শনিবার, জুন ২২

গি দ্য মোপাসাঁর গল্প : উন্মাদের দিনলিপি : ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম মানিক

0

Motif-01লোকটা মারা গেছেন। তিনি ছিলেন কোনো একটা উচ্চ আদালতের প্রধান বিচারক, বলতে গেলে এমন একজন ঊর্ধ্বতন বিচারক যার নিখুঁত জীবনযাপন ফ্রান্সের সকল আদালতে লোককথায় পরিণত হয়েছিল। তার দীর্ঘকায় লিকলিকে শরীর আর পাংশু চেহারায় জ্বলজ্বল করে জ্বলা দুটি চোখ দেখে আইনজীবী, তরুণ পরামর্শক, বিচারকসহ সকলেই শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানাতেন।

তিনি জীবনভর অন্যায়ের প্রতিবিধান করেছেন এবং দুর্বলকে রক্ষা করে গেছেন। জোচ্চোর বা খুনির দল তার কাছে তেমন কোনো দুর্ধর্ষ প্রতিপক্ষ ছিল না, কারণ তিনি তাদের অন্তঃকরণে লুকায়িত সবচেয়ে গোপন কথাটিরও পাঠ নিতে জানতেন সহজেই।

বিরাশি বছর বয়সে তিনি গত হয়েছেন, সশ্রদ্ধ স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে তাকে সম্মান জানানো হয় এবং পুরো জাতি অনুশোচনার মধ্য দিয়ে তার প্রয়াণে শোক প্রকাশ করে। লাল পাজামা পরিহিত সৈনিকেরা চারপাশে বেষ্টনী দিয়ে তাকে সমাধিস্থলে নিয়ে যান। সাদা গলবন্ধনী পরিহিত লোকজন বিভিন্ন শব্দ জপছিলেন এবং এমনভাবে অশ্রু বিসর্জন করছিলেন যে, দেখে তাদেরকে খুবই আন্তরিক মনে হয়েছিল।

টেবিলের ওপর তিনি যেখানে ভয়ংকর সন্ত্রাসীদের নথি রেখেছিলেন, ভারাক্রান্ত কর্মচারীটি সেখানে একটা অদ্ভুত দিনলিপি খুঁজে পায়। এরপরই এটি খবরের শিরোনাম হয়ে যায়।

কিন্তু কেন?

২০ জুন, ১৯৫১ : মাত্রই আদালত ত্যাগ করলাম। ব্লন্ডেলকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছি। এই লোকটি কেন তার পাঁচটি শিশুসন্তানকে হত্যা করল? যারা জীবনকে বিনাশ করে আনন্দ পায় এমন লোকের সাথে হরহামেশা যে কারো দেখা হয়েই যায়। হ্যাঁ, হ্যাঁ, জীবন বিনাশেও আনন্দ থাকা উচিত, এটা বরং সবচেয়ে আনন্দময় হওয়া উচিত, সম্ভবত এটাই হওয়া উচিত কারণ সৃষ্টির পরবর্তী জিনিসটিই কি ধ্বংস নয়? সৃষ্টি ও ধ্বংস! এই দুটি শব্দতেই মহাবিশ্বের সকল ইতিহাস বিরাজমান, জগতের সকল ইতিহাস এখানেই বিরাজমান; এই দুটি শব্দই সবকিছু, একেবারেই সব! তাহলে হত্যায়-বিনাশে-ধ্বংসে কেন উন্মাদনা থাকবে না?

২৫ জুন : আপাত ভাবনায় যা জীবন-যাপন করে, হাঁটে, দৌড়ায়; তা-ই প্রাণী। প্রাণী? প্রাণী আবার কী? সেই প্রাণবন্ত বস্তু যা গতির মূলনীতিগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করে এবং সেই গতিকে বিরাজমান রাখার ইচ্ছে পোষণ করে। এটি কোনো কিছুর সাথেই সংযুক্ত নয়, একেবারেই না। এর পদতল ভূমির সাথে অন্তর্গত নয়। এটি জীবনের এমন এক শাঁস যা পৃথিবীতে গতিশীল, কখন জীবনের এই শাঁসের উদ্ভব আমি জানি না, কিন্তু ইচ্ছে হলেই যে কেউ তা ধ্বংস করে দিতে পারে। তারপর আর থাকে না কিছুই—একেবারে কিছুই না। জীবন ধ্বংস হয়, একদম বিলীন হয়ে যায়।

