‘ভারতের স্মৃতি হচ্ছে নীরবতা!’—এমনটা বলেছিলেন ডিউক অব ওয়েলিংটন ফিলিপ গ্যেদেলা। কিন্তু ওইরকম ভীতিজনক পরিণতির কাছে সঁপে দেননি অ্যাডওয়ার্ড ফার্লে ওটেন (১৮৮৪—১৯৭৩)। তিনি বরং ভারতে কাটানো তাঁর জীবনকে প্রাচীন ‘গল’দের মতো তিনটি পর্বে বিভক্ত করে দেখেছেন। প্রথম ভাগে ছিল ১৯০৯ থেকে ১৯১৬ সালের ভারতীয় শিক্ষাদপ্তরের চাকুরে হিসেবে প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক পদে; দ্বিতীয় পর্বে ১৯১৬ থেকে ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ রাজের অশ্বারোহী বাহিনীর প্রোভিন্স হর্সে (পাঞ্জাব ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে, মূলত জলান্ধরে ও সেন্ট্রাল প্রোভিন্সের সাগর স্টাফ ট্রেনিং কলেজে) এবং ১৯১৯ থেকে ১৯৩০ সালে ভারতীয় শিক্ষাদপ্তরের নানাবিধ পদে (বিশেষ করে কলেজের অধ্যক্ষ, সহকারী নির্দেশক ও নির্দেশক হিসেবে নির্দেশনা দপ্তরে এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটর ও সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে)। অবশ্য পাশাপাশি আংশিক সময়ের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকেন্ড অকসিলারি ব্যাটালিয়ানের মেজর হিসেবে আসীন ছিলেন। ভারতের একুশ বছরের বর্ণাঢ্য জীবন কাটিয়ে ওটেন দারুণ অনিচ্ছার সঙ্গে ভারত ত্যাগ করতে বাধ্য হন ১৯৩০ সালে। ভারত-জীবন প্রসঙ্গে ওটেনের সেই স্মরণীয় উক্তি অনেকেই জানেন যে, ‘একবার যে ভারতে থেকেছে সে কখনও তাকে ভুলে থাকতে পারবে না!’ এই ভুলে না থাকতে পারা থেকেই ওটেন তাঁর অনবদ্য রচনা ‘মাই মেমরিজ অব ইন্ডিয়া’ (১৯৮৪) লিখেছিলেন। বইটি নিছক একটি স্মৃতিকথা নয়, এতে প্রতিফলিত হয়েছে একজন ইংরেজের চোখে ভারতীয় জীবনচর্যা, সমাজ, সংস্কৃতি শিক্ষা সহ নানা আনুষাঙ্গিক বিষয়। একই সঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে ভারতের প্রতি ওটেনের দৃষ্টিভঙ্গি ও সুগভীর মমত্ববোধ-ভারতের মানুষের প্রতি নানা দায় ও দায়িত্ববোধের তাড়না। স্মৃতিকথাটি পড়ে ওটেনকে যতটা না উপনিবেশক, তারচেয়ে বেশি একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি ও মানুষ বলে মনে হয়। এছাড়াও ওটেন ছিলেন একজন অধ্যাপক, কবি, ইতিহাসবিদ ও পণ্ডিত লোক। স্মৃতিকথার পরতে পরতে তার প্রমাণ মেলে।
ভারতে আসার আগেই ভারত-বিষয়ে অ্যাডওয়ার্ড ফার্লে ওটেনের দুটো গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশিত হয়েছিল। ‘অ্যাংলো ইন্ডিয়ান লিটারেচার’ ও ‘ইউরোপিয়ান ট্র্যাভেলার্স ইন ইন্ডিয়া’। নিয়োগকর্তারা নিশ্চয় ওগুলো পড়েই তাঁকে ভারতে নিয়োগ দিয়ে থাকবেন। আর সমকালীন ভারত নিয়ে ওটেনেরও ঔৎসুক্য কম ছিল না। তাই রওয়ানা দেবার আগে বামপন্থী পার্লামেন্ট সদস্য রাদারফোর্ডকে যখন জিজ্ঞেস করেছিলেন ভারতের সমস্যাগুলো কখন সংকটে রূপ নেবে, তখন মুখের ওপর তিনি বলে দিয়েছিলেন ‘সংকট তো এখনই’। ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে সদ্য নিয়োগ-পাওয়া ওটেনের তৎকালীন ভারত-বাস্তবতা তাঁকে ভয় পাইয়ে দেয়নি। তিনি বরং অন্য সব ইংরেজের উপনিবেশকের মতো ভারতের যে-কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। ভারতবাসকালে শুধু যাত্রার সময় জাহাজে দেওয়া জনৈক কর্নেলের উপদেশটা তিনি ভুলতে পারেনি যে, ‘ভারতে কোনো পুরুষমানুষকে ভয় পেয়ো না এবং যা ঠিক তাই কোরো আর সমস্ত মহিলাদের ভয় করে চোলো, আর কিচ্ছু লিখো না!’
কলকাতায় ওটেনের প্রথম থাকার জায়গা হয় দক্ষিণ চৌরঙ্গীর মিডলটন রো-তে, একটা বোর্ড হাউসে। আর মাইনের দিক থেকে দেখতে পেলেন সরকার যে বেতন দেয় তাতে সারা মাস বিলাসবহুলভাবে খরচ করেও হাতে যথেষ্ট টাকা উদ্বৃত্ত থেকে যায়। প্রথমে ওটেন প্রয়োজন অনুভব করলেন একজন ব্যক্তিগত চাকরের, পেয়েও গেলেন তাড়াতাড়ি আর তার সঙ্গে হিন্দুস্থানিও চালতে শুরু করেন। এই সময় ওটেনের দুদিন লেগেছিল এটা জানতে যে, বাথরুমে রাখা বড়ো পাত্রটার জলের মধ্যে ডোবা চলবে না, বরং তা থেকে জল তুলে নগ্ন শরীরে ঢালতে হবে আর ঠান্ডা জলের আমোদ নিতে হবে!
ভারতে পা রেখেই ওটেনকে চমকিত করেছিল কলকাতার বাঙালিদের পোশাক, বিশেষ করে ধুতি। প্রথমদিককার ডায়েরিতে ওটেন পোশাকটি সম্পর্কে টুকেও রেখেছিলেন এমন, ‘সাধারণ বাঙালিদের মধ্যে চালু সঠিক পোশাকটি হলো পায়ের গোছ অবধি একধরনের ঢোলা ট্রাউজার, আর একটা শার্ট-কড়া-মাড়-দেওয়া, বাইরে এক লেজ মতো পরা।’ কিন্তু খেয়াল করে দেখেছিলেন ওটা ট্রাউজার নয়, ওটা একটা লম্বা সুতি কাপড়ের ফালি যেটা কোমরের চারপাশে পেঁচিয়ে পরের একটা অংশ দুপায়ের ফাঁক দিয়ে নিয়ে কোমরের পেছনে গুঁজে নিম্নাঙ্গের জন্য একটা চমৎকার খোলামেলা পোশাক বানানো। ওটেনের বিবেচনায় পোশাকটি সহজে খুলে ধুয়ে শুকিয়েও নেওয়া যায়। আর গরমের জন্য এটি একটি আদর্শ পোশাক। খোলামেলা বোতাম ছাড়া, একটা অংশ উর্ধাঙ্গেও রাখা যায়-তাতে বেশ সম্ভ্রমও আসে। অবশ্য উর্ধাঙ্গের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শার্ট থাকে। ওটেন দেখেছিলেন বাঙালি পোশাকের বেলায় খদ্দরের ব্যবহার বেশি। প্রথম দিকে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে এমন পোশাক পরলেও পরে খেয়াল করেছেন পোশাকের বেলায় হিন্দু-মুসলমানে তফাৎ ক্রমশ তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ হিন্দুরা ধুতি পরে, আর মুসলমানরা এক রকমের ট্রাউজার আর এক ধরনের কোট পরে। অবশ্য অভিজাত বাঙালিরা নিজেদের খুশিমতো পোশাক পরত আর সমান ধরনে আটকে থাকত না।
ওটেনকে প্রথম দিকে ভারতীয় ধর্ম-সংস্কৃতির একটা ব্যাপার বেশ অবাক করত। রাস্তা দিয়ে মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার বিষয়টা। মৃতের সৎকারের সময় কবর দিতে কিংবা পোড়াতে নিয়ে যেতে খাঁটিয়ায় কাঁধে বহন করে নেওয়া হতো। উদ্দেশ্য সবাই যাতে দেখতে পায়, জানতে পায়। ওটেন পাশ্চাত্যের মানুষ—ওখানে কফিন যেমন আছে, বহন করার গাড়িও আছে। কিন্তু এখানকার এই অবস্থা তার পক্ষে মেনে নেওয়া কষ্টকর ছিল।
ওটেনকে প্রথম দিকে ভারতীয় ধর্ম-সংস্কৃতির একটা ব্যাপার বেশ অবাক করত। রাস্তা দিয়ে মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার বিষয়টা। মৃতের সৎকারের সময় কবর দিতে কিংবা পোড়াতে নিয়ে যেতে খাঁটিয়ায় কাঁধে বহন করে নেওয়া হতো। উদ্দেশ্য সবাই যাতে দেখতে পায়, জানতে পায়। ওটেন পাশ্চাত্যের মানুষ—ওখানে কফিন যেমন আছে, বহন করার গাড়িও আছে। কিন্তু এখানকার এই অবস্থা তার পক্ষে মেনে নেওয়া কষ্টকর ছিল। পরে এর বাস্তবতা বুঝেওছিলেন। প্রধান কারণ ছিল দারিদ্র্য। তিনি লিখেছেন, ‘বোঝা গেল এমন একটা সম্প্রদায়ের মধ্যে আসা গেছে যারা এতটাই গরিব যে অন্যত্র যা মৃতদেহের জন্য ন্যূনতম নৈতিক দায়িত্ব বলে গণ্য হয়, সেটুকু করার সামর্থ্যও এদের ছিল না।’ এরকম আরও দারিদ্র্যের সঙ্গে পরে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন ওটেন।
নতুন দেশে তখন তো কিছু করার ছিল না তাই ওটেন শহরে ঘুরে বেড়াতেন, আর মানুষ দেখতেন। বাঙালি ফুটবলাররা কীভাবে ময়দানে বা শহরের পার্কে খালি পায়ে খেলছে তা খেয়াল করতেন। খোলোয়াড়দের দক্ষতা তাঁকে চমকিত করত। অনেক সময় বুটপরা বৃটিশ সৈন্যদের বিরুদ্ধে খেলে তাদের হারিয়ে দেওয়াও দেখেছেন। পথে পথে দরিদ্র শিশুদের যেমন দেখতেন, তেমনি সকালে হোটেলের বাইরে ফুটপাতে-শোয়া-মানুষদের মুখ ধোবার দঙ্গলও দেখতেন। ইতিহাস নিয়ে যথেষ্ট পড়াশোনা করে ওটেন ভারতে আসেন, তাই পড়া থেকে জানা অভিজ্ঞতা বাস্তবের অভিজ্ঞতাকে আরও বর্ণিল করেছিল—আরও ভালোভাবে জানার সুযোগ দিয়েছিল।
গোড়ার দিকে ওটেন নিজের পরিসর ও আনন্দের জন্য দুটো পদক্ষেপ নেন। একটি ক্যালকাটা লাইট হর্সে যোগ দেওয়া, অপরটি ফ্রিম্যাসনের কনকর্ডিয়া লজের সদস্য হওয়া। এই দুটি বিষয় তাঁকে ভারতজীবনে অনেক আনন্দ ও খ্যাতি এনে দিয়েছিল। ফ্রিম্যাসন হওয়ার পেছনে রুডিয়ার্ড কিপলিঙের একটা প্রভাবও ছিল। ভারত নিয়ে লেখা কিপলিঙের রচনায় ফ্রিম্যাসনারির অভিজ্ঞতা ওটেনকে টানত খুব, কিপলিং পড়ার সময় ভারতকে চোখের সামনে দেখতে পেতেন। যদিও লেখক ছিলেন দুর্বল একজন ফ্রিম্যাসন অনুশীলনকারী।
১৯১১ সালে বাংলার ইতিহাসে বড়ো ঘটনা ঘটে। রাজা পঞ্চম জর্জ রানি মেরি-সহ ভারত সফর করেন। এই সফর উপলক্ষ্যে ভাইসরয় আর রাজধানীকে হুট করে কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করা হয়। বাঙালির কাছে রাজতন্ত্রের একটা মহিমা তখন পর্যন্ত ছিল, আর তাই ওটেনের মতে এর ফায়দাটাও তুলে নিলেন রাজনৈতিক নেতারা। তারা বললেন রাজার ইচ্ছায় রাজধানী পরিবর্তন-সহ বাংলা ও অন্যান্য প্রদেশের সীমানার পরিবর্তন করা হচ্ছে। ওটেন এর আগে দেখতে পেয়েছিলেন রাজা ও রানি কলকাতা ছেড়ে ফিরে যাবার কালে হাজার হাজার বাঙালি ও অন্যরা ময়দানজুড়ে কীভাবে ভীড় জমিয়েছিল। রাজা ও রানি যখন চেয়ারে বসেছিলেন তাঁদের সামনে সকলে কীভাবে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেছিল! পরিবর্তনের ঘোষণাটা আসে এর পরে। বাংলার এই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রসঙ্গে একটা স্মৃতির কথা তুলে ধরেন ওটেন। সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি বাংলা ভাগের তীব্র বিরোধী ছিলেন। পুনর্গঠিত বাংলা নিয়ে সুরেন্দ্রনাথের সহোদর প্রমথনাথ ব্যানার্জি ওটেনকে বলেছিলেন একটি কথা—‘আমি দাদাকে বারবার বলেছি, বুঝিয়েছি যে উনি যদি সফল হন আর পূর্ব বাংলা ফের বাংলার সঙ্গে যুক্ত হয়, সেদিনটার জন্য পরে উনি অনুতাপ করবেন। এখন ফলাফলটা দেখুন। এক খেলায় জিতল তো আরেক খেলায় হেরে গেল। পূর্ব বাংলা জিতলেন ঠিকই কিন্তু বিহার খোয়াতে হলো, বাংলাও রাজধানী রইল না আর—জাতও গেল, বিপুল শক্তিও খোয়াল। ক্ষমতাকেন্দ্র সরে গেল উত্তর ভারতে এবং বাঙালিরাও আর কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রভাবিত করতে পারবে না।’ ওটেনের এ প্রসঙ্গে মন্তব্য হচ্ছে পরে সত্যি ভারতকে পাকিস্তানের কাছে পূর্ববাংলা খোয়াতে হয়েছিল, আর পশ্চিম বাংলা কেবল আগেকার একখণ্ড ভগ্ন ছায়ামাত্র হয়ে থাকল। অবশ্য ওটেনের সন্দেহ রয়ে গিয়েছিল যে সুরেন্দ্রনাথ নিজের জয়ের শেষ পরিণতি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন কি না!
