রক্তের ভিতরে সূর্যের ছায়া
রাত তিনটে।
শহরের গলিতে গলিতে বাতাসের গন্ধে লেগে আছে এক পুরোনো শোক।
স্মৃতির উপর মোমবাতির আলো পড়ে কাঁপছে।
আমি—অর্জুন নই, কর্ণও নই, তবু দুইয়ের মাঝখানে আটকে থাকা এক মানুষের ছায়া।
একটাও নাম নেই আমার—
সবাই ডাকে ‘কার্তিক’…
কিন্তু আয়নার ভেতরে আমি দেখি,
এক লালবর্ণ বর্মহীন মুখ—
যে মুখে কুন্তীর চোখের রেখা।
মোবাইল স্ক্রিনে মায়ের মেসেজ—
‘তুই আবার ওই মেয়েটার সঙ্গে কেন?’
আধুনিক কুন্তীর ভাষায়
মাতৃত্ব এখনও নিয়ন্ত্রণের অন্য নাম।
আর আমি? আমি শুধু একটা বর্জিত সন্তান—
যার বাপের নাম আজও আলো আর অন্ধকারের মাঝখানে ঝুলে আছে।
রাতটা গরম, জানালার বাইরে বৃষ্টি আসার আগুন।
আমি ঘুমাতে যাই, আর স্বপ্ন দেখি—
বুড়িগঙ্গার ধারে এক অচেনা নগরী,
সেখানে এক যুবক, বর্ম পরে দাঁড়িয়ে আছে
সূর্যোদয়ের দিকে,
তার কণ্ঠে বেজে ওঠে লৌহের মতো এক বাণী—
‘আমি ন্যায়ের জন্য জন্মাইনি, আমি জন্মেছি নিজের অস্তিত্ব প্রমাণে।’
বজ্রপাত।
স্বপ্ন ভাঙে।
কিন্তু জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখি—
আমার বুকের ভেতর এখনো বাজছে ধাতুর শব্দ।
কর্ণ কি আমার ভেতর বেঁচে আছে?
নাকি আমি কর্ণেরই এক আধুনিক অবতার,
যে এখন নিজের মা-কে ব্লক করে রেখেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়?
কুন্তীর ই-মেইল
আজ ভোরে এক অচেনা ই-মেইল এলো—
‘Subject: My Son, Forgive Me.’
প্রেরক: kunti@kurulegacy.org
আমি প্রথমে ভাবলাম এটা স্প্যাম।
কিন্তু খোলার পর দেখি—
চিঠির মধ্যে হালকা সোনালি আলোর রেখা নাচছে,
স্ক্রিনের অক্ষরগুলো গলে গলে পড়ছে কাগজে,
আর এক মাতৃকণ্ঠ ধীরে ধীরে আমার মাথার ভেতরে গুনগুন করছে—
‘কার্তিক, আমি তোমার নাম দিয়েছিলাম সূর্যবীজ।
তুমিই সেই আগুন, যাকে আমি সমাজের ঠান্ডা জলে ডুবিয়ে রেখেছিলাম।
ক্ষমা কোরো না আমাকে, শুধু মনে রেখো—
রক্ত সব সময় নিজের আলোককে চিনে নেয়।’
আমি ল্যাপটপ বন্ধ করি।
কিন্তু ঘরের দেয়ালে তখনও জ্বলছে সূর্যের প্রতিফলন।
কর্ণের চিৎকার,
কুন্তীর অনুতাপ,
আর আধুনিক সময়ের সেই অনন্ত প্রশ্ন—
আমরা কি আমাদের জন্মের দায় থেকে কখনও মুক্ত হই?
শহরের যুদ্ধক্ষেত্র
আজ শহরে ধর্ম আর উন্নয়নের নামে যুদ্ধ।
রাস্তার পোস্টারে প্রতিটি মুখ যেন নতুন কুরুক্ষেত্রের সৈনিক।
আমি হেঁটে যাই ভিড়ের মধ্যে, আর ভাবি—
যুদ্ধ কি কেবল বাহিরে হয়,
নাকি ভেতরের কর্ণ ও অর্জুন প্রতিদিন
নতুনভাবে মুখোমুখি হয়—
একই শরীরে, একই চিন্তার যুদ্ধক্ষেত্রে?
