
জেমস ক্যামেরন
চলচ্চিত্র জগতের ইতিহাসে জেমস ফ্রান্সিস ক্যামেরন এক বিস্ময়কর নাম। জন্ম ১৬ই আগস্ট ১৯৫৪ সালে কানাডার কাপুসকাসিং, অন্টারিওতে। প্রযুক্তি, কল্পনা ও আবেগের অপূর্ব সমন্বয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন Titanic, Avatar কিংবা The Terminator–এর মতো কালজয়ী সিনেমা। কিন্তু ক্যামেরনের কাছে সিনেমা মানে কেবল প্রযুক্তির জৌলুশ নয়; এর ভেতর লুকিয়ে থাকে গভীর মানবিকতা আর চিরন্তন প্রেমকাহিনির স্পন্দন। the-talks.com–এ প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে ক্যামেরন খোলামেলা কথা বলেছেন তাঁর সৃজনপ্রক্রিয়া, চ্যালেঞ্জ, এবং সীমাহীন সম্ভাবনার অনুসন্ধান নিয়ে। শ্রী-র পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি বাংলায় ভাষান্তর করেছেন বিধান সাহা।
প্রশ্ন: মি. ক্যামেরন, সিনেমায় আপনি যেভাবে নতুন নতুন উদ্ভাবনের সীমা ছুঁতে থাকেন, আপনাকে কী চালিত করে?
ক্যামেরন: আমার মনে হয়, ছোটোবেলা থেকেই আমি এমন কিছু করতে চেয়েছিলাম যা শিল্পীসত্ত্বার প্রকাশ ঘটাবে এবং মানুষকে বিস্মিত করবে। আমি নিজেও তেমন সিনেমা দেখতাম যা আমাকে মুগ্ধ করত—যেমন রে হ্যারি হাউসেন-এর সিনেমা বা স্ট্যানলি কুব্রিকের 2001: A Space Odyssey। আমি কখনোই এর চেয়ে কম কিছু করতে চাইনি। আমার প্রিয় কাজগুলোর মধ্যে এটা অন্যতম—কী করা সম্ভব, কিন্তু এখনও কেউ করেনি, সেটা বের করা। আমি সবসময় নতুন কিছু তৈরি করতে চেয়েছি—নতুন যন্ত্রপাতি, নতুন প্রযুক্তি।
প্রশ্ন: ছোটোবেলা থেকেই কি এসব ভাবনা ছিল?
ক্যামেরন: অবশ্যই। আমি কার্ডবোর্ডের বাক্স দিয়ে রোবট বানাতাম। সবসময় মাথায় কোনো না কোনো পাগলাটে প্রজেক্ট থাকত। যখন আমি ১০ বছর বয়সী, তখন একটা বিমান বানাতে চেয়েছিলাম। একটা মাঠে পড়ে থাকা পাতলা প্লাইউড কুড়িয়ে এনে আশপাশের ছেলেমেয়েদের সাহায্যে সেটা কেটে বিমান বানিয়েছিলাম। অবশ্য সেটা কখনো ওড়েনি, তবে আমরা গাছ থেকে ঝুলিয়ে দিয়েছিলাম! প্রযুক্তি, রোবটিক্স, অপটিক্স এসব বিষয় আমাকে বরাবরই টানত। তাই হাইস্কুলে আমি ফুটবল টিমে না থাকলেও, বিজ্ঞান ক্লাবের সভাপতি ছিলাম—যদিও ওই ক্লাবের সদস্য বলতে ছিলাম আমি, চেকোস্লোভাকিয়ার এক মেয়ে যে ইংরেজি বলত না, আর কয়েকটা ল্যাব র্যাট! (হাসি)
প্রশ্ন: দশক পেরিয়ে এসেও আপনার প্রতিটি কাজেই প্রযুক্তি ও রোবটিক্সের প্রতি সেই কিশোরের মুগ্ধতা দেখা যায়। আপনি কি মনে করেন, আপনি সেই ছেলেটার স্বপ্নই বড়ো হয়ে পূরণ করছেন?
ক্যামেরন: নিশ্চয়ই। আমি এখনও সেই বিজ্ঞানপাগল ছেলেটাই। সিনেমার প্রতি ভালোবাসা পরে এসেছে, কিন্তু আমার হৃদয়টা এক্সপ্লোরারের। যখন আমি কোনো অভিযানে বের হই, পানির নিচে রোবট চালিয়ে টাইটানিক অনুসন্ধান করি, বা আমি নিজে কোনো সাবমেরিনে করে পৃথিবীর গভীরতম জায়গায় যাই—সরাসরি যাই বা রোবট পাঠিয়ে আমার চোখের কাজ করি—সেটা একটা প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ, আর আমি সেটা ভালোবাসি। কঠিন সমস্যা সমাধান করা, কঠিন জায়গায় কাজ করার যন্ত্র বানানো—এগুলোই আমাকে আনন্দ দেয়।
প্রশ্ন: আপনার কাছে সবচেয়ে আনন্দদায়ক হয় কি, যখন এই দুটো জগত—সিনেমা আর অনুসন্ধান—একত্র হয়?
