আমি কে? এই যে আমি একটা ঘরের ভেতর বসে আছি, বসে বসে লিখছি, এই ঘরটা আসলে কী? চারটা দেওয়াল আর একটা ছাদ? একটা জানালা, বারান্দার টবে ভিজে যাচ্ছে কামিনীর পাতা, ঘরভর্তি বইয়ের পাহাড়, রং, ক্যানভাস? না, এই ঘরটা হাওয়ার কবর কিংবা এটাকে আমার শরীরও বলা যায়। আর এই শরীরের ভেতর আমি একা নই, এখানে উড়ে বেড়াচ্ছে অগণিত ছায়া, অসংখ্য স্মৃতি, যারা প্রত্যেকেই একেকটা অর্থহীন দাগ।
সেই একটা অর্থহীন দাগ খুলে বলি এইবার। এই যেমন ধরুন, ইয়েমেনি বণিকের কথা। গেল শতাব্দীর নব্বই দশকের শুরুর দিকের সেই সকালের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। যদিও আমি নিশ্চিত সেই বণিক আসলে কোনো মানুষ ছিল কি না, হয়তো সে ছিল কেবল সময় অথবা এক মহাজাগতিক প্রবঞ্চনার আধার। সে রুমাল বিক্রি করত। তেরোটা রুমাল নিয়ে এসেছিল আমাদের উঠানে।
সে তেরোটা রুমাল নিয়ে এসেছিল মানে, সে আমাদের তেরোটা সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে তার কাঁধের বিশাল ঝোলায় পুরে নিয়ে এসেছিল। আমার মা তার কাছ থেকে তেরোটা রুমালই কিনে নিয়েছিল অজ্ঞাত কোনো কারণে। কী কারণ তা কখনো জানতে পারিনি।
আপনারা ভাবছেন সেই বণিক ব্যাবসা করতে এসেছিল? না, সে তেরোটা রুমাল নিয়ে এসেছিল মানে, সে আমাদের তেরোটা সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে তার কাঁধের বিশাল ঝোলায় পুরে নিয়ে এসেছিল। আমার মা তার কাছ থেকে তেরোটা রুমালই কিনে নিয়েছিল অজ্ঞাত কোনো কারণে। কী কারণ তা কখনো জানতে পারিনি। ঘরে টাকা ছিল না। মা তার নাকের সোনার নথ আমাদের গ্রামের ননী মহাজনের সোনার দোকানে বন্ধ রেখে টাকা এনেছিল। ততক্ষণে ইয়েমেনি সেই বণিক আমাদের আনারস খেতের নয়টা আনারস খেয়ে ফেলেছিল বসে বসে।
এখনো তার সেই বণিকের আনারসের রসে হলুদ একগাছি ছাগলা দাড়ি চোখে ভাসছে, চোখে সুরমা, দীর্ঘ চুল, পরনে ধবধবে শাদা জোব্বা কিন্তু খালি পা। গায়ে অদ্ভুত এক আতরের গন্ধ। সেই দিনের তিরিশ বছর পর আমি একবার দিল্লিতে গিয়ে একই আতরের ঘ্রাণ পেয়েছিলাম। মিট্টি আতর। খবর নিয়ে জেনেছিলাম এর ঘ্রাণ শুকনো মাটিতে প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার পর যে সোঁদা গন্ধ বের হয়, ঠিক তার মতো। ভারতের কনৌজ এলাকায় গঙ্গা নদীর তীরের শুকনো মাটিতে প্রথম বৃষ্টি পড়বার পর সেই মাটি সংগ্রহ নানা প্রক্রিয়ায় সেই মাটির ঘ্রাণকে বাষ্প বানিয়ে এই আতর বানানো হয়। আমি এক শিশি রাত্রিকে দেবার জন্য কিনেছিলাম সেইবার।
