১.
সূর্যের আলো যখন ড্রেসিং টেবিলের পায়ের কাছে এসে পড়ে, তুমি উঠে দাঁড়াও এবং স্যুটকেসটা আবার খুলে দেখো। নিউইয়র্কে এখন গরম, কিন্তু শীতকালে ঠান্ডা পড়তে পারে। বামন জাতের মোরগগুলো সকালভর ডেকে গেছে। এটা এমন কিছু নয়, যা তোমার মনে পড়বে। তোমাকে কাপড় পরতে হবে, মুখ ধুতে হবে, জুতোগুলো পালিশ করতে হবে। বাইরে, মাঠজুড়ে শিশির পড়ে আছে—শুভ্র; যেন খালি পাতা। কিছুক্ষণ পর রোদে তা উবে যাবে। খড় কাটার জন্য দিনটা ভালো।
মায়ের শোবার ঘরে মা জিনিসপত্র সরাচ্ছে, দরোজা খুলছে আর বন্ধ করছে। তুমি ভাবো যে, তোমার চলে যাবার পর তার দিনগুলো কেমন যাবে। তোমার একাংশ আবার এসব নিয়ে ভাবতেও চায় না। মা দরজার আড়াল থেকে কথা বলে—
‘একটা সেদ্ধ ডিম খাবে?’
‘না, মা।’
‘কিছু তো একটা নাও।’
‘পরে নিতে পারি।’
‘আমি একটা সিদ্ধ দিচ্ছি তোমার জন্য।’
নিচে, কেটলিতে পানি ঢালার শব্দ হয়, দরজার খিল সরে যায়। তুমি কুকুরগুলোর দৌড়াদৌড়ির আওয়াজ শোনো, জানালার শাটার ভাঁজ হয়ে আসার শব্দ শোনো। গ্রীষ্মে এই বাড়িটা তোমার সবসময়ই পছন্দের—রান্নাঘরের ভেতরে ঠান্ডা ভাব, পেছনের খোলা দরজা, বৃষ্টির পর ধূসর রঙের ওয়ালফ্লাওয়ারের ঘ্রাণ।
আয়নার স্ক্রুগুলোতে মরচে ধরেছে, কাচটাও ঝাপসা। তুমি নিজের দিকে তাকাও এবং এটাও জানো যে, স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় তুমি ফেল করেছ। শেষ পরীক্ষাটা ছিল ইতিহাস। আর তারিখগুলো যেন মাথা থেকে মুছে গিয়েছিল। যুদ্ধের পদ্ধতি ও রাজাদের নামগুলো গুলিয়ে ফেলেছিলে। ইংরেজিটা আরও খারাপ হয়েছিল।
বাথরুমে তুমি দাঁত ব্রাশ করো। আয়নার স্ক্রুগুলোতে মরচে ধরেছে, কাচটাও ঝাপসা। তুমি নিজের দিকে তাকাও এবং এটাও জানো যে, স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় তুমি ফেল করেছ। শেষ পরীক্ষাটা ছিল ইতিহাস। আর তারিখগুলো যেন মাথা থেকে মুছে গিয়েছিল। যুদ্ধের পদ্ধতি ও রাজাদের নামগুলো গুলিয়ে ফেলেছিলে। ইংরেজিটা আরও খারাপ হয়েছিল। নর্তক আর নাচ সংক্রান্ত লাইনটার মানে বোঝাতে তুমি চেষ্টা করেছিলে।