ক্যামেরন: অবশ্যই, তখন সবকিছু একসাথে মিলে যায়, ব্যাপারটা খুব তৃপ্তিদায়ক হয়। আমি সবসময় অনুভব করি আমি আমার মা-বাবার এক বাস্তব মিশ্রণ। আমার বাবা ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার, খুবই যুক্তিবাদী ও লজিক্যাল মানুষ। আর মা ছিলেন শিল্পী। আমি মনে করি সিনেমা নিখাদ শিল্প নয়, এটা একটা প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প। এখানে জটিল যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয়, এবং অনুভব প্রকাশের আগে প্রযুক্তির ওপর দক্ষতা অর্জন জরুরি। আমি প্রকৌশল ভালোবাসি, আবার গল্প বলাও ভালোবাসি। আমার মনে হয় এই দুটো জিনিস হাত ধরাধরি করে চলে। তাই যখন গভীর সমুদ্র অভিযানে যাই—নতুন যন্ত্রপাতি বানাই, আলোকায়নের যন্ত্র বানাই, ক্যামেরা বানাই—যাতে ছবি তুলে ফিরতে পারি—এটা আমার কাছে স্বাভাবিক লাগে।
প্রশ্ন: শোনার ভঙ্গিতে তো মনে হয় আপনি নিজেই নিজের একটা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির সিনেমা বানিয়ে ফেলছেন!
ক্যামেরন: ঠিক তাই! সবচেয়ে মজার ব্যাপার, আমি এই অভিযান নিয়ে সিনেমা বানিয়ে সেটার আয় দিয়েই সব খরচ দিই! আমি হলিউড সিনেমা বানাই যেন এক্সপ্লোরেশন চালিয়ে যেতে পারি। আমার কাছে এটা শুধু সিনেমা বানানোর বিষয় না—এর পেছনে আরও বড়ো একটা লক্ষ্য আছে, সেটা হলো অজানার দিকে আলো ছড়ানো এবং তথ্য সংগ্রহ করে আনা। এখানে ভালো বৈজ্ঞানিক চর্চার ব্যাপার থাকে। আমি শুধু সিনেমা বানাতে যাই না, যদিও সেটা গুরুত্বপূর্ণ—কিন্তু আমি সত্যিকারের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান করতে চাই।
প্রশ্ন: একজন অনুসন্ধানকারী হিসেবে আপনার অভিজ্ঞতা কি আপনাকে ভালো চলচ্চিত্র নির্মাতা করেছে?
ক্যামেরন: আমি মনে করি, বাস্তব পৃথিবীর অভিযানে কাজ করা আমাকে টিমওয়ার্ক সম্পর্কে অনেক শ্রদ্ধাশীল করেছে। গভীর সমুদ্র অভিযানের সবচেয়ে আনন্দের জায়গা হতে পারে এটাই যে অভিযানের শেষে আমি নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেছি। আমি দলনেতা ছিলাম, প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছি, যান চালিয়েছি—আমি আমার অংশটুকু করেছি, আর দলও আমাকে সম্মান দিয়েছে। এটাই আমি চাই। আর এটাই আমাকে ভালো পরিচালক করে তুলেছে, কারণ সিনেমাও অনেক বেশি দলগত কাজ। সিনেমা বানাতে অনেক লোক লাগে, অনেক নতুন প্রযুক্তি লাগে। আমি কখনো মনে করি না যে আমি পরিচালক বলেই সবাই আমাকে সম্মান দেবে। সিনেমার শুরুর দিকে মনে হতো এটা হায়ারার্কিক একটা কাজ, কিন্তু আসলে তেমন নয়। আপনি চাইলে এমন একটা সেট চালাতে পারেন যেখানে সবাই নিঃশব্দে আপনার কথা শুনবে, কিন্তু আমি এখন সেটা আর উপভোগ করি না।
প্রশ্ন: গল্প বলার দিক থেকে বললে, প্রযুক্তির উন্নয়ন কি সিনেমার মান উন্নত করেছে?
ক্যামেরন: সম্ভবত চূড়ান্ত প্রোডাক্টের দিক থেকে আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। কিন্তু গল্প? হয়তো না। একটা ভালো গল্প তো সবসময়ই ভালো গল্প। সেটা সাদা-কালোতেই হতে পারে, ১৯৪০ সালেও হতে পারে। কাসাব্লাঙ্কার কথা ভাবুন—ওরকম গল্প আজও হার মানায়। আমাদের অবশ্যই মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখতে হবে। আপনি চাইবেন দর্শক যেন কিছু অনুভব করে, হয়তো কাঁদেও। তাই প্রযুক্তির ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে গল্প বলাটাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে করতে হবে। দুটোই করতে হয়।
প্রশ্ন: আপনার মতে ভালো গল্প কাকে বলে?
