শনিবার, জানুয়ারি ২২

জীবনের আদিকল্প ও কবিতার ক্রমস্ফুরিত বিকিরণমালা

0

শৈশবে গল্প শুনিতাম, ওই যে ছেলেধরা আসিতেছে, দুষ্টামি করিলেই বস্তায় পুরিয়া ধরিয়া লইয়া যাইবে। ছেলেধরারা আজও আছেন কি না, জানি না। থাকিলেও, ফিলহাল তাঁহারা নিশ্চয়ই বস্তা কাঁধে ঘুরিয়া বেড়ান না। কিন্তু কোনও কবিকে লইয়া আলাপ করিতে বসিলে, সেই ছেলেধরা-বস্তাটি আমাদের পিছু ছাড়ে না। কোনও না কোনওভাবে কবিকে কব্জা করিয়া মাপসই একটি বস্তায় ঠেলিয়া ঠুলিয়া ঢুকাইয়া বস্তার মুখ বাঁধিতে পারিলেই, কেল্লা ফতে! এইবার বয়ামে-ভরা মোরব্বার মতো পাঠিকা পাঠকের পাতে পাতে পরিবেশন করিলেই হইল। কিন্তু সকল কবির বেলায় এই ফিকির খাটে না। কোনও অভাবিত কবি নজরদারির বাহিরে ছুট দিয়া পলাইলে, লম্বা পায়ে দৌড় লাগাইয়া তবু হয়তো তাঁহার নাগাল পাওয়া যাইতে পারে। কিন্তু গোল বাঁধে তখনই, যখন তাঁহাকে হাপিস করিবার জন্য কিছুতেই আর লাগসই বস্তা খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। তখন ছেলেধরাগিরির এতদিনের কারিকুরি, শিক্ষাদীক্ষা, সব বৃথা! কাঁচি গজফিতা হাতে লইয়া, নাকে-ঝুলানো চশমার ফাঁক দিয়া জরিপ করিয়া, চটজলদি সেই কবির মাপের বস্তা বানাইয়া দেওয়াও কোনও ওস্তাগরের পক্ষে আসান নহে। কারণ মাপ লইতে গেলেই, হয় ফিতায় কুলায় না, নয় চশমার কাচে সব কেমন ঝাপসা দেখায়। কোনও অধীত অভ্যাস দিয়াই সেই কবিকে যেন ঠিক রপ্ত করা যায় না। জহর সেনমজুমদারও তেমনই একজন কবি। যাঁহাকে কোনও পড়িয়া-পাওয়া দাদুর দস্তানায় মুঠাবন্দি করার কোশেশ না-করাই ভালো। করিলে, দস্তানাও ফর্দাফাঁই, কবিরও হদিশ মিলিবে না।

কচিকাঁচা-অবস্থা-হইতেই-জানা কোনও মানুষকে যখন আমরা তাহার তালেবর বয়সে দেখি, কতই-না বদলাইয়া গিয়াছে সেই শৈশব-বাল্য-কৈশোরের সুরত ও মন। স্বাভাবিকভাবেই, সেইসব দেহী ও বিদেহী উচ্চণ্ড বদলগুলি আমাদের কৌতূহলের বিষয় হইয়া উঠে। আমরা বুঝিতে কোশেশ করি, কীভাবে একটি ক্রমিক সরণ ঘটিয়াছে তাহার বিদ্যমানতায়। পূর্বাপর সঞ্চাররেখটি ধরিয়া তাহার চলাচল অনুসরণ করিতে উৎসুক হইয়া উঠি আমরা। প্রিয় পাঠিকা প্রিয় পাঠক, ইহার বিপরীতে, মোহিত চট্টোপাধ্যায় প্রণীত মহাকালীর বাচ্চা নাটকটির সেই অদ্ভুত জাতকটিকে মনে করুন। যে, এক পরিণত মানুষ হইয়াই পয়দা হয়, ও তাহার সর্বগ্রাসী কর্মকাণ্ডে আমাদের হতচকিত করে। যেন তাহার কোনও ক্রমবিবর্তনের অতীত নাই। বা, লোকচক্ষুর আড়ালে আমাদের ইতিহাসপুরুষ বা কালবিবেক তাহাকে বিবর্তিত করিয়াই মঞ্চে নামাইয়াছে। ৪০বছর আগে প্রকাশিত পহেলা কবিতাবহিটি হইতে, জহর সেনমজুমদারের আনুপূর্বিক কবিতা পাঠে, আজ যেন ঠিক সেই অনুভূতিই হয়— এক আচম্বিত অশনিসম্পাত। তবে অশনি হইলেও তাহা ক্ষণপ্রভ নয়। সে যেন এক এলাহি বিকিরণমালা। একটি জবরদস্ত বিস্ফোরণের পর যে-বিকিরণমালা কেবলই স্ফুরিত হইয়া চলে, দিগ্বিদিকে আরও আরও বিস্ফোরণ ঘটাইতে থাকে। সেই আদিকল্পবাহী গতিভঙ্গিমাটিকে থমকাইয়া থমকাইয়া পর্যবেক্ষণ করা যায়, কিন্তু অনুসরণ করা যায় না। কারণ তাহা একটি বিন্দু হইতে অপর একটি বিন্দুতে সরণ মাত্র নহে, যেন একটি কেন্দ্রীয় বিন্দুরই এক অপূর্ব বিস্ফার।

একথা ঠিক যে, কবিতার প্রপঞ্চে, মঞ্চের মায়া সত্য হইয়া উঠিতে সময় লাগে। বিশেষত বিগত খ্রি. শতকের শেষ অর্ধ জুড়িয়া প.বাংলার কাব্য পরিমণ্ডলে নানান কল ও কাঠি সক্রিয় ছিল। জাল ফেলিয়া মাছ ধরার কারবার হইতেও জল ঘুলাইয়া দেওয়াতেই সেই ব্যবস্থাপনা আপন বাহাদুরি মানিত। কালের নিয়মেই সেই পুরানা জারিজুরি আজ বাঞ্চাল হইয়া গিয়াছে। কিছু দেরি হইয়া গেল, ইহা সত্য। কিন্তু সেই দেরির ভিতর দিয়া আমাদের খণ্ডকালের জারণ অতিক্রম করিবার একটি সুযোগও ঘটিয়া গেল। জহরের সেই প্রথম কবিতাবহি জনৈক ঈশ্বরের বাণী (প্র. ১৯৭৮) হাতে তুলিয়া লইলে, বাংলাভাষার গর্ভে ‘নতুন নতুন কাশবন রচনার’ কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তগুলি আজ বরং অনেক ধীরস্থির প্রত্যয়ের সাথে চিহ্নিত করিতে পারি—

তুমিও শ্রাবণশৃঙ্গার, ময়ূরীর চিত্তচমৎকার, নাভিমূলে নিলিমানিসর্গ শুধু মৃদু মৃদু মৃদু
হাহাকার করে, তোমার শামুক আমাদের নীড়ে সখা ও সখীর শবযাত্রায় মিশে যায়
তোমার ঝিঁঝিপোকা আমাদের মৌচাকের ভেতর জনৈক ঈশ্বরের বাণী রেখে যায়
আমরাও ভেড়াবৃন্দ, আফিম গাছের গন্ধে এক শতাব্দী ঘুমিয়ে থাকবার পর এইমাত্র
জেগে উঠলাম, আমাদের চোখদুটি লুপ্ত হয়ে গেছে, মাথাভর্তি ঝরাপাতা,
মাথাভর্তি বাঁশপাতা, স্বপ্ন লেখা খাতাটি শুধু হাত থেকে উড়ে উড়ে যায়
বালিকার লাল নৌকায় বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর শব কুয়াশায় ক্রমশই স্পষ্ট হয়ে ওঠে
আমরা কোথাও যাই না, মায়ের গর্ভের ভেতর পুনরায় নতুন নতুন কাশবন রচনা করি

(নীলিমানিসর্গ, জনৈক ঈশ্বরের বাণী)

