শনিবার, ফেব্রুয়ারি ৭

নির্বাচিত দশ কবিতা : আহমেদ স্বপন মাহমুদ

0

গত ৩ ফেব্রুয়ারি কবি আহমেদ স্বপন মাহমুদ ৬০ অতিক্রম করে ৬১তে পদাপর্ণ করলেন। এই শুভ মুহূর্তে কবিকে আমাদের শুভেচ্ছা। তিনি নিরন্তর কর্মমুখর এবং সৃজনশীল থাকুন— এ-ই প্রত্যাশা। —সম্পাদক


চোখ বন্ধ, মন সহজ


১.
চোখ বন্ধ করুন। শান্ত হোন, হতে থাকুন শান্ত ও স্থির। অটল ও অবিচল হোন। চিন্তাশূন্য। সহজ। চোখ বন্ধ রাখুন। মন সহজ করুন আরো। শান্ত করুন। তারপর লম্বা একটা দম নিন। ধীরে ধীরে দম ছাড়তে থাকুন। আবার লম্বা দম নিন। দম ছাড়ুন। দম নিন, দম ছাড়ুন। এভাবে চলতে দিন। যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে দম উঠছে, দম নামছে। এখন আপনি অধিক শান্ত ও স্থির। আরো অটল ও অবিচল। ভাবুন, আপনার শরীরের সমস্ত আবর্জনা দম ছাড়ার সময় বেরিয়ে গেছে। আর যত সুবাতাস ও সকল শুভশ্রী গ্রহণ করছেন আপনি। এবার আপনি স্থির ও শান্ত, উজ্জ্বল।

দম নিন। প্রসারিত করুন অন্তর, অন্তর্লোক। সংকোচন ও প্রসারণের খেলা খেলতে থাকুন। আপনার প্রবহমান রক্তে বয়ে চলছে আলো, আলোর প্রবাহন বয়ে যাচ্ছে রক্তে। শিরা-উপশিরায়। রক্তে যেন আলোর পরশ। আপনি উদ্ভাসিত আলোয়, আলোয়। মুক্তির আলোয়।

চোখ বন্ধ, মন সহজ। মন মুক্ত করুন দেহের ভার থেকে। মন শান্ত। দম নিন, দম ছাড়ুন। লোভ-লালসা, হিংসা-ঘৃণা, কাম-কামনা ছাড়ুন, দমে দমে। অহিংসা, প্রেম, মায়া ও পূর্ণতা নিন, দমে দমে। দম ছাড়ুন, দম নিন। নিতে থাকুন। আপনি ভারমুক্ত করুন দেহ থেকে মন, মন থেকে দেহ।

চোখ বন্ধ, মন সহজ। আপনার অন্তর্লোক আলোয় ভরা।আপনি মন ও দেহের, কাম ও কামনার থেকে ভারমুক্ত। আপনার অন্তর্লোক বিস্তৃত। একাকার যেন সব। মন-দেহ, সাকার-নিরাকার একাকার। অসীম, যেন অনন্ত।

আপনি পরম ধ্যানমগ্ন। আপনার দেহের আলো মনের আলোয় মজেছে। প্রেমে। আপনি এবার উড়ুন, স্থির থাকুন। বাসনায় পূর্ণ হোন। আপনি অনন্ত অটলবিহারী। অমূল্য নিধি। চির-অনাদি। পরম।


২.
পেয়ালা কবুল করো দয়াল।
এ শরাব তোমার নামে।
সঁপেছি, শুদ্ধ মনে।
অস্তিত্ববিহীন চরণে তোমার।

কানায় কানায় পূর্ণ পেয়ালা।
বাকাবিল্লায় করছে জিকির
হিল্লা পেতে। ফানা হতে।

আমার মন নাই, সাঁই।
তোমার অসীমতায় সায়রে ভাসে।
একই পুষ্পে, একাত্মে। অদ্বৈতে।
মিশে যাই।