সেই বণিকের নাম জানি না। সে ভাঙা ভাঙা বাঙলা বলতে পারত, কিন্তু রুমালকে বলছিল, ‘শুমাল’। কী সুন্দর সুন্দর সুতার নকশা করা রুমাল তবে কেবল মুখ মোছার ছোটো রুমাল নয়, সেইসব ছিল মাথায় বাঁধার রুমাল। বাদামি আর ছাইরঙের ওপর নানা রকম ফুল লতাপাতার নকশা। কিন্তু এই রুমাল মেয়েদের নয়, ছেলেবা মাথায় বাঁধে। সেই বণিকের মাথায়ও বাঁধা ছিল একটা।
রুমালগুলির একটা ভয়ানক বৈশিষ্ট্য আছে। এর কোনো উল্টো পিঠ নেই। ঠিক যেমন আমাদের ওই অর্থে কোনো পেছনের দরজা নেই। আপনি জন্মেছেন, মানে আপনি এই অর্থহীনতার গোলকধাঁধায় আটকা পড়েছেন। বেরোনোর কোনো পথ নেই।
২
কৌশিকের চোখের মণি দুটো স্থির। সে আমার দরজায় দাঁড়িয়ে আছে হাঁ করে কিছু বলবার জন্য। তার হাতে একটা রংপেনসিল, ইনডিগো নীল। এই নীল রংটা আমার দুচোখের বিষ। এটা একটা নকল গভীরতার ভান করে, যেন এই নীল দিয়ে মহাকাশ আঁকা যায়। অথচ মহাকাশ বলে তো কিছু নেই, আকাশ, মহাকাশ সবই মূলত শূন্যতা।
কৌশিক গলা খাঁকারি দিয়ে বলে, ‘তোর কাছে না একটা আশ্চর্য অ্যারাবিক রুমাল আছে! দে তো, আমি রুমালটা ভাঁজ করে একটা গোলকধাঁধা বানাতে পারি কি না দেখি।’
আমি হাসি। একটা তিক্ত, বিকারগ্রস্ত হাসি। আলমিরা থেকে আমি রুমালটা বের করি। এটা আসলে কোনো কাপড় নয়, আপনারা ছুঁলে বুঝতে পারবেন। এটা যেন জমাট বাঁধা কুয়াশা, বিষণ্ণতা আর স্মৃতির এক অদ্ভুত বুনন।
‘শোন কৌশিক,’ আমি রুমালটা ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলি, ‘তুই কি জানিস এই রুমালের কোনো নির্দিষ্ট শুরু নেই? প্রতিটি সুতার অন্য একটি সুতার ওপর নির্ভরশীল। তুই এটা দিয়ে গোলকধাঁধা বানাবি? কী বোকা তুই! মানুষ গোলকধাঁধায় পথ হারায় না। কারণ, পথ বলে কিছু আদতে নেই।’
কৌশিক রুমালটা হাতে নেয়। ওর আঙুল ছোঁয়া মাত্র রুমালের ওপরের নকশাগুলি নড়তে শুরু করল। ও একটা ঘোরের মধ্যে বলে ওঠে, ‘বুঝলি, পিকাসো ভেবেছিল সে ফর্ম ভেঙেছে। কিন্তু সে আসলে ফর্মের নতুন কারাগার তৈরি করেছিল। আমি এমন এক রেখা খুঁজছি যা নিজেকেই অস্বীকার করে। তোর এই রুমালটা ঠিক তাই, এতে যা লেখা আছে, তা আসলে যা লেখা নেই তাকেই নির্দেশ করছে।’
আমি বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকাই, ‘দেখ ভাই, তুই যখন বলিস ‘রুমাল’, তখন তুই আসলে একটা অভাবকে বোঝাস। রোদের হাত থেকে বাঁচবার জন্য মাথা ঢাকা, ঘাম বা চোখের পানি বা অন্যকিছু মুছবার পর রুমালটা, যা ধারণ করে, সেই ঘাম, সেই পানি, সেই ক্লান্তি, তা-ই হলো আসল।
