রবিবার, জুন ২৩

জান্নাতুল নাঈম পিয়াল অনূদিত এ. আর. খাতুনের : দাদিমার গল্প

0

‘দাদিমা, আজ আমাদেরকে একদম নতুন একটা গল্প শোনাও না!’

‘বাছারা, তোমাদেরকে তো আমি আমার ঝুলির সব গল্পই শুনিয়ে ফেলেছি। এখন আবার নতুন একটা গল্প আমি কই খুঁজে পাই, বলো তো!’

‘না, না, দাদিমা! এসব বললে হবে না। আজকে একটা গল্প না বললে তোমাকে আমরা ছাড়বই না! দেখো, সাফিয়া আর রোকেয়াও চলে এসেছে। এখন আমরা পাঁচজন। কী মজা হবে তোমার গল্প শুনতে!’

‘হ্যাঁ, দাদিমা,’ গলা মেলাল রোকেয়া ও সাফিয়াও। ‘আমরা তো রোজ রোজ এ বাড়িতে আসি না। শুধু তোমার নাতনিরাই তোমার সব গল্প শুনেছে। আমরা শুনেছি মাত্র অল্প কিছু। আজ তোমাকে কোনোমতেই ছাড়ছি না।’

দাদিমা বলল, ‘বাছারা, আমি একটা গল্প শুরু করে শেষ করতে পারি না, তোমরা আজব আজব সব প্রশ্ন শুরু করে দাও। এভাবে গল্প বলে কোনো মজা নেই। গল্প বলতে গেলে শ্রোতাদেরকেও সেটা মন দিয়ে শুনতে হবে, ঠিক জায়গামতো প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে।’

‘দাদিমা, আমাদের পরীক্ষা তো শেষ। এখন আর আমাদের রাত জাগতে কোনো সমস্যা নেই। আমরা মাঝরাত অবধিও জেগে থেকে তোমার গল্প শুনতে রাজি। আর জায়গামতো, ঠিকঠাক প্রতিক্রিয়া দেখাতেও প্রস্তুত।’

এ কথা শুনে হাসি ফুটল দাদিমার মুখে।

‘ঠিক আছে, মেয়েরা। তোমরা তো এতদিনে আমার ঝুলিতে থাকা সব রাজা-রানি, দৈত্য-দানোর গল্পই শুনে ফেলেছ। আজ তোমাদেরকে আমি বলব একদম সাধারণ একজন মানুষের কথা। ঠিক আমাদের মতোই সেই মানুষটা। তবে, এই গল্পটা কেবল মেয়েদের জন্য, ছেলেদের জন্য নয়।’

‘ঠিক আছে, মেয়েরা। তোমরা তো এতদিনে আমার ঝুলিতে থাকা সব রাজা-রানি, দৈত্য-দানোর গল্পই শুনে ফেলেছ। আজ তোমাদেরকে আমি বলব একদম সাধারণ একজন মানুষের কথা। ঠিক আমাদের মতোই সেই মানুষটা। তবে, এই গল্পটা কেবল মেয়েদের জন্য, ছেলেদের জন্য নয়।’

‘এই মুহূর্তে এখানে কোনো ছেলে নেই তো!’ বলে উঠল মেয়েদের মধ্যে একজন।

‘শুরু করে দাও, দাদিমা!’

দাদিমা তার সুপারির কৌটো খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করল, ‘তো মেয়েরা, বলো তো পাকিস্তানের জন্ম কবে হয়েছে?’

এ তো খুবই সহজ প্রশ্ন! তাই সমস্বরে বলে উঠল সবগুলো মেয়ে, ‘১৯৪৭ সালে!’

তারপর একজন বলল, ‘তুমি কি ভেবেছ, আমরা জানি না যে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ আমাদের জাতির পিতা?’

‘আচ্ছা বেশ। এবার বলো তো, তিনি কবে মারা যান?’

‘১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৮,’ আবারো সমবেত কণ্ঠে সঠিক উত্তর দিল মেয়েরা।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল দাদিমা।

‘দুঃখের বিষয়, এই দেশটাকে পাপড়ি মেলতে দেখে যেতে পারেননি তিনি। তার চলে যাওয়াতে এতিম হয়েছে মাত্র এক বছরের একটা দুধের শিশু। আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন! তার রহমত আমাদের খুব দরকার।

‘তো যা-ই হোক, বাছারা, এখন আমাকে বলো : পাকিস্তানে তোমরা কীভাবে এসেছ? ট্রেনে চেপে নাকি প্লেনে উড়ে?’

‘ওহ দাদিমা! তুমি তো সবই ভুলে গেছ! আমাদের জন্মই তো এদেশে।’

দাদিমার চোখ-মুখ থেকে ঝরে পড়ল প্রবল হতাশার অভিব্যক্তি।

‘হায় রে আমার স্মৃতিশক্তি! সত্যি কথা বলতে কী, আমার মনে হয় ভীমরতি ধরছে। আমি এতক্ষণ তোমাদের ভাইয়ের কথা ভাবছিলাম, যার জন্ম ভারতে। আমরা প্লেনে উড়ে এসেছি। কিন্তু হাজার হাজার মানুষ এসেছে রেলরোডে। স্পেশাল ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেই ট্রেনে গরু-ছাগলের মতো চাপানো হয়েছিল অজস্র মানুষকে।’

সেই দুঃসহ স্মৃতি মনে করে আরও একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল দাদিমা।

‘কিন্তু এটা তো কোনো রূপকথার গল্প না, দাদিমা। তুমি স্রেফ তোমার স্মৃতি হাতড়ে যা মনে পড়ছে তাই বলছো!’