হাসে অস্তিত্বহীন প্রফুল্ললতা।
বিলীন হয়।
আমি সত্য বলে।
নিজ গুণে!—

তুমি সাঁই নিরাকার। নিরঞ্জন।
অস্তিত্ববিহীন তোমার পা।
আমার মরণ! চরণ!—

তোমার অস্তিত্বের লতায়
নিজ গুণে, ধোঁকাহীন।
ঘুমে, স্বপ্নে, জাগরণে। না ভণিতা ও ভানে।
ধ্যানে।

পরস্পরে আপন।
পেয়ালা ও স্বভাব। অদ্বৈত।
মূলধন।


৩.
দিল দান না করলে
হয় না দিলবান।
দিলরুবা।
রুহানি পাত্রভরা হাতে
নেচে ওঠে শরাব
মর্ম জেনে করিও পান
পুণ্যবান।

শব্দ, রূপ, শূন্যতা
অনুভব, তোমার চিন্তা ও কল্পনা নিয়ে
দাঁড়িয়েছি স্বয়ংফুল, শরাবসাকি।

রাত ঘনিয়েছে, মিথ্যা আলো
জ্বালিয়ে যে চোখে দেখ
তার বিপরীতে
একক পুষ্প আমি। জ্ঞানের অতীত।

তাকাও ফিরে বালা ও ঘুঙুরের দিকে
লোভ ও কামনা না হলে ফিকে
সাধু, কামে মিলবে না ধন
যত কর না সাধন।
করো দিল দান পুণ্যপ্রেমে
শরাব বিনে কেমনে হবে বেহুঁশ
অদ্বৈতে ফানা
আমি এসেছি শূন্য হতে
নিষ্কামে কর সন্ধান নিজেকে দৈন্যদান
ওরে আলোককানা।


৪.
না পাই দিদার তোমার, সাঁই।
পিঁপড়ার মতন শ্রেষ্ট জীব তোমার
মানুষ জলে ভেসে যায়
অসহায়! হায়, অসহায়!

আমি মৃত্যু দেখে তোমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছি।
শরাব ও সুন্দরতা নিয়ে।

তোমার নুপুরের আওয়াজ ও কণ্ঠের বেহাল সুর
রাত্রি পার হয়ে দুপুর শেষ না হতেই মরে যায়—
তোমাকে চায়, উন্মত্ত আঁখি নেশাতুর জেগে রয়
সাকি, প্রিয়তমা, জানো, জগতের সকল চালাকি
লোভাতুর হয়! পিষে যায়!
আমাদের কলিজা খায়, অনন্তর।

শূন্যতার অন্তর!
লীনে, বিলীনে, অসীমে
থেমে যায় কবরের নেকাব।
নিটোল গহন প্রেম ও পালক।


৫.
পেয়ালা কবুল কর দয়াল।
এ শরাব তোমার নামে।
সঁপেছি, শুদ্ধ মনে।
অস্তিত্ববিহীন চরণে তোমার।
কানায় কানায় পূর্ণ পেয়ালা।

বাকাবিল্লায় করছে জিকির
হিল্লা পেতে। ফানা হতে।
আমার মন নাই সাঁই।
তোমার অসীমতায় সায়রে ভাসে।
একই পুষ্পে, একাত্মে। অদ্বৈতে।
মিশে যাই।
হাসে অস্তিত্বহীন প্রফুল্ললতা।

বিলীন হয়।
আমি সত্য বলে।
নিজগুণে!
তুমি সাঁই নিরাকার। নিরঞ্জন।

অস্তিত্ববিহীন তোমার পা।
আমার মরণ! চরণ!
তোমার অস্তিত্বের লতায়
নিজগুণে, ধোঁকাহীন।
ঘুমে, স্বপ্নে, জাগরণে। না ভণিতা ও ভাণে।

