অনাবৃত বাদাম; আরও দূরে, অনালোকিত গৃহলোকের দিকে, সূর্যাস্তের বাঁকলগুলি ঘন হয়ে উঠছে—তার কণ্ঠস্বরের ওপর মেলে দেয়া তরঙ্গের শেকড়ে!
স্মৃতিরা শিমূল তুলোর মতো। উড়ে যায়। উড়ে যায় কোথাও দূরে। অনেক অনেক দিন পরে, তারপর হয়তো কখনও তারা, সেইসব স্মৃতিরা ফেরে। ফিরে এসে উঠোনের আঁধার জড়ানো নিমগাছটার ডালে এসে বসে; উঁকি দিয়ে দেখে নেয় মানুষের-মানুষীর পেতে রাখা খেলাঘর।
স্মৃতিরা শিমূল তুলোর মতো!
উঠোনের পাঁচিলের গা ঘেঁষে সন্ধ্যামণির ঝোপ। ছোট্ট টালির ঘর আর একটু এগিয়ে গেলে হেজে-মজে যাওয়া খড়ের চালের একটা রান্নাঘর।
চুলোয় খড় গুজে দিতে দিতে অর্চনার মনে হয়, দুপুরটা বৈঁচি ঝোপের মতো নিঝুম। শিশিরের ভারে নুয়ে থাকা কত কত কথা; কাঠবাদাম গাছের লালচে পাতার মতোই তাই ঝরে ঝরে পড়ে।
স্মৃতিরা শিমূল তুলোর মতো!
নাটা ঘাসের বনে বাবুই পাখির বাসা দোলে।
পুকুরের দামকলমির আড়াল থেকে ডাক দেয় ডাহুক পাখিটি; হয়তো কোনো এক ডাহুক ডাকা ভোরে পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছিল বীথিকা।
বাড়ির পুব দিকটায় শান বাঁধানো পুকুর ঘাট। বরষার বিকেলগুলোয় ওর বুকে আমরা কতো কতো বার কেয়া পাতার নৌকা ভাসিয়েছি। জেঠিমার সবটুকু সাধ জন্মের মতো ভাসিয়ে দিয়ে স্মৃতিই হয়ে গেলো মুখপুড়ি।
কেমন চাপাফুলের গন্ধে মিইয়ে আছে উঠোনটা!
পাতালপুরির রাজকন্যার মতো মায়াবী দুপুর, পেরিয়ে যাচ্ছে, উঠোনে ফেলে রাখা মিনুর কাজললতা; তার বুকের ভেতর ইকড়িমিকড়ি, কানামাছি, একটা ভোকাট্টা ঘুড়ি আকাশদিউটির মতো হয়তো-বা চুপ হয়ে আছে; বাতাসের সারি, অশোকের এলোমেলো ডালগুলো নিয়ে খেলছে এখন। বেলা বাড়ে; আরও দীঘল হয়ে ওঠে বকুল গাছটার ছায়া।
ভুলে যাওয়া আমাদের ডাকনামগুলি হয়তো কোথাও ফেলে রাখা আছে; বুলবুলি অথবা একটা তুলোট্যাঁপারির শিস দিয়ে মুড়ে হয়তো কেউ লুকিয়ে রেখেছে তাকে, ছেঁড়াখোঁড়া, বৈঁচি ঝোপের ছায়ায়; পুরোনো কোনো মস্ত কোঠাবাড়ি, খড়খড়ির জানালা গলে যেভাবে রোদ্দুর এসে শুয়ে থাকে স্যাঁতস্যাঁতে ময়লা মেঝেয়; রঙগুলি প্রজাপতি আর সুরগুলি ঝিঁঝিঁপোকা বুঝিবা; সেই পাতালপুরির রাজকন্যার মতো মায়াবী দুপুর, পেরিয়ে যাচ্ছে, উঠোনে ফেলে রাখা মিনুর কাজললতা; তার বুকের ভেতর ইকড়িমিকড়ি, কানামাছি, একটা ভোকাট্টা ঘুড়ি আকাশদিউটির মতো হয়তো-বা চুপ হয়ে আছে; বাতাসের সারি, অশোকের এলোমেলো ডালগুলো নিয়ে খেলছে এখন। বেলা বাড়ে; আরও দীঘল হয়ে ওঠে বকুল গাছটার ছায়া।
এতোটা দূর থেকে, সেই ছায়ার কোলে বসে থাকা বাবা-মেয়ের বিহ্বল কথোপকথন অর্চনা শুনতে পায় না।
‘বাবা জানো, মা আমার পোষা মিনিকে তাড়িয়ে দিয়েছে।’
‘মাকে বকে দেবো আমি’
‘তুমি লেজ ঝোলা হলদে পাখিটাকেও বকে দিয়ো। ওটা আমাকে কাল সারাটা দুপুর ভরে ভেঙিয়েছে!’
