ভার্জিনিয়া উলফ ছিলেন বিশ্বখ্যাত ইংরেজ সাহিত্যিক এবং বিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী আধুনিকতাবাদী লেখকগণের একজন। তিনি তাঁর উপন্যাসে, যেমন ‘টু দ্য লাইটহাউস’ এবং ‘মিসেস ড্যালোয়ে’-এ আলাদা ঘরাণার শৈলীর জন্য বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গণে সুপরিচিত। তবে তাঁর খ্যাতি কেবল সাহিত্যকর্মের উপর নির্ভর করে আসেনি, বরং তাঁর ব্যক্তিগত জীবন দীর্ঘদিন ধরে পাঠক ও সমালোচকদের আগ্রহের বিষয় হয়ে এসেছে।
এ কথা সত্যি যে, ভার্জিনিয়া উলফ শুধু একজন লেখিকা ছিলেন না; একই সঙ্গে তিনি ছিলেন একজন গভীর চিন্তাবিদ, কেননা তিনি মানব মনোবিদ্যা, লিঙ্গ (জেন্ডার) ভূমিকা এবং সামাজিক জটিলতা নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি নারীদের অধিকার এবং লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর নারীবাদী চিন্তাধারায় রচিত সমালোচনামূলক লেখাগুলো (যেমন ‘অ্যা রুম অব ওয়ান’স ঔন’) পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে এবং সমালোচক ও গবেষকদের কাছে সমাদৃত হয়েছে।

ভার্জিনিয়া উলফ
ভার্জিনিয়া উলফ শৈশব থেকেই বিভিন্ন কারণে মানসিক সংকটের সম্মুখীন হয়েছিলেন। তিনি খুবই ছোটোবেলায় যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন এবং পিতা-মাতা ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের হারিয়েছেন। তিনি জীবনে বারবার মানসিক অবসাদ, হ্যালুসিনেশন এবং অস্থিরতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। একসময় তিনি পুনরায় পাগল হওয়ার আশঙ্কা করেন এবং আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। পরে ১৯৪১ সালের ২৮ মার্চ বয়সে নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করেন।
‘ভার্জিনিয়া উলফ: আত্মহননের আড়ালে ভয়ংকর ও বিয়োগান্তক কাহিনি’ প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো তাঁর আত্মহননের ভাবনা, প্রস্তুতি এবং যেভাবে তিনি আত্মহত্যা করেছেন, আত্মহননের পরের ঘটনা, আত্মহননের কারণ (বিশেষ করে মৃত্যুর আগে তাঁর মানসিক অবস্থা), এবং তাঁর উত্তরাধিকার (লেগ্যাসি) বিষয়গুলো আলোচনা করা। এছাড়া স্বামী লিওনার্ডকে উদ্দেশ করে লেখা তাঁর আত্মহত্যার সম্পূর্ণ চিরকুট সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে এসবের আগে ভার্জিনিয়া উলফের জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, এই লেখায় লেখকের সাহিত্যকর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়নি, তবে প্রাসঙ্গিক ভাবে উল্লেখযোগ্য রচনার কথা এসেছে।
ভার্জিনিয়া উলফের জন্ম নাম এ্যাডেলিন ভার্জিনিয়া স্টিফেন। তিনি বিয়ের পরে স্বামী লিওনার্ড উলফের পদবী গ্রহণ করে নিজের নাম রাখেন ‘ভার্জিনিয়া উলফ’ এবং এ নামেই তিনি সাহিত্যিক হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন।