তখনকার ধর্মীয় সংস্কৃতির ব্যাপারে ওটেনের বেশ আগ্রহ ছিল। তিনি বিভিন্ন ধর্মের উপাসনালয় ঘুরে বেড়াতেন। ইউরোপীয় কোনো অতিথিকে কলকাতার অন্যতম দর্শনীয় মন্দির দেখানোটা একটা ‘ব্যাপার’ ছিল—কালীঘাটের কালী মন্দির। পুরোহিতরা খুশি মনে গর্ভগৃহ দেখতে দিতেন, যেখানে আধো অন্ধকারে কালীর মূর্তি বসানো। পুজোয় বলি হবার জন্য নিয়ে আসা পাঠা বলি দেখাতে পেরে তারা তৃপ্তি পেতেন। বলি দেওয়া হতো একটা বড়ো দা অথবা কুড়ালের এক কোপে। ওটেন বিভিন্ন বৌদ্ধ মন্দিরেও গিয়ে দেখেছেন বুদ্ধের মূর্তির পায়ের কাছে খাদ্যদ্রব্য উৎসর্গ করা। একবার এক পুরোহিতকে জিজ্ঞাসাও করেছেন, ‘খাদ্যদ্রব্য যা নিবেদন করা হয়েছে কী হয় সেগুলোর?’ জবাবে পুরাহিত জানিয়েছিলেন, ‘ওগুলো সারারাত মূর্তির সামনেই রাখা থাকে, আর সকালে যা যা না খাওয়া পড়ে থাকে তার সমুদয় আমার সম্পত্তি হয়।’
প্রেসিডেন্সি কলেজে ফার্লে ওটেনের চাকরি শুরু হয় ভারতীয় ইতিহাসের ইংরেজ অধ্যায়ের অংশ দিয়ে। বিষয়টা তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল; কেননা ওটেনের মতে ইতিহাসের এই অধ্যায় সবচেয়ে কূট ও বিতর্কিত অনেকের কাছে। ওয়ারেন হেস্টিংস, ফিলিপ ফ্রান্সিস, নন্দ কুমার, চৈত সিং, ইম্পে কিংবা আরও অনেকের কীর্তিকলাপে ইংরেজদের বিশ্বাসঘাতক ভাবার সুযোগ ছিল। তখনকার সময়ে ছাত্রদের ওটেন খুব নিরীহ ও বাধ্য বলে অভিহিত করে জানান যে ক্লাসে তিনি যা-ই পড়ান না কেন ওরা ভিন্নমত পোষণ করত না।
প্রেসিডেন্সিকে ওটেন ভারতের সেরা একটি কলেজ হিসেবে উল্লেখ করেন। অনেকে এটাকে ভারতের ‘বেল্লিও’ বলে অভিহিত করতেন। বেল্লিও অক্সফোর্ডের প্রাচীন কলেজগুলোর একটি ছিল। প্রেসিডেন্সিতে যেমন ভারতের সেরা ছাত্ররা পড়ত, শিক্ষকরাও ছিলেন সবাই নামকরা। এখানকার শিক্ষকরা ইন্ডিয়ান এডুকেশনাল সার্ভিস ও প্রভিন্সিয়াল সার্ভিস থেকে আসতেন। এডুকেশনাল সার্ভিসের শিক্ষকরা অন্যদের চেয়ে বেশি বেতন পেতেন। এঁরা প্রায় সকলে ইংরেজ ছিলেন। ওটেন তাঁর সময়ে বিশেষ সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলেন ই. পি. হ্যারিসন, স্যার জগদীশচন্দ্র বসু, স্যার পি. সি. রায়, জর্জ ল্যাংলে, এস. সি. মহলানবিশ প্রমুখকে। ল্যাংলে পরে নবপ্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন। তখনকার দিনে প্রেসিডেন্সির পড়াশোনার মান খুব উন্নত ছিল। ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে আর. এন. গিলক্রিস্ট ইংরেজি পড়াতেন। তিনি এসেছিলেন আবারডিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এক ছাত্র একবার তাঁকে ক্লাসে জিজ্ঞেস করেছিল লিখনশৈলীর জন্য কোন লেখকের লেখাকে অনুসরণ করা উচিত? গিলক্রিস্ট পরামর্শ দিয়েছিলেন গিবন, ম্যাকলি ও কার্লাইলকে। এই ছিল তখনকার প্রেসিডেন্সির মান। অবশ্য প্রেসিডেন্সিতে মুসলমানদের অংশগ্রহণ কম ছিল বলে উল্লেখ করেন ওটেন। এর কারণ হিসেবে আধুনিক শিক্ষায় মুসলমানদের পিছিয়ে পড়াকেই দায়ী করেন। মুসলমানরা তখনকার দিনে পড়াতেন ধর্মের সঙ্গে যুক্ত ফারসি, আরবি, উর্দু প্রভৃতি ভাষা।
বাংলাদেশে আধুনিকায়ন চলছে তখন বেশ জোরেশোরে। কলকাতায় সামাজিকভাবে ইংরেজি কেতায় অভ্যস্ত বাঙালি পরিবারের সঙ্গে ইংরেজদের চলাফেরার চল হয়ে হয়ে গিয়েছিল। বনেদি ঘরের হিন্দু মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেছে। সামাজিক অনুষ্ঠানে মেয়েরা ইংরেজিতে বলতে পারত। মেয়েরা একসাথে অতিথিদের সঙ্গে ডিনারেও বসত। এক্ষেত্রে ব্রাহ্মপরিবারের মেয়েরা অগ্রবর্তী ছিল। বিয়েও হতো অনেকের ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের সদস্যের সঙ্গে। একবার ব্রাহ্মসমাজের বিয়েতে নিমন্ত্রিত হয়ে ওটেন এমন একটা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন যা ছিল অভাবনীয়। বিবাহপ্রক্রিয়া চলাকালে পুরোহিত নববধূকে শর্ত দিচ্ছেন, ‘তুমি তোমার বরকে পার্থিব বা অপার্থিব কোনো বিষয়েই ছাপিয়ে যাবে না।’ এ সময়ে ওটেন ছাত্র প্রমথনাথ ব্যানার্জির সঙ্গে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জির মেয়ের বিয়ের ঘটকালিও করেন। কিন্তু বিয়েতে যাওয়ার শর্ত ছিল হিন্দু পোশাকে যেতে হবে। প্রেসিডেন্সি কলেজের একটি ঘটনা ছাড়া সবকিছুকে ওটেন পারস্পরিক সৌজন্যসম্পর্কের বলে অভিহিত করেছেন।
২.
