বৃহস্পতিবার, মে ৩০

ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বত : কবীর রানা

0

Utsob-Songkha_Motif১.
ওপরে যাও। আরও ওপরে যাও। ক্ষুধা ও খাদ্যের সকল গর্জন নিয়ে ওপরে যাও, ক্ষুধা ও খাদ্য বিদ্যার সকল গর্জন নিয়ে ওপরে যাও, ক্ষুধা ও খাদ্য বিদ্যার সকল শিকার ও কৃষি নিয়ে ওপরে যাও। যা কিছু দিয়ে মহাকাশ জয় করেছ, সেসব নিয়ে ওপরে যাও। মহাকাশের যে ওপর থেকে একটা বাজপাখি অথবা অসংখ্য বাজপাখি ক্ষুধা ও খাদ্য খোঁজে, যাও তারও ওপরে। এরপর ভাবো এবং দেখো মানব সৃষ্ট সকল বিদ্যা দিয়ে কতটুকু ওপরে যেতে পারো তুমি—রাজনীতির ওপরে, অর্থনীতির ওপরে, ইতিহাসের ওপরে, প্রত্নতত্ত্বের ওপরে, ধর্মতত্ত্বের ওপরে। যদি যেতে পারো, কিংবা না-ও যেতে পারো এসবের ওপরে; তারপরও বলি, ক্ষুধার ওপরে যাও, খাদ্যের ওপরে যাও। এবং তারপরও যদি না যেতে পারো ক্ষুধা ও খাদ্যের ওপরে, তবে নেমে এসো এ গ্রামে, ক্ষুধা ও খাদ্য গ্রামে, যেখানে চিরকালের ক্ষুধা ও খাদ্য নিয়ে গড়ে উঠেছে ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বত। এ গ্রামের ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতের বিভিন্ন গুহায় গড়ে উঠেছে অশুমার ক্ষুধা ও খাদ্যের ভোজনালয়।

 

২.
হরিণগাছী গ্রামের এ ভোজনালয়টাকে বাইরে থেকে দেখে মনে হয় একটা পর্বত। প্রাচীন পর্বত। মানুষের অধিক বয়সি পর্বত। যার ভেতরে আছে ক্ষুধা ও খাদ্যের অশুমার গুহা। সব কালের, সব মানুষের ক্ষুধা ও খাদ্যের ভোজনালয় আছে এখানে। মানুষের প্রদীপ মানুষকে সর্বদা পর্বত নির্মাণের প্রতি আগ্রহী করে তুললে এ গ্রহের নানান জায়গায় গড়ে উঠেছে পুরাণ পর্বত, দর্শন পর্বত, ধর্ম পর্বত, অর্থনীতি পর্বত, রাজনীতি পর্বত, গণতন্ত্র পর্বত এবং আরও চেনা-অচেনা পর্বত। পর্বতের উঁচু চূড়ায় চির প্রজ্বলিত প্রদীপ হাতে যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের নাম তো অমর, তারা তো অমর, তারা তো জীবিত সকল কালে। যেভাবে জীবিত ক্ষুধা ও খাদ্য সকল কালে।

হরিণগাছী গ্রামে এরূপ কোনো পর্বত না থাকলে এ গ্রামের একজন মানুষ কিংবা কয়েকজন মানুষ সিদ্ধান্তে যায়, তারা যাবে এমন এক পর্বত নির্মাণে, যেখানে তাদের গ্রামের পতাকা উড়বে, গৌরব উড়বে সবচেয়ে উঁচুতে থাকা বাতাসে। যে বাতাস এ গ্রামের পর্বতের গৌরব ছড়িয়ে দিবে, জানিয়ে দিবে সারা দুনিয়াকে।

প্রতিটি গ্রামের আদি ইতিহাস অরণ্য কিংবা জঙ্গল হলে, এ গ্রামের শুরুতে দেখি অরণ্যের ভেতর অশুমার হরিণ ছুটে বেড়াচ্ছে ক্ষুধা ও খাদ্য থেকে বের হওয়ার জন্য। তাদের পেছনে একটা গ্রাম নির্মাণের নেশায় মত্ত মানুষ নানারূপ অস্ত্র নিয়ে তাদেরকে তাড়া করছে। একটা হরিণ খাদ্য হয়, গ্রাম নির্মাণ এগিয়ে যায়; দুটো হরিণ খাদ্য হয়, গ্রাম নির্মাণ এগিয়ে যায়। তারপর হরিণ কোথায়। হরিণ হারিয়ে গেলে গড়ে ওঠে গ্রাম। হরিণ হারিয়ে গেলেও হরিণের প্রতি মানুষের ভালোবাসার কমতি থাকে না, যেভাবে ক্ষুধা ও খাদ্যের প্রতি মানুষের ভালোবাসার কমতি থাকে না। পূর্ণাঙ্গ গ্রাম নির্মাণের পর বিলুপ্ত হরিণের প্রতি, ক্ষুধা ও খাদ্যের প্রতি অশেষ ভালোবাসা থেকে এ গ্রামের নামকরণ হয় হরিণগাছী গ্রাম। এরপর যাত্রা শুরু হয় এ গ্রামের প্রত্নতত্ত্বের, রাজনীতির, অর্থনীতির, ধর্মনীতির, দর্শনের, ইতিহাসের, শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞানের।

এই কথা আগে বলা হয়েছে, এখন বলা হচ্ছে, পরে বলা হবে, হরিণগাছী গ্রামের গৌরব-পর্বত না থাকায় তারা আবিষ্কারে যায় একটা পর্বত নির্মাণে। তাদের একজন অথবা কয়েকজন, যাদের নিয়ন্ত্রণে আছে গ্রামের রাজনীতি, অর্থনীতি, তারা সিদ্ধান্তে যায়, তারা এ গ্রামে নির্মাণ করবে এমন এক পর্বত যা দুনিয়ার কোথাও নাই। অনন্তর একদিনে, দুদিনে, কিংবা অনেক দিনে তারা নির্মাণ করে ফেলে একটা পর্বত। তারা বলে এ পর্বত পৃথিবীর প্রথম পর্বত। ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বত। এ গ্রামের সবচেয়ে দক্ষ, মেধাবী স্থপতিদল আট তলা বিশিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে তৈরি করে ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বত। প্রতিটি তলায় আছে অসংখ্য কক্ষ। এ সকল কক্ষের আকৃতি গুহার মতো। আর এ সকল গুহায় গড়ে উঠেছে পৃথিবীর সকল কালের, সকল কালের মানুষের ক্ষুধা ও খাদ্যের ভোজনালয়। প্রতিটি ভোজনালয়ের দুটো অংশ আছে। একটি অংশে আছে ক্ষুধা নির্ণয় আসন। যে আসনে বসলে একজন ব্যক্তি জানবে তার কোন কোন ক্ষুধা আছে। অন্য অংশটিতে আছে সে সকল ক্ষুধার আহার।

 