ভার্জিনিয়া উলফের জন্ম ২৫ জানুয়ারি ১৮৮২ সালে লন্ডনের দক্ষিণ কেনসিংটন এলাকায়। তাঁর পিতা স্যার লেসলি স্টিফেন ছিলেন একজন লেখক এবং মা জুলিয়া ডাকওয়ার্থ ছিলেন একজন হাসাপাতালের সেবিকা। অল্প বয়স থেকেই ভার্জিনিয়া ধ্রুপদী ইংরেজি সাহিত্য এবং ভিক্টোরিয়া যুগের সাহিত্যে বুৎপত্তি লাভ করেন। তিনি ১৮৯৭ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত লন্ডনের কিংস কলেজের ‘লেডিস ডিপার্টমেন্ট’-এ পড়াশোনা করেন। সেই সময় তিনি ধ্রুপদী সাহিত্য এবং ইতিহাসে জ্ঞান অর্জণ করেন এবং নারীদের জন্য উচ্চশিক্ষা ও নারী অধিকার আন্দোলনের প্রাথমিক যুগের সংস্কারকদের সংস্পর্শে আসেন।
স্নাতক ডিগ্রি অর্জণ করার পর ভার্জিনিয়া উলফ দ্রুত সাহিত্যের জগতে প্রবেশ করেন এবং লন্ডনের বিখ্যাত শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের সংগঠন ‘ব্লুমসবারী গ্রুপ’-এ যোগদান করেন, যা তাঁর জীবন এবং কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই সংগঠনের সদস্যরা নিয়মিতভাবে মিলিত হতেন এবং শিল্প, সাহিত্য ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন। উল্লেখ্য, সেই সংগঠনেই বিশিষ্ট প্রবন্ধকার লিওনার্ড উলফের সঙ্গে ভার্জিনিয়ার পরিচয় হয়। তাঁরা ১৯১২ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পরে ১৯১৭ সালে ভার্জিনিয়া এবং লিওনার্ড দম্পতি ‘হোগার্থ প্রিন্টিং প্রেস’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা সেই সময়ে লন্ডনের অন্যতম বৃহত্তম প্রেস ছিল। তাঁরা তাঁদের প্রেস থেকে তখনকার প্রতিষ্ঠিত লেখকদের পাশাপাশি উঠতি ও প্রতিভাবান লেখকদের সাহিত্যকর্ম প্রকাশ করেন। লেখকদের তালিকায় ছিলেন টি.এস. এলিয়ট, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, লরেন্স ভ্যান এবং ক্যাথরিন ম্যান্সফিল্ড। এছাড়া তাঁরা রুশ সাহিত্যের অনুবাদও প্রকাশ করেন।
ভার্জিনিয়া উলফের লেখালেখির জীবন শুরু হয় সাংবাদিকতার মাধ্যমে। তিনি ‘টাইমস লিটারারি সাপ্লিমেন্ট’-এ লেখা প্রকাশ করে নিজের সমালোচনামূলক দক্ষতাকে শাণিত করেছেন এবং তাঁর তার সাহিত্যকর্মের স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বিকশিত করেছেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্যা ভয়েজ আউট’ ১৯১৫ সালে প্রকাশিত হয়, যা তাঁকে একজন মননশীল উপন্যাসিক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তবে তিনি সত্যিকার খ্যাতি অর্জন করেননি, যতক্ষণ না তাঁর চতুর্থ উপন্যাস ‘মিসেস ড্যালোয়ে’ ১৯২৫ সালে প্রকাশিত হয়। এ উপন্যাসে তিনি নারীবাদ, মানসিক অসুস্থতা এবং সমলিঙ্গতা সহ আধুনিকতাবাদী বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেছেন। তারপর তিনি অন্যান্য উল্লেখযোগ্য এবং জনপ্রিয় উপন্যাস প্রকাশ করেন, যেমন ‘টু দ্যা লাইটহাউস’ (১৯২৭) এবং ‘অরল্যান্ডো’ (১৯২৮)। উপন্যাস লেখার পাশাপাশি তিনি নারীবাদী প্রবন্ধও রচনা করেন, যেমন ‘অ্যা রুম অব ওয়ান’স ঔন’ এবং ‘থ্রি গিনি’। এসব সাহিত্যকর্ম তাঁকে একজন বিপ্লবী এবং প্রখ্যাত লেখক হিসাবে সমালোচনামূলক সফলতা আনতে সাহায্য করে। উল্লেখ্য, ‘অ্যা রুম অব