১.
কবে ও কীভাবে কবিতা লিখতে এসেছিলাম স্পষ্ট করে আজ আর মনে পড়ে না। প্রায় ৩৫ বছর বাংলা কবিতার উঠোনে রোদ পোহাতে পোহাতে আজ ভারি অবাক লাগে। এতগুলি বছর থেকে গেলাম! হয়তো একটিও সার্থক কবিতা লিখে ফেলা হয়নি। কিন্তু পালিয়ে তো যাইনি! কত বিচিত্র এই আমাদের কবিতার ম্যাজিকরুম! সাজঘরে বল্লম লুকিয়ে রেখে কবিতার দিকেই নিরন্তর অভিযাত্রা। ক্লাস এইটে লিখে ফেলেছিলাম একটি নাটক—‘রাজা শূলে’। বন্ধুরা মিলে পাড়ার ‘দেব ভবন’-এর হলঘরে অভিনয় করেছিলাম সেই নাটকের। ২০১৭-তে আমার লন্ডনের বন্ধু ডেভিড গাওয়ার অনুবাদ করে একটি জার্নালে প্রকাশ করেছেন সেই নাটক। ১৯৮৫-তে প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল কোচবিহারের ‘সাহিত্যপত্র নবলিপি’-তে। তারপর নিজেকে প্রস্তুতির এক চূড়ান্তের দিকেই নিয়ে গেছি আমি। প্রচুর পড়তাম। গোগ্রাসে। এক সাথে দুই তিন রকমের বই পড়তাম। আজও সেই রুটিন। পড়াশোনা আমাকে পুষ্টি যুগিয়েছে জনমভর। সাহসী করেছে। খিদে উষ্কে দিয়েছে প্রবল। জলপাইগুড়িতে বছরের অনেকটা কাটতো। কারণ জ্যাঠামশাইয়ের বাড়ি সেখানে। অনেক নুতন বন্ধু জুটে গেলো জলপাইগুড়িতে। শুভ্র চট্টোপাধ্যায়, নিলাদ্রী বাগচী, নিঝুম ঠাকুর, অতনু বন্দোপাধ্যায়, দেবাশিস কুন্ডু, মানস ভউমিক। পরে আমরা সবাই মিলে শুরু করি ‘এরকা’ পত্রিকা। কবি প্রবীর রায়, রঞ্জন মৈত্র, স্বপন রায় আমাদের উৎসাহ যোগাতে থাকেন। প্রবীর দার কদমতলার ‘শ্যামলছায়ায়’ জমে যেত আমাদের আড্ডা। স্বপ্নের উৎসব। আমাদের মধ্যে শুভ্র তখন চুটিয়ে লিখছে বাংলার অজস্র লিটলম্যাগে। বন্ধুরা হুল্লড়ে মাততাম। কবিতা নিয়ে। যাপন নিয়ে। সাইকেল নিয়ে দলবেঁধে ঘুরে বেড়াতাম। ডেঙ্গুয়াঝাড় চা-বাগানের শ্মশান ছিল আমাদের পছন্দের ঠেক। চিতায় শুয়ে শুয়ে জীবনানন্দ আর র্যাবো পড়তাম (লোকনাথ ভট্টাচার্যের অনুবাদে)। কিছু পরে আলাপ হলো সমর রায়চৌধুরী, শ্যামল সিংহ, বিজয় দের সঙ্গে। তাদের স্নেহ ও আস্কারা আমাদের ভেতর তোলপাড় এনে দিলো। ভাংচুর এনে দিলো। তখন চিঠিপত্রের সময়। কত সম্পর্ক জমে উঠছে চিঠিতে চিঠিতে। সখ্য তৈরি হলো গৌতম গুহ রায়ের সাথে। গৌতম’দা তখন টগবগে তরুণ তুর্কি। কেশর ফোলানো ঘোড়া। জম্পেশ জাদুকর। দু’চোখে অনন্ত স্বপ্ন। গৌতম’দার সততা, কাজ ও অন্তহীন স্বপ্ন আমাকে তাড়া করল তুমুল। আমি কবিতা ও স্বপ্নে ডুবে যেতে থাকলাম। এভাবেই কবিতার বাঁকে বাঁকে বহুবর্ণ সব পাখিদের ডানার ছায়া আমাকে জড়িয়ে ধরল। এভাবেই বুঝি এক না সারতে থাকা অসুখের জার্নি আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকল ভুলা মাশানের মতো।
২.