৩.
হরিণগাছীর গভীর রজনিতে মাঠে মাঠে একটা রাখাল বাঁশি বাজালে সে বাঁশির সুর কত দূরে যায়। যদি বাঁশির সুর সর্বত্রগামী হয়, তবে হরিণগাছী গ্রামের ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতের নাম পৌঁছে যায় দুনিয়ার সকল মানুষের ক্ষুধা ও খাদ্য শ্রবণে। সবাই তো অপেক্ষায় ছিল এমন এক পর্বতের জন্য। সবাই তো অপেক্ষায় ছিল এমন এক পর্বত ভ্রমণের জন্য। তারপর তারা আসতে থাকে দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে এই পর্বত পরিভ্রমণে। এ গ্রাম হয়ে ওঠে পৃথিবীর অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। হরিণগাছী গ্রাম পর্যটন শিল্পে বিখ্যাত হয়ে গেলে তার অর্থনীতির সঙ্গে আর কারা পারে। এ পর্বতের নাম শুনে এবং এ পর্বত পরিদর্শন করে মানুষেরা টের পায় প্রথমবারের মতো তাদের শরীরের কত কত ক্ষুধা আছে, কত কত তার খাদ্য আছে। জানা ক্ষুধা, অজানা ক্ষুধা। জানা খাদ্য, অজানা খাদ্য। ক্ষুধা ও খাদ্যের কত যে রন্ধন প্রণালি। তারপর দেখি ক্ষুধা ও খাদ্য বিষয় নিয়ে সারা দুনিয়ার মানুষের অসীম জ্ঞানচর্চা। ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতের পরিচালকেরা বের করেছে ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতের ভোজনশালার মেনু নিয়ে পাঁচ খণ্ডের প্রায় আড়াই হাজার পৃষ্ঠার অসমাপ্ত একটি বই। পাঁচ খণ্ডের এই অসমাপ্ত বইটি সারা দুনিয়ার বিভিন্ন বইয়ের দোকানে এত বেশি বিক্রি হয় যে এটি হয়ে ওঠে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বেস্ট সেলার বই। পৃথিবীর অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষুধা ও খাদ্য বিষয়ক বিভাগ খুলে পড়ানো হতে থাকে এই বই। এছাড়া ক্ষুধা ও খাদ্য বিষয়ক এই অসমাপ্ত বই নিয়ে গড়ে উঠেছে তত্ত্ব। অসংখ্য ছাত্র শিক্ষক ক্ষুধা ও খাদ্য বিষয়ে গবেষণা করে বিখ্যাত গবেষক হয়ে গেছেন। এছাড়া অনেক দেশে কৃষি থেকে শুরু করে দর্শনবিদ্যার সিলেবাসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে এ বইটিকে। সমুদ্রের মাঝখানের এক দ্বীপরাষ্ট্রে ভিক্ষাবিদ্যার সঙ্গে ক্ষুধা ও খাদ্যবিদ্যাকে সমন্বয় করে একটা বিভাগ খোলা হয়েছে।

 

৪.
সূর্যের ক্ষুধা কী? এই প্রশ্ন কে জিজ্ঞেস করে? কিংবা কে জিজ্ঞেস করেছিল? ক্ষুধা ও খাদ্যে অধিকার থাকে সবার। সূর্য এখন এই অধিকারে যায়। সে যেতে চায় অন্ধকারে। একটা সূর্য একবার আলো খেয়ে দিন হয়, একবার অন্ধকার খেয়ে রাত হয়। সূর্যটা এখন অন্ধকার খেতে চাইলে দেখো ঘটছে সূর্যাস্ত। ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতের সামনে দিদার ফকির ও রাজু ফকিরকে দেখা যায়। শরীরে তাদের ক্ষুধা, পোশাকে তাদের ক্ষুধা, ইচ্ছায় তাদের ক্ষুধা। তারা এখানে দাঁড়িয়ে আছে ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতে প্রবেশ করার জন্য। এ পর্বতের নিয়ম এই যে সূর্য অস্ত না গেলে এর দরজা খোলা হয় না। ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতের ভোজনালয়গুলো খোলা থাকে সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় অবধি। ভোজন বিষয়ক তাত্ত্বিক ও গবেষকরা অনেক গবেষণায় জেনেছেন মানুষের সকল ক্ষুধা ও খাদ্য পাওয়া যায়, দেখা যায় রাতের বেলা। দিনের বেলা মানুষের সকল ক্ষুধা ও খাদ্য তার নিকটে থাকে না। মানুষের অধিকাংশ জীবন যাপন মুখস্থ বিদ্যার মতো হলে মানুষেরা এখানে আসে নিজেদের ক্ষুধা চিনতে এবং নিজেদের খাদ্য গ্রহণ করতে রাতের বেলা।

দিদার ফকির আর রাজু ফকিরের সঙ্গে রয়েছে তাদের পোষা কুকুর ও পোষা বিড়াল। এ দুজনের জীবনী সামান্য বললে যদি কারো ক্ষতি না হয় তবে বলা যেতে পারে তাদের যমজ জীবনী। হরিণগাছী গ্রামের এই খ্যাতি আছে যে, সে তার রাস্তার পাশে ভিখারিকে আশ্রয় দেয় দয়া দিয়ে, মায়া দিয়ে। আর এ সকল দয়া ও মায়ায় এ গ্রামের এক রাস্তার পাশে গত চল্লিশ বছর ধরে বসে ভিক্ষা করেছে একসঙ্গে দিদার ফকির ও রাজু ফকির। তারা গত চল্লিশ বছর ধরে কথা বলেছে ক্ষুধা ও খাদ্য নিয়ে। ক্ষুধা ও খাদ্য নিয়ে তাদের মতো আর কে বা এত কথা বলেছে জানে না তারা। তাদের শৈশব, তাদের কৈশোর, তাদের যৌবন পার হয়েছে ক্ষুধা ও খাদ্য আলাপে। তাদের বসার স্থান থেকে দেখা যায় ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বত। প্রতিদিন, প্রতিরাত তারা ভেবেছে কোন একদিন যাবে তারা ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতের ভোজনালয়ে? তারা দুজন কত কিছুকে যে ক্ষুধা ভেবেছে, খাদ্য ভেবেছে সে কথা জানে তারা আর তাদের ভিক্ষার থালা। তাদের চল্লিশ বছরের ইচ্ছা ক্ষুধা ও খাদ্য ভোজনালয়ের ভোজ গ্রহণ করবে একরাত। যদিও তারা দুই তিনটার বেশি ক্ষুধা ও খাদ্যের নাম জানে না। তবে তারা জানে নাম জানা অথবা না জানার সঙ্গে ক্ষুধা ও খাদ্যের স্বাদের কোনো তারতম্য নাই। তারা গত চল্লিশ বছর ভিক্ষা হিসেবে জেনেছে এবং পেয়েছে রাস্তার অর্থনীতি, রাস্তার রাজনীতি, রাস্তার ধর্মনীতি, রাস্তার ইতিহাসনীতি, রাস্তার প্রত্ননীতি। তারা জানে না এ সকল রাস্তার অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্মনীতি, ইতিহাসনীতি, প্রত্ননীতি এ গ্রামের পাঠ্যপুস্তকের সিলেবাসে আছে কি না। তবে তারা তাদের থালায়, তাদের ভিক্ষার থালায় লিখে রেখেছে বিভিন্ন ধ্বনিতে এ সকল ইতিহাস। তাদের দুটো থালাকে তারা জ্ঞান করে রাস্তার সকল ইতিহাস ধ্বনি দ্বারা লিপিবদ্ধ বই। যারা থালার ধ্বনি পাঠ করতে পারে তারা জানবে এ ইতিহাস। রাস্তার ইতিহাস। ধ্বনিতত্ত্ব বিদ্যালয়ে পড়ানো হলেও সে বিদ্যা দিয়ে হয়তো জানতে পারবে না তাদের থালার ধ্বনিবিদ্যা। তারা একবার এ গ্রামের প্রাচীন জাদুঘরে গিয়ে দেখেছিল সেখানে দুটো মাটির তৈরি ভাঙা থালা। তারা নিশ্চিত ছিল এই থালা যে ধ্বনি উৎপন্ন করতে পারে তা কেউ পড়তে পারেনি। তাদের ভিক্ষার থালা তাদের গ্রামের সমান বয়সি। এই থালায় তারা আহার করেছে চল্লিশ বছর ধরে। আজও তারা দুজন থালা দুটোকে বহন করে এনেছে তাদের ঝুলির ভেতরে। সঙ্গে এনেছে এত দিন ভিক্ষা করে জমানো অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতি, ইতিহাসনীতি, প্রত্ননীতি।