ওয়ান’স ঔন’ নারীবাদী সমালোচনার ভিত্তি হিসাবে গণ্য করা হয়, কেননা সেখানে তিনি নারী, লেখালেখি এবং সমাজের মধ্যে জটিল সম্পর্ক তুলে ধরেছেন। তাঁর একাধিক উপন্যাস মঞ্চ, সিনেমা এবং রেডিয়োর জন্য নাটকে রূপান্তরিত হয়েছে, যা তাঁর সাহিত্যকে নতুন দর্শকের কাছে পরিচয় করিয়েছে। মাইকেল ক্যানিংহামের ‘দ্য আওয়ার্স’, যা তাঁর ‘মিসেস ড্যালোয়ে’ উপন্যাস থেকে অনুপ্রাণিত, পুলিৎজার পুরস্কার জিতেছে এবং অস্কারজয়ী চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়েছে, যেখানে হলিউডের বিখ্যাত অভিনেত্রী নিকোল কিডম্যান অভিনয় করেন।

ভার্জিনিয়া উলফের নির্বাচিত গ্রন্থের প্রচ্ছদ
এ কথা সত্যি যে, ভার্জিনিয়া উলফ একজন স্বনামধন্য কথাসাহিত্যিকের চেয়েও বেশি ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন গভীর চিন্তাবিদ এবং মনোবিজ্ঞান, লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা এবং সামাজিক নিয়মের জটিলতা নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর সেসব লেখায় সাহিত্য এবং ইতিহাস থেকে শুরু করে রাজনীতি এবং সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি পুরুষশাসিত সমাজে নারীদের চ্যালেঞ্জ সমাধানে একজন পথিকৃৎ ছিলেন। তাঁর একটা বিখ্যাত উক্তি হলো, ‘একজন নারীর অবশ্যই অর্থকড়ি এবং নিজের একটি ঘর থাকতে হবে, যদি তিনি লেখক হতে চান,’ যা নারী সমাজের সৃজনশীল প্রচেষ্টায় বাধাগ্রস্ত অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরেছে।
ভার্জিনিয়া উলফ প্রায় ছয় বছর বয়স থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের প্রথম দিক পর্যন্ত সৎ ভাইদের হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, যার জন্য তিনি দীর্ঘমেয়াদী মানসিক দুঃসহ যন্ত্রণায় ভুগছেন। এছাড়া তিনি নিকটতম আত্মীয়-স্বজনদের, যেমন মা, বাবা ও সৎ বোনকে, হারিয়ে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। তাঁর সেসব মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সারাজীবন লড়াই করার পর, যার মধ্যে ছিল তীব্র বিষণ্ণতা এবং আত্মহত্যার চেষ্টা, ভার্জিনিয়া উলফ ১৯৪১ সালের ২৮ মার্চ ৫৯ বছর বয়সে ইংল্যান্ডের সাসেক্সে তাঁদের বাড়ির কাছে নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করেন।
একজন লেখিকা হিসাবে সুনাম অর্জন এবং স্বামী লিওনার্ডের সঙ্গে সুখের সংসার থাকার পরেও ভার্জিনিয়া উলফ অবসাদ ও মানসিক অসুখের সঙ্গে লড়াই করেছেন। জানা যায়, তিনি বিভিন্ন মানসিক চিকিৎসা করিয়েছিলেন, তবে তৎকালীন সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য গবেষণার প্রাথমিক অবস্থার কারণে চিকিৎসা ফলপ্রসূ হয়নি। সেই সময় মানসিক রোগের চিকিৎসার মধ্যে একটি ছিল রোগীর কয়েকটি দাঁত তুলে ফেলা। কেননা ১৯২০-এর দশকে মনে করা হতো যে, মানসিক রোগের সঙ্গে দাঁতের সংক্রমণ যুক্ত। আর তাই ভার্জিনিয়া উলফকেও মানসিক রোগ থেকে সুস্থ করার জন্য দাঁত তুলে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি।
