোনো এক অজানা কারণে যেন আড়ালে থেকে যায় এই নারী। তবে এটাও কারণ হতে পারে যে, পরপর চার স্ত্রীর বাইরে হেমিংওয়ের জীবনে আসা অন্য নারীদের তুলনায় লিওপোল্ডিনার সামাজিক জীবনের অবস্থানগত পার্থক্য ছিল অন্যান্যদের তুলনায় ভিন্ন। হেমিংওয়ে যেসব বরাবণিতাদের সঙ্গে মিশতেন তাদের থেকেও এই নারীর অবস্থানগত পার্থক্য ছিল বিস্তর।

হেমিংওয়ের বয়স যখন পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই তখন আদ্রিনা নামে আরেক নারীর প্রেমে পড়েন তিনি। জীবনীকারদের মতে সেই অষ্টাদর্শীয়া নারীর দীঘল কালো চুল, মসৃণ-জলপাই-বাদামি ত্বক, তীক্ষ্ম টিকালো নাক, সৌষ্ঠব আর কমনীয়তা, নিস্পাপ চেহারা আর বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ করেছিল হেমিংওয়েকে। তবে তার ওপর সমালোচকদের অভিযোগ হলো, প্রায় তিনগুণ বেশি বয়সী হেমিংওয়ের সাথে আদ্রিয়ানা পরগাছার মতো মিশে ছিলেন শুধু নিজের খ্যাতি আর উন্নতির জন্য।

হেমিংওয়ের বয়স যখন পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই তখন আদ্রিয়ানা নামে আরেক নারীর প্রেমে পড়েন তিনি। জীবনীকারদের মতে সেই অষ্টাদর্শীয়া নারীর দীঘল কালো চুল, মসৃণ-জলপাই-বাদামি ত্বক, তীক্ষ্ম টিকালো নাক, সৌষ্ঠব আর কমনীয়তা, নিস্পাপ চেহারা আর বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ করেছিল হেমিংওয়েকে। তবে তার ওপর সমালোচকদের অভিযোগ হলো, প্রায় তিনগুণ বেশি বয়সী হেমিংওয়ের সাথে আদ্রিয়ানা পরগাছার মতো মিশে ছিলেন শুধু নিজের খ্যাতি আর উন্নতির জন্য। আদ্রিয়ানার সঙ্গে হেমিংওয়ের ঘনিষ্ঠতা যখন চরম পর্যায়ে মেরী মনে করেছিলেন প্রায় কন্যার সমবয়সী মেয়েটির সাথে হেমিংওয়ে মিশতেই পারেন। আর তাতে ততদিন তাঁর আপত্তি নেই যতদিন এই সম্পর্কটা নিষ্কাম থাকে। কেননা, হেমিংওয়ে আদ্রিয়ানাকে সবসময় ডটার বলেই সম্বোধন করতেন। আদ্রিয়ানার সংস্পর্শে এসে বেশ উন্নতি হয়েছিল হেমিংওয়ের। তিনি দ্রুতই ফিরে পেয়েছিলেন সৃজনশীলতা। আর স্বাস্থ্যগত উন্নতিও হয়েছিল তাঁর। প্রাণশক্তিতে ভরপুর হেমিংওয়ের বিষণ্ন চেহারায় উজ্জ্বলতা দেখা দেয়। ওজনও কমিয়ে ফেলেছিলেন অনেকখানি আর কমিয়ে দিয়েছিলেন বহু পুরনো অভ্যাস-মদ্যপান। তবে শেষ পর্যন্ত মিলন হয়নি তাঁদের। হেমিংওয়ের মৃত্যুর দুবছর পর তিনি এক ব্যবসায়ীকে বিয়ে করেছিলেন আদ্রিয়ানা। আর সেই ঘরে দুটো সন্তানও হয়েছিল তাঁর।

