শুক্রবার, জুলাই ১৯

আত্মকরুণার মতো বৃষ্টিতে

0

চাঁদের আবছা আবছা আলোয় স্পষ্ট হয় ছিপছিপে নদী। শীর্ণদেহ নিয়ে কেউ বসে আছে সে নদীর পাড়ে। চিরমধ্যাহ্নে এইখানে ছিল ভাঁড়ার, এখন জলের মাঝে কতোগুলো ছায়া খেলা করে। টলতে টলতে মানুষেরা এসে দাঁড়ায় নিজেদের সামনে। কারো মুখে ফোটে না কোনো কথা। হঠাৎ মনে হয় পুনর্জন্ম হয়েছে সবার আর সকলেই নিয়ে এসেছে জাতিস্মরতা। তারা ভাবে, ভাবতে শুরু করে এটাও চিরস্থায়ী মধ্যাহ্ন, যা স্রেফ রূপ বদলে ফেরত এসেছে।

তারা আর নাই, যারা এইখানে ছিল একদিন। যারা আছে তারাও ভুলে যেতে বসেছে তাদের কথা। এখন মধ্যাহ্ন। সময়ের হিসেব কেউ রাখে না এইখানে। হয়তো সময় স্থির হয়ে আছে বলে। অর্থাৎ, এইখানে মধ্যাহ্ন দিয়েছে শেকড় ছড়িয়ে বহুকাল ধরে। একসময় রাত ছিল, মেয়ে সন্তান হলে অনেকে নাম দিতো রাত্রি। অথচ, এখন তন্ন তন্ন করে খুঁজে এই জনপদে পাওয়া যাবে না এই নামের সন্ধান। যদিও কেউ কেউ আছে, যারা গাছে গাছে থাকে, খোঁজে ছায়া, যাদের মনে কোথাও রয়ে গেছে স্মৃতি স্মৃতি ঘ্রাণ— তারা এখনও মাঝেমধ্যে করে রাতের গুণগান।

এই চিররহস্যের মাঝে কেউ কেউ ভাবে রাত হয়তো পাখি। অসীম শূন্যতায় যারা পেয়েছে ক্ষয়ের শাস্তি। আবার কেউ কেউ বলে রাত ছিল বৃষ্টির মতো, যার ছোঁয়া পেলে প্রকৃতিতে নেমে আসতো বসন্ত। এইসব সন্তাপের মাঝে মনে পড়ে কতদিন ফোটে না ফুল আর বাগানগুলো পড়ে আছে যেন বোমাবিধ্বস্ত নগরী। মাতালের স্বরে কে যেন পাশ থেকে বলে, হাওয়া কী বইতে ভুলে গেল? প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য কেউ খোলে না মুখ। চারিদিকে নৈঃশব্দ্য আর লাল লাল চোখ। তার মাঝে বহুকাল পরে কোথা থেকে যেন অহেতুক নেমে এলো রাত, গভীর রাত।

রাত নেমে এসেছে শহরে, সকলেই অবাক হয়ে ভাবে, এ কেমন বিপদের দোলাচল। কোথাও ছিল না বিপদসংকেত, ছিল না কারফিউ; এমনকি অক্সিজেনের ব্যবহার ছিল কম। এটাই যে বহুকাঙ্ক্ষিত রাত সে কথা বোঝার আগে অনেকেই হারিয়ে যায় অন্ধকারে, যদিও বিষণ্ণতার মতো কোথাও তখনও মিটিমিটি জোনাক জ্বলে। আরও জ্বলে আকাশে হিম হিম নক্ষত্র, মানুষেরা ভাবে এসব হয়তো দৈত্য। চিরস্থায়ী মধ্যাহ্নে জন্ম নেওয়া মানুষেরা খুঁজতে থাকে মুক্তির উপায়। রাত তখন আরও গভীর থেকে গভীর হয়ে যায়।

শুরু হয় মধ্যরাতে বৃষ্টি। মানুষেরা কিছুটা ধাতস্ত হয়ে যখন ছুটে যেতে চায় পাওয়ার সোর্সের কাছে তখন দেখা যায়, পড়ে আছে সবকিছু অকেজো হয়ে। ইঞ্জিন হয় না চালু, মোবাইলের ব্যাটারি, ল্যাপটপ সবকিছু অন্ধের মতো আচরণ করে আর তখন ঝুমঝুম করে শুরু হয় বৃষ্টি। এইসব যে বৃষ্টি মানুষেরা তা বুঝতে পারে না, যদিও জলের আকস্মিক আগমন তাদের ভালো লাগে, তবে অন্ধকারে ছমছম করে গা। যারা ঘরে আছে তারা ভাবে বাইরে যাবে আর যারা বাইরে আছে তারা ফিরে যেতে চায় ঘরে। বৃষ্টি পড়ে, আত্মকরুণার মতো বৃষ্টি।