যাহোক, একসময় ভার্জিনিয়া উলফের কাছে মনে হয়েছে যে, তিনি আবারও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পাগল হয়ে যাবেন এবং তিনি সেই ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে জীবন যুদ্ধে জয়ী হতে পারবেন না। তিনি তাঁর স্বামী লিওনার্ডকে উদ্দেশ করে স্বহস্তে চিঠি লিখে আত্মহননের সিদ্ধান্ত জানান, যেখানে তিনি জীবনের শেষ পরিস্থিতি ব্যক্ত করেছেন।
২৮ মার্চ ১৯৪১। দিনটি ছিল শুক্রবার।
সেদিন লিওনার্ড উলফ বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভার্জিনিয়া মানসিক ভাবে সুস্থ নন। তাই স্ত্রীকে পরামর্শ দেন যে, তিনি যেন ভেতরে গিয়ে বিশ্রাম নেন। সেই ছিল শেষবার, যখন লিওনার্ড তাঁর স্ত্রীকে জীবিত দেখেছেন।
লিওনার্ড তাঁর অফিসে যাওয়ার পরে তখন ভার্জিনিয়া বিশ্রাম নেওয়ার পরিবর্তে তাঁর পশমের কোট গায়ে জড়ান এবং ওয়েলিংটন বুট পরেন। তারপর তিনি কোটের পকেটে পাথর ভর্তি করেন আর টুপি ও হাঁটার ছড়ি তুলে নেন। অবশেষে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে সামনের গেট পেরিয়ে বাড়ির পাশেই খরস্রোতা ওউস নদীর দিকে দ্রুত হেঁটে যান। তারপর তিনি নদীতে নামেন ও পানিতে ডুবে মারা যান।
কয়েক ঘন্টা পরে লিওনার্ড তাঁর অফিস থেকে ফিরে এসে স্ত্রীর খোঁজ নিতে উপরের ঘরে যান এবং সেখানে দু’টি আত্মহত্যার চিরকুট (সুইসাইডস নোট) খুঁজে পান। একটি লেখা হয়েছে তাঁর জন্য এবং অন্যটি ছোটো বোন ভ্যানেসা স্টিফেনের জন্য। আত্মহত্যার নোট পড়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং আশপাশে খুঁজতে থাকেন। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি নদীর পাড়ে স্ত্রীর পায়ের ছাপ এবং হাঁটার ছড়ি খুঁজে পান। কিন্তু তৎক্ষণাৎ ভার্জিনিয়াকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
যাহোক, আত্মহত্যার চিরকুট পাওয়ার পর এবং ভার্জিনিয়ার দীর্ঘকালীন মানসিক অসুস্থতার ইতিহাস জানার পর তাঁর পরিবার অনুমান করেছিল যে, ভার্জিনিয়া ইচ্ছে করেই হারিয়ে গিয়ে আত্মহত্যা করেছে, কিন্তু তাঁর মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। ছোটো বোন ভ্যানেসার স্বামী ক্লাইভ বেল নিখোঁজ হওয়ার কয়েকদিন পর (৩ এপ্রিল) লেখক বন্ধু ফ্রান্সেস প্যাট্রিজকে লিখেছিলেন যে, তাঁরা আশা করছেন, ভার্জিনিয়া ফিরে আসবেন। কিন্তু দিনের পর দিন চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের আশা ক্ষীণ হতে থাকে।
‘কিছুদিন অবশ্যই আমরা আশা করেছি যে, তিনি (ভার্জিনিয়া উলফ) হয়তো উদ্ভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরি করছেন এবং তাঁকে হয়তো কোথাও কোনো ঘরে কিংবা গ্রামের দোকানে পাওয়া যাবে,’ বন্ধুকে লিখেছিলেন ক্লাইভ বেল। ‘কিন্তু এখন সব আশা ত্যাগ করা হয়েছে; শুধুমাত্র দেহটি পাওয়া যায়নি বলে তাঁকে আইনগতভাবে মৃত হিসাবে ঘোষণা করা যাচ্ছে না।’
