শুক্রবার, অক্টোবর ১৬

কোনো লেখা তার শ্রেষ্ঠ অবস্থায়ও এক প্রকার বিদ্রুপমাত্র : রোলাঁ বার্ত

0

ভূমিকা ও অনুবাদ: তানভীর রাসেল


রোলাঁ বার্ত

রোলাঁ বার্ত

বিশ শতকের প্রভাবশালী ফরাসি তাত্ত্বিক রোলাঁ বার্ত (১৯১৫-১৯৮০) ছিলেন একাধারে সাহিত্য সমালোচক, প্রাবন্ধিক ও দার্শনিক। চিহ্নতত্ত্ব, কাঠামোবাদ, উত্তরকাঠামোবাদ নিয়ে তাত্ত্বিক কাজের পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্র, ফটোগ্রাফি, ফ্যাশনসহ সমকালীন মিথ বিশ্লেষণ ইত্যাদি নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ কাজে নিয়োজিত ছিলেন সারাজীবন। অবিবাহিত বার্ত ১৯৭৭ সালে তাঁর মায়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এসব কাজের সমান্তরালে ভিন্ন এক বার্তে পরিনত হন। মায়ের মৃত্যুর ঠিক পরদিন থেকে নিজের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছোটো ছোটো ইনডেক্স কার্ডে, খণ্ডিত নোট আকারে টানা দুই বছর ধরে দিনলিপি লিখে গেছেন। নিজের মৃত্যুর তিন দশক পর ২০০৯ সালে ৩ শতাধিক নোট একত্রিতভাবে ‘Journal De Deuil’ শিরোনামে এদিসিওঁ দ্যু স্যই থেকে প্রকাশিত হয়। পরের বছর অর্থাৎ ২০১০ সালে বার্তের ঘনিষ্ঠ ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অনুবাদক মার্কিন কবি ও সাহিত্য সমালোচক রিচার্ড হাওয়ার্ডের অনুবাদে হিল এন্ড ওয়াং প্রকাশনা থেকে ইংরেজি সংস্করণ ‘Mourning Diary’ প্রকাশিত হয়। এর মাধ্যমে বিশ্বপাঠক ভিন্ন এক রোলাঁ বার্তকে আবিষ্কারের সুযোগ পায়। কেননা, বার্ত তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত গ্রন্থে যেখানে নির্মোহ তাত্ত্বিক কাজ করেছেন, এই দিনলিপি লিখতে গিয়ে সেই তিনিই যেন মুখ ফেরালেন সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে—একান্তই ব্যক্তিগত, অনির্বচনীয় শোকের অভিজ্ঞতার দিকে। একজন তাত্ত্বিকের কাজ যেখানে প্রণালীবদ্ধ চিন্তাকাঠামোর প্রতি দায়বদ্ধ থাকে, শোকের দিনলিপিতে প্রকটভাবে তেমনটা পরিলক্ষিত হয় না। তবে এটি তাঁর চুড়ান্ত তাত্ত্বিক রচনা না হলেও কোনো কোনো নোটে এক ধরণের তাত্ত্বিক বোঝাপড়ার ব্যাপারটা প্রচ্ছন্নভাবে হলেও উঁকি দিয়ে যায়। তার অন্যান্য কাজের বিপরীতে এটি বরং মাতৃবিয়োগজনিত শোক, শোকের পুনরাবৃত্তি, স্মৃতি ও অনুপস্থিতির উপস্থিতিকে দৈনন্দিনতার অংশ হিসেবে নথিবদ্ধ করার প্রয়াস; যেখানে নিরেট তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের বদলে অনুভবের কথাই মুখ্য হয়ে ওঠে। রোলাঁ বার্তের মা অঁরিয়েত বার্তের জন্ম ১৮৯৩ সালে। বিশ বছর বয়সে ফরাসি নৌ-কর্মকর্তা লুই বার্তের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। বাইশ বছর বয়সে তিনি মা হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে স্বামী লুই বার্ত মৃত্যুবরণ করলে ২৩ বছর বয়সেই হন যুদ্ধবিধবা। প্রাপ্ত বয়স্ক রোলাঁ দীর্ঘ সময় তাঁর মায়ের সাথেই কাটিয়েছেন। সারাজীবন অবিবাহিত থেকে যাওয়া রোলাঁ মায়ের সাথে এমন এক নির্ভরশীলতায় যূথবদ্ধ ছিলেন যে, মায়ের মৃত্যু তাকে উথালপাথাল করে দিয়েছিল। যেন তাঁর অস্তিত্বেও এক মৌলিক ফাটল ধরিয়েছিল। তিনি নিজেকে ভিন্ন এক সত্তারূপে আবিষ্কার করেছিলেন। অঁরিয়েত বার্ত কেবল একজন মা ছিলেন না; তিনি ছিলেন রোলাঁর জীবনের কেন্দ্রীয় ও অন্তরঙ্গ মানসিক আশ্রয়। পুরো দিনলিপি জুড়েই দেখা যায় নিজের জীবদ্দশায় রোলাঁ কখনোই মাতৃশোক থেকে মুক্ত থাকতে পারেননি। যদিও এই দিনলিপি একান্তই ব্যক্তিগত শোকের, কিন্তু তা প্রকাশের ভাষা এমন, যার অনুরণন যেকোনো সংবেদনশীল মানুষের হৃদয়েই প্রতিধ্বনিত হতে চায়। ফলে এটি কেবল একজন বিশ্বখ্যাত তাত্ত্বিকের ব্যক্তিগত দিনলিপিই নয়, বরং মানসিক ভঙ্গুরতার ভেতর দিয়ে নিজেকে নতুন সত্তা রূপে আবিষ্কারের এক গভীর, সংযমী ও নৈর্ব্যক্তিক দলিল। রিচার্ড হাওয়ার্ডকৃত ইংরেজি অনুবাদ ‘Mourning Diary’ তথা ‘শোকের দিনলিপি’ থেকে কিছু নোট ‘শ্রী’-এর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।