যেসব ছোটো ছোটো পাখি, ছোটো জন্তু তার সংস্পর্শে আসে; সেগুলোকেও সে হত্যা করে। কিন্তু সর্বসংহারের যে অদম্য তাড়না আমাদের ভেতরে কাজ করে এটুকু সে জন্যে পর্যাপ্ত নয়।

২৬ জুন : তাহলে হত্যা করা অপরাধ কেন? হ্যাঁ, কেন? ওপরন্তু, এটিই প্রকৃতির নিয়ম। প্রতিটি প্রাণীর লক্ষ্যই হচ্ছে হত্যা করা; সে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে হত্যা করে, সে হত্যার প্রয়োজনে হত্যা করে। জন্তুরা বিরতিহীন হত্যা করে যায়, সারা দিন, যত দিন টিকে থাকে তার নিজের অস্তিত্ব। মানুষও নিজের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে অবিরাম হত্যায় মেতে থাকে; কিন্তু পাশাপাশি যেহেতু তার বিনোদনের প্রয়োজন, তাই সে শিকার করার মতো খোশখেয়ালের উদ্ভব ঘটায়। একটা শিশু যেসব পোকামাকড় পায় সেগুলোকে সে হত্যা করে; যেসব ছোটো ছোটো পাখি, ছোটো জন্তু তার সংস্পর্শে আসে; সেগুলোকেও সে হত্যা করে। কিন্তু সর্বসংহারের যে অদম্য তাড়না আমাদের ভেতরে কাজ করে এটুকু সে জন্যে পর্যাপ্ত নয়। জন্তু-জানোয়ার হত্যাই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়, আমরা অবশ্যই মানুষও হত্যা করে থাকি। অনেক অনেক আগে এই হত্যার প্রয়োজনীয়তা বলিদানের মাধ্যমে সম্পাদন করা হতো। কিন্তু এখন সমাজজীবনের অনুষঙ্গগুলো হত্যাকে অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছে। সংহারকে আমরা দোষ হিসেবে সাব্যস্ত করে শাস্তি দিই! কিন্তু এই প্রাকৃতিক ও স্বেচ্ছাচারী প্রবৃত্তির কাছে নিজেকে সমর্পণ না করে আমরা থাকতে পারি না। তাই বিভিন্ন সময়ে আমরা যুদ্ধে লিপ্ত হই, যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা এই প্রবৃত্তির খোলস হতে নিজেদেরকে মুক্ত করি। তখন একটা জাতি অপর একটা জাতিকে পুরোদমে জবাই করে দেয়। এটা রক্তের একটা উৎসব, মানে রক্তের হোলি খেলা; এটা এমন এক উৎসব যা সেনাবাহিনীকে উন্মত্ত করে দেয় এবং বাতির আলোয় গণহত্যার উত্তেজনাপূর্ণ গল্প পাঠরত বেসামরিক লোকজন-নারী-পুরুষ এমনকি শিশুদেরকেও উত্তেজিত করে তোলে।

যে কেউ ভাবতে পারেন, যারা এসব খুন-খারাবির সাথে সম্পৃক্ত তারা ঘৃণিত। না, তা মোটেও নয়। তারা পরিপূর্ণ সম্মানিত। তারা সোনাদানা ও উজ্জ্বল পোশাকে সজ্জিত থাকে, তাদের মাথায় পালকখচিত মুকুট আর বক্ষবন্ধনীতে থাকে বিচিত্র রঙের অলংকার। তাদেরকে ক্রুশচিহ্ন, পদক-পুরস্কার ও যাবতীয় খেতাবে ভূষিত করা হয়। তারা গর্বিত ও সম্মানিত নারীকুলের ভালোবাসাপ্রাপ্ত হয়, জনতা তাদের নিয়ে উল্লাসধ্বনি করে শুধুমাত্র এই কারণে যে, তাদের একমাত্র লক্ষ্যই হচ্ছে মানুষের রক্তপাত ঘটানো। তারা মৃত্যুর সরঞ্জাম টানতে টানতে রাস্তা ধরে এগিয়ে যায়, কালো পোশাক পরিহিত পথিকেরা ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকায় তাদের দিকে। তাই প্রকৃতির মহান নিয়ম হচ্ছে হত্যা যা অস্তিত্বের সমূলে বিরাজমান থাকে। হত্যার চেয়ে প্রকৃতিতে সুন্দর ও সম্মানিত আর কিছুই নেই।