সূর্য রাতের ক্ষুধা ও আহারের নিকট গেলে ঘটে সূর্যাস্ত। ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতের ভোজনালয়ের প্রাচীন দরজা খুলে যায়। দিদার ফকির ও রাজু ফকির দেখে দরজার দুপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে অনেক নিরাপত্তাকর্মী। তাদের সবার হাতে বন্দুক। বন্দুক কি সব সময় ক্ষুধা ও খাদ্যের নিরাপত্তা। বন্দুক বাহিনী পার হলে দুদিকে দুজন মেয়ে ফুল গাছ হয়ে, ফুল হাতে নিয়ে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে আছে। তাদের হাসিমাখা মুখ থেকে ফুলের সুবাস বেরিয়ে এলে দিদার ফকির ও রাজু ফকির বুঝতে পারে না মেয়ে দুটো আসলে ফুল গাছ কি না। কিংবা তারা কেবলই মেয়ে, যারা জন্মেছে অন্ধকারের ফুলবাগান থেকে।

 

৫.
অচেনা অভ্যর্থনা দিয়ে, অচেনা অভ্যর্থনা নিয়ে, তারা প্রবেশ করে ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতের প্রথম তলায়। তারা কি এখানে পালাতে এসেছে রাস্তা থেকে, যে রাস্তার পাশে বসে তারা প্রতিদিন থালা নিয়ে ক্ষুধা ও খাদ্য জেনেছে। তারা আজ জানতে এসেছে, যে ক্ষুধা যে খাদ্য তারা জানে না সে ক্ষুধা সে খাদ্য সম্বন্ধে। প্রথম তলাতে কত যে ভোজনশালা। ভোজনশালাগুলো তারা ঘুরে দেখে। কত রকম যে খাবার সাজানো সে ভোজনশালাগুলোতে তার গণিত তারা জানে না। তার অনুমান তারা জানে না। একটা ভিক্ষার থালায় কতটুকু গণিতইবা লিখিত থাকতে পারে। তাদের মনে কোথা থেকে যেন বসন্ত আসে। ক্ষুধা ও খাবারের বসন্ত। তাদের মনে হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বসন্ত ফুল ফোটায় খাদ্যের ডালে। কিছুক্ষণ পর তাদের মনে হয় তারা তো কেবল ভোজনশালাগুলো দেখতে আসেনি, এসেছে তাদের ক্ষুধা জানতে এবং খাদ্য জানতে। তারা এখন যাবে খাদ্যের ডালে বসে থাকা বসন্তে।

তারা ক্ষুধার বর্ণনা শিখেছিল তাদের শৈশবে মারা যাওয়া বাবা-মায়ের নিকট থেকে। তাদের বাবা-মা আকাশের দিকে তাকিয়ে, কিংবা তাদের সমাধিস্থ হয়ে যাওয়া সামান্য সম্পদের দিকে তাকিয়ে বন্দনা করত। দিদার ফকির ও রাজু ফকির সে বন্দনা করে।

তারা একটা ভোজনালয়ে প্রবেশ করে ক্ষুধা জানার জন্য ও আহার করার জন্য। যেহেতু এখানকার প্রতিটি ভোজনালয়ের দুটো অংশ আছে, একটা অংশে আছে ক্ষুধা নির্ণয় করার আসন আর অপর অংশে আছে খাদ্য। নিয়ম অনুযায়ী তারা প্রথমে যায় ক্ষুধা নির্ণয় করা আসনে। তারা সে আসনে বসে নিজেদের ক্ষুধাগুলোকে জানার জন্য। অনেকক্ষণ যায় তবুও তারা নির্ণয় করতে পারে না তাদের ক্ষুধাগুলোকে। তাদের শরীর ও মনে ক্ষুধা ধরা পড়ে না ক্ষুধা নির্ণায়ক আসনগুলোতে বসেও। তারা সেসময় ভাবে এরকম আসনে তারা কখনো বসেনি। এসব আসনগুলো জ্ঞান চর্চিত, পাঠ্যপুস্তক চর্চিত, জীবন চর্চিত নয়। তারা তো জ্ঞান চর্চা করেনি, পাঠ্যপুস্তক চর্চা করেনি তবে কীভাবে নির্ণীত হবে তাদের ক্ষুধা। যদি জ্ঞান চর্চা না থাকে পাঠ্যপুস্তক চর্চা না থাকে, তবে যাওয়া যেতে পারে নির্জন বন্দনায়। তারা ক্ষুধার বন্দনা করে। তারা ক্ষুধার বর্ণনা শিখেছিল তাদের শৈশবে মারা যাওয়া বাবা-মায়ের নিকট থেকে। তাদের বাবা-মা আকাশের দিকে তাকিয়ে, কিংবা তাদের সমাধিস্থ হয়ে যাওয়া সামান্য সম্পদের দিকে তাকিয়ে বন্দনা করত। দিদার ফকির ও রাজু ফকির সে বন্দনা করে। এই বন্দনায় ক্ষুধার সন্ধান না জানা গেলে তারা তখন কী করবে। এরপর তারা ভাবে, তারা তো কয়েকবার ফুলের সুবাস নিয়েছিল। ফুল কত যে ভালো, মনে হয়েছিল তাদের। তবে করা যাক ফুলের বন্দনা। কত মানুষ তো পৃথিবীতে ফুলের বন্দনা দিয়ে অর্জন করে কাঙ্ক্ষিত বিষয়। ফুল ও তাদের পক্ষে যায় না। ফুল যদি যায় সৌন্দর্যের পক্ষে তবে তারা তো ভিখারি, কেন ফুল তাদের পক্ষে আসবে। অবশেষে তারা ভিক্ষার বন্দনা করে ক্ষুধা জানার জন্য, চেনার জন্য। ভিক্ষার বন্দনায় তারা তো পার করেছে চল্লিশ বছর। ভিক্ষার বন্দনা ভীষণ দুর্বল হলে তাদের জানা হয় না তাদের ক্ষুধাসমূহ। আর নিজেদের ক্ষুধা জানতে না পারলেও এ ভোজনালয়ের যে অংশে খাদ্য আছে সে অংশে তারা যায় খাদ্য খাওয়ার জন্য। তারা তো জানে না সেসব খাদ্যের নাম। কীভাবে চাইবে খাবার। তবে কিছুক্ষণ বসে থাকলে একজন পরিচারক তাদের দুজনার জন্য অনেক ধরনের খাবার নিয়ে আসে। তারা খাবার খেতে থাকে। খেতে খেতে তারা টের পায় ভোজনালয়ে একটা মৃদু সংগীত বাজছে। খাবারের টেবিলের মাঝখানে কয়েকটা ফুল। তারা জানে না কোন ভাষার সংগীত এটা। তারা জানে না কী ফুল এটা। সংগীত শুনে এবং ফুল দেখে তাদের চিন্তা এলোমেলো হয়ে যায় ক্ষুধা ও খাদ্য বিষয়ে। তাদের খাদ্য তারা খাচ্ছে। নাম না জানা খাদ্য। খাদ্যেরও ক্ষুধা থাকলে খাদ্যের খাদ্য কি তবে সংগীত। কিংবা সংগীতের খাদ্য কি তারা যা খাচ্ছে সেগুলো। ফুল এখানে কোন ভূমিকায় অবস্থান করছে। ফুলও কি খাদ্যকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করছে তার গন্ধ দিয়ে। তারা চিন্তায় তেমন পারদর্শী না হলে চিন্তা থামিয়ে দেয়। তবে তারা এইটুকু ভাবনা ভাবে যে ক্ষুধারও ক্ষুধা আছে, খাদ্যেরও খাদ্য আছে। হয়তো, হয়তো।