ভাবনাটাকে আর কিছুতেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না। বনমুলোর মাথা থেকে রোদ নেমে যাচ্ছে ধীরে। উঠোনে পেতে রাখা কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ি ঢেকে দিয়ে গেছে নিমছায়া। চোখ জলে ভরে ওঠে, তার।
কে অমন বুকের ভেতর ডাক দিয়ে যায়?
সেই কাঁচপোকা ধরা দুপুর; তার ফিনফিনে ডানার ধ্বনির মতোই উবে গিয়েছে কবে যেন; কোথায় কারা যেন ঝরা কুঁচফল কুঁড়িয়ে ফিরে যাচ্ছে; কোথায়, এক নিঃসঙ্গ পিয়ালশাখা শুধু থেকে থেকে মাথা নাড়ে।
দু-একটা গানের সুর এইখানে হাওয়ায় গাঁথা আছে।
দেউড়িতে ফুলের ভারে নুয়ে পড়েছে যে ঝাড়, তার বুকের ’পরে রোদ্দুর ডানা মেলে দিয়েছে। একটা ঝিঁঝিঁ পোকার ডানা ধ্বনিও সুর হয়ে উঠতে চায়। এমন নিঝুম হয়ে আছে চারপাশ। একটা পোড়া মাটির পুতুল বিষণ্ন ছায়ার কোলে একা একাই ঘুমায়। হয়তো কোথাও বুকজলে দাঁড়ানো হিজলের বন কথা কয়; কথা কয় হাওয়াদের সাথে। হয়তো কোথাও পদ্মনালের ফাঁকে একটা জলমাকড়সা চুপ হয়ে আছে।
একা একাই কেটে যায় দুপুরটা।
খঞ্জনা পাখির ডাক ভরা দূরের কোনো পথ!
নিঃসঙ্গ দুপুরটায় কিছুই করার থাকে না। বাবা সেই কোথায় গিয়েছে; এখনও ফেরেনি। বারান্দায় মা পুরোনো ছেঁড়া কাপড় আর রাজ্জির সুতো নিয়ে কাঁথা পেতে বসেছে।
যখন বিষণ্ন দুপুরগুলোয় কিছুই করার থাকে না, তখন দুপুরটা যেন নিজেই একটা একটা করে তার গোপন কথার ডালি খুলে বসে।
কখনও সে মামা বাড়ি, দাদু-দিদা, ঝুরিনামা সেই বটগাছটার কথা পাড়ে।
কখনও সে এক আশ্চর্য পাখিওয়ালার কথা তোলে, যে কিনা মৃত পালক থেকে গোধূলির অন্ধকারে ঝাঁক ঝাঁক পাখি উড়িয়েছিল।
তাই হয় নাকি! খুকুর ঠিক বিশ্বাস হয় না। কিন্তু যখন সাঁঝ নেমে আসে; হয়তো দূরের পাড়ায় সাঁজাল দিয়েছে কেউ; জোনাকির আলোডোবা পথে পথে ঘরে ফেরে পাতাকুড়ুনিরা; খুকু দ্যাখে, তাদের লাল টালির চালের ওপর দিয়ে, মস্ত শানবাঁধানো পুকুরটায় ছায়া ফেলে, উড়ে যায় থোপা থোপা পাখিরা, মেঘের মতো।
‘তোমাকে শিখিয়ে দেবো, কেমন করে পালক থেকে পাখি ওড়াতে হয়।’—বলেছিল সেই পাখিওয়ালা।
সেই পাখিওয়ালা আর আসেনি। একটা নিলচে ধূসর পালক, খুকু লুকিয়ে রেখেছে; পুতুলের কাপড়ের মধ্যে; যদি ফিরে আসে সেই পাখিওয়ালা।
হয়তো কোনো দিন দ্যাখা হবে না—এমন বিষাদ, কেউ কেউ পাণ্ডুর কুয়াশার মতো পুষে রাখে বুকের ভেতর; খানিকটা জলের ধারা ঝিরি ঝিরি শব্দ তুলে বয়ে চলেছে; দূরে কোথাও। প্রজাপতিটি ডানা থেকে খুলে রাখছে রোদের কুঁচিগুলো; রোদের দুপুর ভরে তিলে ঘুঘু ডাকছে।
রোদ্দুরের পিঠে আঙুল পেতে দিয়ে কারা যেন পাখি ফোটায়; ফুল বানায়; দুপুরটা কাচের চুড়ির মতো ভেঙে যায় কোনো কোনো দিন। ঝুরঝুর শব্দ তুলে। বাইরে নিঝুম ঘুমের ঝরনা নেমেছে। বাইরে, কোথাও কোনোখানে বাতাসের সিঁথি বেয়ে বেরিয়ে পড়েছে ঝরা পাতার দল। কথা হয় আজ তাই ঝরাপাতাদের সাথে।
হয়তো কোনো দিন দ্যাখা হবে না—এমন বিষাদ, কেউ কেউ পাণ্ডুর কুয়াশার মতো পুষে রাখে বুকের ভেতর; খানিকটা জলের ধারা ঝিরি ঝিরি শব্দ তুলে বয়ে চলেছে; দূরে কোথাও। প্রজাপতিটি ডানা থেকে খুলে রাখছে রোদের কুঁচিগুলো; রোদের দুপুর ভরে তিলে ঘুঘু ডাকছে।
মৃত্যুর মতো শান্ত একটা প্রজাপতি, রোদ্দুরের গায়ে ছিটিয়ে দিচ্ছে তার রঙের আর্তিগুলি!