কবিতাজীবন বলে কিছু হয় কী? কবিতাভাবনা আবার কী? এই উত্তরহীন এই সমাধানহীন প্রশ্ন কেমন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়।
আসলে কবিতা লিখি। কবিতার সাথে লিপ্ত হয়ে থাকি। কবিতা আমার কাছে গভীর এক আশ্রয়। ভরসার জায়গা।
জীবন জীবনের মতো। সে জীবনে কবিতা ঘন হয়ে বসে থাকে। কবিতা থেকে দূরে কখনোই আমার জীবন হতে পারে না। হয়তো এটাই কবিতাজীবন।
জনমভরের এক স্মৃতি থাকে মানুষের। তাড়িত দুঃখের মতো সব স্মৃতি। স্মৃতি জড়িয়ে স্মৃতিকে গহীন গাঙের মতো বুকের মধ্যে টেনে নিয়েই মানুষের আস্ত এক বাঁচা। এক জন্মের বাঁচা ফুরিয়ে গেলে বাঘবনে শীত নামে। পুরোনো স্মৃতিদের সরিয়ে জায়গা দখল করে নুতন স্মৃতিরা। স্মৃতি তো মানুষের জীবনের সেরা সম্পদ। আমি সবসময় স্মৃতিকে নিজের সমগ্রতা দিয়েই অনুভব করি। কিন্তু কখনোই স্মৃতিকাতর হই না। হাতি মাহুতের পৃথিবীতে সেই কবেকার শোনা হস্তীকইন্যার গানগুলি আমার কাছে কখনো অতীত হয় না। সমকালের স্মৃতি হয়েই থেকে যায়। কিছু কিছু পুরোনো ছবি, দৃশ্য কখনোই হারিয়ে যেতে দিই না। স্মৃতির প্রবহমানতা থেকে আমি আমার সমগ্রতায় বারবার টেনে আনতে থাকি ট্রান্সজড়ানো স্মৃতিদেরকেই।
এক জন্মের বাঁচা ফুরিয়ে গেলে বাঘবনে শীত নামে। পুরোনো স্মৃতিদের সরিয়ে জায়গা দখল করে নুতন স্মৃতিরা। স্মৃতি তো মানুষের জীবনের সেরা সম্পদ। আমি সবসময় স্মৃতিকে নিজের সমগ্রতা দিয়েই অনুভব করি। কিন্তু কখনোই স্মৃতিকাতর হই না।
আমি জানি, দু’চার বছর আগে আমি যাদের সঙ্গে ছবি তুলেছি কিংবা আজ যে ছবি তোলা হবে সেসবের অনেক কিছুই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে কালখণ্ডের মলিন ধুলোয় শুয়ে থাকবে। এটাই নিয়তি। পেরিপেতাইয়া। স্মৃতি তো নদীবন্দরের হলুদবরণ পাখি। সমগ্র জীবন ধরে এই স্মৃতি মনমরা খেপলা জলের মতো আমাদেরকে জড়িয়েই রাখে।
এই অনিবার্য স্মৃতির প্রহার, পীড়ন বয়ে নিয়ে যেতে যেতে বুঝে ফেলি, আমার কবিতাভাবনায় খুব ক্রিয়াশীল থাকে এই স্মৃতির প্রহর ও প্রহারগুলি।
৩.
দেবেশ রায়। সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন। কথাশিল্পী। এক অপরূপ কথোয়াল। অনেক বছর আগে দেবেশের ‘দুপুর’ গল্পটি পড়ে আমি চমৎকৃত হয়েছিলাম। তারপর একে একে দেবেশের লেখাপত্তরের গহিনে ক্রমে ডুবে যেতে থাকা। ইতোমধ্যে দেবেশ রায়ের অগ্রজ দীনেশ চন্দ্র রায় আমার মনোযোগ কেড়ে নিয়েছেন। মাত্র ৪৮ বছর বয়সে প্রয়াত দীনেশ চন্দ্র রায় বেঁচে থাকলে বাংলা সাহিত্য ঋদ্ধ হতো। তার ‘ঐরাবতের মৃত্যু’ গল্পটি এবং ‘সোনাপদ্মা’ উপাখ্যানটি বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। দেবেশের কথায় দীনেশ চন্দ্র বহুভাবে এসেছেন।
দেবেশ ও দীনেশ তাদের কথনবিশ্ব জুড়ে কী এক দার্শনিক বিস্ময় ছড়িয়ে দিয়েছেন।
আচ্ছা মানুষ কি কখনো তার দেশ হারায়! জন্মমাটি, বেড়ে উঠবার যাপনভূমি ছেড়ে তাকে হয়তো চিরতরে নুতন এক দেশে চলে আসতে হয়। সেই দেশকে নিজের দেশ করে তুলতে হয়। কিন্তু মানুষ কিন্তু আদতে তার দেশ হারান না। তিনি তার অভ্যাসে, তার শরীরের পেশি ও মজ্জায় চিরদিনের সেই দেশকেই আমৃত্যু বহন করতে থাকেন। তাকে বহন করতেই হয়। এই তার নিয়তি। হারিয়ে যাওয়া দেশের নদী, বাড়ি, পথ প্রান্তর আর লোকগান খুব নিবিড় হয়ে বইতে শুরু করে, বয়েই যেতে থাকে তার অন্তর্গত রক্তস্রোতের ভেতরে।
