শনিবার, জুন ২২

কুংফু না জানা মাস্টার : কৃষ্ণ জলেশ্বর

0

সেইদিন বৃষ্টিঘন একটি বিকেল গড়িয়ে পড়ছিল সন্ধ্যার অন্ধকারের দিকে। আর আমরা আটকা পড়ে গিয়েছিলাম সিনেমাহলের সিঁড়িকোঠায়। আমরা মানে জাভেদ আর আমি। জাভেদ হচ্ছে জাভেদ। আমাদের পাশের বাসায় থাকত। যদিও সে প্রথমে বলেছিল তার নাম ব্রুস লি। আমি অবাক হয়েছিলাম, এটা আবার কেমন নাম! তখন সবে গ্রাম ছেড়ে মফস্বল শহরটিতে গিয়ে ইশকুলে ভর্তি হয়েছি। পৃথিবীর তেমন কিছুই জানি না, চিনি না।

আমি ব্রুস লিকে চিনি না দেখে সে হতাশ হয়েছিল। ‘তুমি কইনথে আসছো! ব্রুস লিকে চেনো না!’ জানতে চেয়েছিল। আমি লজ্জিত হয়েছিলাম। সে আমাকে তার বাসায় নিয়ে গিয়ে ব্রুস লি’র ছবি দেখিয়েছিল। বলেছিল, রুবেল আর কী কুংফু জানে! ব্রুস লি হইতেছে বস! বুঝছো?

আমি ব্রুস লিকে চিনি না দেখে সে হতাশ হয়েছিল। ‘তুমি কইনথে আসছো! ব্রুস লিকে চেনো না!’ জানতে চেয়েছিল। আমি লজ্জিত হয়েছিলাম। সে আমাকে তার বাসায় নিয়ে গিয়ে ব্রুস লি’র ছবি দেখিয়েছিল। বলেছিল, রুবেল আর কী কুংফু জানে! ব্রুস লি হইতেছে বস! বুঝছো? আমি মাথা নাড়িয়ে বলতে চেয়েছিলাম যে আমি বুঝছি। জাভেদ আর আমি একই স্কুলে পড়তাম। সে অবশ্য ফাইভে। আর আমি থ্রিতে। কিন্তু কুংফু সুত্রে সে আমার প্রিয় হয়ে উঠেছিল। তার চেয়ে বলা ভালো, সে আমার কুংফু মাস্টার হয়ে উঠেছিল। আমরা প্রায়ই সিনেমাহলে ঢুঁ মেরে দেখে যেতাম সামনের সপ্তাহে রুবেলের সিনেমা আসবে কিনা। দুপুরবেলা সবে ফুরিয়েছিল সেদিন, স্কুল থেকে ফিরে ভাত খেয়ে আমি আর জাভেদ ভাবলাম, যাই দেখে আসি, যেহেতু বৃহস্পতিবার, শুক্রবার থেকে কী সিনেমা চলবে সেটার খোঁজ নিয়ে আসা যাক। সিনেমাহলে সাঁটা পোস্টার দেখতে দেখতে ভীষণ বৃষ্টি নেমে গেল। আর আমরা আটকা পড়ে গেলাম। আমরা মানে জাভেদ আর আমি।

 

২.
জাভেদের নাম যে জাভেদ সেটা প্রথম যখন জানলাম তখন অবাক হয়েছিলাম। তাকে ব্রুস লি নামেই চিনতাম। সে বলত, আমাকে লি বলেই ডেকো। আমিও লি-ই বলতাম। সে বলত, সে হচ্ছে কুংফু মাস্টার। তার ব্ল্যাক বেল্ট আছে। আমাকে বেশ কয়েকটা কুংফু-স্টাইল শিখিয়েছিল। যেমন: মাংকি কিক, ড্রাগন ফ্লাই কিক, লিউপার্ড পও ইত্যাদি। তো সে হয়ে উঠেছিল কুংফু মাস্টার। কুংফু প্রিয় বলে সিনেমায় রুবেল ছিল আমাদের প্রিয় নায়ক।