পেট পুরে খাওয়ার পর কিছু খাবার বেঁচে গেলে তারা তাদের সঙ্গে থাকা কুকুর ও বিড়ালটাকে উচ্ছিষ্ট খাবারগুলো খেতে দেয়। বিড়াল, কুকুরেরও নিশ্চয় ক্ষুধা ও খাদ্য আছে। তবে চিরকাল কুকুর ও বিড়াল মানুষের উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে আসলে জানা যাবে না তাদের সত্যিকারের ক্ষুধা ও খাদ্য কী। দিদার ফকির ও রাজু ফকিরের এসময় কান্না পায়, নিজেদেরকে অসুখী মনে হয় এই ভেবে যে, তারা তাদের শরীর ও মনের ক্ষুধা চেনে না, খাদ্যের নাম জানে না, শ্রুত সংগীতের ভাষা জানে না, ঘ্রাণ নেয়া ফুলের নাম জানে না। তারা তো ক্ষুধার জন্য, খাদ্যের জন্য থালা হাতে রাস্তার পাশে বসে বসে ভিক্ষা করেছে গত চল্লিশ বছর। চল্লিশ বছর ক্ষুধা সংগ্রহ করে, খাদ্য সংগ্রহ করে তারা জানেনি কোন ক্ষুধা, কোন খাদ্য তাদের শরীরে রয়েছে। তারা নিজেদের অজানা, অচেনা ক্ষুধা ও খাদ্যকে জিজ্ঞেস করে, কে তুমি। নীরব নিঃশব্দ নূপুর বেজে যায়। একবার রাস্তার পাশে ঘুমিয়ে থাকার সময় অন্ধকারে যে নীরব নিঃশব্দ নূপুর বেজে গিয়েছিল সে নূপুর এখন বাজে। যে নূপুর তাদেরকে সে রাত্রে ঘুমাতে দেয়নি। বারবার বলেছিল আমাকে জানো, আমাকে চেনো, আমার পেছনে পেছনে এসো। তারা সে অন্ধকারে সে নূপুরের পেছনে পেছনে যেতে পারেনি। হয়তো সে নূপুরের কাছে ছিল তাদের ক্ষুধা ও খাদ্যের পরিচয়।

 

৬.
নূপুর বেজে যায়। বাজুক। তাদের হাঁটা ক্ষুধার্ত হলে, খাদ্য চাইলে ক্ষুধা ও খাদ্যের সিঁড়ি বেয়ে দ্বিতীয় তলায় চলে আসে তারা। প্রথম তলার মতো দ্বিতীয় তলায়ও অনেকগুলো ভোজনালয়। দ্বিতীয় তলায় এমন একজন মানুষের সঙ্গে তাদের দেখা হয়, যে তাদের কিছু জিজ্ঞাসার উত্তর দেয়। মানুষটি তাদেরকে জানায় পৃথিবীর সব যুগের, সব মানুষের ক্ষুধা ও খাদ্য আছে—এ ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতের বিভিন্ন ভোজনালয়ে। প্রথম তলায় ছিল পৃথিবীর প্রথম যুগের মানুষের কয়েক রকম ক্ষুধা এবং কয়েক রকমের খাদ্য। আর এখন দ্বিতীয় তলায় রয়েছে তারপরের যুগের মানুষের অসংখ্য ক্ষুধা ও খাদ্য। সে তাদেরকে জানায় যত ওপরে যাওয়া যাবে এ পর্বতের, তত জটিল ও বেশি সংখ্যক ক্ষুধা ও খাদ্য পাওয়া যাবে মানুষের। ক্রমে ক্রমে মানুষের ক্ষুধা ও খাদ্য হয়ে পড়েছে অসীম। মানুষ তার ক্ষুধা ও খাদ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এই ক্ষুধা ও খাদ্য মানুষকে অসহায় করে দিচ্ছে। মানুষের শরীর ও মন যার কারণে হাহাকার করছে সর্বদা ঘুমে ও জাগরণে। মানুষের ক্ষুধা অসীম এবং তার খাদ্যও অসীম। মানুষটি জানায় তার কাছে মনে হয়েছে মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্যের প্রধান লক্ষ্য মানুষের ক্ষুধা ও খাদ্যের পরিধি বাড়িয়ে দেওয়া। মানুষ তার শরীরে ধারণ করতে পারছে না এই অসীম ক্ষুধা ও খাদ্যের ওজন। মানুষটির কথা দিদার ফকির ও রাজু ফকির সবটুকু বোঝে না। তবে এটুকু তারা টের পায় ক্ষুধা ও খাদ্য শুধু তারা ভিক্ষা করে না থালা হাতে। তাদের মনে হয় পৃথিবীর সকল মানুষ থালা হাতে রাস্তা দিয়ে ভ্রমণ করছে ক্ষুধা ও খাদ্য সংগ্রহের জন্য।

কিছু কিছু মেঘ যদি কেবলই ভান করে, ছায়া হয়ে সরে যায়, বৃষ্টি হয় না। তাদের ক্ষুধাগুলোও তেমনি ছায়া হয়ে সরে যায়, বৃষ্টি হয় না। তারা তবে ক্ষুধার আসন ছেড়ে চলে যায় খাদ্যের আসনে। তারা পান করে প্রাণ ভরে। যেভাবে বর্ষার বৃষ্টিতে স্নান করে একটা বৃক্ষ। কিছু পানীয় বেঁচে গেলে তারা সেখানকার একজন পরিচারককে দুটো গামলা আনতে বলে।

দিদার ফকির ও রাজু ফকির দ্বিতীয় তলার ভোজনালয়গুলো ঘুরে ঘুরে দেখে। এখানকার বেশিরভাগ ভোজনালয়গুলোতে তরল জাতীয় খাদ্য সাজানো আছে। তাদের মনে হয় তারা ভীষণ তৃষ্ণার্ত। তৃষ্ণা নিবারণের জন্য তারা একটা ভোজনশালায় প্রবেশ করে। অন্যান্য ভোজনালয়ের মতো এখানেও রয়েছে দুটো অংশ। ক্ষুধা চেনার অংশ আর খাবার অংশ। তারা নিয়ম অনুযায়ী ক্ষুধা চেনার অংশে প্রথমে আসন গ্রহণ করে। তারা প্রার্থনা করে এক ফোঁটা দুই ফোঁটা ক্ষুধা আসুক তাদের নিকটে। নিজেদের ক্ষুধাকে চিনবে তারা। ক্ষুধা চেনা এত কঠিন জানত না তারা আগে। বাইরে বোধ হয় মেঘের গর্জন। হতে পারে বৃষ্টি। বৃষ্টি ঝরুক। ঝরুক ক্ষুধা তাদের চিন্তায়। তারা আজ ক্ষুধায় ভিজতে চায়। কিছু কিছু মেঘ যদি কেবলই ভান করে, ছায়া হয়ে সরে যায়, বৃষ্টি হয় না। তাদের ক্ষুধাগুলোও তেমনি ছায়া হয়ে সরে যায়, বৃষ্টি হয় না। তারা তবে ক্ষুধার আসন ছেড়ে চলে যায় খাদ্যের আসনে। তারা পান করে প্রাণ ভরে। যেভাবে বর্ষার বৃষ্টিতে স্নান করে একটা বৃক্ষ। কিছু পানীয় বেঁচে গেলে তারা সেখানকার একজন পরিচারককে দুটো গামলা আনতে বলে। সে দুটো গামলায় তাদের উচ্ছিষ্ট পানীয়টুকু ঢেলে দেয় তাদের কুকুর ও বিড়ালকে পান করতে দেওয়ার জন্য। কুকুর ও বিড়ালটারও তৃষ্ণা পেয়েছিল তাদেরই মতো। তারা পানীয়টুকু পান করে খুব দ্রুত।