এবং এইকথা ভাবিয়া বিস্মিত না-হইয়া পারি না যে, সেইসময় যখন প.বাংলার কাব্যাকাশে অনেকানেক নবীন তারকা স্বমহিমায় দীপ্যমান, সেই তীব্র অগ্রজদের তিনি কোন্‌ আন্তরিক ক্ষমতার বশে এতদূর এড়াইয়া গেলেন! আত্মমুগ্ধ সেই পূর্বপ্রজন্মও অবশ্য তাঁহার দিকে ফিরিয়া চাহিলেন না। জহরের তাহাতে কিছু আসিল যাইল কি? তিনি লিখিতে চাহিতেছিলেন স্পষ্টতই এক উত্তরকালের জন্য। সেদিনের সেই নওলকিশোর (তাঁহার বয়স তখন সদ্যই ১৮) জীবনে দাঁড়াইয়াই তিনি হয়তো টের পাইয়াছিলেন প্রচ্ছন্নে তলাইয়া-থাকা এক ‘ছড়ানো সমগ্রতার’। ঠাহর করিয়াছিলেন ‘আজকের জীবন আর কালকের জীবন’-এর গহন আন্তঃসম্পর্কটি। পরিণত বয়সের এক জবানবন্দিতে যেকথা তিনি বিশদ করেন এইভাবে—

…প্রতিটি মুহূর্তেই বুঝতে পারি কালকের জীবনের ওপরই দাঁড়িয়ে রয়েছে আজকের জীবন, আজকের জীবনের ওপর কালকের জীবন; হয়তো মধ্যে একটা শূন্যতা থাকে; এই শূন্যতা অতিক্রম করতে পারলেই কালকের জীবন আজকের হয়ে ওঠে, তৎসহ, আজকের জীবনও কালকের হয়ে ওঠে; এভাবেই এক আশ্চর্য মহাজাগতিক ক্রিয়া ও চৈতন্যের মধ্যে ক্রমাগত বসবাস করতে করতে, প্রতিদিনই আমি দেখতে পাই এক শাশ্বত মহাজগৎ, ধ্বংস নেই তার, মৃত্যু নেই তার, গভীর অন্ধকার ভেদ করে সে উঠে আসছে; ক্রমাগত উঠে আসছে…                                        

(মনখারাপ ভাসমানতা, হৃল্লেখবীজ, ২০১২)

২.
প্রিয় পাঠিকা প্রিয় পাঠক, দীর্ঘ চার দশকের উদাসীনতার জরিমানা স্বরূপ আজ আমাদের, সময়ের উলটা দিকে কিছু হাঁটা লাগাইতে হইবে। আসুন, আমরা একবার জনৈক ঈশ্বরের বাণী-র নিভৃত গোপন বিস্ফোরণটির দিকে তাকাই। দেখি, বর্তমান ও আগামীর মধ্যবর্তী ধুধু শূন্যতার দিকে, অদেখা এক সময়ের নৈর্ব্যক্তিকতার দিকে, ৪০ বছর আগের সেই কবিতাবিহিটি হইতে, কীভাবে উৎক্ষিপ্ত হইয়া গেল, বাংলার গভীর মর্মের সাথে জড়াইয়া-থাকা এইসব কীর্ণ অনুষঙ্গের বিকিরণগুলি— বঙ্গীয় বাউল, আদিম নৌকা, তামসিক কালপ্যাঁচা, গৃহপালিত কুকুর, উইলাগা হারমোনিয়াম, গাধা, বিড়ালের লেজ, ভিখারি, ফড়িঙ, ইঁদুর, যাবতীয় বোকামি, কানাফকির, নুনজল, বাস্তুহারা কলোনির মেয়ে মাকড়শা, নেংটি ও ধাড়ি , কাঁকড়া ও কবীর, লণ্ঠন, শান্ত হেলেসাপ, ভাঙা সাইকেল, শিবলিঙ্গ, টুংটাং, মায়ের গর্ভ, টিয়া, বাংলার ব্যর্থ বালিকা, রান্নাঘরের হাঁড়ি, ময়ূরের সাধনসংগীত, দারুচিনি দাঁড়, হিজল গাছের স্বদেশী অন্ধকার, রুগ্ন পিঁপড়ে, পাড়াগাঁর শেয়াল, এবং আরও বহুকিছুর সাথে— রক্তমাখা মাতৃভাষা। ইহারা কিন্তু কোনও প্রকল্প-মাফিক উপস্থাপিত কিছু প্রামাণিক বিশেষ্যমাত্র নয়। প্রকৃতি-উদ্যান বা চিড়িয়াখানার ঝাড়াই-বাছাই করা প্রচলিত-ক্রমে সাজানো-গোছানো খাঁচাবন্দি নমুনাসমূহের মতো নয়। এগুলি যেন এক বিশাল নকশিকাঁথার বুকে সূচের ফোঁড়ের একেকটি গভীর আর্ত হাহাকার। আর্ত কিন্তু উচ্চকিত নয়। ইহারা কোনও অভিধানে মুখ-থুবড়াইয়া-পড়া শব্দমাত্রও নয়। ইহারা ভাবের ডানা-লাগানো কিছু ভাসমান ছবি। গত ৪দশক ধরিয়া আমাদের আবহমণ্ডলের মায়া ও মহাশূন্যের মন্দিরা জুড়িয়া ছবিগুলি ভাসিতে লাগিল। সময় হইতে সময়ান্তরে হয়তো আরও কিছু ছবি যোগ দিল। সময় হইতে সময়ান্তরে নতুন নতুন স্ফুরণের ঢেউয়ে তাহারা ফিরিয়া ফিরিয়া আসিল কবির কাছে, পাঠকের কাছে। ঠিক আগের চেহারায় নয়, আগের বিন্যাসে নয়, তবু তাহারাই, তাহারাই।

ধরা যাক, টিয়াপাখির কথা। টিয়াপাখির ঠোঁটটি লাল/ ঠাকুরদাদার ফোকলা গাল। শহরপত্তনের পরেও বাঙালি শিশুর মনে এই ছবি আঁকা ছিল দীর্ঘকাল। সেই টিয়া আজ কোথায় হারাইয়াছে। শিশুপাঠও পাল্টাইয়াছে। আজ টিয়ারা যেন নিয়তিতাড়িত বয়স্ক মানুষ। একলা, দোকলা বা দলে-বাঁধা, যাহাই হউক, মানুষের শাপগ্রস্ত পরিণতি তাহারা যেন এড়াইতে পারে না। জহরের পহেলা বহিটির এক কবিতায় দেখি, দুইজন টিয়া কোনও শ্মশানে আসিয়া ‘প্রাকৃতিক কর্মশেষে অতি ঘন বাক্যালাপ করে’ (সাধনসংগীত)। ধরিয়া লওয়া যায়, সেই নিবিড় বাক্যলাপের পর তাহারা উড়িয়া গেল। হয়তো আমাদের দেখাশুনার বাহিরে তাহারা উড়িতে লাগিল। বা, কোনও স্বপ্নগাছে গিয়া বসিল। যত দূরেই যাক, সেই শ্মশানের স্মৃতি, সেই মৃত্যুর স্মৃতি, সেইসব স্মৃতির ক্লান্ত বিষণ্ণতা, তাহাদের ছাড়িল কি? কত কতদিন ব্যাপী এই গ্রস্ততা চলিতে পারে! আমাদের কোনও আন্দাজ নাই। আমরা শুধু চয়ন করিতে পারি আরও দুইটি উল্লেখ। ১. আমাদের স্বপ্নগুলো অজস্র টিয়াপাখি হয়ে প্রতিটি মৃতদেহের পিছু পিছু ধায়, ও ২. আমরা সবাই শুধু ব্যর্থ টিয়াপাখি/ ক্লান্ত, বিষণ্ণ, সারারাত বোকা স্বপ্নগাছে ঝুলে থাকি। এবং আশ্চর্য হই, পহেলা উক্তিটি রহিয়াছে ১৯৮১ সালে প্রকাশিত মহাকাল সমারূঢ় কবিতাবহির এক কবিতায় (সমকাল), আর দোসরা উক্তিটি আমাদের পঠিত কবির সর্বশেষ কবিতাবহির সর্বশেষ কবিতার সর্বশেষ দুইটি লাইন (টিয়াপাখি, স্বপ্নগাছ; বোকা স্বপ্নগাছ, জানুয়ারি ২০১৮)! শেষ কবিতাটির অবস্থান হয়তো নিছকই সমাপতন। তবে মাঝের ৪০বছরে আরও কয়েকবার নানা ভাবমূর্তিতে আমরা এই টিয়াকে দেখিয়াছি—

