রবিবার, নভেম্বর ২৮

১৯৭১ : ‘জয় বাংলা’ স্লোগানই ছিল সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র || সালেক খোকন

0
sk_001

সাব-সেক্টর কমান্ডার মাহফুজ আলম বেগ, ছবি : সালেক খোকন


‘আমি ছিলাম পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপের (এসএসজি) একজন এলিট কমান্ডো। আমাদের মধ্যে কিছু ইন্টেলিজেন্সের লোকজন ছিল। তাদের মুখেই শুনতাম পূর্ব পাকিস্তানে কিছু একটা ঘটবে। তখন চিন্তা হতো দেশকে নিয়ে। একদিন করাচি নেভাল পোর্টে ফিশিং করতে গিয়ে দেখি পূর্ব পাকিস্তানে আসার জাহাজে হেভি আর্মস অ্যামুনেশন লোড করা হচ্ছে। তখনই বুঝে যাই ওরা খারাপ কিছু ঘটাবে।

১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। কয়েক দিনের ছুটিতে দেশে আসি। ফিরে যাওয়ার আগে সুলতান সাহেব ও নূর মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে মিটিং করি। পরিকল্পনা হয় খারাপ কিছু ঘটার আগে তারাই করাচিতে আমাকে মেসেজ পাঠাবেন।

হঠাৎ একদিন কমান্ডিং অফিসার টি এ খান একটি টেলিগ্রাম হাতে ছুটে আসেন। টেলিগ্রামে লেখা, ‘মাদার সিরিয়াস কাম শার্প।’ বুঝে গেলাম এটি নূর মোহাম্মদ ভাই পাঠিয়েছেন। ‘মাদার’ মানে মাতৃভূমি। আর ‘সিরিয়াস’ লিখলে বুঝতে হবে যেভাবেই হোক ফিরে যেতে হবে।

হঠাৎ একদিন কমান্ডিং অফিসার টি এ খান একটি টেলিগ্রাম হাতে ছুটে আসেন। টেলিগ্রামে লেখা, ‘মাদার সিরিয়াস কাম শার্প।’ বুঝে গেলাম এটি নূর মোহাম্মদ ভাই পাঠিয়েছেন। ‘মাদার’ মানে মাতৃভূমি। আর ‘সিরিয়াস’ লিখলে বুঝতে হবে যেভাবেই হোক ফিরে যেতে হবে।

ফরমাল ছুটি না নিয়েই পালানোর পরিকল্পনা আঁটি। টাকার প্রয়োজনে শখের মোটরসাইকেলটাও বিক্রি করি নয়শ টাকায়। ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল অলি। দেশ নিয়ে সেও চিন্তিত। পরিকল্পনার কথা শুনে তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকেও সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করল। রাজি হলাম। কিন্তু প্লেনের টিকিট তো নাই। অলরেডি পাকিস্তান থেকে লোকজন আসা বন্ধ। শুধু হাজিদের ফ্লাইট ওপেন ছিল।

তখন মনে পড়ে লেফটেন্যান্ট ইমতিয়াজের কথা। চেরিয়ট ট্রেনিংয়ে আমি ছিলাম তার ট্রেনার। ওই সময় সে প্রায় ৬০ ফিট পানির নিচে চলে যায়। ফলে আনকনশাস অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রাণে বাঁচিয়েছিলাম। সেই থেকেই পরিবারিকভাবে একটা বিশ্বস্ত সম্পর্ক ছিল তার সঙ্গে। পাঞ্জাবি হলেও তার কাছেই সাহায্য চাইলাম। সেও সব কিছু গোপন রেখেছিল। পাকিস্তান এয়ারলাইন্সে চাকরি করতেন তার এক আত্মীয়। তার মাধ্যমেই দুটো টিকিট জোগাড় করে দেন ইমতিয়াজ। রাত দুটোর ফ্লাইটে পাকিস্তান থেকে রওনা হয়ে ৪ মার্চ ১৯৭১ তারিখ ভোরে ঢাকায় পৌঁছি। ধরা পড়লে আমাকে হয়তো ফায়ারিং স্কোয়াডেই গুলি করে মারা হতো। কিন্তু মৃত্যুর পয়গাম হাতে নিয়েই পালিয়ে এসেছিলাম।’

