রবিবার, নভেম্বর ২৮

আবুল হাসানের অভিষেক

0

Startগোলাপের নিচে নিহত হে কবি কিশোর আমিও ভবঘুরেদের প্রধান ছিলাম।
জ্যোৎস্নায় ফেরা জাগুয়ার চাঁদ দাঁতে ফালা ফালা করেছে আমারও প্রেমিক হৃদয়!
আমিও আমার প্রেমহীনতায় গণিকালয়ের গণিকার কাছে ক্লান্তি সঁপেছি
বাঘিনীর মুখে চুমো খেয়ে আমি বলেছি আমাকে উদ্ধার দাও।
সক্রেটিসের হেমলক আমি মাথার খুলিতে ঢেলে তবে পান করেছি মৃত্যু
হে কবি কিশোর
………………………  আমারও অনেক স্বপ্ন শহিদ হয়েছে জীবনে কাঁটার আঘাত সয়েছি আমিও।
………………………..
……………………… আমার পায়ের সমান পৃথিবী কোথাও পাই নি অভিমানে আমি
……………………… অভিমানে তাই
……………………….চক্ষু উপড়ে চড়ুইয়ের মতো মানুষের পাশে ঝরিয়েছি শাদা শুভ্র পালক!
……………………….হে কবি কিশোর নিহত ভাবুক, তোমার দুঃখ আমি কি বুঝি না?
……………………….আমি কি জানি না ফুটপাতে কারা করুণ শহর কাঁধে তুলে নেয়?

              ………….  .  (গোলাপের নিচে নিহত হে কবি কিশোর)

শামসুর রাহমান ব্রিটিশ কাউন্সিলে গেছেন। রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা অনুবাদের বইয়ের কাজ প্রায় শেষ। এখন টীকা টিপ্পনি, ভূমিকা— এসব কেজো কাজের শরণ নিতে প্রায়ই ব্রিটিশ কাউন্সিলে আসেন। আজ কাজ শেষে বসে বসে দৈনিকের সাহিত্যপাতাগুলো দেখছিলেন। বেলাটা একটু পড়ুক। বৈকালিক হাঁটাহাঁটি করতে করতে বাসার দিকে যাবেন।

দৈনিক সংবাদের রবিবারের সাহিত্যপাতায় আবুল হোসেনের কবিতা ছাপা হয়েছে। কবিতাটি পড়ে শামসুর রাহমান ধন্দে পড়ে গেলেন। কবি লিখেছেন,

যা কিছু পাবো না, কিংবা যাকে কাম্য বলে ভাবি
শত চেষ্টায়ও সেই কস্তুরী নাভীর প্রাপ্তি আমার কখনো নয়,
অপহৃত শব্দে শুধু চতুর্পার্শ্বে খোলা হচ্ছে বিজ্ঞ বিজ্ঞাপন,
আঁকা হচ্ছে কড়ি ও কোমলে যত কারুকাজ!
শোভন বুকের মধ্যে খোঁড়া হচ্ছে প্রেমের খন্দক!

( নিসর্গ)

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাওয়া ‘নব বসন্তে’র কবির কাব্যশৈলী এখানে অনুপস্থিত। আবুল হোসেনের কবিতার ভাষা স্মার্ট, ছন্দানুগ। এই কবিতাটিতে আবুল হোসেনের রচনারীতি ও ভাষার ধারাবাহিকতা অনুপস্থিত। পাকিস্তানী খবরেও আবুল হোসেনের লেখা পড়েছেন। শামসুর রাহমান পুরো কবিতাটা পড়লেন; সংশয়মিশ্রিত তৃপ্তি নিয়ে। এই কবিতায় ছন্দ টনটনে। ভাষাও মন্দ নয়। তবে দুর্বল কি শব্দের ব্যবহারে?

তরুণের হাতে কিছু পত্রিকা, কাগজের তাড়া; ‘রৌদ্র করোটিতে’ বইটির ঘন নীল প্রচ্ছদটি এর ফাঁকেই স্পষ্ট। ভাবলেন, ছেলেটি হয়তোবা কোনো স্বাক্ষর শিকারী হতে পারে। তরুণটি এগিয়ে এসে লাজুক ভঙ্গিতে নিজের পরিচয় দিল, ‘আমি আবুল হোসেন। ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে পড়ি।’

