শুক্রবার, মে ২২

চোখ

0

রাত ক্রমশ গাঢ় হতে হতে তার একান্ত গভীরতার দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে। যেন রহস্যময় কোনো অন্ধকার বনের ভেতর দিয়ে একটি কালো পাখি হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছে বনের আরও আরও ভেতরে, চূড়ান্ত গভীরতার দিকে—ধীরে…ধীরে…ধীরে…ধীরে…

ঠিক এই সময়ে এই শহরের সমস্ত চোখেরা তাদের যাবতীয় কোলাহল ও কলহ নিভিয়ে দিয়ে ঘুমের আলিঙ্গনে বিভোর হয়ে আছে। শুধু একজোড়া চোখ জেগে আছে। শিউলি ফুলের মতো এই নির্ঘুম চোখজোড়া মনীষার, যার চোখের সাথে ঘুমের আজন্ম দ্বন্দ্ব। সে রাতে ঘুমাতে পারে না। মাঝেমাঝে ভাবে হয়তো তার ঘুমগুলো বিলিয়ে দেওয়া হয়েছে সমস্ত পৃথিবীতে। তার ঘুমগুলো নিয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়ে কিন্তু সে পারে না, সারারাত জেগে থাকে আর ভোরে যখন মানুষজন ঘুম ভেঙে জাগতে শুরু করে তখন মনীষার চোখে ঘুমেরা ফিরতে শুরু করে—
ধীরে…ধীরে…ধীরে…ধীরে…

এভাবেই সে তার জীবনের গত দশটি বছর পার করে আসছে।

রাত তার চূড়ান্ত গভীরতা অতিক্রম করে ভোরের দিকে বয়ে যাচ্ছে আপনমনে, নির্মোহভাবে। মনীষার মন হঠাৎ কেন যেন মৃদু বিচলিত হয়ে উঠলে তার অহেতুক ভাবনারা মৌমাছির মতো দলে দলে এসে জমায়েত হতে থাকে তার মস্তিষ্কের নির্জন উঠানজুড়ে। ডিমলাইট জ্বলছে। বিছানায় মুখোমুখি হয়ে শুয়ে আছে মনীষা আর তার স্বামী জামসেদ চৌধুরী। সে বিভোর হয়ে নাক ডেকে ডেকে ঘুমাচ্ছে। নাক ডাকার শব্দ শুরুতে বিরক্ত লাগলেও দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততার কারণে এখন আর মনীষার বিরক্তি লাগে না, বরং ভালোই লাগে।

মনীষা জামসেদের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবতে থাকে—

‘আহা! বেচারা পুরুষমানুষ। কী সুন্দর নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। একজন পরিপূর্ণ সুখী মানুষ।’

মনীষা ঘুমন্ত জামসেদের দিকে অপলক তাকিয়ে আরও ভাবতে থাকে—

‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হচ্ছে ঘুমন্ত মানুষগুলো। ঘুম হচ্ছে শরীর ও আত্মার আশ্রম। ঘুম না থাকলে তারা বিশ্রাম নিতে পারত না। আর অকালেই সব ধ্বংস হয়ে যেত অদ্ভুতভাবে।’

জামসেদ সেই সুখী মানুষদের একজন। মনীষা রাতে ঘুমাতে পারে না। আর ভোরে যখন ঘুমায় তখনও তার ঘুম খুব হালকা থাকে। এত হালকা যে একটি পাখির ডাকে কিংবা গাছ থেকে একটি শুকনো পাতা ঝরার সামান্য শব্দেও তার ঘুম ভেঙে যায়। অথচ ছোটোবেলায় সে ছিল এর ঠিক উল্টোটা। এই ঘুমের কারণেই সে কত যে বকা খেয়েছে বাবা, মা আর স্কুলের শিক্ষকদের কাছে, তার হিসাব নেই। একবার স্কুলে বিজ্ঞান ক্লাসে ঘুমিয়ে পড়ার জন্য স্যার তাকে সবার সামনে এনে তিনবার কান ধরে উঠবস করিয়েছিল। কী যে অপমান! ইশ! সেই ঘটনাটি মনে পড়লে এখনও মনীষা লজ্জায় লাল হয়ে যায়, এত লাল যে স্বয়ং রক্তজবাও হার মানবে সেই লালের কাছে এলে।

একবার স্কুলে বিজ্ঞান ক্লাসে ঘুমিয়ে পড়ার জন্য স্যার তাকে সবার সামনে এনে তিনবার কান ধরে উঠবস করিয়েছিল। কী যে অপমান! ইশ! সেই ঘটনাটি মনে পড়লে এখনও মনীষা লজ্জায় লাল হয়ে যায়