দেশ ছেড়ে নুতন দেশে নুতন হয়ে ওঠা জীবন।
ব্যক্তিগতভাবে দেবেশ রায়ের ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’, ‘তিস্তাপুরাণ’, ‘মফস্বলী বৃত্তান্ত’, ‘জলের মিনার জাগাও’ পড়ে আমি দেবেশের মগ্ন পাঠক হয়ে উঠি। তিনি আমার শিক্ষক হয়ে ওঠেন। পরে প্রান্ত বয়সে এসে তিনি লিখলেন ‘বরিশালের যোগেন মণ্ডল’। এক মহাকাব্যিক আখ্যান। সময়ের দলিল। কী অসামান্য সমাজ বিশ্লেষণ! ইতিহাসচেতনার অন্তর্লীন স্রোত। কথা দিয়ে, কথার পর কথার জালকে, গল্পের পাকে পাকে পাঠককে ডুবিয়ে মারেন তিনি। দেবেশের ওঠার এই জাদু খুব তীব্র। বিরল।
দেবেশ রায়ের লেখা জুড়ে কেবল অন্তহীন মানুষ। পটভূমি জুড়ে দৃশ্যের পর দৃশ্য। তিনি দেখেন আর দেখান। মানুষ তার রক্ত ও পেশির সঞ্চালনের ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকে। বেঁচে থাকতে থাকতে আস্ত এক জীবন ফুরিয়ে যায়। এই আবহমান এক চিরকালীনতা দেবেশের কথনবিশ্বের মহামহিম এক অংশ হয়ে ওঠে। এই কারণেই তিনি দেবেশ রায়।
নুতন ব্যারেজ নুতন তিস্তাপারের বৃত্তান্ত থেকে এক দৃপ্ত প্ৰত্যাখ্যান নিয়ে চলে যাচ্ছেন বাঘারু। আমরা দেখতে পাচ্ছি মাদারির মায়ের স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের মাথার ওপর নিবিড় চাঁদ।
আবার তিস্তাপুরাণের বুড়িমা তার প্রাচীনতা নিয়েই আমাদের ঘুরিয়ে মারেন গোতের অভ্যন্তরে। সেখানে জমির গল্প আছে। বদলে যাওয়া সময়ের গল্প আছে। নদী দিয়ে ভেসে যাওয়া অলৌকিক সোলঙ্গা রয়েছে। তিস্তার চরে চোরাবালিতে ডুবতে থাকা সেই মস্ত ‘কানজি হাতির’ গল্প রয়েছে। মানুষের বহুবর্ণ যাপনের গল্প ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেবেশের পৃথিবীতে।
দেবেশ রায়, এক অপরূপ কথোয়াল। আমার কবিতাজীবন তার লেখা থেকে পুষ্টি খুঁজে নেয়।
৪.
আমাদের জীবনের ভেতর কী অসম্ভব এক মায়া! মায়ায় জড়ানো যাপন!
কোনো এক লোকমেলায় আমি দেখি শরীরে নাচ নিয়ে কণ্ঠে গান নিয়ে হাতিডোবার নদীবাঁকে গানের পর গান। নাচের পর নাচ নেমে আসছে—
‘গাও হেলানি দিয়া নাচ রে গোলাপী’
এই যে, এত এত দেখা আর মানুষের প্রতিদিনের বেঁচে থাকা; বেঁচে বর্তে থাকাটা আমাকে বিস্মিত করে! মানুষ বেঁচে থাকে কেন! এই সংশয় আমাকে তাড়িত করে। প্রতিটি দেখা থেকে আমি নুতন করে অনুবাদ করে ফেলি আরও নুতন নুতন দেখাকে। জীবনের স্বাদ নিতে থাকি ক্লান্তিহীনভাবেই।
একটা ঝুঁকে পড়া শীতকালের জন্য আমার মায়া ছিল। আমি তো জানিই যে হাটে কমলালেবু বিক্রি হয় সেই হাটে ঢেকিশাক বিক্রি না-ও হতে পারে। খেলনা বন্দুক দিয়ে আমি তো আর শিকারে যেতে পারি না। শহরে আবার ফিরে আসতে দেখি সেই সব পুরোনো যাত্রা। সেখানে লজ্জায় মুখ ঢেকে ফেলতে দেখি পার্ট ভুলে যাওয়া নায়ককে। একইসঙ্গে বাদাম ও খুচরো পয়সা রাখি পকেটে। মেলা থেকে ফিরেই ফুটো করে দেই সমস্ত বেলুন। মৃত্যু আমার প্রতিপক্ষ নয়। স্বজনের জন্য আমার শোক খুব সাময়িক। হিজল একটি গাছের নাম হলেও আমি কিন্তু হিজলের ছায়ার কাছে কখনো যাইনি। ভাঙা সম্পর্ক থেকে তাই গান উড়ে আসে। এভাবেই লাইটার ও মোমবাতির যুগলবন্দী আর আমার হাসিমুখে চাঁদের আলো।
৫.