বেরুতেই এক ‘ক্ষীণকায় তরুণে’র মুখোমুখি হলেন। তরুণের হাতে কিছু পত্রিকা, কাগজের তাড়া; ‘রৌদ্র করোটিতে’ বইটির ঘন নীল প্রচ্ছদটি এর ফাঁকেই স্পষ্ট। ভাবলেন, ছেলেটি হয়তোবা কোনো স্বাক্ষর শিকারী হতে পারে। তরুণটি এগিয়ে এসে লাজুক ভঙ্গিতে নিজের পরিচয় দিল, ‘আমি আবুল হোসেন। ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে পড়ি।’
‘জেনে খুব ভালো লাগল। আমিও ইংরেজির ছাত্র। আচ্ছা, আপনার সাথে নিউমার্কেটে দেখা হয়েছিল কি?’
‘জ্বি। ভূঁইয়া ইকবাল ছিল সাথে। মহিউদ্দিন এন্ড সন্সের বইয়ের দোকানে।’
‘তাই বলুন। আপনার মুখটা আবছা আলোয় ভালো দেখতে পাচ্ছি না।’
‘সংবাদে আমার কবিতা বেরিয়েছে। আপনি কি দেখেছেন?’
‘হ্যাঁ। আমি পড়েছি। আপনাদের কবিতার ভাষা আমাদের সাথে মিলবে না ঠিকই, কিন্তু আমাদের কবিতার খোঁজও কিন্তু রাখা চাই। আবুল হোসেন নামে আমাদের একজন সিনিয়র কবি আছেন; তিনি এখনও সচল!’
লাজুক কবিটি আরও গুটিয়ে গেল যেনবা। কিন্তু কিছু একটা পাওয়ার আনন্দ তার মুখে খেলা করছিল যেন। লাজুক ছেলেদের হাসি তো দর্শনীয়ই হয়। হাসান ব্রিটিশ কাউন্সিলে ঢুকে গেল টাইম ম্যাগাজিনের লিটারেরি সাপ্লিমেন্ট পড়ার লোভে। তার আগ্রহের আরও কিছু বিষয় ছিল— লোরকা আর বোদলেয়ারের কবিতা, ইওরোপের চিত্রশিল্পীদের ছবির অ্যালবাম।

Abul Hasan poet 22

কবি আবুল হাসান

এরই মধ্যে আর একদিনের ঘটনা। দুপুরের ক্লাসের জন্য সেই লাজুক কবির সাথে খাদেম, কাশীনাথ, শেহাবরা কলাভবনের করিডোরে অপেক্ষমাণ। পাক-ভারত যুদ্ধের সময় কলাভবনে ক্লাস বন্ধ ছিল। মাসখানেক হলো কেউ ঢাকা মেডিকেলের অস্থায়ী ক্লাসরুম, কেউবা নীলক্ষেতের ক্লাসরুম থেকে একত্র হয়েছে। পরিচয় অত গাঢ় হয়নি সবার। খাদেমের বেতারে আসা যাওয়া আছে। তরুণ কবি তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি আমার কবিতা পড়েছেন?’
‘পড়িনি তো। কোথায় বেরিয়েছে?’
‘সংবাদে।’
‘আচ্ছা! বেশ তো। কি নামে লিখেন আপনি?’
‘আবুল হোসেন নামে লিখি। যদিও আমার পুরো নাম আবুল হোসেন মিয়া।’
‘আবুল হোসেন খুব কমন নেইম,’ কিছুটা উন্নাসিকতার সাথে বলল খাদেম, ‘এই নাম দেখলে মনে হয় মফঃস্বলের কোনো কবির লিখা। চোখ পড়ে না।’
শেহাবউদ্দিন আহমেদ, টুকুর হাইস্কুলের বন্ধু হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে পড়তে এসেই পরিচয়। সে টুকুর চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল তরুণ কবির মনে বেদনার ঝড় বইছে। আস্তে করে পিঠে চাপড় দিয়ে ক্লাসে ঢুকে পাশাপাশি বসল।

পরদিন কবিবন্ধু হুমায়ুন কবিরের সাথে শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে আড্ডা চলছে। মাহফুজও আছে, আছে স্বর্ণপদক পাওয়া লেখক মলয় ভৌমিকও। ধুম্রশলাকা সহযোগে চা। বাংলা বিভাগের এক ছেলে এসে ‘এক আবুল হোসেন ভাত পায় না আবার আরেক আবুল হোসেন আসছে’ পাশ থেকে শুনিয়ে চলে গেল!