১. অর্ধশতাব্দী আগে একবার ঘুরতে ঘুরতে/ একদিন আমারই সাইকেলের তলায় একটি টিয়া এসে অকস্মাৎ আছড়ে পড়েছিল/ জলভরা স্মৃতিপুঞ্জ, জলভরা স্মৃতিপুঞ্জ, হয়তো বা তুমি সেই টিয়া (অবঘন, দূরগামী দেহযন্ত্রবীণা, ১৯৯৯)
২. ন্যাংটো ভিখারির একগুচ্ছ টিয়া রক্তে রাঙা বালিকার রক্ত চেটে চেটে একদিন/ পেয়ারাগাছের পাশে গৃহ তৈরি করে (সপ্তডিঙা, শাশ্বত বীজক্ষেত, ২০০৫)
৩. শান্ত/ অতি শান্ত টিয়াপাখিও আমার ঠোঁট ব্যবহার করে (সারারাত, ছয়টি হিজলগাছ, ২০১২)
৪. শুধু তুমি বারবার পিছন ফিরে/ তোমার ঐ নরম আঙুলে টিয়াপাখির প্রমা তুলছ (মর্মরিত, স্বপ্নগাছ; বোকা স্বপ্নগাছ, ২০১৮)
৫. ওগো সখা; তোমার টিয়ার পাশে আমাদের নাভি পড়ে আছে;/ …/ ওগো নারী ওগো টিয়া ফিরে এসো ফিরে এসো তুমি (রান্নাঘর, ঐ, ২০১৮)
৬. লাল হাড়িকাঠের মাঝখানে গলা দিয়ে পড়ে আছে টিয়া (রেলপথ, ঐ, ২০১৮)
৭. দুইফোঁটা বৃষ্টি নিয়ে টিয়াপাখি জলে ভেসে যায় (টিয়াপাখি, ঐ, ২০১৮)

বলা বাহুল্য, নানাসময়ের এইসব টিয়া, টিয়াগুলি, কোনও একক অস্তিত্ব নহে। নহে তাহারা কোনও একরৈখিক উপমা বা রূপক বা প্রতীক। তাহারা কখনও ভীষণ, কখনও করুণ, কখনও শান্ত। যেমন মানুষের মন। কবির মন। যেমন ধরা যাক, রান্নাঘরের হাঁড়ি। বাংলার প্রাত্যহিক জীবনের সাথে জড়িত একটি অনিবার্য তৈজস। চর্যাপদের কবিও দেখিয়াছিলেন – হাড়িত ভাত নাহি। দুইমুঠি অন্নেভরা হাঁড়ি যেন এক পূর্ণতার স্বপ্ন। একটি আকুল গর্ভের মতো, হাঁড়ি সেই পূর্ণতার পানে তাকাইয়া রয়। নহিলে সে যে নিতান্তই শূন্য। সাম্প্রতিক কবিতাবহি স্বপ্নগাছ; বোকা স্বপ্নগাছ-এর কবিতায় হাঁড়ির সেই শূন্যতার সূত্রে জহর লক্ষ করিয়াছেন এইরকম এক রূঢ় নগ্ন দৃশ্য –‘পোড়া হাঁড়ির ভিতর ইঁদুরেরা বারবার প্রস্রাব করে’ (চক্রব্যূহ)। এই দৃশ্যেরই কি করুণ রঙিন কোনও আভাস ধরা পড়িয়াছিল তাঁহার পহেলা বহির এমন বয়ানে –‘বাংলার ব্যর্থ বালিকা রান্নাঘরের হাঁড়িতে ছ-লাইনের বৃষ্টি ঢেলে দেয়’ (সাধনসংগীত, জনৈক ঈশ্বরের বাণী)? সাম্প্রতিক বহিতে কবি দেখিয়াছেন –‘পোড়া হাঁড়িসহ আমাদের রান্নাঘর আস্তে আস্তে জলে ডুবে যায়’(চিরকাল)। হাঁড়ি ছিল, ঘরও ছিল, কিন্তু সবই তলাইয়া গেল। চিরকালের সব সম্বল এইভাবেই তলাইয়া যায়। রহিয়া যায় রিক্ততার প্রহর। কিন্তু যখন কিছুই ছিল না, সেই নিঃস্বতা কেমন ছিল? সিকি শতক আগের এক কবিতায় ধরা পড়িয়াছে সেই অনুভাব –‘আমাদের হাঁড়ি নেই, আমাদের বাড়ি নেই, নিঃস্ব রিক্ত ধু-ধু দূর্বাদল’ (কালসখা, হৃদয়প্রণীত সন্ধ্যাজল, ১৯৯৪)। হাঁড়ি কখনও আধার, কখনও আধেয়। হাঁড়ির ভিতর অবস্থান লইয়া মা নিজেই যেন সন্তানের খাদ্য হইয়া উঠেন, হইয়া উঠেন অন্নপূর্ণা। জহরের তেমনই এক সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ হইল –‘পোড়া হাঁড়ির ভিতর নুন আর চিনির মাঝখানে বসে থাকে মা’ (ধানখেত, স্বপ্নগাছ; বোকা স্বপ্নগাছ)। আবার, মায়ের গর্ভও তো এক হাঁড়ি। সেখানে রচিত হইতে থাকে সন্তানের স্তব্ধতার ইতিহাস – ‘ভাঙা হাড়ির ভিতর দশমাস দশদিনের ইতিহাস স্তব্ধ’ (হাহাকার, ছয়টি হিজলগাছ, ২০১২)। এইভাবে, হাঁড়ির নানা টুকরা ছড়াইয়া আছে জহরের নানা সময়ের নানান কবিতা জুড়িয়া—

১. হাঁড়িভর্তি স্বপ্ন শুধু রোদে চমকায় (নিরঞ্জন নিস্পৃহতা, ষড়রিপু ষড়যন্ত্র, ১৯৯৬)
২. লাল হাঁড়ির ওপর ঘুমভাঙা বৃষ্টির চারচক্ষু দেখে তুমি কি উৎফুল্ল হয়েছ কখনো? (খাঁচা, শাশ্বত বীজক্ষেত, ২০০৫)
৩. মেঘপুঞ্জ; দেবীগৃহ; ছায়ামাখা রান্নাঘর; পুড়ে যায় মেয়েভর্তি হাঁড়ি (সন্ধ্যাপথ, ভবচক্র; ভাঙা সন্ধ্যাকালে, ২০১৫)
৪. হাঁড়িভর্তি পোড়া নারী একদিন উড়ে যায় দূরদেশে আলুথালু চাঁদে (হৃদপিণ্ড, ঐ, ২০১৫)
৫. পড়ে আছে মুণ্ডমালা; পোড়া ভাত; অন্ধকার; তৎসহ আর কিছু কালশিটে হাঁড়ি (তৎসহ,ঐ, ২০১৫)
৬. পোড়া হাঁড়ির ভেতর পুড়ে যাচ্ছে আমাদের চুমা (ধানক্ষেত তোমাকে ডাকছে, অগ্রন্থিত, ২০১৫)
৭. হাঁড়ির ভেতর কাটা মুণ্ডু রান্না হইতেছে (বীজ যেন বীজ, অগ্রন্থিত, ২০১৫)
৮. পোড়া হাঁড়ির ভেতর মাকড়শার জাল ক্রমশ বড়ো হয়ে ওঠে (নৌকা, অগ্রন্থিত, ২০১৫)