ধ্যানে।
পরস্পরে আপন।
পেয়ালা ও স্বভাব। অদ্বৈত।
মূলধন।


স্বর্ণলতা


সেই পথে প্রতিজ্ঞা ও ভালোবাসা পড়ে থাকে। তুমি আয়নায় বারবার মুখ দেখে ফিরিয়ে নিয়েছ মুখ। আর লবণাক্ত হ্রদ থেকে তুলে এনে কিছুটা মায়া ও বিভ্রম, ভুলেছ বৃষ্টি ও টগরের রং। এবার তুমি ধূলি ও রং-মাখামাখি করে বাজাও সংগীত। আমি যার ধ্বনি শুনব না আর— কেবল দূরান্তের মেঘ হয়ে উড়ে যাব লাল শিমুলের ওপার। আর মধুর সেসব ভুল ছড়িয়ে দিয়ে ভাবব, ভালোবাসা কেন এত ভীরু ও উদাস।

ধূলিপথে পড়ে থাক বিশেষ দুর্বলতা— সংশয়খচিত প্রেমিকার মায়া ও কুহক।


পৃথিবীর আদিম বটগাছের নাম অসহায়


রামের বোতল শেষ করে যিনি পর্বতের চূড়ায় অনড় দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি জগতের বড় ভাই! তার নাম অসহায়! রামের পায়ের কাছে হনুমান শুয়ে থাকে। পর্বত হাতে নিয়ে হনুমান যাচ্ছেন। শিব বসে আছেন চূড়ায়। শীষনাগের মাথায় পৃথিবী। সূর্যের চারদিকে ঘুরে। রামনাম।

আমার ঘোর গেল না সাঁই। মনমন্দিরে অযথাই যেসব তোলপাড় তার সাথে যোগাযোগ হলে বলে দিও কবির নিয়তির সাথে মরণের কোনো যোগ নাই। কেবল দহন, আর্তনাদ, দুর্দশা ও নিঃসঙ্গতা আছে। পৃথিবীর আদিম বটগাছের নাম অসহায়। কবি সেই গাছের ছালে পিরিতের ঔষধি বানিয়ে অস্থির মাছেদের বিতরণ করে।

গেল রাতে অস্থির গুলির আওয়াজ বিদীর্ণ করেছে মায়ের আঁচল। দাঁতাল শুয়োর হাসছে গণতরিকায়, তন্ত্র হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে মদদে।

কবির মসনদ লাগে না। না গণতন্ত্র। সে নয়া নয়া দুনিয়া পয়দা করে অক্ষরের অন্তরালে। দেখে নিও। সূর্য যখন হাসে।


কসাইখানার কবিতা


বারান্দার জন্য মায়া হয়।
অদ্ভুত রকম তাকিয়ে থাকা নিষ্প্রভ লাশের জন্য মায়া হয়।
বেদনা লাগে।

খুন হওয়া মানুষের কোনো বেদনা নাই আর!

কেউ জলে, কেউ আঞ্জুমান মফিদুলে, কেউবা হাসাপাতালে, মর্গে
হাঁসফাঁস করতে করতে বেওয়ারিশ পাতালে চলে গেল।

সকরুণ মায়া হয়ে উড়ে গেল অকাল মানবজনম।

বারান্দার জন্য মায়া হয়
বারান্দায় দাঁড়িয়ে লোকটি আকাশ দেখতে ভালবাসত।

আমাদের ভাই মাঠে গেছে ফিরে নাই আর।
আমাদের বোন ঘাটে গেছে ফিরে নাই আর।
আমাদের আত্মজ হাটে গেছে ফিরে নাই আর।
কসাইয়ের সপ্রতিভ চাপাতির নিচে তারা শুয়ে আছে
তারা ঝুলে আছে কসাইখানায় মাংসের ঢলে।

আকাশ খুন করে আততায়ী ঘুরে বেড়াচ্ছে
আইনি আকাশের তলে।
বারান্দাও খুন হয়ে যায়।
আকাশের বারান্দার জন্য মায়া হয়।


