স্বপ্ন না-ফেরা দিনগুলো
সময়কে শক্ত করে ধরে রাখি—
স্বপ্ন না-ফেরা দিনগুলো
মুখ বন্ধ করা মানুষের মতো
আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।
সময় বধির হয়,
আমি নীরব;
তবু শত দুঃখকষ্টের ভেতর
কেবলই বিস্ময় জন্মায়।
সময় বদলালে একদিন বলব—
কোথায় কোথায় আমারও ব্যথা লেগেছিল,
কতখানি রক্তক্ষরণ হয়েছিল ভিতরে,
যদিও কাউকে তা বুঝতে দিইনি।
কারণ নীরবতার গভীরে
একটি বিস্ময়কর উচ্চারণ থাকে—
যার কাছে
সব শব্দ একদিন পরাজিত হয়।
বন্যতার কোমল উচ্চারণ
মোহিনীর গায়ে কাশফুলের ভোর,
আমার গায়ে বর্ষাভেজা মাটি।
আমরা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরলে
শালবন তার ঈশ্বর-লিখিত কবিতা
নিঃশব্দে খুলে দেয়।
ঘুঘুর ডাক,
হরিণের কটাক্ষ,
লতাঝোপের অদৃশ্য কাঁপন—
ভালোবাসা সবসময়
বন্যতারই
সবচেয়ে কোমল উচ্চারণ।
সোনালি সময়
কামিনী,
সোনালি পাতা বেশিদিন থাকে না—
একসময় ফুলও নিজের নাম ভুলে
শুধু পাতা হয়ে যায়।
তবু শালবনের শুঁড়িপথে হাঁটলে
প্রজাপতির ডানায়,
শজারুর নীরব ব্যথায়
কী এক অদৃশ্য বাণী শুনতে পাই।
তখন বুঝি—
ঈশ্বর এখনও তরুণ কবি;
তাই ক্ষণস্থায়ীত্বই
পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ প্রতিশ্রুতি।
অচেনা হয়ে যাওয়ার আগে
বিশ্বাস ভালো—
যতক্ষণ আলোয়
সব মুখ স্পষ্ট।
অন্ধকার নামলে
অভিজ্ঞতার চোখই
শেষ প্রদীপ।
তাই বিশ্বাস করতে ভয় পাই।
জানি, একদিন
কেউ আর আমাকে চিনবে না।
সেই নীরব অচেনাকেই
আমি গোপনে
অপেক্ষা বলি।
ঈশ্বরের বিষণ্ন কবিতা
আমরা খুব দাপুটে ছিলাম—
রাত, নেশা, ভুল পথ
আর হৈচৈকে
জীবন ভেবেছিলাম।
পরে বুঝেছি,
কোনো শিল্পই
একটি আহত নীরবতার
ক্ষত ঢাকে না।
সব দাপট শেষে
যে ক্ষতটি রয়ে যায়,
সেটিই হয়তো
ঈশ্বরের সবচেয়ে বিষণ্ণ কবিতা।

মূলত কবি ও কথাসাহিত্যিক; অনুবাদ ও গবেষণায় রয়েছে সমান আগ্রহ। বাংলা একাডেমির রিসার্স-ফেলো হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা থেকে পি-এইচ. ডি সম্পন্ন করেছেন ২০০৪ সালে। বাংলাদেশের সরকারি কলেজে দর্শন বিভাগে অধ্যাপনায় নিয়োজিত। তার কবিতা তাইওয়ানিজ, চীনা, নেপালি, আজারবইজানিজ, তার্কি, রোমানিয়ান, আরবি, ইতালীয়, অসমীয় ও স্পেনীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইংরেজি ভাষায় বিশ্বের বিখ্যাত জার্নাল ও ব্লগগুলোতে নিয়মিত কবিতা লিখে যাচ্ছেন। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে তিনি ইংল্যান্ডের ‘THE POET’ পত্রিকা কর্তৃক ‘International Poet of the Week’-এ ভূষিত হয়েছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৫টি। বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার (২০১১); চিহ্ন পুরস্কার (২০১৩); দিনাজপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমি গুণীজন সম্মাননা (২০১৪); উপমা সাহিত্য পুরস্কার (২০২১) অর্জন করেছেন। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ : ‘টেনে যাচ্ছি কালের গুণ’, ‘ধ্বনিময় পালক’, ‘ধাঁধাশীল ছায়া’, ‘জন্মান্ধের স্বপ্ন’, ‘সার্কাসের মেয়ে ও অন্যান্য কবিতা’, ‘The shadow of illusion’, ‘Blind Man’s Dream’. গল্পগ্রন্থ : ‘তামাকবাড়ি’, ‘আবার কাৎলাহার’, ‘ঢুলকিপুরাণ’, ‘নাবিকের জুতো’। প্রবন্ধ : ‘বাংলাদেশের কবিতার নন্দনতত্ত্ব’, ‘হাজার বছরের বাংলা কবিতা’, ‘জীবনানন্দ দাশ ও অন্যান্য’, ‘বাংলা সাহিত্যে নারী’, ‘বাংলা উপন্যাস অধ্যয়ন’। অনুবাদ : ‘চৌদল ঐকতান’, মূল: টি. এস. এলিয়ট; ‘ধূসর বুধবার’, মূল: টি. এস. এলিয়েট; ‘বালি ও ফেনা’, মূল: কাহলিল জাফরান; ‘হল্লা’, মূল: অ্যালেন গিনসবার্গ।