অপলক দৃষ্টিতে মনীষা জামসেদের চোখ দুটো দেখতে থাকে। দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকার পর আজ তারা বাড়িতে এসেছে। মনীষা এক মুহূর্ত বুকের ভেতরে সামান্য মিহি শূন্যতা অনুভব করে, যে শূন্যতায় হালকা হাহাকারও মেশা থাকে। সেদিনের দুর্ঘটনার দৃশ্যটি মনের ভেতরে একবার উঁকি দিতেই পরক্ষণে মনীষা সচেতনভাবে সেই দৃশ্যটি মুছে ফেলে। দুর্ঘটনার মতো কোনো কুৎসিত দৃশ্য সে সহ্য করতে পারে না। আর সে ভাবতেও চায় না ওরকম ভয়ংকর আর কুৎসিত দৃশ্যটি। সেদিন দুর্ঘটনার পর জামসেদের চোখ দুটো নষ্ট হয়ে যায়। আর মনীষার পা দুটো ভেঙে যায়। সৌভাগ্যক্রমে জামসেদের নতুন চোখ প্রতিস্থাপন করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি তাদের। ওরা হাসপাতালে আসার কিছুক্ষণ পরই আত্মহত্যা করা একটি লাশ নিয়ে আসা হয়, দুইমাস আগে যে লোকটি মরণোত্তর তার চোখ দুটো দান করে দিয়েছিল এই হাসপাতালে এসে। দীর্ঘদিন হাসপাতালে আলাদা আলাদা বিছানায় থাকার পর আজ তারা একসাথে ঘুমাচ্ছে, এক বিছানায়, পাশাপাশি। মনীষা পলকহীনভাবে জামসেদের দিকে তাকিয়ে সেই এলোমেলো ভাবনাগুলো ভাবতে থাকে যা তাকে প্রায়শই নির্ঘুম রাত্রির সুদীর্ঘ একাকীত্বের সাথে সঙ্গ দিয়ে থাকে।

হঠাৎ করে জামসেদ চোখ দুটোর পাপড়ি তুলে মনীষার দিকে তাকালে, মনীষা খুব ভয় পেয়ে চমকে ওঠে একমুহূর্ত। তারপর সে ভয়মিশ্রিত ক্ষীণকণ্ঠে বলে, ‘জামসেদ, তুমি না একটু আগেই নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিলে? তা হঠাৎ এভাবে ঘুম ভেঙে গেল কেন? তুমি অকস্মাৎ এমনভাবে তাকালে আর আমি তো খুব ভয় পেয়েছি, ইশ্!’

তারপর বুকে থুথু ছিটিয়ে সাহস ফিরে আনে মনীষা।

তখন আবারো চোখ দুটো একইভাবে তাদের যৌথস্বরে মনীষার চোখের দিকে তাকিয়ে সাপের মতো হিসহিস করে নরম গলায় বলে—

‘ভয় পেয়ো না, মনীষা। আমরা জামসেদের চোখ নই। জামসেদ ঘুমাচ্ছে, যে তোমার স্বামী।’

মনীষা হাসবে নাকি অবাক হবে ভাবতে ভাবতে বলে—

‘এতরাতে রসিকতা করতে হবে না। তুমি ঘুমাচ্ছিলে ঘুমাও তো! আরামে নাক ডেকে ডেকে ঘুমাও।’

চোখ দুটো এক রহস্যময় দৃষ্টি ফেলে জ্বলে উঠে বলে—
‘রসিকতা নয়। আমরা সত্যি বলছি। খেয়াল করে দেখ, জামসেদ এখনও মৃদু নাক ডাকছে। সে ঘুমাচ্ছে। আর তার মুখটাও বন্ধ, নড়ছে না। কথা বললে তো তার ঠোঁটগুলো নড়েচড়ে উঠত। দেখ, জামসেদ কত গভীরভাবে ঘুমাচ্ছে!’

মনীষা অবাক হয়। খেয়াল করে দেখে সত্যি সত্যি জামসেদ এখনও মৃদু নাক ডেকে চলেছে। শুধু চোখ দুটো বাদে, হাত-পাসহ বাকি সমস্ত শরীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মনীষা আরও বেশি ভয় পেতে থাকে এবং অনুভব করে, তার সমস্ত শরীর স্ট্যাচু হয়ে গেছে। সে নড়াচড়া করতে পারছে না। চোখ দুটো অদ্ভুত এক অদৃশ্য শক্তির মাধ্যমে তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে যা এড়ানো দায়। শুধু তাকে নয় জামসেদকেও…!

চোখ দুটো আবারো হিসহিস করে মনীষাকে বলতে থাকে— ‘তোমার স্বামী ওইদিন দুর্ঘটনায় তার চোখ দুটো হারানোর পর আমরা তার কাছে এসেছি। আমরা যার শরীরে ছিলাম তার নাম প্রবাহিত, তিনি একজন কবি ছিলেন। আজ থেকে প্রায় ১০ হাজার বছর আগে আমাদের জন্ম হয়। আমাদের শরীরটা মারা গেলেও আমরা এখনও দিব্যি বেঁচে আছি মানুষের চোখে চোখে; কারণ আমরা অমরত্বের বরপ্রাপ্ত। যার চোখ সে মারা গেছে, অমরত্বের বর সে পায়নি অথচ তার চোখ দুটো বেঁচে আছে এখনও, তাদের কোনোদিন মৃত্যু হবে না। কী অদ্ভুত ঘটনা তাই না!’