বাতাসে ভেসে আসে এক নারীকণ্ঠ—
রেডিওতে কেউ গাইছে রবীন্দ্রনাথ,
‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে…’
আমি হাঁটতে হাঁটতে বুঝি,
এই ‘একলা’ পথটাই কর্ণের পথ,
এবং হয়তো আমারও।
মিথ ভেঙে যায়,
বাস্তবতার ভেতর থেকে উঠে আসে জাদু—
ই-মেইলের আলো, স্বপ্নের বজ্র, মায়ের অনুতাপ,
সব এক হয়ে যায় এক অস্তিত্বচেতনার মৃদু কম্পনে।
কর্ণ আর কুন্তী আর দুজন নয়—
তারা এখন প্রতিটি মা আর সন্তানের মাঝে থাকা
অকথিত দূরত্বের প্রতীক।
সূর্যবীজের স্বপ্ন
রাতের আকাশ ফেটে গেছে নিঃশব্দে।
একটি হলুদ আলো জানালার ফাঁক গলে এসে
আমার বুকের ভেতর ঢুকে যায়—
যেন সূর্য নিজে কোষের মধ্যে ডিম পেড়ে গেছে।
ঘুম ভাঙে না পুরোপুরি,
তবু দেখি—আমি আর এই শহরের কার্তিক নই,
বরং এক যুদ্ধবাজের শরীরের ভেতরে রয়েছি—
যার বর্ম সোনার নয়,
বরং রক্তে ভেজা নিঃশব্দ অনুশোচনার ধাতু দিয়ে তৈরি।
স্বপ্নের মধ্যে কণ্ঠ ভেসে আসে—
‘তুমি সূর্যবীজ, তুমি অন্ধকারের ভিতরে আলো ছড়াতে জন্মেছো।’
আমি চিৎকার করি,
‘কিন্তু আলো কি আমাকে চায়?
যে মা জন্ম দিয়েও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল,
সে কি এখন আমাকে দেখবে?’
আলো উত্তর দেয় না।
শুধু আমার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে পুড়ে যাওয়া পত্রিকার গন্ধ,
যেন সময়ের সংবাদও একপ্রকার অশ্বত্থের পাতার মতো—
প্রতিদিন নতুন হয়, কিন্তু মূল শিকড় পুরোনোই থাকে।
স্বপ্নের শহরে আমি হাঁটতে হাঁটতে দেখি—
গগনচুম্বী ভবনগুলো দানবের মতন হেসে উঠছে,
বিজ্ঞাপনের পোস্টারে লেখা—
‘আলো কিনুন, ছায়া ফ্রি!’
আমি জানি, এই আলো বাজারের,
কিন্তু আমার ভেতরের সূর্য বিক্রি হয় না।
সে শুধু জ্বলে,
যতক্ষণ পর্যন্ত না নিজেরই ছাই হয়ে যায়।
বাতাসে কেউ বলে—
‘তুমি কর্ণ, তুমি রক্তের সন্ত্রাসে জন্মানো এক ন্যায়।’
তখন আমার চোখ খুলে যায়।
সকালের সূর্য জানালায়,
ঘরের কোণে রাখা আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখি—
একটা আধা পোড়া মুখ, আধা হাসি,
আর চোখে সূর্যের ছায়া।
আমি বুঝি—
স্বপ্ন এখন আর আলাদা নয় বাস্তব থেকে।
আমার ভেতরের কর্ণ আর বাইরে থাকা কার্তিক
একই দেহে মিশে গেছে।
কুন্তীর স্বীকারোক্তি — ড্রাফট বক্সে ফেলে রাখা চিঠি
ল্যাপটপের পর্দা জ্বলে উঠল।
রাত তখন দুটো, শহর ঘুমিয়ে,
শুধু আমার বুকের ভিতরে ঘূর্ণায়মান বাতাসের আওয়াজ—
যেন কেউ আমার পাঁজরের ভিতরে কিবোর্ড টিপে চলেছে।
ইনবক্স নয়, আমি খুলে বসি ড্রাফটস ফোল্ডারে।
সেখানে অসংখ্য অপঠিত চিঠি—
যেগুলোর প্রাপক সব এক: কার্তিক।
আমার ছেলে।
যে জানে না আমি তার মা,
আর আমি জানি না তাকে কী নামে ডাকি—
সূর্যবীজ, না কর্ণ, না কেবল এক অনন্ত আলোকদাগ।
চিঠির প্রথম লাইনে লিখেছিলাম—
‘বাবা, তোমাকে পৃথিবীকে বুঝে তোলার আগেই আমি পৃথিবীর ভয় বুঝেছিলাম।’
কিন্তু আমি কখনও পাঠাইনি সেই ই-মেইল।
কারণ পৃথিবী ক্ষমা করে, সমাজ করে না।
আর মাতৃত্ব?