তুমি আবার শোবার ঘরে ফিরে গিয়ে পাসপোর্টটা বের করো। ছবিতে তোমাকে অদ্ভুত লাগে, যেন হারিয়ে যাওয়া কেউ। টিকিটে লেখা আছে, ১২টা ২৫ মিনিটে তুমি কেনেডি বিমানবন্দরে পৌঁছাবে, যা প্রায় একই সময় (টাইম জোনের কারণে), যখন তুমি এখান থেকে যাত্রা শুরু করবে। ঘরটার দিকে শেষবারের মতো তাকাও—গোলাপ ফুলের ছাপ দেওয়া হলুদ পেপারে মোড়ানো দেয়াল, উঁচু ছাদে স্লেট সরে যাওয়ার দাগ, বিছানার নিচ থেকে লেজের মতো বেরিয়ে থাকা বৈদ্যুতিক হিটারের তার। সিঁড়ির উপরের মাথায় আগে এটা একটা খোলা ঘর হিসেবে ছিল, কিন্তু ইউজিনই তার ইতি টানে। সে কাঠমিস্ত্রি ডেকে এনে পার্টিশন তোলে এবং একটা দরজা বসায়। সে যখন তোমাকে চাবিটা দিয়েছিল, তখন সেটা তোমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল—তুমি তা এখনো মনে করতে পারো।
নিচে, মা গ্যাসের চুলার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, হাঁড়ির পানি ফুটবার অপেক্ষায়। তুমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকাও। ক’দিন ধরে বৃষ্টি হয়নি, উঠোন থেকে নেমে আসা নালাটা প্রায় শুকিয়ে গেছে। পাশের মাঠ থেকে খড়ের গন্ধ ভেসে আসে। শিশির শুকিয়ে গেলেই রাড ভাইয়েরা মাঠে নেমে পড়বে—খড়ের সারিগুলো উল্টেপাল্টে দেবে, আবহাওয়া যতক্ষণ ভালো থাকবে ততক্ষণ, খড়গুলো বাঁচাতে। খড় রোল করার সময় বেলার যন্ত্রটি যেটুক ফেলে যায়, পিচফর্ক দিয়ে তারা সেটুক কুড়িয়ে নেবে। মিসেস রাড ফ্লাস্ক আর সালাদ নিয়ে বের হবে। তারা খড়ের গাঁইটে হেলান দিয়ে পেট ভরে খাবে। তাদের হাসির শব্দ রাস্তা বেয়ে উঠে আসবে, স্পষ্ট, জলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পাখির ডাকের মতো।
‘আজ আরেকটা ভালো দিন।’ কথা বলার প্রয়োজন অনুভূত হয় তোমার।
মা গলার ভেতর কোনো প্রাণীর মতো শব্দ করে। তুমি তার দিকে তাকাও। সে তার হাতের পেছনটা দিয়ে চোখ মুছে নেয়। কান্নার ব্যাপারে মা কখনো ছাড় দেয়নি।
‘ইউজিন কি উঠেছে?’—মা বলে।
‘জানি না। কোনো শব্দ পাইনি।’
‘আচ্ছা, আমিই গিয়ে ওকে তুলে দিচ্ছি।’
২.
ছয়টা বাজতে আর তেমন বাকি নেই। তুমি এক ঘন্টা পর বের হবে। সসপ্যানে পানি ফুটছে, তুমি গিয়ে আঁচটা কমিয়ে দাও। ভেতরে তিনটা ডিম একটা আরেকটার গায়ে ঠোক্কর খাচ্ছে। একটার খোসা ফেটে গেছে, সাদা অংশটা ফিতার মতো বেরিয়ে আসছে। তুমি গ্যাসটা আরও কমিয়ে দাও। নরম ডিম তোমার পছন্দ নয়।
ইউজিন সিঁড়ি বেয়ে নামে, রবিবারের ড্রেসেই। তাকে ক্লান্ত দেখায়। তবে সবসময় যেমন দেখায়, তার থেকে খুব আলাদা নয়।
‘তাহলে বোন আমার, সব গুছানো হলো?’—সে বলে।
‘হুম।’
‘টিকিট ও আর সবকিছু ঠিক আছে তো?’