হুমায়ুন উত্তেজিত হয়ে উঠল; কিন্তু যাকে নিয়ে এই বিদ্রুপ সে তাকে হাত ধরে বসিয়ে দিল। হুমায়ুন রেগে আছে, ‘আমি এখনই শায়েস্তা করে দেয়ার ব্যবস্থা করছি। ভেবো না! ওই পোলা কি জানে তুমি কার বন্ধু? রংবাজি করে আমার সাথে!’

বাঙলা বিভাগের ছাত্র হুমায়ুন কবির আর হাসান এক সাথেই বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছিল। সেও বরিশালে থাকতেই কবিতা লিখতে শুরু করে। ভালো ছাত্র হুমায়ুন কবির পড়ালেখা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের বাংলা বিভাগের গবেষণা সহকারী হিসেবে যোগ দিয়েছেন। ভেতরে ভেতরে সে যে কখন অতি বাম রাজনীতির ধারার সাথে জড়িয়ে গিয়েছিল তা কেউ জানতেও পারেনি। আহমদ ছফার উপন্যাস পড়ে মনে হয়েছে— সম্ভবত তিনিই প্রথম লেখক শিবিরের এই সতীর্থটির ভিন্ন যাত্রাপথ কিছুটা বুঝতে পারেন। স্বাধীনতার পর যেদিন সে রমনা পার্কে ডেকে নিয়ে ছফাকে পিস্তল দেখিয়ে গুলি না করে কেঁদে ফেলেছিল। হুমায়ুনের প্রতিপক্ষ সর্বহারা পার্টির প্রধান সিরাজ শিকদারের বোন শামীম শিকদারের সাথে ছফার বন্ধুত্ব হুমায়ুন মেনে নিতে পারেনি আর সেই সাথে ছফাকেও বিপক্ষ গ্রুপের একজন ভেবেই হয়তো এই আক্রমণ। হুমায়ুন হয়তো ভেবেছিল ছফা সিরাজ শিকদারের সমর্থক। অবশ্য ছফার উপন্যাসে অতিরঞ্জনও থাকতে পারে। কেননা সেখানে একথাও আছে হুমায়ুন কবির নাকি সম্পাদককে পিস্তল দেখিয়ে কবিতা ছেপেছিলেন! হুমায়ুন কবির কবিতার মধ্যে থাকলেও, ‘পার্শ্ববর্তিনী সহপাঠিনী’ রেবুকে বিয়ে করে সংসার করতে শুরু করলেও, সর্বহারা পার্টিই তাঁর কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর মাঝেই আদর্শগত পথের পার্থক্যের কারণে হাসানের জগতের সাথে ধীরে ধীরে তার জগতের ব্যবধান হতে থাকে।

কেননা সেখানে একথাও আছে হুমায়ুন কবির নাকি সম্পাদককে পিস্তল দেখিয়ে কবিতা ছেপেছিলেন! হুমায়ুন কবির কবিতার মধ্যে থাকলেও, ‘পার্শ্ববর্তিনী সহপাঠিনী’ রেবুকে বিয়ে করে সংসার করতে শুরু করলেও, সর্বহারা পার্টিই তাঁর কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর মাঝেই আদর্শগত পথের পার্থক্যের কারণে হাসানের জগতের সাথে ধীরে ধীরে তার জগতের ব্যবধান হতে থাকে।

‘না, বাদ দাও হিমু। মানুষ যার যার বিকৃতি আর দর্শন দিয়েই নিজের জগত সৃষ্টি করে নেয়। ও ওর মতো, আমি আমার মতো। রফিক ভাই একবার ইত্তেফাকে যেতে বলেছিলেন। কবিতা আছে?’
‘এক ঢিলে দুই পাখি? ঠিক আছে, কবিতা নাই, কবিতা হতে কতক্ষণ? যেতে যেতে ভাবি, পৌঁছে নিউজপ্রিন্টে প্রসব করব!’
‘চল তাহলে।’
রফিক আজাদ সিঙ্গারা ভেঙে ফুঁ দিয়ে ঠান্ডা করতে করতে বললেন, ‘কি হইছে আবুল হোসেন মিয়া? মুখে শ্রাবণের মেঘ কেন?’
মেঘের রাজপুত্র অধোবদন। হুমায়ুন কবির ঘটনাটা বললেন।
‘কাল শামসুর রাহমানও বলেছেন নামটা কনফিউজিং।’ সে নিজেই যোগ করল।
রফিক আজাদ হা হা করে হাসতে হাসতে বললেন, ‘এই গেরাইম্যা নাম নিয়া কবিতা লেখার দিন শেষ। এখন জাফর ভাইয়ের সমকালের জামানা চলতেছে। দুইদিন পর রফিক আজাদের স্যাড জেনারেশনের জামানা শুরু হইব। এলিয়টের কফির চামচে না, আমি জীবন মাপি দুঃখের চামচে। আবুল হুসেন ফুসেন নাম দিয়া চলব না মিয়া! নামটারে আবুল হাসান বানাইয়া ফেল! ঝকঝকা নতুন এক রূপাইয়ার কয়েনের মতো!’
লাজুক তরুণ কবি পকেট থেকে বের করে দিলেন একটা আনকোরা কবিতা—