একাত্তরে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসার ইতিহাস এভাবেই তুলে ধরেন সাব-সেক্টর কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজ আলম বেগ। যিনি ক্যাপ্টেন বেগ নামে অধিক পরিচিত। একবার তার মুখোমুখি হয়েছিলাম একাত্তরের নানা ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে।

তার বাবার নাম প্রফেসার হোসামউদ্দিন। তিনি বরিশাল বিএম কলেজের নামকরা প্রফেসার ছিলেন। মায়ের নাম মর্জিনা বেগম। তাদের বাড়ি বরিশাল শহরে। ৭ ভাই ও ৫ বোনের মধ্যে মাহফুজ আলম বেগ পঞ্চম। তার মেজ ভাই মনজুরুল আলম বেগ একুশে পদকপ্রাপ্ত দেশের প্রখ্যাত ফটোগ্রাফার।

ফিরে এসে কী করলেন?

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে সব কথা খুলে বললাম। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘তোরে তো পেলে ওরা মাইরা ফেলবে। তুই যা বললি সেটা আমি জানি। পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে সেলিমদের সাথে মিশে থাকবি। সেলিম তোকে বলবে কী করতে হবে।’

তিনি বলেন, “ছোটো ভাই মাহবুব আলম বেগ তখন ছাত্রলীগ করত। তোফায়েল আহমেদসহ তৎকালীন ছাত্র নেতাদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। তাকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে সব কথা খুলে বললাম। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘তোরে তো পেলে ওরা মাইরা ফেলবে। তুই যা বললি সেটা আমি জানি। পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে সেলিমদের সাথে মিশে থাকবি। সেলিম তোকে বলবে কী করতে হবে।’

বুঝলাম বঙ্গবন্ধু নিজেও একটা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সাত মার্চ ভাষণের পর শেখ সেলিম ও কিছু ছেলেসহ আমরা নারায়ণগঞ্জে একটা বাড়িতে আস্তনা গাড়ি। সেখানে পেট্রোল আর সাবান এনে মনোটল ককটেল বানানো শুরু করি। অসহযোগে ঢাকায় ও আশপাশে যত ককটেল ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলো অধিকাংশই ছিল নারায়ণগঞ্জের। এর পর বলা হলো কলাতিয়া চলে যেতে। ওখানে গগনদের বাড়িতে ক্যাম্প করতে হবে। যদি কোনো ঘটনা ঘটে বা পাকিস্তানিরা বিশ্বাসঘাতকতা করে তবে নেতারা কলাতিয়াতে আশ্রয় নেবেন। আমার দায়িত্ব তাদের সেভ ডেসটিনিতে পাঠিয়ে দেওয়া।

গগন ছিলেন ওখানকার আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। তার বড়ো ভাই গ্রামের চেয়ারম্যান। সেখানে গিয়েই ক্যাম্প করলাম। ট্রেনিংও শুরু হয়। বাড়ির সামনে ছিল একটা পুকুর। পুকুরের ওপারে বোতল রেখে গুলির ট্রেনিং দিতাম। অস্ত্র ছিল একটা পয়েন্ট টু টু রাইফেল। ওখানে ছিলেন তোফায়েল আহমেদ, রাজ্জাক সাহেব, সিরাজুল আলম খান, ক্যাপ্টেন মনছুর আলী, শেখ ফজলুল হক মনি, আমেনা বেগম, মন্টু, আরেফ প্রমুখ।


sk_002

একাত্তরে গাবুরা (সুন্দরবন) আর্মি ক্যাম্প দখলের পর— ডান থেকে আ স ম ফিরোজ (বর্তমান চিফ হুইপ), আফজাল, আকরাম, মাহফুজ আলম বেগ, তারেক, প্রদীপচন্দ্র ঘোষ, অস্ত্র হাতে সালাম ( বর্তমানে বারডেমের প্রফেসর), ছবি: অ্যালবাম থেকে সংগৃহীত


 