‘আছে’।
মা কাপ আর প্লেট সাজিয়ে রাখে, পাউরুটির টুকরা থেকে চারভাগের একভাগ কেটে নেয়। ছুরিটা পুরোনো, কোনো কোনো জায়গা ভোতা হয়ে গেছে। তুমি রুটি খাও, চা খাও, আর ভাবো—আমেরিকানরা নাস্তায় কী খায়? ইউজিন ডিমের মাথা ভাঙে, রুটিতে মাখন লাগায়, কুকুরগুলোর সাথে ভাগ করে নেয়। কেউ কোনো কথা বলে না। ঘড়িতে ছয়টা বাজলে ইউজিন তার টুপিটা হাতে নেয়।
‘ইয়ার্ডে দু-একটা কাজ আছে,’ সে বলে। ‘বেশি সময় লাগবে না।’
‘ঠিক আছে।’
‘সময়মতো বেরোতে হবে’, মা বলে। ‘টায়ার পাংচার হলে কিন্তু মুশকিল।’
তুমি নোংরা বাসনগুলো ড্রেনিং বোর্ডে তুলে রাখ। মায়ের সঙ্গে বলার মতো তোমার যেন কিছু নেই। কথা শুরু করলে ভুল কথা বেরিয়ে আসতে পারে, আর তুমি চাচ্ছিলে না শেষটা সেভাবে হোক। তুমি ওপর তলায় যাও, কিন্তু ঘরে ঢুকতে ইচ্ছে করে না। তুমি ল্যন্ডিংয়েই দাঁড়িয়ে থাকো। রান্নাঘরে তারা কথা বলতে শুরু করে, কিন্তু কী বলে—তুমি তা শুনতে পাও না। একটা চড়ুই জানালার কার্নিশে নেমে এসে নিজের প্রতিবিম্বে ঠোকর দেয়, কাচে ঠোঁট লেগে শব্দ হয়। তুমি ওটাকেই দেখতে থাকো, যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণই, তারপর ওটা উড়ে যায়।
মা চাইত না সংসারটা বড়ো হোক। কখনো কখনো রেগে গেলে বলত—তোমাকে একটা বালতিতে ভরে ডুবিয়ে দিবে। ছোটোবেলায় তুমি কল্পনা করতে—জোর করে তোমাকে স্লেনি নদীর ধারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, একটা বালতিতে বসানো হচ্ছে, তারপর পাড় থেকে বালতিটা ছুড়ে ফেলা হচ্ছে; কিছুক্ষণ ভেসে থাকার পর সেটা ডুবে যাচ্ছে। বড়ো হতে হতে তুমি বুঝে নিয়েছিলে, ওটা শুধু কথার কথাই ছিল। পরে তুমি ভাবতে শুরু করেছিলে—এমন বলাটা খুব বাজে ব্যাপার। মানুষ কখনো কখনো বাজে কথাই বলে।
তোমার বড়ো বোনকে আয়ারল্যান্ডের সবচেয়ে ভালো বোর্ডিং স্কুলে পাঠানো হয়েছিল, আর পরবর্তীতে সে স্কুল শিক্ষিকা হয়েছিল। ইউজিনও পড়াশোনায় ভালো ছিল, কিন্তু চৌদ্দ বছরে পা দিতেই বাবা তাকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে এনে জমির কাজে লাগিয়ে দিয়েছিল। পারিবারিক ছবিগুলোতে বড়োরা বেশ সাজগোজ করা ছিল: স্যাটিনের ফিতা, শর্ট ট্রাউজার, রোদে ঝলসানো চোখ। বাকিরা এমনিতেই এসে গেছে, প্রকৃতির নিয়মে; খাওয়ানো হয়েছে, পরানো হয়েছে, বোর্ডিং স্কুলে পাঠানো হয়েছে। কখনো কখনো তারা ব্যাংক হলিডের ছুটিতে বাড়ি ফিরত। উপহার নিয়ে আসতো, আর আনতো এমন এক আশাবাদ, যা দ্রুতই মিলিয়ে যেত। তুমি বুঝতে পারতে, তারা যেন সবকিছুই, নিজেদের অস্তিত্বটাও মনে করে ফেলছে; তবে বাবার ছায়া মেঝেতে পড়তেই তারা কেমন যেন গুটিয়ে শক্ত হয়ে যেত। আর বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় তারা নিজেদের সুস্থ স্বাভাবিক মনে করত, তারাহুড়ো থাকত চলে যাবার।
বোর্ডিং স্কুলে যাওয়ার পালা তোমার আর আসেনি। ততদিনে বাবা মনে করেছিল, মেয়েদের পড়াশোনার কোনো মানে নেই; তুমি তো একদিন চলে যাবে, আর অন্য একজন পুরুষ তোমার শিক্ষার সুফল পাবে। দিনের স্কুলে পাঠালে তুমি ঘরদোর আর উঠানের কাজে সাহায্য করতে পারবে।
৩.
