শনিবার, মার্চ ২১

তিমির

0

Motifকলমের খোঁচায় নখের গোড়ার অংশে ব্যথা পেয়ে তুহি মৃদু স্বরে চোখ বন্ধ করে নিলো। ব্যথাটা অত প্রকট নয়। তাছাড়া কলমের খোঁচায় ব্যথার তীব্রতা খুব বেশি হবারও কথা নয়। তা সত্ত্বেও অন্তিকের কপালে ঈষৎ ভাঁজ। ভাঁজটা তুহির ব্যথার কারণে পড়ল না এটুকু নিশ্চিত সে।

অন্তিক কলমটা হাতে তুলে নিলো। কলমটা ছিল রাইমার দেয়া। রাইমা যে অফিসে কাজ করত সে অফিসের স্যুভেনির কলম। কলমের গায়ে সে কোম্পানির নাম স্পষ্টাক্ষরে অন্তিকের চোখে প্রতিফলিত হচ্ছে: ‘তিমির’। অন্তিক একটু বিমর্ষ হয়ে গেছে এটা ভেবে যে, রাইমার হয়ে রাইমার কলম কীভাবে অন্তিক-তুহির মাঝে একটা দেয়াল তৈরি করছে?

অন্তিকের মনে হচ্ছিল, ঠাকুমার ঝুলির সোনার কাঠি রুপোর কাঠির মতো রাইমার কলম ‘রাইমার কাঠি’ হয়ে জানান দিতে চাইছে এবং অন্তিককে সেই কলম বলে উঠছে:

‘কী কমতি ছিল অন্তিক আমাদের ভালোবাসার? আমি কি এই দীর্ঘকাল আমাদের ভালোবাসাকে তবে ভুল বুঝে এসেছি? সবই কি মিথ্যে ছিল?’

এই ধরনের নানা প্রশ্নোত্তর-স্বগতোক্তি অন্তিকের মন বিচলিত করে দিচ্ছিল।

যে সময় এই কলম কাহিনির সমাচার সেই সময়ে অন্তিক আর তুহি সিনেমা দেখতে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। ‘উৎসব’ দেখতে যাবে দুজনে। এই সিনেমার এত জনপ্রিয়তা যে, টিকেটই পাওয়া যাচ্ছিল না। তুহির বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছে টিকেট ম্যানেজ করতে। স্বাভাবিকভাবেই অন্তিক আর তুহির বাড়তি একটা উত্তেজনা ও ভালোলাগার অনুভূতি কাজ করছিল।

সেই ভালোলাগার প্রত্যাশার বেলুনটা চুপসে দিলো রাইমার দেয়া ‘তিমির’ কলম।

 

২.
স্যুভেনির-কলম-রাইমা নিয়ে ভাবতে ভাবতে অন্তিকের মনে ভীড় করে বসে ‘স্যুভেনিরের জাদুঘর’।

যেকোনো স্যুভেনির, তাজমহলের ফ্রিজ ম্যাগনেট কিংবা ব্রেমেন শহরের লোকগল্পের; কিংবা ৯০ দশকের ভিউকার্ড। ভিউকার্ড ৮০-৯০ দশকের চল ছিল। কোথাও ভ্রমণ করতে গেলে সে জায়গার উল্লেখযোগ্য কোনো স্থান কিংবা চরিত্রের অ্যালবাম সাইজের একটা ছবিতে প্রেরক প্রাপকের নাম ঠিকানা লেখার জায়গা থাকত। কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী কিংবা প্রিয় মানুষ সেই ভিউকার্ডে মেসেজ লিখে পাঠিয়ে দিতেন।

স্যুভেনির হতে পারে ডাইরি, নোটবুক, কোনো টিশার্ট, পানীয় মগ, ফটো অ্যালবাম, অর্থাৎ স্মৃতি বিজড়িত জায়গার সাথে কতিপয় কপোত-কপোতি, বন্ধুদের, পরিবারের স্মৃতির আড্ডা জমিয়ে রাখা স্মৃতি জাগানিয়া বস্তু।

অন্তিক মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে এবং অনুভব করে, স্যুভেনিরের আশ্চর্য ক্ষমতা আছে বর্তমান সময়কে থামিয়ে দেয়ার। শুধু স্যুভেনির কেন, স্মৃতি বিজড়িত যেকোনো বস্তুই সময় থামিয়ে দেয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবন-যাপনের সাথে সংশ্লিষ্ট যেকোনো কিছুরই সেই আশ্চর্য ক্ষমতা আছে!