অনন্তের এক জীবন আমাদের চারপাশে। সেই জীবনের উত্তাপ, শোক ও শ্লোকের কী এক বার্তা বুঝি বহন করে আনে! ভোরের পৃথিবীতে কী এক রহস্য জেগে থাকে, আমাকেও জাগিয়ে রাখে! দিনদুনিয়ার টুকরো গল্পগুলিকে পল্লবিত হয়ে উঠতে দেখলে আমার সমস্ত শরীর জুড়ে এক প্রবল বর্ষার ঢেউ, হয়তো খুব উঁচু কোনো পাহাড় থেকে নেমেই আসছে অন্তহীনকালপর্ব জুড়েই।
এই সব দেখা ও দেখাসমগ্রের অনুসঙ্গে একটা অদ্ভুত পরিসর নির্মিত হয়ে যায়। আমি জন্ম লিখতে শুরু করি। আমি জন্মান্তর লিখতে শুরু করি। আসলে যে যাপনের ঘেরে আমি থাকি সেই জীবন ও সেই জীবনযাপন আমাকে দিয়ে হয়তো লিখিয়ে নেয় কবিতার পর কবিতা। এটাই সত্য।
আমি কবিতা লিখি। আমার সমস্ত দেখা ও দেখানোকে নিজের যাপনের ভেতর টেনে নিয়েই। কবিতা লেখা ছাড়া আমার আর কিছুই তো করবার নেই!
৬.
অবশ্য ক্ষয় থাকে। অবক্ষয় থাকে। দাহ থাকে। জীবন ও জীবনযাপন জুড়ে। আর সাহিত্য তো জীবন থেকেই উঠে আসে। জীবনকে ধারণ করে। জ্বলন্ত ঝিনুক ভাসে শব্দের ঢেউয়ে। কিংবা ক্ষয় বা অবক্ষয় বলে কিছু হয় কি? শেষাবধি বুঝে ওঠা যায় না সবকিছু। তবে অবক্ষয় কী? সময়ের অসুখ। না কি, শহীদের লাশে লাশে ভরে যাওয়া আমাদের সবকটি ভোরের কাগজ। সমাধানসূত্রহীন হয়ে থাকি। আর ত্রাণশিবিরের দিকে পাখিগণ। অবক্ষয় তবে কী! এক নির্মাণ পেরিয়ে আরেক নির্মাণের দিকে যাত্রা।
সাহিত্য সংস্কৃতিতে ক্ষয়, ভাঙন ও অবক্ষয়ের এক চোরাস্রোত তো থাকেই। আসলে সমঝোতামনষ্ক লিখিয়েরা কেবল সুখ, সমৃদ্ধি ও সুন্দরের কথাই লিখে যেতে থাকেন। কিন্তু অন্ধকারের কথা, ক্লেদ পুঁজ রক্ত ও গলিত লাশের গন্ধ, রিরংসা, লিবিডোর কথা; বেঁচে থাকবার মরীয়া প্রয়াস, অবদমিত যৌনতার কথাও তো প্রবল উঠে আসে আমাদের সাহিত্য সৃজনে। এই ক্ষয়-অবক্ষয় নিয়েই সেজে ওঠা আমাদের ভূবনবৃত্ত। যশ ও খ্যাতির দিকে না গিয়ে অনেকেই জীবনের কুহককুয়াশার দিকে হেঁটে যেতে থাকেন। নির্মিত হয়, আছড়ে পড়ে হাংরি আন্দোলন, এংরি আন্দোলন, শাস্ত্রবিরোধী। সে এক চুরমার সমুদ্র। প্রশ্নে প্রশ্নে বিক্ষত করে তোলা সমস্ত স্বাভাবিকতাকে। যেমন জীবনানন্দ বলেছিলেন—
‘গভীর অন্ধকারের ঘুমের আস্বাদে আমার আত্মা লালিত
আমাকে কেন জাগাতে চাও?’
৭.
‘সুস্থ মৃত্তিকার চেয়ে সমুদ্রেরা কত বেশি বিপদসংকুল
তারো বেশি বিপদের নীলিমায় প্রক্ষালিত বিভিন্ন আকাশ,’
……………………………………………..বিনয় মজুমদার
অবক্ষয়ের ছড়ানো রোদের ভেতরেই তো যাপন আমাদের। এ বুঝি হাওয়ায় ওড়ানো রুমাল। মনোবিকলন পেরিয়ে ফ্রয়েডিও সন্তরণ। কিংবা বাখতিনিও তত্ত্বের চোরকাঁটাবনে হারিয়ে যাওয়া। কবি শৈলেশ্বর ঘোষের তপ্ত উচ্চারণ মনে পড়ে—
‘টক ঝাল ও গন্ধময় মদে মত্ত, এই দেশ’
বিপুল শোষণ শিল্প ও সেনায়’।
এই পৃথিবী, চারপাশের স্তব্ধতায়, হিমাঙ্কের নিচে জেগে থাকবার পরিধীতে মাঘনিশীথের কোকিলেরা ডানা ঝাড়ে। যেন, শবের উপর সামিয়ানা। আলোর বিপরীতে ক্ষয়-ক্ষত ডিঙিয়ে অবক্ষয়ের জোড়া দিঘিতে নেমে যাওয়া হাঁসেরা।
বোদলেয়ারের আশ্চর্য মেঘদল। বোদলেয়ার, যিনি নৈরাজ্যের হৈ-হল্লা থেকে অবসর খুঁজে এনে শৌচালয়ের দেওয়ালে ঝুলিয়েছিলেন। আর র্যাঁবো; মাথাভর্তি আগুন ও উঁকুন নিয়ে যেভাবে নরকবর্ণনার গানে গানে ডুবে মরেছিলেন। র্যাঁবোর কবিতার দিকে হেঁটে আসছেন ভ্যান গগ তার হলুদ বাড়ি নিয়ে, যেখানে একা একা পঠিত হবে পল গঁগার ডায়েরি। আর দেখি অরুণেশ ঘোষ লিখে রাখছেন—
‘প্রতিটি মধ্যরাতে তোমাকে পেরুতে হয়
নরক ও নক্ষত্রলোকের নদী, কোথায় স্পষ্টটা?