বাবা অন্য ঘরে স্থানান্তরিত হয়েছিল, কিন্তু তার জন্মদিনে মা তাকে শারীরিক সম্পর্ক দিত। তার ঘরেই মা যেত, আর সেখানেই সব হতো। বেশি সময় লাগত না, কোনো শব্দও হতো না, কিন্তু তুমি তা জানতে। তারপর সেটাও বন্ধ হয়ে গেল, আর তার বদলে তোমাকেই পাঠানো শুরু হলো—বাবার সাথে ঘুমাতে। মাসে এক দুইবার এমন হতো, আর সবসময়ই যখন ইউজিন বাড়িতে থাকত না।
প্রথমদিকে তুমি নিজের ইচ্ছাতেই যেতে। নাইটড্রেস পরে ল্যান্ডিং পেরিয়ে যেতে, তার হাতের ওপর মাথা রাখতে। সে তোমার সাথে খেলত, তোমার প্রশংসা করত; বলত—তোমার মাথা আছে, তুমি তার সবচেয়ে বুদ্ধিমান সন্তান। সব সময় সে এক হাত তোমার ঘাড়ের নিচে রাখত, তারপর সেই ভয়ঙ্কর হাতটা কাপড়ের নিচে নেমে নাইটড্রেসটা তুলে দিত, দুধ দোয়ানোর কাজে শক্ত হয়ে ওঠা আঙুলগুলো তোমাকে খুঁজে নিত। সেই উন্মত্ত হাত নিজের শরীরের দিকে যেত, যতক্ষণ না সে গোঙানি দিত, তারপর তোমাকে কাপড়টা এগিয়ে দিতে বলত। বলত—চাইলে তুমি এখন যেতে পারো। শেষে বাধ্যতামূলক চুমু—দাড়ির খোঁচা, নিশ্বাসে সিগারেটের গন্ধ। কখনো কখনো তোমাকে সে একটা সিগারেট দিত, তুমি তার পাশে শুয়ে ধূমপান করতে, নিজেকে অন্য কেউ ভেবে নেওয়ার চেষ্টা করতে। সব শেষ হলে তুমি বাথরুমে গিয়ে নিজেকে ধুয়ে নিতে, নিজে নিজেই বলতে—এসবের কোনো মানে নেই, আর চাইতে—বাথরুমের পানিটা যেন গরম থাকে।
এখন তুমি ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে কোনো সুখের কথা মনে করার চেষ্টা করছ—একটা ভালো দিন, একটা সন্ধ্যা, একটা সদয় কথা। মনে হয় বিদায়টাকে আরও কঠিন করার জন্য সুখের কিছু খুঁজে নেওয়া দরকার, কিন্তু এমন কিছুই মনে আসে না। তার বদলে তোমার মনে পড়ে সেই সময়টার কথা, যখন ‘সেটার’ জাতের কুকুরটার অনেকগুলো বাচ্চা হয়েছিল। প্রায় সেই সময়েই মা তোমাকে তার ঘরে পাঠাতে শুরু করেছিল। জলখানায়, মা আধাভর্তি ড্রামের ওপর ঝুঁকে পড়ে, বস্তাটা পানিতে ডুবিয়ে রেখেছিল, যতক্ষণ না কুঁইকুঁই শব্দ থেমে যায়, আর বস্তাটাও স্থির হয়ে আসে। যেদিন বাচ্চাগুলোকে ডুবিয়ে মেরেছিল, সেদিন সে মাথা ঘুরিয়ে তোমার দিকে তাকিয়েছিল, আর হেসেছিল।
ইউজিন ওপরে উঠে এসে তোমাকে সেই ল্যান্ডিংয়েই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে।
‘এতে কিছু যায় আসে না,’ সে বলে—‘এত ভাবার কিছু নেই।’
‘কোনটায় কিছু যায় আসে না?’
সে কাঁধ ঝাঁকায় আর সেই ঘরে ঢুকে যায়, যেটা সে বাবার সঙ্গে ভাগ করে নেয়। তুমি স্যুটকেসটা টেনে নিচে নামাও। মা বাসনগুলো ধোয়নি। মা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে পবিত্র জলভর্তি একটা বোতল। মা তোমার ওপর সেই জল ছিটিয়ে দেয়। কিছুটা তোমার চোখে এসে লাগে। ইউজিন গাড়ির চাবি নিয়ে নিচে নামে—
‘বাবা তোমার সাথে কথা বলতে চায়।’
‘সে উঠতে চাচ্ছে না?’
