শনিবার, মার্চ ২১

চাঁদ পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে

0

Motifযখন খবরের কাগজ থেকে খবর দূরে সরে যাচ্ছে তখন এই কথা মহাস্থানগড়ের দৈনিক পত্রিকায় আসে, চাঁদ পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। মহাস্থানগড়ের মানুষেরা অনেকদিন চাঁদের কথা ভুলে গিয়েছিল। চাঁদ বিষয়ক আগ্রহ অনেকদিন কিংবা অনেক যুগ তাদের না থাকলে জানা হয় না অনেক পাখি উড়ে গেছে মহাস্থানগড়ের বৃক্ষসমূহ থেকে চাঁদ নিয়ে না ভাবার কারণে। মহাস্থানগড়ের মানুষেরা পশু পালনের জন্য, ‘জঙ্গল চায় জঙ্গল চায়’ স্লোগান দিলে চাঁদ বিষয়ক কথা হারিয়ে যায়। একটা মানুষ থেকে আরেকটা মানুষ কতদূর গেলে, একটা ফুল থেকে ফুলের গন্ধ কতদূর গেলে, একজন প্রেমিক থেকে একজন প্রেমিকা কতদূর গেলে, একটা বিদ্যালয় থেকে একজন বিদ্যার্থী কতদূর গেলে তাকে হারানো বলে তার নির্ণয় মহাস্থানগড়ের গণিতবিদেরা চেষ্টা করতে পারে। এ বছর শীত থেকে শীতের সরে যাওয়া টের পাওয়া গেলে চাঁদ পৃথিবী থেকে দূরে যাচ্ছে এই খবরটা মনে রাখা যেতে পারে। যদিও মন থেকে মন দূরে সরে যায়, মন থেকে মন হারিয়ে যায় প্রতিদিন এই মহাস্থানগড়ে। অনেক গল্প থেকে গল্প হারিয়ে যেতে পারে ভেবে বলা যেতে পারে মহাস্থানগড়ের লাইলি মজনুর গল্প।

শোনা হয়, জানা হয় এ নগরী থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে চাঁদপুর নামের এক জায়গায় রয়েছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। এ পর্যটনকেন্দ্রের সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ এখান থেকে চাঁদ সবচেয়ে ভালো দেখা যায়, চাঁদের ইতিহাস সবচাইতে ভালো জানা যায়।

 

২.
এখন বলা হবে চাঁদের কথা। এখন বলা হবে এ নগরীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রের কথা। এই নগরীর মানুষেরা গৃহের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেললে ভ্রমণপিয়াসী হয়। এ নগরীর মানুষেরা পর্যটন বিষয়ে খোঁজখবর নিতে থাকে। শোনা হয়, জানা হয় এ নগরী থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে চাঁদপুর নামের এক জায়গায় রয়েছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। এ পর্যটনকেন্দ্রের সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ এখান থেকে চাঁদ সবচেয়ে ভালো দেখা যায়, চাঁদের ইতিহাস সবচাইতে ভালো জানা যায়। এ পর্যটনকেন্দ্রে একজন মানুষের জন্য যে যে পর্যটন পছন্দ ও প্রয়োজন তার সবই পাওয়া যায়। তারা জানছে এবং সবাই জানাচ্ছে কী কী পর্যটন প্রয়োজন একজন মানুষের জন্য। কিংবা কেন পর্যটন প্রয়োজন মানুষের জন্য। তারা বলে, তারা শোনে, পর্যটন সৃষ্টি হয় নানারূপ ক্ষুধা থেকে, নানারূপ রোগ থেকে। তারপর সে সব জ্ঞানের কথা ভুলে গিয়ে শুনি চাঁদপুরে আছে বিনোদনমূলক পর্যটন, শিক্ষামূলক পর্যটন, ধর্মীয় পর্যটন, ঐতিহাসিক পর্যটন, প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যটন, চিকিৎসা বিষয়ক পর্যটন, সাংস্কৃতিক পর্যটন, যৌন বিষয়ক পর্যটন। চাঁদপুরে পর্যটকদের জন্য রয়েছে আহার ও আবাসনের সুব্যবস্থা। তবে এখানে একটা কথা জানতে হবে যে, মহাস্থানগড় থেকে চাঁদপুরে যাওয়ার বাহন কেবল পায়েচালিত রিকশা। যান্ত্রিক কোনো বাহনে চাঁদপুরে পৌঁছানো যায় না। মহাস্থানগড়ের ট্রাভেল এজেন্সিগুলো তাই সবকিছুর সুবন্দোবস্ত করতে পারলেও পায়েচালিত রিকশা ছাড়া আর কোনো রকম পরিবহন চালু করতে পারেনি চাঁদপুরে যাওয়ার জন্য। তখন এই কথা চালু হয়ে যায় যে, দ্রুতগামী বাহনে চড়ে চাঁদপুরে গেলে কিছুই দেখা যায় না। আরও জানা যায় ধীরগামী না হলে পর্যটনের কিছুই দেখা যায় না। আর চাঁদ দেখার জন্য ধীরগামীতার বিকল্প কিছু নাই। পায়েচালিত রিকশার মতো ধীর গতির বাহন ব্যতীত চাঁদের অলংকার, চাঁদের সৌন্দর্য, চাঁদের কলঙ্ক, চাঁদের পাথর, চাঁদের বুড়ি, চাঁদের মাটি, চাঁদের আলো, চাঁদের অন্ধকার দেখা যায় না। মহাস্থানগড়ের সবকিছুর গতি এতো বেশি যে কিছুই ভালো করে দেখা যায় না, বোঝা যায় না। নিজের পরিবার দেখতে না দেখতে চলে আসে অন্যের পরিবার। নিজের মুখ দেখতে না দেখতে চলে আসে অন্যের মুখ। নিজের নদী দেখতে না দেখতে চলে আসে অন্যের নদী কিংবা রূপান্তরিত হয়ে তা নর্দমায়। মহাস্থানগড়ের মানুষেরা অনেকদিন রাতের বেলা নদীর জলে চাঁদ দেখতে নদীর কাছে যেত। কিন্তু নদীর গতি বেশি হয়ে গেলে সেখানে চাঁদ উঠতে পারে না, বসতে পারে না। তবে তাদের চাঁদ দেখার সাধ একেবারে মিটে যায় না। আর এই কথা খুব ঠিক যে, মানুষের মনে সব সাধ জমা থাকে অমীমাংসিতভাবে।

 