২৭ অক্টোবর ১৯৭৭

—তোমরা কখনোই কোনো নারীর শরীরকে বুঝতে শেখোনি!
—আমি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি আমার মায়ের শরীর; প্রথমে অসুস্থ, অতঃপর মৃত্যুর দিকে ধাবমান।


২৭ অক্টোবর ১৯৭৭

প্রতিদিন সকাল ৬:৩০টা নাগাদ, অন্ধকারে বাইরে থেকে ভেসে আসে আবর্জনার ক্যানগুলোর ধাতব কোলাহল। তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলতেন : অবশেষে রাতটা শেষ হলো (রাতে তিনি প্রচণ্ড কষ্ট পেতেন, একা; নিষ্ঠুর এক ব্যাপার)।

কেউ মারা গেলেই শুরু হয়ে যায় ভবিষ্যতের জন্য উন্মত্ত প্রস্তুতি (যেমন ঘরের আসবাবপত্র সরানো, ইত্যাদি): বলা যেতে পারে ভবিষ্যৎবাতিক।


২৭ অক্টোবর ১৯৭৭

লোকে-লোকারণ্য চারপাশ। অবশ্যম্ভাবী; বাধা দেওয়া নিস্ফল। পাশের ঘরে আমি তাঁর কথা ভাবি। সবকিছুই ধসে পড়ছে।

এই এখান থেকেই শুরু হলো দীর্ঘ ও বিস্তৃত শোকের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। দুই দিনের মধ্যে এই প্রথমবার নিজের মৃত্যুকেও মেনে নিতে পারার গ্রহণযোগ্য উপলব্ধি এলো।


২৮ অক্টোবর ১৯৭৭

মায়ের শবদেহ প্যারিস থেকে উর্তে নিয়ে যাচ্ছি (জ্যঁ লুই ও একজন শব ব্যবস্থাপকের সাথে): তুর পার হয়ে সোরিনিতে, ট্রাকচালকদের এক ছোট্ট খাবারের দোকানে লাঞ্চের জন্য থামি। সেখানে শব ব্যবস্থাপকের সাথে তার এক ‘সহকর্মীর’ (যিনি আরেকটি শবদেহ উত-ভিয়েনে নিয়ে যাচ্ছিলেন) দেখা হয় এবং একসঙ্গেই আমরা লাঞ্চ সেরে নিই।

আমি জ্যঁ লুইয়ের সাথে চত্বরের এক পাশে (সেখানে মৃতদের স্মরণে নির্মিত এক কদর্য স্মৃতিস্তম্ভ আছে) কয়েক কদম হাঁটি; চারপাশে বিস্তৃত খোলা মাঠ, বৃষ্টির ঘ্রাণ, ছড়ানো ছিটানো ডালপালা ও পাড়াগাঁয়ের আবহ। তবুও যেন জীবনের এক ঝলক স্বাদ অনুভব করি (বৃষ্টির সেই মিষ্টি গন্ধের কারণে); একদম প্রথম মুক্তির অনুভূতি, ক্ষণিকের হৃদ্‌কম্পনের মতো।