‘না। তোমাকেই ওপরে যেতে হবে।’
‘যাও,’ মা বলে। ‘খালি হাতে এসো না।’
তুমি আবার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে যাও, তার ঘরের বাইরেই থেমে যাও। বারো বছর বয়সে ঋতুচক্র শুরু হওয়ার পর থেকে তুমি এই দরজা দিয়ে আর ঢোকোনি। তুমিই দরজাটা খোলো। ভেতরটা আলোঅন্ধকারময়, পর্দাজুড়ে গ্রীষ্মের বিক্ষিপ্ত আলোর রেখা। সিগারেটের ধোঁয়া আর পায়ের সেই পুরোনো গন্ধ। বিছানার পাশে তার জুতো ও মোজা পড়ে আছে। তোমার বমি ভাব হয়। সে গেঞ্জি পরে উঠে বসে, পশু ব্যবসায়ীর চোখ দিয়ে সবকিছু মেপে নেয়…
‘তাহলে তুমি আমেরিকায় যাচ্ছ।’
‘হ্যাঁ যাচ্ছি’।
‘বেশ চালাক তো তুমি।’ চাদরটা পেটের ওপর ভাঁজ করে নিয়ে বলে ‘ওখানে কি গরম পড়বে?’
‘হ্যাঁ পড়বে।’
‘কেউ কি তোমাকে নিতে আসবে?’
‘হ্যাঁ’ বলে তুমি তার কথায় সায় দাও। সবসময় এটাই ছিল তোমার কৌশল।
‘তাহলে ঠিক আছে।’
তুমি অপেক্ষা করতে থাকো—সে হয়তো মানিব্যাগ বের করবে, কিংবা কোথায় আছে, আনতে বলবে। কিন্তু তার বদলে সে হাত বাড়িয়ে দেয়। তুমি তাকে ছুঁতে চাও না, কিন্তু টাকাটা হয়তো তার হাতেই আছে। নিরুপায় হয়ে তুমি নিজের হাত বাড়াও, আর সে তোমার হাত ধরে ঝাঁকায়। তোমাকে নিজের দিকে টেনে নেয়। তোমাকে চুমু খেতে চায়। তার মুখের দিকে না তাকিয়েও তুমি বুঝতে পারো, সে হাসছে। তুমি নিজেকে ছাড়িয়ে নাও, ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাও, কিন্তু সে আবার ডাকে। এটাই তার নিয়ম। এখন সে তোমাকে দেবে—কারণ সে বুঝে গেছে তুমি ভেবেছিলে কিছুই পাবে না।
‘আরেকটা কথা’, সে বলে—‘ইউজিনকে বলো আমি চাই অন্ধকার হওয়ার আগেই মাঠের খড়ের কাজে যেন হাত দেয়।’
তুমি বেরিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দাও। বাথরুমে গিয়ে হাত ধুয়ে নাও, মুখে পানি দাও, নিজেকে আবার সামলে নাও।
‘ও কি তোমাকে টাকা পয়সা কিছু দিয়েছে?’—মা জিজ্ঞেস করে।
‘দিয়েছে।’
কত দিয়েছে?
‘একশ পাউন্ড।’
‘এতেই হয়তো ওর বুকটা ফেটে গেছে’—‘নিজের মেয়ে, ভাইবোনদের মধ্যে শেষজন, আমেরিকায় যাচ্ছে, আর সে কিনা বিছানা থেকেও উঠল না; কী কুৎসিত লোকটাকেই না আমি বিয়ে করেছিলাম।’
‘প্রস্তুত?’ ইউজিন বলে—‘রওনা হওয়া দরকার।’
তুমি মাকে জড়িয়ে ধরো। কেন এটা করছ তুমি নিজেও জানো না। তুমি জড়িয়ে ধরলে মা বদলে যায়। তুমি তার শরীরটা তোমার হাতে নরম হয়ে আসতে অনুভব করো—
‘ওখানে পৌঁছেই খবর পাঠাব, মা।’
‘খবর দিও’
‘যেতে যেতে অবশ্য রাত হয়ে যাবে।’
‘জানি, পথটা তো লম্বা’
ইউজিন স্যুটকেসটা নেয়, তুমি তার পেছন পেছন বাইরে বেরিয়ে আসো। চেরি গাছগুলো হেলে পড়েছে। বাতাসের যত জোর, গাছটাও যেন তত শক্ত। ভেড়া পাহারা দেওয়া কুকুরগুলো তোমাদের পেছন পেছন আসে। তুমি হাঁটতে থাকো—ফুলের বাগান পেরিয়ে, নাশপাতি গাছের পাশ দিয়ে, গাড়িটার দিকে। চেস্টনাট গাছের ছায়ায় কর্টিনা গাড়িটা রাখা। ডিজেল ট্যাংকের পাশে বুনো পুদিনার গন্ধ পাওয়া যায়। ইউজিন ইঞ্জিন চালু করে কোনো রকমের ঠাট্টা করার চেষ্টা করে রাস্তা ধরে নামতে শুরু করে। তুমি আবার ব্যাগের ভেতরটা চেক করো— হ্যান্ডব্যাগ, টিকিট, পাসপোর্ট ইত্যাদি। তুমি নিজেই নিজেকে বলো—তুমি পৌঁছাবেই। গেটের সামনে, এভিনিওতে ইউজিন গাড়ি থামায়—
‘বাবা তো তোমাকে তেমন কিছুই দেয়নি, তাই না?’