মনীষা কি বলবে বুঝতে পারছে না; পারছে না কোনোকিছু ভাবতেও। শুধু সম্মোহিত হয়ে তাকিয়ে আছে চোখ দুটোর দিকে। আর চুপচাপ তাদের কথা শুনে যাচ্ছে। মনীষা আরেকটু গভীরভাবে তাকালে সে বুঝতে পারে চোখ দুটো সত্যিই অদ্ভুত আর রহস্যময় এবং যথেষ্ট মায়াবীও বটে। চোখ দুটোর দিকে তাকালে কেমন যেন একটা মায়া আর ঘোর কাজ করে। সে মায়া উপেক্ষা করার শক্তি হয়তো পৃথিবীর কারোরই নেই। স্তম্ভিত মনীষার মুখের ভাষারা কথার দরজা বন্ধ করে দিয়ে চুপচাপ বোবা হয়ে যায় কিছুক্ষণের জন্য। শুধু মনীষার চোখ দুটো বিস্ময় ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে মুখোমুখি শুয়ে থাকা তার স্বামী জামসেদের চোখ দুটোর দিকে। জামসেদ ঘুমাচ্ছে কিন্তু তার চোখ দুটো গল্প করছে মনীষার সাথে। সবকিছুই মনীষার কাছে ঠিক স্বপ্নের মতো মনে হতে থাকে। বাইরে ঝুমঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। জানালা দিয়ে বিদ্যুৎ চমকানোর আলো আর শীতল হাওয়ারা পরিমিতিবোধ ভেঙে আছড়ে পড়ছে বিছানায়। দীর্ঘ সময় ধরে চোখ দুটো যুক্তিসহকারে বুঝানোর পর মনীষা ঘটনাটি বিশ্বাস করতে বাধ্য হয় যে, যা ঘটছে তা ভ্রম কিংবা স্বপ্ন নয়, শতভাগ সত্যি।

তারপর অনেক্ষণ নীরবতা পালনের পর মনীষা বলে—

‘আচ্ছা, এটা কি করে সম্ভব যে একজন ঘুমন্ত মানুষের চোখ কথা বলছে, অথচ লোকটা কিচ্ছু টের পাচ্ছে না। তোমরা কি জামসেদকে নিয়ন্ত্রণ করছ?’

চোখ দুটো একবার পলক ফেলে, তারপর স্থির হয়ে মনীষার চোখের দিকে তাকিয়ে ক্ষীণস্বরে বলে—

‘হ্যাঁ। আমরা তাকে নিয়ন্ত্রণ করছি। আমরা তার সম্পূর্ণ অবচেতন মনকে পরিচালনা করছি এখন। জামসেদ ও তার সচেতন মন এখন ঘুমাচ্ছে। আমরা ঘুম না ভাঙালে তারা অনন্তকাল এভাবে ঘুমিয়ে থাকবে। তাদের ঘুম কেউ ভাঙাতে পারবে না।’

চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে মনীষা করুণ স্বরে বলে—

‘প্লিজ, তোমরা জামসেদের কোনো ক্ষতি কোরো না। সে খুব সরল এবং ভালো মানুষ। যদি এই পৃথিবীতে একজনও ভালো মানুষ থাকে তবে সে হলো জামসেদ। তার কোনো বিপদ না আসুক। প্রয়োজনে তোমরা আমাকে মেরে ফেলতে পারো।’

চোখ দুটো মনীষার চোখে বিশ্বাসের দৃষ্টি ফেলে বলে—

‘আমরা তোমাদের কোনো ক্ষতি করব না, তুমি আমাদের ওপরে আস্থা রাখতে পারো। আমরা কারো ক্ষতি করি না। আর হ্যাঁ, জামসেদ এই পৃথিবীর একমাত্র শতভাগ খাঁটি মানুষ। আর এজন্যই সে আমাদেরকে পেয়েছে। আমরা তাকে নির্বাচন করেছি। জানো, আমরা কীভাবে অমরত্বের বর পেয়েছিলাম, শুনবে সেই কাহিনি?’