 

টীকা :
উর্ত হলো দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের একটি গ্রাম। রোলাঁ বার্তের সৎভাই মিশেল ও ভাইয়ের স্ত্রী রাশেল সেখানে বসবাস করতেন। উর্ত গ্রামেই মাকে সমাধিস্থ করা হয়। এই নোটে ইংরেজিতে ‘আন্ডারটেকার’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কাজের ধরন ও পরিধি বিবেচনায় এখানে ‘আন্ডারটেকার’ শব্দটাকে শব ব্যবস্থাপক হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, কোনো মৃতের সৎকার তথা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদনের জন্য ইউরোপে তখন ফিউনারেল হোম থেকে আন্ডারটেকার পাঠানো হতো।

জ্যঁ লুই (১৯৩৮-২০২২) : Jean Louis shefer (জ্যঁ লুই শেফের)-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। তিনি একজন ফরাসি দার্শনিক, সাহিত্য সমালোচক ও শিল্পতাত্ত্বিক। চিত্রকলা, সিনেমা ও পাঠের দর্শন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। বার্তের সাথে তাঁর বৌদ্ধিক সম্পর্ক ছিল। তিনি বার্তের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের একজন ছিলেন।

তুর (Tours) : ফ্রান্সের মধ্যাঞ্চলের Indre-et-Loire বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। এটি লোয়ার উপত্যকায় (Loire Valley) অবস্থিত সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক কেন্দ্র এবং রেনেসাঁস যুগে নির্মিত বহু প্রাসাদ আর ঐতিহাসিক ভবনের জন্য পরিচিত। ফরাসি সংস্কৃতিতে তুর অঞ্চলে ব্যবহৃত ভাষার রূপকে দীর্ঘদিন ধরে পরিমিত ও শুদ্ধ ফরাসি ভাষার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সোরিনি (Sorigny) : তুর শহরের দক্ষিণে অবস্থিত একটি ছোটো, শান্ত গ্রামীণ কমিউন। শহুরে কোলাহল থেকে দূরে প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত অঞ্চল। এ ধরনের স্থানের কথা ফরাসি লেখক, শিল্পীদের বর্ণনায় প্রায়ই অস্থায়ী অবস্থান, ভ্রমণকালীন বিরতি বা অন্তর্মুখী মানসিকতার স্থানিক রূপ হিসেবে এসেছে।

ওত-ভিয়েন (Haute-Vienne) : ফ্রান্সের মধ্য পশ্চিমাঞ্চলের একটি প্রশাসনিক বিভাগ। এর প্রশাসনিক কেন্দ্র Limoge, যা চীনামাটি শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। ওত-ভিয়েন মূলত গ্রামীণ, পাহাড়ি ও শান্ত প্রকৃতির জন্য পরিচিত। অঞ্চলটি ভিয়েন নদীর উৎপত্তিস্থল হিসেবেও পরিচিত। এই নদীর নামানুসারেই অঞ্চলটির নাম ওত-ভিয়েন রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।


২৯ অক্টোবর ১৯৭৭

কী আশ্চর্য! মায়ের কন্ঠস্বর, যা আমার এতটা পরিচিত এবং যা স্মৃতির নিজস্ব বুনন বলে বিবেচিত (‘সেই প্রিয় স্বর…’), আমি আর শুনতে পাই না। যেন এক স্থানিক (বা আংশিক) বধিরতা (Localized deafness)…


২৯ অক্টোবর ১৯৭৭

তাঁর মৃত্যুর আগে (যখন তিনি অসুস্থ ছিলেন) যে আকাঙ্ক্ষাগুলো আমার ছিল, এখন আর তা পূরণ করা সম্ভব হবে না। কারণ, এখন পূরণ করার মানে হবে যে, তাঁর মৃত্যুই আমাকে সেগুলো অর্জন করার সুযোগ দিয়েছে—আমার আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে, এক অর্থে যেন তাঁর মৃত্যুই আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছে।