আমি বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকাই, ‘দেখ ভাই, তুই যখন বলিস ‘রুমাল’, তখন তুই আসলে একটা অভাবকে বোঝাস। রোদের হাত থেকে বাঁচবার জন্য মাথা ঢাকা, ঘাম বা চোখের পানি বা অন্যকিছু মুছবার পর রুমালটা, যা ধারণ করে, সেই ঘাম, সেই পানি, সেই ক্লান্তি, তা-ই হলো আসল। বাকিটা কিছু নয়। তুই যাকে আর্ট বলছিস, সেটা মূলত এই শূন্যতাকে ঢাকবার একটা সস্তা চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।’
কিন্তু কৌশিক আমার কথা শোনে না। সে পেনসিল দিয়ে রুমালের ওপর একটা রেখা আঁকে। সেই রেখাটা উমরাও জানের নাচের মুদ্রার মতো বেঁকে গিয়ে হঠাৎ আমার শৈশবের ইশকুলের বন্ধু জহিরের অবয়ব ধারণ করে।
আমি শিউরে উঠি। জহির? জহির কেন? জহির তো সেই কবে হারিয়ে গেছে।
সকাল দশটার রোদে স্বপ্নটা ফিকে হয়ে আসে। কৌশিক রুমালটা তার কাঁধের চটের ব্যাগে পুরে নেয়। কিন্তু তারপর যা ঘটে, তা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ বিশ্বাস করবে না। রুমালটা ব্যাগে ঢোকানোর পর কৌশিক নিজেও ওই ব্যাগের ভেতর অদৃশ্য হয়ে যায়! আমার ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকে কেবল তার দীর্ঘ ছায়ার দাগ।
আমি বুঝি, যা পড়ে আছে তা এক অন্তরহিত গোলকধাঁধা, যেখানে প্রতিটি মোড়ে মানুষ নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে, আর পরের মুহূর্তেই শূন্যতায় হারিয়ে ফেলে। আমি বিছানায় বসে ভাবি, কাল সকালে হয়তো ওই ইয়েমেনি বণিকটা আবার আসবে। সে এবার রুমাল নয়, আমার কাছে বিক্রি করতে চাইবে ইয়েমেনের কোনো আদিগন্ত মরুভূমির দীর্ঘ মরীচিকা।
৩
কৌশিক অদৃশ্য হয়ে যাবার ঠিক পরমুহূর্তে, ঘরের মেঝেতে সেই পরিত্যক্ত ছায়ার দাগ থেকে জহির বেরিয়ে আসে। কিন্তু সে সেই ইশকুলের হাফপ্যান্ট পরা লাজুক জহির নয়। তার সারা শরীরে অসংখ্য রুমাল জড়ানো, যেন সে নিজেই একটা জীবন্ত ধাঁধা, একটা চলমান ছায়ার রূপকথা।
জহির আমার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুতভাবে হাসে, ‘তুই আমাকে স্বপ্নে দেখেছিস, নাকি আমি তোর স্বপ্নে ঘাপটি মেরে বসে ছিলাম যাতে তুই জেগে উঠলে আমি তোর বাস্তবে পা রাখতে পারি?’
কে সত্য? আমি, নাকি জহির? মানুষ তো তার নিজের বাসনার গোলকধাঁধায় বন্দি। জহির ঠিক তেমনি আমার হারানো শৈশবের এক দগদগে দাগ, যা কেবল আমার অভাববোধের মধ্যেই টিকে থাকে। সে যদি থাকে, তবে আমি নেই। আর আমি থাকলে, সে কেবল একটা ছায়া।
জহির তার গায়ে জড়ানো রংবেরঙের রুমাল ভাঁজ থেকে একটা পুরোনো, ময়লা রাবার বের করে। সে রুমালের ওপর কৌশিকের আঁকা সেই উমরাও জান-টাইপ রেখাটা মুছতে শুরু করে।
‘করছিস কী তুই?’ আমি চিৎকার করে উঠি, ‘কৌশিকের আঁকা মুছে দিচ্ছিস! ও তো তার আর্ট রে!’