মনীষা বলে— ‘বল তাহলে, শুনি।’

তারপর চোখ দুটো হিসহিসি করে বলতে শুরু করে—

আজ থেকে দশ হাজার বছর আগে একজন কবির জন্ম হয়েছিল। তার নাম প্রবাহিত আর তার কবিতা শুনে প্রেমে পড়েছিল এক দেবী। সে স্বর্গে থাকত এবং একদিন মর্ত্য থেকে স্বর্গে যাওয়ার পথে এক পাহাড়ারের চূড়ায় বসে কবিতা পড়তে দেখে প্রবাহিতকে। দেবী কাছে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে কবিতা শুনতে থাকে। প্রবাহিতের কবিতা এতটাই সুন্দর আর তীব্র ছিল যে কবিতার কথাগুলো শুনতে শুনতে দেবী কবিতার প্রেমে পড়ে যায়।

‘আজ থেকে দশ হাজার বছর আগে একজন কবির জন্ম হয়েছিল। তার নাম প্রবাহিত আর তার কবিতা শুনে প্রেমে পড়েছিল এক দেবী। সে স্বর্গে থাকত এবং একদিন মর্ত্য থেকে স্বর্গে যাওয়ার পথে এক পাহাড়ারের চূড়ায় বসে কবিতা পড়তে দেখে প্রবাহিতকে। দেবী কাছে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে কবিতা শুনতে থাকে। প্রবাহিতের কবিতা এতটাই সুন্দর আর তীব্র ছিল যে কবিতার কথাগুলো শুনতে শুনতে দেবী কবিতার প্রেমে পড়ে যায়। এরপর থেকে প্রবাহিত যতবারই সেই পাহাড়ের চূড়ায় উঠে কবিতা পড়ত, ততবারই দেবী এসে শুনত। এভাবে বহুকাল কেটে যায় কিন্তু তাদের ভেতরে কখনো কথা হয় না।

একদিন প্রবাহিতের চোখ দুটো নষ্ট হয়ে যায়। অন্ধকার ছাড়া সে কিছুই চোখে দেখতে পায় না। চোখ দুটো নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর অনেকদিন প্রবাহিত কবিতা পড়তে যায় না। দেবী দিনদিন প্রবাহিতের বিরহে ছটফট করতে থাকে। একদিন সে প্রবাহিতের খোঁজে নেমে আসে মর্ত্যে, এসে দেখে প্রবাহিত সেই পাহাড়টির নিচে সামান্য দূরে একটি বৃক্ষের নিচে দুচোখ বন্ধ করে বসে আছে। তার মুখে কোনো কবিতার ধ্বনি নেই। মুখটা কেমন বিষণ্ণ। কবির অন্ধ হয়ে যাওয়া দেখে দেবীর বুকের ভেতরে হাহাকার করে ওঠে এক তীব্র বেদনাবোধ। তখন দেবী প্রবাহিতের অন্ধ চোখ দুটিতে স্পর্শ করে পুনরায় ভালো করে দেয় এবং অমরত্বের বর দেয়।’

চোখ দুটোর কথা শুনে মনীষা আশ্চর্য হতে থাকে। জগৎ কতই না অদ্ভুত আর রহস্যময় তা নিয়ে সে ভাবতে থাকে, যে ভাবনার কোনো আদি-অন্ত নেই। তার কাছে ক্ষণিকের জন্য সবকিছু কেমন যেন পৌরাণিক জগতের মতো মনে হতে থাকে। চোখ দুটো আবারও বলতে শুরু করে—

‘সে আমাদের দিয়ে পৃথিবীর সেইসব দৃশ্যগুলি দেখত যা সাধারণ মানুষেরা দেখতে পায় না। তার ভাবনাগুলিও ছিল পবিত্র, ঐশ্বরিক এবং শিল্পময়। তার সাথে থাকতে থাকতে আমরাও বিশেষ হয়ে উঠি, আমরাও শিল্পী হয়ে উঠি। আমরা এই পৃথিবীর বহু দৃশ্যের সাক্ষী। গত দশ হাজার বছরে পৃথিবীর পরিবর্তনগুলোর একমাত্র সাক্ষী আমরাই। আমাদের সামনেই হয়েছে রামায়ণ, মহাভারত, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ আরও যত যুদ্ধ আছে। আমরা দেখেছি কীভাবে কুরুক্ষেত্রের ময়দানে গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম শরশয্যায় ছিলেন, কীভাবে রথের চাকা আটকে গেলে মাটিতে নামার পর অর্জুনের তীরের আঘাতে কর্ণের মৃত্যু হয়েছিল। ভগবান কৃষ্ণ যখন অর্জুনকে গীতার জ্ঞান প্রদান করছিলেন, তখন আমরা পাশে ছিলাম। আমরা সবকিছুর প্রত্যক্ষদর্শী।’

মনীষা অবাক হয়ে চোখ দুটোর কথা শুনতে থাকে। তারপর নীরবতা ভেঙে মনীষা বলে—

‘আচ্ছা, জামসেদের পূর্বে তোমরা যে লোকটার চোখ ছিলে সে আত্মহত্যা করে মরল কেন?’

চোখ দুটো জবাবে বলে—

‘সে ছিল খুব হতাশ, ব্যর্থ ও পরাজিত মানুষ। তাছাড়া সে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোনো কারণই খুঁজে পাচ্ছিল না।’

—তোমরা তাকে বাঁচালে না কেন?