গ্রামের আলপথ হইতে শহরের অ্যাসফল্টে গড়াইয়া চলে সাইকেলের চাকা। সাইকেল যেন এক অল্পবয়সী গতি। একসময় যেমন ছিল নৌকা, আজ তেমনই সাইকেল, কেবলই দুইটি দূরবর্তী প্রান্তকে একটি সূত্রে গাঁথিতে গাঁথিতে, যেন এক আসমানিযানই হইয়া উঠে। কী না কী পারাপার হইয়া যায় তাহার পিঠে চড়িয়া। হইতে পারে বাংলা কবিতা, হইতে পারে বৃষ্টিভেজা ধানখেত, হইতে পারে আমাদের সার্বিক হাহাকার। জহরেরস্বপ্নগাছ; বোকা স্বপ্নগাছ (জানুয়ারি ২০১৮)-এ আমরা সেই সাইকেলের এইসব ছবি পাই—

১. এইখানে একদিন সাইকেল করে বাংলা কবিতা উড়ে আসে (মেঘরং)
২. ওগো সখা; বৃষ্টিভেজা ধানখেত সাইকেলে তুলে নিয়ে আমরাও এসেছি আজ/ তোমার কাছে; কথা বলো; তুমি কথা বলো (ভাসমান)
৩. আমাদের হাহাকার, অনির্বাণ হাহাকার, পৃথিবীর সাইকেলে উঠে/ একদিন শামুকের আঞ্চলিক ইতিহাস হয়ে যায় (হাহাকার)

কিন্তু সাইকেলের অনুষঙ্গ তো শুধু এই ২০১৮-তেই ভাসিয়া উঠে নাই। জহরের কবিতায় গত ৪০ বছর ধরিয়াই নানা তরিকায় তাহার আসা-যাওয়া। কখনও সে কর্তা কখনও কর্ম, কখনও বিবৃত কখনও সম্বোধিত—

১. ভাঙা সাইকেল, তুমি তুমি/ তুমি শুধু একদিন পৃথিবীর যাবতীয় ঝড়ঝঞ্ঝা শেষে হৃদিতলে বালিকার পাখি রেখে দিও (বিস্ময় বিস্ময়, জনৈক ঈশ্বরের বাণী, ১৯৭৮)
২. সাইকেল চালাতে চালাতে মহাশূন্যের ওপার থেকে নেমে আসে কাল মহাকাল (মেঘমল্লার, প্রসবসিঁদুর, ১৯৮৯)
৩. ভাঙা পথে প্রেম ও প্রমিতাক্ষর নিয়ে সাইকেল চালাই আমি …/ …/ শতাব্দীর পর শতাব্দী জীর্ণশীর্ণ সাইকেল চালাই ( অবঘন, দূরগামী দেহযন্ত্রবীণা, ১৯৯৯)
৪. আমি শুধু অবাধ্য লিরিক নিয়ে সাইকেল চালাতে চালাতে একদিন ঢুকে পড়ি/ ফুটফুটে সরস্বতীর আহত পদপ্রান্তের জায়মান দীর্ঘশ্বাসে (তৃষিত ময়ূরের আত্মনিবেদন, তৃষিত ময়ূরের আত্মনিবেদন, ২০১০)
৫. বৃষ্টিভরা সাইকেল নিয়ে আমরাও এসে গেছি দিগন্ত অবধি (বর্ণচক্র, ছয়টি হিজলগাছ, ২০১২)
৬. পোষা প্রাণী আমরা/ কোথাও যাই না, সাইকেল চাকার নিচে শ্রাবণের জল লক্ষ্য করি (পুণ্যলগ্ন, ঐ, ২০১২)

আমাদের অবচেতন তৈয়ার হয় গভীর শৈশবেই। প্রেক্ষিত যতই বদলাইয়া যাক, অতীতের মায়াবী লণ্ঠনের আলোছায়া আমাদের পিছু ছাড়ে না। জহরের নিজের ভাষ্যে— ‘আমার গ্রাম, আমার আস্তিক্যভূমি, আমার কল্পনার ভেতর যেভাবে রূপাতীত ঋতুরূপে আছে, সে কি আজও বাস্তবে তেমনই আছে; এতদিন পরে কি পালটিয়ে যায়নি তার ইন্দ্রিয়ঈশ্বর? শহরের রাখাল আমি, বৃন্তচ্যূত, ফেলে আসা গ্রামের তড়িৎতীব্র তৃষিত ময়ূরটির দিকে ফিরে তাকাই…’ (প্রপঞ্চ ও ঈশিতা, হৃল্লেখবীজ, ২০১২)। সেই ফিরিয়া তাকাইবার চাহনিটিও তৃষ্ণার্ত। কোন্‌ বিস্মৃতির পরপার হইতে দিগন্তে সহসা দুলিয়া উঠে এক পৌরাণিক লণ্ঠন। যে-লণ্ঠন বা হ্যারিকেন আজ হয়তো আর রোজানা দরকারের উপকরণ নয়, নানান ভাঙাচোরা রূপকল্পে তবুও তাহা বহিয়া আসে মাইলের পর মাইল বছরের পর বছর। এমনকি সিন্ধাইয়া যায় সদ্যতন কবিতাতেও—

১. নীল ডোরাকাটা এক হরিণ রোগা লণ্ঠন হাতে দিগন্তের প্রান্তে বসে থাকে (হাহাকার)
২. বটবৃক্ষের মাথায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তোমার চাঁদ/ মাতৃভক্ত স্বদেশের দিকে যৌন লণ্ঠন তুলে ধরে (মাতৃভক্ত)
৩. একজন মাতৃভক্ত হেলেসাপ অন্ধ লণ্ঠনের পাশে বসে থাকে (স্বপ্নগৃহ)
৪. মনে পড়ে একদিন আমাদের প্রিয়তম বটবৃক্ষ একা একা হেঁটে গিয়েছিল/ তোমার দীর্ঘ ওই পৌরাণিক লণ্ঠনের দিকে/ …/ ভৌগোলিক সন্ধ্যাবন্দনাদি আমরাও জানি/ তবুও তোমার ওই দীর্ঘ লণ্ঠনের ভেতর আমরাও তেল হয়ে যাই (অপ্রাকৃত)

এগুলি সবই সাম্প্রতিক স্বপ্নগাছ; বোকা স্বপ্নগাছ-এর কবিতাংশ। কিন্তু ইহারাও সহসা আসে নাই। থাকিয়া থাকিয়া ঘটিয়া-চলা রক্তক্ষরণের মতো, জিন্দেগিভর নিজেকে জানান দিয়া যায় এই মদির ব্যাধি—

১. শুদ্ধতম নক্ষত্র ও নুলিয়ার মাঝে/ অতিস্তব্ধ নালন্দালণ্ঠন (ঘুমজল, মহাকাল সমারূঢ়, ১৯৮১)
২. …শীতকালের অন্ধ লণ্ঠন জ্বালিয়ে কাম করে বন্ধ্যা পুরোহিত (মেঘমল্লার, প্রসবসিঁদুর, ১৯৮৯)
৩. হিংসা যেন হলুদ লণ্ঠন (ইন্দ্রিয় ও অতীন্দ্রিয়, ষড়রিপু ষড়যন্ত্র, ১৯৯৬)
৪. আমাদের পালক রক্তাক্ত, আমাদের জীবনও রক্তাক্ত/ গরিব লণ্ঠন হঠাৎ হঠাৎ নিভে যায় (খাঁচা, শাশ্বত বীজক্ষেত, ২০০৫)
৫. অলৌকিক লণ্ঠনের পাশে মৃদু মৃদু অশান্তির গল্প লেখা হয়,/ কবিতাও হয়। আমরা হই না। (ঈশ্বরের মুদ্রিত ইতিহাস, তৃষিত ময়ূরের আত্মনিবেদন, ২০১০)
৬. অন্ধকারে একটি ব্যর্থ নাবিক, তবুও লণ্ঠন হাতে মাকড়সা খোঁজে/ বারবার উন্মাদের মতো সমুদ্র দেখলেই ঘুরে ঘুরে ঊর্মি ডাকে। (তৃষিত ময়ূরের আত্মনিবেদন, ঐ, ২০১০)
৭. শ্মশানের পাদদেশে হ্যারিকেন নিভে যায়, জোনাকিরা শুধুমাত্র জ্বলে (ছন্দ, ভবচক্র; ভাঙা সন্ধ্যাকালে, ২০১৫)
৮. জগৎ ও যোনির ভেতর জ্বলে ওঠে অতিশয় শান্ত হ্যারিকেন (দাঁড়, ঐ, ২০১৫)
৯. বিষণ্ণ হ্যারিকেন হাতে ক্রমে দূরে চলে যায় আমাদের চাঁদ আমাদের রামধনু (কাক যেন কাক, অগ্রন্থিত, ২০১৫)
১০. একদিন তুমিই আমাদের ঋতুমুগ্ধ ধানক্ষেত আর শতাব্দীর শেষতম নীল হ্যারিকেন দেখাতে দেখাতে পৃথিবীর বীজক্ষেতে রাঙা দুটি পা রেখেছিলে (নৌকা, অগ্রন্থিত, ২০১৫)
১১. যমজ দুই বোন আজ হ্যারিকেন জ্বালিয়ে স্তব্ধতা পাঠ করিতেছে (ঘুড়ি, অগ্রন্থিত, ২০১৫)