‘কী?’
‘আমি জানি দেয়নি। লুকাতে হবে না আমার কাছে।’
‘কিছু যায় আসে না তাতে।’
‘আমার কাছে শুধু কুড়ি পাউন্ড আছে। পরে আমি টাকা পাঠাতে পারব।’
‘কিছু যায় আসে না’
‘ডাকে টাকা পাঠানো কি নিরাপদ হবে বলে মনে করো?’
প্রশ্নটা যেন হঠাৎ আসে—অপ্রত্যাশিত, বোকামিপূর্ণ। তুমি গেটের দিকে তাকাও, গেটের পিছনে থাকা জঙ্গলের দিকে তাকাও।
‘নিরাপদ?’
‘হুম।’ তুমি হ্যাঁ বলো, তোমার তাই মনে হয়।
তুমি তার দিকে তাকাও, আবার চোখ সরিয়ে নাও—কিন্তু পুনরায় ফিরে না তাকিয়ে থাকাও অসম্ভব। তোমার চোখ চলে যায় কাঁকড় বিছানো রাস্তার ওপর, রেলপথের মধ্যে থাকা সবুজ পাশটা ধরে সেই গ্রানাইটের খুঁটি পর্যন্ত, যা প্রোটেস্ট্যান্ট যুগ থেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে আছে
তুমি বের হয়ে এসে গেট খুলে দাও। সে গাড়ি চালিয়েই পার হয়, বাইরে তোমার জন্য অপেক্ষা করে। তুমি রশিটা আবার লাগাতে গেলে, খেতের ধারে থাকা ছোট্ট ঘোড়াটা দৌড়ে আসে, বেড়ার গায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ায়, আর হ্রেষাধ্বনি করে। দেখতে লালচে চেস্টনাট রঙের। এক পায়ে তার সাদা মোজা। টিকিট কেনার জন্য তুমি তাকে বিক্রি করে দিয়েছ, কিন্তু আগামীকাল পর্যন্ত তাকে নিতে আসবে না—এমনটাই ঠিক হয়েছিল। তুমি তার দিকে তাকাও, আবার চোখ সরিয়ে নাও—কিন্তু পুনরায় ফিরে না তাকিয়ে থাকাও অসম্ভব। তোমার চোখ চলে যায় কাঁকড় বিছানো রাস্তার ওপর, রেলপথের মধ্যে থাকা সবুজ পাশটা ধরে সেই গ্রানাইটের খুঁটি পর্যন্ত, যা প্রোটেস্ট্যান্ট যুগ থেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে আছে; এবং তারও পরে তোমার মায়ের দিকে, যে কিনা তোমাকে শেষবারের মতো দেখতে বাইরে এসেছে। একরকম ভীরুভাবেই হাত নাড়ায়, আর তুমি ভাবতে থাকো— স্বামীর সঙ্গে তাকে রেখে চলে যাওয়ার জন্য মা কি তোমাকে কখনো ক্ষমা করবে।
৪.
এভিনিউ ধরে চলতে চলতে দেখো, রাডরা ইতোমধ্যেই মাঠে নেমে পড়েছে। কোথাও ইঞ্জিন চালু হওয়ার শব্দ, কোথাও উজ্জ্বল একফালি হাসি। তুমি বার্না ক্রস পেরিয়ে যাও—যেখান থেকে তুমি একসময় কমিউনিটি বাস ধরতে। শেষের দিকে তুমি প্রায় যেতেই না। সারাদিন জঙ্গলে গাছের নিচে বসে থাকতে, অথবা বৃষ্টি হলে খড়ের গোলাঘরে ঢুকে পড়তে। কখনো বোনদের রেখে যাওয়া বই পড়তে। কখনো ঘুমিয়ে পড়তে। একবার এক লোক তার খড়ের গোলাঘরে ঢুকে সেখানে তোমাকে পেয়েছিল। তুমি চোখ বন্ধ করে রেখেছিলে। সে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল, তারপর চলে গিয়েছিল।
‘একটা কথা তোমার জানা দরকার’, ইউজিন বলে।
‘কী কথা?’