ভেবেছিলাম সে হয়তো সত্যি সত্যি কোনো বই দেখাবে, কিন্তু সে যেটা দেখিয়েছিল সেটা ছিল একটা খাতা। সেখানে কুংফুর বিভিন্ন কৌশল সে কলম দিয়ে এঁকে রেখেছিল। আর সেইসব কৌশল কীভাবে প্রয়োগ করতে হবে তা লিখে রাখা ছিল। সে বলেছিল, ‘দিস বুক ইজ ভেরি সিক্রেট’। সে এও নিশ্চিত করেছিল যে, তার ছাত্র হিসেবে আমিই কেবল সে বইটা দেখার সুযোগ পেয়েছি। যারা বইটি সম্পূর্ণ আয়ত্বে আনতে পারবে। তার সাথে কেউ পেরে উঠবে না।

যা হোক, স্কুল ছুটির এক দুপুরে সে আমাকে তাদের ঘরে নিয়ে গিয়েছিল কুংফু-কারাতের একটা বই দেখাতে। ভেবেছিলাম সে হয়তো সত্যি সত্যি কোনো বই দেখাবে, কিন্তু সে যেটা দেখিয়েছিল সেটা ছিল একটা খাতা। সেখানে কুংফুর বিভিন্ন কৌশল সে কলম দিয়ে এঁকে রেখেছিল। আর সেইসব কৌশল কীভাবে প্রয়োগ করতে হবে তা লিখে রাখা ছিল। সে বলেছিল, ‘দিস বুক ইজ ভেরি সিক্রেট’। সে এও নিশ্চিত করেছিল যে, তার ছাত্র হিসেবে আমিই কেবল সে বইটা দেখার সুযোগ পেয়েছি। যারা বইটি সম্পূর্ণ আয়ত্বে আনতে পারবে। তার সাথে কেউ পেরে উঠবে না। এই বলার পর ঘরের কেউ তাকে ‘জাভেদ’ বলে ডাকছিল, আর সে সাড়া দিয়েছিল ‘আসতাছি’।

‘জাভেদ’! আমি অবাক হয়েছিলাম। কারণ সিনেমার ‘জাভেদ’ কে পছন্দ করতাম না। তলোয়ার দিয়ে ‘টিংটিং’ যুদ্ধ পারে জাভেদ, কুংফু পারে না। সেই ‘জাভেদ’ লি’র ডাক নাম! বিস্মিয় নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমার নাম জাভেদ? সে বিব্রত হয়েছিল। বলেছিল, ‘কে কী নামে ডাকল তাতে কিছুই আসে যায় না। আই অ্যাম কুংফু মাস্টার। ওখেই?’

আমি তার সে কুংফু’র বই দেখার পর তাদের ঘর দেখছিলাম। ওয়্যারড্রবের উপর রাখা টেলিভিশনে ঝিরঝিরে কোনো একটা চ্যানেলে হিন্দি সিনেমা চলছিল। আর জাভেদের মা, যাকে বিনু খালা ডাকতাম, তিনি ঝুলানো আয়নায় সেই টেলিভিশনের প্রতিবিম্ব দেখছিলেন। টেলিভিশন সরাসরি না দেখে আয়নায় কেন প্রতিবিম্ব দেখা হচ্ছে?— অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলাম। জাভেদ জানিয়েছিল দূর দর্শনে হিন্দি সিনেমা দেখা হচ্ছে। তখনও ডিশ অ্যান্টেনা আসেনি। কিংবা এলেও আমরা যেখানটায় থাকতাম ওখানে ডিশ অ্যান্টেনা ছিল না। আমরা একটা বাঁশ দিয়ে অ্যান্টেনা লাগিয়ে সেটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে টেলিভিশন দেখতাম। কখনও সখনও ভারতীয় চ্যানেল ধরা পড়ত। কিন্তু ঝিরঝির আসত। বৃষ্টি হলে ঝিরঝির আরও বাড়ত। আয়নাতে টেলিভিশন দেখলে ঝিরঝির কম লাগত। বিনু খালা আয়নাতে অমিতাভ বচ্চনের কোনো একটা সিনেমা দেখছিলেন।