অবিশ্বস্ত প্রেমিকার মায়া


অবিশ্বস্ত প্রেমিকার মায়ার মতো
দীর্ঘ টানা বরষা
তোমাকে ভাসিয়ে নে’ গহন বিষাদের স্রোতে
স্রোতমাত্র কলিজার কাচা কাচা
রক্ত ও আর্তনাদ
ফেনার আশ্রয়ে বেড়ে ওঠা প্রেম—

প্রেমমাত্র বিভীষিকা—দহনের রঙ।

রঙ খেলে খেলে আমরা
মেঘ ও বৃষ্টি দেখি
অবুঝ সন্ধ্যার গরিমায় একাকীত্ব দেখি।

গরিমাকাতর প্রেমিকাদের মন ভালো নয়
বৃষ্টি এলেও ভিজতে জানে না
সামান্য হাওয়ায় মুখ বেঁকে যায়

আর আমাদের পাড়ারা ফোটে ওঠে
কোলাহলময় ভিড়ে

নীড়ে ফেরার আগে
কারও ঘর থাকে না—

আমাদের শত শত ঘর ও মন-মন্দির পুড়ে ছাই

সমস্ত আকাশ নেমে এসে আজ বুকেতে বাঁধাই হয়ে আছে
বৃষ্টিপতনের সাথে।

পতন ভালোবেসে
তোমাকে দেখে দেখে আনতকাল
কাটাতে চাই মায়ার আশ্রমে
আগুনের রং মেখে।

আগুন প্রেম হয়
তুমি কুহকময়
ছায়ামাত্র—

বিভ্রম।


যখন কিছুই ছিল না


ওখানেই নামতে চাই
যেখান থেকে এসেছি।

নাই থেকে
আজব-রঙা অ-জীব
স্বপ্নঘোর শূন্য থেকে

নাই হয়ে যাব
পুনরায়।

বিপুল শূন্য সমারোহে
পূর্ণ পরমে
হরিহরে
লা মোকামে

নীলে, লীলায়
শূন্যতায়

নাই হয়ে যাব।

লা শরিকে।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ১৩৭২ বঙ্গাব্দের ২১ মাঘ, তথা ১৯৬৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি, নেত্রকোণা জেলায়। পড়াশুনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, (১৯৮৫-৮৯ সেশন )। সাংবাদিকতা ও অধ্যাপনা করেছেন। বর্তমানে ভয়েস নামে বেসরকারি একটি গবেষণা সংস্থার প্রধান নির্বাহী। ঢাকায় বসবাস করেন। প্রকাশিত গ্রন্থ : কবিতা : অতিক্রমণের রেখা, ২০০০; সকল বিকেল আমাদের অধিকারে আছে, ২০০৪; অবিচল ডানার উত্থান, ২০০৬; আদিপৃথিবীর গান, ২০০৭; আগুন ও সমুদ্রের দিকে, ২০০৯; আনন্দবাড়ি অথবা রাতের কঙ্কাল, ২০১০; প্রেম, মৃত্যু ও সর্বনাম, ২০১৪; অতিক্রমণের রেখা : নির্বাচিত কবিতা, ২০১১; ভূখণ্ডে কেঁপে ওঠে মৃত ঘোড়ার কেশর, ২০১৩; রাজার পোশাক, ২০১৪; অনেক উঁচুতে পানশালা, ২০১৪; দাহকাব্য, ২০১৫; শ্রীমতি প্রজাপতি রায়, ২০১৭; এখান থেকে আকাশ দেখা যায়, ২০১৮। গদ্যগ্রন্থ : সমূহ সংকেতের ভাষা, ২০০১; কলমতালাশ : কবিতার ভাব ও বৈভব, ২০১৪; কবিতার নতুন জগৎ, ২০১৭। পুরস্কার : বইপত্র সম্মাননা, কলকাতা, ২০০০; বগুড়া লেখক চক্র, ২০১৫; শব্দগুচ্ছ, ঢাকা-নিউইয়র্ক, ২০১৫; লোক, ২০১৬।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।