‘বিপন্ন বিস্ময় অধ্যায়টি’ লেখক শুরু করেছেন হেমিংওয়ের মা গ্রেস হেমিংওয়েকে নিয়ে। সংগীত শিক্ষায় পারদর্শী গ্রেস সর্বদাই সংসারের কর্তৃত্ব বহণ করতেন। আর তাঁর আয় ছিল হেমিংওয়ের ডাক্তার পিতা ক্ল্যারেন্সের চেয়ে বেশি। সংসারে একচ্ছত্র কর্তৃত্বপরায়ণতা, স্বামী ক্ল্যারেন্সের প্রতি মানসিক যন্ত্রণা ইত্যাদি সর্বদাই হেমিংওয়ের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। আর তাই হেমিংওয়ে অকপটেই স্বীকার করতেন, তিনি তাঁর মাকে ঘৃণা করেন। এমনকি মা গ্রেসের মৃত্যুর পর তাঁর শেষকৃত্যেও হেমিংওয়ে যোগদান করেননি।

Hemingway 6

হেমিংওয়ের সাথে ভ্যালেরি ডানবি স্মিথ


হেমিংওয়ের জীবনে যে সকল নারী ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন, এর বাইরে আরও বহুসংখ্যক নারী ছিল তাঁর লেখার প্রেরণা। বলা যায় এরা কেউ কেউ তুমুল ঝড় বইয়ে দিয়েছিলেন হেমিংওয়ের জীবনে। তবে একথা সত্য যে, শুধুমাত্র চারজন নারী ছাড়া আর কারো সাথে প্রেম থেকে সম্পর্কটা বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়নি।

জীবনীকারদের ভাষ্যানুযায়ী হেমিংওয়ের অম্লমধুর ভরপুর সম্পর্কের বন্ধু ফিটজেরাল্ডের স্ত্রী জেলদার সাথেও একসময় ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন হেমিংওয়ে। এছাড়া ব্যারনেস ইভা ব্লিক্সেনের সঙ্গেও তাঁর বন্ধুত্ব ছিল লিখে প্রকাশ করার মতো। অথচ আলোচকদের কাছে এসব নারীদের কথা তেমনভাবে খুব একটা উচ্চারিত হয়নি। সবচেয়ে তাজা খবর হচ্ছে তৎকালীন হলিউডের দাপুটে অভিনেত্রী জিগি শেয়ারটেলের সঙ্গেও মোটামোটি একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে শেষ পর্যন্ত সেটাও গভীরতা পায়। আর এসব ইংগিত কোনো কোনো জীবনীকার দিয়েছেনও বটে। জীবনীকার জেফরি মেয়ার্সের মতে, জিগির সঙ্গে গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলেন হেমিংওয়ে। এ বিষয়ে একটা পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায় হেমিংওয়ের জিগির কাছে লেখা একটা চিঠিতে। তিনি লেখেন, তুমি চলে যাওয়ার পর, তোমার অভাব এত বেশি অনুভব করেছি, সেটা না বলা, না ভাবা কিংবা না লেখাই ভালো। বড়ো কোনো অঙ্গ কেটে ফেলার পর যেরকম মনে হয়, আমারো সেরকম মনে হয়েছে।

লেখক ফারুক মঈনউদ্দীন এখানে জীবনীকার মেয়ার্সের ধারণা উল্লেখ করে লিখেছেন, হেমিংওয়ে যত বুড়িয়ে যাচ্ছিলেন, তত নিজের স্বাস্থ্য আর সৃষ্টিশীলতার বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। তাই হতাশা কাটানোর জন্য হলেও কারো সাথে তাঁর একটা প্রেমের সম্পর্কের প্রয়োজন ছিল।