‘তাতে কী হয়েছে! পুরনো স্মৃতিরাই তো একসময় গল্পে রূপ নেয়! যেমনটা বলছিলাম, ওই স্পেশাল ট্রেনের একটাতে চেপেই পাকিস্তানে এসেছিল সালেকা বেগম।’

দাদিমার কথা শেষ হওয়ার আগেই হাহা হিহি শুরু হয়ে গেল মেয়েদের মধ্যে।

‘কী মজার নাম! কারো নাম কি সালেকা বেগম হতে পারে!’

‘নাহ, তার নাম ছিল একেবারে ভিন্ন কিছু। কিন্তু আমি তার এই নামটা বললাম তার চরিত্রের বিশুদ্ধতা, বিচক্ষণতার জন্য। যখন আমরা ভারতে থাকতাম, সেই তখন থেকেই তাকে আমি চিনি। এক মহল্লাতেই ছিল আমাদের বাড়ি। সে আমাকে ডাকত খালা বলে। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা হয়তো খুব ভালো ছিল না, কিন্তু তারা বেড়ে উঠেছিল একটা সম্ভ্রান্ত, রুচিশীল পরিবারে। তার স্বামী শহীদুল্লাহ কাজ করত কোনো একটা অফিসে। বেতন ছিল মাসে ষাট রুপি…’

আবারো হাসতে শুরু করল মেয়েরা।

এবার যেন খানিকটা বিরক্তই হলো দাদিমা। ‘এখন হাসছ কেন তোমরা?’

‘কী সব মান্ধাতার আমলের নাম আউড়াচ্ছ তুমি, দাদিমা! শহীদুল্লাহ! এই নামও হয় বুঝি?’

‘নামে কী আসে যায়? তোমাদের যে নামে খুশি ডাকতে পারো তাকে। কিন্তু সত্যিকার নাম আমি ফাঁস করব না। সেটার কোনো দরকার নেই। সে পাকিস্তানে আসার পথে শহিদ হয়েছিল। তাই আমি তাকে এই নাম দিয়েছি।’

‘ওহ দাদিমা! তুমি শুধু ছোটো ছোটো তথ্য দিয়ে যাচ্ছ! এটা তো কোনো গল্প হচ্ছে না!’

‘তাহলে গল্প বলতে তোমরা কী বোঝো? গল্পের মাথায় কি শিং গজায় নাকি?’ ধমকে উঠল দাদিমা। ‘আমি তোমাদেরকে একটা সত্যি ঘটনা বলছি। এতদিন তোমরা অনেক আজগুবি, মিথ্যে কাহিনি শুনেছ। এখন যদি এই সত্যি ঘটনায় তোমাদের আগ্রহ না থাকে, তাহলে যাও, শুয়ে পড়ো।’

‘আচ্ছা আচ্ছা,’ সবগুলো মেয়ে ফের একত্রে বলে উঠল। তাদের কণ্ঠে বিবর্ণতার ছাপ স্পষ্ট। ‘এরপর কী হলো?’

‘কেউ জানত না পরের পনেরো বা ষোলো বছর সালেকা বেগম কোথায় ছিল। আমি তো ভেবেছিলাম আমরা তাকে হারিয়েই ফেলেছি। কিন্তু দিনকয়েক আগে, একটা গাড়িতে চড়ে সে দেখা করতে আসে আমার সঙ্গে। আমি প্রথম দেখায় তাকে চিনতে পারিনি। তার পরনে ব্ল্যাক লেডি হ্যামিল্টনের বোরকা, সাদা ক্রেপের সালোয়ার, নীল-সাদা শিফনের স্কার্ফ, কানে সোনার দুল, গলায় সোনার ভারি লকেট, দুই হাতে আটটা করে সোনার চুড়ি।

‘বরাবরই সে দেখতে খুব সুন্দরী। কিন্তু আমি যখন তাকে চিনতাম, ভারতে থাকতে, তখন অনিশ্চয়তা আর উদ্বেগ তার চেহারার সব সজীবতা কেড়ে নিয়ে মলিন করে তুলেছিল তাকে। কিন্তু সেদিন যখন দেখলাম, মনে হচ্ছিল সে যেন রক্তবীজের মতো জ্বলজ্বল করছে। আমার সামনে এসেই সে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি তো তাকে হঠাৎ দেখে পুরো হকচকিয়ে গেছি।

‘সে তখন প্রায় কেঁদে উঠল, ‘আমাকে চিনতে পারছেন না, খালা?’ আমি আর কী জবাব দেব? আমি আসলেই তাকে চিনতে পারছিলাম না। তাই বিড়বিড় করে বলতে শুরু করলাম, বয়স হয়ে যাওয়ায় স্মৃতিশক্তি কেমন লোপ পেয়েছে। তারপর তাকে বললাম একটা কোনো সূত্র ছাড়তে যেন আমি তাকে চিনতে পারি।

