১.
একটা সিঁড়ি নিচের দিকে নেমে গেছে,
আমি তাই ধরে প্রতিদিন উপরে আরও উপরে উঠে যেতে চাইছি,
গাছের মতো একটা সঙ্গিনী চাই এখন
যার শেকড়ে মাটি রাখতে রাখতে বলে উঠব ভালোবাসি।
ঘরের যেহেতু কোনো সন্ধ্যা নেই, সন্দেহ আছে।
আতর নেই, আদর আছে।
একটা মোহমেহফিলে আচ্ছন্ন ঘুম আছে।
যদিও নয়টা দশটার বুনিয়াদহীন কবিতায়
কিছুই আমি তোমার নামে করে দিতে পারলাম না সুজন।
রাতের হিলকার্ট রোড, ভিজে ম্যাস্টিফ গালিচায় গলনাঙ্ক নামে।
আরও নামতে নামতে যেন খাদ আর অন্ধকারে ঘেরা একা ট্রাফিকলাইট।
মদ্যরাতের ঝিঞ্ঝটি জ্বলছে নিভছে, ক্রমশ দক্ষিণ দিকে সরে যাচ্ছে মন…
এসব অক্ষর আসলে একটা দ্রাক্ষা(বি)ফল(তা), ব্যাধিপক্ষ, নিশিপদ্ম।
বুকের বা’দিকে নিরাপদ বলতে বলতে রাতের ঘর জাগে
রাতের হাওয়ায় একটা ঘুমহারানো অক্ষর লেগে থাকে,
হাওয়া থামে, হাওয়া নামে, হাওয়া গুম হয়ে ঘামে মিশে যায়।
সিঁড়ি উঠে আসে দেহশরীরে, আমি নিচ থেকে নিচে নেমে যাই…
একটা গভীর রঙের সেলোফিনে মোড়া চাঁদ আমি তার পিছু-পিছু ছুটে চলা
দাম্ভিক দলনেতা। নগরপরিব্রাজক বলে কারা যেন আবার হেসে চলে যায় প্রান্তিক।
আমি ভুল থেকে শিখে ঘরে ফেরা বোকা পাখি
আমি ভুল থেকে ফের ভুলে যাওয়া তুলে রাখি
আমি ভুল থেকে ভিড়ে ঢুকে পড়া বোকা লোক
আমি ভুল থেকে ফের ভুলে যাওয়া প্রিয় শোক
তবু তার কথা আমি কার কথা লিখে গেছি
সিঁড়িভাঙা খোপে সাজিয়ে রেখেছি পাপ।
গাছ, আমি যেন কোন গাছের কথা লিখতে চেয়েছিলাম?
গাছের মতো একটা বাকল উঠে আসা বস্তির দিকে হেঁটে যাই বরং,
হে অন্ধনগর আমার বাক দত্তক রাখো, আমার ইস্তেহার কুড়িয়ে নাও…
এই যে কবিতার বিপণনে অর্ধেক রাত কেটে যায় আমাদের,
এই যে রাতের কোটর থেকে আমরা গোপন মেহফিলে, মজলিসে,
জলসাখানায় হাঁটি, শুয়ে পড়ি আর ঘরে ফিরে আসি ভিজে বিছানায়…
তোমার হাত থেকে খসে পড়ি, উঠি আর সিঁড়ি ধরে ছুটে আসি চেনা ব্রোথেলে,
যে সিঁড়ি নেমে গেছে প্রিয় শরীরের মতো চেনাশোনা কোনো আঁধারে।
২.
কি করে বোঝাই তোমাকে যে মাটি আলগা ছিল
সেখানে বোকার মতো গালিচা বুনেছিলে।
একা হতে হতে ভিড় সামলাই সহজে ওঠা আঙুলে লাগে দ্রোহ।
বিশ্বাস দেখি ক্রমশ হালকা বায়ু যত ধরে রাখি উড়ে যায় উড়ে যায়।
কি ভীষন অপচয়ে নিজেকে সাজিয়ে রেখেছি তুমি জানো…
শুধু জানো না বিকেল হলে কবিতার মৃতদেহ মর্গে অথবা সৎকারে চলে যায়।
ছুরি হচ্ছে খুন। খুনের নিচে নদী। পরিষ্কার জনপদ। অন্ধ খাচ্ছে। বিপদ খাচ্ছে।
সস্তা সে তো অমূল্য আতর। নগ্নসাধক কবিতায় কেচ্ছা সেঁটে দিলো।
বাদক বাদ্যযন্ত্রে দিলো তাল। চোখের দিকে শান্ত-গ্রাম, দূর ঘুরতে ঘুরতে বল,
জল ঘুরতে ঘুরতে বাক্স আর দল ঘুরতেই ব্যাগ ভর্তি পাথর-থান-ইট।
সংগ্রাম চাইছে গোপন বিনিময় আর স্তনের কাছের তিলে
ভোঁতা কলম উঠে দাঁড়াচ্ছে সহযোদ্ধার…
৩.
যে খেলায় আগাগোড়া হেরে যাওয়া মানুষের রঙ ক্রমশ
ফিকে হয়ে আসে পরবাসে, রাতের গোড়ালি ভেজা জল
ভোরের আলোর কাছে ঋণী থেকে যায়,
একা একা হাঁটাপথ, নদীর কপাল জুড়ে জ্বর, ফিরে দেখা পূর্বপুরুষ,
জলজপূরাণ, ফিকে হয়ে আসা ঘর।
বন্ধুরা মস্করা করে, হাসে, আমি হাসি নিজের জ্বালায়,
কোন দহনের কাছে বায়ু নত হয়,
কোন বাতাসের পায়ে মন নিচু।
আমি ভাবি কোমল মাটির কথা, পাথরে পাঁজর বেঁকে যায়।
রাতের প্রলেপ রাখি ঠোঁটে, তবু ভয় কেন?