৩.
মহাস্থানগড়ের রিকশাওয়ালাদের চাইতে চাঁদপুর কেউ বেশি না চিনলে তাদের কথা সামান্য জানতে হয় চাঁদ দেখতে যাওয়ার আগে। রিকশাওয়ালারা এ নগরীর যে বস্তিতে বাস করে তাকে নগরীর সবাই রিকশাপট্টি নামে চেনে। রিকশাপট্টির আয়তন দেখতে চাঁদের মতো। এতোটুকু বস্তিতে এতোজন রিকশাওয়ালা কীভাবে তাদের পরিবার নিয়ে বাস করে তা একজন কিশোরকে বিভ্রান্ত করতে পারে। বিভ্রান্ত হওয়া এই কিশোরটি একদিন বই খুলে জানতে চায় রিকশাপট্টির কয়েক হাজার মানুষের একেকজনের জন্য কতটুকু জায়গা আছে। নানা রকম গাণিতিক হিসাব কষে বুঝতে পারা যায় চাঁদকে মহাস্থানগড় থেকে যতোটুকু মনে হয় অর্থাৎ যত বর্গফুট মনে হয় ঠিক ততটুকু জায়গা এই বস্তির একেকজনের জন্য বরাদ্দ আছে। তারা ঘুমায় চাঁদের মতো বৃত্তাকারে। তবে তারা বলে তারা ঘুমায় রিকশার চাকার মতো বৃত্তাকারে। তারা আরও বলে চাঁদ দেখতে তাদের পায়েচালিত রিকশার চাকার মতো। রিকশাপট্টির একজন রিকশাওয়ালার একজন কিশোরী মেয়ে কবিতা লেখা শুরু করলে, সে লেখে তার বাবা তিনটা চাঁদকে চাকা বানিয়ে রিকশায় জুড়ে দিয়ে রিকশা চালায়, চাঁদ চালায়। মহাস্থানগড়ের অধিবাসীরা এই গৌরব চিন্তায় ভাবে রিকশাপট্টির রিকশাওয়ালাদের চাইতে চাঁদকে কেউই ভালো চেনে না বা জানে না। আর তারাই কেবল চাঁদপুরে চাঁদ দেখাতে নিয়ে যেতে পারে।

 

৪.
রিকশাপট্টির মজনু রিকশাওয়ালা সবচেয়ে জনপ্রিয় মহাস্থানগড়ের যেসব রিকশাওয়ালা চাঁদ দেখায় চাঁদপুরে নিয়ে গিয়ে তাদের মধ্যে। তার কপালে একটা স্থায়ী চাঁদের ছবি আঁকা আছে। সে কোন গ্রাম থেকে মহাস্থানগড় নগরীতে এসেছিল এই প্রশ্ন একজন কিংবা অনেকজন করে যখন সে চাঁদ দেখানোর ট্যুর গাইড হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। চাঁদ নিয়ে সে কয়েকশত কবিতা লিখেছে। যারা তার রিকশায় চড়ে তাদেরকে সে চাঁদ নিয়ে কবিতা শোনায়। সে চাঁদের ইতিহাস সম্বন্ধেও অনেক কিছু জানে। যদিও কেউই তার চাঁদ বিষয়ক ইতিহাস বিশ্বাস করে না। চাঁদে বিশ্বাস না থাকলেও চাঁদ বিষয়ক ইতিহাস শুনতে সবাই পছন্দ করে। আর এটা তো ঠিক যে বিশ্বাসের চাইতে অবিশ্বাসকে মানুষ বেশি পছন্দ করে। বিশ্বাসের ভেতরে কোনো বিস্ময় থাকে না, অবিশ্বাসের ভেতর থাকে বিস্ময়। বিস্ময় সবাই জীবনে চাইলে মজনুর চাঁদ বিষয়ক ইতিহাস তাদের ভালো লাগে, ভালো লাগে তার কবিতাও। পর্যটকেরা তার রিকশায় চড়ে চাঁদ দেখতে যাওয়ার জন্য অগ্রিম বুকিং দেওয়া শুরু করে। বুকিং এর বিষয়টা দেখত তার স্ত্রী লাইলি। লাইলির মুখ থেকে কেউ শুনেছিল তাদের অসম্পূর্ণ জীবনী। মজনু এবং লাইলি একই শ্রেণিতে পড়াশোনা করত। তারা ভেবেছিল পড়াশোনার প্রধান লক্ষ্য মানুষ ও সমাজ চেনা। কিন্তু পড়াশোনা করার পর মানুষ ও সমাজ চিনতে না পারলে তারা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হতে থাকে। একবার দুবার কয়েকবার অকৃতকার্য হওয়ার পর তারা সিদ্ধান্তে যায় বিদ্যালয়ের পড়াশোনা তাদের জন্য নয়। তারা একে অন্যকে চেনার জন্য একদিন কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করে ফেলে। তারা ভাবে বিয়ে করার মাধ্যমে মানুষ একে অন্যকে চেনার চেষ্টা করে কিংবা চেনার ব্যর্থ চেষ্টা করে। বিয়ে করার পর তারা তাদের বাড়িতে ফেরার চেষ্টা করে না। তারা ভাবে বিয়ে করার পর মানুষ আগের বাড়িতে ফিরতে পারে না। তারা হাঁটতে হাঁটতে কিংবা পালাতে পালাতে রিকশাপট্টিতে এসে বস্তির একটা ঘর ভাড়া নেয়। রিকশাপট্টির ঘরগুলো বৃত্তাকার হলে তারা একটা বৃত্ত ভাড়া নেয়, বলা ভালো বৃত্তঘর ভাড়া নেয়। যা দেখতে রিকশার চাকার মতো। জীবিকার উপায় করার জন্য মজনু খুব দ্রুত রিকশা চালনা শিখে ফেলে। কিছুদিনের মধ্যে সে দক্ষ রিকশাচালক হয়ে ওঠে। সে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে আরোহীদের মাঝে। রিকশাচালক হিসাবে তার নাম পুরো মহাস্থানগড়ে ছড়িয়ে পড়ে। তার জনপ্রিয় হওয়ার কারণ এই যে, সে চাঁদের কবিতা ও চাঁদের ইতিহাস জানার সঙ্গে চাঁদ বিষয়ক গান জানে এবং সে সকল গান গাইতেও জানে। এই কথা এখানে জানিয়ে রাখা যেতে পারে যে, যখন সে লাইলির সঙ্গে প্রেম করত সে সময় তার মনে গান ও গানের সুরের আগমন ঘটত। সে সবকিছুর ভেতর গান, কবিতা, ইতিহাস, সুর খুঁজে পেত। রিকশাচালানোর সময় সে সে সকল কবিতা, ইতিহাস, গান আরোহীদের শোনাত। মহাস্থানগরের নাগরিকেরা তার গানে এমন এক সুর ও কথা খুঁজে পায় যা তারা এ নগরীর কোনো গানে আগে পায়নি। একটা সময় তাদের নিকটে মহাস্থানগড়ের আগের গানগুলোকে অচল মুদ্রার মতো মনে হতে থাকে। কত আগের কোন ভূগোলের সুর ও কথা মজনু নিয়ে এসেছে তা তারা জানতে চায়। কীভাবে সে সে সকল গান ও সুরের সঙ্গে আত্মীয়তা গড়ে তুলেছে জানতে চায়। তার গান, সুর জীবিত জলের মতো। তার গান শুনলে স্নানের স্নিগ্ধতা আসে এ নগরীর অধিবাসীদের মনে। তারা অনুভব করে জল ও স্নানের ভাষা। কিন্তু মজনু কিংবা লাইলি কেউই জানায় না কোথায় পেয়েছে মজনু এ গান ও তার সুর। মজনু ও লাইলি বলে যদি গানের উৎস বলে দেওয়া হয় তবে গান মৃত্যুবরণ করে। কখনও কখনও গানের গায়কও মৃত্যুবরণ করে। লাইলি কি গান জানে—কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে এই কথা। লাইলী বলে সেও গান জানে, তবে সে গান কেবল মজনুর জন্য। সে বলে মজনু ঘুমায় চাঁদের মতো বৃত্তাকারে। মজনুর ঘুমের জন্য মাঝে মাঝে তাকে গান গাইতে হয়। বৃত্তাকার গান। গান কীভাবে বৃত্তাকার হয় বুঝতে পারে না তারা।