লেখক ফারুক মঈনউদ্দীন এখানে জীবনীকার মেয়ার্সের ধারণা উল্লেখ করে লিখেছেন, হেমিংওয়ে যত বুড়িয়ে যাচ্ছিলেন, তত নিজের স্বাস্থ্য আর সৃষ্টিশীলতার বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। তাই হতাশা কাটানোর জন্য হলেও কারো সাথে তাঁর একটা প্রেমের সম্পর্কের প্রয়োজন ছিল। আর হয়তো এসব কারণেই বয়সের শেষ প্রান্তে হেমিংওয়ের জীবনে আরও কয়েকজন বান্ধবীর সন্ধান পাওয়া যায়। যেমনটা কারো মতে ধারণা করা হয় জার্মান ফটোসাংবাদিক ইয়েং শোয়েনথাল নামক এক নারীর সঙ্গেও একসময় দুরন্ত ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন হেমিংওয়ে। যাকে তার নিয়োগকর্তা ১৯৫৩ সালে কিউবায় পাঠিয়েছিলেন নতুন বইয়ের জার্মান সংস্করণ নিয়ে আলোচনা করা আর ছবি তোলার জন্য। পরে এই বিদুষী নারী দুর্ধর্ষ ফটোসাংবাদিক হিসেবে বিশ্বের তাবত বড়ো লেখক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতাদের ছবি তুলে সুনাম কুড়িয়েছিলেন।

তবে জীবনের প্রায় অন্তিমকালের পূর্ব মুহূর্তে বেলজিয়ান সংবাদ সংস্থার ফ্রিল্যান্সার আইরিশ তরুণী ভ্যালোরি জানবি স্মিথ নামে এক নারীকে হেমিংওয়ে ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে এ্যাপয়েনমেন্ট দিয়েছিলেন। উনিশ বছর বয়সী এই তরুণীর ছিল দুধের সরের মতো গায়ের রং, গোলাপী গাল আর কোঁকড়ানো চুল।

প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় ১৯৪৩ সালে এক ফরাসি জাহাজে হেমিংওয়ের সঙ্গে পরিচয় ঘটে জার্মান বংশোদ্ভূত অভিনেত্রী মার্লিন দিয়েত্রিচের সাথে। শোনা যায় এই নারীর প্রেমেও ডুব দিয়েছিলেন প্রেমিক পুরুষ হেমিংওয়ে। লেখক তাঁকে সম্বোধন করতেন ‘ক্রাউথ’ বলে। যখন ভৌগলিক দূরত্বে দুজনের অবস্থান তখন তেতাল্লিশ বছর বয়সী মার্লিন দিয়েত্রিচকে পঞ্চাশ বছর বয়সী হেমিংওয়ে প্রায়ই চিঠি লিখতেন সুন্দরী সম্বোধন করে।

হেমিংওয়ের নারীর প্রতি আকর্ষণ, যখন-তখন প্রেমে পড়া কিংবা কারো সঙ্গে গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতার বিষয়ে প্রায় চার স্ত্রীর-ই অনিচ্ছাকৃত প্রশ্রয় ছিল। কারণ, তাঁরা সবাই চাইতেন, হেমিংওয়ে যাতে মানসিকভাবে সুস্থ, সুখি আর সৃষ্টিশীল থাকতে পারেন। এরপর তবুও একমাত্র মেরী ছাড়া আর কারো দাম্পত্য জীবনই খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

হেমিংওয়ের চার স্ত্রীর মধ্যে কেবল দ্বিতীয় স্ত্রী পলিন মারা গিয়েছিলেন প্রাক্তন স্বামীর দশ বছর আগে। তারপর মারা যান স্ত্রী হ্যাডলি। যিনি ছিলেন হেমিংওয়ের দুঃসময়ের একমাত্র সাথী। আর মেরী মারা যান ১৯৮৬ সাথে প্রায় বহু বছর পর। আর ১৯৯৮ সালে সায়ানাইড ক্যাপসুল নামক বিষপানে আত্মহত্যা করেন মার্থা।

Hemingway 7

হেমিংওয়ের চার স্ত্রী


জীবনে এত এত সুখসংসর্গ পাওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত মানসিক বিপর্যস্ততা, প্রচণ্ড মদ্যপান আর হতাশায় ডুবে থাকা জীবন থেকে নিষ্কৃতি পেতে নিজ বন্দুকের গুলিতে আত্মহত্যা করেন এই বরেণ্য লেখক হেমিংওয়ে। একথা সত্য যে, একজন লেখকের মনোজগতে সবসময় ভীড় করে, ফেলে আসা জীবনের অগণন স্মৃতি, গভীর কল্পনাবোধ আর নারীর প্রতি অদম্য প্রেম। তবে এইসব জাগতিক সুখ আর আনন্দ লেখকের মন থেকে একদিন মুছে যায়। ফুরিয়ে যায় সমস্ত আনন্দ। তাঁর চিন্তার ক্ষমতা নিস্তেজ হয়ে পড়ে আর ক্ষয়ে যায় কল্পনার জগত। না লিখতে পারার দুঃসহ যন্ত্রণা হয়তো একজন লেখককে নিঃশেষ করে দেয়। যার ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাই হেমিংওয়ের মতো আরও বহু বরেণ্য লেখককে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে।