—তার আয়ু শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া মৃত্যুই ছিল তার জটিল জীবনের একমাত্র সমাধান। বেঁচে থাকলে সে আরও বেশি দুঃখ পেত। আরও বেশি ব্যর্থতা আর লাঞ্ছনার শিকার হতে হত তাকে।

মনীষা আর কিছু বলে না। অনেক্ষণ চুপচাপ কেটে যায়। চোখ দুটোও নীরবতা পালন করে, হয়তো ঘুম পাচ্ছে ওদের। রাত্রি প্রায় শেষ দরজায় এসে দাঁড়ালে ভোরের আযানের আওয়াজ আসতে থাকে। তারপর চোখ দুটো আস্তে আস্তে নিষ্পাপ শিশুর মতো শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। মনীষার চোখ দুটোতেও ঘুমেরা ফিরতে শুরু করে—

ধীরে…ধীরে…ধীরে…ধীরে…

জামসেদ এখনও নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। সে কিছুই টের পায়নি এখনও। হয়তো মনীষা না বললে কোনোদিনই টের পাবে না। কিংবা মনীষা সবকথা খুলে বললেও সে কোনোকিছু বিশ্বাস করবে না। বিশ্বাস খুব শক্ত জিনিস।

ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে জামসেদের ঘুম ভেঙে যায়। জামসেদ স্নিগ্ধ একটা প্রশান্তি অনুভব করে তার সারা শরীর জুড়ে। সূর্য ওঠার সাথে সাথে ঘুম ভেঙে বিছানা থেকে ওঠা তার চিরায়ত স্বভাব। এই স্বভাবটি সে তার মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিল। তার মা খুব ধার্মিক মহিলা ছিলেন। রোজ ফজরের নামাজ পড়ার পর ছোট্ট জামসেদকে বিছানা থেকে টেনে তুলে পড়ার টেবিলে বসিয়ে দিতেন তার মা। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে তিনি খুব সচেতন ছিলেন। জামসেদের বাবা ছিলেন ব্যস্ত লোক এবং নিজের ব্যবসার কাজে তাকে প্রায়শই বাইরে বাইরে থাকতে হতো। তাই সংসার এবং বাচ্চাদের সামলানোর দায়িত্ব ছিল তার মায়ের ওপর।

জামসেদ ঘুমের আবেশ কাটিয়ে বিছানা থেকে উঠে অবচেতনভাবে আস্তে আস্তে বেসিনের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সে নিজেকে দেখতে থাকে। হাত দিয়ে আলতো করে সে তার চোখ দুটোকে স্পর্শ করে এবং কিছুটা স্বর্গীয় সুখ অনুভব করে এটা ভেবে যে এতবড়ো একটা দুর্ঘটনার পরও সে এখন পুরোপুরি সুস্থ। পূর্বের চেয়ে সে আরও ভালোমতো দেখতে পারে সবকিছু। জামসেদ ব্রাশে টুথপেস্ট লাগিয়ে বেসিনের আয়নার দিকে তাকিয়ে ব্রাশ করতে থাকে। কিছুক্ষণ ব্রাশ করার পর সে আবার তার চোখের দিকে দৃষ্টি ফেলে। কী অদ্ভুত মায়াবী চোখজোড়া। সে নিজেই নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে সম্মোহিত হয়ে যায়। তার মনে হয় চোখগুলো কথা বলছে নীরব ভাষায়। কিন্তু সেই ভাষা না জানার জন্য যে কিছুই বুঝতে পারছে না। চোখজোড়া যেন প্রাচীন কোনো নগরীর মতো শত-শত বছরের চাক্ষুস ইতিহাস আর ঐতিহ্য ধারণ করে আছে। চোখ দুটো যেদিন রিপ্লেস করা হলো, ডাক্তার যখন তাকে চোখ খুলতে বলল, তখন প্রথমবার চোখ দুটো খুলে তাকিয়েই জামসেদ কিছুটা আন্দাজ এবং অনুভব করতে পারে যে, চোখ দুটো সাধারণ নয়। বিশেষ কোনো ক্ষমতা বা অলৌকিক শক্তি আছে। যদিও জামসেদ যথেষ্ট বিজ্ঞানমনস্ক, তবুও সে বিশ্বাস করে এই পৃথিবী এবং মহাবিশ্বের রহস্যের অন্ত নেই। যত সময় যাবে মানুষ সেইসব রহস্য আবিষ্কার করতে থাকবে। ব্রাশ করতে করতে জামসেদ আবারও তার চোখের দিকে তাকায়। হঠাৎ তার মনে পড়ে প্রাচীন মিশরের দেবতা হোরাসের চোখের সেই মিথের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সে ‘হোরাসের চোখ’ সম্পর্কে জানতে পারে একটি বই পড়ে। বইটি মনীষা তাকে জন্মদিনের বিশেষ উপহার হিসেবে দিয়েছিল। হোরাসের মতো সে আবার তার হারানো চোখ ফিরে পেয়েছে। জামসেদ নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে একমুহূর্তের জন্য নিজেকে তার হোরাস মনে হয়।