ঈর্ষা ও গৌরব মাঝে মাঝে এক জায়গায় বাস করলে বলা যায় এ দুটোর কথা। রিকশাপট্টির অন্য রিকশাওয়ালারা তাকে নিয়ে যেমন ঈর্ষা করত একই সঙ্গে তাকে নিয়ে তারা গৌরব করত। তারা বলত, মহস্থানগড়ের গৌরব রিকশাপট্টি। আর রিকশাপট্টির গৌরব মজনু। তাদের রিকশাপট্টির আয়তন পরিমাপ করা গেলেও রিকশাপট্টির মজনুর গান অপরিমেয়। এ নগরীর নাগরিকদের চাঁদের সন্ধানে চাঁদের নিকটে নিয়ে যেতে কেবল তারাই পারে।

মহাস্থানগড়ের মানুষেরা দেখে তারা তাদের বিয়েতে বিয়ের স্বাদ হারিয়ে ফেলেছে। বিয়ের আনন্দ হারিয়ে ফেলেছে। যৌনতার আনন্দ হারিয়ে ফেলেছে। চুম্বন ও সঙ্গমে তারা আনন্দ পাচ্ছে না। চুম্বন ও সঙ্গমে যেন লবণ নাই, চাঁদ নাই। চাঁদ কি জীবনের লবণ? রিকশাপট্টির বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে মজনু সব সময় গান গাইতো। বিয়ের গান যে এতো মধুর হয়, চাঁদের মতো হয়, মহাস্থানগড়ের নাগরিকেরা কেউ জানত না আগে। মহাস্থানগড়ের গীতিকার ও সুরকারেরা মজনুর মতো কিংবা তার চেয়ে ভালো গান তৈরি করার জন্য সাধনা করত। কিন্তু তারা অনুভব করত সাধনার জন্য যে স্থান, সে স্থান মহাস্থানগড়ের কোথাও নাই। তারা আরও অনুভব করে মহাস্থানগড় সম্ভবত সাধনা করার সকল স্থান হারিয়ে ফেলেছে। সাধনা কীভাবে হারায় তা বোঝার চেষ্টা করে তারা। কেউ কেউ মহাস্থানগড়কে বলে সবকিছুর ধ্বংসাবশেষ। মহাস্থানগড় বিখ্যাত তার ধ্বংসাবশেষের জন্য। কেউ বলে মহাস্থানগড় বিখ্যাত চাঁদের ধ্বংসাবশেষের জন্য। এখানে এক সময় বিখ্যাত চাঁদ পাওয়া যেত। তারপরে আবারও সাধনা নিয়ে একটু কথা বলা যায়। সাধনার স্থান অক্ষুন্ন রাখতে বা নির্মাণ করতে কী লাগে? কেউ তখন দূরে, অন্ধকারে রাত যখন রাস্তায় একা হেঁটে যায়, বলে ওঠে সে, ওগো স্থিরতা, ওগো নীরবতা, ওগো দু ফোঁটা চোখের জল, ওগো পবিত্র জঙ্গল—তোমাদের ভেতর যেতে চাই জরাব্যাধি নিয়ে, জরাব্যাধি অতিক্রম করে। দ্রুতগামী বর্ণমালা ভুলে যাই, দ্রুতগামী পথ চলা ভুলে যাই। ওগো পুরোনো পাহাড়ের চূড়ায় বসে থাকা বর্ণমালা আমাদের নিকটে এসে অবতীর্ণ হও প্রাচীন ঈশ্বরের ধ্যান হয়ে।

 

৫.
মজনু আজ ছুটিতে। ছুটি নিয়েছে সে সকল জীবিকা থেকে, সকল চাঁদ থেকে, সকল প্রয়োজন থেকে। সে আর লাইলি আজ দূরে যায়, দূরে যায় সকল নিকট থেকে। তারা কথা বলে, তারা কথা বলে না। দুটো পথ দূরে যাচ্ছে। কথা বলার পথ, কথা না বলার পথ। এ সকল দূর কত দূরে যায়। একটা ফড়িং যেতে যেতে যখন ফড়িং থাকে না, একটা গন্ধ যেতে যেতে যখন গন্ধ থাকে না ততদূরে। সপ্তাহে একদিন তারা এভাবে বসে থাকে কোথাও না গিয়ে। তারা বোঝে যেতে যেতে ফিরে আসতে হয়, নতুবা মানুষ হারিয়ে যায় মানুষের বাইরে। চাঁদের বাইরে। তাদের কথায় বিষয় থাকে, বিষয় থাকে না। তাদের কথা খেলা, খেলা না। তারা কি চাঁদ নির্মাণ করতে চেয়েছে এতোকাল? চাঁদ নির্মাণের জন্য তারা পরস্পরের প্রেমে পড়েছিল। পরস্পরের গানে পড়েছিল, সুরে পড়েছিল। তারা কি ক্ষুধার্ত হয়েছিল? তারা কি একে অন্যের প্রেম খায়, ভালোবাসা খায়, গান খায়, সুর খায়, চাঁদ খায়? তারা একটা সুদূর নির্মাণ করতে চেয়েছিল, যে সুদূরে চাঁদ বাস করে। যে চাঁদে বাস করে তাদের বাঁশি। তারা দুজনই তো বাঁশি বাজাতে পারে। এই যে দুপুর। তারা দুজন দুপুরের বাঁশি বাজায়। এরপর বিকেল হবে, রাত হবে। তারা বাজাবে বিকেলের ও রাতের বাঁশি।

চাঁদ নির্মাণের জন্য তারা পরস্পরের প্রেমে পড়েছিল। পরস্পরের গানে পড়েছিল, সুরে পড়েছিল। তারা কি ক্ষুধার্ত হয়েছিল? তারা কি একে অন্যের প্রেম খায়, ভালোবাসা খায়, গান খায়, সুর খায়, চাঁদ খায়? তারা একটা সুদূর নির্মাণ করতে চেয়েছিল, যে সুদূরে চাঁদ বাস করে। যে চাঁদে বাস করে তাদের বাঁশি।