‘যখন সে আমাকে তার নিজের ও স্বামীর নাম জানাল, আমি তো আরও বেশি হতভম্ব হয়ে পড়লাম। তার ভিতর যে এতটা পরিবর্তন এসেছে, তা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। আমি যে সালেকা বেগমকে একসময় চিনতাম, সে তো মোটা সুতির বোরকা পরত। তার সব জামাকাপড়ই ছিল অত্যন্ত গড়পড়তা মানের। কোনো বিশেষ উপলক্ষ্য এলে সে বিয়ের সময় বাপের বাড়ি থেকে দেওয়া পোশাকগুলো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পরত। যার স্বামীর বেতন মাসে মোটে ষাট রুপি, তার থেকে এর বেশি আর কী-ই বা আশা করা যায়! স্বামী, দুই সন্তান আর নিজেকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। কিন্তু সেই সংসারেও বিয়ের পর থেকে একটা কাজের লোক রাখবার সঙ্গতি কখনো হয়নি তার। তাই আমি হাঁ করে চেয়ে রইলাম তার দিকে, তার ঝলমলে পোশাক-পরিচ্ছদের দিকে। নিশ্চয়ই খুব বড়োলোক কারো সঙ্গে বিয়ে হয়েছে, ভাবলাম আমি…’

‘কিংবা গুপ্তধন ঠাসা কোনো পোড়োবাড়ির সন্ধান পেয়েছে,’ মেয়েদের মধ্যে একজন বলে বসল।

‘না,’ দাদিমা বলল। ‘তোমরা কি চুপ করে শুনবে সালেকা বেগমের সঙ্গে আমার কী কথোপকথন হলো?’

মেয়েদেরকে নীরব দেখে দাদিমা বলে চলল, “সালেকা বেগম আমাকে বলল, ‘খালা, আপনি আসলেই আমাকে চিনতে পারছেন না?’ কিন্তু তোমরাই বলো, বাছারা। আমি কীভাবে তাকে চিনব? পুরো ব্যাপারটাই তো আমার জন্য বিস্ময়কর। তার স্বামী কি খুব ভালো কোনো চাকরি পেয়েছে?”

মেয়েদেরকে নীরব দেখে দাদিমা বলে চলল, “সালেকা বেগম আমাকে বলল, ‘খালা, আপনি আসলেই আমাকে চিনতে পারছেন না?’ কিন্তু তোমরাই বলো, বাছারা। আমি কীভাবে তাকে চিনব? পুরো ব্যাপারটাই তো আমার জন্য বিস্ময়কর। তার স্বামী কি খুব ভালো কোনো চাকরি পেয়েছে?”

মেয়েরা আবার থামাল দাদিমাকে।

‘একটু আগেই তো বললে সে নিশ্চয়ই কোনো বড়োলোককে বিয়ে করেছে। তাহলে আবার তুমি কেন জানতে চাইবে তার স্বামী বড়ো কোনো চাকরি পেয়েছে কি না?’

দাদিমা কিঞ্চিৎ নাক কুঁচকাল। ‘মেয়েরা, খবরদার আমার ভুল ধরতে এসো না। আসলে, আমি তো শুনেছি তার স্বামী খুন হয়েছে। কিন্তু পরের মুখে শোনা কথার পুনরাবৃত্তি করি কীভাবে? তাই এভাবে প্রশ্ন করেই আমি প্রকৃত সত্যিটাকে টেনে বের করতে চাই।’

‘তা, সালেকা বেগম কি তোমাকে সেই সত্যিটা জানাল?’ জানতে চাইল মেয়েরা।

“সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, ‘খালা, আপনি জানেন না? আমার স্বামী তো পাকিস্তানে আসার পথেই শহিদ হয়েছে। আমি এদেশে পা রেখেছি আমার দুই সন্তানকে নিয়ে। ছেলেটার বয়স তখন দশ, আর মেয়েটার আট। অনেকদিন ধরে আমরা ক্যাম্পে থেকেছি। খেয়েছি কমিউনিটি কিচেন থেকে। গেরস্থালীর জিনিসপত্র যা ছিল, সবই তো ভারতে রেখে এসেছি। থাকার মধ্যে ছিল শুধু একটা প্লেট, একটা গ্লাস, আর এক টুকরো কয়েন। আল্লাহর উপর ভরসা করা ছাড়া কোনো উপায়ই আমার ছিল না। বিয়ের সময় পাওয়া গহনাগুলো তো আগেই বেচে দিয়েছি। সেখান থেকে অবশিষ্ট ছিল শুধু একজোড়া কানের দুল। আপনি তো জানেনই, দুঃসময় যখন আসে, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়, যে যার পথ দেখে। কয়েকদিন পর আমি ভাবলাম, আর কতকাল এখানে বসে থাকব দানছত্রের আশায়? নিজের লড়াই আমাকে নিজেকেই লড়তে হবে। নামতে হবে পৃথিবীর পথে। তাই আমি সাহস সঞ্চয় করলাম।

আমার কাছে লাগেজ বলতে কিছুই ছিল না। শুধু এইড এজেন্সি থেকে পাওয়া একটা কম্বল। আমি আমার মেয়ের হাত ধরলাম। আর ছেলের কাঁধে চাপিয়ে দিলাম কম্বলটা। তারপর আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করলাম হাঁটা। আগে কোনোদিনই এভাবে রাস্তায় বের হইনি। তাই জানি না, কোন পথে হাঁটতে হবে। একে-ওকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে থাকলাম পথের দিশা। বিশ্বাস করুন খালা, হাঁটতে হাঁটতে পায়ে কড়া পড়ে গেল আমার। বাচ্চা দুটোর অবস্থা তো আরও শোচনীয়।