স্ত্রী পুত্রের সাথে একসঙ্গে সময় কাটানোর স্মৃতিচারণ করে হেমিংওয়ে একবার লিখেছিলন— গাদা করে রাখা কাঠের গুঁড়ির পাশ দিয়ে ট্রেনটা স্টেশনে ঢোকার পর আমার স্ত্রীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি, আমার তখন মনে হচ্ছিল ওকে ছেড়ে আরেকজনকে ভালোবাসার আগে আমার মরণ হলনা কেন?

তবে প্রেমে তো চিরকাল সুখ আর বিরহ পাশাপাশি বসবাস করে। পলিনকে নিয়ে লেখকের এক স্মৃতিচারণমূলক লেখা পড়ে প্রচণ্ডভাবে আপ্লুত হয়েছি। পৃথিবীতে নারী আর পুরুষের জন্মই তো প্রেমের জন্য আর প্রেম স্বর্গীয় এবং সুন্দর। স্ত্রী পুত্রের সাথে একসঙ্গে সময় কাটানোর স্মৃতিচারণ করে হেমিংওয়ে একবার লিখেছিলন— গাদা করে রাখা কাঠের গুঁড়ির পাশ দিয়ে ট্রেনটা স্টেশনে ঢোকার পর আমার স্ত্রীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি, আমার তখন মনে হচ্ছিল ওকে ছেড়ে আরেকজনকে ভালোবাসার আগে আমার মরণ হলনা কেন? আমাকে দেখে ওর মুখে হাসি, বরফের মধ্যে রোদে পোড়া ওর সুগঠিত চমৎকার মুখের ওপর সূর্যের আলো পড়ছিল, সারা শীতকাল ধরে বেসামাল আর সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠা ওর চুল লাল সোনারঙে জ্বলছিল।

তবে একথা সত্য যে, এইবাক্যগুলো পড়ে যে কোনো সংবেদনশীল মানুষের বুকের ভেতর হাহাকার জেগে উঠবে। আর হয়তো অজান্তেই চোখ থেকে গড়িয়ে পড়বে দু’ফোঁটা অশ্রু।

পরিশেষে নির্দ্বিধায় বলা যায়, ‘হেমিংওয়ের নারীরা’ বইটি লেখার জন্য লেখক ফারুক মঈনউদ্দীন যতটা সময় এবং শ্রম ব্যয় করেছেন, একজন ক্ষুদ্র এবং সাধারণ পাঠক হিসেবে আমি তাকে সাধুবাদ জানাই। তিনি বইটিতে সংযোজন করেছেন প্রয়োজনীয় টীকা, শেষাংশে রেখেছেন লেখকের সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জী। বিশ্বখ্যাত নোবেল লরিয়েট আর্নেস্ট হেমিংওয়ের জীবনের অসংখ্য না জানা কথা জানতে পেরে লেখককে বিশেষ ধন্যবাদ জানাই।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

মোস্তফা অভি মূলত তরুণ গল্পকার। জন্ম বাংলাদেশের পটুয়াখালী জেলার বিঘাই গ্রামে ১৯৮৪ সালে। পড়াশোনা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতোকত্তোর। পেশায় ব্যাংকার। বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকে বেশ কিছু গল্প ছাপা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ, ভারত উভয় দেশের বিভিন্ন সাহিত্যপত্রে ছাপা হয়েছে বেশ কিছু লেখা। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ দুটি। ‘বাজপাখির পুনর্জন্ম’ এবং ‘সিএস খতিয়ান ও একটি মামলার ইতিবৃত্ত’।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।
Ad_Icchesrabon-02