লাইলি ও মজনু এ সময় শোনে পাখির কলতান। তাদের বস্তির ঘরের পাশে যে ঘর সেখানে থাকে শিরি ও ফরহাদ দম্পতি। তাদের ঘর থেকে ভেসে আসছে পাখির কলতান। রিকশাপট্টির বস্তির মানুষদের জীবিকার প্রধান উপায় রিকশাচালনা হলেও কেউ কেউ অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত আছে। শিরি ও ফরহাদ কিছুদিন থেকে পাখির ব্যাবসা করছে। তারা দুজনই এ ব্যাবসার সঙ্গে যুক্ত আছে। তারা চাঁদপুর গ্রামের চাঁদপুর বিল থেকে পাখি ধরে এনে নগরীর হাটে বিক্রি করে। লাইলী ও মজনু কথা বলে তাদের সম্বন্ধে।

—চাঁদপুর বিলে কেমন পাখি পাওয়া যায়?
—এ বিষয়ে খুব বেশি ধারণা নাই।
—চাঁদপুর বিলে পাখিরা কেন আসে?
—মাছ পাখিদের প্রিয় খাবার হলে তারা আসে মাছ খেতে।
—পাখির ব্যাবসায় লাভ কেমন?
—মনে হয় অনেক। কারণ মানুষ পাখির মাংস ভীষণ ভালোবাসে।
—পাখি ধরা নিশ্চয় অন্যায়?
—অন্যায় সবসময় আনন্দদায়ক, তবে যারা অন্যায় করতে পারে।
—আমরা কি অন্যায় করতে পারি আনন্দ পাওয়ার জন্য?
—আমাদের এখনো আনন্দের অভাব হয়নি।
—কারা অভাবে আছে? আনন্দ না পাওয়ার অভাবে?
—মহাস্থানগড়ের অধিকাংশ মানুষই আনন্দের অভাবে আছে। তাইতো তারা আনন্দ পাওয়ার জন্য চাঁদ দেখতে যায় চাঁদের নিকটে গিয়ে।
—চাঁদের নিকটে কি পাখি পাওয়া যায়?
—চাঁদ নিজে একটা বড়ো পাখি যে কিনা উড়ে গেছে দূরের আকাশে।
—রিকশায় চড়ে কি চাঁদের নিকটে উড়ে যাওয়া যায়?
—এই কথা অবান্তর।
—মানুষ কি পাখির মাংস আহার করার মাধ্যমে চাঁদের নিকটে যেতে চায়?
—সেরূপ সম্ভাবনা থেকেই যায়।
—চাঁদ কি বিক্রি করা যায়?
—চাঁদ বিষয়ে কোনো কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ কেউ কেউ তো বলে পৃথিবীর অনেক চাঁদ হারিয়ে গেছে।
—চাঁদ কি ধ্বংসাবশেষ?

 

৬.
চাঁদ ধ্বংসাবশেষ হোক অথবা না হোক মহাস্থানগড়ে চাঁদ নিয়ে কবিতা লেখা শুরু হয় যখন তারা অনুধাবন করে সবার নিজস্ব চাঁদ প্রয়োজন। তারা আরও অনুধাবন করে জীবন একটা ফাঁদ। জীবনের এই ফাঁদ থেকে বের হওয়ার জন্য নিজস্ব একটা চাঁদ বিশেষ দরকার। মহাস্থানগড়ের সবাই এ সময় মনে করে তাদের কাব্যপ্রতিভা আছে। আর এ কাব্যপ্রতিভার স্ফুরণ ঘটাতে তারা চাঁদ নিয়ে কবিতা লেখা শুরু করে। লেখালেখির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা একটা বড়ো ভূমিকা পালন করলে চাঁদ নিয়ে কবিতা লেখার জন্য তারা চাঁদের অভিজ্ঞতা অর্জন করার কথা ভাবে। তারা মনে করে চাঁদ সব সময় প্রতিটি ব্যক্তিকে ডাক দেয় তার নিকটে যাওয়ার জন্য। মানুষ যদিও সে ডাক শুনতে পায় না সব সময়। তারা চাঁদের কাছে যেতে চায়। চাঁদের কাছে যেতে চাওয়ার সময় তাদের মনে পড়ে চাঁদপুর গ্রামের কথা। চাঁদপুর গ্রাম তাদের নগরীর পাশেই। চাঁদপুর গ্রামে চাঁদ পাওয়া যায় কিংবা বলা ভালো সেখান থেকে চাঁদকে ভালো করে দেখতে পাওয়া যায়, বুঝতে পারা যায়। তবে দ্রুতগামী বাহনে সেখানে পৌঁছানো যায় না। চাঁদপুর গ্রামে যেতে পায়েচালিত রিকশা লাগে। পায়েচালিত রিকশা নিয়ে তারা যেতে চায় চাঁদপুর গ্রামে।

মহাস্থানগড়ের চাঁদ বিষয়ক দুজন বিখ্যাত কবি, যারা মহাস্থানগড়ের কবিদের নাম পরিবর্তন বিষয়ক ঐতিহ্য অনুসরণ করে নিজেদের নাম নিজেরা রেখেছেন রূপচাদ সওদাগর এবং সোনাচাঁদ সওদাগর, তারা চাঁদ বিষয়ক ধ্রুপদী কবিতা লেখার জন্য যেতে চায় চাঁদপুর গ্রামে। তারা দুজন বন্ধু। তারা রিকশাপট্টিতে যায় রিকশা ভাড়া করতে চাঁদপুরে যাওয়ার জন্য। নগরীর দেওয়ালে দেওয়ালে চাঁদ দেখা রিকশার বিজ্ঞাপনে দেখেছে এবং পত্রিকায় পড়ে জেনেছে এ নগরীর সবচেয়ে ভালো রিকশাচালক মজনু। তারা মজনুর বাড়িতে গিয়ে দেখে মজনু নাই। মজনুর স্ত্রী লাইলি জানায় আগামী ছয় মাসের সকল দিন তার স্বামীর রিকশা বুকিং হয়ে গেছে চাঁদপুরের চাঁদ দেখতে যাওয়ার জন্য। কবি রূপচাঁদ ও সোনাচাঁদ ছয় মাসের পর যেদিন মজনু রিকশাওয়ালা তাদের চাঁদপুরের নিয়ে যেতে পারবে সেদিনের বুকিং কনফার্ম করে। মজনুর স্ত্রী লাইলি তাদের নাম লিখতে গিয়ে তাদের জিজ্ঞেস করে তাদের নাম সম্বন্ধে। দুজন কবি লাইলীকে জানায় শৈশব থেকে চাঁদ নিয়ে কবিতা লিখে মহাস্থানগড়ে তারা বিখ্যাত হয়ে গেছে। চাঁদ তাদের কবিতার মূল উপজীব্য। তাই তারা দুজন পিতা-মাতার দেওয়া নাম বদলে রূপচাঁদ ও সোনাচাঁদ রেখেছে। চাঁদ নিয়ে অনেক কবিতা লিখে ফেলেছে তারা, তাই নিজেদের নামের সঙ্গে সওদাগর পদবীটা যোগ করেছে। লাইলী পুনরায় তাদের জিজ্ঞেস করে সওদাগর যদি ব্যবসায়ী হয় তবে তারা কীসের ব্যাবসা করে। তারা জানায়, তারা মূলত কবিতা নিয়ে ব্যাবসা করে। মহাস্থানগড়ে সব কিছু নিয়েই ব্যাবসা হয়। তাই মহাস্থানগড়ের বেশিরভাগ ব্যক্তির নামের শেষে সওদাগর পদবী আছে। আবার অনেকের পদবী হয়তো ভিন্ন কিন্তু অর্থ একই। নামের শেষে সওদাগর পদবীটা এ নগরীর নাগরিকদের ঐতিহ্য। সবাই এই ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য নামের শেষে কিংবা প্রথমে এই পদবী যোগ করে থাকে। এ নগরীর নারীরাও এই পদবী ব্যবহার করে।