সে এক অদ্ভুত সফটওয়্যার—
ভালোবাসার ডেটা জমা রাখে,
কিন্তু পাপের ভাইরাসে নিজেই নিজেকে করাপ্ট করে ফেলে।
আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখি—
আমার চোখের প্রতিফলনে এক তরুণ দাঁড়িয়ে আছে,
তার গায়ে বর্মের মতো জ্বলছে ল্যাপটপের নীল আলো।
সে কিছু বলে না,
কিন্তু আমি শুনতে পাই তার নীরবতার ভাষা—
‘তুমি কেন আমায় পরিত্যাগ করলে, মা?’
আমি চুপ।
কারণ সেই উত্তর নেই আমার কাছে,
যেমন ঈশ্বরের কাছেও নেই মানুষের সমস্ত অশ্রুর হিসেব।
মাউসের কার্সর ঘুরে ঘুরে থেমে থাকে ‘Send’ বোতামে।
আঙুল কাঁপে।
হঠাৎ স্ক্রিনে ঝলকে ওঠে এক সূর্যচিহ্ন—
যেন সফটওয়্যারের গ্লিচ নয়,
বরং সময়ের পর্দায় সূর্যের নিজস্ব সাইন-ইন।
ঘরের আলো নিভে যায়,
তবু স্ক্রিনে সেই ই-মেইল নিজে থেকেই পাঠিয়ে দেয় নিজেকে,
কোনও প্রাপক ছাড়াই।
প্রেরক ও প্রাপক—একই আত্মা।
আমি বুঝি, হয়তো মা-ছেলের সম্পর্কও
এমনই কোনও অসীম ড্রাফট বক্স,
যেখানে কেউই ‘Send’ চাপতে পারে না,
কিন্তু দুজনেই একে অপরের বার্তা
হৃদয়ের ইনবক্সে পড়তে পায়—
শব্দহীন, অথচ অনন্ত।
সকালে যখন ঘুম ভাঙে,
জানালার ধারে সূর্য হাসছে,
আর আকাশে হালকা ই-মেইল-রঙের মেঘ ভাসছে।
আমি জানি, কর্ণ (কার্তিক)
আমার পাঠানো সেই বার্তা কোনও না কোনওভাবে পেয়ে গেছে—
কারণ আজ তার বুকের ভেতরও নিশ্চয়ই
এক নতুন আলো জন্ম নিয়েছে।
কর্ণের আত্মবচন — আলো থেকে পতন
সূর্য ডোবে না, শুধু নিজের ছায়া হারায়।
আমি তাকিয়ে আছি জানালার বাইরে—
শহরের আকাশে নিঃশেষ আলো,
নিয়ন সাইনবোর্ডে লেখা ‘SALE’,
মানুষের মুখে মুখে দাম,
কিন্তু সম্পর্কের কোনো ট্যাগ নেই।
আমার বুকের মধ্যে এক শব্দ বাজছে—
‘সূর্যবীজ।’
এটা মা ডেকেছিল,
নাকি ভেতরের ঈশ্বরের কোনো পাসওয়ার্ড ছিল সেটা আমি জানি না।
আজ সারাদিন অফিসে কাজ করেও ক্লান্তি আসেনি।
শুধু মনিটরের আলোয় মাঝে মাঝে
দেখেছি নিজের মুখ বদলে যাচ্ছে—
একবার আধুনিক, একবার পুরাণের।
কোনটা সত্যি?
আমি কর্ণ নই, তবু আমার শরীরে কর্ণের হাড়।
আমি কার্তিক নই, তবু আমার হৃদয় সেই বঞ্চিত ছেলেটির মতোই—
যে সূর্যের দিকেই ছুটে যায়,
কারণ ছায়ার মধ্যে তার জায়গা নেই।
সন্ধেবেলা রাস্তা পার হতে গিয়ে দেখি—
এক বৃদ্ধা ভিক্ষা চাইছে, মুখে সূর্যের দাগ,
চোখে অদ্ভুত এক নরম পরিচিতি।
আমি থেমে যাই, পকেট থেকে টাকা বের করি,
কিন্তু তার হাত ধরা মাত্র শরীরটা কেঁপে ওঠে।
তিনি তাকিয়ে বলেন—
‘তোমার গায়ে গরম পড়ছে কেন, বাবা?’