‘আমিও থাকছি না।’
‘মানে?’
‘জমিটা ছেড়ে দিচ্ছি। ওরাই রাখুক।’
‘কী?’
‘ওদের সাথে শেষদিন পর্যন্ত এখানে থেকে যাওয়ার কথা তুমি কল্পনা করতে পার?’ কোনো নারীকে এখানে এনে রাখার কথা? কোন নারী তা সহ্য করবে? আমার তো কোনো জীবনই থাকবে না।’
‘কিন্তু এত কাজ, এত সময় ব্যয়—ওসব?’
‘এসবের কিছুই আমার দরকার নেই, সবই শেষ।’
‘তাহলে তুমি যাবে কোথায়?’
‘জানি না। কোথাও একটা জায়গা ভাড়া নিয়ে নেব।’
‘কোথায়?’
‘এখনো জানি না। তুমি চলে যাওয়ার অপেক্ষাতেই ছিলাম। এরপর আর ভাবিনি।’
‘আমার জন্যই কি তুমি থাকোনি এখানে?’
ইউজিন গাড়ির গতি কমায় আর তোমার দিকে তাকায়— ‘হ্যাঁ তোমার জন্যই ছিলাম, কিন্তু তাতে কি খুব একটা কাজে লেগেছিলাম, বোন?’
এই প্রথম কেউ কখনো এমন করে বলল। কথাটা শুনতে ভয়ানক লাগে তোমার।
‘তুমি তো সবসময় সেখানে থাকতে পারতে না।’
‘না। বোধ হয় পারতাম না’—ইউজিন বলে।
ব্যালটিংগ্লাস আর ব্লেসিংটনের মাঝখানে রাস্তা আঁকাবাঁকা। এই অংশটা তোমার পরিচিত। অল-আয়ারল্যান্ড ফাইনালের সময় তোমরা এই পথেই এসেছিল। টালাহটে বাবার এক বোন ছিল, তার বাড়িতে থাকা যেত—কঠিন স্বভাবের এক মহিলা, দারুণ টার্ট বানাত, আর ধোঁয়ার লম্বা রেখা ফেলত। জলাভূমির মতো জমি, রাস্তার দুপাশে অনুর্বর মাঠ, কয়েকটা টাট্টুঘোড়া ঘাস খাচ্ছে। ছোটোবেলায় তুমি ভাবতে—এটাই আয়ারল্যান্ডের পশ্চিম দিক। এটা শুনে বড়োরা হাসত। আর এখন হঠাৎ করে তোমার বাবার একটা ভালো দিক মনে পড়ে যায়। সেটা সেই সময়কার কথা, যখন তুমি তখনো তার ঘরে যেতে শুরু করোনি। সে একদিন গ্রামে গিয়ে পেট্টোল নিতে একটা গ্যারেজে থেমেছিল। পাম্পের মেয়েটা এসে তাকে বলেছিল—তুমি আসার আগ পর্যন্ত সেই মেয়েটাই ছিল ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রী, সব বিষয়ে সেরা। গ্রাম থেকে ফিরে এসে বাবা এই কথাটা বলেছিল, আর গর্বিত হয়েছিল—কারণ তুমি প্রোটেস্ট্যান্টদের মেয়ের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান ও মেধাবী।
বিমানবন্দরের কাছাকাছি আসতেই আকাশে প্লেনের ওড়াউড়ি দেখা যায়। ইউজিন গাড়ি পার্ক করে, কাউন্টারটা খুঁজে পেতে তোমাকে সাহায্য করে। তোমাদের কেউই ঠিক জানো না কী করতে হয়। বিমানবন্দরের লোকজনই তোমার পাসপোর্ট দেখে, স্যুটকেস নিয়ে নেয়, কোথায় যেতে হবে বলে দেয়। তুমি চলন্ত সিঁড়িতে পা রাখো—ওগুলো তোমাকে ভয় দেখায়। একটা কফিশপে ইউজিন তোমাকে ভাজাপোড়া জাতীয় কিছু খাওয়াতে চায়, কিন্তু তোমার খেতে ইচ্ছে করে না, কিংবা তাকে সময় দিতেও।
তোমার ভাই তোমাকে জড়িয়ে ধরে। এভাবে আগে কেউ কখনো তোমাকে জড়িয়ে ধরেনি। তার দাড়ির খোঁচা গালে লাগতেই তুমি একটু সরে আসো।