লাইলি তাদের সঙ্গে আর কোনো কথা বলতে না চাইলেও কবি রূপচাঁদ ও সোনাচাঁদ আরও কিছুক্ষণ কথার ব্যাবসা করতে চায়। তারা জিজ্ঞেস করে লাইলি কখনও চাঁদপুরে গেছে কি না। লাইলি জানায় সে কখনও চাঁদপুরে যায়নি তবে চাঁদপুরের উপহার পেয়েছে। তারা দুজন জানতে চায় সে উপহার কী? লাইলী তাদের বলে জন্মের সময় সে চাঁদের উপহার পেয়েছিল, প্রেমের সময় সে চাঁদের উপহার পেয়েছিল, মাঝে মাঝে রাতের বেলায় সে চাঁদের উপহার পায়। রূপচাঁদ ও সোনাচাঁদ তার এ কথার অর্থ বুঝতে না পারলে তারা পুনরায় জিজ্ঞেস করে চাঁদ বিষয়ক উপহার সম্বন্ধে। সে তখন চাঁদের মতো হেসে জানায় তার স্বামী চাঁদপুর থেকে মাঝে মাঝে এক চা-চামচ করে মাটি নিয়ে আসে। আরও কয়েক মাস বা কয়েক বছর এই মাটি জমা হলে সে মাটি দিয়ে তার স্বামী একটা চাঁদ তৈরি করে তাকে উপহার দিবে। রূপচাঁদ ও সোনাচাঁদ তার কথায় বিভ্রান্ত হয়। তারা বুঝতে পারে না লাইলির কথা। তারা তার কথা শোনার পর বিমর্ষ হয়ে যায়। নিজেদের তাদের ডানাভাঙা চাঁদ মনে হয়। তারা তাদের কবিতায় এক জায়গায় চাঁদকে ডানাভাঙা চাঁদ বলেছিল। তারা ভাবতে পারে না একজন রিকশাওয়ালা কীভাবে এ রকম একটি কাব্যিক উপহারের কথা ভাবতে পারে। মহাস্থানগড়ের নাগরিকেরা অনেক কিছু উপহার দেয় তবে কখনও চাঁদ নির্মাণ করে উপহার দেয় না। মহাস্থানগড়ে বেহুলা লক্ষিন্দরের বাসরঘর আছে। কত মানুষ যে এই বাসরঘর দেখতে আসে নানান জায়গা থেকে তার ইয়ত্তা নাই। তবে মহাস্থানগড়ে বেহুলা লক্ষিন্দরের বাসরঘরে এখন আর সাপ নাই। মহাস্থানগড় নগরেও সাপ নাই। সাপ না থাকলেও মহাস্থানগড়ের কবিরা আজকাল পরস্পরকে বিষ উপহার দেয়। কবিরা চাঁদ নিয়ে কবিতা লিখতে গিয়েও সেখানে বিষ জমা রাখে। রূপচাঁদ এবং সোনাচাঁদ ভাবে মহাস্থানগড়ের সকল অভিধানে বিষ জমে গেছে। মহাস্থানগড়ের ভাষায় এতো বেশি বিষ যে, দৈনিক পত্রিকায়, রাজনৈতিক বক্তব্যে, ধর্মীয় বক্তব্যে, ঐতিহাসিক বক্তব্যে, কবিতায়, উপন্যাসে, চিত্রকলায় বিষ আর বিষ। তারা আরও খেয়াল করে, বন্ধুর কথায়, পরিবারের কথায়, সমাজের কথায়, রাষ্ট্রের কথায় বিষ। বিষ মহাস্থানগরে গৌরব। বিষ যদি তাদের গৌরব হয় তবে চাঁদ দেখা কেন। চাঁদের নিকটে যাওয়া কেন। তারা এই মুহূর্তে বুঝতে পারে না কেন তবুও চাঁদ নিয়ে কবিতা লেখার চেষ্টা।

কত মানুষ যে এই বাসরঘর দেখতে আসে নানান জায়গা থেকে তার ইয়ত্তা নাই। তবে মহাস্থানগড়ে বেহুলা লক্ষিন্দরের বাসরঘরে এখন আর সাপ নাই। মহাস্থানগড় নগরেও সাপ নাই। সাপ না থাকলেও মহাস্থানগড়ের কবিরা আজকাল পরস্পরকে বিষ উপহার দেয়।

রিকশাপট্টি থেকে কবি রূপচাঁদ ও সোনাচাঁদ বেরিয়ে আসে। তারা সিদ্ধান্তে যায় ছয় মাস পর মজনুর রিকশায় চাঁদপুর গ্রামে চাঁদ দেখতে যাওয়ার আগে নিজেরা চেষ্টা করবে চাঁদপুরের মতো চাঁদ আর কোথাও দেখা যায় কিনা, পাওয়া যায় কিনা। তারা ভাবে রাত খনন জানলে হয়তো চাঁদ পাওয়া যায়। অন্ধকার খনন জানলে হয়তো চাঁদ পাওয়া যায়। বিষ পান করতে জানলে হয়তো চাঁদ পাওয়া যায়। শৈশব খনন করলে হয়তো চাঁদ পাওয়া যায়। মহাস্থানগড়ের পুরাতন কবিতা খনন করলে যদি চাঁদ পাওয়া যায় তবে তারা মহাস্থানগড়ের প্রাচীনতম কবিতার সন্ধানে যাবে চাঁদ সন্ধানে যাওয়ার জন্য।

 