বিনু খালা দেখতে ছিলেন ভীষণ মিষ্টি। গায়ের রং শ্যামলা। দীঘল চুল। পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে রাখতেন। কে জানে কেন এমন সুন্দর একটা মেয়ের সংসার ভেঙে গিয়েছিল! তিনি জাভেদকে নিয়ে স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে এসেছিলেন বাবার বাসায়।

 

৩.
তো জাভেদ আমাকে নানান সিনেমার গল্প বলত। সিনেমার পোস্টার দেখে সিনেমার গল্প বলে দিতে পারত সে। আমরা স্কুল ছুটির পর কিংবা ছুটির দিনগুলোতে তিতখোলা নদীর তীর ঘেঁষে বহুদূর চলে যেতাম। তার প্রিয় জায়গা ছিল বরফকল, রেল ইস্টিশন আর কাঠ চেরাইয়ের গলি। এইসব জায়গায় আমরা শুধু শুধু ঘুরতাম, আর পৃথিবীর যাবতীয় বিষয়-আসয় নিয়ে গল্প করতাম। গল্প বলতে বলতে একদিন বলেছিল, ‘তুমি আমার চেয়ে বয়সে ছোটো হলেও আমার বন্ধু, বুঝছো?’ এইভাবে কুংফুসূত্রের বাইরে গিয়েও আমরা বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম। এবং স্কুল ফেরত বিকেলগুলোতে কুংফু ও সিনেমা বিষয়ক আলাপ সালাপ করে আমাদের দিন চলে যাচ্ছিল। কিন্তু মাস তিনেক পর একদিন বিনু খালার ফের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল।

তার প্রিয় জায়গা ছিল বরফকল, রেল ইস্টিশন আর কাঠ চেরাইয়ের গলি। এইসব জায়গায় আমরা শুধু শুধু ঘুরতাম, আর পৃথিবীর যাবতীয় বিষয়-আসয় নিয়ে গল্প করতাম। গল্প বলতে বলতে একদিন বলেছিল, ‘তুমি আমার চেয়ে বয়সে ছোটো হলেও আমার বন্ধু, বুঝছো?’ এইভাবে কুংফুসূত্রের বাইরে গিয়েও আমরা বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম।

জাভেদকে রেখে বিনু খালা নতুন শ্বশুরবাড়ি চলে গিয়েছিলেন। বাবা-মা হীন জাভেদ নানা-নানু ও মামা-মামীর সংসারে একা হয়ে গিয়েছিল। আর ক্রমেই পাল্টে যাচ্ছিল সে। কেমন রুক্ষ্ম আর বদমেজাজী হয়ে উঠেছিল! স্কুলের বারান্দায় প্রায়ই তাকে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম। সে শুধু স্কুলেই মার খেত না, বাসাতেও মামাদের হাতে মার খেত। এতে আমাদের বন্ধুত্বে কোনো অসুবিধা হয়নি। আমরা বিকেল বেলায় তিতখোলা নদীর তীর ধরে হাঁটতাম। কুংফু আর সিনেমা নিয়ে কথা বলতাম। সে বলত, ‘জীবনে টিকে থাকতে হলে দারুণ কুংফু জানতে হয়, বুঝছো?’ আমি হয়তো বলতাম যে, বুঝছি। কিন্তু আদতে বুঝতাম না। ওভাবে ‘হা’ ‘হু’ করে হাত-পা নাড়িয়ে বাতাসকে লাথি-ঘুষি মেরে কীভাবে জীবনে টিকে থাকার সূত্র শিখে ফেলা যায় বুঝতে পারতাম না। কিন্তু বুঝতে পারতাম ক্রমেই যেন আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়ো হয়ে উঠছিল জাভেদ।

 

৪.
তো একদিন ফুরিয়ে যাওয়া দুপুরে সিনেমাহলে পোস্টার দেখতে গিয়ে বৃষ্টিতে আটকে পড়েছিলাম আমরা। আমরা মানে জাভেদ আর আমি। বৃষ্টিতে আটকা পড়ে অনেকক্ষণ আমরা সিনেমার পোস্টার দেখলাম। নাহ, রুবেলের সিনেমা নয়, জাফর ইকবালের সিনেমা আসবে। ‘বন্ধু আমার’। সিনেমার পোস্টার দেখা শেষে বৃষ্টি থামছিল না বলে সিনেমাহলের পেছন দিকটায় চলে গেলাম। পেছনের দিকে কিছুটা জঙ্গল। আরও পেছনে তিতখোলা নদী। জঙ্গল ও নদী ভিজে যাচ্ছিল ভারী বৃষ্টিতে।