কেন এই ছিন্ন আশঙ্কায় দিন কাটে,
রাত চৌচির; যেন কাচ আর এলাচের দানা,
যেন দড়ি আর কলসির ভার,
যেন ডুব, যেন রঙ্গশালার কাছে পড়ে থাকা আমারই আন্ধার।
তবু এসব কথায় বিরাগ জানাতে নেই; নারাজি জানাতে নেই।
কথার খেলাপিও না জানাতে চেয়ে কেন যে সন্ধ্যারাগের কথা
জানাজানি হয়ে যায় কবিতাপাড়ায়।
আমি একা-একা একাই শব্দে রাখি মোম।
গলুক। গলতে গলতে তার ব্যথার প্রদাহে নামে নদী।
যদিও ভুলের কাছে মাথানত করি বারবার, যদিও নতের দিকে
ক্ষতপোড়া মন নিয়ে সুতো আর ধাগায় জড়াই…
জড়াতে জড়াতে একা গড়াতে গড়াতে নুড়ি, পারভাঙা বিদেহী পালক।
পাখিহীন। প্রকট করি না খাঁচা আর জলে ডোবা তন্দ্রামরণ…
এই সব সহজ সরল কথা আর বলব না বহুবার ভেবেছি আন্ধার।
এই সব অহেতুক কথা কোনো রাতের জাফরি দিয়ে ফেলে দেবো দেখো।
এত কথা ভাবব না আর…
৪.
সরোবর খুন হয় আমার ভেতরে; জলহত্যা কি নিদারুণ ছল?
আঘাত বলতে নেই ভিড় রাস্তায়, তবু আঘাতে রাখতে নেই জল…
সরোবরে দেহ ভেসে আসে, কার দেহ কার বিচ্ছেদ
খুন হই শব্দের মোহে, মোহের আগুনে পোড়ে দ্রোহ।
কোন সম্পর্কের কাছে, কাচের মতো ভাঙা সন্দেহ হাসে।
এই ছিল করুণাবিরাগ, এই ছিল আতরদানির মিঠে শ্বাসে?
গাছ আর মাছের পোশাকে আমরা দুই-জন্মের গৃহবাসী হবো,
তবু আঙুলে কলহ রাখি পুষে, তবু নখের কোনায় রাখি প্রেমও।
জলে ডুবে মরে সংকেত। জ্বলে পুড়ে মরে কাঁচা ক্ষোভ।
মরা মরা হাঁসের পালক, পোড়া পোড়া শব্দের শোক।
খুন হয় আলো আর আলেয়ার রাত। খুন হই কবিতার ঘোরে।
আমাকেও সন্দেহ করো। এসো প্রেম খুন হও আমার ভেতরে।
৫.
আমি শুধু একটা বছর জারুল ফুলের অপেক্ষাতে থাকি।
একটা বছর; যেন ফুরিয়ে আসা নদীর দেহসঙ্গে মিলন চাই।
এই যে ভ্রমণ জড়িয়ে থাকা, ভাঙা-ভাঙা চাতকের মতো…
এই রক্তে একলা বাতাস, নোনা সংলাপ, ভ্রমপ্রমাদের বর্ণনা,
নিশিগঞ্জ থেকে করিমপুর, বালি মুঠো বালি স্মৃতি বালি সুখ
এসব কিছুই এখন আগের মতো নেই।
হুহু করে কাঁদে না, স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকা চোখ,
পলকহীন হাহাকার করে চিৎকারও করে ওঠে না কোথাও মঞ্চের মাঝে।
তোমার শূন্যতায় ঘেরা এই নগরিয়া যাপনও আমার অসুখের কাছে
বিশ্বাস হারায়, স্থির তাকিয়ে থাকে, কোথায় যে ঘর খুঁজি…
কোথায় যে দৌড়ে পালাই, দৌড় দৌড় ছুট,
ছুটে পার হয়ে যাই গোটা শহর রাতকানা ভিখারির মতো।
তারপর কোথায় যে মহীরুহ পুড়িয়ে শ্মশান কেঁদে ওঠে শোকে,
কোথায় যে ছায়া ছিঁড়ে ছিঁড়ে যায় গুলমোহর থেকে, শিশমহল থেকে…
সোনালি হাঁসের শরীরে কাঁটাতার নেই। ডিঙি আছে।
সরু হয়ে যাওয়া সাঁতার আছে, ডুবে মরা ডুবুরিসংবাদ…
এখন রাতের করাত রাখি চোখে, কেটে যাক।
ফালাফালা মাংসের দেহ। ভিতু আঙুল ফল টক।
গোপন করতে করতে একদিন আমাদের যাবতীয় ঘুম
আজন্ম চোখ খুলে রাখে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের শিলিগুড়ি শহরের কবি। প্রথম লেখা প্রকাশ ২০০৬ সালে। তারপরে দীর্ঘ সময় ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লিখে চলেছেন। এযাবৎ দশটি বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম বই ‘ঈশ্বরহীন স্তবক ও এথিওর কবিতাগুচ্ছ’ প্রকাশিত হয়েছে ২০১৫ সালে। ‘কাচের সংলাপ’ কাব্যগ্রন্থের জন্য পেয়েছেন রাঢ়বনতলি রোদ্দুর সম্মান। একালের কণ্ঠ যুব কবি পুরস্কার এবং চুনী কোটাল স্মৃতি সম্মান। কবিতা লেখার পাশাপাশি একজন চিত্রশিল্পী ও প্রচ্ছদশিল্পী।