৭.
যখন মেঘে মেঘে পা ফেলে চাঁদ দূরে চলে যায় তখন বলি এই কথা। কোনো কোনো জিনিস চাঁদের মতো হয় তবুও তারা চাঁদ নয়, কোনো কোনো প্রশ্ন উত্তরের মতো হয় তবুও তারা উত্তর নয়, কোনো কোনো কান্না হাসির মতো হয় তবুও তারা হাসি নয়, কোনো কোনো ব্যর্থতা সফলতার মতো হয় তবুও তারা সফলতা নয়। হাঁটতে হাঁটতে রূপচাঁদ আর সোনাচাঁদ চলে এসেছে মহাস্থানগড়ের চাঁদ একাডেমির মাঠে। এই চাঁদ একাডেমি মহাস্থানগড়ের শিল্প-সাহিত্যকে পৃষ্ঠপোষকতা করে। প্রতিবছর তারা পুরস্কৃত করে শিল্প-সাহিত্যের নানান বিভাগে যারা অবদান রাখে তাদেরকে। সরকারি অর্থে এটা পরিচালিত হয়। আজ চলছে চাঁদ আঁকা এবং চাঁদ নিয়ে কবিতা লেখার প্রতিযোগিতা। মহাস্থানগড়ের সকল শ্রেণির সকল বয়সের মানুষেরা এতে অংশগ্রহণ করছে। সবকিছু উৎসবময়। মাইকে ঘোষণা এলে শুরু হয় প্রতিযোগিতা। আঁকা হয় অসংখ্য চাঁদ। চাঁদ যে কত রকম হতে পারে তা এই প্রতিযোগিতায় না এলে জানা যাবে না। কেউ কেউ বলে জ্যামিতিকে ভেঙে দিয়েছে এইসব চিত্রকরেরা। জ্যামিতি কে আবিষ্কার করেছিল? রঙ কে আবিষ্কার করেছিল? চাঁদ আঁকতে গিয়ে কত রকম যে জ্যামিতি ভাঙা হয়েছে, কত রকম রঙ ভাঙা হয়েছে তার গণনা করার তেমন কেউ নাই। তারপর চাঁদ নিয়ে কবিতা লেখার কথা বলা যেতে পারে। চাঁদ নিয়ে প্রথম কবিতা কে লিখেছিল? জানে কে, জানে না কেউ। চাঁদ নিয়ে কবিতা লেখা কত রকম যে হতে পারে সে সব লেখা কেউ পড়ুক এসে চাঁদ একাডেমিতে।

চাঁদ আসলে কি, এ সময় এ প্রশ্ন মনে হয় সবার, চাঁদের ছবি আঁকতে আঁকতে, চাঁদ নিয়ে কবিতা লিখতে লিখতে। চাঁদ কী—সে সম্বন্ধে তারা কিছুই বুঝতে পারে না। তবে তারা এটা বোঝে সবার চাঁদ দরকার। দরকার একটা পূর্ণ চাঁদ, অর্ধেক চাঁদ কিংবা চাঁদের যেকোনো একটা খণ্ডাংশ। মহাস্থানগড়ের সকল মানুষ জন্মগ্রহণের পর জেনেছে নানান বিদ্যালয় থেকে, না-বিদ্যালয় থেকে এই কথা, চাঁদ দরকার। কেন দরকার তা তারা জানে না।

এ সময় শত শত পাখি আসে চাঁদ একাডেমির আকাশে। পাখিদের ঠোঁটে গাছের পাতা। পাখিদের ঠোঁটে গাছের পাতা কেন? পাখিগুলো কি চাঁদ আঁকতে চায়? চাঁদ নিয়ে কবিতা লিখতে চায়? একজন কিংবা কয়েকজন ভাবে পাখিরা তাদের ঠোঁটের সাহায্যে নীড় নির্মাণ করে। পাখিদের নীড় দেখতে চাঁদের মতো। পাখিরা তাদের নীড় নির্মাণের পর যে ডিম পাড়ে সে ডিম দেখতেও চাঁদের মতো। পাখি নিয়ে অনেক কবিতা লেখে এমন একজন কবি ভাবে চাঁদের ছবি আঁকার, চাঁদ নিয়ে কবিতা লেখার উত্তম শিক্ষক হতে পারে পাখিরা। তখন তার আরও মনে হয়, মহাস্থানগড়ের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকেরা আজকাল মার খাচ্ছে শিক্ষার্থীদের হাতে। অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের পিটিয়ে বিদ্যালয় থেকে বের করে দিচ্ছে। পত্রিকায় ও ফেসবুকে শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষকদের মার খাওয়ার ছবি ও শিক্ষার্থীদের উল্লাস উল্লাস করার ছবি আসছে। শিক্ষকেরা মার খেয়ে মেঝেতে পড়ে গেলে তাদের দেখতে চাঁদের মতো মনে হয়। শিক্ষকেরা চাঁদের মতো মেঝেতে পড়ে থাকলে শিক্ষার্থীরা ভাবে তারা নিজেদের চাঁদ দেখতে পেয়েছে। শিক্ষকদের চাঁদ তাদের কাছে ভীষণ অপছন্দের।

পাখিগুলো কিছুক্ষণ চাঁদ একাডেমির মাঠের ওপরে ওড়াউড়ি করার পর দূরে কোথাও যায়, যেখানে বন আছে, বনের নিরাপত্তা আছে। তবে কেউ কেউ দেখে কোনো কোনো পাখির ঠোঁট থেকে কিছু কিছু পাতা চাঁদ একাডেমির মাঠে এসে পড়েছে। এ সকল পাতায় তাদের মতো চাঁদের ছবি কিংবা পাখির ডিমের মতো ছবি। কারো কারো পুনরায় মনে হয় এ পাখিগুলো সম্ভবত চাঁদের ছবি আঁকা ও কবিতা লেখা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে এসেছিল। কিন্তু তাদের বসার আসন না থাকায় তারা ফিরে গেছে।

 