জাভেদ বলছিল, জাফর ইকবাল মরে গেছে বুঝছো? আমি ভেবেছিলাম সিনেমার শব্দ শুনে বলছে সে। কান রাখলাম। আমি বলি, ‘নাহ। বাপ্পারাজ।’ জাভেদ বলেছিল, ‘আরেহ। আমি বাস্তবের কথা বলতাছি। জাফর ইকবাল মরে গেছে বুঝছো, মদ খেয়ে। ববিতাকে ভালোবাসতো। পরে ববিতার বিয়ে হয়ে যায়। সেই কষ্টে সে অনেক মদ খায়। তারপর মদ খেতে খেতে মরে যায়।

আমরা সিনেমাহলে দোতলার বারান্দার মতো একটা অংশে পা ঝুলিয়ে বসে সিনেমাহল থেকে ভেসে আসা ঢাকা-৮৬ সিনেমার শব্দ শুনছিলাম আর নদী এবং জঙ্গলের ভিজে যাওয়া দেখছিলাম। সিনেমার ডায়ালগ, নায়িকার কান্না, গান— ‘পাথরের পৃথিবীতে কাচের হৃদয়’ ইত্যাদি শুনতে শুনতে জাভেদ বলছিল, জাফর ইকবাল মরে গেছে বুঝছো? আমি ভেবেছিলাম সিনেমার শব্দ শুনে বলছে সে। কান রাখলাম। আমি বলি, ‘নাহ। বাপ্পারাজ।’ জাভেদ বলেছিল, ‘আরেহ। আমি বাস্তবের কথা বলতাছি। জাফর ইকবাল মরে গেছে বুঝছো, মদ খেয়ে। ববিতাকে ভালোবাসতো। পরে ববিতার বিয়ে হয়ে যায়। সেই কষ্টে সে অনেক মদ খায়। তারপর মদ খেতে খেতে মরে যায়।’ এই কথা শুনে আমি কী বলেছিলাম মনে নেই। মনে আছে, এর কিছুক্ষণ পরই আমি আর জাভেদ মুখোমুখি হয়েছিলাম অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতার। আমরা বসেছিলাম দোতলার বারান্দায়। জঙ্গলের দিকটা ছিল নির্জন। জঙ্গল ঘেঁষে সিনেমাহলের এক কোণে হান্নান ও একটি মেয়ে এসে দাঁড়ায়। আমরা দোতলা থেকে তাদের দেখছিলাম। হান্নানকে হান্নান কাকা ডাকতাম। সিনেমাহলের পাশে তার মনিহারি দোকান ছিল। বাবা মাঝে মধ্যে তার দোকান থেকে এটা সেটা কিনতেন। আমি ভেবেছিলাম, হান্নানকে ‘হান্নান কাকা’ বলে ডেকে উঠব। জাভেদ বলল কথা না বলতে। আমরা চুপ করে দেখছিলাম হান্নান ও ওই মেয়েটিকে। হান্নান মেয়েটির কাছে কিছু একটা চাচ্ছিল। মেয়েটি দিচ্ছিল না। শেষে মেয়েটি বৃষ্টিতে নেমে পড়েছিল। ভিজে যেতে থাকছিল সে। এরপর হান্নানও বৃষ্টিতে নেমে মেয়েটিকে ঝাপটে ধরেছিল। মেয়েটি হান্নানের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাচ্ছিল। এইরকম দৃশ্য আমরা সিনেমাতে দেখেছিলাম। কখনও রাজীব বা আহমেদ শরীফ নায়িকাদের এভাবে জড়িয়ে ধরতে চাইত, নায়িকারা চিৎকার করত বাঁচাও বাঁচাও বলে। কিন্তু হান্নানের সাথের মেয়েটি চিৎকার করছিল না। তবে হান্নানের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিল। পারছিল না। হান্নান মেয়েটির জামা কাপড় ছিঁড়ে ফেলেছিল। আমরা তখন পৃথিবীর যাবতীয় বিষয়াদি ভুলে দূর থেকে ওই-ই দেখছিলাম। ভীষণ বৃষ্টিতে ভিজে যেতে থাকছিল সব। জাভেদ বলেছিল, হান্নান একটা ভিলেন, বুঝছো! আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ। আমারও তাই মনে হয়। তারপর জাভেদ বলেছিল, আসো ‘জাফর ইকবাল জাফর ইকবাল’ বলে চিৎকার করি। তারপর আমরা ‘জাফর ইকবাল, জাফর ইকবাল’ বলে চিৎকার করতে থাকছিলাম। জাভেদ বলেছিল, ওই দিকে তাকায়ো না, নদীর দিকে তাকায়া থাকো। কিন্তু আমি সেই দিকেই তাকিয়েছিলাম। আর জাভেদের সাথে সাথে চিৎকার করছিলাম। আমাদের চিৎকার শুনে মেয়েটিকে ছেড়ে দিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়েছিল হান্নান। ছাড়া পেয়েই মেয়েটি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দৌড়ে কোথায় চলে গিয়েছিল। হান্নান বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে দীর্ঘক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকছিল।