কিন্তু তাঁর মৃত্যু তো আমাকে বদলে দিয়েছে; আমি আর সেই পুরোনো আকাঙ্ক্ষাগুলো অনুভব করি না। কিছু একটা ঘটতে পারে ধরে নিলেও, আমাকে অপেক্ষা করতে হবে নতুন কোনো আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠার জন্য, অর্থাৎ তাঁর মৃত্যুর পর জন্ম নেওয়া কোনো আকাঙ্ক্ষা।


৩১ অক্টোবর ১৯৭৭

এ নিয়ে আর কথা বলতে চাই না; এই ভয়ে যে, আমি এটি থেকেও সাহিত্য বানিয়ে ফেলব—কিংবা নিশ্চিত হতে পারব না যে, আমি সেটা করছি না; যদিও বাস্তবে, সাহিত্য ঠিক এইসব সত্যের ভেতর থেকেই জন্ম নেয়।


৩১ অক্টোবর ১৯৭৭

কখনো কখনো, খুব সংক্ষিপ্ত এক শূন্যগর্ভ মুহূর্ত আসে—এক ধরনের অসাড়তা—কোনো বিস্মরণের মুহূর্ত নয়। এটি আমাকে আতঙ্কিত করে।


২ নভেম্বর ১৯৭৭

এই নোটগুলোর বিশেষত্ব হলো, এগুলো দেখায় যে, একটি বিধ্বস্ত সত্তা তার বোধের সচেতন উপস্থিতির শিকার হয়ে আছে।


৩ নভেম্বর ১৯৭৭

একদিকে তিনি আমার কাছে সব কিছু চান—পরিপূর্ণ শোক, এর চূড়ান্ত রূপ (কিন্তু তখন এটা আসলে তাঁর নিজের চাওয়া নয়, বরং আমিই মাকে দিয়ে আমার ওপর এমন দাবির ভার আরোপ করছি)। আর অন্যদিকে তিনি (সত্যিকার অর্থে যখন তিনি নিজেই) আমাকে নির্ভার জীবনের প্রস্তাব দেন, যেন তিনি এখনো বলছেন : ‘যাও তবে, বেরিয়ে পড়ো, আনন্দ করো…’


৪ নভেম্বর ১৯৭৭

আজ, বিকেল ৫টার সময়, সব কিছুই যেন প্রায় স্থির বা নির্ধারিত হয়ে গেছে: এক চূড়ান্ত একাকিত্ব; আমার নিজের মৃত্যু ছাড়া অন্য কিছুতেই যার সমাপ্তি নেই।

কণ্ঠরোধ হয়ে আসছে। এই বেদনা আমাকে ঠেলে দেয় এক কাপ চা বানাতে, একটি চিঠি লেখা শুরু করতে, কোনো কিছু গুছিয়ে রাখতে—যেনবা, যথেষ্ট ভয়ংকর হলেও, আমি এখনকার এই সম্পূর্ণ গোছানো ও ‘একান্তভাবেই আমার একার’ অ্যাপার্টমেন্টে থাকাটা উপভোগ করছি। কিন্তু এই উপভোগ আমার হতাশার সাথে জুড়ে আছে।

এই সবকিছুই আমার যাবতীয় কাজের ভুলত্রুটি বা থমকে যাওয়াকে সংজ্ঞায়িত করে।


৪ নভেম্বর ১৯৭৭

সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ: অ্যাপার্টমেন্টটি উষ্ণ, পরিচ্ছন্ন, আলোয় ভরা, মনোরম।
আমিই এটাকে এভাবে গড়ে তুলি; উদ্যমে, আন্তরিকতায় (আর তাতে তিক্ত আনন্দও উপভোগ করি): এখন থেকে চিরকালের জন্য আমিই আমার মা।


৫ নভেম্বর ১৯৭৭

বিষণ্ন বিকেল। শপিং করতে বের হয়েছি। চায়ের সাথে খাওয়ার জন্য কেক কিনতে (একটা অকারণ বিলাসিতা) বেকারিতে ঢুকি। আমার ঠিক আগের ক্রেতার সাথে লেনদেন করতে করতেই কাউন্টারের পেছন থেকে মেয়েটি বলল—Voilà।

ঠিক এই কথাটিই আমি বলতাম, যখন মাকে কিছু দিতাম, যখন আমি তাঁর দেখাশোনা করতাম। একবার, শেষের দিকে, আধা-অচেতন অবস্থায় মা নিজেও খুব ক্ষীণ স্বরে বলেছিলেন—Voilà (এই তো আমি এখানে—এই শব্দটাই আমরা আজীবন একে অপরের সঙ্গে ব্যবহার করতাম)।