কিন্তু বাসা বদলের দিন অন্তিক প্রতিবার টের পায় তার সে ধারণা ভুল। বাসা বদলের আসবাবপত্র গোছানোর মুহূর্তে সে আবিষ্কার করতে থাকে ওই বাসার আনাচে-কানাচে কত স্মৃতি! কত উড়োউড়ি!

অন্তিকের এমন অনুভূতি প্রকট রূপ ধারণ করে ঢাকা শহরে বাসা বদলের সময়। ঢাকা শহরের স্থায়ী কোনো বাসিন্দা সে নয়। যেহেতু কাজের সূত্রে সে ঢাকায় থাকে সেহেতু দেখা যায় প্রতি বছরেই তাকে অন্তত একবার হলেও বাসা বদল করতে হয়। তো সে অর্থে, খুব বেশি মায়া মমতা জমে ওঠে না সে বাসার প্রতি। কিন্তু বাসা বদলের দিন অন্তিক প্রতিবার টের পায় তার সে ধারণা ভুল। বাসা বদলের আসবাবপত্র গোছানোর মুহূর্তে সে আবিষ্কার করতে থাকে ওই বাসার আনাচে-কানাচে কত স্মৃতি! কত উড়োউড়ি!

তেমনিই এক স্মৃতি উসকে দিলো তখন অন্তিককে। চার বছর আগে বাসা বদলের সময় বইয়ের শেলফ থেকে বই বের করে নতুন বাসায় নিয়ে যাবার জন্য ব্যাগে ভরছিল অন্তিক আর রাইমা। সেই শেলফে উপর থেকে নিচে ৬ টার মতো তাক ছিল। কোন তাকে কি বই সাজানো হবে তা রাইমা আর অন্তিক দুজনে মিলে ঠিক করেছিল। বিয়ের পরে অন্তিক আর রাইমার ওটাই প্রথম বাসা।

রাইমা: যেহেতু জীবনানন্দ তোমার সবচেয়ে প্রিয় তাকে সবার উপরের তাকে রাখো।

অন্তিক: তাহলে কুন্ডেরার কী হবে? শাহাদুজ্জামানের কী হবে?

রাইমা: তুমিই তো বলেছিলে, এমন টাইব্রেকার পরিস্থিতি হলে কবির আত্মা প্রাধান্য পাবে।

রাইমার মোক্ষম যুক্তি মেনে নিয়ে রাইমার সিদ্ধান্তই মেনে নিলো অন্তিক। প্রথম তাকে জীবনানন্দ, দ্বিতীয় তাকে কুন্ডেরা, কামু, কাফকা। তৃতীয় তাকে মানিক, শাহাদুজ্জামান, শহীদুল জহির। চতুর্থ তাকে ইতিহাসের বই, পঞ্চম ও ষষ্ঠ তাকে গবেষণা সম্পর্কিত কিছু বই ও জার্নাল।

বই গোছানোর সময় কুন্ডেরার The Unbearable Lightness of Being বইটা হাতে নিয়ে রাইমা প্রথম পৃষ্ঠাটা অন্তিকের দিকে এগিয়ে দিলো। অন্তিকের স্বভাব ছিল বই যেদিন উপহার পেয়েছে সেদিনের তারিখ ও স্থান লিখে রাখা। বেশ পুরোনো অভ্যাস। রাইমার সে অভ্যাস অনেক পছন্দ। বইটা রাইমা উপহার দিয়েছিল অন্তিককে, আজিজ মার্কেটের তক্ষশীলা থেকে।

রাইমা লিখেছে: ‘To my Dear Dr Antik…’

নিচে অন্তিক লিখে রেখেছে:

১৯/১২/২০১১
শাহবাগ

স্থানের নিচে অন্তিক একটা স্বাক্ষর দিয়ে দিত।

বইয়ের অনেক পাতাতেই অন্তিক মার্কার দিয়ে চিহ্নিত করে রেখেছে। তার বদভ্যাস!