ধীরে ধীরে আমরা স্থানীয়দের বন্দুক সংগ্রহ করা শুরু করি। জয়দেবপুরে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনারা তখন বিদ্রোহ করে বেরিয়ে এসেছে। একদিন ক্যাম্পে আসেন আ স ম আব্দুর রব। সঙ্গে বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৫জন সেনা। তাদের কাছে ছিল একটা চাইনিজ এসএমজি আর চারটা চাইনিজ রাইফেল। তখনই প্রথম মর্ডান আর্মস পাই। ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু হলে ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাই নরসিংদীতে, ক্যাপ্টেন মতিউর রহমানের গ্রুপে। শিল্পী আপেল মাহমুদও ছিলেন ওখানে।”

পাকিস্তানি সেনারা ঢাকা থেকে তারাবো দিয়ে নরসিংদীর দিকে অ্যাডভান্স হচ্ছে। তখন বেগকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ঠেকানোর। একটা দল নিয়ে তিনি এগিয়ে যান অ্যাম্বুশের জন্য। দুইটি এলএমজি, কয়েকটা রাইফেল, স্টেনগান তাদের অস্ত্র। প্রথম অ্যাটাকেই পাকিস্তানি সেনাদের দুটি ট্রাক রাস্তার দুদিকে পড়ে যায়। হতাহত হয় অনেক সেনা। কিন্তু পরদিনই তারা ফুলপেজে বম্বিং করে অ্যাডভান্স হয়। ফলে টিকতে পারেন না বেগরা। তারা ফিরে এসে দেখেন তাদের ডিফেন্স নেই। তখন যে যার মতো আত্মোগোপনে চলে যান। বেগ নৌকায় করে চলে যান লৌহজং। সেখান থেকে একটা লঞ্চে ফেরেন নিজ শহরে, বরিশালে।

বাকী ইতিহাস শুনি তার জবানিতে—

‘বরিশাল গিয়েই ছাত্রদের ত্রিশজনের একটা গ্রুপকে রাইফেল ট্রেনিং দেওয়া শুরু করি। চিফ হুইপ ফিরোজ, আফজাল, প্রফেসর সালাম এরাও ছিলেন ওখানে। ইছাকাঠি গার্ডেন, কাশিপুরে ট্রেনিং করাই। জায়গাটা ছিল লাকুটিয়া জমিদারবাড়িতে, একটা মাঠে।

তিন-চারদিন পরেই বরিশালে পাকিস্তান আর্মিরা আসে। প্যারাট্রুপারসও ল্যান্ড করে। হেভি মেশিনগানের সামনে আমরা টিকতে পারি না। তখন ট্রেইন্ড লোক খুব কম ছিল। ‘জয়বাংলা’ স্লোগানই ছিল একাত্তরের সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র। প্রথম দিকে সবাই ছিল আইডিওলজিক্যাল ফ্রিডম ফাইটার। যারা মন দিয়ে বিশ্বাস করত বাংলাদেশ স্বাধীন হবে।

পাকিস্তানি সেনারা বরিশাল দখল করলে আমরা চলে যাই আটঘর কুড়িআনায়। পেঁচানো খাল আর পেয়ারাবাগান ওখানে। চলাচলের জন্য ‘হাক্কা’ ছিল একমাত্র উপায়। বরিশালের ভাষায় ‘হাক্কা’ হলো একটি বাঁশ। একটি বাঁশ দিয়ে তৈরি পুল দিয়েই চলাচল করতে হতো। ফলে বুট পরে তার ওপর দিয়ে যাওয়া খুব কঠিন। এসব কারণে জায়গাটা আমাদের জন্য নিরাপদ ছিল।

তবুও পাকিস্তানি সেনারা গানবোট নিয়ে আক্রমণের চেষ্টা করত। রমা দাস, বিথিকা রাণী বিশ্বাস, সমিরন, হরিমন বিশ্বাসসহ আরও অনেক মেয়ে ওখানে ট্রেনিং করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। অধিকাংশই ছিল কলেজের ছাত্রী। এ ছাড়া সেখানে ছিল পরিমল, ভুলু, তারেক প্রমুখ। আমাদের কাছে দুইটা স্টেনগান, ত্রিশটির মতো রাইফেল। তা দিয়েই যতটা সম্ভব ঠেকিয়েছি। রাজাকার বাহিনীও মাঠে নেমেছে তখন। ছোটোখাটো যুদ্ধও চলেছে। এক সময় অস্ত্রের সংকটে পড়ি। তখন নির্দেশ আসে ছোট্ট ছোট্ট দলে ভাগ হয়ে ইন্ডিয়ায় চলে যাওয়ার। ফলে সবাইকে ট্রেনিংয়ের জন্য ইন্ডিয়ায় পাঠিয়ে দিই।’