৮.
চাঁদের ছবি আঁকা ও চাঁদ নিয়ে কবিতা লেখার প্রতিযোগিতা শেষ হয়। সবাই তাদের ছবি ও কবিতা জমা দেয়। কিছুক্ষণের ভেতর ফলাফল দেওয়া হবে। প্রতিযোগিতা আয়োজনকারীরা ভোজের আয়োজন করলে সে বিষয়ে এখন প্রস্তুতি চলছে। আজ শীতের শেষ দিন। শীতকালে মহাস্থানগড়ের মানুষেরা হাঁসের মাংস দিয়ে আহার করে আনন্দ পেলে হাঁসের মাংস আহারের প্রধান আকর্ষণ আজ। বসন্তকে স্বাগত জানানোর জন্য হাঁসের মাংসের চাইতে ভালো আর কিছু হতে পারে না বলে এদের বিশ্বাস। হাঁসের মাংস দিয়ে আহার শেষ হলে ফলাফল ঘোষণা হয় মাইকে। মাইকে ঘোষক মহাস্থানগড়ের গৌরব বর্ণনা করে কথা বলা শুরু করে। সে জানায় মহাস্থানগড় শিল্পের শহর। তার প্রমাণ এ শহরের প্রাচীন সকল কিছুর ধ্বংসাবশেষ। পৃথিবীর প্রাচীনকালে যে কয়েকটি নগরীতে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তার অন্যতম এ নগরী। প্রাচীনকাল থেকে এ নগরীতে শিল্পের চর্চা হয়ে এসেছে। এখানকার মিউজিয়ামে রয়েছে প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন। এরপর ঘোষক সেদিনের প্রতিযোগিতা সম্বন্ধে বলা শুরু করে। এটা একটা রেকর্ড যে একসঙ্গে এতো অধিক পরিমাণ কবি ও চিত্রকর কবিতা লেখা ও ছবি আঁকায় অংশগ্রহণ করেছে। আজকের প্রতিযোগিতায় একজন চিত্রকর পেয়েছেন চাঁদ আঁকার প্রথম পুরস্কার এবং একজন কবি পেয়েছেন চাঁদ নিয়ে কবিতা লেখার প্রথম পুরস্কার। তাদের ছবি ও কবিতা চাঁদ একাডেমির গ্যালারিতে টাঙিয়ে রাখা হবে। পুরস্কার হিসেবে প্রত্যেকে পাবেন একটা করে প্রাচীন ইট যা এই নগরীর প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রাপ্ত। এই নগরীতে এর চাইতে ভালো পুরস্কার আর কিছু হতে পারে না।

সবাই আগ্রহী হয়ে ওঠে এটা জানার জন্য যে, কারা পেল এ দুটো পুরস্কার। সঙ্গে তারা এটাও দেখতে চাইল চাঁদের ছবিটি কেমন এবং চাঁদ নিয়ে লেখা কবিতাটা কেমন। পুরস্কার প্রদানের মঞ্চে উঠে এসেছে মজনু। চাঁদ নিয়ে সবচেয়ে ভালো কবিতাটা সে লিখেছে। উঠে এসেছে লাইলী। চাঁদ নিয়ে সবচেয়ে ভালো ছবিটা সে এঁকেছে। মহাস্থানগড়ের চেনা জানা সকল কবি ও চিত্রকর বিমর্ষ হয়ে যায়। একটা প্রতিযোগিতা কী পরিমাণ পরাজয় উপহার দেয় বোঝে তারা, জানে তারা। চাঁদ দ্বারা কতজন তবে পরাজিত হয়। চাঁদের দ্বারা পরাজয় তাদের কাছে ভীষণ বেদনার। তাদের কাছে মনে হয় রিকশাপট্টি পুরো মহাস্থানগড়ের প্রাচীন ও আধুনিক সভ্যতাকে পরাজিত করেছে। চাঁদ দ্বারা পরাজিত হয়ে সবাই নিজ নিজ গৃহের দিকে যাত্রা শুরু করে। তারা ভাবে, গৃহ জয় করার জন্য কি চাঁদ জয় করতে হয়? তারা চাঁদ বিষয়ক জয়-পরাজয়ে বিভ্রান্ত, বিপর্যস্ত। তাদের মনে হচ্ছে বাড়ি যাবার পথ তারা হারিয়ে ফেলেছে। তারা ক্ষুধা হারিয়ে ফেলে, বাড়ি যাওয়ার ক্ষুধা। বাড়ি যাওয়ার ক্ষুধা কি সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষুধা? বাড়ি ফেরার পথে পরিব্যপ্ত বিষণ্নতা। বাড়ি ফেরার পথের ভাষা কি বোঝে তারা। জানে না। তাদের পুরাতন সকল অর্জন, অহংকার রাস্তার ওপর ঝরে পড়ছে এখন। ঝুর ঝুর। কুড়াতে ইচ্ছা করছে না কিছুই। তাদের বাউল হতে ইচ্ছে করে। কারো কারো বাউলের গান গাইতে ইচ্ছে করে। কোনো এক বাউল কবি লিখেছিল এই গান —‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে আমরা ভেবে করব কি’। এই গানের অর্থ তারা জানে না। এসব সাধকের গান, সাধনার গান। তাদের সাধনা নাই, তারা সাধক নয়। এই কথা মনে আসে কারো কারো চাঁদের ছবি আঁকার জন্য সাধনা লাগে, চাঁদ নিয়ে কবিতা লেখার জন্যও সাধনা লাগে। এই গানটির আরেকটু অংশ তাদের মনে পড়ে ধ্বংসাবশেষের মতো—‘ঘর আছে তার দুয়ার নাই, লোক আছে তার বাক্য নাই’। এরপর তাদের মনে হয় চাঁদ বিষয়ে ভাবনা না থামালে তারা বাড়ি পৌঁছাতে পারবে না। চাঁদ ডুবে যাক সহস্র আকাশে। ডুবে যাক সে রিকপট্টির নর্দমায়।

 

৯.
রাত চলছে চাঁদের দিকে। রিকশা চলছে চাঁদপুরের রাস্তায়। মজনুর রিকশায় চড়ে কবি রূপচাঁদ আর সোনাচাঁদ যাচ্ছে চাঁদপুরে চাঁদ দেখতে। কবে থেকে মানুষেরা যাত্রা শুরু করেছে চাঁদের দিকে? কবে থেকে মানুষেরা কবিতা লিখতে শুরু করেছে চাঁদ নিয়ে? মানুষেরা লণ্ঠন আবিষ্কার করেছে চাঁদের কাছে যাওয়ার জন্য, চাঁদ বিষয়ক কবিতা লেখার জন্য। তারপরও লণ্ঠন জ্বালাতে জ্বালাতে এই কথা মনে হয় এই যাত্রা কি সত্যি চাঁদের দিকে? তাদের দুজনের খুব আগ্রহ হয় এটা জানতে, মজনু কীভাবে চাঁদ নিয়ে সবচেয়ে ভালো কবিতাটি লিখল, আর তার স্ত্রী লাইলী কীভাবে সবচেয়ে ভালো চাঁদের ছবিটি আঁকল। তারা কথা বলে মজনুর সঙ্গে।