হেসে, বাঁ হাতে সরিয়ে দাও সব হা-হাস্যকর
শুধুই একটি আঙুলে স্পর্শ করে মাটি’।
কিংবা, কবি শামসের আনোয়ার যখন লেখেন—
‘প্রেম আর স্মৃতি আমি উড়িয়ে দিয়েছি সিগারেটের ধোঁয়ায়
জ্বর আসেনি তবুও আমি জ্বরের ঘোরেই বাঁচি’
অথচ মানুষ বেঁচে থাকে কেন—এই দার্শনিক জটের ভিতর ঢুকে পড়তে পড়তে আমাদের দেখে ফেলতে হয় আবহমানের এক চলমানতাকে।
ক্ষয় ও অবক্ষয়ের দেশে মধ্যরাতের ঘোড়া ছোটে। অনেক নদীর জল। সাঁকোর পাশে শালবন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’ থেকে চোরাবালির টানেই শিথানের পাকুড়গাছ খুঁজতে থাকে তমিজের বাপ। তারপর শূন্যতা। কুলসুম, তমিজ আর বৈকুণ্ঠ গিরি স্বপ্নে স্বপ্নে বুঝি চিরনুতন অবক্ষয়বৃত্তান্তের লোকপুরাণ হতে হতে পোড়াদহ মেলার জমজমাটির ভিতর নবীকৃত এক ক্ষয় ও অবক্ষয় দিয়ে বদলেই দিতে থাকে আমাদের কবিতার ভুবন।
৮.
কবিতা তো জন্মান্তরের কুয়াশা। অনন্ত রহস্য কবিতার পরতে পরতে। কুয়াশায় ডুবে থাকা, কুয়াশায় ডুবে মরা অন্ধকার এক রাত্রীকাল। আকাশ জুড়ে হাড়ির কালির মতো ‘হাড়িয়া ম্যাঘ’। বজ্রবিদ্যুতের গম্ভীর গর্জন। কেমন একটা অলৌকিকতা যেন পরিসর জুড়ে। কালাম ব্যাপারী বড়ো গঞ্জ থেকে হাট সেরে ফিরে আসছেন। তার গরুর গাড়ির গাড়োয়ান হাকিমুদ্দিন গান ধরেছেন, সেই কত কত পুরাতন লোকগান। গানের ওঠানামায় কেমন এক জাদু। রহস্য। গান চলতে থাকে। গান গড়াতে থাকে। নৈঃশব্দ্য জমাট হতে হতে কালাম ব্যাপারীর তিন কুড়ি সাত বয়সী শরীরের বাঁকে বাঁকে কী এক শিহরন বুঝি বুলিয়ে দিতে দিতে ব্যাপারীকে তীব্র স্মৃতিকাতরতায় নিমজ্জিত করে দিতে থাকে। ব্যাপারীর দীর্ঘ যাপনের কোনো গুপ্ত কোটর থেকে বেরিয়ে আসা স্মৃতি তাকে কুমারসাহেবের সেই বাঘশিকারের ঘটনাক্রমের কথাই মনে করিয়ে দিতে থাকে হয়তো বা! এইসব তো আসলে স্বপ্নের মতন। ম্যাজিক বাক্স থেকে উড়ে আসা রুমালের মতন। আর এভাবেই তো নৈঃশব্দ্য আর কুয়াশা ঘিরে রাখে মানুষের আবহমানের জীবনকে। আর তিন বুড়ি গোল হয়ে নাচে। মাঠে মাঠে, পাথারবাড়িতে নাচ আর গান সাজাতে সাজাতে কুয়াশা ডিঙিয়ে কেবল ভেসে আসে গান—
‘ও জীবন রে
জীবন ছাড়িয়া না যাইস রে’
তখন মরিচের খেত থেকে কী এক ব্যাকুলতা নিয়েই উড়ে যায় অগণন লাল টিয়া। রুপসীর জমিদার বাড়িতে নাচতে থাকা ময়নামতি আরও প্রবল নৈঃশব্দ্য নিয়েই ছুটে যেতে থাকে আসারীকান্দির দিকে। বগরীবাড়ির দিকে। বালাকুঠির দিকে। আর ময়নামতি দেখতে পায় টোকন ব্যাপারীর হাতি শুড় তুলে অভিবাদন জানাচ্ছে লালজি রাজাকে। আর সেই হাতির সামনে শরীরে সামান্য নাচের মুদ্রা মেখে গান গেয়েই চলেছে বুচুসুন্দরী। আর সেই