জহির রাবারটা ঘষতে ঘষতে নির্বিকার গলায় বলে, ‘আর্ট মানেই তো বাউন্ডারি। রেখা মানেই তো একটা বাউন্ডারি টেনে দেওয়া। আমি এই বাউন্ডারি মুছে দিচ্ছি, যেন রুমালটা আবার অন্তহীন আর শূন্য হয়ে যায়। মনে আছে ইশকুলে আমরা যখন মানচিত্র আঁকতাম? তুই বলতিস, বর্ডারগুলি আসলে সীমা নয়, ওইসব পেনসিলের ভুল।’
জহিরের হাসিতে কোনো শব্দ নেই, কেবল একটা জমাট বাঁধা শূন্যতা দোলে। সে আসলে কোনো মানুষ নয়, সে হলো আমার শৈশবের ইশকুলের রুটিন, যা এখন অর্থহীন।
জহির রুমালটা মেলে ধরে আমার চোখের সামনে। দেখি, তাতে ‘আমি’, ‘তুমি’ এই দুই শব্দ ঘিরে অর্থহীন কিছু অর্থহীন কথা লেখা, যেমন, ‘তুমি হাঁ করলে মরুভূমিকে একটা কুমির খাল কেটে সমুদ্র আনে…’ কিন্তু লেখাগুলি স্থির নেই। ‘আমি’ শব্দটি বদলে গিয়ে ‘তুমি’ হয়ে যাচ্ছে, ‘খাল’ শব্দটি বদলে গিয়ে ‘পাল’ হয়ে যাচ্ছে।
‘এই রুমালটাই তোকে বাঁচিয়ে রেখেছে!’ জহির ফিসফিস করে বলে, ‘তুই যখন লিখিস, তখন তুই আসলে স্মৃতিকে হত্যা করিস। কারণ একবার লিখে ফেললে সেটা আর তোর থাকে না, সেটা হয়ে যায় পাঠকের, একটা সর্বজনীন বেশ্যা। কৌশিক তোর কাছ থেকে রুমাল নয়, তোর নিঃসঙ্গতা নিতে এসেছিল।’
হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় জহিরের শরীরে জড়ানো রুমালগুলি উড়তে থাকে। সে ধীরে ধীরে একটা অর্থহীন শব্দগুচ্ছে পরিণত হতে থাকে। আমি হাত বাড়িয়ে তাকে ধরতে যাই, কিন্তু আমার হাত তার শরীরের ভেতর দিয়ে গলে যায়। আমি বুঝতে পারি, সে কোনো নিরেট বস্তু নয়, সে কেবল একগুচ্ছ রেখা, যাদের কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই।
৪
সকাল এগারোটা। রোদের তেজ বেড়েছে। আমার ঘরের ছাদটা ধীরে ধীরে সরে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠল এক মহাজাগতিক নীল আকাশ, সেই ইনডিগো নীল। দেখলাম, কৌশিক বসে আছে একটা অদৃশ্য ক্যানভাসের সামনে, আর জহির তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে একটা হাড়ের তৈরি স্কেল দিয়ে শূন্যতা মাপছে। তারা দুজনেই আমার জীবনের দুই ভিন্ন বলয়ের দুই মেরু, কিন্তু আজ তারা একই রুমালের সমান্তরাল ভাঁজে এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
কৌশিক আমার দিকে আঙুল তাক করে জহিরকে বলে, ‘বুঝলি জহির, এই পবিত্র গাধাটা ভাবছে ও আমাদের সৃষ্টি করছে। অথচ ও জানে না, ও নিজেই একটা দীর্ঘ রুমাল, যাকে কোনো এক অতিপ্রাকৃত সত্তা ভাঁজ করে এই বিছানায় শুইয়ে রেখেছে।’
জহির হাসে, ‘ঠিক তাই, কৌশিক। ও আমাদের নিয়ে গল্প বানাতে চায়, অথচ ও জানে না যে গল্প বলে কিছু নেই। আছে শুধু শব্দের বাগান করা। ও যখন আমার নাম ধরে ডাকে, ও আসলে ওর নিজেরই একটা হারিয়ে যাওয়া কবিতার শিরোনাম ধরে ডাকছে।’
আমি দেখি, ওরা দুজন এক বিশাল গোলকধাঁধার ভেতর বসে তাস খেলছে। তাসগুলি কোনো কাগজের নয়, সেগুলি মানুষের মুখের প্রতিচ্ছবি। তারা একেকটা তাস ফেলছেন, আর আমার জীবনের একেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিন মুছে যাচ্ছে।
আমি আর চুপ থাকতে পারি না। চিৎকার করে উঠি, ‘তোরা আমার সময় নিয়ে ছিনিমিনি খেলছিস কেন?’