ভারতে শিক্ষাবিভাগে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের গোড়াঅবধি ছুটি থাকত। আরেকটা মাসখানেকের ছুটি ছিল অক্টোবর-নভেম্বর নাগাদ। ওটেনের কাছে এসব ছুটি ছিল আকর্ষণীয় ও উপভোগ্য। প্রেসিডেন্সি-কালের প্রথম ছুটিতে অস্ট্রেলিয়া যাবার পথে ট্রেনে করে কলম্বো যান পূর্ব উপকূল বেয়ে। মাদ্রাজ, মাদুরাই প্রভৃতি যাবার পথে পড়েছিল আর ভারতের বিশালতা দেখে ওটেন বিস্মিত হয়েছিলেন। মাদুরাইয়ের শিবের মন্দিরের খোদাইকরা মিথুনমূর্তিটি বেশ আকর্ষণীয় ছিল। এত বছর পরেও সেই মূর্তির বর্ণনা দিতে ভোলেননি ওটেন—একটা থামের গোড়ায় একটা লোকের মূর্তি রিলিফে খোদাই করা, আর তার পুরুষাঙ্গটা গোটা স্তম্ভটা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে একেবারে ডগায় একটি স্ত্রীমূর্তির যোনীতে প্রবিষ্ট করা। এছাড়া দক্ষিণভারতে দেখতে পেয়েছিলেন দৈনন্দিন কাজকর্মে অংশগ্রহণরত নারীদের। এরা সকলেই ছিল অকপট ও প্রায়শ সুন্দর চেহারার। এদের দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। ধারণা করেছিলেন জীবনযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এসব নারী নীচুজাতের কিংবা সমাজচ্যুত।
অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণের পরে ওটেন উত্তর ভারতের বড়ো বড়ো শহর দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে মহাবিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত লক্ষ্মৌ, কানপুর, দিল্লি প্রভৃতি। প্রথমেই তিনি সিমলা যান এবং সিমলার পাহাড়ি সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন। সেখানে রাজা ও রানির সঙ্গেও দেখা করেন। সিমলাতে পাদ্রি অ্যান্ডুজের সঙ্গে দেখা হয়, যিনি পরে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে শান্তিনিকতেনে যোগ দিয়েছিলেন। দিল্লি ফেরার পথে কালকাতাও ভ্রমণ করেন। সিমলার নৈসর্গিক পরিবেশ ও মানুষের সৌখিন আবহের পর কালকাতার ময়লা জামাকাপড়-পরা মানুষ দেখে ওটেনের মন খারাপ হয়। ওই ভ্রমণবৃত্তান্ত ডায়েরির পাতায় লিখতে গিয়ে ওটেন নোট রেখেছিলেন। একটি নোট এমন ছিল—‘নিশ্চিতভাবেই ভারত একটা ধুলো-ময়লা অধ্যুষিত দেশ। কোথাও কখনও কখনও যথেষ্ট জলও থাকে না, ফলে লোকেরা একটা অজুহাত খাড়া করতে পারে। মানুষ চায়, কিন্তু নিচে আছেই তো সামান্য, কিন্তু সে-টুকুই সে সামান্য পরিচ্ছন্ন চায়। যেখানে জল পরিচ্ছন্ন পাওয়া যায়, সেখানে অবস্থাটা অনেক ভালো।’
দিল্লিতে কয়েকদিন চষে বেড়ান ওটেন। দিল্লির সেই স্মৃতিকে ওটেন তাঁর জীবনের স্মরণীয় অভিজ্ঞতা বলে উল্লেখ করেছেন। মহাবিদ্রোহের সময় দিল্লির যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল বিভিন্ন স্থাপনা দেখে মর্মাহত হয়েছিলেন এবং মহাবিদ্রোকে তিনি দুপক্ষের জন্যই ‘ধর্মযুদ্ধ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। পরের তিন সপ্তাহ ওটেন আগ্রা, লক্ষ্মৌ, ফতেহপুর সিক্রি, কানপুর, এলাহবাদ এবং পাটনা ভ্রমণ করেন। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে উত্তরভারতের এসব অঞ্চলেও বিদ্রোহের ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন ও স্মৃতি অনুসন্ধান করেছেন। হবেই না কেন? তাঁর ঝোলায় ছিল তখন কে. ও. ম্যালসনের ‘হিস্টরি অব দ্য ইন্ডিয়ান মিউটিনি অব ১৮৫৭—৫৮’। এই ভ্রমণে দেখা হাজার দৃশ্য ও ঘটনার মধ্যে একটা জিনিস ভোলেননি ওটেন—দিল্লির পাহাড়ি এলাকার স্তম্ভটির কথা, যা আলেকজান্ডারের ভারত-আক্রমণের সাক্ষ্য বহন করছে। অশোকের আমলের এই স্তম্ভটি দীর্ঘদির মীরাটে ছিল, সেখান থেকে পরে তা এখানে নিয়ে আসেন কোনো সম্রাট। স্তম্ভটি ওটেনকে খুব আলোড়িত করেছিল, এবং সেসময়ই তিনি এব্যাপারে ডায়েরির পাতায় এমন কিছু কথা লিখেছিলেন যাতে ইংরেজ জাতের সহজাত অভিমান প্রকাশিত হয়—‘অল্পদিনের মধ্যেই এই স্তম্ভ এই বিস্তীর্ণ সমভূমিতে দেখতে পাবে সমগ্র ভারত, ইংল্যান্ড তথা কানাডা অস্ট্রেলিয়া দক্ষিণ আমেরিকা নিউজিল্যান্ড এবং ভারতসম্রাট রাজা জর্জের তথা বিশ্বের রাজারা ধন্য ধন্য করছে। এথেন্স বা রোম যখন ছিল না ততখানি পুরোনো শহর দিল্লি তার ইতিহাসে মনে রাখবে, রাজাকে যোগ্য সম্মান ও স্বাগত জানাবে। যেখানে রাজা ধাওয়া, পৃত্থিরাজ এবং শাহজাহান রাজ্যশাসন করেছেন—ভারত সম্রাট প্রথম জর্জ ভগবানের মতো সেখানে আবির্ভূত হবেন এবং ঈশ্বর হিসেবেই পূজিত হবেন তার অগণিত, অসংখ্য ভক্ত প্রজার কাছে, যারা রাজকীয় মানেই ঈশ্বরের প্রতিভূ বিশ্বাস করে এবং রাজা তাদের কাছে খোদ ঈশ্বরের অবতার। চিরকালীন শহর দিল্লিতে সমস্ত ভালো ভালো ঘটনার চেয়ে এমন ভালো ঘটনা আর কিই-বা হতে পারে?’ ডায়েরির পাতার এই আশাবাদ একবছরের মাথায় বাস্তবে রূপান্তিরত হয় অর্থাৎ পরের বছরই রাজা জর্জ ফতোয়া জারি করেন, আর বহু বছর পর দিল্লি আবারও ভারতের রাজধানী হয়ে স্বীয় মর্যাদা ফিরে পায়।
স্টেশন মাস্টার উপযুক্ত সিট না পেয়ে শেষে তৃতীয় শ্রেণির একটা কামরা খালি করে ওদের ব্যবস্থা করে দেন। ট্রেন ছাড়ার পর ওটেনের ভেতরে অনুশোচনা শুরু হয় সেইসব যাত্রীর জন্য, যাদের স্টেশনের নামিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনা কখনও ভোলেননি ওটেন।
কলকাতা ফেরার পথে একটি অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে আর ওটেনের সারাজীবনের গ্লানি হিসেবে থেকে যায়। পাটনাতে রেলের সিট না-পাওয়ায় স্টেশন-মাস্টারকে কয়েকটি প্রথম শ্রেণির যাত্রীর সিটের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেন। স্টেশন মাস্টার উপযুক্ত সিট না পেয়ে শেষে তৃতীয় শ্রেণির একটা কামরা খালি করে ওদের ব্যবস্থা করে দেন। ট্রেন ছাড়ার পর ওটেনের ভেতরে অনুশোচনা শুরু হয় সেইসব যাত্রীর জন্য, যাদের স্টেশনের নামিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনা কখনও ভোলেননি ওটেন।
পরের ক-বছরের মধ্যে ওটেন রাজপুতানা, জয়পুর, আলিগড় প্রভৃতি ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে বেড়াতে গিয়েছেন। জয়পুরের চাকচিক্য তাঁকে বিস্মিত করেছিল। শহরটিকে ওটেন স্মরণাতীতকালের গোলাপী শহর নামে আখ্যায়িত করেন। দার্জিলিঙের পাহাড়ও তাঁকে খুব অভিভূত করে। বিশেষ করে ঘুমের অনুচ্চ পাহাড়ি পথ বেয়ে চলতে চলতে কুয়াশা ঢাকা হিমালয়ের রেখা দেখার দৃশ্যের তুলনা হয় না। বেনারস ও কাশ্মীর ভ্রমণের স্মৃতিও ওটেনের কাছে অম্লান ছিল। বেনারসের হিন্দু-মন্দিরগুলো অপূর্ব লেগেছে তার কাছে, আর অবশ্য কারণীয় হিন্দু আচার গঙ্গাস্নানের দৃশ্য তো ভোলার নয়। আর মনে পড়ে পাথরের সেই ষাঁড়ের মূর্তি, যার ওপরে প্রাণীটার আরামের জন্য অনবরত হাতে-টানা পাখা দুলে চলেছে!
১৯১৪ সালের জুন মাসে ওটেন বৃটেনে গিয়ে বিয়ে করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্রদের সম্পাদিত পত্রিকায় শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তাটি ছাপা হয়। সেটা নভেম্বর মাসে। ওটেন যখন ফিরে এলেন তখন ছাত্রদের মধ্যে ইংল্যান্ডের যুদ্ধের ঘোষণা নিয়ে বেশ উদ্দীপনা ও সমর্থন চলছিল। সময়টাকে ওটেন ‘স্বস্তির আবহাওয়া’ বলে উল্লেখ করেছেন। পত্রিকাতে ছাত্ররা লিখেছিল, ‘আনুগত্যের একটা ঢেউ এসে লেগেছিল সাগরপাড়ের রাজত্বে। ভারতের জনগণ ব্রিটিশের এই যুদ্ধের কারণকে যে কেবল প্রজা হবার কারণে মেনে নিয়েছে তা নয়, বাঁচা-মরার লড়াইয়ে সহযোদ্ধা হিসেবে মেনেছে, কেননা সাম্রাজ্যের অন্যান্য অংশের মতো নিজের স্বার্থেই তারা তা করছে।’
৩.
ভারত-ইতিহাসে অ্যাডওয়ার্ড ফার্লে ওটেনের পরিচিতির একটা বড়ো কারণ সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে সংঘাত। প্রেসিডেন্সি কলেজে ওটেনের সঙ্গে ছাত্রদের সংঘাতের জন্যই সুভাষচন্দ্র বসু কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হন। সেটা ১৯১৬ সালের ঘটনা। ঘটনাটির পরে ওটেনও প্রেসিডেন্সি ছেড়ে চলে যান, কিন্তু ভারত-স্মৃতিতে ঘটনাটিকে তিনি গুরুত্ব দিয়ে স্মৃতিচারণ-সহ আত্মপক্ষ সমর্থন করে ব্যাখ্যা করেন। ঘটনাটির সময়ে কলেজ-অধ্যক্ষ ছিলেন এইচ. আর. জেমস। এই ঘটনার রেশ হিসেবে মিস্টার জেমস পদত্যাগও করেছিলেন। এটাকে ওটেন জেমসের জন্য ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে উল্লেখ করেন। কারণ জেমস ছিলেন যথার্থ বিদ্বান এবং ভদ্রলোক। অনেক পাণ্ডিত্যপূর্ণ গ্রন্থ রচনা ছাড়াও তিনি একজন কবি ছিলেন। ছিলেন সত্যবাদী এবং অভ্যাসগতভাবে বড়োলাট ও অপরাপর হোমড়াচোমড়াদের অপ্রিয় সত্যও প্রকাশ করতে পারতেন যখন-তখন। এজন্য তিনি জীবনে অনেক ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছিলেন। যেমন জন-নির্দেশনা দপ্তরের নির্দেশকের পদে স্যার ইউলিয়াম হার্নেলের পর ডব্লিউ. ডব্লিউ. হার্নেলের যে নিয়োগ হয় যোগ্যতার ভিত্তিতে এইচ. আর. জেমস ছিলেন প্রকৃত দাবিদার। তাঁকে ওই পদ দেওয়া হয়নি। মিস্টার জেমস সম্পর্কে কলেজের পরবর্তী অধ্যক্ষ ডব্লিউ সি ওয়ার্ডসওয়ার্থ লিখেছিলেন, ‘সর্বোপরি কলেজ একজন প্রশাসন, একজন শিক্ষককে হারাল, যিনি বহু বছর এখানে চাকরি করেছেন এবং এই বঙ্গদেশে আরও অনেক বছর ধরেই শিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন। ওর ক্ষমতা এবং নিষ্ঠা বিরল। কলেজের জন্য এ-এক বিরাট ক্ষতি এবং এই ক্ষতি অপূরণীয়।’