‘স্যরি বোন’
‘ইটস ওকে’
‘বিদায় বোন’
‘বিদায়, ইউজিন। নিজের প্রতি খেয়াল রেখো।’
‘নিউইয়র্কে পকেটমারদের থেকে কিন্তু সাবধান।’
তুমি কোনো উত্তর দিতে পার না।
‘লিখবে কিন্তু, লিখতে ভুলবে না’, ইউজিন দ্রুত বলতে থাকে।
‘লিখব। চিন্তা কোরো না।’
তাকে পেছনে ফেলে তুমি যাত্রীদের লাইনের সাথে এগিয়ে যেতে থাকো। সে আর ভাজাপোড়া জাতীয় খাবার খাওয়াতে ফিরবে না; তার সময় নেই। তুমি জানোই—সে তার বুট পড়ে নেবে, দুপুরের আগেই বাড়িতে থাকবে, অন্ধকার নেমে আসার আগেই মাঠে খড় গোছানোর কাজে হাত দেবে। এরপর আছে ভুট্টা কাটার কাজ। ইতোমধ্যেই শীতকালীন যব পরিপক্ক হতে শুরু করেছে। সেপ্টেম্বর মাসটা আরও কাজ নিয়ে আসবে। জমির পুরোনো সব দায়। গোয়ালঘর পরিষ্কার করা, গবাদিপশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চুন ছিটানো, সারের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। তুমি জানো যে, সে কখনোই মাঠ ছেড়ে যাবে না।
একজন অচেনা লোক তোমার হ্যান্ডব্যাগ চাইলে তুমি তাকে সেটা দাও। তুমি দরজাবিহীন একটা ফ্রেমের ভেতর দিয়ে যাও, তারপর ব্যাগটাও তোমার হাতে ফেরত আসে। অন্যপাশটা আলো ঝলমলে। সুগন্ধি আর ভাজা কফি বিনের ঘ্রাণ—দামি দামি সব জিনিস। তুমি ট্যানিং লোশনের বোতল আর কালো চশমার র্যাকগুলোও দেখতে পাও। সবকিছু যেন ধোঁয়াটে হয়ে আসছে, তবু তুমি এগোতে থাকো—কারণ তোমাকে এগোতেই হবে—টিশার্ট আর ডিউটি ফ্রি পেরিয়ে সেই গেটের দিকে। গেটটা পেয়ে গেলে দেখো, সেখানে তেমন কেউ নেই, কিন্তু তুমি জানো—এটাই সঠিক জায়গা। তুমি আরেকটি দরজা খুঁজতে যাও, যেখানে নারী দেহের অংশ দেখা যায়। দরজাটায় ধাক্কা দাও, দরজা খুলে যায়। উজ্জল হ্যান্ড-বেসিন আর আয়নাগুলো পেরিয়ে যাও। কেউ একজন জিজ্ঞেস করে—‘তুমি ঠিক আছো তো ?’—কী বোকা প্রশ্ন; তুমি কাঁদো না, যতক্ষণ না আরেকটা দরজা খুলে আবার বন্ধ করে দিচ্ছ, যতক্ষণ না নিজের কেবিনে নিরাপদে ঢুকে দরজাটা আটকে দিচ্ছ।

জন্ম গাজীপুর জেলার কাপাসিয়ায়। বাবার চাকুরিসূত্রে বিভিন্ন জেলায় বেড়ে ওঠা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে যুগ্ম-পরিচালক হিসেবে কর্মরত। ২০০৮ সাল থেকে লেখালেখির প্রতি আগ্রহ জন্মায়। কবিতার পাশাপাশি দর্শন ও সংগীতে আগ্রহ আছে। অনেকের লেখা অনুবাদ করেছেন। বেন ওকরি’র প্রথম কবিতার বই ‘আফ্রিকার শোকগাথা’ অনুবাদ গ্রন্থ হিসেবে ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয়। আসন্ন পহেলা বৈশাখে প্রকাশিত হবে ফরাসি তাত্ত্বিক ও চিন্তক রোলাঁ বার্তের ‘শোকের দিনলিপি’।