৩০ জুন : হত্যাই প্রকৃতির নিয়ম কারণ প্রকৃতি চিরন্তন তারুণ্যকে ভালোবাসে। মনে হয় প্রকৃতি তার সকল অবচেতন কর্মের মধ্য দিয়ে চিৎকার করছে, ‘দ্রুত, ত্বরিত, অতি সত্বর! তাড়াতাড়ি শেষ করে দাও।’ যতই সে ধ্বংস করবে, ততই সে নতুন সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে।

২ জুলাই : মানব অস্তিত্ব—মানব অস্তিত্ব কী? ভাবনা দ্বারা এটি প্রতীয়মান হয়, মানব অস্তিত্ব হচ্ছে সবকিছুর প্রতিফলন; স্মৃতিশক্তি ও বিজ্ঞান দ্বারা প্রতীয়মান হয়, মানব অস্তিত্ব হচ্ছে মহাজগতের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ, কাল-কালান্তরে যে অস্তিত্বের ইতিহাস বিবৃত করে যায় মহাজগৎ, মানব অস্তিত্ব হচ্ছে জাতি ও জাগতিক অনুষঙ্গের দর্পণ, প্রতিটি মানব অস্তিত্বই বিশাল বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডের ভেতর হয়ে ওঠে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র।

৩ জুলাই : হত্যা অবশ্যই আনন্দদায়ক, বৈচিত্র্যময় ও পরিপূর্ণ প্রাণবন্ত; একটা জীবন্ত, চিন্তাশীল অস্তিত্বের সামনে দাঁড়ানো, সে অস্তিত্বে একটা ছিদ্র তৈরি করা, একটা ছোট্ট ছিদ্রমাত্র—এর বেশি কিছু নয়, লাল একটা জিনিস যা রক্ত নামে অভিহিত, যা প্রাণ সঞ্চার করে; নিশ্চল-শীতল-জড় ভাবনায় অক্ষম এক স্তূপ মাংসপিণ্ড যা একটু আগেও প্রাণবন্ত ছিল, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সত্যিই আনন্দদায়ক।

৫ আগস্ট : আমি এমন একজন ব্যক্তি যে কিনা বিচারকার্য করে, লোকজনকে দোষী সাব্যস্ত করে, মৌখিক আদেশে হত্যা করে আমার পুরো জীবনটা কাটিয়েছি। যারা অন্যকে ছুরি মেরে হত্যা করেছে, আমি তাদেরকে গিলোটিনে হত্যা করেছি। আমি, হ্যাঁ আমিই, এই আমিই যখন যাকে ইচ্ছে হয়েছে, হত্যা করেছি, আমি—আমি—হ্যাঁ, আমিই—এই কাজ করেছি, কেইবা এটা জানতে পেরেছে?

১০ আগস্ট : কেইবা জানতে পেরেছে আমার এসব খুনের কথা? আমাকে, এই আমাকে কেইবা সন্দেহ করতে পেরেছে বিশেষত যখন কাউকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহবোধ হয়নি? যখন কাউকে হত্যার জন্যে আমি পছন্দ করেছি?

১৫ আগস্ট : অবশেষে হত্যার সেই প্রলোভন আমার কাছে ধরা দেয়। এই প্রলোভন আমার সমগ্র সত্তাকে আন্দোলিত করে, হত্যার আকাঙ্ক্ষায় আমার হাত কেঁপে ওঠে।

লোমে ঢাকা পাখিটির শরীর ছিল উষ্ণ। আমি আমার কক্ষে চলে গেলাম। তারপর ক্রমাগত পাখিটির গলায় শক্ত করে টিপে ধরতে থাকলাম, পাখিটির হৃৎস্পন্দন বাড়তে থাকল, আরও বাড়তে থাকল; এটি খুবই নৃশংস এবং একই সাথে রোমাঞ্চকরও ছিল।