মাহফুজ আলম বেগও চলে যান কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক অফিসে। প্রখ্যাত আওয়ামী লীগ নেতা ফণীভূষণ মজুমদার তাকে নাইন সেক্টরের হেডকোয়ার্টার হাসনাবাদে যাওয়ার পরামর্শ দেন। নাইন সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর এম এ জলিল। বেগকে পেয়ে তিনি খুশি হন এবং ওই দিনই ট্রেনিং থেকে আসা একটি কোম্পানির দায়িত্ব দেন তাকে। ভারতের বসন্তপুরের পাশে বর্ডারে রাইস মিলে প্রথম ঘাঁটি গাড়েন মাহফুজ আলম বেগ। সামনে নদী। ওপারে ছিল পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প। বেগের গ্রুপে প্রথম দুইশ জন মুক্তিযোদ্ধা থাকলেও পরে তা বেড়ে দাড়ায় পাঁচশতে। নাইন সেক্টরের অপারেশনাল কমান্ডারও ছিলেন তিনি। পরে তাকে শমসেরনগর সাব-সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সমগ্র সাতক্ষীরা অঞ্চলে গেরিলা, সম্মুখ ও নৌকমান্ডো যুদ্ধসমূহ পরিচালনা করেন মাহফুজ আলম বেগ। পারুলিয়া ব্রীজ, খাঞ্চিয়া বর্ডার আউট পোস্ট, উকসায় মাইন বিস্ফোরণ, ভাতশালা, কেয়ারগাতি রাজাকার ঘাঁটি বিনাশ, বিউটি অব খুলনা নৌযান পুনরুদ্ধার, হবিনগর কৈখালী পাকিস্তানি গানবোটে অভিযান, কেয়ারগাতিতে গানবোট আক্রমণ, শ্যামনগর যুদ্ধ, মাগুরা শিশির অভিযান, আশাশুনিতে পাকিস্তান ঘাঁটি ধ্বংস, কালীগঞ্জের যুদ্ধ, গোয়ালডাঙ্গার যুদ্ধ, কালীগঞ্জে রাজাকার ঘাঁটি দখল, বসন্তপুর অপারেশন, চাপড়া রাজাকার ক্যাম্প ও আশাশুনি থানা অপারেশন, সাতক্ষীরা শহরে পাওয়ার হাউজে দুঃসাহসিক অভিযান, কৈখালীতে সংঘর্ষ, শ্যামনগরে অপারেশন ও কালীগঞ্জ থানা পুনরুদ্ধার যুদ্ধ প্রভৃতি অপারেশনসহ বরিশালের দোয়ারিকায় এক কোম্পানি পাকিস্তানি সেনাকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেন এই যোদ্ধা।

রণাঙ্গনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হন এই বীর। অতঃপর স্মৃতি হাতড়ে তুলে আনেন একাত্তরের দুঃসাহসিক সেই দিনগুলোর কথা।

তার ভাষায়, ‘গেরিলা ইউনিটগুলোকে কমান্ড করতাম। গোয়েন্দা রিপোর্ট আসত আর্মি মুভ করছে। রেইড, কোথাও অ্যাম্বুশ, কোনো কোনো বিওপি দখল করতাম। এমন রাত ছিল না যে অপারেশন করিনি। যত অপারেশন হয়েছে সেগুলো আমি, মেজর জলিল আর ইন্ডিয়ান আর্মির চার্লি সেক্টরের অফিসাররা প্ল্যান করতাম।

তাদের মেইন কাজ ছিল অ্যামুনেশন ক্যারি, ইন্টেলিজেন্সের কাজ করা। ওরা গল্প বলে আর মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে কথা বলে পাকিস্তানি সেনাদের বিশ্বস্ততা অর্জন করত। পরে আর্মি ক্যাম্পে ঢুকে ওদের ঠ্যাং টিপে ফিরে এসে বয়ান করত ক্যাম্পের কোথায় কি আছে। তাদের কাজে ঝুঁকি ছিল অনেক। যেখানে ট্রেইন্ড মুক্তিযোদ্ধারাও যেতে চাইত না, সেখানে ওরা বলত— ‘স্যার আমি যাব’।