 

৫.
সেইদিন বিকেল আর আসেনি। কীভাবে যেন সন্ধ্যা নেমে আসছিল। বৃষ্টি কিছুতেই থামছিল না দেখে এবং হান্নানকে ওইরূপে আবিষ্কারের উত্তেজনায় আমরা বৃষ্টিতে ভিজেই দৌড়ে ফিরে এসেছিলাম। পরদিন শুক্রবার বিকেলে বাবার সাথে বাজারে গিয়েছিলাম। বাবা হান্নানের দোকান থেকে জিনিসপাতি কিনতে গিয়েছিলেন। আমি ভয়ে একটু দূরেই দাঁড়িয়েছিলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে হান্নান বাবার কাছে নালিশ দিয়ে বসেছিল। বলেছিল, ‘আপনার পোলায় নষ্ট হয়া যাইতাছে, খালি সিনেমাহলে ঘুর ঘুর করে।’ বাবা স্বভাবসুলভ হাসি মুখে ঝুলিয়ে রেখে বলেছিলেন, ‘আচ্ছা। একটু শাসন করতে হবে তবে।’ বাজার থেকে বাসায় ফেরার পথে সারা রাস্তা বাবা চুপ করেছিলেন। বাসায় এসে বাজারের ব্যাগটা ছুঁড়ে মেরেছিলেন। আর ঠাস করে বামগালে জোরে একটা চড় বসিয়েছিলেন। মায়ের হাতে নিয়মিত মার খেলেও সেই প্রথম বাবার হাতে মার খেয়েছিলাম। ‘মানুষ মন্দ বলবে কেন তোমাকে?’ চোখ মুখ শক্ত করে বাবা এই প্রশ্ন করেছিলেন। ব্যথার চেয়ে লজ্জায় আমি মাটিতে মিশে যাচ্ছিলাম। সিনেমাহলে যাওয়া আমার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরদিন জাভেদ জানতে চেয়েছিল, আমার গাল লাল কেন। বিস্তারিতই বলেছিলাম তাকে আমি। শুনে সে বলেছিল, হান্নানের ডান হাত সে কেটে দিবে। আমি বলেছিলাম, হাত কেন কেটে দেবে? সে বলেছিল, যেহেতু আমি তার বন্ধু, বন্ধুর হয়ে বন্ধু প্রতিশোধ নেবে। এভাবেই প্রতিশোধ নিতে হয়। এটাই পৃথিবীর নিয়ম।

 