অবশেষে সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটে এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর দুশ্চিন্তার কালো মেঘ কেটে যায়, যখন ভার্জিনিয়া নিখোঁজ হওয়ার তিন সপ্তাহ পর (১৮ এপ্রিল) এক দল শিশু পূর্ব সাসেক্সের সাউথইজ গ্রামের পাশে ওউস নদীর কিনারে তাঁর গলিত দেহ আবিষ্কার করে।
তারপর ভার্জিনিয়া উলফকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত ঘোষণা করা হয়। অপ্রত্যাশিত খবর শুনে টি.এস. এলিয়ট শোকবার্তায় লেখেন, ‘একটা জগত শেষ হয়ে গেল।’
ভার্জিনিয়া উলফের গলিত মৃতদেহ পোড়ানো হয় এবং সেই ছাই উলফ দম্পতির ইস্ট সাসেক্সে তাঁদের বাড়ির পিছনে ‘ভার্জিনিয়া’ এবং ‘লিওনার্ড’ নামের এলম গাছের নীচে সমাহিত করা হয়। ভার্জিনিয়া উলফের স্মৃতি ফলকের পাথরের উপর খোদাই করে লেখা রয়েছে:
গাছের নীচে সমাহিত করা হয়েছে ভস্ম
ভার্জিনিয়া উলফ
জন্ম: ২৫ জানুয়ারি ১৮৮২
মৃত্যু: ২৮ মার্চ ১৯৪১
মৃত্যু হলো শত্রু।
আপনার বিরুদ্ধে, আমি নিজেকে সমর্পণ করব,
অপরাজেয় এবং অনমনীয়,
হে মৃত্যু!
ঢেউগুলো এসে তীরে আছড়ে পড়েছে।
উল্লেখ্য, শেষের অংশটি ভার্জিনিয়া উলফের ‘দ্য ওয়েভস’ উপন্যাসের শেষ লাইন।

ভার্জিনিয়া উলফের স্মৃতি ফলক
বিখ্যাত অনেকেই মানসিক অবসাদের কারণে আত্মঘাতী হয়েছেন, ভার্জিনিয়া উলফের মৃত্যুও দীর্ঘকালের মানসিক অসুস্থতা এবং এবং বাইপোলার ডিসঅর্ডার রোগের কারণে হয়েছিল।
এ কথা সত্যি যে, ভার্জিনিয়া উলফের শৈশব ছিল ভয়ংকর ও একাধিক বিয়োগান্তক ঘটনায় ভরা। ছোটোবেলা থেকেই তিনি স্নায়বিক বিভ্রাটে ভুগতে থাকেন এবং একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন। তিনি ১৯১৩ সালে প্রথম আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। তারপর তিনি গুরুতর মানসিক অসুস্থতা এবং ট্রমার সম্মুখীন হন।
আত্মহননের আগে ভার্জিনিয়া উলফ স্বামী লিওনার্ড উলফকে উদ্দেশ করে নিজের হাতে লেখা আত্মহত্যার চিরকুট (সুইসাইডস নোট) রেখে যান, যা এই লেখার শেষে সংযুক্ত করা হয়েছে। সম্ভবত চিরকুটটি লেখা হয় তিন দিন আগে, অর্থাৎ ২৫ মার্চ ১৯৪১ সালে এবং সম্বোধন করা হয়েছে ‘প্রিয়তম’ হিসেবে। সেই চিরকুটে তিনি তাঁর গভীর হতাশা এবং মানসিক কষ্ট সহ্য করতে না পারার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
এছাড়া আত্মঘাতী হওয়ার নেপথ্যে হয়তো আরেকটা কারণ থাকতে পারে। জানা যায়, লিওনার্ড ১৯৪০ সালে ভার্জিনিয়ার কাছে যৌথ আত্মহত্যার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রস্তাবে ভার্জিনিয়া রাজি হননি। তখন লিওনার্ডের কাছে মনে হয়েছিল যে, জার্মানি যেকোনো সময় ব্রিটেনে আঘাত হানবে। কেননা তখন ইউরোপের বাকি অংশ নাৎসিদের দখলে চলে গিয়েছিল। একজন ইহুদি হিসাবে লিওনার্ড আশা করেছিলেন যে, জার্মান সৈনিকেরা তাঁকে গ্রেপ্তার করবে এবং তাঁর স্ত্রীকেও। একাধিক তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, হিটলারের তাত্ক্ষণিক গ্রেপ্তারের তালিকায় সত্যি তাঁদের দু’জনের নাম অন্তর্ভূক্ত ছিল। জার্মানদের হাতে ধরা পড়ার চেয়ে আত্মহত্যা হয়তো লিওনার্ডের কাছে সম্মানজনক ছিল।