বেকারির মেয়েটির মুখে শব্দটা শুনে আমার চোখে পানি এসে গেল। সুনসান অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে কিছুক্ষণ নীরবে কাঁদলাম। এভাবেই আমি আমার শোক উপলব্ধি করতে পারি। সরাসরি একাকিত্বের মধ্যে নয়, বরং বাস্তবিক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই। আমার মধ্যে যেন এক ধরনের স্বাভাবিকতা ও নিয়ন্ত্রণ পরিলক্ষিত হয়, যা দেখে মানুষ ভাবে আমি বোধ হয় তাদের ধারণার চেয়ে কম শোকগ্রস্ত। অথচ, আমাদের এই মা-ছেলের ভালোবাসার বাঁধন যখনই নতুন করে ছিঁড়ে যেতে চায়, তখনই শোক আমাকে গ্রাস করে। সবচেয়ে বিমূর্ত মুহূর্তেই আসে সবচেয়ে গভীর যন্ত্রণা…

 

টীকা :
‘Voilà’ একটি ফরাসি শব্দ, যা কারো দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ব্যবহার করা হয়। এর অর্থ—এই তো আমি এখানে।


৬ নভেম্বর ১৯৭৭

রোববার সকালের আরাম। একা। তাঁকে ছাড়া প্রথম রোববার সকাল। আমি সপ্তাহের দৈনন্দিন চক্রের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। তাঁর অনুপস্থিতিতে যেন দাঁড়িয়ে আছি এক সুদীর্ঘ সময়ের মুখোমুখি।


১০ নভেম্বর ১৯৭৭

অস্বস্তি বোধ হয়, এমনকি অপরাধবোধেও ভুগি;
কারণ কখনো কখনো মনে হয়, আমার শোক যেন আবেগপ্রবণতার প্রতি নিছক এক সংবেদনশীলতা মাত্র।
কিন্তু সারাজীবন কি আমি ঠিক এমনটাই ছিলাম না: সহজেই আবেগে আলোড়িত?


১৯ নভেম্বর ১৯৭৭

প্যারিস থেকে তিউনিসে যাত্রা। বিমানে একের পর এক যান্ত্রিক গোলযোগ। আসন্ন আইদ কেবির উদ্যাপনের জন্য বাড়ি ফিরছে এমন তিউনিসীয়দের ভিড়ে এয়ারপোর্টে অনন্ত অপেক্ষা। কেন যে এইসব বিভ্রাটময়, বিপর্যস্ত দিনের অশুভ আবহ শোকের সঙ্গে এত নিখুঁতভাবে মিলে যায়!

 

টীকা :
মুসলিমদের প্রধান দুটি ধর্মীয় উৎসবের একটি হলো ঈদ-উল-আযহা বা কুরবানির ঈদ। ঈদ-উল-আযহা তিউনিশিয়ায় ‘আইদ কেবির’ নামে পরিচিত। আমরা যেমন বলে থাকি বকরা ঈদ, কুরবানির ঈদ—অনেকটা সে রকম।


২১ নভেম্বর ১৯৭৭

এখন আমি জানি বিষণ্নতার উৎসটা কোথায়: এই গ্রীষ্মে লেখা দিনলিপিগুলো আবার পড়তে গিয়ে আমি একই সঙ্গে ‘মুগ্ধ’ (প্রলুব্ধ) ও হতাশ; অর্থাৎ, কোনো লেখা তার শ্রেষ্ঠ অবস্থায়ও এক প্রকার বিদ্রুপমাত্র। বিষণ্নতা আসে তখন, যখন হতাশার গভীরে ডুবে থেকেও লেখালেখির প্রতি আমার যে অনুরাগ, তা দিয়েও আমি নিজেকে রক্ষা করতে পারি না।


৭ ডিসেম্বর ১৯৭৭

এখন, সময়ে সময়ে আমার ভেতরে ফেটে পড়া বুদ্বুদের মতো অপ্রত্যাশিতভাবে জেগে ওঠে এই উপলব্ধি : তিনি আর নেই, তিনি আর নেই—একদম সম্পূর্ণরূপে, চিরতরে হারিয়ে গেছেন। এটি এক ধরনের অভিব্যক্তিহীন বাস্তবতা, কোনো বিশেষণই খাটে না—এতটাই অর্থহীন যে, আমাকে দিশাহীন করে তোলে (যার কোনো সম্ভাব্য ব্যাখ্যাও নেই)।
এ এক নতুন যন্ত্রণা…