৬.
সেই দিনের কয়েকদিন পর জাভেদের ছোটো মামা তাকে গাছের সাথে বেঁধে প্রচণ্ড মেরেছিলেন। জাভেদ নাকি হান্নানের সাথে গ্যাঞ্জাম করেছিল, হান্নান ছোটো মামার কাছে নালিশ জানিয়েছিল। সেইদিন বিকালে জাভেদ আমাকে নিয়ে তিতখোলা নদীর তীরে গিয়েছিল। তার ছোটো মামার মারে কাটা ঠোঁট কামড়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিল সে। আমাকে বলেছিল, এই পৃথিবীতে টিকে থাকার মতো কোনো গোপন কুংফুই সে শিখে উঠতে পারছে না। বা এই জাতীয় কিছু একটা বলেছিল বলে মনে হচ্ছে আমার। সে তার গোপন কুংফুর বইটি আর একটা কালো ফিতা যেটাকে সে ব্ল্যাক বেল্ট বলত সেটা আমার হাতে তুলে দিয়েছিল। বলেছিল, ‘তুমি এইগুলো রেখে দাও। বুঝছো!’ তার পরদিন থেকে কোথাও আর জাভেদকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। একদিন বিনু খালা শ্বশুরবাড়ি থেকে এসে খুব কেঁদেছিলেন আর জাভেদের মামাদের সাথে ঝগড়া করেছিলেন।

এরপরও হান্নানকে বহুবার দেখেছিলাম আমি বাজার থেকে ফিরে আসতে আসতে। কেমন অশ্লীল এক দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসত।

পরের বছর বাবা বদলী হয়ে গিয়েছিলেন। আমরা আর শহরে চলে গিয়েছিলাম। এবং হান্নানকে ভুলে গিয়েছিলাম। এমনকি জাভেদের কথাও!

 

৭.
প্রায় পঁচিশ বছর পর আমি কর্মসূত্রে ফের এই মফস্বল শহরে এসেছি। দুই দিনের কাজে এসেছিলাম। কাজ শেষে আজ অবসর। বিকেলে ফিরে যাব। তিতখোলা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে জাভেদের কথা মনে পড়ছে। যদিও নদী আর আগের মতো বহতা নেই। শুকিয়ে গেছে। বদলে গেছে শহরের সবকিছুই। দেখলাম শৈশবের সেই বিশাল সিনেমাহলটি এখন জীর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেয়াল জুড়ে সাঁটা গলাকাটা অশ্লীল পোস্টার। হান্নানের দোকান যেখানে ছিল, সেখানে বিশাল মার্কেট। আমি খোঁজ করলাম হান্নানের। একজন বলল, হান্নান নদীর ওই পাড়ে চলে গেছে। সেখানেই তার দোকান।

দেখলাম শৈশবের সেই বিশাল সিনেমাহলটি এখন জীর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেয়াল জুড়ে সাঁটা গলাকাটা অশ্লীল পোস্টার। হান্নানের দোকান যেখানে ছিল, সেখানে বিশাল মার্কেট। আমি খোঁজ করলাম হান্নানের। একজন বলল, হান্নান নদীর ওই পাড়ে চলে গেছে। সেখানেই তার দোকান।

আমরা যে বাসায় থাকতাম, সেখানে বহুতল ভবন উঠেছে। জাভেদদের কেউ নেই সেখানে। তারাও মূলত ভাড়াটেই ছিল আমাদের মতো। একটা রিকশা করে নদীর ওই পাড়ে চললাম হান্নানের খোঁজে। বহু বছর পর আজ হান্নানের সাথে যদি আমার দেখা হয়, তবে তাকে আমি কী বলব? কী বলার আছে? অতীতের ক্ষোভ তো আর নেই আমার। তারপরও আমি অতীতকেই একবার দেখতে চাইছিলাম।

 

৮.
সত্যি সত্যি হান্নানের দোকান পাওয়া গেল। বেশ বড়ো মনিহারি দোকান। কিন্তু হান্নান দোকানে নেই। এক কর্মচারি আর হান্নানের ছেলে আছে দোকানে। ছেলের বয়স বিশ-একুশ হবে। দেখতে হান্নানের মতোই। জানতে চাইলাম, তোমার বাবা কোথায়? বলল, ‘বাসায়। অসুস্থ।’ একবার ভাবলাম, থাক আর বাসায় গিয়ে লাভ নেই। ফিরে যাই। কী মনে করে বাসার দিকেই চললাম। হান্নানের ছেলেটা তার একটা কর্মচারীকে আমার সাথে দিয়ে দিল। বাসা দোকান থেকে মিনিট দশের পথ। হেঁটে চলে এলাম। হাফবিল্ডিং বাড়ি। বাড়ি ঢুকতেই চোখে পড়ল মিষ্টি এক কিশোরী। বয়স চৌদ্দ পনেরো হবে বারান্দায় দোলনায় বসে বসে মোবাইল ফোনে কিছু একটা দেখছিল। কর্মচারী বালকটি মেয়েটিকে বলল, ‘তোমার বাবাকে খুঁজতেছে।’ কিশোরী আমাকে চেনার চেষ্টা করল বলে মনে হলো। তারপর বারান্দায় পাতা চেয়ারে বসতে বলে ভেতরে গেল।