পানীয় পান করার পর তারা বেরিয়ে আসে। চিন্তা তাদেরকে কামড় দিচ্ছে এখন। তাদের খুব অস্বস্তি লাগছে। তাদের মনে হয় তারা ব্যতীত পৃথিবীর সকল মানুষ নিজেদের ক্ষুধা জানে, ক্ষুধা চেনে। মানুষেরা জ্ঞান অর্জন করে নিজেদের ক্ষুধা আবিষ্কারের জন্য, খাদ্য আবিষ্কারের জন্য। তারা ভাবে মানুষের সকল সৃজনশীলতা ক্ষুধা ও খাদ্য আবিষ্কারের জন্য বোধ হয় ব্যয় হয়। তারা স্মরণ করে, মানুষ হত্যা করে মানুষকে ক্ষুধা আবিষ্কারের জন্য, মানুষ লুণ্ঠন করে মানুষকে ক্ষুধা আবিষ্কারের জন্য, মানুষ দান করে ক্ষুধা আবিষ্কারের জন্য। তারাও তো থালা হাতে রাস্তার পাশে বসে আছে চল্লিশ বছর ক্ষুধা ও খাদ্য আবিষ্কারের জন্য।

 

৭.
চাঁদ স্পর্শ করার সাধ ছিল তাদের। চাঁদ স্পর্শ করা কি এক ধরনের ক্ষুধা? হতে পারে। তারা দুজন উঠতে চেয়েছিল চাঁদে। হাঁটতে চেয়েছিল চাঁদে। হাঁটতে হাঁটতে দিদার ফকির ও রাজু ফকির চলে এসেছে তৃতীয় তলায়। এখানকার ভোজনালয়গুলো একটু ভিন্ন ধরনের। প্রতিটি ভোজনালয়ে রয়েছে কয়েকজন করে রূপসি ও সুগন্ধি মেয়ে। চাঁদের মতো। একটা ভোজনালয়ে প্রবেশ করে তারা টের পায় তাদের ক্ষুধা কী। তাদের মনে হয় গত চল্লিশ বছর তারা কেবল গায়ে মেখেছে পথের ধুলা। কোনো দিন নিজেদের গায়ে মাখেনি নারী বা চাঁদ। নারী ও চাঁদকে সেসময় তাদের তরল মনে হয়। তারা অনুভব করে ক্ষুধা এক ধরনের অন্ধকার। কত রিপু, ছয় রিপু, শত রিপু অন্ধকার হয়ে তাদেরকে আকর্ষণ করছে চাঁদের দিকে, এই নারীগুলোর দিকে। তাদের একসময় মনে হয় মানুষ ক্ষুধা আবিষ্কার করেছে কি তবে চাঁদের দিকে যাবার জন্য, নারীর দিকে যাবার জন্য। চাঁদের আলোর দিকে, চাঁদের অন্ধকারের দিকে আরোহণ করার জন্য। নারীর আলোর দিকে, অন্ধকারের দিকে আরোহণ করার জন্য। চাঁদও কি এক প্রকার ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বত। নারীও কি ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বত। এ দুই পর্বতে আরোহণ করার জন্য কি আবিষ্কার হয়েছে অর্থনীতি, রাজনীতি, সৌন্দর্যনীতি? মানুষের মোমবাতি নিভে যায়, হারিয়ে যায় চাঁদ আবিষ্কার করতে, মনে হয় তাদের। তাদের পথের দূরে রয়েছে কি জলের ঢেউ, যে ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে যায় চাঁদ ও চাঁদ সওদাগরকে।

দিদার ফকির ও রাজু ফকির দুজন নারীর দিকে এগিয়ে যায়। এ নারী দুজন নাচ জানে। তারা কি নাচ বিক্রেতা। এ নারী দুজন গান জানে। তারা কি গান বিক্রেতা। এ নারী দুজন শরীর জানে। তারা কি শরীর বিক্রেতা। দিদার ফকির ও রাজু ফকির নিজেদের গোপন অন্ধকারে নিজেদের অর্থনীতির দিকে তাকায়। তারপর তারা ভাবে কী কিনবে তারা। এ দুজন নারীর নাচ, অথবা গান, অথবা শরীর। তারা পথ হারায়। চিন্তা হারায়। দেখো, অন্ধকার কত কিছু যে আহার করে। আহার করে সে তোমার ভগিনী, আহার করে সে তোমার জননী, আহার করে সে তোমার প্রদীপ, আহার করে সে তোমার সকল প্রার্থনা। তাদের থালায়, ভিক্ষার থালায় কখনো আসেনি চাঁদ, আসেনি নাচ, আসেনি গান। এ সকল ক্ষুধা জন্মায় না ভিখারির থালায়। তারা এরপর অনুভব করে খাদ্য থাকলেও মানুষের সব সময় ক্ষুধা থাকে না। সকল ক্ষুধা সব সময় খাদ্য দাবি করে না। ক্ষুধা দাবি না করলে সেসময় দেখো একজন সাধু অন্য কোনো অজানা পর্বতে ধ্যানে বসে আছে, জ্ঞানে বসে আছে, প্রজ্ঞায় বসে আছে মানুষকে ক্ষুধা মুক্ত করাবার জন্য, খাদ্য মুক্ত করাবার জন্য। এসময় দিদার ফকির এবং রাজু ফকিরের মনে হয় তাহলে অন্য কোনো অরণ্যে হয়তো এমন পর্বত নির্মিত হয়েছে যেখানে রয়েছে ক্ষুধা ও খাদ্য মুক্তির সাধনা। সে সকল পর্বত ছায়া নিয়ে বসে আছে তোমার জন্য, আমার জন্য।

 

৮.
শরীর ভাষা তৈরি করে, শরীর মন তৈরি করে অথবা এরকম যে, ভাষা তৈরি করে শরীর, ভাষা তৈরি করে মন। তারপর বলি, শরীরের জন্য, মনের জন্য কত কত গৃহ নির্মাণ করা। কত কত ক্ষুধা নির্মাণ করা। কত কত খাদ্য নির্মাণ করা। কত কত মিথ্যা আবিষ্কার করা। তারপর দেখো ভেঙে পড়ে এসবের আশ্রয়দাতা নানারূপ গৃহ। গৃহগুলো ভেঙে গেলে সবাই এসেছে রাস্তায় থালা হাতে। এখন সবার কথা নয়, শুধু দিদার ফকির এবং রাজু ফকিরের কথা বলি। তাদের ভাষা বলি। তাদের তো নির্মাণ রয়েছে নিজস্ব ভাষা। তাদের থালায় পড়ছে শব্দ। পথিকের করুণার শব্দ, পথিকের পথ ভুলে যাওয়ার শব্দ। একজন পথিক পথ হারিয়ে ফেললে ভিখারির থালায় ছুড়ে মারে পথ হারানো মুদ্রা। এ সকল শব্দের ভাষা জানে দিদার ফকির ও রাজু ফকির। এখন চারপাশে নিস্তব্ধতা। তারা ভিক্ষার বাইরে এসেছে আজ। আজ রাতে। রাতকে এখন তাদের রজনি বলতে ইচ্ছা হয়। কোনো এক গান থেকে তারা রাতকে রজনি বলতে শিখেছিল। এই রজনি এখন গন্ধরাজের মতো স্তব্ধ।