দুঃখগুলো উলটে দিয়ে দীর্ঘ একটি পুষ্প কর না,
প্রহর যায়, প্রহর যাক, এখন তুই হসনে ঝরনা।
রক্তগুলি রাঙিয়ে দিয়ে রঙিন একটি আয়না কর না,
প্রহর যায়, প্রহর যাক, এখন তুই হসনে ঝরনা।

এরপর শামসুর রাহমান বলছেন, ‘কিছুদিন পর আঠারো বছরের তরতাজা আবুল হোসেন তাঁর নাম পাল্টে ফেললেন। আবুল হোসেন রূপান্তরিত হলেন আবুল হাসানে। আর কী আশ্চর্য, নাম বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কবিতাও গেল বদলে। পুরনোর খোলস থেকে বেরিয়ে এলো নতুন। কবিতার জ্বলজ্বলে প্রান্তরের দিকে তাঁর যাত্রা শুরু হলো।‘ শামসুর রাহমানের দরোজা হাসানের জন্য সব সময়ই খোলা রইল।
আবুল হাসান তাঁর এই নতুন নামকরণটি মনে প্রাণে গ্রহণ করলেন। প্রথম বইয়ের প্রথম কবিতাটি অবিস্মরণীয়, সেই কবিতার শিরোনাম ‘আবুল হাসান’ দিয়েই উদযাপন করলেন—

সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র,
মায়াবী করুণ
এটা সেই পাথরের নাম নাকি ? এটা তাই ?
এটা কি পাথর নাকি কোনো নদী ? উপগ্রহ ? কোনো রাজা ?
পৃথিবীর তিনভাগ জলের সমান কারো কান্না ভেজা চোখ ?
মহাকাশে ছড়ানো ছয়টি তারা ? তীব্র তীক্ষ্ণ তমোহর
কী অর্থ বহন করে এই সব মিলিত অক্ষর ?

আমি বহুদিন একা একা প্রশ্ন করে দেখেছি নিজেকে,
যারা খুব হৃদয়ের কাছাকাছি থাকে, যারা এঘরে ওঘরে যায়
সময়ের সাহসী সন্তান যারা সভ্যতার সুন্দর প্রহরী
তারা কেউ কেউ বলেছে আমাকে-
এটা তোর জন্মদাতা জনকের জীবনের রুগ্ন রূপান্তর,
একটি নামের মধ্যে নিজেরি বিস্তার ধরে রাখা,
তুই যার অনিচ্ছুক দাস !

হয়তো যুদ্ধের নাম, জ্যোৎস্নায় দুরন্ত চাঁদে ছুঁয়ে যাওয়া,
নীল দীর্ঘশ্বাস কোনো মানুষের !
সত্যিই কি মানুষের ?

তবে কি সে মানুষের সাথে সম্পর্কিত ছিল, কোনোদিন
ভালোবেসেছিল সেও যুবতীর বামহাতে পাঁচটি আঙ্গুল ?
ভালোবেসেছিল ফুল, মোমবাতি, শিরস্ত্রাণ, আলোর ইশকুল?

তবে হাসান এই কবিতাটি লিখেছিলেন স্বাধীনতারও পরে, যখন ‘রাজা যায় রাজা আসে’ বইটির কম্পোজ প্রায় শেষ হয়ে গেছে! একই সময়ে হুমায়ুন আজাদের প্রথম বই ‘অলৌকিক ইস্টিমারে’র কম্পোজও শুরু হয়েছে। প্রুফ দেখার ফাঁকে তাঁরা দুজন মাঝে মাঝে শেখ সাহেব বাজারের বিসমিল্লাহ রেস্টুরেন্টে বসে রাজা উজির মারেন। হুমায়ুন আজাদ একদিন হাসানকে বললেন, “হাসান, আমার বইয়ের শেষ কবিতার নাম ‘ হুমায়ুন আজাদ’; এই কবিতায় আমি সাতচল্লিশ সালে আমার জন্ম থেকে একাত্তর সাল পর্যন্ত ইতিহাসের বিভিন্ন উত্থান পতন ধরে রেখেছি!” শুনে হাসানের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। হলে ফিরে গিয়ে লিখে উঠলেন এই কবিতা। দু’দিন পরেই হাসান জানান তাঁর বইয়ের প্রথম কবিতার নাম ‘আবুল হাসান’। অনেক আবেগ দিয়ে সেই রেস্টুরেন্টেই চা খেতে খেতে সেই কবিতা আবৃত্তি করে শোনান।