প্রিয় পাঠিকা প্রিয় পাঠক, উদাহরণের বিস্তারের জন্য মাফ চাহি। তবে, আমাদের অব্যবহিত জীববৃত্ত (যেমন হিজলগাছ, পিঁপড়া, উই, সাপ, ইঁদুর, প্যাঁচা, শালিক, ময়ূর, বিড়াল, কুকুর, গাধা, শিয়াল ইত্যাদি) এবং সমাজবৃত্ত (যেমন নৌকা, ভিখারি, বাউল ফকির, মাস্টারমশায়, বালিকা, মেয়ে [নারী ও কন্যা আলাদা আলাদাভাবে], মা, ভাষা, দেশ ইত্যাদি)— এই দুই বৃত্ত হইতেই বুনিয়াদি অনুষঙ্গগুলি জহরের কবিতার বিস্তীর্ণ পরিসরে কীভাবে আত্তীকৃত হইয়া গিয়াছে, তাহারই সামান্য নমুনা পেশ করিলাম। কিন্তু ইহাকে অনুষঙ্গের পুনরাবৃত্তি মাত্র ভাবিবার তিলেক ফুরসত নাই। সময় হইতে সময়ান্তরে ভাবনার বিকীর্ণ আদিকণিকাগুলির তেজস্ক্রিয় স্ফুরণে ফিরিয়া ফিরিয়া উচ্ছৃত হইবার এই প্রক্রিয়াটি, তাঁহার কবিতার একটি মৌলিক ধর্ম। রৈখিক বিস্তারের কাব্যপ্রয়াস হইতে এইভাবেই জহর সেনমজুমদার বিলকুল আলাদা।

৩.
একদিকে খুব সংলগ্ন ও পরিচিত আদিকল্পের পাথেয়, অন্যদিকে তাহাকে মোকাবিলা করিবার জন্য এক সম্পূর্ণ অপরিচিত ভাষিক বিস্তার। ভাষার অভ্যস্ত আমোদ ও রগড়কে পুরাই বুড়া আঙ্গুল দেখাইয়া, ন্যায়ের প্রচলিত ক্রমকে আউলাঝাউলা করিয়া, জহর যে-ক্ষাত্রতেজ জাহির করিয়াছেন, তাহা যে সময় সময় ভাবগত বা প্রকাশভঙ্গিমাগত নৈরাজ্যের রথে সওয়ার হয় নাই, সেকথা বলা যায় না। যেন, যুক্তিতে গাঁথা দুনিয়াদারির যাবতীয় লাবণ্য মাংস-চামড়া সমেত ঝরিয়া পড়িয়াছে বলিয়াই আজ অযুক্তির বিশ্বটি আবিষ্কারের দিকে কদম বাড়ানো। তবে জহরের ক্ষেত্রে এই অযুক্তি-মন্থনও কোনও সুনির্ধারিত মার্গদর্শন নহে। দেখা যায়, অনিরুদ্ধ প্রহেলিকা লইয়া আত্মদ্বন্দ্বের জর্জরতা তাঁহাকে কখনও কখনও ভালোমতো ঘায়েল করিয়াছে। সেই রক্তমোক্ষণের সাবুতও রহিয়াছে তাঁহার কবিতায়—

মঞ্জরিত প্রহেলিকা; জলমগ্ন স্বর্ণযুগ; ওগো সখা স্তব্ধ মনোবীজে/ মেরুদণ্ড রক্তমাখা; মলদ্বার রক্তমাখা; রক্তে রক্তে দেহখানি ভিজে (প্রহেলিকা, ভবচক্র; ভাঙা সন্ধ্যা-কালে, ২০১৫)

স্তব্ধ মনোবীজে যে-প্রহেলিকা মঞ্জরিত হইয়া ঊঠে, কবির বয়ানে বহুদিন আগেই এমন এক প্রস্তাব-বিপাশা জাগিয়াছিল যে, চেতনার সেই অন্তর্ঘাতের ও সে-বাবদে পাওয়া নৈরাজ্যবাদের সামূহিক উৎস হয়তো বা আমাদের অবান্তর ও অর্থহীন জীবনের অনুপুঙ্ক্ষেই জড়ানো—

জীবনও কি প্রলাপপ্রহেলিকা? সাঁকোর ওপর তবুও তো স্বর্গ ও শতভিষা পড়ে আছে/ শ্বেতপদ্ম হাতে নিয়ে একটি ক্লান্ত কিশোরী তবুও তো একা একা দাঁড়িয়ে রয়েছে ওই/ বটবৃক্ষের আড়ালে, বিকলাঙ্গ প্রেমিক তার বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে জ্বলন্ত শ্মশানের মেঝে/ ক্রমাগত ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করে, দূর থেকে ভেসে আসে গীতিকবির হিম নির্জনতা/ একটি বৃদ্ধ লোকপাড়াগাঁর বালিকার দুই স্তনের মাঝে জবাফুল রেখে অতৃপ্ত সঙ্গম করে/ উহাদের অপূর্ব সঙ্গম থেকে একদিন পৃথিবীতে জন্ম নেয় ছয়জন ছোট্ট শালিক/ জীবনও কি প্রলাপপ্রহেলিকা? আমি কিছু বলবো না, ভাবো তুমি ভাবো/ আমি কিছু বলবো না, ভাবো তুমি ভাবো (শতভিষা, হৃদয়প্রণীত সন্ধ্যাজল, ১৯৯৪)

তবে, তখন সেই প্রলাপের স্বরূপ নির্ণয়ের ভার কবি কিছুটা নাটকীয় কায়দায় পাঠকের উপর চাপাইয়াছিলেন। কিন্তু প্রহেলিকা ও পাথেয় লইয়া কবির নিজের অসহায়তাও বারান্তরে কিছু গোপন থাকে নাই—

১. আমরা দেখি না কিছু; ওগো; আমরা বুঝি না কিছু/ নীচু হয়ে চুপিসাড়ে অনুভব করি – মশারির ভেতর একটার পর একটা/ নানারঙের সাপ মন্দীভূত হয়েছে, প্রহেলিকা ও পাথেয় হয়েছে। (ঈশ্বরের মুদ্রিত ইতিহাস,তৃষিত ময়ূরের আত্মনিবেদন, ২০১০)
২. পৃথিবীর নাভিচক্রে কম্পন করে/ আমাদের মায়াতুর নিস্তব্ধতা, আমাদের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ/ অনিশ্চিত প্রহেলিকা; যেন এক হলুদ রগড় (প্রহেলিকা, স্বপ্নগাছ; বোকা স্বপ্নগাছ, ২০১৮)

প্রহেলিকা কতদূর পাথেয় হইয়া উঠিবে, না কি তাহারা সমান্তরাল অস্তিত্ব বজায় রাখিবে, না কি শেষ তক নিতান্ত রগড়ের বিষয় হইয়া উঠিবে, এই ধন্দ, কখনও কখনও আমাদের এক চক্রব্যূহে পৌঁছাইয়া দেয়। যাহার নির্মাণ নৈরাজ্যবাদেরই মতো, যেখানে প্রবেশের পথ আমরা জানি, কিন্তু শেখা হয় নাই নিষ্ক্রান্ত হইবার অভিমুখ। সেই রূঢ় অন্তিম যখন টের পাওয়া যায়, দেরি হইয়া গেছে ঢের। তখন শুধু আফসোসের আহাজারি—