আল্লাহর অশেষ রহমত, এক স্বর্ণকারের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল আমার। ৫০ রুপির বিনিময়ে কানের দুলজোড়া কিনে নিল সে। কী স্বস্তিটাই না তখন পেলাম, বলার মতো না। এদিকে স্বর্ণকার মানুষটা বেশ দয়ালু। আমাদের দুরবস্থা দেখে বসতে বলল সে। এক কর্মচারীকে পাঠাল আমাদের জন্য নান আর কাবাব কিনে আনতে। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি যদি চাও, তোমাকে আমি একটা কাজ জোগাড় করে দিতে পারি।’ আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। তারপর সে এক চাকরকে দিয়ে আমাকে পাঠাল এক মহিলার বাড়ি। কিন্তু আমার সঙ্গে দুই ছেলেমেয়েকে দেখেই নাক সিঁটকাল মহিলা। বলল, বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে কাজ করতে পারব না আমি। আরও জানাল, তার একটা কাজের মহিলার প্রয়োজন শুধু তাকে সাহায্য করার জন্য। মূল রান্না সে নিজেই করে, আর রুটিও আসে স্থানীয় বেকারি থেকে। তাই আমাকে মাসে ১০ রুপির বেশি দিতে পারবে না। কিন্তু আমি তো তাতেই রাজি!

সঙ্গে ৫০ রুপি থাকায় মনে বেশ বল পাচ্ছিলাম। ভাবছিলাম, খুব টিপেটুপে খরচ করলে বোধহয় মাসে কিছু সঞ্চয়ও থাকবে আমার। কিন্তু মূল সমস্যা হলো থাকার জায়গার। আমি গৃহকর্ত্রী মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম, তার বাড়িতে আমাকে অল্প খানিকটা জায়গা দেওয়া যাবে কি না। বিনিময়ে আমি রাত-দিন চব্বিশ ঘণ্টা তার সঙ্গে ছায়ার মতো থাকব, অতিরিক্ত বিভিন্ন কাজও করে দেব। কিন্তু সে প্রত্যাখ্যান করল আমার এই প্রস্তাব।

আমার সঙ্গে স্বর্ণকারের যে চাকরটা এসেছিল, সে বলল, ‘তুমি চিন্তা কোরো না, বোন। আমি কোথাও একটা থাকার বন্দোবস্ত করে দেবো তোমার। কাছেই একটা মন্দির আছে। অনেক মানুষ মাথা গুঁজেছে সেখানে। তুমিও নিশ্চয়ই একটা কোণে নিজের জন্য কিছুটা জায়গা পেয়ে যাবে।’ তাই খালা, আমি ওই মহিলার চাকরিটা নিয়ে নিলাম। থাকার ব্যবস্থা করতে চললাম সেই মন্দিরে। গিয়ে দেখি, লোকে গিজগিজ করছে জায়গাটা। তবু, আমার একটা থাকার ব্যবস্থা হয়ে গেল। অল্প একটু জায়গায় আমি আমার কম্বলটা বিছিয়ে দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে বসে পড়লাম। সারাদিন ঘোরাঘুরির পর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছিল আমার শরীর। তাই তাড়াতাড়ি কিছু খাবার জোগাড় করে, সেগুলো খাইয়ে ঘুম পাড়ালাম বাচ্চা দুটোকে। এদিকে আমি রাতের প্রায় অর্ধেকটা কেবল নিজের দুর্গতির কথা চিন্তা করে ফোঁপাতে থাকলাম। কারণ, আমি হয়তো জীবনের কঠিনতম পরিস্থিতিও পার করে ফেলেছি, তবু এই মন্দিরের পরিবেশ আমার জন্য নয়। পরদিন সকালে আমি বেরিয়ে পড়লাম। সেই মহিলার বাড়ি গিয়ে তার জন্য বাজার-সদাই করে আনলাম, বাসনকোসনও মেজে দিলাম।

এরপর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম নিজের থাকার ব্যবস্থা আমি নিজেই করব। এই বিশাল শহরে কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই কোনো জায়গা পাব আশ্রয় নেওয়ার। তাই ঘুরে বেড়াতে লাগলাম আমি। ওই এলাকায় কিছু বড়ো বড়ো ম্যানশন রয়েছে। লম্বা করে দম নিয়ে ঢুকে পড়লাম সেরকম একটা ম্যানশনে। বাচ্চাদের অবশ্য বাইরেই রেখে গেলাম। ভেতরে ঢুকে দেখতে পেলাম, ইতোমধ্যেই চারটে বাস্তুহারা পরিবার মিলে দখল করে রেখেছে ম্যানশনটা। তবে তাদেরকে মানুষ হিসেবে বেশ ভালো মনে হলো আমার। তাদেরকে আমার অবস্থার কথা খুলে বলে জানতে চাইলাম ওখানে কোথাও থাকা যাবে কি না। আমার কথা শুনে তারা খুবই কষ্ট পেল। আমাকে দারোয়ান বা চাকরদের লজটা দখল করতে বলল। এতেই যেন আমি আকাশের চাঁদ পেয়ে গেলাম হাতে। তাদেরকে ধন্যবাদ জানালাম, কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলাম আমার সৃষ্টিকর্তার প্রতিও। বাচ্চাদেরকে নিয়ে থাকতে শুরু করলাম ম্যানশনে।