ছোটোদের নিয়ে একটা গ্রুপও ছিল। তাদের বয়স ১১-১৪ বছরের মতো। সাতক্ষীরা, খুলনা ও বরিশালের কিশোররা ছিল সংখ্যায় চল্লিশের মতো। গ্রুপটির নাম দিই ‘হার্ড কর্পস অব সার্জেন্টস’। আসলে ওরা বিচ্ছুবাহিনী। ওদের এসএমজি, রাইফেল ও গ্রেনেডের ওপর ট্রেনিং দেওয়া হয়। নৌকা চালানোর ওপর ছিল বিশেষ ট্রেনিং। তাদের মেইন কাজ ছিল অ্যামুনেশন ক্যারি, ইন্টেলিজেন্সের কাজ করা। ওরা গল্প বলে আর মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে কথা বলে পাকিস্তানি সেনাদের বিশ্বস্ততা অর্জন করত। পরে আর্মি ক্যাম্পে ঢুকে ওদের ঠ্যাং টিপে ফিরে এসে বয়ান করত ক্যাম্পের কোথায় কি আছে। তাদের কাজে ঝুঁকি ছিল অনেক। যেখানে ট্রেইন্ড মুক্তিযোদ্ধারাও যেতে চাইত না, সেখানে ওরা বলত— ‘স্যার আমি যাব’।


sk_004

একাত্তরে বরিশাল যাওয়ার পথে নয় নম্বর সেক্টরের হার্ড কর্পস অব সার্জেন্টস (বিচ্ছুবাহিনী), ছবি: অ্যালবাম থেকে সংগৃহীত


জলিল সাহেব একবার প্ল্যান করলেন পাকিস্তানি গানবোটকে কাউন্টার দিতে হবে। গানবোটে ৪০ মিলিমিটার বাফার থাকে। ইপিআরের স্টিল বডি লঞ্চ ছিল তখন। বিগ্রেডিয়ার সালেক ছিলেন ইন্ডিয়ান আর্মির চার্লি সেক্টরের কমান্ডার। তাকে রিকোয়েস্ট করে আনা হয় হেভি মেশিনগান। সেগুলো লঞ্চে ফিট করে গানবোট বানানো হয়। ‘বঙ্গ বজ্র’ নামের দুটি লঞ্চকেই গানবোট হিসেবে ব্যবহার করতাম আমরা। প্রথম নেভি বলতে গেলে নয় নম্বর সেক্টরেই শুরু হয়। নেভির লেফটেন্যান্ট গাজী, লেফটেন্যান্ট আলম ছিলেন। তাদেরকে দিয়েই নৌ অপারেশনগুলো প্ল্যান করা হতো।

বরিশালের দোয়ারিকায় পাকিস্তানি সেনাদের একটা ক্যাম্প ছিল। পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন কাহারের নেতৃত্বে সেখানে ছিল বেলুচ রেজিমেন্টের একটা কোম্পানি। আমাদের পুরো ব্যাটেলিয়ান ঘিরে ফেলে ওদের। আর্মি ছাড়া ওরা সারেন্ডার করবে না। পরে তারা অস্ত্র ফেলে আমার নিয়ন্ত্রণে থাকে। দোয়ারিকা থেকে তাদের নিয়ে আসা হয় ওয়াবদায়। পাকিস্তান আর্মি মাথা নিচু করে ওয়াবদার দিকে মার্চ করছে। আর অস্ত্র উঁচিয়ে তাদের নিয়ে যাচ্ছে ছেঁড়া শার্ট আর ছেড়া লুঙ্গি পরা মুক্তিযোদ্ধারা। এই দৃশ্যটা কখনো ভুলতে পারব না। পরে তাদের ইন্ডিয়ান আর্মির কাছে হ্যান্ডওভার করি।

আমাদের সঙ্গে থাকতেন ফটোগ্রাফার খোকন দাস ও মিন্টু দাস। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা যুদ্ধকালীন নানা ছবি তুলতেন। মিন্টু দাস এখন বেঁচে নেই। খোকন দাস চলে গেছেন ভারতে। কিন্তু তাদের তোলা ওই ছবিগুলোই এখন মুক্তিযুদ্ধের অসামান্য দলিল। অথচ ইতিহাসে এই ফটোগ্রাফারদের কথা তুলে ধরা হয়নি।’