কৌশিক একটা তাস ফেলতে ফেলতে নির্লিপ্ত গলায় বলে, ‘সময় তো একটা রৈখিক বিভ্রম মাত্র, ওহে অবুঝ বালক। আমরা তো আসলে তোর অস্তিত্বের ভিন্ন ভিন্ন ধরন নিয়ে খেলছি। এই যে জহির তাসটা ফেলল, এতে তোর ২০০৫ সালের ১৩ আগস্ট, শনিবারের একটা সন্ধ্যা হারিয়ে গেল। যেই সন্ধ্যায় তুই আর রাত্রি মেরিন বিচে বসেছিলি পাশাপাশি, তুই রাত্রির কোমড় জড়িয়ে ধরেছিলি আর সমুদ্রের ঢেউ তোদের দিকে ধেয়ে আসছিল বারবার, আর ফিরে যাচ্ছিল তোদের পায়ের কাছে ভেঙে পড়ে। রাত্রি তোর গালে খোঁচা খোঁচা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলছিল, ‘এর পরের বার ক্লিন শেইভড হয়ে তারপর আমাকে ডাকবে…’।
কৌশিক আবারও বলে, ‘আর এই যে আমি যে তাসটা ফেললাম, তাতে তোর আগামীকালের সকালটা চিরতরে হারিয়ে গেল।’
জহির আর কৌশিক পরস্পরের দিকে তাকাল। তারপর তারা দুজনে মিলে রুমালটার দুই প্রান্ত ধরে। তারা রুমালটা ভাঁজ করতে শুরু কর। রুমালের প্রতিটি ভাঁজে আমার ঘর ছোটো হয়ে আসতে থাকে। আলমিরা, বইপত্র, মায়ের স্মৃতি, ইশকুলের বারান্দা, সবকিছু সেই রুমালের ভেতর সেঁধিয়ে যাচ্ছে।
কৌশিক বলে, ‘দেখ জহির, ভাঁজ যত বাড়ছে, পথ তত জটিল হচ্ছে।’
শেষ ভাঁজ দেবার সঙ্গে সঙ্গে ঘরটা পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যায়। কেবল শোনা যায় একটা রুমাল ঝাড়ার শব্দ।
৫
ঘরটা যখন শূন্যতায় লীন হতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই দরজার কাঠ চিরে একটা বুনো গন্ধ তীব্র হয়ে ওঠে। ভেজা মাটি আর পুরোনো শেঁওলার গন্ধ। ঘরটা যেন মুহূর্তেই একটা প্রাচীন অরণ্যে রূপ নেয়। সেই বনের কুয়াশা চিরে সামনে এসে দাঁড়ায় মাসুদ।
মাসুদের পরনে কোনো জামা-কাপড় নেই, তার শরীরটাই যেন গাছের বাকল দিয়ে তৈরি। তার দুই হাতে দুটো সজারু। সজারু দুটোর গায়ের প্রতিটি কাঁটা রুপোলি আলোর মতো চকচক করছে।
‘রুমাল দিয়ে গোলকধাঁধা বানালে তাতে মানুষ পথ হারায়,’ মাসুদের কণ্ঠস্বর যেন মাটির তলা থেকে গাছের চারার মতো মাটি ভেদ করে উঠে আসে, ‘কিন্তু আমার এই সজারুর কাঁটা দিয়ে যদি তুই গোলকধাঁধা বানাস, তবে মানুষ পথ খুঁজে পাবে না, বরং সে নিজেই একটা পথ হয়ে যাবে।’
এই সজারুর কাঁটাগুলি আসলে একেকটা আদিম বাসনা। এগুলি যখন কোনো অক্ষরকে গাঁথবে, তখন সেই অক্ষরের রক্তক্ষরণ হবে, আর সেই রক্তই হবে আসল কবিতা।
মাসুদ তার হাতের একটি সজারু আমার টেবিলের ওপর ছেড়ে দিলো। সজারুটা খাতার শাদা পাতায় হাঁটতে শুরু করে। তার পায়ের ছাপগুলি হয়ে ওঠে যেন এক অদ্ভুত চিত্রলিপি। সজারুর কাঁটাগুলি ঝরে পড়তে শুরু করে মেঝের ওপর, যেন সেগুলি এক-একটি কলম, যা অদৃশ্য কোনো কালিতে আমার আর কৌশিকের কথাগুলি কাটাকুটি করছে।
‘কৌশিক রেখা টানে, জহির তা ঘষে ঘষে মোছে,’ মাসুদ অট্টহাসি দিয়ে ওঠে, ‘কিন্তু আমি রেখাকে গেঁথে ফেলি। এই সজারুর কাঁটাগুলি আসলে একেকটা আদিম বাসনা। এগুলি যখন কোনো অক্ষরকে গাঁথবে, তখন সেই অক্ষরের রক্তক্ষরণ হবে, আর সেই রক্তই হবে আসল কবিতা। অস্তিত্বের প্রমাণ কেবল যন্ত্রণার মাধ্যমেই পাওয়া যায়।’
কৌশিক আর জহির তখন মাসুদের সামনে এসে দাঁড়ায়। তাদের চোখে কৌতূহল নয়, আছে এক ধরনের ভয়। কারণ মাসুদ কোনো তত্ত্বকথা জানে না, সে জানে কেবল আদিম বাস্তবতা। সে জানে যে, জ্ঞান মূলত এসকেপিস্টের খাদ্য।
‘মাসুদ, তুই তো জংলি,’ কৌশিক কাঁপাকাঁপা গলায় বলে, ‘তুই কেমন করে বুঝবি এই রুমালের মর্ম?’