২২ আগস্ট : আমি লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। শুরুতে বিষয়টা পরখ করার জন্যে আমি একটা ছোট্ট প্রাণীকে হত্যা করলাম। আমার চাকর জিনের একটা সোনালি রঙের গানের পাখি ছিল। পাখিটিকে খাঁচায় পুরে বারান্দায় ঝুলিয়ে রেখেছিল সে। একটা সংবাদ নিয়ে তাকে আমি বাইরে পাঠালাম, আর তারপর আমি পাখিটাকে হাতে নিলাম। হ্যাঁ, পাখিটাকে আমার হাতে নিয়েছিলাম এবং সেখানে আমি তার হৃৎস্পন্দন অনুভব করছিলাম। লোমে ঢাকা পাখিটির শরীর ছিল উষ্ণ। আমি আমার কক্ষে চলে গেলাম। তারপর ক্রমাগত পাখিটির গলায় শক্ত করে টিপে ধরতে থাকলাম, পাখিটির হৃৎস্পন্দন বাড়তে থাকল, আরও বাড়তে থাকল; এটি খুবই নৃশংস এবং একই সাথে রোমাঞ্চকরও ছিল। আমি এটিকে প্রায় শ্বাসরোধ করে মেরেই ফেলছিলাম, কিন্তু আমি রক্তের দেখা পেলাম না।

আমি কাঁচি নিলাম, ছোটো ফলার কাঁচি, এবং খুব ঠান্ডা মাথায় তিনটি পোঁচে পাখিটির গলা কেটে ফেললাম। সে তার ঠোঁট হাঁ করল এবং আমার হাত থেকে রেহাই পাবার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করল। কিন্তু আমি এটিকে ধরে রাখলাম, আহ্, আমি এটিকে ধরে রাখলাম—আমি যদি একটা পাগলা কুকুরকে এভাবে ধরে রাখতে পারতাম এবং এমন রক্তের নির্গমনের ধারা দেখতে পেতাম।

একজন খুনি যা করে এরপর আমি তা-ই করলাম—একেবারেই একজন প্রকৃত খুনির মতো। কাঁচি ধুয়ে ফেললাম এবং তারপর হাত ধুয়ে নিলাম। এরপর পানি ছিটিয়ে দিলাম, সবশেষে মৃত পাখির শরীরটি নিয়ে বাগানে গেলাম এবং পুঁতে ফেললাম। একটা স্ট্রবেরি গাছের তলে এটিকে পুঁতে রাখলাম আমি। এটাকে আর কখনোই খুঁজে পাওয়া যাবে না। এই গাছটা থেকে আমি প্রতিদিন একটা করে স্ট্রবেরি খাই। যখন কেউ জেনে যায় সে কীভাবে জীবনকে উপভোগ করবে, তখন সে কীভাবে জীবনকে উপভোগ করে!

আমার চাকরটি কান্নাকাটি করল; সে ভেবেছিল তার পাখিটি উড়ে গেছে। কীভাবে সে আমাকে সন্দেহ করবে? আহ্! আহ্!
২৫ আগস্ট : আমি অবশ্যই একটা মানুষ হত্যা করব! আমি অবশ্যই—

৩০ আগস্ট : মানুষ হত্যার কাজটাও হয়ে গেল। কিন্তু কী একটা ছোট্ট মানুষ! আমি ভের্নেস পর্বতে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। আমি কিছুই ভাবছিলাম না, বলতে গেলে একেবারেই কিছু না। রাস্তায় একটা শিশু ছিল, ছোট্ট শিশুটা রুটি ও মাখনের মিশ্রিত একটা চিলতে খাচ্ছিল।

আমাকে অতিক্রম করার সময় সে থেমে গেল এবং বলল, ‘শুভ-দিন, মি. প্রেসিডেন্ট।’

আর আমার মাথায় চিন্তাটা ঢুকে গেল, ‘আমি তো তাকে হত্যা করতে পারি?’

আমি তাকে প্রত্যুত্তর করলাম, ‘তুমি কি একা, বাছা?’

‘জি, জনাব।’

‘বনে একাই ঘুরতে এসেছ?’