৩ এপ্রিল ১৯৭৮

নৈরাশ্য : শব্দটি খুব নাটকীয়, ভাষার অংশ।
একটি পাথর যেন।


কাসাব্লাঙ্কা, ২৭ এপ্রিল ১৯৭৮

—মায়ের মৃত্যুর পর আমি ভেবেছিলাম, উদারতার ভেতর দিয়ে এক ধরনের মুক্তি আসবে—মা আরও গভীরভাবে বেঁচে থাকবেন এক আদর্শ প্রতিমা হিসেবে, আর আমি মুক্ত হবো সেই ‘ভয়’ থেকে (বাধ্যবাধকতার ভয়)—যে ভয় নিহিত এতসব তুচ্ছ সংকীর্ণতার উৎসমূলে। কারণ এরপর থেকে সব কিছুর প্রতিই কি আমি নির্বিকার নই? নিজের প্রতি নিরাসক্তি কি এক প্রকার উদারতার শর্ত নয়?

—কিন্তু হায়, ঘটে ঠিক উল্টোটা। আমি আমার আত্মকেন্দ্রিকতা, তুচ্ছ আসক্তিগুলো ত্যাগ করি না; বরং বারবার নিজেকেই বেছে নিই, সবক্ষেত্রে নিজেকে সামনে রাখি—ভালোবাসার ভেতর দিয়ে কারো প্রতি আত্মনিবেদন করতে পারি না; তারা হয়ে ওঠে আমার উদাসীনতার শিকার, এমনকি যারা সবচেয়ে আপন তারাও। আমি যন্ত্রণায় ভুগি—আর এটি সত্যিই বেদনাদায়ক—‘হৃদয়ের এই কঠোরতা’—এই উদাসীনতা (অ্যাসিডিয়া)।

 

টীকা :
অ্যাসিডিয়া (Acedia) : উদাসীনতার এক গাঢ় ব্যাধি। এটি একটি ল্যাটিন শব্দ যা মধ্যযুগীয় খ্রিষ্টিয় তত্ত্বে মানসিক অবসাদ, করুণ নিরাসক্তি, আত্মিক নিষ্ক্রিয়তা বোঝাতে ব্যবহার হতো।


১৮ মে ১৯৭৮

(গতকাল)
ক্যাফে ফ্লর-এর বারান্দা থেকে আমি দেখলাম বুক স্টোর ‘লা ইউন’-এর জানালার পাশে একজন নারী বসে আছেন; এক হাতে পানির গ্লাস, মুখে স্পষ্ট অনাগ্রহের ছাপ; তার পেছনে পুরো ঘরভর্তি পুরুষেরা, সবাই আমার দিকে পিঠ ফিরিয়ে আছে। একটা ককটেল পার্টি চলছে।

মে মাসের ককটেল পার্টি। ঋতুভিত্তিক সামাজিক আচরণের এক স্থূল ও গতানুগতিক চিত্র। আমার যা মনে এলো—মা আর এখানে নেই, অথচ জীবন, এই নির্বোধ জীবন, চলছেই।

 

টীকা :
ক্যাফে দ্য ফ্লর (Café de Flore) শতাধিক বছরের পুরনো প্যারিসের ঐতিহ্যবাহী ক্যাফে। লা ইউন (La Hune) প্যারিসের বৌদ্ধিক ও পাঠক পরিমণ্ডলে জনপ্রিয় বইয়ের দোকান।


শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম গাজীপুর জেলার কাপাসিয়ায়। বাবার চাকুরিসূত্রে বিভিন্ন জেলায় বেড়ে ওঠা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে যুগ্ম-পরিচালক হিসেবে কর্মরত। ২০০৮ সাল থেকে লেখালেখির প্রতি আগ্রহ জন্মায়। কবিতার পাশাপাশি দর্শন ও সংগীতে আগ্রহ আছে। অনেকের লেখা অনুবাদ করেছেন। বেন ওকরি’র প্রথম কবিতার বই ‘আফ্রিকার শোকগাথা’ অনুবাদ গ্রন্থ হিসেবে ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয়। আসন্ন পহেলা বৈশাখে প্রকাশিত হবে ফরাসি তাত্ত্বিক ও চিন্তক রোলাঁ বার্তের ‘শোকের দিনলিপি’।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।