‘সভ্যতা তো একটা বড়ো রুমাল কৌশিক, যা দিয়ে তোরা সত্যের দগদগে ক্ষত ঢেকে রাখিস।’ মাসুদ গর্জে ওঠে, ‘আমার সজারুর কাঁটা সেই ঢাকনা ছিঁড়ে ফেলে। দেখ, তোদের রুমাল এখন কেমন শতচ্ছিন্ন!’
আমি তাকিয়ে দেখি কৌশিকের হাতের সেই রুমালটা এখন মাসুদের সজারুর কাঁটায় বিদ্ধ হয়ে ছিন্নভিন্ন। রুমালটা ছিঁড়ে যাবার পর তার ভেতর থেকে ছোটো ছোটো আলোর কণা বেরিয়ে আসছে। সেগুলি কোনো শব্দ নয়, সেগুলি হলো অনুভূতির শুদ্ধ কম্পন, যন্ত্রণার কম্পন।
মাসুদ তার দ্বিতীয় সজারুটা আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়, ‘এই নে, একে বুকের ওপর বসা। দেখবি তোর ভেতরের সব গল্প, ওই ইয়েমেনি বণিক, মা, ইশকুল, সবাই একেকটা কাঁটা হয়ে বেরিয়ে আসবে। তখন তুই আর লেখক থাকবি না, তুই নিজেই হয়ে যাবি এক বিস্তারিত বনপাহাড়ের গোলকধাঁধা।’
আমি সজারুটাকে ছুঁই। সজারুর গায়ের কাঁটা আমার আঙুলের ডগায় বিঁধতেই একটা তীব্র বিদ্যুৎশিখা আমার মস্তিষ্কের ভেতর দিয়ে চলে যায়। আমি দেখি, মাসুদ, জহির আর কৌশিক, তিনজনেই মিলে হাত ধরাধরি করে গোল হয়ে নাচছে। তাদের নাচের মাঝখানে পড়ে আছে সেই ছেঁড়া রুমাল আর তেরোটা রুমালের অদৃশ্য স্তূপ।
মাসুদ বনের গভীরে মিলিয়ে যেতে যেতে একবার পেছনে ফিরে তাকিয়ে আমাকে চিৎকার করে বলে, ‘ব-ন ক-খ-নো শে-ষ হ-য় না- রে। তু-ই শু-ধু গা-ছে-র এ-ক পা-তা থে-কে অ-ন্য পা-তা-য় হেঁ-টে গে-ছি-স।’
৬
বনের নিস্তব্ধতা চিরে একটা খুব পরিচিত গানের সুর ভেসে আসে। কোনো বাদ্যযন্ত্র নয়, মনে হয় কেউ আলতো করে গুনগুন করছে। বনের কুয়াশার পর্দা সরিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় রাত্রি।
রাত্রি, যাকে আমি কখনো পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। পরনে তার নকশা করা শাড়ি, আর হাতে একটা কাঠের পুরোনো বাক্স। সে যেন এইসব শূন্যতার এক নীরব দর্শক। রাত্রি এসে মাসুদের সজারু দুটোর মাথায় হাত রাখে। হিংস্র সজারুগুলি মুহূর্তেই পোষা ইঁদুরের মতো নুইয়ে পড়ে। ইঁদুর কি পোষ মানে? রাত্রির হাতে মানে নিশ্চয়ই।
‘তোমরা সবাই মিলে একটা গল্প বানানোর চেষ্টা করছিলে, তাই না?’ বলে রাত্রি হাসে, যে হাসিতে কোনো ব্যঙ্গ নেই, আছে এক গভীর উদাসীনতা। সে বলে, ‘অথচ তোমরা ভুলে গেছ যে গল্পের কোনো কেন্দ্র থাকে না, থাকে শুধু একজোড়া চোখ, যা সবকিছুকে দেখেও না দেখার ভান করে। এই মহাবিশ্বে কোনো অর্থ নেই, আর অর্থ খুঁজবার এই বৃথা চেষ্টাই হলো মানুষের সবচেয়ে বড়ো ট্র্যাজেডি।’