‘যখন শব্দের জন্য সমস্ত প্রার্থনাই থেমে গিয়েছে, তখন সুরেরা জেগে ওঠে; তুই দেখতে পাবি একটা জ্যান্ত বিষাদ রঙের সুর, ধীরে তোর সামনে দিয়ে এগিয়ে চলেছে’— ছোটো কাকু একদিন বলেছিল এইসব।
‘তোর ছোটো কাকু একটা পাগল!’— মা বলে।
মায়েরা সবসময় সত্যি কথা বলে না; খুকু জানে!
‘আজ আবার এসেছে পাখিটা’
হাত বাড়ালেই নোয়ানো যায়, কোথাও এমন একটা শুকনো মরা ডাল, ছায়ার বিষাদে ভরে আছে।
আমলকী গাছটার ছায়ায় বসে খেলছিল সে; সাঁঝ নেমেছে; মা বকছে আর দৌড়ে দৌড়ে এটা ওটা গুছিয়ে রাখছে বারান্দায়।
আকাশটা কাজলের মতো কৃষ্ণবর্ণ হয়ে উঠছে থেকে থেকে; ওই উল্টে গেলো ভাঙা ঝুড়িটা। কেমন সাঁইসাঁই করে বাতাস আছড়ে পড়ছে। মা কোনো রকমে তাকে আর এক গাদা বাসনকোসন, কিছু শুকনো কাপড় নিয়ে ঘরে ঢুকল।
‘তোর বাবাটা কি বল দেখি! এখনও ফিরল না! যদি জ্ঞান বুদ্ধি কিছু থাকে!’
‘বাবাকে বকবে না!’
‘না, বকবে না!’
ওই তো কোথাও দূরে বাজ পড়ল। বেনা ঘাসের বন ডুবল আঁধারে।
তারপর কখন সে ঘুমিয়ে পড়েছিল তার মনে নেই; ভোরের আলো ফুটলে দ্যাখে ঝড় থেমে গেছে।
সেই ঝড়ে দুটো শালিক পাখির বাচ্চা নিচে পড়ে গিয়েছিল। নিচে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা বাচ্চা মারা যায়। আর একটা তখনও বেঁচে ছিল। ছোটো কাকু সেটাকে তুলে দিয়েছিল বাসায়।
তারপর থেকে রোজ পাখিটাকে দেখা যেতে লাগল!
এতটুকু ছেঁড়া কাগজ, গাছের বাঁকল, ঠোঁট দিয়ে উল্টে কি যেন খোঁজে সে।
ব্যথার মতো দীর্ঘ হয়ে আসে দুপুরগুলো।
হয়তো শাঁখাপলার থইথই শব্দের কাছে দুপুরটা দাঁড়ায় এসে; নিসিন্দার ঘন ঝোপ ঢলে পড়ে ঘুমের কোলে!
হয়তো কেউ কোথাও নেই; মাথার কাঁটা, কাচের চুড়ি, পুঁতির মালা, হয়তো কেউ কোথাও নেই। কোনো দূরে, মজে যাওয়া কোনো ডোবার ধারে রাধালতা গাছটায় ফুল এসেছে বুঝিবা।

জন্ম ৮ ডিসেম্বর ১৯৮৮; কৃষ্ণনগর, খুলনা। সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। পেশায় শিক্ষক।
প্রকাশিত বই : ডাকিনীলোক [কবিতা, চৈতন্য, ২০১৬], অহম ও অশ্রুমঞ্জরি [কবিতা, অগ্রদূত, ২০১৮], নিঃসঙ্গ কেতকীর মতো [কবিতা, বিদুর, ২০২১]
ই-মেইল : anupamsoc@gmail.com