এইচ. আর. জেমস প্রেসিডেন্সি কলেজে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, প্রতিটি বিষয়ের ওপর সেমিনার করা। সেমিনারগুলোতে ছাত্ররা তাদের গবেষণাপত্র পড়ত এবং তার ওপর আলোচনা হতো। ইতিহাসের সেমিনারগুলোতে সভাপতি হতেন ওটেন। এই সময়টাকে ওটেন ভারতের রাজনীতির অস্থিরতার কাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই অস্থিরতা ছাত্রসমাজকে কীভাবে প্রভাবিত করেছিল তারও উল্লেখ করে লেখেন—কলেজে একদল জাতীয়তাবাদী ছাত্র অস্থিরতা তৈরি করছিল এবং আইন না-মানার প্রবণতা তখন থেকে শুরু হয়। ছাত্ররা তখন থেকে কলেজ-প্রশাসনের বিভিন্ন উদ্যোগকে সন্দেহের চোখে দেখত। যেমন ১৯১৫ সালে মিডলসেক্স রেজিমেন্টের দশম ব্যাটালিয়নের কলেজে আগমন। ছাত্রদের কাছে ওটা মনে হয়েছিল অপ্রত্যাশিত ও আচমকা। ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এসব ছাত্রদের ওটেন ‘অবাধ্য’ ও ‘ঝামেলাবাজ’ হিসেবে উল্লেখ করেন, যাদের লক্ষ্যই ছিল রাজনৈতিক এবং সাধারণ ছাত্রদের ভুল পথে চালিত করা। অবশ্য সুভাষচন্দ্র বসুর ব্যাপারে ‘বাঙালি দেশপ্রেমিক’ উল্লেখ করে তাঁর মন্তব্য হচ্ছে, ‘আমি জানি না কলেজে ছাত্রদের মনে এই অস্থিরতা তৈরি এবং কলেজের নিয়মানুবর্তিতা না মানার প্রবণতা তৈরিতে কীভাবে অথবা অদৌ সে-ই মূলত দায়ী ছিল কি না।’
ছাত্র-আন্দোলনে ছাত্রদের তখন একটা কৌশল উল্লেখ করে ওটেন লিখেছেন পদাধিকারী ব্যক্তির কোনো না কোনো বলা শব্দ বা বাক্যকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে অন্য মানে তৈরি করা। যেটা ওটেনের বক্তৃতার ক্ষেত্রে ঘটেছিল। বক্তৃতা-অনুষ্ঠানে ওটেন আলেকজান্ডারের পর মধ্য-এশিয়ায় গ্রিকদের প্রভাবের সঙ্গে ভারতে ইংরেজিকরণ ও শিক্ষিত ইংরেজের ভূমিকার তুলনা টেনেছিলেন। কথায় কথায় তাঁর একটা মন্তব্য এমন ছিল যে গ্রিকরা পারসিয়ানদের এবং অন্য প্রজাদের ‘বারবারোই’ বলত। সেখানে ‘বারবারোই’য়ের ব্যাখ্যাও দেন—‘অগ্রিকভাষী’ লোক অর্থে। কিন্তু ওটেনের বক্তব্যকে ভুল বোঝে কিছু ছাত্র। ওটেনের কথায়, “আমি স্বপ্নেও ভাবিনি ভিন্নমত পোষণকারী ছেলেদের একাংশ এই ঐতিহাসিক বক্তব্যটাকে অভিযোগের আকারে দাঁড় করাবে যে আমি ভারতীয়দের ‘বারবারিয়ান’ অর্থাৎ ‘অসভ্য’ বলেছি। আমার আরও সতর্ক হবার দরকার ছিল।” ওটেন বেশ মর্মাহত হয়েছিলেন, আর অনুভব করেছিলেন রাজনীতির পেষাইকলে সবকিছুই পিষে যায়।
প্রেসিডেন্সি কলেজে শৃঙ্খলা ও শিক্ষার পরিবেশ বজায় থাকার জন্য কিছু নিয়ম ছিল। এর একটি হচ্ছে লেকচার চলাকালে কোনো ছাত্র বিনাকারণে করিডোরে হাঁটাচলা করতে পারবে না। ১৯১৬ সালের শুরু থেকে এই নিয়ম না মানা তুমুল হয়ে ওঠে বলে জানান ওটেন এবং এজন্য কিছু গোলযোগকারী ছাত্রের ইন্ধনকে দায়ী করেন। এ-সময়ে একদিন ক্লাসের শেষে দিকে ওটেন করিডোরে ছাত্রদের ভিড় তাঁর বক্তৃতাকে বারবার বাধাপ্রাপ্ত করলে তিনি ক্লসরুম ছেড়ে বাইরে আসেন। চলমান ছাত্রদের স্রোতে দরজার সামনেই ছিল এবং তিনি তাঁদের বাধা দেন। ছাত্রদের বাধা দিতে ওটেন দুহাত দুদিকে প্রসারিত করেন। এতে যারা পেছনে ছিল তারা এগিয়ে পড়ে আর যারা সামনে ছিল তারা পিছু হটে যায়। এতে কোনো মারামারি বা হাতাহাতি হয়নি। ওটেন শুধু চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘ফিরে যাও। তোমরা তো জানো যে ঘণ্টা না বাজা পর্যন্ত করিডোর দিয়ে হাঁটার অনুমতি নেই।’ ফলে ছাত্ররা ফিরেও যায় এবং তিনি আবার ক্লাস শুরু করেন। কিন্তু এই ঘটনা ‘ছাত্রদের গায়ে ওটেনের হাত তোলা’ আকারে প্রচার পায়। এমনকি একজন ইংরেজ হিসেবে হেনস্থার শিকার হয়েছেন ওটেন এটাও প্রচারিত হয়। যার কোনোটাই সঠিক নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই ঘটনার প্রতিবাদ হিসেবে কলেজে ধর্মঘট হয়, ছাত্ররা কয়েকদিন ক্লাসে অনুপস্থিত ছিল। তারপর ছাত্ররা ক্লাসে আসতে থাকে এবং যথারীতি পরীক্ষায় বসে।
পরে আরও দুটো ঘটনা প্রেসিডেন্সিতে ঘটে। যেগুলোকে ওটেন ‘বিচ্ছিন্ন’ বলে উল্লেখ করেন। বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও এগুলোই চূড়ান্ত বিপর্যয় ডেকে আনে। অধ্যক্ষ জেমসকে ভয়ানক ক্লেশ ও বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। প্রথমটি হচ্ছে কথায় কথায় ক্লাসে ছাত্রধর্মঘট সম্পর্কে একটা মন্তব্য করেছিলেন ওটেন। ছাত্রধর্মঘটে কলেজের সিনিয়র ছাত্রদের নির্বিকার থাকাটা। চাইলে এসব ছাত্র ধর্মঘটের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারত, আর সবার সামনে দেখার মতো দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারত। সেদিন মন খারাপ থাকার কারণে ওটেন ক্লাশটা মুলতবিও রেখেছিলেন। একইদিনে দ্বিতীয় ঘটনাটিও ঘটে। করিডোরে লাফানোর কারণে জে. ডব্লিউ. হোম একটি ছাত্রকে কান ধরে শাস্তি দিয়েছিলেন। এধরনের শাস্তিকে ওটেন ‘হঠকারী’ বলেও উল্লেখ করেছেন। যদিও হোমসের অনৈতিক দায় তাঁর ওপর চাপিয়ে দেন অনেকে। আর এই কারণেই ওটেন শেষপর্যন্ত হেনস্থার শিকার হন। কলেজের করিডোরে পেছন থেকে একদল লোক তাঁকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করে, যাদের ওটেন চিনতেনও না। ওটেন এই ঘটনায় কোনো অভিযোগ করতে রাজি হননি। দ্য লন্ডন টাইম্সে ঘটনাটি ছাপাও হয়েছিল। আর চাউর হয়েছিল ঘটনাসূত্রে অথবা যেভাবেই হোক ঘটনার সঙ্গে সুভাষচন্দ্র বসু জড়িত। ফলে শৃঙ্খলাকমিটির সামনে তলব হলো বসুর। ওটেন লিখেছেন, ‘আমার মনে হয় বোস বোর্ডের লোকদের নিয়ে খানিকটা আমোদ করেছিল। যদ্দুর মনে আছে নিজের পক্ষ সমর্থনে সে কিছু বলতে অস্বীকার করেছিল।। ফলে তাকে পরবর্তীকালে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়।’
পরে কোনো একটা অলটপকা কথায় ইংরেজ লোকটি তার মেজাজ হারান এবং তার এক ছাত্রের গায়ে হাত তোলেন। সেই বিকালে একদল ছাত্র তাকে নিগ্রহ করে। বোস সেখানে ছিলেন এবং এটা ধরে নেওয়া হয় যে ঘটনাটা তাঁর নেতৃত্বেই হয়।
কিন্তু ঘটনাগুলো বিভ্রান্তিকর ও অসত্যরূপে ছড়ায় নানা মাধ্যমে, যাতে ওটেন খুব দুঃখ পান। এর মধ্যে একটি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবনীকার হিউ টোয় তাঁর স্প্রিংগিং টাইগার বইয়ে বিষয়টিকে এভাবে সাজিয়েছেন যে, “একজন ইংরেজির শিক্ষককে হেনস্থা করার অভিযোগে ওকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। শিক্ষকটি অবিবেচক এবং অস্থিরমতি, ছাত্ররাও পালটা হামলার জন্য প্রস্তুত ছিল। অসহিষ্ণুতা বাড়ছিল। ওর মন্তব্যের বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিবাদ শুরু হলো, বোস তার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ছাত্ররা খেপে, মারমুখী হয়েছিল; যেনতেন প্রকারে এর হেস্তনেস্ত চাইছিল, ঘটনাকে ভারতীয় যুবসমাজের পরীক্ষা তথা ভারতের ভবিষ্যত নির্ধারণ হিসেবে দেখতে শুরু করেছিল। ‘ভারত এক নতুন জীবনে প্রবেশ করে’ এই সময়ে উনি (সুভাষচন্দ্র বসু) লেখেন, ‘আমরা ভাগ্যবান এই পূণ্যসময়ে আমাদের জন্ম হয়েছে, হতাশা ঝেড়ে ফেলে আমাদের সুমুখে নতুন আলোর দিকে তাকাও, অনুসরণ করো।’—ছাত্রদের মধ্যে এইরকম ভাব কঠিনের চেয়েও কঠিন। পরে কোনো একটা অলটপকা কথায় ইংরেজ লোকটি তার মেজাজ হারান এবং তার এক ছাত্রের গায়ে হাত তোলেন। সেই বিকালে একদল ছাত্র তাকে নিগ্রহ করে। বোস সেখানে ছিলেন এবং এটা ধরে নেওয়া হয় যে ঘটনাটা তাঁর নেতৃত্বেই হয়। তিনি এটা স্বীকারও করেননি, ক্ষমাও চাননি এবং ১৯১৬-র ফেব্রুয়ারি মাসে তাকে (বোসকে) বহিষ্কার করা হয়।” ওটেনের ব্যাপারে টোয়ের এই অভিযোগ নিয়ে খোদ ওটেনের বক্তব্য হচ্ছে, ‘এমন একটা অভিযোগ একজন সম্মানীয় এবং সংবেদনশীল লোককে কী পরিমাণ যন্ত্রণায় ফেলতে পারে টোয়ের সে-সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না।’
সবচেয়ে বড়ো ঘটনা ওটেনের কাছে এসব ঘটনার পরিপ্রক্ষিতে অধ্যক্ষ এইচ. আর. জেমসের বরখাস্ত। এটার জন্য ওটেন সারাজীবন অনুতপ্ত ছিলেন, যেহেতু তাঁকে কেন্দ্র করে জেমসকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। সুভাষের বহিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে কলেজ শান্ত হয়ে আসছিল আর মিস্টার জেমসও সবকিছু ঠিকঠাক করে নিয়েছিলেন। কিন্তু একজন সেনাসদস্যের নিগ্রহের গুরুতর ঘটনায় সরকার ব্যবস্থা নেবে ঠিক করল এবং তদন্তকমিটি মিস্টার জেমসের বিরুদ্ধেই প্রতিবেদন ও সুপারিশ পেশ করর। ওটেনের মতে, ‘ওরা মিস্টার জেমসকে সরাসরি জড়িয়ে না ফেলে সহজেই রিপোর্ট দিতে পারত।’ অবশ্য না দেবার পেছনের কারণও উল্লেখ করেন ওটেন যে কমিটির সদস্যদের দুজন জেমসের শুভাকাক্সক্ষা তো ছিলেনই না, বরং শত্রু ছিলেন। একজন মিস্টার হার্নেল, অপরজন স্যার আশুতোষ মুখার্জি। সুতরাং মিস্টার জেমস তৎক্ষণাৎ বরখাস্ত হলেন তাঁর পদ থেকে এবং অবসর নেবার আগের ছুটিতে পাঠানো হলো তাঁকে। ওটেনও মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে লম্বা ছুটিতে সস্ত্রীক অেিস্ট্রলিয়া চলে যান।

অ্যাডওয়ার্ড ফার্লে ওটেন (১৮৮৪—১৯৭৩)
৪.
অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে মাস দুয়েক প্রেসিডেন্সিতে কাজ করেন ওটেন। এরমধ্যে ভারতীয় সেনাদলে যোগ দেওয়ার ফরমান আসে এবং পূর্বে ট্রুপার হিসেবে অভিজ্ঞতা থাকার সুবাদে ওটেন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে ইলেভেন্থ কিং এডওয়ার্ডের নিজস্ব ঘোড়সওয়ার বাহিনীতে যোগ দেন। প্রোভিন্স হর্সের সদস্য হিসেবে পদায়ন হয় তাঁর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের ডেরা ইসমাইল রেজিমেন্টে। এই অঞ্চলে নিজের আগমনকে ওটেন বর্ণনা করেন এক নতুন পৃথিবীতে প্রবেশের মতো। সবুজে-ছাওয়া উষ্ণ বাংলার প্রকৃতির সঙ্গে সিন্ধু নদী ও সুলেমান পর্বতের ধুলোধূসরিত সমভূমির কোথাও যেন মিল নেই। তবু জায়গাটাকে ভালোলাগার নানা কারণ খুঁজে পান ওটেন।
ডেরা ইসমাইল খান অন্যতম এক সেনা ছাউনি। পেশোয়ার থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত বিভিন্ন মিলিটারি ছাউনি উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং আফগানিস্তানের মধ্যে উপজাতীয় লোকদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করত। ডেরা ইসমাইমের ভাগে পড়েছিল মাহসুদ উপজাতি। পুবের সমতলে এরা সুযোগমত হানা দিত—সম্পদ ও নারী লুট করত। সেনাদের কাজ ছিল মাঝে মাঝে এদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা। ওটেন নিজেও এরকম অভিযান পরিচালনা করেছেন। ডেরা ইসমাইলকে তিনি গ্রীষ্মকালে একটা ‘ভয়ানক অসুবিধাজনক জায়গা’ বলে অভিহিত করেন। এখান থেকে পরে বিভিন্ন পদে জলান্ধর সহ নানা স্থানে সামরিক দায়িত্ব পালন করেন ওটেন। জলান্ধরে তখন কাপুরথালার মহারাজা সপরিবারে বসবাস করতেন। একবার মহারাজের অট্টালিকায় সেনা অফিসাররা সস্ত্রীক নিমন্ত্রিত হন। সে স্মৃতি কখনও ভোলেননি ওটেন। সেখানকার মেয়েদের জুটিবেঁধে খেলা, ফরাসি বোলচাল, আদর-আপ্যায়ন ইত্যাদি। রাজার প্রসাদটা ছিল ফ্রান্সের ভার্সাইলের ছোটো সংস্করণ; বেশির ভাব ইমারত ফরাসি স্টাইলের। পোশাকবদলের শৌচাগারগুলোও বিলাসদ্রব্যে ভরা, আর সৌখিনভাবে সাজানো। ওটেন সেই সন্ধ্যায় উপভোগ করেছিলেন কাপুরথালা ও পাতিয়ালার দুই রাজার মধ্যকার বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বিশেষ করে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কে কত সৈন্য যোগান দিতে পেরেছে বিষয়ে।
জলান্ধরে দুটো অপ্রিয় কাজ করতে হয়েছে ওটেনের। একটি হচ্ছে সেনাছাউনিতে যুক্ত অসামরিক লোককে চাবুক দিয়ে প্রহার, অপরটি নীল নামের বৃটিশ সেকেন্ড লেফটেন্যান্টকে লঘু পাপে গুরুদণ্ড প্রদান। এসবের বাদে ছাউনিজীবন ওটেনের ভালোই কেটেছে। এসময়ে বেশ বেড়ানোও গেছে। বিশেষ করে কাশ্মীর ভ্রমণ। কাশ্মীরে প্রথমবারের স্মৃতির মধ্যে হাউসবোডে মাছশিকারের কথা ভোলেননি ওটেন। সে-বারে তিনি অবিবাহিত ছিলেন, কিন্তু এবারে সস্ত্রীক। যাত্রাপথের রাওয়ালপিন্ডি, উরি, বারমুলার সৌন্দর্য তাঁদের দুজনকেই গভীর আনন্দ দিয়েছিল। আর কাশ্মীরের শোভা তো বরাবর অতুলনীয়। ওখানে ওটেন গুলি করে হত্যা করেছিলেন একটি কালোরঙের ভালুক, যার চামড়া আর মাথাটা তাঁর ভারতের বৈঠকখানায় সবসময়ে শোভা পেত। এ-সময়ে সস্ত্রীক সাঁচি ভ্রমণও করেছিলেন ওটেন বৌদ্ধস্তূপ দেখার জন্য। আর সাঁচির সাগরপারের লোকালয় দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে দিনকাটানোর কথাগুলো কখনও ভুলেননি ওটেন।
ছাউনিজীবনের শেষের দিকে ভারতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে বিশেষ করে অমৃতসরের পরিস্থিতি। এসময়ে অমৃতসরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় এবং জেনারেল ডায়ার শক্তহাতে তা মোকাবেলা করেন। অমৃতসরের কাছে হলেও জলান্ধরে দাঙ্গার প্রভাব পড়েনি, তবু ছাউনির সবাইকে তখন বেশ সজাগ থাকতে হয়েছিল। অমৃতসরের ঘটনার পরে ওটেন জেনারেল ডায়ার ও নিজের ব্রিগেডের মেজর ব্রিগসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সে-সময়ে ভারতের বেশিরভাগ মানুষের মতো ওটেনও অমৃতসরের ঘটনায় এক পক্ষ নেন এবং অন্য অনেকের মতো না হয়ে জেনারেল ডায়ারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। কিন্তু হান্টার-ট্রাইবুন্যালের প্রতিবেদনের আগে ওটেন বুঝতেই পারেনি যে ডায়ার অতিরিক্ত সৈন্য ব্যবহার করেছিল এবং তার পদক্ষেপটি ছিল সৎ, যদিও তা ছিল বোকামিতে ভরা। ওটেন এ-ব্যাপারে লিখেছেন যে, ‘আমার মনে হয় আমার আমি প্রশিক্ষণ অনুযায়ী আমি ব্যাপারটার নিবিড় পর্যালোচনা করেছিলাম যে অসামরিক কর্তৃপক্ষ ঠিক কী অবস্থায় সামরিক শক্তিকে সাহায্যের জন্য ডাকতে পারে আর এভাবেই ওই ট্র্যাজেডির ওপর আমার মতামত স্থির হয়েছিল।’
১৯১৯ সালের মার্চ মাসে ওটেন সামরিক চাকরি থেকে অব্যাহতি পান এবং কলকাতায় এসে শিক্ষা বিভাগে যোগ দেন।
৫.
শিক্ষা বিভাগে যোগ দিতেই ওটেনকে নিয়োগ দেওয়া হয় হুগলি কলেজের অধ্যক্ষ পদে। হুগলি ছিল পর্তুগিজদের পুরোনো বাণিজ্যিক জায়গা যেটা পরে মুঘলরা দখল নিয়েছিল। জায়গাটার ইতিহাস প্রাচীন ও বিচিত্র বলে ওটেনের তা ভালো লেগেছিল। চনন্দনগরের ফরাসি গভর্নরের নিমন্ত্রণে যোগ দেওয়া আর হুগলী নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা ছাড়া ওখানে উল্লেখযোগ্য স্মৃতি ছিল না। বেশিদিন ছিলেনও না হুগলীতে। মাসছয়েকের মাথায় ওটেনকে বদলি করে দেওয়া হয় কলকাতায় মুসলমানি শিক্ষাক্রমের সহকারী নির্দেশক হিসেবে। ওই পদটা সৃষ্টির ব্যাপারে ওটেনের মন্তব্য হচ্ছে, ‘১৯১১ সালে সম্রাটের নানাবিধ পরিবর্তন ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ববঙ্গে মুসলমানদের অস্তিত্ব নষ্ট হবার খেসারত হিসেবে এটি তৈরি হয়েছিল।’
ওটেনের দায়িত্ব ছিল বাংলার স্কুল কলেজে পরিদর্শন করে মুসলমানদের শিক্ষার তদারকি করা। মুসলমান জনসংখ্যার আধিক্য অনুসারে বিভিন্ন স্থানে মক্তব ও মাদ্রাসা খোলা। এই শিক্ষাব্যবস্থায় মুসলমান শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়গুলো অন্তর দিয়ে অনুভব করতেন ওটেন। যেমন ধর্মীয় ভাষা হিসেবে আরবি শিখতে হতো, সাংস্কৃতিক ভাষা হিসেবে শিখতে হতো ফারসি আর মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা। মাদ্রাসা বা কলেজে পড়ার জন্য ইংরেজি বাধ্যতামূলক, আর উর্দু বা হিন্দি উত্তর ভারতের প্রচলিত সাধারণ কাজের ভাষা হিসেবেও শিখতে হতো। তাই তার পর্যবেক্ষণ ছিল যে, ‘সবার পক্ষে এতগুলো ভাষা শেখাটা অসম্ভব ছিল অথচ অনেক মাদ্রাসাই অনেকগুলো ভাষাই শেখাতে চাইত কিন্ত ফলাফলটা মোটেই সুখকর হতো না।’
তখন বাংলার পুরো শিক্ষার ব্যাপারে দপ্তর কোনোভাবে দায়বদ্ধ ছিল না। প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়ে দপ্তর জেলা পরিষদকে অনুদান দিত যাতে ওই অনুদানের সাহায্যে পরিষদ প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্বে থাকে। সেকেন্ডারি বিদ্যালয় শিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশে নির্দিষ্ট পাঠক্রম ও বিষয় পড়ানো হতো। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার মাধ্যমে সেকেন্ডারি শিক্ষা নিয়ন্ত্রণ করা হতো। দপ্তর কেবল ভালো শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে চব্বিশটা সেকেন্ডারি স্কুলকে আদর্শ স্কুল হিসেবে পরিচালনা করত। আরও অনেক স্কুলকে শুধু অনুদান দিত। তবে বাংলার একটা বিরাট অংশের স্কুল দপ্তরের ওপর নির্ভর ছিল না, তারা স্বাধীনভাবে ছাত্রবেতন ও স্থানীয় সাহায্যের ওপর চলত। এসব স্কুলের ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ কেবল পাঠক্রম ও বিষয়-নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কলেজ শিক্ষার ব্যপারেও দপ্তর অনেক কলেজ ও মাদ্রাসা পরিচালনা করত, তার বাইরে অনেক বেসরকারি কলেজ ছিল। এদের কেউ কেউ সরকারি অনুদান নিত, কেউ-বা ছাত্রবেতনের ওপর চলত। বাংলার মোট জনসংখ্যার তুলনায় বিদ্যালয় বা কলেজের সংখ্যা যে অপ্রতুল ছিল ওটেন সে-বিষয়টা বেশ গুরুত্বের সঙ্গেও উপলব্ধি করেছেন। আর ওটেন এও খেয়াল করেছেন যে যারা কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন, কলেজে স্বল্পসংখ্যক মুসলমান ছাত্র পড়াশোনা করলেও অধ্যক্ষরা হিন্দুদের জীবনযাপন সম্পর্কে জানলেও মুসলমানদের ব্যপারে অল্পই জানতেন।