আমি বলি—
‘আমি আগুন থেকে তৈরি, মা।’
এই শব্দ ‘মা’টা মুখ থেকে বের হতেই
সব কিছু বদলে যায়।
রাস্তার আলো নিভে যায়,
বাতাসে লালচে ধোঁয়া,
শহর গলে গিয়ে রক্তের নদী হয়ে যায়।
আমি দেখি, আমি দাঁড়িয়ে আছি কুরুক্ষেত্রের মাঝখানে—
কিন্তু সৈন্যরা সবাই আধুনিক পোশাক পরা,
কেউ হাতে মোবাইল, কেউ লাঠি, কেউ পোস্টার।
তারা চিৎকার করছে—
‘ন্যায়! ধর্ম! উন্নয়ন!’
কিন্তু কারও চোখে আলো নেই,
সবাই কেবল নিজেদের ছায়ার সঙ্গে লড়ছে।
আমি বুঝি,
এই যুদ্ধটাই আমার নিয়তি—
যে আলোতে জন্মেছি,
সেই আলোকেই আমাকে পুড়ে মরতে হবে।
হঠাৎ আকাশে বজ্রপাত—
আমি শুনি সেই ই-মেইলের শব্দ: ‘My Son, Forgive Me.’
মায়ের কণ্ঠ নেমে আসে বজ্রের ভেতর থেকে,
আর আমি হাঁটু গেড়ে বসে পড়ি ধুলোয়।
আমার বর্ম ফেটে যাচ্ছে,
বুকের ভেতর আগুন, চোখের ভেতর পানি।
এই কি ক্ষমা?
না এই-ই পতন?
আমি কাঁদি না,
শুধু ধীরে ধীরে বুঝি—
আলো থেকে পতন মানেই অন্ধকার নয়,
এ মানে আলোর ভিতরেই নিজের সীমা খুঁজে পাওয়া।
সূর্যও তো প্রতিদিন মরে,
তবু পরদিন আবার উঠে আসে,
যেন জন্মের অপরাধ মুছে দিতে।
আমিও উঠব একদিন,
কিন্তু কারও পুত্র হয়ে নয়—
নিজের নামেই আলো হবো।
সকাল হয়।
ঘরের আয়নায় দেখি—
আমার মুখের ভেতর এখন সূর্য নেই,
আছে শুধু এক শান্ত ছাইরঙা আলোকবিন্দু।
হয়তো পতনই ছিল জন্মের অন্য নাম।
পুনর্জন্ম — মায়ের কণ্ঠে সূর্যের প্রত্যাবর্তন
বৃষ্টি পড়ছে।
জানালার ধারে বসে কার্তিক তাকিয়ে আছে ভেজা রাস্তায়।
জলের মধ্যে নেমে আসছে নরম রোদ,
যেন কেউ ওপর থেকে আলো ঢেলে দিচ্ছে নিঃশব্দে।
ল্যাপটপটা খোলা,
স্ক্রিনে শুধু একটাই লাইন—
‘Message Delivered : 06:02 AM’
কিন্তু ইনবক্সে কোনো নতুন ই-মেইল নেই।
তবু সে জানে, কিছু একটা বদলে গেছে।
মাথার ভেতর এক কণ্ঠ ঘুরে বেড়াচ্ছে—
সেই পুরোনো, মায়াময়, অব্যক্ত সুর:
‘কার্তিক, আমি এখন তোমার মধ্যে আছি।’
সে চমকে ওঠে।
ঘরের কোণে আলো জমে ওঠে ধীরে ধীরে—
না, এটি বিদ্যুতের আলো নয়,
বরং এক অদৃশ্য উষ্ণতা,
যা তার বুকের ভেতর থেকে বাইরে ছড়িয়ে যাচ্ছে।
তার চারপাশের সময় থেমে যায়।
ঘড়ির কাঁটা স্থির,
ট্রাফিকের শব্দ দূরে মিলিয়ে যায়,
শুধু বাতাসে মায়ের গন্ধ—
মিষ্টি অথচ ধাতব, যেন ঘামে মেশানো সোনার মতো।
কার্তিক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে মেঝেতে।
চোখ বন্ধ করতেই
দেখে সে এক বিশাল আকাশ—
নক্ষত্রেরা ঘুরছে, সূর্য ওঠে না, তবু আলো আসে।
সেই আলোর ভেতর দাঁড়িয়ে এক নারী,
তার শরীর আধা আলো, আধা ছায়া।
চোখে অশ্রু, ঠোঁটে মমতা।
‘তুমি?’