ম্যানশনের বাকি চার পরিবারের কোনো চাকরবাকর ছিল না। তাই তারা আমাকে নিযুক্ত করল তাদের বাজার করে দেওয়ার জন্য। বিনিময়ে প্রতিটা পরিবার আমাকে দেবে মাসে পাঁচ রুপি করে। এভাবেই আগের ১০ আর এই ২০ মিলিয়ে মাসিক নিশ্চিত ৩০ রুপির বন্দোবস্ত হয়ে গেল আমার।

পরদিন আমি আমার ছেলেকে নিয়ে বাজারে গেলাম। সঙ্গে করে ইতোমধ্যেই আমার কাছে থাকা সেই ৫০ রুপি। আমি একটা খড়ের মাদুর, একটা মাটির পাত্র, আরেকটা পানি রাখার পাত্র, কিছুটা মসুর ডাল, মসলা আর রান্না করার হাতা কিনলাম। এছাড়া বাচ্চাদের এক সেট করে জামা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, সুই-সুতা, আর একটা কাঁচি কিনলাম। এগুলো কিনতেই আমার হাত থেকে ২০ রুপি বেরিয়ে গেল। বাকি সারাটা দিন আমি সেলাই করে গেলাম। সন্ধ্যায় হাতমুখ ধুয়ে বাচ্চাদের গোসল করিয়ে দিলাম। নিজেকে নিয়ে খুব বেশি ভাবলাম না; হাজার হোক, আমি তো এখন পরের বাড়ির চাকরানি ছাড়া কিছুই না!

পরদিন আমি বেরিয়ে পড়লাম নতুন আরও কাজের সন্ধানে। একটা চমৎকার ম্যানশন চোখে পড়ল আমার। ঢুকে পড়লাম সেটার ভেতর। ঢুকে দেখি, সেখানে এক বিশাল পরিবারের বাস। তাদের বাচ্চাকাচ্চাই পুরো এক ডজন। এই পরিবারটা অবশ্য স্থানীয়, এবং দেখে তাদেরকে যথেষ্ট অবস্থাসম্পন্ন বলেই মনে হলো। তাদের একজন রান্নার লোক ছিল বটে, তবে আরেকজন কাজের লোকও তারা খুঁজছিল।

পরদিন আমি বেরিয়ে পড়লাম নতুন আরও কাজের সন্ধানে। একটা চমৎকার ম্যানশন চোখে পড়ল আমার। ঢুকে পড়লাম সেটার ভেতর। ঢুকে দেখি, সেখানে এক বিশাল পরিবারের বাস। তাদের বাচ্চাকাচ্চাই পুরো এক ডজন। এই পরিবারটা অবশ্য স্থানীয়, এবং দেখে তাদেরকে যথেষ্ট অবস্থাসম্পন্ন বলেই মনে হলো। তাদের একজন রান্নার লোক ছিল বটে, তবে আরেকজন কাজের লোকও তারা খুঁজছিল। তাই সেখানে আমি মাসিক ১৫ রুপি বেতনের চাকরি পেয়ে গেলাম। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম আমি। এখন আমার কাজ দাঁড়াল পাঁচটা আলাদা পরিবারের জন্য, আলাদা আলাদা পরিমাণের মাংস ও অন্যান্য তরিতরকারি কেনা। মাঝেমধ্যে আমি কসাইকে অনুরোধ করতাম যেন খানিকটা বেশি মাংস দিয়ে দেয়। তাহলে ওই বাড়তি মাংসটা আমি নিজে নিয়ে বাচ্চাদের জন্য রাঁধা স্টুর ভেতর মিশিয়ে দিতে পারতাম।

ম্যানশনের বাসিন্দারা তাদের রান্নায় প্রচুর পরিমাণে মাখন ব্যবহার করত। তখন ছিল শীতকাল, তাই বাসনকোসনে অনেক চর্বি জমে যেত। আমি সেগুলোকে গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখতাম, যেন ঘি পানির উপরে ভেসে ওঠে। পরদিন সকালে আমি পুরু স্তরের এঁটো চর্বি সংগ্রহ করতাম, যা আমার ছেলেমেয়েদের জন্য রাঁধা স্টুতে ব্যবহার করতাম।”

এ পর্যায়ে দাদিমা বলল, “সালেকা বেগমের মুখে এসব বৃত্তান্ত শুনে আমার কেমন যেন লাগছিল। আমি বললাম, ‘এহহে, বাছা, তোমার ঘেন্না লাগত না?’ জবাবে সে বলল, ‘কেন খালা, ঘেন্না লাগার কী আছে? আপনি কি শোনেননি যে টানা তিনদিন অভুক্ত থাকলে হারাম খাবারও হালাল হয়ে যায়? আল্লাহর অশেষ রহমত, কারো সামনে হাত পেতে আমার নিজের কাছে নিজেকে ছোটো হয়ে যেতে হয়নি। যে দুর্বিষহ দিন আর রাত আমি কাটিয়েছি, আপনাকে কী বলব! আমি যেখানেই কাজ করতাম, সেখান থেকেই কিছু ফেলে দেয়া, জঞ্জাল খাবার কুড়িয়ে আনতাম। এমনকী তা শাকসবজির খোসা হলেও। আমি আমার মেয়েকে শিখিয়েছিলাম, কীভাবে ওগুলোকে পরিষ্কার করে সিদ্ধ করতে হয়। তারপর আমি যখন বাড়ি ফিরতাম, ওগুলোর সঙ্গে মরিচ, লবণ, রসুন আর এক চিমটি আমের গুঁড়ো মিশিয়ে, অল্প তেলে ভেজে ফেলতাম। কখনো কখনো আবার আমি মশুর ডাল বা মটর অনেক বেশি মসলা দিয়ে রান্না করতাম। মিষ্টি হিসেবে রুটির শুকিয়ে যাওয়া অংশকে পানিতে ভিজিয়ে রেখে সেটার সঙ্গে গুড় মিশিয়ে এক ধরনের পদ রান্না করতাম। সেটা খেতে এক কথায় অসাধারণ!’”