দিদার ফকির ও রাজু ফকির গন্ধরাজের স্তব্ধতার ভেতর হাঁটতে থাকলে পৌঁছে যায় এ পর্বতের চতুর্থ তলায়। চতুর্থ তলায় পৌঁছে দেখে অনেকগুলো গোলকধাঁধা সেখানে। গোলকধাঁধা ভোজনালয়। তারা কিছুক্ষণের জন্য যেকোনো একটা গোলকধাঁধা ভোজনালয়ে প্রবেশ করতে চায়। এবং তারা একটা গোলকধাঁধা ভোজনালয়ে প্রবেশ করে। এ ভোজনালয় যেন জাদুর ভোজনালয়। নানারূপ খাবার সেখানে সাজানো আছে। কিন্তু যেই মাত্র সেটা খেতে যাওয়া হচ্ছে, সেটা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। তারা বিষয়টা বুঝতে পারে না তবে উপভোগ করে এটা। এ ভোজনালয়ে কোনো পরিচারক কিংবা পরিচারিকা নাই। অনেকগুলো খাবার পাত্রে অনেক রকম খাবার সাজানো আছে। তারা পাত্রগুলোর নিকটে যায়। খাবারগুলো তুলতে চায় নিজেদের থালায়। কিন্তু তুলতে গিয়ে দেখে সেখানে কোনো খাবার নাই। তারা কীভাবে ব্যাখ্যায় যাবে এই গোলকধাঁধার। সেসময় তাদের মনে পড়ে, মাঝে মাঝে তারা গিয়েছে কোনো বিয়ে বাড়িতে খাবার জন্য। সেখানে অজস্র খাবার। যখনই তারা তাদের থালা পেতেছে তখনই দেখেছে খাবার উধাও হয়ে গেছে। তাদের থালায় কোনো খাবার আসেনি। তারা এবং তাদের পোষা কুকুর ও বিড়াল খাবার পায়নি।

দিদার ফকির আর রাজু ফকির যে রাস্তার পাশে বসে থালা হাতে ভিক্ষা করে, সে রাস্তাকেও তাদের মাঝে মাঝে গোলকধাঁধা বলে অনুভূত হয়। সারা দিন, সারা রাত তাদের ভিক্ষার পথ বেয়ে কত যে পথিক পথ হারিয়ে কোন পথে যায়, জানে না তারা। তবে তাদের ভালো লাগে যখন দেখে অনেক পথিক তাদেরকে জিজ্ঞেস করে পথের ঠিকানা। তারা সব সময় বলে সামনে গিয়ে বামে, সামনে গিয়ে ডানে, সামনে গিয়ে যে বড়ো একটা গাছ, সামনে গিয়ে যে বড়ো একটা পুকুর, সামনে গিয়ে যে পথ আর নাই, সেখানেই তাদের ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যাবে।

একটু পরে দিদার ফকির ও রাজু ফকির দেখে গোলকধাঁধা বিষয়টা সাময়িক। হঠাৎ যেন সেসময়টা পার হয়ে যায়। তারা বলে নিজেদেরকে, গোলকধাঁধার ভেতর কিছুই থাকে না। না ভোজনশালা, না ভোজন। গোলকধাঁধা তার শিকল খুলে দেয় অথবা তাদের শিকল খুলে দেয়। তারা বের হয়ে আসে গোলকধাঁধার ভেতর থেকে। তবে তারা অনুভব করে গোলকধাঁধায় আনন্দ আছে, বিস্ময় আছে, অসহায়তা আছে। গোলকধাঁধার ভেতর কেউ কাউকে উদ্ধারে আসে না। হারিয়ে যাই আমি হারিয়ে যাও তুমি। মানুষ হারাতে না পারলে কত যে ক্লান্ত হয়ে যায় সে কথা জানে একটা মানুষের মাছ।

 

৯.
আর কী চাই তারা। যখন বেরিয়ে এসেছে গোলকধাঁধা থেকে। গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে কী চায় মানুষ। তারা তো ভিখারি। সারা জীবনের ভিক্ষার সঞ্চয় নিয়ে দেখতে এসেছে ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বত। পৃথিবীর একটা রাস্তা চেনে তারা। ভিখারি রাস্তা। তবে এখন তাদের মনে হয় পৃথিবীর সকল পথের পথিক নানা পথ অতিক্রম করে হেঁটেছে তাদের ভিখারিপথ দিয়ে। যেহেতু ভিখারিপথে সবাই হেঁটেছে তবে তারা চিনেছে সকল পথের পথিককে। তারা জানে পথের ক্ষুধা। যদি তারা পথের ক্ষুধা জানে, তবে তারা জানে সকল পথিকের ভ্রমণের ভাষা।

যেহেতু বই থেকে আগুনের তাপ বের হচ্ছে না, বাঁশির সুর বের হচ্ছে না, তবে বই তাদের খাদ্য নয়। বই তাদেরকে জানাতে পারবে না তাদের ক্ষুধা কী কী ছিল কিংবা কী কী রয়েছে। তাদের আরও স্মরণ হয়, যে পথের পাশে বসে তারা ভিক্ষা করে, সে পথে বই হাতে, বই ব্যাগে নিয়ে কত যে পথিক, কত যে পাঠক, কত যে বইভোজনকারী কত ভ্রমণে যায় প্রতিদিন।

দিদার ফকির আর কাদের ফকির উঠে এসেছে পঞ্চম তলায়। পঞ্চম তলায় রয়েছে শিল্প-সাহিত্য দর্শন বিজ্ঞানের অসংখ্য ভোজনালয়। এ ভোজনালয়ে কেবল বই আর বই। কোনো এক শৈশবে তারা দুজন মাতৃভাষা পড়তে শিখেছিল। এখনো তারা মাতৃভাষা পড়তে পারে অর্থ বুঝে অথবা না বুঝে। যেহেতু আজই তাদের প্রথম ও শেষ প্রবেশ ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতে, তাই তারা সিদ্ধান্তে যায় যেকোনো একটা ভোজনালয়ে তারা প্রবেশ করবে। তারা প্রবেশ করে একটা ভোজনালয়ে। এ ভোজনালয়ে পৃথিবীর সকল কালের সকল লেখকের শিল্প সাহিত্য বিজ্ঞান দর্শনের বই সাজানো আছে। বই যে ভোজনের বিষয় হতে পারে তা তাদের স্বল্প শিক্ষা দিয়ে, স্বল্প বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারেনি কখনো আগে। বই কীভাবে ভোজন করা যায় বুঝতে পারে না তারা। তবুও চেষ্টা করে কীভাবে এ সকল বইকে ভোজনের বিষয় করা যায়। ভোজনালয়ের ক্ষুধা বিষয়ক অংশে আসন গ্রহণ করে তারা। তারা ভাবে মানুষের সৃজনশীলতার সর্বোচ্চ প্রকাশ যদি শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন হয়ে থাকে, তবে তারা এ সকল বইয়ের পাশে বসে হয়তো বুঝতে পারবে তাদের ক্ষুধাগুলোকে। তারা তো জেনেছে পৃথিবীর সকল ক্ষুধা ও খাদ্যের কথা লেখা আছে এ সকল বইয়ে। অনেকক্ষণ বইগুলোর পাশে বসে তারা টের পায়, বইয়ের পাশে বসে পাওয়া যায় না বইয়ের আহার। পাওয়া যায় না বইয়ের উত্তাপ। উত্তাপ শব্দটা মনে হতে তাদের মনে হয় আগুনের কথা। বই আগুনের মতো হলে ভালো হতো। এ বইগুলোকে এখন তাদের মৃত বই বলে মনে হচ্ছে। তখন তাদের আরও স্মরণ হয় কেউ বলেছিল পাথরেরা নিজস্ব জ্ঞান দিয়ে, বিজ্ঞান দিয়ে, দর্শন দিয়ে, শিল্প দিয়ে, সাহিত্য দিয়ে আগুন জ্বালাতে পারে। পৃথিবীর প্রথম শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞানের স্রষ্টা পাথর। সেসময় এই চিন্তা তাদের মনে উদিত হয়, পাথর দ্বারা নির্মিত খাবারের কোনো ভোজনালয় থাকলে ভালো হতো। দিদার ফকিরের হঠাৎ বাঁশির কথা মনে পড়ে। সে তো একবার বাঁশি বাজানো শিখেছিল সুদূর শৈশবে। বাঁশি যেমত বাজে, বইগুলো সে রকম বাজলে হয়তো তারা বইগুলো ভোজন করতে পারত। যেহেতু বই থেকে আগুনের তাপ বের হচ্ছে না, বাঁশির সুর বের হচ্ছে না, তবে বই তাদের খাদ্য নয়। বই তাদেরকে জানাতে পারবে না তাদের ক্ষুধা কী কী ছিল কিংবা কী কী রয়েছে। তাদের আরও স্মরণ হয়, যে পথের পাশে বসে তারা ভিক্ষা করে, সে পথে বই হাতে, বই ব্যাগে নিয়ে কত যে পথিক, কত যে পাঠক, কত যে বইভোজনকারী কত ভ্রমণে যায় প্রতিদিন। বই যদি তাদের ক্ষুধার সন্ধান না দিতে পারে তবে দেখো কোথাও দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে, ফুল ঝরে যাওয়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে, একটা পাখি উড়তে উড়তে আকাশে হারিয়ে যাচ্ছে।