গান থেকেই তো নেমে আসতে থাকে দিক ও দিগরের দিকে এক আশ্চর্য নৈঃশব্দ্যতা, যা আদতে চিরদিনের কবিতার মতন। শব্দ ও নৈঃশব্দ্য নিয়ে, কুয়াশায় কুয়াশায় এভাবেই চিরকালীন বেঁচে থাকতে হয় মানুষকে। অথচ মানুষ বেঁচে থাকে কেন—এই দার্শনিক জটের ভিতর ঢুকে পড়তে পড়তে আমাদের দেখে ফেলতে হয় আবহমানের এক চলমানতাকে। সেখানে হাকিমুদ্দিন গাড়িয়ালের গান তখন বাউকুমটা বাতাস থেকে সরে এসেছে নাল টিয়ার দিকে। আর শিকারজুলুস থেকে কালাম ব্যাপারীর স্মৃতি ঝুঁকে পড়ে জমি ও চর দখলের অতিজীবিত আখ্যানের উপরেই। এইভাবে নৈঃশব্দ্য ঘন ও গহীন হয়। এবং নৈঃশব্দ্য ডুবে মরতে থাকে সেই চোরাবালিতে হাতি ডোবার এক কালখণ্ডেই। এতসবের ফোকড়ে কখন বুঝি প্রবেশাধিকার পেয়েই যায় গান, যা আদতে চিরদিনের আবহমান আমাদের কবিতার নকশিমাদুর।
৯.
চিলাপাতার হাটে ঢোল বাজাতে বাজাতে আমার নিকটবর্তী হয়েছিল জার্মান রাভা। আন্দুবস্তীতে হাড়িয়া খেতে খেতে কত কত বছর আগে জার্মান তার জীবনের নানাকিসিমের গল্প শুনিয়েছিল। কত কত বাদ্যগান মোরগলড়াই কবরখানা ধামসা মাদল! এক ফাঁকে জেনেছিলাম শিবজির বৃত্তান্ত, যাকে গিলে ফেলেছিল মেন্দাবাড়ির হাতি। মাঠে মাঠে ঘুরি। ছড়ানো রোদের মায়ায় ভরভরন্ত শীতকাল। নকশাদার। অপরূপ। প্রান্তিক সব গঞ্জবাজারে উত্তরজনপদের, নিম্ন অসমের নদীজলবাতাসে পুষ্ট হতে হতে কেমন এক চিরকালীনতাই এসে যায় বুঝি। কত সম্পর্ক। বর্ণময় এক জীবনই তো যাপন করি। যা আমার কবিতার টানেলে খুব ঢুকে পড়তে থাকে শিশিরের শব্দের মতো।
অসমের গৌরীপুর। সাদা ফিতের এক নদী গদাধর। লাওখাওয়ার বিল। ৩০০ বলির দুর্গাপূজা। রাজা প্রভাতচন্দ্র বড়ুয়া। রাজকুমার প্রমথেশ। লালজি রাজার গল্পগাথা। আর হস্তির কন্যা প্রতিমা বড়ুয়া। জনশ্রুতিতে ‘আজার বেটি’। গৌরীপুরের পথে পথে হাঁটি। পাগলের মতো হাতি খুঁজি। সেই সব মাহুতফান্দীদের খুঁজি। আমার শরীর জুড়ে গোয়ালপারিয়া লোকগান। কাঠি ঢোল। মায়াময় এক জীবন নিয়ে আমার গতজন্মের ‘মাটিয়াবাগ রাজবাড়ি’। বিমল মালির বাজনা বাজে, বাজে সীতানন্দের সারিন্দা। প্রতিমা বড়ুয়ার গানের সুরে সুরে আমার আবহমানের অনুভুতিময় স্মৃতিকাতর কুয়াশাঘেরা জীবনের দিনগুলি জীবন্ত হয়ে বেঁচে থাকে। তুমুল এক শীতরাতে রাজবাড়ি থেকে বিমল মালির সঙ্গী হয়ে ফিরছিলাম। বিমল শোনাচ্ছিল প্রতিমার নেশাময় জীবনের হরেক গাথাগল্পগুলি। প্রতিমার জীবন, তার গান, গানময় বেঁচেবর্তে থাকবার আর্তি প্রবলভাবে উজ্জীবিত করেছিল। নাসিরুদ্দিন বিড়ি আর দেশী মদ খতে খেতে হাতিমাহুতের সে এক অন্তহীন পৃথিবী—
‘ও তোর মাহুত চড়ায় হাতি
গদাধরের পারে পারে রে’
১০.