অন্তিক বইয়ের পাতা উল্টাতে গিয়ে শেষ খালি পাতায় গিয়ে দেখল একটা উক্তি লিখে রেখেছিল সে:

‘What a loss to spend that much time with someone, only to find out that she’s a stranger.’
(Eternal sunshine of the spotless mind)

লেখাটা পড়তেই অন্তিক বলে উঠল: কী রাইমা, তুমিও কি অপরিচিত হয়ে যাবে?

রাইমা: তুমিও তো হতে পারো? তাই না?

অন্তিক ভাবনার সাগরে ডুবে গিয়েছিল। অন্যমনস্ক উদাসীনভাবে সিনেমা দেখতে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল।

তুহি অন্তুর মাথায় একটা হাল্কা টোকা দিয়ে বলল: ‘এত দ্রুত আমি পর হয়ে যাচ্ছি। নখে ব্যথা পেলাম তোমার কলমের খোঁচায়। একটু হাতটা ধরেও দেখলে না?’

অন্তিক এমনভাবে স্যরি বলল যেন তুহি বুঝতে না পারে সে অন্যকিছু ভাবছে।

 

৩.
রাইমার সাথে অন্তিকের বিয়ের তিন বছরের মাথায় বিচ্ছেদ হয়। বিচ্ছেদ তো এমনিতেই সুখকর না। তার উপর তাদের বিচ্ছেদের পেছনে যে সময় ও মানসিক ঘাত-প্রতিঘাত গিয়েছে তা পরিমাপ করার মতো বৈশ্বিক প্যারামিটার পৃথিবীতে নেই।

পৃথিবীর অন্য বিশুদ্ধ প্রেমগুলোর মতো তাদের জীবন ঘিরে যেসব চিহ্ন, অর্থ বিস্তার করেছিল, সেরকম কিছু অভ্যাস, স্যুভেনির, টোকেনের মধ্য দিয়ে তাদের আসন্ন বিচ্ছেদের পরাবাস্তব চিত্রকল্প আঁকতে পারছিল। সেই চিত্রকল্পের একটা ছিল আমেরিকানো।

 

 

আমেরিকানো

আমেরিকানো নিয়ে রাইমা আর অন্তিকের বেশ পুরোনো সুখস্মৃতি।

২০০৭-৮ সালের দিকের কথা। কফি বলতে তখনো নেসক্যাফের ইন্সট্যান্ট প্যাকেটের যে কফি মিক্স সেটার সাথে দুধ চিনি দিয়ে মিশিয়ে একটা বাংলাদেশী সংস্করণের কফি। অন্তিক আর রাইমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন টং মোড়ে কিংবা ছোটোখাটো ক্যাফেতে বসে তাই খেতো।

অন্তিক: আচ্ছা, রাই! কফি খেলে একটা ইউরোপীয় ভাব আসে না? হা হা…

রাইমা: তাই তো দেখি! কিন্তু জানো, কফি নিয়ে মধ্যযুগে আরব দুনিয়া আর ইউরোপের মধ্যে একটা সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব ছিল? ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে সেখানে ক্যাথলিক খ্রিষ্টানেরা নাকি কফি ‘মুসলমান পানীয়’ বলে এটাকে পরিত্যাজ্য ঘোষণা করতেন পনেরো শতকের দিকে। কফির জন্ম আর প্রসার যেহেতু আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে তাই এর প্রসারে মুসলমান সমাজের প্রভাবশালী ভূমিকা ছিল বলে ইউরোপীয়দের মধ্যে মুসলমান বনাম খ্রিষ্টান একটা বিরোধীতা কাজ করত। ওদিকে ইউরোপীয়দের আভিজাত্য ওয়াইনে। কফির যদি প্রসার বাড়ে তবে ইউরোপীয় আভিজাত্যে ঘা লাগবে ভেবে এই সাংস্কৃতিক যুদ্ধের মতো কফিবিরোধী প্রচার চালাত।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো পনেরো-ষোল শতকের দিকে ভেনিসে, তৎকালীন পোপ অষ্টম ক্লেমেন্ত না কি জানি নাম, তিনি এসব কথার প্রতিবাদ করেন। তিনি বলেন যে, এই সুস্বাদু পানীয় শুধুমাত্র আরবরা কেন খাবে? আমরা কি দোষ করেছি? তো তিনি একরকম উৎসাহই দেন ইউরোপের সকল ক্যাথলিকদের কফি পান করার জন্য। এরপর তো আস্তে আস্তে লন্ডন, প্যারিসের মতো মহানগরীর বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক চর্চার মূল আখড়া হয়ে উঠল কফিহাউজগুলোই।