 

১০.
মানুষ রাজা চায়। কে বলে? রাজা বলে। মানুষ রাজনীতি চায়। কে বলে? রাজনীতিবিদ বলে। মানুষ চায় কাউকে সে রাজা বলুক। কে বলে? বলে রাজা, বলে রাজনীতিবিদ।

তারপর রাজা নিজের ভোজনালয়ে আহার করে অন্য রাজার মাংস। পান করে অন্য রাজার রক্ত। অথবা রাজা আহার করে, পান করে রাস্তার পাশে বসে থাকা ভিখারিদের মাংস ও রক্ত। যেহেতু রাজা সব সময় একবচন। যদি বহুবচনে তা গণতন্ত্র হয়, তবে বলি বহুবচন থাকে কেবল ব্যাকরণ বইয়ে। ব্যাকরণ লেখে কে? সে কি জানে ভাষা? সে কি কথা বলে রাস্তায় এসে? সে কি কথা বলে দিদার ফকির আর রাজু ফকিরের সঙ্গে? ব্যাকরণবিদ কোনো কালে জানেনি জীবন্ত ভাষা, জানেনি জীবন্ত মানুষ। ব্যাকরণবিদ সর্বদা মৃত ভাষা জানলে ভাষাকে জীবিত করবে কে? তারপর দেখো রাত নামলে একদল ফকির সব হারিয়ে জীবন্ত ভাষায় গান গেয়ে চলে যায় দূরের পথ বেয়ে, যখন তুমি আমি শুয়ে আছি রাতের জানালা বন্ধ করে।

একদল নয়। দুজন ফকির। দিদার ও রাজু ফকির উঠে এসেছে ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতের ষষ্ঠ তলায়। হঠাৎ তাদের নজরে পড়ে তাদের সঙ্গে এখন অনেকগুলো কুকুর ও অনেকগুলো বিড়াল। তাদের তো কেবল একটা বিড়াল একটা কুকুর ছিল। এতগুলো কুকুর ও বিড়াল কোথা থেকে এলো। নিজেদেরকে তাদের এখন মনে হচ্ছে কুকুর ও বেড়ালের সর্দার। বিড়াল ও কুকুরগুলো তাদেরকে সম্ভবত মান্য করছে। কারণ তারা কোনো শব্দ করছে না। তারা শব্দ না করলে দিদার ফকির ও রাজু ফকির নিজেদেরকে নিরাপদ জ্ঞান করে।

ষষ্ঠ তলাটা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি কোলাহলপূর্ণ। অজস্র ভোজনালয় এখানে। এখানকার ভোজনালয়গুলোতে শুধু চা বিক্রি হচ্ছে। তবে কী রকম চা তা জানে না দিদার ফকির ও রাজু ফকির। তবে তাদের মনে হয় তারা যে রাস্তার পাশে বসে ভিক্ষা করে সে রাস্তার পাশে অনেকগুলো দোকানে চা বিক্রি হয়। তারা একটা ভোজনালয়ে প্রবেশ করে। প্রথমে তারা এ ভোজনালয়ের ক্ষুধার অংশে গিয়ে আসন গ্রহণ করে। তারা চেষ্টা করে তাদের ক্ষুধা নির্ধারণে। তারা টের পায় তাদের ক্ষুধা সম্ভবত ভিক্ষার থালা ও ভিক্ষার ঝুলি হারিয়ে ফেলার। ভিক্ষার ঝুলি ও ভিক্ষার থালা তারা হারাতে চায়, আপাতত এই একটা তাদের ক্ষুধা। কিন্তু তারা অনুভব করে ভিক্ষার থালা আর ভিক্ষার ঝুলি হারিয়ে গেলে তারা যাবে কোন ঠিকানায়। ভিক্ষার থালা ও ভিক্ষার ঝুলি তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে, আহার দিয়েছে, ঠিকানা দিয়েছে কত কত বছর। মাঝে মাঝে রাজনীতি ভিক্ষা হিসেবে পেলে তারা দেখেছে সেখানে আশ্বাস আছে ভিক্ষার থালা ও ভিক্ষার ঝুলি উচ্ছেদের। ভিক্ষা হিসেবে পাওয়া রাজনীতিতে তাদের বিশ্বাস না থাকলে, বিশ্বাস দৃঢ় হয় ভিক্ষার থালা ও ভিক্ষার ঝুলিতে।

এরপর তারা এ ভোজনালয়ের খাদ্য অংশে যায়। তারা সেখানে আসন গ্রহণ করা মাত্র তাদেরকে দুকাপ চা দিয়ে যায় একজন পরিচারক। চা পান করতে করতে তাদের প্রথমবারের মতো মনে হয় ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতের কিছুটা তাদের আগে জানা ছিল। তারা সেসময় কিছুক্ষণের জন্য নিজেদেরকে হরিণগাছী গ্রামের অধিবাসী জ্ঞান করে। কয়েক বছর পরপর তাদের রাস্তার নিকটে রাজনীতি এসে জিজ্ঞেস করে তারা ভোটার কি না। তারা সেসময় তাদেরকে রাজনীতির চা খাওয়ায়। চা খাওয়া শেষ হলে তারা দেখে রাজনীতি চলে গেছে রাজধানীতে।

দিদার ফকির ও রাজু ফকির যদিও ভেবেছিল ষষ্ঠ তলার ভোজনালয়ে শুধু চা পাওয়া যায়, রাজনীতি পাওয়া যায়, রাজধানী পাওয়া যায়, রাজধানীর কথা পাওয়া যায় কিন্তু এখন তারা দেখে আরও অন্য কিছুও এখানে পাওয়া যায়। এখান থেকে বের হয়ে যাওয়ার আগে তাদের চোখে পড়ে কয়েকটি অন্যরকম ভোজনালয়। যেখানে লেখা আছে শেষ বিদায় ভোজনালয়। তাদের এ নামটি বেশ ভালো লাগে। তারা ঢুকে পড়ে এরকম একটি ভোজনশালায়। তারা তাদের ক্ষুধা জানার জন্য প্রথমে আসন গ্রহণ করে ক্ষুধার অংশে। তারা সেখানে আসন গ্রহণ করার পর বুঝতে পারে তাদের আপাতত একটা ক্ষুধা। না মরার ক্ষুধা। তাদের আরও মনে হয় সকল ক্ষুধার সারমর্ম ক্ষুধা সম্ভবত না মরার ক্ষুধা। মরতে না চাওয়ার ক্ষুধা। তারা তাদের ক্ষুধা জানার পর কোনো কিছু আহার না করে ত্যাগ করে এ ভোজনালয়।