সে এক অদ্ভূত মানুষ! যার সঙ্গে হয়তো আর দেখাই হবে না কোনোদিন। যার জন্য মন কাঁদে, বুকের ভিতর আশ্চর্য মোচড়। রাজশাহী শহরে পদ্মার পারে তার সাথে দেখা। সম্রাট স্বপন। পেশায় রিকশাচালক। পদ্মাচরে বাড়ি। বন্ধু কবি মাসুদার রহমান ও আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দেখা পেয়ে যাই সম্রাটের। ওর রিকশায় পরবর্তী ৩ দিন আমরা অন্তহীন ঘুরে বেড়াই। সম্রাট স্বপন ভবঘুরে, উদাসীন স্বভাবের। কীভাবে যেন আত্মীয়তায় বেঁধে ফেলে সে আমাদের। আমরা স্বপনের নদীচরের বাড়িতে যাই। বড্ড মায়াময় এই জীবন। হাহা হাসতে হাসতে প্রবল গান গেয়ে ওঠা সম্রাট স্বপনের।
আবার হেরম্ব বর্মণ কে কি করে ভুলি! সাহেবপোঁতার হাটে, পাটকাপাড়ার হাটে টর্চলাইট বিক্রি করত হেরম্ব। সে ছিল আমুদে, রসিক মানুষ। কোচবিহার রাজার শিকারযাত্রায় হাঁকোয়ালি করত। ‘কুষাণ পালায়’ ছুকরি সেজে খোসা নাচত। আবার হেমন্তের সদ্য কাটা ধানখেতে ঘুরে ঘুরে ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান কুড়িয়ে নিয়ে আসত। হেরম্ব গল্প বলত, যেন বহুপ্রজ এক কথোয়াল! পুরোনো দিনের সব ধনীজোতদার, কোচবিহারের রাজারাণীরাজকুমারেরা কী জীবন্ত হয়ে বর্তমানে ফিরে আসত যেন।
দিদির মৃত্যুর দিন বৃষ্টির হচ্ছিল। বৃষ্টির ভিতর মৃত দিদির মৃতদেহবহনকারী আমরা। দিদির মৃতমুখ বেদনাবাহী বৃষ্টিকণায় মিশে যেতে যেতে কেমনতর এক শোকগাথা হয়ে দিদিকে নিয়ে লেখা যাবতীয় এলিজিতে গিয়ে ঝাঁপ দেয়।
গল্পের পাকে পাকে, স্মৃতির পাকে পাকে জড়িয়ে যাওয়া জীবন। অথচ কোথাও জায়মানতা থাকে না! নদীতীরের বাতাসে তিরতির কেঁপে ওঠা জীবন। কাঠামবাড়ির জঙ্গল ভেঙে হাতিরা বেরিয়ে আসে, হাঁটতে থাকে গাজলডোবার দিকে। আমি বুঝে ফেলি, দিনে দিনে খসিয়া পড়িবে রঙিলা দালানের মাটি।
এই এত এত যাপনের রঙের বর্ণিলতা আমার কবিতাকে আলো দেয়। আমি চলাচল শুরু করি বিশ্ব কবিতার বহুস্বরিকতায়, ঘুমের দরজা ঠেলেই।
সাবানের ফেনা আমার প্রিয় বিষয়। প্রতিটি ডুবসাঁতার থেকেই আত্মঅভিমানের জন্মগাঁথা। আর লোকপুরাণের গান ঠোঁটে আমাদের যাবতীয় প্রস্থানপথ। ধানবাংলা আর বাংলা কবিতাকে পাহারা দিচ্ছে গ্রামঠাকুর। আমরা সবাই তো আসলে আমাদের কবিতায় ‘মিথ’ জাগাই। ‘বিবমিষা’ জাগাই। আমরা সবাই মিথজাত। যেমন জন্ম। জন্মদিন। ও কবিতা। আর কবিতাকে ছায়া দেয় চিরায়ত রোদ মাখা পাখিদের ডানা।
১১.
আমার বাল্যকালটা ছিল ফাঁকা ফাঁকা। শূন্যতা ও তুমুল একাকীত্ব গ্রাস করেছিল আমাকে। মাঠ ঘাট খেত হাট গঞ্জ লোকগান মানুষজনের বর্ণাঢ্যতা তীব্র আকর্ষণ করত। যত বেড়ে উঠতে থাকলাম, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ালাম উত্তরবাংলার লোকায়ত এই ম্যাজিকল্যাণ্ড, প্রান্তিক ধুলোবালি, সাবলীল নদীপ্রান্তর, আদিবাসী পাড়া, মোরোগলড়াই, হাটফেরত মানুষজন, বিচিত্রসব কথাটুকরো আর মায়াময় আকাশের বিস্তারের ভেতর আটকে গেল জীবন আমার। অন্যরকম হয়ে যেতে থাকল জীবন। একটা কিছু, যাকে বোধ বলে কউ কেউ; জেগে উঠতে থাকল আমার মগজকোষে। ঢেউসমগ্র যেন। কোথাও লোকগান শুনলেই, হাটপ্রান্তরের অংশ দেখলেই আমি গন্তব্য ভুলে যাই। এই ঘোর থেকেই আমি ক্রমে জড়িয়ে পড়তে থাকলাম কবিতার পাকে পাকে। অথচ বুঝি না কোথাও জায়মানতা থাকে কি না! কবিতা কি তবে হাটের মধ্যে বিনির্মিত হতে থাকা অন্য এক হাট?