‘জি, জনাব।’

তাকে হত্যা করার চিন্তা আমাকে মদের মতো নেশাগ্রস্ত করে তুলল। আমি তাকে খুব শান্তভাবে পর্যবেক্ষণ করলাম। মনে হলো সে দৌড়ে চলে যাচ্ছিল। হঠাৎ আমি তাকে পাকড়াও করলাম এবং গলা চেপে ধরলাম। আতঙ্কিত চোখে শিশুটি আমার দিকে তাকাল—একেবারেই আতঙ্কিত চোখে। সে তার ছোট্ট হাত দিয়ে আমার হাতের কব্জিতে ধরল এবং তার দেহ অগ্নিকুণ্ডের ওপর ঘুরতে থাকা পালকের মতো শূন্যে পাক খেতে লাগল। তারপর তার নড়াচড়া থেমে গেল। একটা গর্তে তার মৃতদেহটা ছুড়ে ফেললাম এবং তার ওপর কিছু আগাছা ছড়িয়ে দিলাম। বাড়ি ফিরে এলাম এবং ভালোভাবে ভোজন সেরে নিলাম। কী ছোটোই না ছিল শিশুটি! সন্ধ্যায় আমি খুবই উৎফুল্ল হলাম, আমার শরীরে একটা দ্যুতি খেলে গেল, আমি পুনরায় তারুণ্য লাভ করলাম। আমি একটা বৈনয়িক সন্ধ্যা কাটালাম। সকলেই আমাকে বিদগ্ধ হিসেবে দেখতে পেল। কিন্তু আমি রক্ত দেখতে পাইনি! আমি শান্ত।

৩১ আগস্ট : মৃতদেহটি উদ্ধার হয়েছে। পুলিশ হন্তারককে খুঁজছে। আহ্! আহ্!

১লা সেপ্টেম্বর : দুজন ভবঘুরেকে আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণের অভাব রয়েছে।

২রা সেপ্টেম্বর : শিশুটির বাবা-মা আমার সাথে সাক্ষাৎ করল। তারা কান্নাকাটি করল। আহ্! আহ্!

৬ অক্টোবর : হত্যার কোনো রহস্যই উদ্‌ঘাটিত হয়নি। কিছু ভ্রাম্যমাণ ভবঘুরেই এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়ে থাকবে। আহ্! আহ্! আমি যদি হত্যার সময় রক্তধারা দেখতে পেতাম, মনে হয় আমি এখন শান্ত থাকতে পারতাম। আমার হত্যার মূল আকাঙ্ক্ষাই হচ্ছে রক্ত; এটা যেন কুড়ি বছরের এক তরুণের কামোচ্ছ্বাস।

২০ অক্টোবর : তারপর আরেকবার, আরেকটি হত্যাকাণ্ড। সকালের নাশতার পর নদীর ধারে হাঁটছিলাম। দেখলাম একটা গাছের তলায় একজন জেলে ঘুমোচ্ছে। তখন দুপুর বেলা। কাছেই আলু খেতে পড়ে ছিল একটা কোদাল, খুব স্পষ্টরূপে যেন সে আমার জন্যেই অপেক্ষা করছিল।

তারপর এটিকে ভারোত্তোলনের মতো করে ওপরের দিকে তুললাম এবং একটা আঘাতেই তার মাথাটা দ্বিখণ্ডিত করে ফেললাম। ওহ্! গোলাপি-রঙা রক্ত। রক্তের ধারা ধীরে ধীরে নদীর জলের দিকে গড়িয়ে যেতে লাগল। বড়ো বড়ো পা ফেলে আমি ফিরে এলাম।

আমি কোদালটা হাতে তুলে নিলাম। কোদালটা নিয়ে ফিরে গেলাম জেলেটির কাছে। তারপর এটিকে ভারোত্তোলনের মতো করে ওপরের দিকে তুললাম এবং একটা আঘাতেই তার মাথাটা দ্বিখণ্ডিত করে ফেললাম। ওহ্! গোলাপি-রঙা রক্ত। রক্তের ধারা ধীরে ধীরে নদীর জলের দিকে গড়িয়ে যেতে লাগল। বড়ো বড়ো পা ফেলে আমি ফিরে এলাম। যদি আমাকে কেউ দেখে ফেলত! আহ্! আহ্! চমৎকার একটা খুন করেছি আমি।

২৫ অক্টোবর : জেলের হত্যাকাণ্ডটি ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। তার যে ভাইপো মাছ ধরত তার সাথে, এই হত্যাকাণ্ডে তাকে অভিযুক্ত করা হলো।

২৬ অক্টোবর : তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট নিশ্চিত করলেন, জেলের ভাইপোটি এই খুনের হোতা। শহরের সবাই এ কথা বিশ্বাস করল। আহ্! আহ্!