তবে বিভিন্ন তথ্যসূত্রের ভিত্তিতে বলা যায় যে, ভার্জিনিয়া উলফের আত্মহননের নেপথ্যে ছিল তাঁর মানসিক অবসাদ, হ্যালুসিনেশন এবং ভয়ংকর ও বিয়োগান্তক ঘটনার তিক্ত অভিজ্ঞতা।
ভার্জিনিয়া উলফের জীবন ও উত্তরাধিকার (লেগ্যাসি) তাঁর যৌন হয়রানি, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার অভিজ্ঞতা এবং জাতি ও সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বিতর্কের বিষয় হয়েছে। গবেষক ও সমালোচকরা বিতর্ক করেন যে, তাঁর ব্যক্তিগত ট্রমা তাঁর সাহিত্যকর্মকে কতটা প্রভাবিত করেছে, তাঁর নারীবাদী রচনার ব্যাখ্যা কীভাবে করা যায়, এমনকি তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভাকে প্রাথমিক দিকের পক্ষপাতের সঙ্গে কীভাবে মিলিয়ে দেখা যায়। এসব বিতর্ক তাঁর জীবনের জটিলতাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে গবেষণা করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এছাড়া তাঁর সাহিত্যকর্ম ও জীবনযাত্রা আজও পাঠক ও লেখকদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করছে। কেননা তাঁর চিন্তাভাবনা ও লেখার শৈলী আধুনিক সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে গণ্য করা হয়।
ভার্জিনিয়া উলফের উপন্যাসগুলো প্রিয় ক্লাসিক হয়ে উঠেছে এবং তাঁর প্রবন্ধগুলো নির্দ্বিধায় তাঁকে একটি আধুনিক নারীবাদী আইকনে পরিণত করেছে। এছাড়া তাঁর দিনলিপি বা ডায়েরি (যা তিনি সারাজীবন ধরে রেখেছেন) পর্যালোচনা এবং ব্যক্তিগত চিঠি মূল্যায়ন করে এক দল প্রকৌশলী এমন সফটওয়্যার তৈরি করার আশা করছে, যার মাধ্যমে আত্মহত্যা করার প্রবণতা আগেভাগেই শনাক্ত করতে পারবে। এভাবে তিনি এমন একটি ঐতিহ্য রেখে গেছেন, যা তার জীবন বা মৃত্যুর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলা যায় যে, ভার্জিনিয়া উলফের সাহিত্য এবং নারীবাদী চিন্তার প্রভাব অপরিমেয়। অতীতে তাঁর সাহিত্যকর্ম অসংখ্য লেখক, পণ্ডিত এবং কর্মীদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে এবং সহজেই বলা যায় যে, তাঁর লেগ্যাসি আগামী প্রজন্মকেও অনুপ্রাণিত করবে।
ভার্জিনিয়া উলফ আত্মহত্যার চিরকুটে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন, কেন তিনি আত্মহননের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে তাঁর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর পুরো গল্প আরও হৃদয়বিদারক এবং একজন নারীর আতঙ্কজনক গল্প, যিনি জীবনের বেশিরভাগ সময় ট্র্যাজেডি এবং মানসিক অসুস্থতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের ভয়ংকর চিন্তা ও আশঙ্কার কাছে পরাজিত হয়েছেন।
ভার্জিনিয়া উলফ আজ বেঁচে নেই, কিন্তু তাঁর নাম, স্মৃতি এবং সাহিত্যকর্ম আজও বেঁচে আছে। তাঁর সাহিত্যকর্ম ও জীবনযাত্রা এখনো পাঠকদের এবং লেখকদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করছে। এ কথা সত্যি যে, তাঁর চিন্তাভাবনা এবং লেখার শৈলী আধুনিক সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভার্জিনিয়া উলফ স্বামী লিওনার্ড উলফকে উদ্দেশ করে স্বহস্তে লেখা আত্মহত্যার চিরকুট (সুইসাইড নোট) রেখে গিয়েছেন, যা নিচে তুলে ধরা হলো:

ভার্জিনিয়া উলফের স্বহস্তে লেখা আত্মহত্যার চিরকুট (সুইসাইডস নোট)
প্রিয়তম,
আমি নিশ্চিত যে, পুনরায় আমি পাগল হতে যাচ্ছি। আমার মনে হয়, আমরা আরেকটি ভয়ংকর সময় পার করতে পারব না। আর এবার আমি সেরে উঠব না। আমি কণ্ঠস্বর শুনতে শুরু করেছি এবং কোনো কিছুতে মনোযোগ রাখতে পারছি না। তাই আমি সেই কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যা আমার কাছে সবচেয়ে ভালো মনে হয়েছে। তুমি আমাকে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য সুখ-আনন্দ দিয়েছ। তুমি সব দিক থেকে এমন একজন হয়ে থেকেছ, যা যে কেউ হতে পারত। যতক্ষণ না এই ভয়ংকর রোগ এসে আমার জীবনের পথ আগলে দাঁড়িয়েছে, তার আগে মনে হয়নি এই দু’জন মানুষ এত বেশি সুখী হতে পারত। আমি আর লড়াই করতে পারছি না। আমি জানি যে, আমি তোমার জীবন এমনভাবে নষ্ট করছি যে, আমাকে ছাড়া তুমি কাজ করতে পারবে না। তবে তুমি পারবে, আমি বিশ্বাস করি। তুমি দেখছ, আমি এটাও ঠিকভাবে লিখতে পারছি না। আমি পড়তে পারি না। আমি যা বলতে চাই, তা হলো আমার জীবনের সমস্ত সুখের জন্য আমি তোমার কাছে ঋণী। তুমি আমার সঙ্গে সম্পূর্ণ ধৈর্যশীল ছিলে, অবিশ্বাস্যভাবে ভালো ছিলে। আমি তাই বলতে চাই—যা সবারই জানা আছে। যদি কেউ আমাকে বাঁচাতে সক্ষম হতো, তবে তা একমাত্র তুমিই হতে। আমার কাছ থেকে সবকিছু চলে গেছে, শুধুমাত্র তোমার ভালো ব্যবহার এবং সহানুভূতির নিশ্চয়তাটুকু রয়ে গেছে। আমি আর তোমার জীবন নষ্ট করতে পারব না।
আমার মনে হয় না, আমাদের চেয়ে অন্য দু’জন মানুষ বেশি সুখী হতে পারত।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: বর্তমান প্রবন্ধ লেখার জন্য আমি আমি বিভিন্ন সূত্র, যেমন বিভিন্ন গবেষণাপত্র ও রচনা, খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রবন্ধ ও নিবন্ধ, অনলাইন ম্যাগাজিন এবং এমনকি মনস্তাত্ত্বিক জার্নালে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য ব্যবহার করেছি। আমি সমস্ত লেখকদের কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।

গল্পকার, ছড়াকার এবং অনুবাদক। লেখালেখির শুরু সত্তরের মাঝামাঝি। ঢাকার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার সাহিত্য পাতায়, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক এবং অনলাইন ম্যাগাজিনে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে তার মৌলিক এবং অনুবাদ গল্প। এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে দুটি গল্পের সংকলন, চন্দ্রপুকুর (২০০৮) ও কতটা পথ পেরোলে তবে (২০১০)। এছাড়া, তার অনুবাদে আফগানিস্তানের শ্রেষ্ঠ গল্প (২০১৩), নির্বাচিত নোবেল বিজয়ীদের সেরা গল্প (২০১৩), ইরানের শ্রেষ্ঠ গল্প (২০১৪), চীনের শ্রেষ্ঠ গল্প ও নির্বাচিত ম্যান বুকার বিজয়ীদের সেরা গল্প ইত্যাদি প্রকাশিত হয়েছে।