ক্যামেরন: আমার বিশ্বাস, ভালো গল্পের মূল থাকে একটি চরিত্র বা কয়েকটি চরিত্রকে ঘিরে—যাদের সঙ্গে আমরা কোনোভাবে আত্মীয়তা অনুভব করতে পারি। তারা হয়তো একেবারেই অপরিচিত এক জগতে বাস করে, বা একেবারে অস্বাভাবিক কোনো পেশার মানুষ, কিন্তু তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক—ভালোবাসা, টানাপোড়েন, দ্বন্দ্ব—এগুলো আমাদের চেনা, হৃদয়ের খুব কাছের কিছু হতে হবে। হতে পারে সেই গল্প একজন ছেলের মেয়েকে ভালোবাসা, একজন বাবা ও ছেলের মধ্যে দূরত্ব, অথবা কোনো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভাঙার কাহিনি। জায়গা কিংবা পরিস্থিতি যত অদ্ভুতই হোক, মানুষের আবেগ এবং সম্পর্কের সত্য যেন সেখানে স্পষ্ট থাকে। আর সেই সম্পর্ককে কঠিন এক পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে—যেন দর্শক সেই টানাপোড়েন অনুভব করতে পারেন। আমি সবসময় বলি, ‘আমার সব ছবিই আসলে প্রেমের গল্প।’
প্রশ্ন: সত্যি? এমনকি Aliens-ও?
ক্যামেরন: হ্যাঁ, Aliens–এও আছে এক ধরনের মা-মেয়ের ভালোবাসার গল্প। আসল কথা হলো—ভালোবাসা যেন কোনো না কোনোভাবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, কঠিন পরীক্ষার ভেতর দিয়ে যায়। তারপর সেই সম্পর্ক যদি আবার নতুনভাবে গড়ে ওঠে, সেটা দর্শকের জন্য গভীর তৃপ্তির উৎস হয়। এমনকি যদি শেষটা হয় Titanic–এর মতো বেদনাময়—যেখানে দুই চরিত্র একে অপরের প্রতি পুরোপুরি নিবেদিত, কিন্তু ভাগ্য তাদের আলাদা করে দেয়—তবু সেই প্রেমের সত্যতা দর্শকের মনে থেকে যায়।
প্রশ্ন: আপনি তো গল্প বাছাইয়ের ব্যাপারে খুব সাবধানী। ৩০ বছরেরও বেশি ক্যারিয়ারে মাত্র ৭টা ফিচার ফিল্ম বানিয়েছেন!
ক্যামেরন: হ্যাঁ, ব্যাপারটা আসলে এমন যে আমি অনেক বিষয়, থিম, ছবি বা সেটিং নিয়ে খেলি। কিন্তু যেগুলো বারবার ফিরে আসে মাথায়, আমি বুঝি সেগুলো নিয়ে কিছু একটা বলার আছে। আমার ভেতর থেকে সেগুলো বার করতে হয়। তবে সেটা কতদিন লাগবে তা কেউ বলতে পারে না। আমি The Abyss লিখেছিলাম ১৯৬৮ সালে, হাইস্কুলে পড়ার সময়। আর সেটা সিনেমা হিসেবে বানিয়েছি ১৯৮৮ সালে। Avatar নিয়েও একই রকম ছিল। আমি যদি ২০০ বছর বাঁচতাম, তাহলে এখনও হয়তো আমার মাথায় থাকা অনেক গল্প নিয়েই কাজ করতাম।

জন্ম ১৯৮৪ সালের ২১ মার্চ বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার ভূয়াপুরে, মামাবাড়িতে। পৈতৃক নিবাস বগুড়া জেলার ধুনটে। চারুকলা বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেছেন। বর্তমানে ঢাকায় থাকেন। প্রকাশিত বই : অব্যক্ত সন্ধির দিকে [কবিতা; চৈতন্য, ২০১৫], এসো বটগাছ [না-কবিতা; চৈতন্য, ২০১৭], শ্রীদেবী অপেরা [কবিতা, তবুও প্রয়াস, কলকাতা, ২০১৯], অবিরাম বিস্মরণ [কবিতা, বৈভব, ২০২৩] এবং সম্পাদিত বই শতবর্ষে সত্যজিৎ [শ্রী, ডিসেম্বর ২০২১]। কলকাতা থেকে পেয়েছেন ‘আদম সম্মাননা-২০১৭’। সম্পাদনা করেন ওয়েবম্যাগাজিন ‘শ্রী’।