কার্তিকের গলা কাঁপে।
নারী মৃদু হাসে—
‘আমি তোমার অস্বীকার, আবার তোমার জন্মও।
আমি কুন্তী, কিন্তু এই যুগে নাম আমার কুন্তলা দত্ত—
যে একদিন ভয় পেয়ে ছেলেকে সমাজের নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিল।’
কার্তিকের চোখে পানি আসে।
সে বলে,
‘মা, তুমি আমাকে ত্যাগ করেছিলে কেন?’
নারী উত্তর দেয় না।
শুধু এগিয়ে এসে তার কপালে স্পর্শ করে।
তৎক্ষণাৎ চারপাশের সবকিছু সোনালি রঙে ভরে যায়—
বৃষ্টি থেমে যায়, কিন্তু জানালার বাইরে আলোর বিন্দুগুলো
সূর্যকণার মতো নাচতে থাকে বাতাসে।
‘আমি তোমাকে ত্যাগ করিনি, বাবা,’
সে বলে,
‘আমি শুধু তোমাকে পৃথিবীর ভয় থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু বুঝিনি, তুমি-ই তো সেই ভয়কে আলো বানাবে।’
কার্তিক বলে,
‘তাহলে আমি কে এখন?’
কুন্তী মৃদু স্বরে বলে,
‘তুমি সূর্যবীজ।
তুমি আলো থেকেও জন্ম নাও,
আর ছায়াকেও আলোকিত করো।’
তারপর হঠাৎ সবকিছু মিলিয়ে যায়—
শুধু বাতাসে থাকে মায়ের গলার উষ্ণতা।
কার্তিক উঠে দাঁড়ায়,
তার চোখে জ্বলছে এক অদ্ভুত শান্ত সূর্য,
যা আর দহন নয়, বরং উপলব্ধির আলোক।
সন্ধ্যায় শহরের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সে থামে এক নদীর ধারে।
গোধূলির আকাশে মেঘ ভাঙছে,
আর পানিতে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে সে ফিসফিস করে—
‘তুমি আমায় ফিরিয়ে দিয়েছো, মা।
এবার আমি আলো হবো,
কিন্তু কারও চোখে নয়—
নিজের ভেতর।’
পানির ঢেউ নড়ে,
তার মধ্যে ঝলসে ওঠে সূর্যের প্রতিফলন,
যেন নদী নিজেই বলছে—
‘সূর্য ফিরে এসেছে।’
জাদুবাস্তব আলোকপত্র — কে মা, কে সন্তান?
রাত নেমেছে, কিন্তু আলো নিভে না।
শহর ঘুমোয়, অথচ বাতাসে এক অদ্ভুত কম্পন—
যেন পৃথিবীর ভেতরে কেউ নতুন করে শ্বাস নিচ্ছে।
কার্তিক জানালার ধারে বসে,
ল্যাপটপ বন্ধ, ফোন অফ,
শুধু টেবিলে এক খোলা নোটবুক।
পাতায় লেখা—
‘সূর্যবীজ — অধ্যায়হীন আলোর গল্প।’
সে লেখে না, শুধু শোনে—
বাতাসের ভেতর মায়ের নিশ্বাস,
আর নিজের বুকের ভেতর সেই সূর্যস্বর:
‘তুমি আমি, আমি তুমি।’
দূর থেকে ভেসে আসে ভোরের আজানের সুর,
তার সঙ্গে মিশে যায় মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি—
দুটি ধর্ম, দুটি ভাষা,
কিন্তু একই তাল, একই আলো।
কার্তিক ভাবে—
সম্ভবত এই পৃথিবীতেই
প্রতিটি মা কুন্তী, প্রতিটি সন্তান কর্ণ,
যারা একে অপরকে চিনে নেয় শুধু সময়ের পরে।
তখন ঘরে একটুখানি আলো জ্বলে ওঠে—
না, বৈদ্যুতিক নয়,
এ আলো পায়ের নিচের ধুলো থেকে,
দেয়ালের ভেতর থেকে, বাতাসের চোখ থেকে আসে।
আলো যেন লিখছে অক্ষরহীন চিঠি,
পাতায় নয়—মানুষের ভেতরে।
সে ফিসফিস করে,
‘এ আলো কার?’