সহকারী নির্দেশকের প্রথম দিকে আরেকটি কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন ওটেন। ইংল্যান্ড থেকে ফোর্ট উইলিয়ামে আগত সৈন্যদের জন্য ভারতীয় ইতিহাসের ওপর বক্তৃতার আয়োজন। এসময়ে ওটেন দুই হাজার বছর আগেকার ভারত, মধ্যযুগের ভারত, ভারতীয় মহাবিদ্রোহ-সহ আধুনিক ভারতের ওপর পাঁচটি বক্তৃতাও দেন। বক্তৃতাগুলো পরে বই আকারে প্রকাশিত হয়। ওটেন বইটি নাম রেখেছিলেন গ্লিমসেস অব ইন্ডিয়ান হিস্টরি। ওটেন-বক্তৃতাতে তাঁকে ভবিষ্যতের সমস্যার মুখোমুখিও হতে হয়েছিল। যেমন ‘ইংল্যান্ডস ইন্ডিয়ান পলিসি’ বক্তৃতায় মন্টেগু চেমসফোর্ডের রিপোর্টের কথাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন ‘ইংল্যান্ড ভারতে তার কাজকর্মে গর্বিত হতে পারে। ভবিষ্যতে আরও গর্বিত হবার আরও বড়ো কারণও সে পেতে পারে। যেসব কাজকর্ম ইতিমধ্যেই করা হয়েছে তাতে ভারতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে; তার মানুষদের সহায়তায় আমরা তার এমন সরকার চাই এবং বর্তমান চালু ব্যবস্থার এমন এমন পরিবর্তন আনতে চাই যাতে আমাদের ভবিষ্যতের দিন সুগম হয় ও ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণ হয়… এই বিশ্বাসে সামনের দিকে এগিয়ে চলা যে আমাদের অভিপ্রায় সঠিক এবং সবাই মিলে তাকে ভারতের জাতি নির্বিশেষে সকলের জন্য আরও মঙ্গলজনক করে তোলা।’ নিজের বক্তৃতাটা শেষ করেছিলেন এই বলে যে, ‘ইতিহাসের পাতা থেকে পাওয়া শিক্ষা, যেসব আদর্শ আমরা ধারণ করি, আমরা তার প্রতিপালন করতে বাধ্য, যেমন আকবর, এমন উচ্চতা—আকবরের মতো এমন অসামান্য রাজনৈতিক উচ্চতা এবং গভীর অধ্যাত্মবোধ আমরা কল্পনা করতে পারি না। সেই কাজটাই আমরা করছি, আমরা খুঁজে চলেছি এমনকিছু ভারতকে দেবার, একটা নতুন কোনো ধর্ম নয়, একটা নতুন রাজনৈতিক বিশ্বাস, যার বুকে তার মহান দেশপ্রেমিকরা নিশ্চিন্তে আশ্রয় পেতে পারবে; আমরা আমাদের দায়িত্ব বা নিয়তি কিছুই এড়িয়ে যেতে পারি না, তা সত্ত্বেও, আমাদের কাজকর্মগুলো যুক্তিপূর্ণ সমাপ্তির দিকেই বহন করে নিয়ে যেতে হবে; এবং তাই, যদিও কেউ কেউ ভয় পাবেন যে আমাদের নিয়তি এটা দেখা যে আমাদের সমস্ত শুভ কাজের একটা একটা করে ইমারতের ইট খসে খসে যাচ্ছে, আর হতাশাজনক পতনের ইতিহাসের আবার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, আমাদের সকলের প্রচেষ্টা থাকা দরকার এবং বিশ্বাস ও আশা থাকা দরকার যে মহান ভারতের হৃদয় নিজেকে দৃঢ় প্রমাণ করবেই। আর কোনো না কোনোভাবে, যদিও অস্বচ্ছতা, বিপদ এবং সমস্যা জর্জরিত হয়ে থাকায় এখনই সেই পথ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না, আমাদের সংকল্প, মহান এবং সর্বোত্তম হয়ে থাকবে ইতিহাসের পাতায় এবং দৃঢ় পদক্ষেপে সোজা এগিয়ে যাবে তার নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে।’ বক্তৃতাতে ওটেন সৈনিকদের ১৯১৭ সালের ২০ আগস্টের ঘোষণার তাৎপর্য বোঝাতে চেয়েছিলেন। ঘোষণায় আশ্বাস দেওয়া হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অখণ্ড অংশ হিসেবে দায়িত্বশীল সরকার গঠন। ওটেন সৈনিকদের স্পষ্ট করে দিতে চেয়েছিলেন যে তখন থেকে এটা খুব পরিষ্কার হয়ে গেছে, এখানে যে প্রক্রিয়ার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে তা লাগু হওয়ায় ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ ধাপে ধাপে উঠিয়ে নেবার যে প্রক্রিয়া, তা শুরু হয়ে গেছে, যা মুনরো একশো বছর আগেই বলে গিয়েছিলেন। সুতরাং এ-অবস্থায় ভারতে ব্রিটিশ সৈন্যদলের কর্তব্যটা অনুধাবন করা প্রয়োজন। ওটেন শেষমেশ পরিষ্কার করে বলেন যে আগামী বহু বছর ধরে সৈন্যবাহিনীর বহু কিছু করবার আছে। বক্তৃতার অনেক বছর পরে, স্মৃতিকথা লেখার সময়ে ওটেন তাঁর কথার সত্যতাও খুঁজে পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
একজন উপনিবেশবাদী লেখক বা প্রশাসন হিসেবে রুডিয়ার্ড কিপলিং যেমন স্বপ্ন দেখতেন, ওটেনও ভারত প্রশ্নে ‘দারুণ-সব স্বপ্নে’র কথাও লেখেন। বাস্তবে যে-স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। ওটেনের কথায় ‘১৯২০ সালে, স্বাধীনতার সাতাশ বছর আগে দুপক্ষই যদি আন্দাজ করতে পারত যে, মুসলমান ও হিন্দুদের আলাদা ভূখণ্ডের স্বপ্নপূরণ হবার কুড়ি বছরের মধ্যেই দুজনেই কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধে নামবে, তাহলে উপনবেশকদের স্বপ্নটাও কম সংস্কারহীন হতো আর ভারতের লোকদের আকাক্সক্ষাও একটু কম হত। যদি জানত যে নতুন ভারতের সীমান্তের অনেকটা অংশ চীনারা ছিঁড়ে নেবে, যদি জানত যে ভারতের ইঁদুর বাঁদর মারার অনিচ্ছা এবং তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলা জনসংখ্যা তাকে ক্রমাগত নিজের লোকদের খাওয়ানোতেই অপারগ করে তুলবে, যদি জানত যে নতুন পাকিস্তান ক্রমাগত ভারতের শত্রু চীনদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলবে আর হিন্দিকে জাতীয় ভাষা বানানোর জন্য ভারতের জোরাজুরি দক্ষিণের রাজ্যগুলিকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্নতাবাদের দিকে ঠেলে দেবে।’ কিন্তু এসব প্রসঙ্গে কিংবা এসবের পেছনে উপনিবেশকরা যে প্রধানত দায়ী এটা কোথাও উচ্চারণ করেননি ওটেন।
সহকারী নির্দেশক পদে থাকাকালে ক্লাবজীবনকে খুব উপভোগ করেছিলেন ওটেন, কিন্তু অফিসে অন্যতম বিরক্তিকর কাজের কথা কখনও ভোলেননি তিনি। সেটা হলো আইনসভার প্রশ্নে উত্তর তৈরি করা। কারণ এমনসব উদ্ভট প্রশ্ন আসত যে তার কোনো জবাবই তিনি খুজে পেতেন না। বরং এসবকে তিনি হয়রানি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একবার এরকম একটি প্রশ্ন এসেছিল যে ‘এটা কি সত্য যে অজগরের চর্বি দার্জিলিং বাজারে বিক্রি হয় ঘি বানানোর জন্য?’ অন্যদিকে অনেক সময়ে যোগ্য লোককে নির্দেশক পদে নিয়োগ করা হতো না। ওটেনের সময়ে মিস্টার ওয়ার্সওয়ার্থ অস্থায়ী নির্দেশক হিসেবে কাজ করলেও তাঁকে পরে স্থায়ী পদে নেওয়া হয়নি। ওটেনের মতে তিনি শুধু সুযোগ্য লোকই ছিলেন না, তিনি স্বাধীনভাবে ও ক্ষমতার বাইরের অনেক কাজ করতে অভ্যস্ত ছিলেন যা ছিল জনহিতকর। অথচ কর্তৃপক্ষ মনে করত এই পদে অবাধ স্বাধীনতা রয়েছে।
দ্বিতীয় দফায় দায়িত্ব নেওয়ার পর ওটেন দেখতে পেয়েছিলেন গভর্নর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য লর্ড লিটন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জির মধ্যে অনেক দূরত্ব বিদ্যমান। বিভিন্ন বিষয়ে দুজন ভিন্নমতের ছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি রীতি নিয়ে যে ঘটনাটি ঘটে তার পরিণামে শেষপর্যন্ত আশুতোষ মুখার্জি পদত্যাগও করেন। বিষয়টি ছিল যে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাধি দেবার সমাবর্তনে প্রথামাফিক, উপাচার্য উপাধি প্রদানের আগে আচার্যের অনুমতি চাইবেন। লর্ড লিটন এটাতে জোরও দিয়েছিলেন, কিন্তু উপাচার্য এটা মানতে চাননি। ওটেন লিখেছেন, ‘গর্বিত স্যার আশুতোষের কাছে এটা ছিল প্রায় মাটিতে মাথা নোয়ানোর সামিল, নিজের কাজের পরিসর ও মর্যাদা সম্পর্কে খুবই সচেতন ছিলেন উনি।’ শেষপর্যন্ত এই ঘটনায় উপাচার্য পদত্যাগ করেন এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন বিচারপতি ইওয়ার্ট গ্রিভস। পরে সমাবর্তনে উপাচার্য আচার্যের কাছে অনুমতি নিয়ে উপাধিপ্রদান ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন।
বিশের দশকের গোড়ার দিকে বাংলার সরকারের দ্বৈতশাসনব্যবস্থায় ফাটল ধরে। এই পরিপ্রেক্ষিতে জন-নির্দেশনা বিভাগের নির্দেশক ডব্লিউ. ডব্লিউ. হার্নেল বাংলাতে আর থাকতে চাচ্ছিলেন না। প্রথমত নিজের কাজগুলো বাস্তবায়নে ছিল অর্থাভাব; দ্বিতীয়ত ভারতীয় মন্ত্রীর অধীনে কাজ করা তাঁর পছন্দ ছিলনা। এছাড়া দিল্লিতে রাজধানী স্থানান্তর হয়ে গেলে বাংলা ক্রমশ পিছিয়ে পড়া গুরুত্বহীন অঞ্চলে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। হার্নেলকে তখন হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করা হয়, এবং তাঁর স্থলে নিয়োগ পান থিওডর ও. ডি. ডান। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ডব্লিউ. সি. ওয়ার্সওয়ার্থ প্রেসিডেন্সির অধ্যক্ষ পদ ও ভারতীয় শিক্ষা দপ্তরের চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন। যেহেতু যোগ্যতাক্রমে পদটি তাঁর পাওয়ার কথা ছিল। এপ্রসঙ্গে ইংরেজদের আর্থিক হিসাব-নিকাশের কথাও উল্লেখ করেছেন ওটেন যে টি. ও. ডি. ডান তাঁর পদোন্নতিতে খুব হয়েছিলেন বিশেষ করে আর্থিক সুবিধার জন্য। প্রকাশ্যে উচ্ছাসও প্রকাশ করেছিলেন যে মাসে এখন তিনি এক হাজার টাকা সঞ্চয় করতে পারবেন! ওটেনের তখন মনে পড়েছিল দশ হাজার পাউন্ডের চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া আইনসদস্য টি. বি. ম্যাকলির কথা। তিনিও যোগদান করে বলেছিলেন চার বছরে নিজের বরাত ফিরিয়ে আনবেন। যাইহোক কিছুদিনের মধ্যেই পরিদর্শন কাজে ভ্রমণ করতে গিয়ে হুগলী নদী পেরোনোর সময়ে নৌকা থেকে চেয়ারসুদ্ধ পড়ে দিয়ে টি. ও. ডি. ডানের অকাল মৃত্যু ঘটে। পরে ডানের স্থলাভিষিক্ত হন ওটেন।
জন-নির্দেশনা বিভাগের নির্দেশকের অনেক দায়-দায়িত্ব ছিল। বিশেষ করে আইনসভার সদস্য হিসেবে কাজ করা এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ও সিনেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন। এক্ষেত্রে শুরু থেকেই ওটেনের উদ্বিগ্নতা কাজ করত এই ভেবে যে প্রতিনিয়ত আশুতোষ মুখার্জির মুখোমুখি হতে হবে, আর পাবলিক একাউন্টস কমিটির কাছে জবাবদিহিতা করত হবে।
৬.