“আমি সালেকা বেগমকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এসব অদ্ভুত অদ্ভুত রান্নার কৌশল তুমি কোত্থেকে শিখেছ?’ জবাবে সে বলল, ‘বিপদে পড়লে মানুষ আপনাআপনি সব শিখে যায়, খালা! সাধারণ সময়ে একশোজন শিক্ষকও আপনাকে এগুলো শেখাতে পারবে না। তবে কথা একটাই, দারিদ্র্যের কাছে মাথানত করলে চলবে না, হাল ছেড়ে দেয়া যাবে না। এই জগতে টিকে থাকার জন্য যা যা সম্ভব তা-ই করতে হবে, এমনটাই ছিল আমার সংকল্প। যা-ই হোক, আমি আমার মতো করে পরিশ্রম করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু সবসময়ই একটা চিন্তা ছিল আমার ছেলেকে নিয়ে। কোনো কাজে ঢুকিয়ে দিতে পারছিলাম না ওকে।’

‘ওকে তুমি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দাওনি কেন?’ আমি জানতে চাইলাম।

‘খালা, ও ইতোমধ্যেই একবার কুরআন খতম দিয়েছিল। ক্লাস সিক্সে পড়ত। দিব্যি লিখতে-পড়তে পারত উর্দু। কিন্তু স্কুলে গিয়ে মাস্টারদের হাতে-পায়ে ধরে টিউশন ফি মওকুফ করা, তারপর বিভিন্ন জায়গা থেকে ধারদেনা করে বই কেনা– এই বিষয়গুলো আমি সমর্থন করি না। তাছাড়া, ছেঁড়া জুতো বা নোংরা জামাকাপড় দেখলেও তো ক্লাসের অন্য ছেলেরা হাসাহাসি করে, মজা করে। আমার ছেলেটা খুবই স্পর্শকাতর। আমি চাইনি ও কোনোভাবে নিজেকে অন্যদের চেয়ে নিচু ভাবুক, কিংবা অত অল্প বয়সেই ধনী-গরিবের মধ্যকার বৈষম্যকে অনুভব করুক। এতে ওর মন ভেঙে যেত। আজকালকার দিনে শিক্ষা মানে তো জ্ঞানার্জনও নয়। এটা নিছকই পয়সা রোজগারের একটা মাধ্যম। তাই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে, আমিও আমার ধ্যানজ্ঞান সঁপে দিলাম ওই একটাই কাজে– পয়সা কামানো। একজন গরিব ব্যক্তি, সে যত জ্ঞানীগুণীই হোক না কেন, সমাজে নিজের একটা জায়গা করে নিতে পারে না।

তো, যা বলছিলাম খালা, মাস শেষ হতে আমার হাতে বেতনের টাকা এলো। মাংসের কিমা দিয়ে সমুচা তৈরি করে আমি আমার ছেলের হাতে তুলে দিলাম। ও বিভিন্ন স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে ওগুলো বিক্রি করতে লাগল। এই জিনিস চোখের পলকে বিক্রি হয়ে যায়, আর আমিও শতভাগ লাভ করতে পারি। তাই আমি প্রতিদিনই আগেরদিনের চেয়ে বেশি সমুচা বানাতে থাকি। ওই যে কথায় আছে না, কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে, এই কথার হাতেনাতে প্রমাণ পাচ্ছিলাম আমরা।

মাস ছয়েক পর আমি একটা পুরনো ঠেলাগাড়ি জোগাড় করে ফেললাম সমুচা বিক্রির জন্য। ওই যে, যেগুলোতে করে চা বিক্রি করা হয়। সমুচা ভাজার জন্য একটা লোকও রাখলাম। সে ক্রেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে সমুচা ভেজে, গরম গরম সমুচা তুলে দিত তাদের হাতে। তাই এরপর আমার ছেলের কাজ অনেকটাই কমে গেল। ওর দায়িত্ব ব্যবসার দেখভাল করা, হিসেব রাখা, আর প্রতিদিন সন্ধ্যায় সব আয়ের টাকা আমার হাতে তুলে দেওয়া। এভাবে যখন আমি পাঁচশো রুপি জমিয়ে ফেললাম, তখন সমুচার সঙ্গে আরও কিছু আইটেম যোগ করলাম : পাকোড়া, কাবাব আর চাটনি। বিশ্বাস করুন খালা, একেকজন ক্রেতাই পুরো এক রুপি করে খরচ করত প্রতিবার। মিষ্টি হিসেবে এরপর আমি নারকেলের মোয়া আর পিঠা আনলাম, কারণ ওগুলো সহজে নষ্ট হয় না, একদিন বানিয়ে পরদিন বিক্রি করা যায়। বিক্রি বাড়তে দেখে আমি আরেক ধরনের কাবাবও আনলাম। আল্লাহর অশেষ কৃপা ছিল আমার উপর। তাই এক বছরের মধ্যে আমি নিজেই একটা দোকান ভাড়া নিয়ে সেটা চালাতে শুরু করলাম। ওই বিল্ডিংয়ের দ্বিতীয় তলায় বাথরুমসহ একটা ফ্ল্যাট ছিল। আমি ওটাও ভাড়া নিলাম নিজেদের থাকার জন্য। অন্য সব চাকরি ছেড়ে পুরো মনোযোগ দিলাম আমার দোকান সামলানোর কাজে।