গাছপালা তখন হয়ে ওঠে সবুজ। অন্ধকারে কেউ দেখতে পায় না রঙ। হাওয়ায় কাঁপন তুলে তখন কিছু একটা, কে জানে কী উড়ে উড়ে যায় গাছেদের কাছে। মানুষেরা বুঝতে পারে না এগুলো মূলত পাখি যাদেরকে অনেকে রাত ভেবে করেছিল খোশগল্প। নকল দুঃখ গুলো কী তখন আসল হয়ে ওঠে? মানুষেরা কান্নার মতো সুর করে একে অন্যকে ডাকে, একই সময় ডেকে ওঠে পাখিরা। কেউ শুনতে পায় না কারো ডাক।

যদি ঘড়ি থাকত এই তল্লাটে তাহলে বোঝা যেত এখন কতো রাত। এমনকি যদি সকাল আসে তবে কতোটা সময় আছে বাকি, জানা যেত। সকাল এলে দেখা যেত, প্রার্থনা ভুলে যাওয়া মানুষদের প্রার্থনারত। কারো কারো বাড়ি লুট হয়ে গেছে, কারো কারো মেয়ে হয়েছে লাঞ্ছিত আর গলাকাটা যে লাশগুলো পড়ে আছে খোলা ম্যানহোলের পাশে, সনাক্ত করা যেত তাদের পরিচয়। অনন্ত চিৎকার শেষে শোনা যেত উল্লাসের জয় নাকি সকলেই সমস্বরে কাঁদত? কে জানে! অনেক হাহাকার শেষে রাত, বসন্তের চাঁদ হয়ে আসে।

চাঁদের আবছা আবছা আলোয় স্পষ্ট হয় ছিপছিপে নদী। শীর্ণদেহ নিয়ে কেউ বসে আছে সে নদীর পাড়ে। চিরমধ্যাহ্নে এইখানে ছিল ভাঁড়ার, এখন জলের মাঝে কতোগুলো ছায়া খেলা করে। টলতে টলতে মানুষেরা এসে দাঁড়ায় নিজেদের সামনে। কারো মুখে ফোটে না কোনো কথা। হঠাৎ মনে হয় পুনর্জন্ম হয়েছে সবার আর সকলেই নিয়ে এসেছে জাতিস্মরতা। তারা ভাবে, ভাবতে শুরু করে এটাও চিরস্থায়ী মধ্যাহ্ন, যা স্রেফ রূপ বদলে ফেরত এসেছে।

মানুষেরা এই রাতকে অবজ্ঞা করে পূর্বজন্মের মধ্যাহ্নের জন্য কাঁদে। যে মধ্যাহ্নে এই জনপদে পাতা ছিল না গাছে, ফুলকে পাখি, পাখিকে রাত, আর নক্ষত্রকে দৈত্য ভাবে আর তাদের সন্তানেরা জন্ম নেয় বিকলাঙ্গ হয়ে। কেউ বেশি অক্সিজেন গ্রহণ করলে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, আর পানি পাওয়া যায় কেবল নিজেদের শরীরকে উৎস ভেবে। মানুষেরা এমন এক চিরস্থায়ী মধ্যাহ্নের জন্য কাঁদে।

এদিকে রাত বুড়ো হয়ে যায় স্বাভাবিক নিয়মে। ধীরে ধীরে ফর্সা হতে থাকে বিবর্ণ আকাশ। সময় খুঁজে পায় নিজের অস্তিত্ব। বাতাস গাছের পাতায় দোলা দিতে দিতে ভেসে যেতে থাকে ঢেউয়ের কাছে। মানুষেরা এইসব দেখে না, তারা চিরস্থায়ী মধ্যাহ্নের জন্য অপেক্ষা করে।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ২ ডিসেম্বর, ১৯৯১; বরিশাল। গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় স্নাতক। পেশায় সাংবাদিক। প্রকাশিত বই : মৃত্যুর মতো বানোয়াট  [কবিতা; ২০১৭] থাকে শুধু আলেয়া  [কবিতা;২০১৯], হিম বাতাসের জীবন  [গল্প ;২০২০], উদাসীনতা, সঙ্গে থেকো; [উপন্যাস; ২০২১] ই-মেইল : dhrubonahid@gmail.com

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।