হোরাস ছিলেন মিশরের অধিপতি দেবতা ওসিরিস এবং দেবী আইসিসের পুত্র। তার মা আইসিস ছিলেন জাদুবিদ্যার দেবী আর বাবা ওসিরিস ছিলেন মৃত্যুপরবর্তী জীবনকালের দেবতা। সহজ করে বললে পরকালের দেবতা। দেবতা গিরির সাথে সাথে ওসিরিস আকাশ এবং মর্ত্যের অর্থাৎ মিশরের অধিপতিও ছিলেন। দেবতা অসিরিসের এক ভাই ছিল। তার নাম সেথ। সেথও দেবতা ছিল। সেথ ছিল যুদ্ধ, ঝগড়া-ফ্যাসাদ আর ঝড়ের দেবতা। সে এতোটাই লোভী আর হিংস্র প্রকৃতির ছিল যে, সিংহাসনের ক্ষমতার লোভে পর্যবসিত হয়ে সে তার আপন ভাই ওসিরিসকে নির্মমভাবে হত্যা করে এবং মৃতদেহ একটা কফিনে ভরে নীলনদে ডুবিয়ে দিয়ে এসে সিংহাসনে চড়ে বসে।

বিধবা আইসিস বৈধব্যের জ্বালা সইতে না পেরে তার জাদুবিদ্যার বলে ওসিরিসকে খুঁজে বের করেন এবং তাঁকে পুনর্জীবন দান করেন। ওসিরিসকে পুনরায় জীবিত দেখে সেথ আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে খুব বাজেভাবে গালিগালাজ করতে থাকে। তারপর রাগে আর ঈর্ষায় সে ওসিরিসকে আবারো হত্যা করে এবং এবার সে হত্যা করেই ক্ষ্যান্ত হয় না। আইসিস যেন আর কখনো খুঁজে বের করতে না পারে সেজন্য ওসিরিসের মৃতদেহকে ৪২টি টুকরো করে সমস্ত মিশরে সেই টুকরোগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়। যেন সে কোনোভাবেই আর ফিরে আসতে না পারে। কিন্তু হায়, কথায় আছে না, ‘রাখে আল্লায় মারে কে!’ বেচারী দেবী আইসিস আবারো তাঁর হতভাগ্য স্বামীর সমস্ত টুকরো খুঁজে খুঁজে বের করতে শুরু করে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, ওরিসিসের শরীরের সমস্ত অঙ্গ-প্রতঙ্গ খুঁজে পেলেও তাঁর পুরুষাঙ্গটি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। দেবী আইসিস বিপাকে পড়ে যান। কিন্তু সেই বিপাক বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারে না, কেননা আইসিস যেহেতু জাদুবিদ্যার দেবী ছিলেন তাই তিনি শেষমেষ একটি স্বর্ণের লিঙ্গ প্রতিস্থাপন করে দেন তাঁর স্বামী ওরিসিসের শরীরে। সেই স্বর্ণলিঙ্গের সক্রিয়তাতেই হোরাসের জন্ম হয়। হোরাস খুব ছোটোবেলা থেকেই বাবা-মার কাছে তাঁর চাচার এইসব অত্যাচারের কথা শুনতে থাকে আর অপেক্ষা করতে থাকে একদিন সে অবশ্যই প্রতিশোধ নেবে। তারপর একদিন হোরাস তার বিশ্বাসঘাতক চাচার প্রতিশোধ নিতে চায় এবং দুজনের মধ্যে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হয়। সে যুদ্ধে সেথ হোরাসের চোখ উপরে ছয় টুকরো করে ফেলে দেয়। তবে শেষ পর্যন্ত হোরাসই সেই যুদ্ধে জয়লাভ করে। তারপর তার মা দেবী আইসিস জাদুবিদ্যার সাহায্যে হোরাসের চোখ ফিরিয়ে আনেন। তখন থেকে হোরাসের চোখ অলৌকিক শক্তিপ্রাপ্ত হয় এবং পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় আর বিশেষ চোখে পরিণত হয়ে ওঠে।

জামসেদ ফ্রেশ হয়ে বাথরুম থেকে আসার পর কিচেনে গিয়ে পাতিলে জল আর চা পাতি ঢেলে চুলাটা জ্বালিয়ে দেয়। চা বানিয়ে খায়। তারপর তার ব্যবসার কাজে বাইরে বেরিয়ে পড়ে। দুপুরে বাসায় ফিরে ডাইনিং টেবিলে বসে দুপুরের খাবার খেতে খেতে মনীষা জামসেদকে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার চোখের আর কোনো সমস্যা নেই তো? সবকিছু ঠিকঠাক আগের মতো দেখতে পাও?’

জামসেদ বলে, ‘না। চোখের কোনো সমস্যা নেই। বরং আগের চেয়ে আরও ভালো দেখি। আগের চেয়ে অনেককিছু বেশিই দেখি।’

—হা…হা…। তাই নাকি?