Abul Hasan

জার্মান শিল্পী রাইনহার্ট হেভিক্যার আঁকা কবি আবুল হাসানের প্রতিকৃতি

এই বিখ্যাত কবিতায় কবি আত্মপরিচয় খুঁজছিলেন নাকি নিজেকেই পরিচিত করিয়ে দিচ্ছিলেন বিশ্বকবিতার পাঠকের সঙ্গে! পরের বছরগুলোতে তিনি ‘আমাদের সকল বিষাদ-বিপন্নতা আর নিমগ্নতার ছবি’ এঁকে যাবেন। পাঠক, আবুল হোসেন থেকে আবুল হাসান হয়ে উঠবার পর থেকেই তাঁকে আমরা ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করব। হোসেন থেকে হাসান হয়ে ওঠার পর আক্ষরিক অর্থেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠলেন হাসান। ঘরে তাকে তেমন পাওয়া যায় না। কবিবন্ধুদের সাথে সারা দিন রাত কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ান। একদিন শেহাবকে গেণ্ডারিয়ার বাসায় ডেকে তার হাতে ব্রাউন মলাট দেওয়া একটা কবিতার খাতা তুলে দিলেন। গোটা গোটা হাতের লেখায় প্রায় চল্লিশটা কবিতা। শেহাবের প্রশ্নবোধক চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এসব আমার স্কুল কলেজে লেখা কবিতা। কোথাও ছাপতে দিব না। আমার তো চালচুলার ঠিক নাই। তোমার কাছেই রেখে দাও।’
শেহাবউদ্দিন বুঝল, আবুল হাসান অন্য ধাতুতে গড়া। বড়ো অভিষেক মঞ্চে পৌঁছুতে চাচ্ছে এই কবি।

শেহাবের প্রশ্নবোধক চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এসব আমার স্কুল কলেজে লেখা কবিতা। কোথাও ছাপতে দিব না। আমার তো চালচুলার ঠিক নাই। তোমার কাছেই রেখে দাও।’
শেহাবউদ্দিন বুঝল, আবুল হাসান অন্য ধাতুতে গড়া। বড়ো অভিষেক মঞ্চে পৌঁছুতে চাচ্ছে এই কবি।

গেণ্ডারিয়ায় হাসানের ডেরা তখন। হাসানের বাবা আলতাফ হোসেন পুলিশে চাকুরির সুবাদে যখন কলকাতা ছিলেন, তখন এই বাড়ির মালিক হাবিব ফকিরের সাথে বাবার বন্ধুত্ব হয়। হাসানের জন্মের আগের কথা। হাবিব ফকির পাঁড় মুসলিম লীগার। নিচ তলায় একটা ভ্যাপসা ঘরে আবুল হাসান থাকেন। ভার্সিটি যেতে ইচ্ছে করলে যান, না হলে ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র কবি মোহাম্মদ রফিকের ভজহরি স্ট্রিটের বাসায় আড্ডা দিতে চলে যান। আড্ডায় আসে আফজাল চৌধুরী, ঢাকা কলেজের ছাত্র আলতাফ হোসেনরা। হাসান তখনও সাহিত্য আড্ডার মাঝখানে আজান শুনতে পেলে উঠে গিয়ে নামাজ পড়ে আসেন। সে সময়ে হাসানের প্রথম লেখা হায়াৎ মামুদ আর জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ‘কালবেলা’ পত্রিকায় ছাপা হয়। হাসান জ্যোতিপ্রকাশের গল্প পছন্দ করাতে মোহাম্মদ রফিক একদিন দু’জনের আলাপ করিয়ে দেন। এরপরে হাসান ক্লাসে না গিয়ে জ্যোতিপ্রকাশের বাসায় চলে যেতেন। জ্যোতিপ্রকাশ হাসানকে বাংলা একাডেমির পাশে শিব মন্দিরের বাসায় বসিয়ে রেখে অফিসে যান। হাসান তার বইয়ের আলমিরা থেকে তিরিশের কবিকুল, সুভাষ মুখোপাধ্যায় কিংবা শামসুর রাহমান পড়েন আর নিজের কবিতা লিখেন। একদিন ‘প্রশ্ন’ কবিতাটি জ্যোতিপ্রকাশের পছন্দ হয়ে গেল। ১৯৬৬’র এপ্রিল সংখ্যা কালবেলায় ছাপলেন ‘আবুল হাসানে’র নামে প্রথম কবিতা—