জন-নির্দেশনা বিভাগের নির্দেশকের অনেক দায়-দায়িত্ব ছিল। বিশেষ করে আইনসভার সদস্য হিসেবে কাজ করা এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ও সিনেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন। এক্ষেত্রে শুরু থেকেই ওটেনের উদ্বিগ্নতা কাজ করত এই ভেবে যে প্রতিনিয়ত আশুতোষ মুখার্জির মুখোমুখি হতে হবে, আর পাবলিক একাউন্টস কমিটির কাছে জবাবদিহিতা করত হবে। মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে ওটেন উল্লেখ করেছেন আইন সভায় স্বাধীনতাকামী ভারতীয়দের সামনের বক্তৃতা করা এবং পত্রিকাগুলোর সম্পাদকীয়তে শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে নানাবিধ বিরূপ সমালোচনা মোকাবেলা। আইন সভার অধিবেশনগুলোকে ওটেন পানসে সমালোচনামূলক, কৌতুকের লেশমাত্রহীন এবং মূলত দ্বৈতশাসনব্যবস্থাকে অকেজো করার ফিকির বলে মনে করতেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ও সিনেট মিটিঙে সর্বদা সচেতন থাকতেন যেন আশুতোষ ভট্টাচার্যের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে না যান। উপাচার্য পদ থেকে পদত্যাগের পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া হতো। স্যার আশুতোষ মুখার্জির ব্যাপারে ওটেনের মন্তব্য হচ্ছে, ‘উনি একজন বিশাল মাপের মানুষ ছিলেন, একটু উদ্ধত যেটা কখনও কখনও মহত্বের সঙ্গে ওতপ্রোত হয়েই থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য, বিশেষত স্নাতকোত্তর স্তরের শিক্ষার জন্য ওর বহু অবদান রয়েছে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আচার্যের বক্তৃতা লেখার দায়িত্ব যখন লর্ড লিটন ওটেনকে দিলেন, তখনও তিনি আচার্যের মুখে তুলে দিলেন এমনসব আবেগময় বাক্য যাতে আশুতোষের মৃত্যুর পরও দুজনের সম্পর্কে একটা মর্যাদাপূর্ণ ভারসাম্য বজায় থাকে। ওটেন লিখে দিয়েছিলেন, ‘শেষাবধি, ওঁর স্মৃতিতে আসুন আমরা একটা বিদ্যার মন্দির গড়ে তুলি আর সেই মন্দিরের ভিত এতটাই সুদৃঢ় হোক যে এই মহান বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য স্যার আশুতোষের করে যাওয়া সমস্ত কাজ যেন কখনোই নিশ্চিহ্ন করে ফেলে দেওয়া না যায়।’ মনপ্রাণ উজাড় করে লেখা বক্তৃতার পুরস্কার হিসেবে ওটেন আঁচ করতে পেরেছিলেন লর্ড লিটন ভারত ছাড়ার আগে ‘সিআইই’ হিসেবে তাঁর নামটি সুপারিশ করবেন, কিন্তু তার আগেই ওটেন তড়িঘড়ি করে ভারত ত্যাগ করেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট হল
নির্দেশকের দায়িত্ব পালনকালে আইনসভায় প্রশ্ন উঠেছিল মহিলাদের ভোটাধিকার থাকবে কি না। দ্বৈত সংবিধানই কাউন্সিলকে প্রশ্নটির মুখে ঠেলে দিয়েছিল। এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী স্যার আবদুর রহিম ও শিক্ষসচিব জে. এইচ. লিন্ডসের সঙ্গে ওটেন আলোচনাও করেন। তিনজনই এতে সহমত পোষণ করেন যে ভারতের সমকালীন ধর্ম ও সমাজপরিস্থিতিতে মেয়েদের ভোটাধিকার সময়োপযোগী হবেনা। কারণ যেহেতু মুসলমান ও হিন্দু উভয় সমাজে পর্দপ্রথা বিরাজমান ছিল আর বেশির ভাগ মেয়েই অশিক্ষিত তাই এটা সমীচীন হবে না। ফলে ভোটের হিসেবে তাঁরা তিনজনেই সংখ্যালঘুর কাতারে পড়েছিলেন, আর পরে এজন্য সমালোচনা তাঁদের সইতে হয়েছিল। স্যার আবদুর রহিমের পর শিক্ষামন্ত্রী হন ব্যোমকেশ চক্রবর্তী। শিক্ষাসচিবের নোটের কোনো বিবেচনা না করেই তিনি ফাইলে স্বাক্ষর করতেন। তখন স্বরাজের কাল চলছিল, সরকারে বিরোধী পক্ষও ছিল ওরা। তিনি সব সময় কোণঠাসা থাকতেন। ওটেন তাঁকে ওই পদের জন্য অযোগ্য ও অক্ষম হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে স্বরাজিদের চিত্তরঞ্জন দাশের কথা কখনও ভোলেননি ওটেন। তাঁকে একজন তুখোড় বক্তা হিসেবে উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘আইনসভায় খদ্দরের পোশাক পরে তিনি যখন দাঁড়াতেন, খদ্দর মোটেই অসম্ভ্রান্ত পোশাক ছিল না যদিও, ওকে দেখতে লাগত ছোটোখাটো রোমান সেনেটরদের মতো।’ চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপ ছিল না বলে আফসোস করেছেন ওটেন। যদিও তাঁর বোন, জগদীশচন্দ্র বোসের স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।
এ সময়ে সিমলায় শিক্ষা-অধিকর্তাদের সম্মেলন হয়। সেখানে দেখা পাঞ্জাবের স্যার অ্যান্ডরসন, মাদ্রাজের লিটলহেইলস-সহ ভারতে কর্মরত শিক্ষাজগতের বিখ্যাত মানুষদের সঙ্গে। সেই সম্মেলনে ওটেন অনুভব করতে পেরেছিলেন বাংলার সমস্যাটা অন্যান্য প্রদেশ থেকে আলাদা কেন? কেননা বাংলার উচ্চবিদ্যালয়গুলো বিপুলাকারে ছড়িয়ে পড়েছিল সরকারের সাহায্য ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই। সম্মেলনের অধিকাংশ আলোচনাকে বাংলার শিক্ষাসমস্যার জন্য সামান্যই তাৎপর্যহীন বলে মনে হয় তাঁর।
লর্ড লিটনের সময়ের শেষে দিকে স্বরাজিরা শিক্ষাবাজেট ছুঁড়ে ফেলে। এই বাজেট নাকচ হওয়ায় লিটন একটি সুযোগ নেন যাতে আইনসভা ও বাংলার মানুষকে রাজনৈতিকভাবে একটা শিক্ষা দিতে পারেন। ফলাফল হলো ওটেনের মাধ্যমে সমস্ত শিক্ষকর্মীদের, শিক্ষক ও পরিদর্শক সবাইকে তিন মাসের মধ্যে বরখাস্তর নোটিশ করা হয়। এতে জ্ঞাত করা হয় যেহেতু আইনসভা কোনো অর্থ বরাদ্দ করেনি সুতরাং তিন মাস বাদে সকলের চাকরির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। চার শ লোকের সকলে ও তাদের পরিবারের হাজারো লোক কাউন্সিলের সদস্যকে অতঃপর চেপে ধরল, যাতে বাজেট ফের পেশ করা হলে তা পাশ হয়। সত্যি তিন মাস বাদে বাজেট পেশ হলো এবং দ্রুত পাশও হয়ে গেল। এ-ব্যাপারে ওটেনের মন্তব্য হচ্ছে, ‘পুরো ঘটনাটা বেশ নির্দয় ঠিকই কিন্তু রাজনীতির অআকখ শেখানোর জন্য একটি তারিফ করার মতো শিক্ষার উদাহরণ।’ লিটনের সময় দপ্তর বাংলার জন্য একটি প্রাথমিক শিক্ষার বিল আনে যার উদ্দেশ্য ছিল একেবারে নীচুতলা অবধি শিশুদের কাছে শিক্ষাবিস্তার সম্ভব হয়। এতে অবশ্য ওটেনকে বেশ বিড়ম্বনায়ও পড়তে হয়।
স্মৃতিকথায় লর্ড লিটনের যাবার প্রাক্কালের একটি অপ্রতিকর ঘটনার উল্লেখ করেন ওটেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়-কর্তৃক প্রকাশিত বইপত্র উপহার হিসেবে পেতেন গভর্নর। বইগুলো ছিল বাংলা, ইংরেজি ও সংস্কৃত ভাষার। বইগুলো নিজের সঙ্গে ইংল্যান্ডে না নিয়ে কিংবা গভর্নর হাউসের গ্রন্থাগারে না রেখে উইলকিনসন মারফত চিঠি দিয়ে ফেরত পাঠান। চিঠিতে লেখা ছিল, ‘হিজ এক্সেলেন্সি… আচার্য আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন এই বইগুলো আপনাদের কাছে ফেরত পাঠাতে। কেননা উনি মনে করেন এগুলো ওঁর চেয়ে আপনাদের বেশি কাজে আসবে।’ ওটেন চিঠির এই ভাষাকে ‘অপমানজনক’ বলে উল্লেখ করেন, এবং সিন্ডিকেটও তা মনে করে। আর এ-ব্যাপারে সিন্ডিকেটের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ চাঁছাছোলা। সিদ্ধান্ত হয় ভবিষ্যতে বিশ্বাবদ্যালয়ের কোনো প্রকাশনাই আর উপহার হিসেবে আচার্যকে দেওয়া হবে না। এ-সিদ্ধান্তে ওটেনেরও সমর্থন ছিল। যদিও এমন ব্যবহারে লর্ড লিটন কতটা দায়ী তাতে তিনি সন্দিহান ছিলেন।
লর্ড লিটনের পর বাংলার গর্ভনর হিসেবে কাজ করেন স্যার জন কার। তিনি এখানকার আইসিএস অফিসার ছিলেন। এখানকার গণ্যমান্য সকলকে তিনি চিনতেন এবং সহজভাবে মেলামেশাও করতেন। তাঁর মধ্যে সুবিচার ও করুণার একটা মিশ্রণ দেখতে পেয়েছিলেন ওটেন। তাঁর পর এলেন স্যার স্টানলি জ্যাকসন। ওটেন তাঁকেও সমাবর্তনের বক্তৃতা লিখে দিয়েছিলেন কিন্তু তা পাঠ না করে গতানুগতিক এমন কিছু বলেছিলেন যা ছিল উইলকিনসনের লেখা। পরে পত্রিকাওলারা তাঁকে চেপে ধরেছিল কিছু বেফাঁস বক্তব্যের জন্য। এর মধ্যে একটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুদান বন্ধের মতো শাসানি। ওটেনের বক্তৃতার খসড়া গ্রহণ না করার পেছনে তাঁর মন্তব্য ছিল, ‘কারণ ক্রিকেটার এবং খেলোয়াড় হিসেবে ওঁর সুনামের সুবাদে ওঁর অর্থহীন স্পর্শকাতরতা। উনি চাইতেন মানুষ যেন ওকে একজন ক্রীড়াবিদ হিসেবে ভাবতে ভুলে যায়। এ বিষয়টা আমি জেনেছিলাম আমার খসড়াটা সম্পূর্ণ বাতিল হওয়া থেকে। জ্যাকসনের প্রথম সমাবর্তন-ভাষণ হিসেবে সবচেয়ে উপযুক্ত ছিল সেটা, এবং ওতে যে সারবত্তা ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থেই মোটের ওপর যেগুলোতে জোর দেওয়া দরকার ছিল।’
শিক্ষামন্ত্রী আবুল কাসেম ফজলুল হককে ওটেন দক্ষ, বাকপটু ও ‘নীতিহীন’ বলে অভিহিত করেছেন। শুধু রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য তৃতীয় শ্রেণিপ্রাপ্ত একটা হিন্দু ছেলেকে প্রেসিডেন্সি কলেজের মতো আদর্শ বিদ্যাপীঠে ক্ষমতাবলে ভর্তি করেছিলেন। এরকম দু-একটার বিষয়ে ওটেন বিব্রতবোধ করেছিলেন। এছাড়া ফজলুল হককে বন্ধুর মতো, আবার কড়া ধাতের বলেও উল্লেখ করেছেন। তিনি কখনও সারাদিনের জন্য স্কুল-কলেজ পরিদর্শনে বের হতেন আর নির্দেশক হিসেবে ওটেনকেও সঙ্গ দিতে হতো।
বেথুন কলেজ তখন রাজনৈতিক আন্দোলনের একটা কেন্দ্র ছিল। মেয়েরা ক্লাসে অনুপস্থিত থেকেই আন্দোলনে যোগ দিত। একবার এক ধর্মঘট চলছিল, ফজলুল হক চেয়েছিলেন ধর্মঘটের দ্রুত নিষ্পত্তি হোক। কলেজের অধ্যক্ষ ক্ষেপে গিয়েছিলেন, কলেজের পরিচালনা কমিটির অপর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে শ্রীমতী রাইটের মতামত উপেক্ষা করে শর্তছাড়া ছাত্রীদের কলেজে ফিরিয়ে আনেন ওটেন। তিনি স্ত্রীশিক্ষার এই কেন্দ্রটির ব্যাপারে খুব সংবেদনশীল ছিলেন।
নতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খসড়া অনুবিধিটি যখন ওটেনের কাছে আসে খুঁটিয়ে দেখা ও মতামত প্রদানের জন্য, তখন একটা জায়গায় তাঁর চোখ আটকে যায়। “দ্য ইউনিভার্সিটি শ্যাল স্যু অ্যান্ড বি স্যুড আন্ডার দ্য নেম অ্যান্ড স্টাইল অব ‘দ্য ঢাকা ইউরিভার্সিটি”। ওটেন আগেও দেখেছেন বাঙালিরা ‘দ্য ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি’ বলে। ওটেন এটাকে ভুল বিবেচনা করতেন এবং রীতিটা ভাঙার চেষ্টা করতেন। কারণ ইংরেজি ভাষায় কেউ এমন বলে না, বরং বলে ‘অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি’ কিংবা ‘দ্য ইউনিভর্সিটি অব অক্সফোর্ড’। সুতরাং ওটেন লিখে দিলেন, ‘যদি এমন নামে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় মামলা করে বা তার বিরুদ্ধে মামলা হয় যা সাহিত্যগতভাবে অশিষ্ট তাহলে খুব শোচনীয় হবে।’ ওটেন নাম প্রস্তাব করেন ‘ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা’। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে নাম তা-ই হয়।
বাংলার নির্দেশক হিসেবে ওটেনকে ভারত সরকার রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর একটি প্রতিবেদন পেশ করতে অনুরোধ করে। ওটেন দেখেশুনে প্রতিবেদন দিতে কলকাতা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এ. এইচ. হার্লেকে সঙ্গী করেন। হার্লে যেমন জ্ঞানী তেমনি নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। তখন শান্তিনিকেতনের দায়িত্বে ছিলেন পূর্বপরিচিত অ্যান্ডুজ; রবীন্দ্রনাথ তখন শান্তিনিকেতনে ছিলেন না। ওটেনরা ক্লাসগুলো ঘুরে ঘুরে দেখলেন। সবই গাছের নিচের ছায়ায় নেওয়া হচ্ছিল। গ্রন্থাগারে ও ক্যাম্পাসে দেখতে পেলেন অনেক জ্ঞানীগুণী ইউরোপীয়দের যাদের কিছু সময়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিতে রবীন্দ্রনাথ আহ্বান করেছিলেন। এছাড়া আদর্শ গ্রাম দেখতে গিয়েছিলে তাঁরা, যেটা রবীন্দ্রনাথ বাংলার গ্রামীণ জীবনের উন্নতির জন্য আদর্শ হিসেবে স্থাপন করেছিলেন। কলকাতায় ফিরে ওটেন যথাযথ প্রতিবেদন সরকারকে পঠিয়েছিলেন।
ওটেনের ভারতজীবন সহসাই সমাপ্তির পথে এগিয়ে যায়, অনেকটা পরিকল্পনাহীনভাবে। ১৯২৮ সালের প্রথম দিকে ওটেনের স্ত্রী আর সন্তানেরা ভারত ছেড়ে ইংল্যান্ডে চলে যান। ছেলের বয়স তখন নয়, আর মেয়ের বয়স সাতের একটু বেশি। প্রতিদিনকার কর্মের শেষে একেবারে একাকী জীবন শুরু হয় এবং কলকাতার দুই ইউরোপীয় ক্লাবে সময় কাটানো শুরু হয়। স্যার প্রভাব মিত্র ও লর্ড সিনহা তখনকার তাঁর নিত্য সঙ্গী হয়েছিলেন। নানান কথা হতো তাঁদের মাঝে। বিশেষ করে ভারতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে। একদিন লর্ড সিনহাই জন স্টুয়ার্ট মিলের রিপ্রেজিন্টেটিভ গভর্নমেন্ট বই থেকে একটা অনুচ্ছেদ পড়ে শোনালেন ওটেনকে। পড়ার সময় সিনহা উত্তেজিত ছিলেন, আর ওটেনের মনে হয়েছিল স্বাধীন ও একক ভারতের সম্ভাবনার সম্পর্কে ওর অবিশ্বাসটা সোচ্চারে বলেছিল। সিনহার পাঠ করা অনুচ্ছেদটা হচ্ছে, ‘একাধিক জাতিসত্তার মিশ্রণের বিষয়টায় বাস্তবিক সবচেয়ে বড়ো বাধা হলো যখন ওই একত্রে যুক্ত থাকা জাতিসত্তারা প্রায় সমসংখ্যক এবং রাষ্ট্র ক্ষমতার কুশীলব। এসব ক্ষেত্রে প্রত্যেকে নিজের নিজের শক্তিতে আত্মবিশ্বাসী হয়ে, দিব্যি সমপরিমাণ সংগ্রাম অন্য জাতির সঙ্গে একা একাই করতে পারবে এই বিশ্বাস রাখে বলে, অন্যের সঙ্গে মিশে যেতে অনিচ্ছুক হয়।… যখন একটা দেশ এইভাবে ভাগ হয়ে একটা স্বৈরাচারী শাসকের অধীনে আসে যা ওদের সকলের কাছেই অপরিচিত অথবা শাসকটি যদি তাদের মধ্যে থেকেই উদ্ভুত হয় অথচ জাতীয়তাবাদের প্রতি সহমর্মিতার চেয়ে নিজের শক্তিবৃদ্ধিতেই তার আগ্রহ বেশি হয় কোনো জাতিকেই সে কোনো সুবিধে দেয় না আর নিজের রীতিনীতিগুলো সবার থেকে নিরপেক্ষভাবে স্থির করে থাকে, এবং কয়েক পুরুষ পরে এই অবস্থার পরিচয় প্রায়শই একটা সম্প্রীতির বাতাবরণ তৈরি করে এবং নানা জাতের লোকেরা নিজেদের একই দেশের মানুষ বলে ভাবতে থাকে; বিশেষত তারা যদি একই দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। কিন্তু যদি এই মিলনের আগেই স্বাধীন সরকারের অভিলাষ এসে পড়ে, এই ব্যাপার কার্যকরী হবার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়।’ ওটেন ‘যদি এই মিলনের আগেই স্বাধীন সরকারের অভিলাষ এসে পড়ে, এই ব্যাপার কার্যকরী হবার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়’ অংশটি দাগিয়ে রেখেছিলেন। এসব কথার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর মন্তব্য হচ্ছে—‘এটা কংগ্রেস যদি আগেবাগেই বুঝত স্বাধীনতা ১৯৪৭ সালের আগেই চলে আসত।’
মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে লর্ড সিনহা মারা যান। কিন্তু তাঁর অদ্ভুত ও আশ্চর্যভাবে বলা ভবিষ্যৎবাণী ওটেনের মনে গেঁথে গিয়েছিল। আর, মার্চ মাসের শেষের দিকে ওটেন লম্বা ছুটিতে ইংল্যান্ড যান; এটাই ছিল মূলত তাঁর স্বদেশে শেষযাত্রা। দেশে ফিরে পারিবারিক বিপর্যয়ে পড়ে তাঁকে অনিচ্ছসত্ত্বেও ভারত-ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ওটেনের কথায়, ‘পৌঁছেই আমি আবিষ্কার করলাম যে আমি এক সঙ্গীন এবং চুরমার করে দেওয়ার মতো পারিবারিক বিপর্যয়ে পড়েছি। এই বিপর্যয়ের সূত্র যেহেতু বাংলায় ছিল, আমার মনে তীব্র বিরূপতা তৈরি হয়েছিল এবং দারুণ অনিচ্ছায় আমি ভারত ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম এবং আমি আপ্রাণ চেষ্টা করলাম তাকে ভুলে যেতে। আমি আংশিক সফল হয়েছিলাম। একবার যে ভারতে থেকেছে সে কখনোই তাকে ভুলে যেতে পারবে না।’ পরে ওখানেই আবার বিয়ে করেন ওটেন এবং ব্যারিস্টারি পাশ করে আইনপেশাতে নিজেকে নিয়োগ করেন। ভারতে আর কখনও তিনি ফিরে আসেননি।
৭.
ভারতে ওটেনের কর্মজীবনের সমাপ্তি রূঢ়ভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন এবং এ-ও উল্লেখ করতে দ্বিধা করেননি যে তাতে তিনি আঘাতই পেয়েছিলেন। কারণ ভারতে তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট লোক, আর পরে হয়েছেন এমন একজন যে আসলে কেউ নন। তবে এ-ও মনে করতেন ভারতে তিনি বেশিদিন টিকতে পারতেন না। শুধু যে ভারতের পরিবর্তিত অবস্থার জন্য এমনটা ভেবেছিলেন তা নয়। শারীরিক ও মানসিকভাবে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন, আর কেবলমাত্র নতুন পরিবেশেই আবার জীবন অতিবাহিত করতে হতো তাঁকে।
কিন্তু ভারত তাঁকে দিয়েছিল প্রচুর পদ, মর্যাদা, খ্যাতি ও অর্থবিত্ত। ভারতে চাকরিগুণে ঘুরে বেড়িয়েছেন নানা দেশ, নানা শহর—দেখেছেন নানা দেশের মানুষ ও সংস্কৃতি। সামাজিকভাবে গণ্যমান্য অনেক মানুষের দেখা ও বন্ধুত্বও হয়েছে সেই সূত্রে। এর মধ্যে বেলজিয়ামের রাজা, প্রিন্স অব ওয়েলস, ভাইসরয়, গভর্নর, ভারতীয় শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক ও বক্তা, রাজা ও জমিদার, লেখক, বিজ্ঞানী যেমন জগদীশচন্দ্র বসু অন্যতম। এঁদের সংস্পর্শ তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি যেমন সমৃদ্ধ করেছে; এঁদের স্মৃতিও তাঁর চিরকালীন সম্পদ হিসেবে গণ্য করেছেন ওটেন।
আর ভারতের ব্যাপারে ওটেনের সবচেয়ে বড়ো পর্যবেক্ষণ শিক্ষাক্ষেত্রে। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে সবসময় তিনি উপলব্ধি করেছেন ক্রমাগত একটানা রাজনৈতিক অশান্তির ফলে প্রথম ক্ষতিটাই হয়েছিল প্রকৃত শিক্ষায়। তাঁর দৃষ্টিতে রাজনীতিবিদরা সুবিধামতো চললে, রাজনৈতিক কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সবসময় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধাংদেহী কার্যক্রম পরিচালিত হলে শিক্ষা খারাপ থেকে খারাপ হতে বাধ্য, আর প্রশাসনও তাতে উত্তরোত্তর অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠে। ভারতে তা-ই হয়েছে বলে ওটেনের দৃঢ় বিশ্বাস। বাংলার ক্ষেত্রে তাঁর উপলব্ধি হচ্ছে—‘সংখ্যাধিক্যই বাংলার উচ্চশিক্ষার শ্বাসরোধ করে ফেলেছিল। আর তা থেকে পরিত্রাণ পাবার উপায় সহজ ছিল না’। কিন্তু নিজে এক্ষেত্রে এটুকুতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন যে বহু ভারতীয় যুবককে গড়েপিটে দেবার কাজে নিজেকে ব্যাপৃত করতে পেরেছিলেন; পরে যারা ভারতের শিক্ষা ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। স্মৃতিকথা শেষও করেছেন এমন একজন প্রতিষ্ঠিত ছাত্রের নাম উল্লেখ করে এবং ওটেনকে লেখা তাঁর পত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে। তিনি বহু গুণে গুণান্বিত আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব প্রমথনাথ ব্যানার্জি। তাঁকে ওটেন বন্ধু বলেও সন্বোধন করেছেন। আমৃত্যু তাঁর মতো অনেকের সঙ্গে ওটেনের পত্রযোগাযোগ ছিল। চিঠির উদ্ধৃতিতে ছিল লর্ড লিনলিথগো ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ভাইসরয়ের কার্যকরী সদস্য পদে নির্বাচন করতে গিয়ে প্রমথনাথকে প্রশ্ন করেছিলেন: ‘কাকে তোমার ব্যক্তিত্ব এবং চরিত্রের গঠনকারী হিসেবে মনে করো?’ জবাবে প্রমথনাথ বলেছিলেন দুটো নাম—এইচ. আর. জেমস এবং ই. এফ. ওটেন। ওটেনের এই উদ্ধৃতি প্রমাণ করে প্রশাসক নন, শিক্ষক পরিচয়েই তিনি গর্বিত। আর যে-ভারতকে তিনি ভুলতে চেয়েছেন, চেয়েছেন ভারতও তাঁকে ভুলে থাক—আদপে তা হয়নি। ‘মাই মেমরিজ অব ইন্ডিয়া’ হচ্ছে তার বড়ো প্রমাণ।
তথ্য ও উদ্ধৃতির দায়: My memories of India by Edward Farley Oaten (1984) ও শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় অনূদিত অ্যাডওয়ার্ড ফার্লে ওটেনের ‘আমার ভারতের স্মৃতি’ (২০২৩)।

জন্ম সিলেটে, ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ডিসেম্বর। তিনি একাধারে কবি, আখ্যান-লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩৭। ‘নির্বাচিত কবিতা’ ও ‘কবিতাসংগ্রহ’ প্রকাশিত হয়েছে যথাক্রমে ২০১৭ ও ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে। সর্বশেষ প্রকাশিত কাব্য ‘আমি করচগাছ’ (২০২১), উপন্যাস ‘একটা জাদুর হাড়’ (২০২০), ভ্রমণ-আখ্যান ‘না চেরি না চন্দ্র মল্লিকা’ (২০২১) ও গবেষণা-গ্রন্থ ‘সিলেটের তাম্রশাসন : ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতি’ (২০২৪)। সম্পাদনা করেন ছোটোকাগজ ‘সুরমস’ ও গোষ্ঠী পত্রিকা ‘কথাপরম্পরা’।