—হ্যাঁ। সত্যি তাই। জানো, আজ সকালে ছাদে টবের ফুলগাছগুলোতে আমি যখন পানি ঢালছিলাম তখন, কোথা থেকে যেন একটা প্রজাপতি এসে একটি ফুলের ওপরে বসল। ফুলগাছটি ছিল আমার পিছনে। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল এবং কল্পনাতে একবার দেখলাম যে নীল রঙের একটি প্রজাপতি আমার পিছন দাঁড়িয়ে থাকা ফুলগাছটির সদ্য প্রস্ফুটিত ফুলের ওপরে গিয়ে বসল। আমি মুহূর্তেই পেছনে তাকিয়ে দৃশ্যটি হুবহু দেখলাম। প্রজাপতির চোখের মিহি অশ্রুদাণা পর্যন্ত দেখেছি আমি।

—বাহ্। ইন্টারেস্টিং তো।

—তা তো বটেই। আচ্ছা, ওই যে দেয়াল বেয়ে একটি পিঁপড়ে উঠে যাচ্ছে উপরে। দেখতে পাচ্ছ তুমি?

—হ্যাঁ। না দেখার কি আছে। এটা তো একদম কাছে। সবাই দেখতে পাবে।
—তা পাবে কিন্তু আমার মতো নয় নিশ্চয়ই।

—কি রকম?

—আমি ওই পিঁপড়াটির কয়টি পা আছে তা এখান থেকে বলে দিতে পারব।

—হা…হা…। সত্যি?

—হুম। সত্যি।

—ওই যে, দলছাড়া একটি পিঁপড়া একাকী যাচ্ছে, ওর ৫টি পা আর ১টি পা ভাঙা।

মনীষা পিঁপড়াটির কাছে গিয়ে চিমটি দিয়ে তুলে এনে আলমারি থেকে আতশকাচটি বের করে আনে, তারপর আতশকাচ দিয়ে ভালোমতো দেখে ঠিক ঠিক পাঁচটি পা আর একটি ভাঙা পা। মনীষা খুব অবাক হয় আর গতরাতে তার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। কিন্তু সে জামসেদকে কিছুই বুঝতে দেয় না। বরং একটা মুচকি হাসি দিয়ে জামসেদের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘বাহ্, তোমার চোখে বুঝি জুমলেন্স আছে!’

—হা…হা…। হয়তো। আচ্ছা যে লোকটার চোখ আমার চোখে রিপ্লেস করা হয়েছে। তার অ্যাড্রেস কি পাবো হাসপাতালে ওদের কাছে?

—পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সে তো এখন মৃত। আত্মহত্যা করেছে। আর মৃত বলেই চোখগুলো পাওয়া গেছে।

—হ্যাঁ। আমি জানি আর এজন্য আমি তার কাছে ঋণী এবং কৃতজ্ঞও। তার জীবন সম্পর্কে আমার খুব জানার কৌতূহল হচ্ছে। এত সুন্দর চোখ যার আছে, পৃথিবীতে বেঁচে থাকার আর কোনো কারণ না থাকলেও সে দিব্যি সুখী হয়ে হাজার বছর বেঁচে থাকার প্রেরণা পাবে। এত মায়াবী আর রহস্যময় যার চোখ সে কেন আত্মহত্যা করল।

জামসেদের চোখের দিকে তাকিয়ে মনীষা খেয়াল করে তার চোখগুলো ক্রমশ রোমাঞ্চকর হয়ে উঠছে।

এদিকে প্রতি রাতে মনীষা চোখ দুটোর সাথে কথা বলতে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন সময়কার ইতিহাস সম্পর্কে জানতে থাকে। চোখ দুটোর সাথে মনীষার এক অন্যরকম সম্পর্ক গড়ে ওঠে, অদ্ভুত সেই সম্পর্ক যা মনীষা আর চোখ দুটো ছাড়া অন্য কেউ অনুমানও করতে পারবে না।

জামসেদ হাসপাতালে গিয়ে অনেক দৌড়ঝাঁপ করেও সেই লোকটার অ্যাড্রেস খুঁজে বের করতে না পেরে অবশেষে হতাশ হয়ে কৌতূহল হারিয়ে ফেলে অজান্তেই। এদিকে প্রতি রাতে মনীষা চোখ দুটোর সাথে কথা বলতে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন সময়কার ইতিহাস সম্পর্কে জানতে থাকে। চোখ দুটোর সাথে মনীষার এক অন্যরকম সম্পর্ক গড়ে ওঠে, অদ্ভুত সেই সম্পর্ক যা মনীষা আর চোখ দুটো ছাড়া অন্য কেউ অনুমানও করতে পারবে না। জামসেদ তার কিছুই জানে না। অনেকদিন পর একরাতে ডাইনিং টেবিলে মুখোমুখি বসে মনীষা আর জামসেদ ডিনার করছিল। মনীষা খেয়াল করে জামসেদ কিছু বলতে চাচ্ছে কিন্তু সংকোচে বলতে পারছে না।

—তুমি কি কিছু বলতে চাচ্ছ?