১.অন্ধকার চক্রব্যূহ, অন্ধকার চক্রব্যূহ, চারিদিকে শুধুমাত্র স্তব্ধতারই শিকড়সমাচার/ চাঁদ পড়ে যায়, তোমার হাত থেকে চাঁদ পড়ে যায়, চাঁদ পড়ে যায় (সপ্তডিঙা, শাশ্বত বীজক্ষেত, ২০০৫)
২. ভাঙা সন্ধ্যাকালে/ একটি শিয়াল শুধু কেঁদে যায় নিকটস্থ চক্রব্যূহ জালে (ভাসমান, ভবচক্র; ভাঙা সন্ধ্যাকালে, ২০১৫)
৩. চারিদিকে চক্রব্যূহ; চাবি কই? প্রশ্ন করে অগ্নিদগ্ধ তালা (মরীচিকা মরুসম, ঐ, ২০১৫)
৪. কাল সারারাত হাঁড়িভর্তি সাপ নিয়ে পাগলের মতো আমি শুধু/ স্বপ্নের দিকে ছুটে গিয়েছি; অন্ধকার চক্রব্যূহ; কোথাও/ তোমায় দেখতে পাচ্ছি না কেন? (অঙ্কুরিত, স্বপ্নগাছ; বোকা স্বপ্নগাছ, ২০১৮)
৫. চাবিভাঙা পুরোহিত একা একা পৃথিবীতে ঘোরে/ মন্ত্রহীন শালিকেরা সারারাত চক্রব্যূহে কাঁদে (চক্রব্যূহ, ঐ, ২০১৮)

একদিকে প্রলাপপ্রহেলিকার আকর্ষণ ও অন্যপ্রান্তে চক্রব্যূহের ফান্দে-পড়া বগার কান্না— এই দুই মেরুপ্রস্তাবের মাঝে এক ক্রান্তিরেখার মতো আমরা পাই শাশ্বত বীজক্ষেত (২০০৫) বহিটি। যেখানে ভাবনার সন্ত্রাস লইয়া কবি স্বয়ং এক বহুস্তর দ্বান্দ্বিকতায় আপন্ন। যেখানে একদিকে রহিয়াছে চাঁদ, খাঁচা, দু-একটি বালিকা, দেহাতি বাংলার মিথ-এর মতো কবিতা। যেখানে প্রকাশগুলির অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস যেন নিজেরাই নিজেদের এক অর্থহীন রূঢ় আক্রোশে ফালাফালা করে—

১. দুপুরে নিজের নকল মাথাটা রেখে আসি দেহাতি বাংলার মিথে।/ তারপর দূর থেকে দেখি; প্রাচীন গাধার বিয়ে। (দেহাতি বাংলার মিথ)
২. দু-একটি বালিকা রজস্বলা হবার আগেই প্যাঁচা হাতে নিয়ে / জঙ্গলে ঢুকে পড়েছে। ঘুমন্ত কৃষিক্ষেতের ওপর চটি এক পুস্তিকাকে/ শুইয়ে রেখে অন্ধ গৃহশিক্ষক আইবুড়ো ক্রিয়াপদ কামড়ে ধরে কাঁদে (দু-একটি বালিকা)
৩. সমুদ্র থেকে ভেসে আসা বৃহৎ কচ্ছপের পিঠের ওপর এইমাত্র / হিংস্র গোধূলি হাতে নিয়ে আবার উঠে দাঁড়িয়েছে নুলিয়া বাচ্চারা।/ দূর থেকে, বহুদূর থেকে, ওদের ডাকছে, গৃহপালিত গলাকাটা মা (খাঁচা)
৪. মাঝে মাঝে গর্ভধাত্রীর ডিম্বাণুচক্রে কোনো এক ঈশ্বর এসে একগুচ্ছ সাপ রেখে যায়/ যৌন গাছের কান্না নদী থেকে জঙ্গলে ভেসে যায় (চাঁদ)

দেখি, কোনও অন্ধপ্রান্তরে দাঁড়াইয়া জহর যেন এইসব কবিতার ঘোরগ্রস্ত বাচনে উগরাইয়া দিতেছেন এক রক্তাক্ত জীবনের ভাষ্য, এক খাঁচাবন্দি যাপনের উদ্ভাস, যেখানে ‘খাঁচাটাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছে অজস্র প্যাঁচা’। ‘যেখানে, মনখারাপ ক্রমশ এক আদিগন্ত শৃঙ্খল হয়ে ওঠে’। যেখানে পোষা বিড়াল বা খরগোশও অবিভক্ত বাংলা, অবিভক্ত দেশ, পায় না। সাপের খোলসের ভিতর কয়েক হাজার বছর বাস করিবার পরও তাই প্রশ্ন জাগে— ‘আজ কোথায় যাই তবে? আজ কোথায় যাই?’ কোনও জান-পহেচান পথ তো নাই। অতিব্যবহারের ফলে সব পথিকতাই নষ্ট –‘বাংলা ছন্দের ব্যর্থ ওঝা ক্রমশই পয়ারে শেষ হয়/ বিষদাঁত পড়ে থাকে, পথ নেই পথিকও নেই’।

ইহাদেরই অপর প্রান্তে রহিয়াছে নাড়িচক্র, প্রেমিক, কৃষ্ণ বা বীজমন্ত্র-এর মতো কবিতা। যেখানে, আমরা কোনদিকে যাইব, এমন প্রশ্নের একটি ইতিবাচক উত্তর পাওয়া যায়— ‘আজ আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে দেখতে যাবো বাবার আঁকা বাড়ি’। যেখানে এমন প্রত্যয়ের আভাস পাওয়া যায় যে, ‘শ্মশানের মেঝে থেকে অগ্নিদগ্ধ বাংলাভাষা বারবার উদ্ধার করেছি’। ঈশ্বর যে তাহার পুরানা আসনে নাই, তাহা কোনও অবিশ্বাসের কারণে নয়। তাহার যেন পদোন্নতিই ঘটিয়া গিয়াছে— ‘তুমি আজ ঈশ্বরকেও প্রেমিকের ফাল্গুন দিয়েছো’। আহা, কী অপূর্ব এক স্বপ্ন আমাদের বন্ধ্যা মগজে বুনিয়া দেন কবি— ‘কোথাও কোনো শান্ত ধানক্ষেতের ওপর/ হলুদ ডাকবাক্স দেখলেই মনে হয়; একগুচ্ছ কাশফুল ফেলি’। মনে হয় যুক্তির ক্লান্তি হইতে অযুক্তিতে পৌঁছাইয়া, অযুক্তির দিশাহীনতা হইতে এইবার ভাবের স্ফুরণের গোপন আলোকে স্পর্শ করিলেন কবি। তাই, কবিতা হইতে কোথায় উধাও হইল সেই ঘোরগ্রস্ত বাচন আর রক্তাক্ত জীবনের ভাষ্য! তাহার বদলে শুনিতেছি—

১. … আমাদের জগজ্জননী নিজেই মৃত এক কিশোরীর চুল বেঁধে দিচ্ছে/ আর সেই বাদামি কিশোরী একটি কমলালেবু ফুটো করে অপরূপ বিশ্ব দেখছে (নাড়িচক্র)
২. আমাদের পদ্মা আছে, গঙ্গা আছে/ নৌকাভর্তি নারী আছে …/… আমাদের সকলের মা আস্তে আস্তে/ পেটের ভ্রূণকেও সুড়সুড়ি দিয়ে ডেকে উঠবে – আয় ওরে আয়, আয় ওরে আয় (প্রেমিক)
৩. কেউ কোথাও নেই, তবু মনে হলো, কেউ যেন কোথাও আছে, আমার এই নৌকার ওপর/ আমার এই ভাঙা সাঁকোর ওপর (কৃষ্ণ)
৪. এক রাস্তায় বিপ্লবীরা যোগী হয়ে উঠে/ কমলালেবুর কোয়া থেকে বীজমন্ত্র ছড়ায়। আর এক রাস্তায় যোগীরা/ বজ্রপাত ভূমিকম্প অগ্ন্যুৎপাত জলোচ্ছ্বাসের ভেতর রুপোর তলোয়ার/ ঘোরাতে ঘোরাতে পৃথিবীর ধড় আর মুণ্ডু একসঙ্গে সারাই করে। (বীজমন্ত্র)