সে কবে কখন বলো সোনার পিণ্ডের মতো
মূল্যবান মুহূর্তগুলো ছুঁড়ে দিয়ে
শয়তানের ধাঙ্গড় তালুতে বাজাবো অশ্লীল তালি?
বলো হে কখন ধ্যানের মতো চিররীতি সাযুজ্যের দায়ে
মৃত্যুর লোবান শুঁকে মরে যাবো ফসিল সত্তায়?
দূরত্বের অসম্ভব যন্ত্রণায় স্তিমিত রাত কিংবা
বেঢপ জনতার চিৎকার ছেঁড়া মাস্তুলের শীর্ষে
কখন আমাকে নিয়ে চালাবে জুয়ার চাল?
কখন?
কখন বোলতে পারি বিধর্মী নাস্তিক নয়,
অথবা রুপোর মাদুলী এঁটে সুদর্শন সাংসারিক সুখে
কেউই বশংবদে শোনে না দুঃখের ভাষা?
দুর্বিনীত তোমার শয্যার ঘনরাত, বোবা হাত কিংবা
কোনো ঝুলন্ত খ্যাতির হাসি।
আনে না তো হৃদয়ের সৈকতে বিন্দু বিন্দু সম্পদের লোনা!
কখন বোলতে পারি, আশ্বিনের সবুজ সকাল
কিংবা, বসন্তের চাঁদ
দর্শনের কেউ কিংবা বালুকা গোনে না?

(প্রশ্ন)


কয়েকটি পাঠসূত্র ও ভাবনাসূত্র

১। আবুল হাসান সমগ্র, বিদ্যাপ্রকাশ
২। শামসুর রাহমান, ভূমিকা, আবুল হাসান সমগ্র
৩। আবুল হাসানের অপ্রকাশিত কবিতা, বিভাস
৪। অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী, আহমদ ছফা, হাওলাদার প্রকাশনী
৫। শেহাবউদ্দীন আহমদ, আবুল হাসানের অপ্রকাশিত কবিতাবলী, প্রাপ্তি ও প্রকাশ, মেঘের আকাশ আলোর সূর্য, বিভাস
৬। অনিন্দিতা ইসলাম, আবুল হাসানের কবিতা : বিষয়বৈচিত্র ও শিল্পরূপ বইতে হুমায়ুন আজাদ, আমার নতুন জন্ম, আগামী প্রকাশন বইটির সূত্র উল্লেখ
৭। আবুল হাসান : তাঁর প্রথম কবিতা জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, ওবায়েদ আকাশ সম্পাদিত শালুক

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৬৮। মূলত কবি। আটটি কবিতার বই ছাড়াও লিখেছেন ছোটোগল্প, প্রবন্ধ, স্মৃতিপাঠের বই। পেশাগত জীবনে জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন। প্রকাশিত কবিতার বই : সড়ক নম্বর দুঃখ বাড়ি নম্বর কষ্ট, আমার আনন্দ বাক্যে, পঁচিশ বছর বয়স, মেঘপুরাণ, ভেবেছিলাম চড়ুইভাতি, বুকপকেটে পাথরকুচি, ডুবোজাহাজের ডানা, অন্ধ ঝরোকায় সখার শিথানে । গল্পের বই : স্বপ্ন মায়া কিংবা মতিভ্রমের গল্প।প্রবন্ধ : তিন ভুবনের যাত্রী । স্মৃতিপাঠ : অক্ষরবন্দি জীবন। স্বনির্বাচিত কবিতা (প্রকাশিতব্য) : পদ্যাবধি । স্মৃতিকথা (প্রকাশিতব্য): গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গল্প : পাবলিক হেলথের প্রথম পাঠ । ডকুফিকশন (প্রকাশিতব্য) : ঝিনুক নীরবে সহো

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।