—হ্যাঁ। কিন্তু আমি খুব দুঃখিত।

—কেন?

—আসলে, তোমার সাথে কথা না বলেই, আলোচনা না করেই আমি একটি কাজ করে ফেলেছি আজকে সকালে।

—আজ সকালে?

—হ্যাঁ।

—কী কাজ? শুনি…

—আজ সকালে হাসপাতালে গিয়ে আমি আমার চোখ দুটো মরণোত্তর দান করে এসেছি। কিছুদিন ধরে এলোমেলো স্বপ্ন দেখছি। তাছাড়া আমার মনে হয় এত সুন্দর এই চোখ চিরকাল বেঁচে থাকুক পৃথিবীতে। আমরা তো যেকোনো সময় মারা যেতে পারি। মৃত্যুর কোনো দিনক্ষণ নেই। জানো, কয়েকদিন ধরেই বিষয়টি নিয়ে ভাবছিলাম। কিন্তু আজকে কেমন যেন আমি অনুভব করলাম আমার ভেতর থেকে কেউ যেন আমাকে নিয়ে গেল হাসপাতালের দিকে। তারপর চোখ দুটো দান করে আসলাম। আমি খুব দুঃখিত। তুমি রাগ কোরো না আমার ওপরে।

মনীষা কোনো কথা বলতে পারে না। সে চুপচাপ শুধু ভাবতে থাকে, তবে কি জামসেদের আয়ু শেষ? তার মৃত্যু আসন্ন? চোখ দুটো কি এবার অন্যকারো কাছে চলে যাবে? কিন্তু সে যে চোখ দুটো ছাড়া একা থাকতে পারবে না। চোখ দুটো তার বন্ধুর মতো হয়ে গেছে, প্রেমিকের মতো হয়ে গেছে, তারা মনীষার মনের ভাষা পড়তে পারে। মনীষাকে তারা বুঝতে পারে।

অনেক প্রশ্ন আর দুর্ভাবনা এসে জমতে থাকে মনীষার মনের ভেতরে। এলোমেলো নানান ভাবনার ভেতরে একটি ভাবনা মনীষাকে আরও তীব্র করে তোলে, তা হলো এই চোখ দুটোকে মনীষার চোখে প্রতিস্থাপন করতে পারলেই তাদের রক্ষা করা সম্ভব। নয়তো কোনোভাবেই তাদের রাখা সম্ভব নয়। তাছাড়া তাদের শূন্যতা মনীষা সহ্য করতে পারবে না। মনীষা ভাবে, উপায় একটাই, জামসেদ মারা গেলে নিজেই নিজের চোখ দুটোকে নষ্ট করে ফেলতে হবে। তবেই সম্ভব হয়তো, যেভাবে জামসেদের চোখে ওদেরকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। একইভাবে মনীষার চোখেও প্রতিস্থাপন করতে হবে। এরকম বহুরকম ভাবনা ভাবতে ভাবতে মনীষা অপেক্ষা করে কখন রাত আরেকটু বাড়বে আর জামসেদ ঘুমিয়ে পড়বে। তারপর সে চোখ দুটোর সাথে কথা বলবে। কেন তারা কিছুই বলল না। কেন জামসেদ আজকেই তাদেরকে দান করে আসল। অনেক অনেক অনেক প্রশ্নের বাণে জর্জরিত হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে মনীষা। কিন্তু দুঃখে বিষয় এই যে, জামসেদ আজ ঘুমাচ্ছে না। জেগে আছে। বরং বহুবছর পর আজ রাতে মনীষার চোখেই ঘুম চলে আসে— ধীরে…ধীরে…ধীরে…ধীরে…

রাত ক্রমশ গাঢ় হতে হতে তার একান্ত গভীরতার দিকে রওনা হয়। যেন রহস্যময় কোনো এক অন্ধকার বনের ভেতর দিয়ে একটি কালো পাখি হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছে বনের আরও আরও ভেতরে, চূড়ান্ত গভীরতার দিকে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। দমকা হাওয়া এসে আছড়ে পড়ছে বিছানায়। মনীষা বিভোর হয়ে ঘুমাচ্ছে, তার পাশে জামসেদ বসে বসে মনীষার দিকে তাকিয়ে আছে এক অদ্ভুত মুগ্ধতা নিয়ে।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ১৮ নভেম্বর, সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে। বগুড়া পুলিশ লাইন্স হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল থেকে হিসাব বিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতিতে স্নাতক। প্রকাশিত বই: অন্তর্ভেদী অক্টোপাস [২০১৮], মাতালগুচ্ছ [২০১৯], টাকা, নাচো তো দেখি [২০১৯], উপেক্ষিত ক্রেঙ্কার [২০২০], বিপন্ন ডানার রঙ [পিডিএফ বই], দ্য লোনলি ট্রি উইদাউট বার্ডস; ফ্লাইং ইনসাইড হার সোল [পিডিএফ], ক্ষুধার্ত লাটিমের বয়ান [২০২২]।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।