রাত্রির চোখের মণি দুটো যেন স্বচ্ছ কাচ। সেখানে তাকালে দেখা যাচ্ছে আমার শৈশবের ইশকুল, মায়ের শাড়ির পাড়ে থানকুনিপাতার নকশা আর ইয়েমেনি বণিকের দাড়িতে আনারসের রসের রং।
রাত্রি তার হাতের বাক্সটা খোলে। তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে সেই তেরোটা রুমাল, যা ইয়েমেনি বণিকের কাছ থেকে মা নাকের নথ বন্ধক রেখে কিনেছিল। কিন্তু সেগুলি আর রুমাল নেই, সেগুলি এখন একেকটা শাদা পাখির মতো উড়তে শুরু করেছে।
‘কৌশিক যে রেখা এঁকেছিল, জহির তা মুছে ফেলেছিল, আর মাসুদ তা গেঁথেছিল সজারুর কাঁটায়।’ রাত্রি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘কিন্তু আমি এই রুমালগুলিকে মুক্তি দিচ্ছি। কারণ স্মৃতিকে বেঁধে রাখলে তা পচে যায়। তাকে উড়িয়ে দিতে হয় শূন্যতার বুকে।’
রাত্রি আমার দিকে তাকায়। তার চাহনিতে এমন এক বিষণ্ণতা, যা ভাষাতীত। সে একটা রুমাল আমার কপালে ছোঁয়ায়, হিম শীতল। তারপর সেই রুমালটা দিয়ে আমার চোখ বেঁধে দেয়।
‘এখন চোখ খোলো।’ ফিসফিস করে রাত্রি বলে, ‘দেখবে তুমি সেখানেই আছ, যেখান থেকে এই পথের ধাঁধা শুরু হয়েছিল।’
৭
আমি চোখ খুলি। কিন্তু চোখ খুলবার পর দেখি আমি আর বনে নেই। আমি আমার সেই অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে ঘরের বিছানায় শুয়ে আছি। জানালার বাইরে রোদের তীব্রতা ঠিক সকাল দশটার মতো। খাতা আমার বুকের ওপর রাখা। কিন্তু একটা পরিবর্তন ঘটেছে। আমার ঘরের দরজায় আর কেউ দাঁড়িয়ে নেই। কৌশিক নেই, জহির নেই, রাত্রি নেই, কেবল মেঝের ওপর পড়ে আছে দুটো সজারুর কাঁটা। টেবিলের ওপর রাখা রুমালে দেখা যাচ্ছে কৌশিকের আঁকা রেখা, যা সাপের মতো পেঁচিয়ে নিজের ভেতরেই ঢুকে গেছে।
আমি ধীর পায়ে আয়নার দিকে এগিয়ে যাই। দেখি আয়নার ওপর বাষ্প জমে আছে। আমি হাতের তালু ঘষে আয়নাটা মুছি। দেখি, আয়নায় আমাকে দেখা যায় না, আমার বদলে দেখা যাচ্ছে, আমার ঘরের জানালার বাহিরে ডুমুরগাছটার ডালে একটা রুমাল উড়ছে, সজারুর কাঁটায় দীর্ণ সেই আরবীয় রুমাল।

- মূলত লেখেন ও আঁকেন। জন্ম : ২৪ আগস্ট ১৯৮১, চকরিয়া, কক্সবাজার, বাঙলাদেশ। পড়াশোনা : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রকলায় স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২৭টি।