এইসব কবিতায় আমরা যাহা পাই, তাহাকে যে যুক্তিচালিত মন দিয়া ব্যাখ্যা করা যায়, তাহা নহে। আবার অযুক্তির নৈরাজ্যবাদকেও তাহা টপকাইয়া গিয়াছে। কবি যেন আসিয়া পৌছাইয়াছেন অজানা-অচেনা এক ভাব-এর জগতে। যেখানে ধড় আর মুণ্ডের বিচ্ছিন্ন হইয়া থাকার যে অ-ন্যায়, তাহার শুশ্রূষার জন্য বিপ্লবী ও যোগীরা স্থানাঙ্ক বদল করে। শাশ্বত বীজক্ষেত বহিটিতে এইভাবে এক রক্তাক্ত আত্মযুদ্ধের সাক্ষ্য রহিয়া যায়। যেখানে, এক প্রান্তে, যুক্তিকে তছনছ করিয়া দেওয়া নৈরাজ্যের বিস্তার। অপর প্রান্তে, যুক্তি ও অযুক্তি, এই দুই তন্ত্রকেই মোকাবিলা করিয়া ভাব-এর অপরূপ স্ফুরণ। এই ভাব ব্যাপারটি সম্পূর্ণই একটি অন-ইউরোপীয় প্রপঞ্চ। আধুনিক বা অধুনান্তিক চিন্তাকাঠামো দিয়া ইহার ব্যাখ্যা হয় না। ইহাকে আমরা বলিতে পারি— বাংলার ভাব। যে-ভাবের বশে আমাদের মা, মানে বাংলা, আমাদের এবং আরও অনাগতদের কেবলই ডাক পাড়িতেছেন— আয় ওরে আয়, আয় ওরে আয়।শাশ্বত বীজক্ষেত গ্রন্থের কিছু কবিতায় জহর যে সেই আহ্বান শুনিতে পাইয়াছেন, এবং আমাদের শুনাইয়াছেন, তাহার জন্য তাঁহার কাছে কৃতজ্ঞতা রহিয়া গেল।

৪.
কিছুদিন আগে জহর সেনমজুমদারের অনুরাগী এক তরুণ কবি অনুযোগের সুরে জানাইলেন, কোনও কোনও বোদ্ধা নাকি মনে করেন, জহরের কবিতা কিছুটা পুনরাবৃত্তিমূলক। ফলত কিছুটা বৈচিত্র্যহীন। পহেলা অভিযোগটিকে ইতোমধ্যেই কিছুটা স্পর্শ করিয়াছি। যাহা তাঁহার স্বাতন্ত্র্যের অভিব্যক্তি, তাহাকে পুরাদস্তুর আমলে না-লইতে পারার কারণেই, তাঁহার রচনাবলীকে একমাত্রিক বিস্তার বলিয়া মনে হইতে পারে। আসলে একরৈখিক ও একমাত্রিক পরিমিতিবোধ এস্তেমাল করিয়া জহরের কবিতার পিছনে না-দৌড়ানোই ভালো। বিভিন্ন সময়পরিসরে ক্রমিক স্ফুরণের ফলে আদিকণিকাগুলি কীভাবে নতুন নতুন শক্তি সঞ্চয় করিয়া আবার বিকিরিত হইতে থাকে, তাহার কিছু নমুনা আমরা আগেই পেশ করিয়াছি। এ-যাত্রায় আর বিস্তারিত না হই।

যাঁহারা বৈচিত্র্যহীনতার কথা বলেন, তাঁহারা হয়তো জহর-প্রণীতবৃষ্টি ও আগুনের মিউজিকরুম (১৯৯৮) আর বিপজ্জনক ব্রহ্ম বালিকাবিদ্যালয় (২০০৪)— এই দুটি কবিতাবহির কথা বেমালুম ভুলিয়া যান। তবে আমরা এখন, নীরিক্ষাপ্রবণ এই বহি দুইটির বদলে, বৈচিত্র্যের আর এক ভুবনের দিকে নজর ঘুরাইতে চাই। জহরের এলাহি রচনাবলীর ভিতর সবদিক দিয়াই বিশিষ্ট সেই কবিতাবহিটি হইল— ভবচক্র; ভাঙা সন্ধ্যাকালে (২০১৫)।

শতাব্দীর রক্তজলে মধু পড়ে টুপটাপ;
আয় তবে দুইজনে একসাথে উড়ি
মাঝে মাঝে শূন্য চাই, মাঝে মাঝে পথ চাই;
আর চাই ঝরাপাতা নুড়ি
অগ্নিদগ্ধ মহিলারা চাঁদ নিয়ে খেলা করে;
এই চাঁদ গিয়েছিল পুড়ে
জেগে ওঠে ষড়রিপু; ক্ষুধাতুর ষড়রিপু;
প্রতিদিন নব নব সুরে

(চন্দ্রপথ)

না, জহর অবশ্য বহির ভিতর তাঁহার কবিতা এইভাবে ভাঙিয়া ভাঙিয়া সাজান নাই। সেখানে রহিয়াছে লম্বা লম্বা মহাপয়ারবৎ লাইন। কিন্তু যেভাবেই সাজান, ভবচক্র; ভাঙা সন্ধ্যাকালে-র প্রায় সকল কবিতার অন্তঃশ্বাসে রহিয়া গিয়াছে আমাদের সেই পুরানা ত্রিপদীর চাল। মনে পড়িতে পারে, শাশ্বত বীজক্ষেত (২০০৫)-এ তাঁহার আফসোস ছিল— ‘বাংলা ছন্দের ব্যর্থ ওঝা ক্রমশই পয়ারে শেষ হয়’। আবার, শ্রাবণশ্রমিক (১৯৮২)-এ শুনিয়াছিলাম, সেই পয়ারেরই আয়ুকামনায় তাঁহার প্রার্থনা— ‘সখা তুমি বাংলার পয়ার বাঁচাও, সখা তুমি আমাদের সকলের পয়ার বাঁচাও’(শ্মশানের পাদদেশ)। পয়ারকে তিনি কতদূর বাঁচাইলেন-মারিলেন, কথা অবশ্য তাহা লইয়া নহে। এমন কি, ভবচক্র; ভাঙা সন্ধ্যাকালে-র কবিতায় কান পাতিলে যে এক তানপ্রধান গীতলতা রণিত হইতে থাকে, কথা তাহা লইয়াও নহে।

বৃষ্টি ও আগুনের মিউজিকরুম আর বিপজ্জনক ব্রহ্ম বালিকাবিদ্যালয়-এ গদ্য-পদ্যর সীমানা ভাঙচুরের নানাকিসিম পরিচর্চার পর এক দশক ছাড়াইয়া, বর্তমান বহিটির আবির্ভাব। মাঝে রহিয়াছে, জহরের আপন স্বাক্ষরবাহী শাশ্বত বীজক্ষেত (২০০৫), মাতৃভক্ত হেলেসাপ (২০০৮), তৃষিত ময়ূরের আত্মনিবেদন (২০১০), আর ছয়টি হিজলগাছ (২০১২)-এর মতো বহিগুলি। তৃষিত ময়ূরের আত্মনিবেদন-এর নামকবিতাটিতে সেই যে তিনি বলিয়াছিলেন— ‘আমি শুধু অবাধ্য লিরিক নিয়ে সাইকেল চালাতে চালাতে একদিন ঢুকে পড়ি/ ফুটফুটে সরস্বতীর আহত পদপ্রান্তের জায়মান দীর্ঘশ্বাসে’, সেই কথাই যেন সত্য হইয়া উঠিল এইবার। জহর গীতিকবিতায় গ্রস্ত হইলেন। কবিতা কখন কীভাবে নাজেল হইবে, তাহা বোধ করি খোদ কবিরও অজানা!