ভেতর থেকে উত্তর আসে—
‘এ আলো তোমারও নয়, মায়েরও নয়,
এটা সেই আদিম আলোকবীজ,
যেখান থেকে জন্ম নেয় করুণা, ভয়, ভালোবাসা, ও ক্ষমা।’
সব শব্দ থেমে যায়।
সমস্ত দুঃখ যেন হালকা হয়ে বাতাসে ভেসে ওঠে।
কার্তিক জানে—
মৃত্যু মানে শেষ নয়,
বরং অন্য কারও নিশ্বাসে নিজের বেঁচে থাকা।
ভোর।
বৃষ্টি থেমে গেছে, আকাশে স্বচ্ছ আলো।
একটি পাখি জানালার ধারে বসে ডাকছে—
তাকে দেখে কার্তিকের মনে হয়,
কুন্তী আজও আছে,
শুধু রূপ বদলে গেছে—
কখনও আলো, কখনও বাতাস, কখনও নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বর।
সে নোটবুকের শেষ পাতায় লেখে—
‘সূর্য আর কখনও ডোবে না।
কারণ সে এখন মানুষের ভেতরে জ্বলে—
নামহীন, রক্তে, চিন্তায়, ভালোবাসায়।’
পাতা বন্ধ হয়,
আর ঘরে ছড়িয়ে পড়ে এক স্বচ্ছ নীরবতা—
যা শব্দের চেয়ে বেশি জীবন্ত,
অন্ধকারের চেয়ে বেশি আলোকিত।
‘সূর্যবীজ’ শেষ হয় না,
কারণ এটি কোনো একক গল্প নয়—
এটি মা ও সন্তানের,
অস্বীকার ও ক্ষমার,
জন্ম ও পুনর্জন্মের চিরন্তন আলোকচক্র।
শেষে রয়ে যায় শুধু এক প্রশ্ন—
‘কে মা, কে সন্তান?’
উত্তর নেই,
কারণ দুজনেই একে অপরের সূর্য।

মূলত কবি ও কথাসাহিত্যিক; অনুবাদ ও গবেষণায় রয়েছে সমান আগ্রহ। বাংলা একাডেমির রিসার্স-ফেলো হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা থেকে পি-এইচ. ডি সম্পন্ন করেছেন ২০০৪ সালে। বাংলাদেশের সরকারি কলেজে দর্শন বিভাগে অধ্যাপনায় নিয়োজিত। তার কবিতা তাইওয়ানিজ, চীনা, নেপালি, আজারবইজানিজ, তার্কি, রোমানিয়ান, আরবি, ইতালীয়, অসমীয় ও স্পেনীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইংরেজি ভাষায় বিশ্বের বিখ্যাত জার্নাল ও ব্লগগুলোতে নিয়মিত কবিতা লিখে যাচ্ছেন। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে তিনি ইংল্যান্ডের ‘THE POET’ পত্রিকা কর্তৃক ‘International Poet of the Week’-এ ভূষিত হয়েছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৫টি। বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার (২০১১); চিহ্ন পুরস্কার (২০১৩); দিনাজপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমি গুণীজন সম্মাননা (২০১৪); উপমা সাহিত্য পুরস্কার (২০২১) অর্জন করেছেন। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ : ‘টেনে যাচ্ছি কালের গুণ’, ‘ধ্বনিময় পালক’, ‘ধাঁধাশীল ছায়া’, ‘জন্মান্ধের স্বপ্ন’, ‘সার্কাসের মেয়ে ও অন্যান্য কবিতা’, ‘The shadow of illusion’, ‘Blind Man’s Dream’. গল্পগ্রন্থ : ‘তামাকবাড়ি’, ‘আবার কাৎলাহার’, ‘ঢুলকিপুরাণ’, ‘নাবিকের জুতো’। প্রবন্ধ : ‘বাংলাদেশের কবিতার নন্দনতত্ত্ব’, ‘হাজার বছরের বাংলা কবিতা’, ‘জীবনানন্দ দাশ ও অন্যান্য’, ‘বাংলা সাহিত্যে নারী’, ‘বাংলা উপন্যাস অধ্যয়ন’। অনুবাদ : ‘চৌদল ঐকতান’, মূল: টি. এস. এলিয়ট; ‘ধূসর বুধবার’, মূল: টি. এস. এলিয়েট; ‘বালি ও ফেনা’, মূল: কাহলিল জাফরান; ‘হল্লা’, মূল: অ্যালেন গিনসবার্গ।