খালা, অভাব কী জিনিস আমি নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছি। তাই দোকান দেওয়ার পর প্রথমেই যে কাজটা আমি করলাম তা হলো, একটা পুরনো ধাঁচের চুলা তৈরি করে ফেললাম। একজন রাঁধুনি নিয়োগ দিলাম, আর গরিবদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা মেনুর ব্যবস্থা করলাম। তাদের কাছ থেকে আমি শুধু রুটির দামই নিতাম। ডাল কিংবা ভাজি বিনে পয়সায় দিতাম। সপ্তাহে একদিন মাংসের তরকারি রান্না করতাম। ওই মাংসের ঝোল দিয়েও পরে আরও সাশ্রয়ী বিভিন্ন পদ তৈরি করতাম। মাত্র চার আনা দিয়েই যে কেউ ভরপেট খেতে পারত। তাই আমার দোকানটা অনেক ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করল।

আপনাকে কী আর বলব, খালা? আমার ছেলেটা তিন বছরের মধ্যেই ম্যাট্রিক পাশ করে ফেলল। ও সবসময়ই অনেক বুদ্ধিমান ছিল, পড়াশোনায়ও খুব মন ছিল। ক্লাস সিক্সে ওঠার পর কিছুদিন পড়াশোনা বন্ধ রাখতে হয়েছিল ঠিকই। একটা বছর গ্যাপও পড়েছিল। কিন্তু নিজের চেষ্টাতেই মাত্র দুই বছরে সেই গ্যাপ পূরণ করে দেয় ও।

আপনাকে কী আর বলব, খালা? আমার ছেলেটা তিন বছরের মধ্যেই ম্যাট্রিক পাশ করে ফেলল। ও সবসময়ই অনেক বুদ্ধিমান ছিল, পড়াশোনায়ও খুব মন ছিল। ক্লাস সিক্সে ওঠার পর কিছুদিন পড়াশোনা বন্ধ রাখতে হয়েছিল ঠিকই। একটা বছর গ্যাপও পড়েছিল। কিন্তু নিজের চেষ্টাতেই মাত্র দুই বছরে সেই গ্যাপ পূরণ করে দেয় ও। শুরু থেকেই যদি ওকে আমি স্কুলে যেতে দিতাম, আল্লাহই জানে কুসঙ্গে পড়ে কী কী বদভ্যাস গড়ে তুলত! আসলে, বাড়ন্ত বয়সে সব ছেলেরই বাবাকে দরকার হয় দিক-নির্দেশনার জন্য। আমি তো সারাদিন বাইরে বাইরেই থাকতাম। হয়তো দেখা যেত ও ওর বোনটাকে একলা ফেলে রাস্তায় গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে মার্বেল খেলছে, অথবা ঘুড়ি ওড়াচ্ছে…’

‘আমি তোমার সঙ্গে একমত, বাছা,’ আমি বললাম। ‘আগেকার দিনে মার্বেল খেলাকে কুনজরে দেখা হতো। কিন্তু এখন, নতুন নতুন সব স্কুলে, ছেলেপেলেদের মাঝে মার্বেল খেলা খুবই জনপ্রিয়। এমনকী ঘুড়ি ওড়ানোও। শুধু বাচ্চারাই না, সব বয়সী পুরুষরাই এখন এগুলো খেলার প্রতি পাগল।’ আমার কথা শুনে সালেকা বেগম বলল, ‘আপনি ঠিক বলেছেন, খালা। ঘুড়ি ওড়ানো অবসর কাটানোর জন্য বেশ ভালো একটা শখ। ধনীর দুলালদের জন্য সুন্দর খেলা। কিন্তু গরিব, হা-ভাতেদের জন্য নয়। তাদের কি এসব করা মানায়? এটা একরকম নেশার মতো। আমি অনেক ছেলেকেই দেখেছি এই নেশায় মত্ত হয়ে ক্লাসের অন্যদের বই-খাতা-পেন্সিল চুরি করছে… আল্লাহর রহমত, আমার বাচ্চারা এসব বাজে নেশায় পড়েনি। প্রতি রাতেই আমি ওদেরকে কুরআন-হাদিস থেকে বিভিন্ন বাণী পড়ে শুনিয়েছি, ওদেরকে বলেছি মিথ্যা বলা বা চুরি করা কত খারাপ।’”

“আমি সালেকা বেগমকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি এখনো ক্যাটারিংয়ের ব্যবসা চালাচ্ছ?’ জবাবে সে জানাল, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি আমার পরিশ্রমের ফল পেয়েছি। আল্লাহর রহমতে, পনেরো বছরের মধ্যে, আমার ছেলে নিজেই এখন একটা হোটেলের মালিক। সব খরচ-খরচা বাদ দিয়ে মাসে আমাদের তিন হাজার রুপি থাকে। আমি এখন ছেলেটার জন্য একটা যোগ্য পাত্রী খুঁজছি।’”

