০১.
অন্য সব মানুষের মতোন মরিয়মও পেঁচা স্বপ্নে দ্যাখে।
মরিয়ম দেখে তার ঘরের ভিতর কেউ পেঁচা রেখে গেছে।
মরিয়ম গুণতে থাকে।
মরিয়মের আলস্য হয়।
মরিয়ম গোণা বন্ধ করে। সে ঘুমের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে। এবং দ্যাখে একটা দুইটা না। হাজার হাজার পেঁচা মরিয়মের ঘরে।
মরিয়মের কাপড়ের আলনা, চালের ভাঁড়, পানির কলস, জলের গেলাস ভাতের হাড়ি, ভাঙা আয়না, সচুল চিরুনি, মশারি-মশারির দড়ি সবখানে পেঁচা বসে আছে।
মরিয়ম তার নিজের ব্লাউজের ভিতরও, যেখানে পৃথিবীর আর সব মেয়েদের একজোড়া স্তন থাকে, মরিয়ম দেখে তার ভিতরও পেঁচা।
তারা অন্য পেঁচাদের মতোন থির হয়ে, অন্ধকার স্বভাবে তাকিয়ে আছে একটা ইঁদুরের দিকে।
একটা গর্ভবতী ইঁদুর। যেরকম হয়, আর দশটা ইঁদুরের মতো সেও, মৃত্যু কতদূরে বোঝার চেষ্টা করছে। আরেকটু বুঝবে? নাকি বুঝবে না? তার আগেই তার দিকে ছুটে আসতে থাকে মৃত্যু।
মৃত্যু কেমন হয়? মৃত্যু হয় সুন্দর। এটা জানা যায় মৃত্যুর চোখে চোখে থির তাকাতে জানলে। ইঁদুরটার কী যে হলো, সম্ভবত গর্ভবতী বলে, সে কিছুটা ভয়, কিছুটা ভয়হীনতা এবং বাকিটা বিহ্ববলতা নিয়ে তাকিয়ে থাকে পেঁচার চোখের দিকে। পেঁচার গতি তখন সিনেমার স্লো মোশনের দৃশ্য যেন। একটু একটু করে আগাচ্ছে… বা আগাচ্ছে না…
তার আগেই ধরফর করে উঠে পড়ে মরিয়ম।
ক্ষীণ-প্রায় অবোধ্য এক ব্যথায় মুচড়ে ওঠে সে। আর আবিষ্কার করে তার জল ভেঙে গেছে। সেই ভাঙা জল ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে তাকে ছেড়ে। একটু একটু করে। আরও একটু একটু…
আশ্চর্য, এ ব্যথার মাঝেও মরিয়ম দেখে, সত্যি সত্যিই দেখে— তার ঘরের সব দিকে, সবখানেই পেঁচা, সত্যিকারের পেঁচা… একটা দুইটা না, শত-শত, হাজার-হাজার পেঁচা, অসংখ্যা পেঁচা… তারা সবাই নিষ্পলক তাকিয়ে আছে মরিয়মের দিকে। থির চোখে।
ঠিক মরিয়মের দিকে না, মরিয়মের হাতের দিকে। তার হাতে ধরা ইঁদুরটার দিকে।
আর মরিয়ম ভেসে আছে জলে। অনবরত জলে।
০২.
মানুষের অনেক সুবিধা। সুবিধা এই যে একজন মানুষ হিসেবেই সে ঘুঘু পাখিদের ভিড়ে ঢুকে যেতে পারে। নেপথ্যে মুনলাইট সোনাটা ছেড়ে দিয়ে খুব স্লো মোশনে, অনেকটা বেলা তারের সিনেমার যেকোনো সিনের মতোই সে ঢুকে পড়তে পারে অনেক ঘুঘুদের কোনো গ্রামে। যেখানে মরিয়ম থাকে।
মরিয়ম কে?
মরিয়ম মানুষ। তাই দেখতেও মানুষের মতোন।
মরিয়ম কী করে?