আমাদের সঙ্গে থাকতেন ফটোগ্রাফার খোকন দাস ও মিন্টু দাস। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা যুদ্ধকালীন নানা ছবি তুলতেন। মিন্টু দাস এখন বেঁচে নেই। খোকন দাস চলে গেছেন ভারতে। কিন্তু তাদের তোলা ওই ছবিগুলোই এখন মুক্তিযুদ্ধের অসামান্য দলিল। অথচ ইতিহাসে এই ফটোগ্রাফারদের কথা তুলে ধরা হয়নি।’

নয় মাসে দেশ স্বাধীন হওয়ার অন্তর্নিহিত কারণ তুলে ধরেন এই সূর্যসন্তান। বলেন, ‘স্লোগান দিয়েই তো আমরা দেশ জয় করেছি। পাকিস্তানিরা আসছে অন্যের দেশে। জোর কইরা একটা যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে মাতবরি করতে আসছে। আর আমাদের দেশেই আমরা। নদীনালা, খালবিল, পাহাড় সব চেনা। এখানে আমরাই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। পৃথিবীর ইতিহাসে শুনছেন ৯০ হাজার ওয়েল ইকুয়েপড সেনা সারেন্ডার করেছে। একমাত্র যদি তারা কাপুরুষ না হয়। এমন নয় যে তাদের গোলাবারুদ ফুরিয়ে গিয়েছিল। তবুও সারেন্ডার করতে বাধ্য হয়েছিল কাপুরুষ পাকিস্তান সেনারাই। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যই হয়েছে এটা। যারা ছিল আইডোলজিক্যাল যোদ্ধা। আমি নামক কোনো শব্দ ছিল না মুক্তিযুদ্ধে। ছিল আমরা। এই দেশ আমার মায়ের দেশ। মাকে মুক্ত করাই তখন ছিল সবচেয়ে বড়ো কাজ।’

পৃথিবীর ইতিহাসে শুনছেন ৯০ হাজার ওয়েল ইকুয়েপড সেনা সারেন্ডার করেছে। একমাত্র যদি তারা কাপুরুষ না হয়। এমন নয় যে তাদের গোলাবারুদ ফুরিয়ে গিয়েছিল। তবুও সারেন্ডার করতে বাধ্য হয়েছিল কাপুরুষ পাকিস্তান সেনারাই। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যই হয়েছে এটা। যারা ছিল আইডোলজিক্যাল যোদ্ধা। আমি নামক কোনো শব্দ ছিল না মুক্তিযুদ্ধে। ছিল আমরা। এই দেশ আমার মায়ের দেশ। মাকে মুক্ত করাই তখন ছিল সবচেয়ে বড়ো কাজ।

যে দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন সে দেশ কি পেয়েছেন?

‘অবশ্যই পেয়েছি। পাকিস্তান আমলে ভাঙাচোরা একটা কর্নেল ছিল আমাদের। তাই নিয়েই গর্ব করতাম। এখন বাংলাদেশের প্রত্যেক গ্রামে একজন সেক্রেটারি আছে। আমার নিজের একটা পতাকা আছে। আছে একটা মানচিত্র, একটা ভাষা। এর চেয়ে বড়ো পাওয়া আর কী হতে পারে! আজকে আর্মি, বিজিবি আর পুলিশের দিকে তাকান। তারা কি পাকিস্তান বা অন্য কোনো দেশের বাহিনী থেকে কম যোগ্যতা সম্পন্ন। এটাই আমাদের অর্জন।’

১৯৭৪ সালে মাহফুজ আলম বেগ পরিচালক হিসেবে যোগ দেন ওয়াবদায়। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে ঘাতকরা। আগে থেকেই খন্দকার মোশতাকের ক্ষোভ ছিল বেগের প্রতি। তিনি বলেছিলেন— ‘জীবিত বা মৃত বেগকে চাই।’ এর পরই বেগকে খুঁজতে ক্যাপ্টেন মাজেদ তার আত্মীয়স্বজনের বাসায় রেইড দিতে থাকে। এক পর্যায়ে কর্নেল তাহেরের সহযোগিতায় বেগ প্রথমে নেত্রকোণার কাজলায় এবং পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ হয়ে ইন্ডিয়ায় চলে যান। দেরাদুনে তারা ‘মুজিবস আইডোলজিক্যাল ফোর্স’ নামে একটি ফোর্সও গঠন করেন। সঙ্গে ছিলেন শেখ সেলিম, আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহসহ অনেকেই।

কী ছিল এই ফোর্সের উদ্দেশ্য?

মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজ আলম বেগের ভাষায়, ‘দেশে ফিরে আওয়ামী লীগ নেতাদের সংগঠিত করে দীর্ঘমেয়াদি কিছু করাই ছিল উদ্দেশ্য। এ ব্যাপারে ভারতীয় সরকারেরও সহযোগিতা পাই। কিন্তু দেশে ফিরেই অনেক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ হতেই হতাশ হই। বড়ো বড়ো নেতারাই ধমকের সুরে সে সময় বলেছিল— ‘তুমি আবার আসলে পুলিশে ধরায়া দিমু।’ মোশতাকের কেবিনেটে কারা ছিল বলেন? এর পরই আমি সেমি কট হই। ডিজিএফআই থেকে বলা হলো সারেন্ডার করতে। সারেন্ডার করি। বহু কষ্টে চার বছর পর চাকরি ফিরে পেয়েছিলাম। কিন্তু চার বছরের বেনিফিট পাইনি। ওই সময়টা কেটেছে নানা অবহেলা আর আতঙ্কে।’

সততার সঙ্গেই চাকুরি জীবন শেষ করেছেন এই বীর। নিজের কোনো বাড়ি নেই তার। সাব-সেক্টর কমান্ডার হয়েও পাননি কোনো সরকারি প্লট। থাকছেন ছোটোবোনের বাসায়। রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানের দাওয়াতও এখন পৌঁছায় না তার বাড়িতে। এ নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই। বরং দেশ নিয়ে এখনো স্বপ্ন দেখেন এই বীরযোদ্ধা।

বর্তমান প্রজন্ম ভালো না হলে পরবর্তী প্রজন্মও ভালো হবে না— এমনটাই মনে করেন সাব-সেক্টর কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজ আলম বেগ। পরবর্তী প্রজন্মের উদ্দেশে তিনি শুধু বললেন— ‘তোমরা সৎ নাগরিক হইও। মাদক থেকে নিজেকে মুক্ত রেখো। বাবা-মাকে ঘুষ না খেতে উদ্বুদ্ধ করো। ধর্মীয় মৌলবাদ থেকে নিজেকে দূরে রেখো। তবেই তোমাদের হাত ধরে দেশটা সোনার বাংলাদেশ হবে।’

সাব-সেক্টর কমান্ডার মাহফুজ আলম বেগের মতো বীর মুক্তিযোদ্ধারা পৌরাণিক কোনো চরিত্র নয়, বরং বাঙালি বীর। তাঁদের রক্ত, ঘাম, ত্যাগে সৃষ্ট বাংলাদেশ আজ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। আজকের সবকিছুই আগামীর ইতিহাসের অংশ হবে তা নয়, কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এই কমান্ডারের দুঃসাহসিক ইতিহাস অনাদিকাল পর্যন্ত আমাদের আলোড়িত করবে।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

লেখক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। তাঁর রচিত যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক মৌলিক গবেষণাগ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক’ পুরস্কার লাভ করে। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং অনলাইন পত্রিকায়। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। প্রকাশিত গ্রন্থ ২২টি। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ— ‘৭১-এর আকরগ্রন্থ’, ‘অপরাজেয় একাত্তর’, ‘১৯৭১: রক্ত, মাটি ও বীরের গদ্য’, ‘দেশে বেড়াই’, ‘বিদ্রোহ-সংগ্রামে আদিবাসী’, ‘১৯৭১: যাঁদের ত্যাগে এলো স্বাধীনতা’, ‘আদিবাসী বিয়েকথা’, ‘১৯৭১: রক্তমাখা যুদ্ধকথা’, ‘১৯৭১: যাঁদের রক্তে সিক্ত এই মাটি’, ‘যুদ্ধাহতের ভাষ্য’, ‘রক্তে রাঙা একাত্তর’।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।