অন্তিক: বাহ! এসব তো জানতাম না, রাই! একটা ব্যাপার দেখস, ইউরোপ নিয়ে আমাদের মধ্যে একটা দারুণ ফ্যান্টাসি কাজ করে। এটা ঠিক যে ইউরোপ নিজের গরিমায় উজ্জ্বল। কিন্তু এর বাইরেও আমরা যারা গরিব দেশে থাকি তারা ইউরোপের মধ্যে এক ধরনের দেবত্ব আরোপ করি। ‘ইউরোপ যা করে তার সবই ভালো’ বা ইউরোপ একটা অযৌক্তিক বা অন্যায় কিছু করলেও ওটাই আমাদের রেফারেন্স হয়ে যায়।

রাইমা: ব্রাউন স্কিন, হোয়াইট মাস্ক!

২০০৭-০৮ এর সেই সুখস্মৃতি ঢাকার গড়পড়তা রেডিমিক্স কফির প্রেমজীবনের পরে অন্তিক-রাই দুজনেই ইংল্যাণ্ড পাড়ি দেয় পিএইচডি করার জন্য। ৪-৫ বছরের সে প্রবাস জীবনে তারা আমেরিকানো, লাটে, মকা, ফ্ল্যাট হোয়াইট সবকিছু যাচাই-বাছাই করে বুঝতে পারল দুজনেরই বেশি পছন্দ আমেরিকানো বা ব্ল্যাক কফি যেটা বলে থাকে সবাই।

তাদের যে-কেউ কফিশপে গেলে একত্রে দুটো আমেরিকানো নিয়ে আসা যেন রোমান্টিক রুটিনে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।

বিচ্ছেদের কয়েক মাস আগে রাইমা-অন্তিক দুজনেই একদিন এক কফিশপে গেল। অর্ডার করার সময় অন্তিক রাইমাকে বেশ অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে জানতে চাইলো, ‘তোমার জন্য লাটে অর্ডার করব নাকি অন্যকিছু?’

রাইমা হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইল অন্তিকের দিকে। চুপচাপ অর্ডার দেয়ার জায়গা ছেড়ে রাইমা কফিশপের বাইরে রাখা চেয়ারে গিয়ে বসল। গম্ভীর বিমর্ষ হয়ে ছিল। অন্তিক দুটো আমেরিকানো অর্ডার করে রাইয়ের পাশে গিয়ে বসল।

রাইকে কিছু জিজ্ঞেস করবে নাকি করবে না বুঝতে পারছিল না। কোনো কথা না বাড়িয়ে দুজনে চুপচাপ আমেরিকানো সেরে উঠে পড়ল।

বিচ্ছেদের আগে তাদের যে কথপোকথন হতো, তখনই রাই ঘুরেফিরে এই আমেরিকানো প্রসঙ্গ নিয়ে আসত। বলত: ‘সেদিনই আমি প্রথম বুঝতে পারি আমি তোমার জীবনে আর নেই। আমার আর বুঝতে বাকি ছিল না আমার আর তোমার মধ্যে একটা দেয়াল উঠছে। এই দেয়াল কে তৈরি করেছে বা করেনি সেই প্রশ্নে আমি যেতে চাই না। দেয়াল উঠছে এটাই বাস্তব’

কী লীলাখেলা! সেদিনের সেই আমেরিকানোর বারিস্তা কি জানে যে সুদূর মধ্যপ্রাচ্য থেকে রপ্তানি হয়ে আসা হাফ রোস্টেড কফি বিনের নাটকীয় কফিপাত্রের ভেতরে অন্তিক-রাইয়ের বিচ্ছেদের উষ্ণতা ধীরে ধীরে শীতল হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছিল?

এমন আরেকটা ঘটনা ঘটেছিল রিকশায়। খুবই গতানুগতিক এলেবেলে ধরনের ঘটনা। স্বয়ং ঈশ্বরও টের পাবেন না এমন মামুলি একটা ব্যাপার থেকে মসজিদ ভাঙার মতো ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

‘মানুষের মন ভাঙা নাকি মসজিদ ভাঙার সমান’!