২৭ অক্টোবর : ভাইপোটি খুবই দুর্বল সাক্ষী হাজির করল। সে ঘোষণা করে, হত্যাকাণ্ডের সময় সে রুটি ও মাখন কিনতে গ্রামে গিয়েছিল। সে শপথ করে বলেছে, তার অনুপস্থিতিতেই তার চাচাকে হত্যা করা হয়েছে। কে এই কথা বিশ্বাস করবে?

২৮ অক্টোবর : ভাইপোটির নিজের স্বীকারোক্তি ছাড়া সবকিছুই তার বিপক্ষে গেল, তারা ছেলেটিকে ধীরে ধীরে আরও কোণঠাসা করে তুলল। আহ্! আহ্!

১৫ নভেম্বর : ভাইপোটির বিরুদ্ধে অখণ্ডনীয় প্রমাণ পাওয়া গেল। সে তার চাচার একমাত্র উত্তরাধিকার ছিল। সুতরাং এটি তারই কাজ। বিচারের এই অধিবেশনে আমি নেতৃত্ব দেই।

২৫ জানুয়ারি : মৃত্যুদণ্ড! মৃত্যুদণ্ড! মৃত্যুদণ্ড! আমি তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলাম। আহ্! আহ্! অ্যাডভোকেট জেনারেল একজন ফেরেশতার মতো কথা বললেন। আহ্! আহ্! তারপর আরেকটা খুন। আমি তার মৃত্যুদণ্ড দেখতে যাব।

১০ মার্চ : এই খুনটাও সম্পন্ন হয়ে গেল। আজ সকালেই তাকে গিলোটিনে হত্যা করা হয়েছে। সে খুব ভালোভাবেই মারা গেছে! খুব ভালোভাবে! তার খুন আমাকে খুবই আনন্দ দিয়েছে। একজন মানুষের কাটা মাথা দেখাটা সত্যিই অসাধারণ।

এবার আবার অপেক্ষা। আমি অপেক্ষা করতে পারি। আরেকটাকে পাকড়াও করার আগে এই সামান্য অপেক্ষাটুকু আমি নিতেই পারি।

পাণ্ডুলিপির আরও অনেকগুলো পৃষ্ঠা বাকি রয়ে গেছে নতুন কোনো খুনের বর্ণনা ছাড়াই।

যে সকল মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে এই ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞের কাহিনি উপস্থাপন করা হয়, তারা ঘোষণা করেন যে, এই বিশ্বজগতে এ রকম অনেক অনুদ্ঘাটিত উন্মাদ রয়েছে যারা যতটা না দক্ষ ও বুদ্ধিমান, ততটা ভয়াবহ প্রকৃতির হিসেবে ভীতিযোগ্যও।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। জন্ম ১৯৮৪ সালের ১১ মার্চ, চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলাধীন বলশীদ গ্রামে। ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে ইংরেজি প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন। নিয়মিত লিখছেন জাতীয় দৈনিক ও বিভিন্ন সাময়িকীতে। ওয়েবম্যাগ তীরন্দাজ-এর সহযোগী সম্পাদক। লেখালেখির স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন নাগরিক বার্তা লেখক সম্মাননা, নতুন কুঁড়ি লেখক সম্মাননা, ফরিদগঞ্জ লেখক ফোরাম পদক (প্রবন্ধে), ছায়াবানী মিডিয়া কমিউনিকেশন লেখক সম্মাননাসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। প্রকাশিত অনুবাদগ্রন্থ মধ্যপ্রাচ্যের সমকালীন গল্প (মাওলা ব্রাদার্স, বইমেলা ২০১৯), দশ নোবেলজয়ী লেখকের সাক্ষাৎকার (পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি., বইমেলা-২০১৮) ও কাব্যগ্রন্থ স্বপ্নের শঙ্খচিল (২০১৪)।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।