—চাঁদপুরে কী আছে?
—চাঁদপুরে চাঁদ আছে। চাঁদপুর থেকে চাঁদ সবচেয়ে ভালো দেখা যায়, সবচেয়ে বড়ো দেখা যায়। একজন ব্যক্তি চাঁদে যা দেখতে চায় তাই সে দেখতে পায়। সবাই চাঁদকে এক ভাবে দেখতে পারে না। চাঁদ দেখার যার যেমন কৌশল সে তেমন দেখতে পায়।
—চাঁদপুরের চাঁদ বড়ো কেন? পৃথিবীর সকল চাঁদ ছোটো হতে থাকলেও চাঁদপুরের চাঁদ ছোটো হয় না কেনো? চাঁদ আসলে কেমন? আমরা তো চাঁদ দিয়ে কত কত কবিতা লিখেছি।
—চাঁদ আমার রিকশার চাকার মতো, যা আমাকে নিয়ে যায় আমার পথে, চাঁদের পথে।
—চাঁদ কি তোমাকে পথ দেখায়?
—চাঁদ আমাকে নয়, সবাইকে পথ দেখায়।
—চাঁদ দেখতে যাওয়া কেন?
—চাঁদের সাহায্যে নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার জন্য।
—তুমি শুনেছি গান গাও। তোমার গানের বিষয়বস্তু কী?
—আমার গানের বিষয়বস্তু আনন্দ। আর পৃথিবীর সকল আনন্দময় গানের বিষয়বস্তু চাঁদ।
—চাঁদ বিষয়ে এতো কথা তুমি কীভাবে জানো?
—চাঁদ ও চাঁদপুর আবিষ্কারের বিষয়।
—চাঁদ ও চাঁদপুর কীভাবে আবিষ্কার করতে হয়?
—কেউ কখনও কাউকে চাঁদ আবিষ্কার করা শেখাতে পারে না।
—আমরা তোমার নিকট থেকে চাঁদ আবিষ্কার শিখতে চাই।
—আপনাদের এই অনুরোধ চাঁদপুর গ্রামের পাখিদের কাছে করুন। চাঁদপুর গ্রামের বিলে সে সকল পাখি স্নান করে। সেই বিলের পাখি আমি ও আমার স্ত্রী পুষি। সেই পাখি গান গায়। সেই গানে আমাদের গৃহের আয়তন বেড়ে যায় রাতের বেলা। সেই গান আমাদের চাঁদের নিকটবর্তী করে।
—তোমার রিকশা কি আদৌ চাঁদপুর যাচ্ছে?
—জি। আমি চাঁদপুর ছাড়া আর কোথাও রিকশা নিয়ে যাই না।
—এখন তো মাঝ রাত। আমাদের ঘুম পাচ্ছে। এতোক্ষণ কেন লাগে চাঁদপুরে যেতে। তা ছাড়া মাঝরাতে তো চাঁদ ডুবে যায়। মনে হচ্ছে চাঁদ ঘুমাতে গেছে।
—চাঁদ ঘুমায় আমাদের গৃহে। আসলে চাঁদ নিয়ে আপনাদের সন্দেহ আমাদের যাত্রা থেকে চাঁদের দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। সন্দেহ সর্বদা দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। আপনাদের প্রতিটি ভ্রমণে প্রতিটি যাত্রায় সন্দেহ। সন্দেহের পথে চাঁদ থাকে না।
—কোথাও পৌঁছানোর কিংবা জ্ঞানের প্রাথমিক শর্ত সন্দেহ। সন্দেহ থেকে সঠিক জ্ঞানে, বলা ভালো সঠিক চাঁদে পৌঁছানো যায়।
—মানুষ কখনও চাঁদে পৌঁছাতে পারেনি। শুধু চাঁদে পৌঁছানোর গল্প লেখা হয়েছে, গল্প বলা হয়েছে। আসলে সঠিক জ্ঞান সঠিক পথে নিয়ে যায় না কাউকে।
—এতো যুক্তি তুমি কোথা থেকে শিখেছ?
—চাঁদের নিকট থেকে।
—কোন চাঁদ?
—যে চাঁদ প্রতিদিন হত্যা হয়ে যায় মহাস্থানগড় নগরীর নাগরিকদের হাতে।

রাত আরও বাড়ে। রূপচাঁদ ও সোনাচাঁদের মনে হতে থাকে মজনু তাদের ঠকাচ্ছে। তাদের সে চাঁদপুর গ্রাম ও চাঁদের নিকট নিয়ে যাবে না। তারা ভাবে মজনু সম্ভবত তার বাড়িতে চাঁদ রেখে এসেছে। তারা যখন মজনুর বাড়িতে ছয় মাস আগে গিয়েছিল তখন মজনুর স্ত্রী লাইলিকে তাদের চাঁদ মনে হয়েছিল। বলা ভালো, লাইলির শরীরে তারা চাঁদের আভাস দেখতে পেয়েছিল। তারা মজনুকে রিকশা থামাতে বলে। মজনু রিকশা থামায়। রূপচাঁদ ও সোনাচাঁদ হঠাৎ ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। তারা তাদের চেয়ে চাঁদ সম্বন্ধে বেশি জানে এমন কাউকে জীবিত থাকতে দেবে না। তাদের সঙ্গে মহাস্থানগড়ের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের দুটো ইট ছিল। এ ইট দুটো তারা মহাস্থানগড়ের মিউজিয়াম থেকে চুরি করেছিল। তারা দুজন এই ইট দুটো দিয়ে মজনুর মাথায় আঘাত করে চাঁদ বিষয়ক কবিতার শেষ পঙ্‌ক্তির মতো। এ সময় মজনুর মাথাকে চাঁদ মনে হচ্ছিল। মজনু মহাস্থানগড়ের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ হয়ে যায়, প্রাচীন অংশ হয়ে যায়, কিংবা চাঁদের অংশ হয়ে যায়। রূপচাঁদ ও সোনাচাঁদ মজনুর রিকশাটাকে উল্টে ফেলে। রিকশার চাকা দুটোকে তারা খুলে ফেলে যা দেখতে দুটো চাঁদের মতো।

রূপচাঁদ ও সোনাচাঁদ হঠাৎ ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। তারা তাদের চেয়ে চাঁদ সম্বন্ধে বেশি জানে এমন কাউকে জীবিত থাকতে দেবে না। তাদের সঙ্গে মহাস্থানগড়ের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের দুটো ইট ছিল। এ ইট দুটো তারা মহাস্থানগড়ের মিউজিয়াম থেকে চুরি করেছিল।

 

১০.
সুপ্রভাত। মহাস্থানগড়ে প্রভাত আসে ধ্বংসাবশেষের আকাশ থেকে। এই সুপ্রভাতে মহাস্থানগড়ের দৈনিক পত্রিকায় দুটো খবর পাশাপাশি ছাপা হয়—চাঁদপুর গ্রামের কাছে একজন প্রাচীন রিকশাওয়ালার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। চাঁদ পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ১৯৬৮, কুষ্টিয়ায়। বর্তমানে সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করছেন। লেখেন বিভিন্ন লিটলম্যাগে। সম্পাদিত লিটলম্যাগ : নিজকল্পা। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ : জল আসে মানুষের দীঘিতে, মানচিত্রকর, আমাদের গ্রামে একটা পাখিচোর আছে, বিড়াল পোষা প্রতিবেশিনীরা, কোথায় কোথায় ঘুমিয়েছিলাম এবং মেয়াদোত্তীর্ণ নিরাপত্তাসমূহ।  উপন্যাস : কেউ মরছে না

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।