 

রিকশা

রিকশা মানেই বাঙালি মধ্যবিত্তের নিদারুণ বিলাসিতা। রিকশা আমাদের জীবনের সর্বস্ব স্পর্শকারী যান। এরমধ্যে ‘রিকশামামা’দের আচরণ আরও মজার। বাংলাদেশীদের মধ্যে যেকোনো কর্তৃত্বকেই যে বুড়ো আঙ্গুল দেখানো যায় তার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ হতে পারে ‘রিকশামামা’দের আচরণ। রোদ, ঝড়, বৃষ্টি, ভোর, নিশিরাত, গণ্ডগোল, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি, সড়ক দুর্ঘটনা, মন ভালো, বসন্তের হাও— যেকোনো কিছুতেই ভাড়া বাড়িয়ে নেয়ার যৌক্তিকতা তৈরি করতে পারা রিকশামামাদের দুর্লভ এক গুণ।

রিকশা নিয়ে অনেক অভিযোগও আছে। আহমদ ছফার লেখা প্রফেসর আবদুর রাজ্জাককে নিয়ে বই ‘যদ্যপি আমার গুরু’ বইয়ে রাজ্জাক স্যার এক রাশিয়ান ভদ্রলোকের কথা উল্লেখ করেছিলেন। সেই রাশিয়ান (তৎকালীন সোভিয়েত শাসনামলের)কে অনেক করে বলার পরেও রাজ্জাক স্যার কোনোভাবেই রিকশায় চড়াতে পারেননি। সে ভদ্রলোকের যুক্তি ছিল খুব মানবিক। তিনি কখনো ভাবতে পারেন না এমন হাড়ভাঙ্গা কায়িক খাটুনি দিয়ে রিকশাওয়ালা তাকে বয়ে নিয়ে যাবেন।

অবশ্য ২০২৫ সালের বাংলাদেশের সকল নগরী-মফস্বল-জেলা শহর ‘বাংলার টেসলা’ দিয়ে ভর্তি। বাংলার টেসলা নামটা টিটকারি করে দেয়া। মূলত রিকশার মধ্যে ব্যাটারিচালিত ইঞ্জিন বসিয়ে দিলেই দুর্দান্ত গতিসম্পন্ন রিকশা হয়ে ওঠে।

অবশ্য ২০২৫ সালের বাংলাদেশের সকল নগরী-মফস্বল-জেলা শহর ‘বাংলার টেসলা’ দিয়ে ভর্তি। বাংলার টেসলা নামটা টিটকারি করে দেয়া। মূলত রিকশার মধ্যে ব্যাটারিচালিত ইঞ্জিন বসিয়ে দিলেই দুর্দান্ত গতিসম্পন্ন রিকশা হয়ে ওঠে। যেহেতু ইঞ্জিনের জন্য তেল লাগে না, বৈদ্যুতিক চার্জ লাগে তাই মানুষজন এর নাম দিয়েছে ‘টেসলা’।

অন্তিক-রাইমা’র রিকশাকাহিনিতে জগৎজীবনের সেই দ্রুততা তখনো আসেনি। তারা প্রেম করত কায়িক শ্রমের রিকশায়। খুনসুটি করতে করতে ক্যাম্পাসের এ কোণা থেকে আরেক কোণায় ছুটে বেড়াত। একটু আমুদে হলে তারা চুপিচাপি রিকশার হুড তুলে দিত যেন তাদের ভালোবাসার কোনো নাগরিক সাক্ষী না থাকে। রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে রিকশাই তাদের প্রেমের বাহন।

এটা একেবারে অলিখিত নির্দেশই ছিল যে রাইমা বসবে বামপাশে। অন্তিক ডানপাশে। রাইমা বামপাশ ছাড়া বসতে আরাম বোধ করে না। এভাবেই চলে আসছিল। অন্তিক প্রথমে ডানে বসে বড়োলোকি ঢং এ হাতটা বাড়িয়ে দিত রাজকন্যাকে বামপাশে বসানোর জন্য।