 

১১.
কুকুর বেড়ে গিয়েছে, বিড়াল বেড়ে গিয়েছে। কুকুর ও বিড়াল অসমাপ্ত ছিল। বেড়ে গিয়েও তারা অসমাপ্ত আছে। ক্ষুধা ও খাদ্যের পর্বত এবং তার ভোজনালয়সমূহ সর্বদা মানুষের অসমাপ্ত বিষয় সমূহের ইঙ্গিত দেয়। মানুষ নিজস্ব ভাষা তৈরি করে অসমাপ্ত সকল কিছুকে বলে সমাপ্ত হয়েছে। তার এই বলার ভেতর মিথ্যা সর্বদা ধারাভাষ্য দেয়। ভোজনালয় দেখতে দেখতে দিদার ফকির ও রাজু ফকির চলে এসেছে সপ্তম তলায়। সপ্তম তলায় অনেকগুলো ভোজনালয়। ভোজন বিষয়ে তাদের আর তেমন কোনো আগ্রহ অবশিষ্ট নাই। তারা দেখতে পায় এখানকার সবগুলো ভোজনালয় নানা যুগের নানা রকমের পাথর দ্বারা পূর্ণ। পাথর যে মানুষের ভোজনের বিষয় হতে পারে এ বিষয়টা তাদের কাছে বেশ আমোদের মনে হয়। তারা একটা ভোজনালয়ে ঢুকে পড়ে। এ দোকানে অজস্র রঙের এবং অজস্র আকৃতির পাথর। এখানকার একজন পরিচারক জানায় এ সকল পাথর পৃথিবীর সকল পাহাড় থেকে সংগৃহীত। এসব পাথর দেখার মানে সারা দুনিয়ার সকল পাথর দেখা। পাথরগুলোকে কেটে কেটে নানারূপ পশু, পাখি ও মানুষের রূপ দেওয়া হয়েছে। এসব পাথরে কোনো ভিক্ষার ছবি নাই। ভিখারির ছবি নাই। কোনো ভিখারি কখনো পাহাড় জয় করেনি অথবা পাহাড় জয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করেনি। তাদের কখনো হয়নি পাহাড় ভোজন কিংবা পাথর ভোজন। যদি কোনো পাথরে ভিক্ষার, ভিক্ষুকের এবং ভিক্ষার পথের ছবি না থাকে তবে এ ভোজনালয়ে দিদার ও রাজু ফকিরের কোনো ভোজন নাই।

একটা কুকুর ঘেউ ডাকে, একটা বিড়াল মিউ ডাকে। সম্ভবত রাত শেষ হয়ে আসবে একটু পরে। সূর্যোদয়ের আগে শেষ করতে হবে দিদার ফকির ও রাজু ফকিরের খাদ্য পর্বতের ভোজনালয় পরিদর্শন। কারণ এ পর্বতের ভোজনশালাগুলোর দরজা বন্ধ হয়ে যায় সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে।

তারা ঠিক বুঝতে পারে না এ ক্ষুধা অপেক্ষার ক্ষুধা না সত্যিকারের প্রয়োজনীয় শারীরিক ক্ষুধা। তাদের একসময় মনে হয় ক্ষুধার কারণে তারা অজ্ঞান হয়ে যাবে। এসময় একজন ব্যক্তি আসে। সে তাদের সামনে বসে। দিদার ও রাজু ফকির তাকে বলে তারা এসেছে ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতের মালিকের সঙ্গে দেখা করতে। লোকটি সামান্য নীরব থেকে জানায় এ পর্বতের মালিক এখানে বাস করে না।

 

১২.
অন্ধকার তো আশ্রয় হয়। সামান্য অন্ধকারকে ভরসা করে দিদার ও রাজু ফকির উঠে আসে ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতের চিলেকোঠায়। তাদের ধারণা এই চিলেকোঠাটি এই পর্বতের চূড়া। যেখানে বাস করে ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতের মালিক। তারা দেখা করতে চায় এ পর্বতের মালিকের সঙ্গে। চিলেকোঠায় দর্শনার্থীদের জন্য যে পাথরের আসন আছে সেখানে গিয়ে বসে তারা। তাদের সঙ্গে এখন অনেকগুলো কুকুর ও বিড়াল। দিদার ফকির রাজু ফকির এখন বুঝতে পারে না কোন কুকুরটা আর কোন বিড়ালটা তাদের পোষা বিড়াল। সবগুলো দেখতে এখন একই রকম। তারা অপেক্ষা করতে থাকে। অনেক খাদ্য খেয়েছে তারা কিন্তু অপেক্ষা করতে করতে এখন তারা ক্ষুধা অনুভব করছে। তারা ঠিক বুঝতে পারে না এ ক্ষুধা অপেক্ষার ক্ষুধা না সত্যিকারের প্রয়োজনীয় শারীরিক ক্ষুধা। তাদের একসময় মনে হয় ক্ষুধার কারণে তারা অজ্ঞান হয়ে যাবে। এসময় একজন ব্যক্তি আসে। সে তাদের সামনে বসে। দিদার ও রাজু ফকির তাকে বলে তারা এসেছে ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতের মালিকের সঙ্গে দেখা করতে। লোকটি সামান্য নীরব থেকে জানায় এ পর্বতের মালিক এখানে বাস করে না। সে মালিকের বার্তাবাহক। দিদার ও রাজু ফকির বেশ হতাশ হয়। তারা লোকটিকে বলে অনেক খাবার খেয়েও এখন আবার তাদের ক্ষুধার উদ্রেক হচ্ছে। এর কারণ কী? লোকটি নির্বিকারভাবে তাদেরকে জানায় তারা আসলে এ পর্বতের উচ্ছিষ্ট ক্ষুধা ও খাদ্য খেয়েছে তাদের কুকুর ও বিড়ালের সঙ্গে। আর এ কথা তো খুব ঠিক যে উচ্ছিষ্ট খাদ্য খেয়ে কখনো ক্ষুধা নিবৃত হয় না। সে আরও জানায় আজ বিশ্ব ভিখারি দিবস ছিল। যদি রাত, তবে বলি আজ বিশ্ব ভিখারি রজনি ছিল। রজনির বাইরে সকাল। বন্ধ হয়ে গেছে ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতের দরজা। তাহলে দিদার ফকির ও রাজু ফকির কীভাবে বের হবে তাদের কুকুর ও বিড়াল নিয়ে ক্ষুধা ও খাদ্য পর্বতের ভেতর থেকে!

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ১৯৬৮, কুষ্টিয়ায়। বর্তমানে সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করছেন। লেখেন বিভিন্ন লিটলম্যাগে। সম্পাদিত লিটলম্যাগ : নিজকল্পা। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ : জল আসে মানুষের দীঘিতে, মানচিত্রকর, আমাদের গ্রামে একটা পাখিচোর আছে, বিড়াল পোষা প্রতিবেশিনীরা, কোথায় কোথায় ঘুমিয়েছিলাম এবং মেয়াদোত্তীর্ণ নিরাপত্তাসমূহ।  উপন্যাস : কেউ মরছে না

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।