সিনেমাহলের পাশে আপনার যে দোকান ছিল সেখানে থেকে জিনিসপাতি কিনতাম। আজ এই শহরে এসে আপনার কথা মনে হলো, তাই দেখতে এলাম। এরপর সুযোগ বুঝে পঠাশ করে ডানহাতটা মুচড়ে দিয়ে ভো দৌড় দেব। ভাবনার মাঝখানেই হান্নান ও কিশোরীটি চলে এলো বারান্দায়। বেশ বুড়িয়ে গেছে হান্নান। লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি পরা। আমি বিস্মিত হলাম। তার পাঞ্জাবির ডান হাত পতপত করে উড়ছে। তার মানে হান্নানের ডান হাত কাটা। অর্থাৎ জাভেদ প্রতিশোধ নিয়েছে! সত্যি সত্যি জাভেদ ওর ডান হাত কেটে দিয়েছে!

দেখে মনে হলো হান্নান মোটামুটি সুখেই আছে। ছেলে-মেয়ে পরিবার নিয়ে। বসে বসে গুছিয়ে নিচ্ছিলাম কী বলব হান্নানকে। বলব যে, আমার নাম লি। ছোটো সময় এই শহরে ছিলাম। সিনেমাহলের পাশে আপনার যে দোকান ছিল সেখানে থেকে জিনিসপাতি কিনতাম। আজ এই শহরে এসে আপনার কথা মনে হলো, তাই দেখতে এলাম। এরপর সুযোগ বুঝে পঠাশ করে ডানহাতটা মুচড়ে দিয়ে ভো দৌড় দেব। ভাবনার মাঝখানেই হান্নান ও কিশোরীটি চলে এলো বারান্দায়। বেশ বুড়িয়ে গেছে হান্নান। লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি পরা। আমি বিস্মিত হলাম। তার পাঞ্জাবির ডান হাত পতপত করে উড়ছে। তার মানে হান্নানের ডান হাত কাটা। অর্থাৎ জাভেদ প্রতিশোধ নিয়েছে! সত্যি সত্যি জাভেদ ওর ডান হাত কেটে দিয়েছে! আমাকে ওরকম বিস্মিত হয়ে পাঞ্জাবির শূন্য হাতের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বুড়িয়ে যাওয়া হান্নান ভাঙা কণ্ঠে বলল, ‘চলতি টেরেন থিইকা নামতে গিয়া কাইট্টা গেছেগা।’ তার কথা শুনে মুহূর্তে উত্তেজনা উবে গেল। হাহ! হান্নান প্রশ্ন করল, কে আপনে? আমি কোনো উত্তর দিলাম না। আমি তার কিশোরী মেয়ের দিকে চোখ রাখলাম। কী গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তাকে বললাম, ‘ভালো থেকো বোন। সাবধানে থেকো। পৃথিবী নষ্ট হয়ে গেছেগা, বুঝছো?’ বলেই বাসা থেকে বের হয়ে আসলাম। পেছন থেকে হান্নান কী যেন বলছিল। শুনতে ইচ্ছে হলো না। বাসার বাইরে এসে ইচ্ছে হলো, ‘জাফর ইকবাল জাফর ইকবাল’ বলে চিৎকার করি কিছুক্ষণ। কিছুই করলাম না। বেশ গরম পড়েছে। ঠা ঠা রোদে পৃথিবী পুড়ে যাচ্ছে।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম বাংলাদেশে। প্রকাশিত গল্পের বই 'আনোহাবৃক্ষের জ্যামিতি'।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।