ডান-বামের এই প্রেমের খুনসুটিরও কোনো নাগরিক সাক্ষী ছিল না। সেসব ছিল তাদের মহাকাশে সুখে থাকার দিনলিপির কিছু অলিখিত নিয়ম মাত্র।

অনাকাঙ্ক্ষিত বিচ্ছেদের কয়েক মাস আগে তারা দুজনে মিলে কোথাও যাচ্ছিল। শপিং করতে খুব সম্ভবত। রিকশায় উঠতেই অন্তিক বসে পড়ল বামে। ঠাঁই বসে আছে। অন্তিক নিজের মতো বসে আছে। সে খেয়ালই করেনি যে রাইমা সে আমেরিকানো অর্ডারের মতো বিমর্ষ দৃষ্টিতে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে অন্তিকের দিকে।

আমেরিকানোর কথা মনে পড়ল অন্তিকের। সেদিনের সব দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে উঠল। আর তারা শপিংয়ে যায়নি সেদিন।

বিচ্ছেদের কয়েকদিন আগে তাদের সর্বশেষ কথপোকথনে আমেরিকানোর পরের প্রসঙ্গেই চিহ্ন আকারে রাই অন্তিককে রিকশার এই বাম-ডানের ব্যাপারটা উল্লেখ করে।

 

৪.
তুহি কোথায় খেয়াল করেনি অন্তিক।

আপাতত সে ডুবে আছে রাইমার দেয়া কলম, আমেরিকানো ও রিকশার হিসাব মেলাতে।

এই তিনের মধ্যে কোনো যোগসাজশ আছে কি না বোঝার চেষ্টা করছে। ভাবতে ভাবতে সে কখন ঘুমিয়ে পড়ল টের পায়নি। এই অল্প ঘুমের মধ্যে একটা স্বপ্নও দেখে ফেলল। ‘গুডবাই লেনিন’ সিনেমার ছায়া অবলম্বনে ছিল সেই স্বপ্ন।
স্বপ্নে রাইমাকে দেখল।

রাইমা অন্তিককে বলছে: ‘গুডবাই লেনিন’ সিনেমায় আলেক্স যেমন তার মায়ের জন্য একটা ফিকশনাল জগৎ তৈরি করেছিল, ঠিক তেমন একটা ফিকশনাল জগৎ আমার জন্য তুমি বানিয়ে দাও। আমাকে তুমি সেই ফিকশনাল জগৎ বানিয়ে দাও যেখানে আমি এখনো ভাবব আমি তুমি একে অপরের।’