মরিয়ম নখ কাটে। আর যেদিকে মেঘমল্লার, যেদিকে সূর্যাস্ত তার দিকে বেণী ছড়িয়ে রাখে একটা অর্ধেক আঁকা কুয়ো পর্যন্ত।
কুয়োতে কী থাকে?
কুয়োতে থাকে অন্ধকার। এবং মানুষের চোখের জমজ।
সে জমজ অন্ধকারের ভিতর এক কনে দেখা আলোয় মরিয়মের বোন নেমে গিয়েছিল। তার তখন এক কুড়ি বয়স। সবাই ভাবতো সে উড়ে উঠে আসবে। আসে নাই। তেরশো বছর আগে।
মরিয়ম তাই বেণী ফেলে রাখে কুয়োর ভিতর। তার উড়তে ভুলে যাওয়া বোন যদি বেণীর নাগাল পায়। যদি উঠে আসে বেণী বেয়ে। সে আশায়।
অনেকে বলেন, মরিয়ম অন্ধ। কারণ সে চোখ খুলে বেঁধে রেখেছে বেণীর আগায়। তার বোনের জন্য। তার বোনও অন্ধ ছিল। অন্ধ বোন অন্ধকার কুয়োয় আলো খুঁজে পাবে কীভাবে! কীভাবে খুঁজে পাবে সলতে হয়ে জ্বলতে থাকা বেণীর আগা! মরিয়ম জানে না।
একদিন মরিয়ম ঘুমাচ্ছিল। হ্যাঁ, বোনকে চোখ ধার দেয়ার পরও মরিয়ম ঘুমাতো। অন্যসব মানুষের মতোন। ঘুমের ভিতরই স্বপ্নে সে অনেক রঙিন এক খলশে মাছের দেখা পেয়েছিল। মাছটাও অন্ধ ছিল। অন্ধরা সুন্দর হয়। মাছটাও সুন্দর ছিল।
সে সুন্দর মাছ আলোর দিকে ফিরে মরিয়মের কানে কানে বলেছিল, ‘তুমি যে চোখ ডুবিয়ে রেখেছিলে জলের ভিতর, জল লেগে লেগে সে চোখ প্রথম নরম হয়ে গিয়েছিল। তারপর খুব পোয়াতি। সেই পোয়াতি চোখ থেকে সামনের মাঘী পূর্ণিমায় চোখের জন্ম হবে। চোখগুলো তো মাছের সঙ্গে সঙ্গে ছিল। তাই মাছের মতোনই চোখ বিয়োবে। অসংখ্য। চোখে চোখে ভরে যাবে পুরা কুয়ো।
‘বাহ!’ মরিয়ম খুশি হয়। খুশি মরিয়মকে দেখে খুশি হয় খলশে মাছও। বলে, ‘আমার গন্ধটা মনে রেখো। মনে থাকবে?’
‘হ্যাঁ। প্রথম ঋতুমতী নারীর গন্ধ।’
‘গন্ধ পেলেই বুঝবে আমি আসতেছি তোমার জন্য চোখ কুড়িয়ে। তুমিও দেখতে পাবে।’
‘আলো দেখতে পাবো?’
‘হ্যাঁ’
‘অন্ধকার?’
‘হ্যাঁ। জোছনাও।’
আলো-অন্ধকার এবং জোছনার জন্য মরিয়ম অপেক্ষা করছে।

জন্ম ১৯৮৩, চট্টগ্রাম। বর্তমানে ঢাকায় থাকেন। পড়াশোনা চিত্রকলায়। । প্রকাশিত বই : সাবানের বন [কবিতা,প্রকাশক : মিতাক্ষরা ২০১৫], ফরসা একটা ফল গড়িয়ে যাচ্ছে [কবিতা, পাবলিশার: তবুও প্রয়াস, কলকাতা, ২০১৯], রিউমার [মেটাফিকশন, পাবলিশার: বৈভব, ২০২১] ই-মেইল : razib.finearts@gmail.com