“শুনে আমি সালেকা বেগমের পিঠ চাপড়ে দিলাম। তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, ‘কী বিচক্ষণ মহিলাই না হয়ে উঠেছ তুমি! আগে যখন তোমাকে চিনতাম, তখন তো এগুলো বুঝতেই পারিনি।’ সে বলল, ‘খালা, এই পনেরো বছরে পৃথিবীর হালহকিকত দেখে আমার বোধোদয় হয়েছে, আমি অনেক শিক্ষার্জন করেছি। আমি এখন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে আজকের এই যুগে কেবল ধনীরাই সম্মানের যোগ্য। যখন আমি ছাউনির নিচে বাস করতাম, মাটির পাত্রে রান্না করতাম, যখন আমার ঘরের কোণে শাকসবজির খোসা জমে থাকত, আর আমি মানুষের বাড়ি বাড়ি নোংরা বাসনকোসন মাজতাম, তাদের বাজারসদাই করতাম, যখন আমার পরনে ছিল পুরনো, শতচ্ছিন্ন পোশাক, তখন লোকে আমাকে অপমান করত, হেয় করত। আমাকে কেউ সম্মান তো করতই না, আমার বুদ্ধি বা দক্ষতাও কেউ দেখতে পেত না।

কিন্তু এখন আমি সবকিছু পাচ্ছি। আমার ড্রয়িংরুমকে লোকে তুলনা করছে মুঘল সম্রাটদের দরবারের সঙ্গে। আমার বেডরুমে রয়েছে সবচেয়ে দামি বিছানা-মশারি। সবাই এখন আমার হাতে এমব্রয়ডারি করা টেবিল ক্লথ নকল করে। আমার ডাইনিং টেবিল দেখেও সবাই মুগ্ধ হয়। তারিফ করে আমার বাসনকোসন, ছুরি-চামচের। হঠাৎ করেই যেন আমি অনেক বেশি প্রশংসনীয় আর সফল হয়ে উঠেছি। আমার পোশাকজ্ঞান চমৎকার। মেয়ের বিয়ের জন্য জামাকাপড় কেনার আগে লোকে আমার সঙ্গে পরামর্শ করতে আসে।

এগুলোর একটাই কারণ, তা হলো, আমার কাছে এখন প্রচুর পয়সা আছে। আমার এখনো মনে পড়ে, উচ্চবিত্ত নারীরা কীভাবে একসময় আমাকে দেখে ভ্রূ কুঁচকাত, নাক সিঁটকাত, আর বলত, দেখো দেখো, রিফিউজিরা কেমন নোংরা। এদের কি সাবান কেনারও পয়সা নেই! আমি তখন চুপ করে থাকতাম। কিন্তু আমার চোখ বুজে আসত কান্নায়। কী-ই বা করার ছিল তখন আমার? আমার তখন সর্বসাকুল্যে এক সেট কাপড়। কিন্তু আমি কখনো হাল ছাড়িনি, লড়ে গেছি। এখন আমি সবাইকে একটা উপদেশই দিই : যদি তুমি সম্মান পেতে চাও, তাহলে পয়সা কামাতে শেখো।’

‘বাছা,’ আমি বললাম, ‘সবাই তো তোমার মতো পরিশ্রম করেনি। অনেকেই জালিয়াতি করে, ফন্দি খাটিয়ে দ্রুত বড়োলোক হয়ে গেছে। একসময় যারা চালাঘরে বাস করত, তারাই বিশাল বিশাল দালানকে নিজেদের বলে দাবি করেছে, সেগুলো দখল করে নিয়েছে। নিজের দেশে হয়তো যার কেবলই একটা পেয়ারা গাছ ছিল, সে এখানে এসে গোটা বাগানের মালিক হয়েছে। নিজের দেশে যারা হয়তো এক বাড়িতে কয়েক পরিবার মিলে বাস করত, এখানে এসে তারা পরিবারের প্রতি সদস্যের জন্য আলাদা আলাদা বাড়ির বন্দোবস্ত করেছে।’

‘কিন্তু খালা, সরকারি অফিসাররা কি এগুলো খতিয়ে দেখেনি? দুর্নীতি ধরতে পারেনি?’

‘মিথ্যের জয় হোক!’ আমি বললাম। ‘দাঙ্গায় তো সব দলিল-দস্তাবেজ ধ্বংস হয়ে গেছে। লোকে তাই চারজন করে ভুয়া সাক্ষী জোগাড় করে এনেছে। প্রত্যেকের হাতে ২০ রুপি করে ধরিয়ে দিলেই কাজ হয়ে গেছে। সরকার তো এই অল্প কিছুদিন হলো নতুন নতুন দপ্তর খুলেছে, সেখানে দেশে নতুন আসা বেকারদের চাকরি জুটেছে। তা-ও বেশিরভাগ চাকরিই পেয়েছে নিজেদের পরিবারের সদস্যরা। ওই যে কথায় আছে না, অন্ধ লোকও মিষ্টি বিলানোর সময় কেবল নিজের লোকদেরকেই চেনে।’

‘সালেকা বেগম সেদিন কিছুক্ষণ পরই চলে গেছে। কিন্তু আমি কয়েকদিন যাবৎ শুধু তার কথাই ভেবে চলেছি। তার গল্প এখানেই শেষ। এরপর কখনো হয়তো আমি তোমাদেরকে লেডি রুইনের সত্যি কাহিনি বলব, কীভাবে সে নিজের জীবনটাকে নষ্ট করেছে।’

(ঈষৎ সংক্ষেপিত ও সম্পাদিত)

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম বাগেরহাটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত। লিখতে ভালো লাগে।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।