এটুকুই মনে আছে স্বপ্নের। আরও কি কি জানি দেখেছিল তার সব আবছা আবছা মনে পড়ছে।

অন্তিক আর রাইমা ‘গুডবাই লেনিন’ একসাথে দেখেছিল। বার্লিন দেয়াল পতনের পরে সমাজতান্ত্রিক পূর্ব জার্মানি ও পুঁজিবাদী পশ্চিম জার্মানি একত্র হবার পরের কাহিনি নিয়ে দুর্দান্ত এক সিনেমা। সারসংক্ষেপ করলে গল্পটা এরকম দাঁড়ায়। সিনেমার মূল চরিত্র আলেক্সের মা ছিল পূর্ব জার্মানির সমাজতান্ত্রিক পার্টির আদর্শ লালন করা শিক্ষাবিদ। একেবারে আদর্শবাদী সমাজতন্ত্রী যাকে বলে। এদিকে ১৯৮৯ সালে পূর্ব জার্মানি ও পশ্চিম জার্মানির রাজনৈতিক ডামাডোলের মাঝে রাস্তায় বেশ মারামারি হচ্ছিল। আলেক্সও মার খাচ্ছিল রাস্তায়। সে দৃশ্য দূর থেকে দেখতে পেয়ে আলেক্সের মা কোমায় চলে যায়। প্রায় ৮ মাস ছিল আলেক্সের মা কোমায়। এর মধ্যে দুই জার্মানির একত্রীকরণের সকল আয়োজন সম্পন্ন হচ্ছিল। সমাজতান্ত্রিক পূর্ব জার্মানি বেশ দ্রুততার সাথে পুঁজিবাদী পশ্চিমের চেহারা পেতে থাকে। আলেক্স, তার বোন সকলেই সেই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে থাকে। চারিদিকে আমূল পরিবর্তন। এর মধ্যে আশ্চর্যজনকভাবে আলেক্সের মায়ের জ্ঞান ফেরে। ডাক্তার তাদের বলে দেয় তাদের মা আবারো যেকোনো বিপদে পড়তে পারে। এবং তার মায়ের স্মৃতিভ্রম হয়েছে। তিনি যেকোনো পরিবর্তন দেখে আবার মূর্ছা হতে পারেন এবং তার অবস্থা আশংকাজনক হয়ে যেতে পারে। এ শুনে আলেক্স মাকে বাসায় নিয়ে যায় এবং রুমটা এমনভাবে সাজায় যেন ঠিক পূর্বের পূর্ব জার্মানির আবহের মতো। আলেক্স প্রতিদিন পূর্ব জার্মানির সংবাদের ভিডিও বানায়, পূর্ব জার্মানির সময়ের কফি প্যাকেট যোগাড় করে রাখে, সেই সময়ের পূর্ব জার্মানির ভিনেগার জারে ভরে রাখা শসার বোতল নিয়ে আসে, জন্মদিন পালন করে তার স্কুলের বাচ্চাদের দিয়ে গান গাইয়ে, ভিডিও এমনভাবে বানায় যেন সেখানে পূর্ব জার্মানির প্যারেড সংগীত থাকে। এক কথায়, আলেক্স তার মায়ের জন্য হুবহু পূর্ব জার্মানির জগৎ তৈরি করে তাকে আশ্বস্ত করতে থাকে যে তার পৃথিবী আগের মতোই আছে। এভাবেই সিনেমা এগুতে থাকে। মৃত্যুর সময় মাকে এমন বাস্তব উপহার দেয় যেখানে সে বলে যে, পশ্চিম জার্মানির মানুষজন পুঁজিবাদের অত্যাচারে বাঁচতে না পেরে পূর্ব জার্মানিতে আসতে চাইছে। তাই সামনে দুই জার্মানি একত্র হয়ে যাবে।

এই ফিকশনাল বাস্তব নিয়েই আলেক্সের মা মারা যায়।

 

৫.
রাইমার সাথে বিচ্ছেদের আগে রাইমার দেয়া সব উপহার ও রাইমা যেসব ছোটোখাটো দৈনন্দিন অভ্যাসে উপস্থিত ছিল তার সব জিনিসই অন্তিক জমা করে রেখেছিল। বেশ কয়েকটা ব্যাগে বন্দি করে রেখেছিল সেসব।

‘গুডবাই লেনিন’ এর স্বপ্নের মতো ‘ফিকশনাল পৃথিবী’ বানানোর লোভে অন্তিক সেদিন সন্ধ্যায়ই রাইয়ের সেসব ব্যাগ খোলা শুরু করল। একে একে সাজানো শুরু করল। সব সাজানোর পরে তার নিজের ব্যবহারের যে ব্যাগ সেটা খোলা শুরু করল। সেই ব্যাগে রাইমার দেয়া অফিসের সেই স্যুভেনির কলমটা ছিল যেটাতে খোঁচা লেগে তুহি ব্যথা পেয়েছিল।

খুবই রহস্যজনকভাবে কলমটা উধাও হয়ে গেল। পরক্ষণেই অন্তিকের খেয়াল হলো, ‘তুহি কোথায়?’

তুহিও নেই। কলমটাও নেই। পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজল।

তুহিকেও, কলমটাও।

বাসার জুতার তাকে তুহির সবুজ জুতোজোড়া নেই। জুতোজোড়া অন্তিক তুহিকে উপহার দিয়েছিল।
তুহির নাম্বারে কল দিলো অন্তিক।

ওপাশ থেকে আওয়াজ এলো, ‘এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না’।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

পেশায় চিকিৎসা নৃবিজ্ঞান গবেষক। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ব্রাইটন শহরে বসবাস করছেন। মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ লেখেন। ডেভিড লিঞ্চের সিনেমা, কুন্ডেরার যেকোনো লেখাপত্র, যেকোনো যুদ্ধের ডকুমেন্টারি, বিমান দুর্ঘটনা, সমাজবিজ্ঞান, শহীদুল জহিরের লেখার জগৎ তার আগ্রহের বিষয়।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।