কোনো সচেতন প্রস্তুতি নিয়ে আমি কবিতা লিখতে আসিনি। তেমনভাবে হয়তো কেউই আসেন না লিখতে। লিখব এটা ভাবিনি কখনোই। আমার জীবন, আমার বেঁচে থাকবার পরিসর, নদী-নিসর্গ-লোকায়ত আমাকে টেনে নিলো কবিতায়। আমার নুতন পৃথিবী আর তাতে হাজার হাজার বিস্ময়। প্রচুর পড়তাম। তবে কোনো বাছাই ছিল না। যা পেতাম, যা টানত সব গোগ্রাসে পাঠ করে ফেলতাম। পড়তাম আর পীড়িত উন্মাদ আমি সাঁকো থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তাম নদীতে। এখনো সুপ্রচুর পড়ি, তবে বেশ বাছাই করে। কত পরিচিত স্বজন ঘনিষ্ঠজনের এক পরিমণ্ডল তৈরি হলো। গ্রাম মহকুমা জেলা ভিনরাজ্য কিছু বিদেশে নিজস্ব স্বজনেরা গড়ে উঠলেন এভাবেই।
এটুকুই বলবার বাংলা কবিতাকে পুষ্ট করেছে প্রান্ত। প্রান্তে থেকেই কবিরা তাদের সাধনা, চর্চা চালিয়ে গেছেন। ধারাবাহিকভাবেই। এই যেমন, এখন দেখি এক ঝাঁক তরুণ কবি লিখতে চলে এসেছেন আমাদের বাংলা কবিতা। তাদের প্রায় ৯০ শতাংশই প্রান্তের। এটাই তো তীব্র আশাবাদ। বিরাট এক ভরসা।
আমি কোনো কবিতা আন্দোলনেই বিশ্বাস করি না। ‘কবিতার জন্য হাঁটুন’, ‘কবিতা বাঁচান’ এসবে আস্থা নেই আমার। বড়ো কবিসভা নয়, আমি ভরস রাখি ঘরোয়া আড্ডা ও আলোচনায়। কবিতা খুব নির্জন এক পরিসর। যিনি লেখেন তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীন।
বেনোজল আগাছা অকবিদের ধান্দাবাজদের ভিড় এসব চিরদিনই ছিল। এসব টেকে না। ইতিহাস তো তাই বলে। সাধক ও তার সাধনাই শেষ পর্যন্ত সত্য। কবি তার ভুবনজোতে নিজের মতন বাঁচে। আমাদের বাংলা কবিতা নিয়ে আমি খুব আশাবাদী। এমনিতেই আমাদের কবিতা এখন বিশ্বজনীন। সারা পৃথিবীতে অনুবাদের মধ্য দিয়ে পৌঁছে দিতে হবে আমাদের বাংলা কবিতা। সেই কাজ কিন্তু শুরুও হয়েছে। নুতন লেখকের পাশে দেখছি কত নতুন ও দীক্ষিত পাঠকদের।
কবিতার মিছিল থেকে দাউদাউ এক আগুন উঠে আসছে, ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের বাংলা কবিতার ভুবনজোতে।

সুবীর সরকার বাংলা কবিতার গুরুত্বপূর্ণ নাম। জন্ম ১৯৭০ সালের ৩ জানুয়ারি। নয়ের দশকে লিখতে আসা এ কবি উত্তরের লোকজীবনের সাথে জড়িয়ে আছেন তীব্র ভাবে। ত্রিশ বছরের বেশি সময় ধরে কবিতা গদ্য সহ বিভিন্ন ধারায় অনায়াস যাতায়াত করেছেন। ভাষার প্রায় সব কাগজে নিয়মিত লেখালিখি করছেন। ১৯৯৬ সালে তাঁর প্রথম কবিতাবই প্রকাশিত হয় কবিতা পাক্ষিক থেকে। গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ও গদ্যের বইগুলো- ধানবাড়ি গানবাড়ি, মাহুত বন্ধু রে, নির্বাচিত কবিতা, বিবাহ বাজনা, নাচঘর, উত্তরজনপদবৃত্তান্ত, মাতব্বর বৃত্তান্ত, ভাঙা সেতুর গান। পেশায় শিক্ষক এ কবি ভালোবাসেন রবিশস্যের খামার বাড়ি, সাদা ঘোড়া আর যৌথ যাপনে চাঁদের আলোয় কবিতা আড্ডা, লোকগানের আমেজ।
কবিতা পাক্ষিক সম্মান ইতিকথা সাহিত্য পুরস্কার শিতলগড় সাহিত্য সম্মান কবিতা করিডোর সম্মাননা তোর্ষা বিশেষ সাহিত্য সম্মাননা বিবৃতি সাহিত্য পুরস্কার সমিধ কবিতা সম্মাননা আলপনা স্মৃতি সম্মাননা সাহিত্যিক অমিয়ভূষণ স্মৃতি পুরস্কার।