ভিতরে ভিতরে গীতিকবিতার প্রতি একটি আত্মিক টান তাঁহার ছিলই। সেই কবেই তিনি লিখিয়াছিলেন— ‘তুমি তারে আপন করিও/ তুমি তারে ভাষা দিও গীতিকবিতার’— প্রজাপতি, মহাকাল সমারূঢ় (১৯৮১)। লিখিয়াছিলেন— ‘দূর থেকে ভেসে আসে গীতিকবির হিম নির্জনতা’— শতভিষা, হৃদয়প্রণীত সন্ধ্যাজল (১৯৯৪)। তাহা ছাড়া, গীতিকবিতা কি তিনি ইতিপূর্বে আদৌ লিখেন নাই নাকি? ভালোই লিখিয়াছেন।

তাহা হইলে ভবচক্র; ভাঙা সন্ধ্যাকালে বহিটির কথা আলাদাভাবে বলিতেছি কেন? বলিতেছি, ইহা নিছক কিছু উত্তম গীতিকবিতার সংকলন বলিয়া মাত্র নহে। শাশ্বত বীজক্ষেত (২০০৫) কবিতাবহিতে যুক্তি-অযুক্তি-অতিরিক্ত এক অব্যাখ্যাতভাব-এর যে-স্ফুরণ আংশিকভাবে ঘটিয়াছিল, সেই ভাবগ্রস্ততা এইবার যেন আরও ডানা-শিকড় মেলিল। কবিতার ঠিক-বেঠিকের নয়া-পুরানা শাস্ত্র-মোতাবেক গড়িয়া-উঠা সংস্কারগুলি অজরুরি বল্কলবৎ ঝরিয়া গেল। এখন শুধু সময়সরণি ধরিয়া একাকী ছুটিয়া যাওয়া। পাথেয় কেবল ‘দেহভাণ্ডে ছিদ্র’, ‘আর কিছু নীরবতা; আর কিছু অগ্নিজল; তৎসহ দুই চোখ ভিজে’। সহজেই টের পাওয়া যায়, একটি পরিব্যপ্ত বিষণ্ণতার বোধ, অপূর্ণতার বোধ, ব্যর্থতার বোধ, অনিকেত সত্তার বোধ,এই বহির রচনাগুলিকে আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছে। অথচ সেই বিষাদ আধুনিক জীবনের ক্লান্তি বা নির্বিণ্ণতা সঞ্জাত নহে। বাংলাদেশের নদীতীরের গানের মতো, হৃদয়-নিঙড়ানো অথচ দিগন্তস্পর্শী তাহার স্বর—

১. আমাদের কিছু নেই; এই কথা লিখে রাখি প্রতিদিন হরিণীর পদতলে মিশে
২. কিছুই পারি না আমি, কঙ্কালের পিছু পিছু মাঝরাতে গৃহ ছেড়ে উড়ি
৩. অতি স্তব্ধ বিষণ্ণতা; পরিব্যপ্ত বিষণ্ণতা; চতুর্দিকে হিম/ রক্ষা করো ডুবে যাই, রক্ষা করো ডুবে যাই; আসিল না কেউ
৪. আমাদের কিছু নেই, চাঁদ আর চুলো নেই, চারিদিকে উড়ে যায় ব্যর্থ খড়কুটো
৫. আমাদের দেশ নেই; আমাদের নীড় নেই; মেরুদণ্ড একেবারে ফুটো

এই সামূহিক না-এর সামনে দাঁড়াইয়া প্রকৃতি কী করিতে পারে? একটি উচ্ছ্বসিত কান্নার ভিতর দিয়া নিজেকে সমর্পণের না-আধুনিক না-অধুনান্তিক পথটিই সে বাছিয়া লয়। কবিও সেই রোদনধ্বনিতেই কান পাতেন— ‘আমি শুধু কান্না শুনি, জলপথে স্থলপথে, অঙ্কুরিত বীজে’। বস্তুত এত অপূর্ব আশ্চর্য বিচিত্র কান্না এই বহির কবিতায় কবিতায় উৎসারিত, যেন একটি গোটা দেশের ছিন্নছেঁড়া মানচিত্রের বেদনাই বাজিয়া উঠে আমাদের মনে—

১. ধান আর অতিরিক্ত জল, তার পাশে বনভূমি কাঁদে
২, খড়কুটো উড়ে উড়ে কাঁদে; গাভীগুলো গৃহে ফিরে আসে
৩. জলপথে স্থলপথে হৃৎপিণ্ড মুখে নিয়ে চোখকানা হরিণেরা কাঁদে
৪. একটি শিয়াল শুধু কেঁদে যায় নিকটস্থ চক্রব্যূহ জালে
৫. জাগরিত জুঁইগাছে পৃথিবীর জোনাকিরা সারারাত কেঁদে কেঁদে ওঠে
৬. জল ছিল; অগ্নি ছিল; পিঁপড়ের ডিম ছিল; বালিকারা উঠেছিল কেঁদে
৭. তোমাদের কৃষিক্ষেতে শালিকের ছেঁড়া ঠ্যাং ধান আর খড়ে কেঁদে ওঠে
৮. হরিণের মাংস নিয়ে, আমাদের চারিপাশে, বনভূমি সারারাত কাঁদে
৯. শতাব্দীর অপরাহ্ন একা একা পদতলে কাঁদে
১০. বৃষ্টিভেজা গাছগুলি একদিন মর্গ থেকে স্বর্গে গিয়ে চুপিসাড়ে কাঁদে
১১. ভিজে গেল মেরুদণ্ড; ভিজে গেল কারুকৃতি; রান্নাঘরে মেয়েরাও কাঁদে
১২. কুহকের কুমকুমে বালিকারা শুধু কাঁদে, চারিদিকে জল শুধু জল

জগৎজুড়া অশ্রুপতনের ভারেই কি চারিদিক জলে ভাসিয়া যায়? কুরুক্ষেত্র ময়দানে সঞ্জয়ের মতো, এতরকম অশ্রুপতনের দ্রষ্টা হিসাবে, কবিকেও সেই কান্না স্পর্শ না-করিয়া পারে না— ‘কাঁদিলাম অতিরিক্ত মৌন বোধিমূলে’। কিন্তু শুধুমাত্র সেই বেদনাগাথার ভিতর দিয়া এই কাব্য শেষ হয় না। শুনা যায় শোককে অতিক্রম করিবারও ভাষা—

যতদূর দৃষ্টি যায় বাঘছাল পরিহিত নদী, চলে যায় পায়ে পায়ে অসম্ভব বনভূমি চিরে
একতারা বেজে ওঠে, বাউলের মাথা থেকে উড়ে যায় প্রজাপতি নিখিলের নীড়ে
তুমি কেন বসে থাকো? চলো আজ দুইজনে একসাথে মিশে যাই ছাইচাপা আগুনের দেশে
আমাদের মৃতদেহ, আজ নয় কাল নয়, সৎকার হবে শোনো শতাব্দীর শেষে

(সৎকার)

মনে হয় না কি, এ যেন এক কবিরই আত্মপরামর্শের বয়ান? যেন নিজেকেই তিনি বুঝাইতেছেন, শত বেদনা সত্ত্বেও স্থবিরতার কোনও অবকাশ নাই। সৃজনলীলার ভিতর দিয়াই নিজেকে বিলীন করিয়া দিতে হইবে আগ্নেয় আত্মধ্বংসের গরিমায়। মনে হয়, নিজের বকলমে আমাদের আরও একটু ভরসাও তিনি দিতেছেন, আজ যে-কবিতার মর্ম বুঝা গেল না, হয়তো শতাব্দী শেষে তাহা গ্রাহ্য হইবে!

আসলেই, জহর লিখিয়াছেন এক অনাগত উত্তরকালের জন্য (অবশ্য, শতাব্দী পার হইতে হয় নাই, সে-কাল ইতোমধ্যেই হাজির)। পূর্বজদের দিকে তাকাইয়া যে তিনি লিখেন নাই, ইহা তাঁহার ঐতিহাসিক কাণ্ডজ্ঞান আর আপন শক্তির উপর ন্যায্য আস্থারই সূচক। বাংলার কাব্যপরিমণ্ডল লইয়া তিনি যথেষ্ট হুঁশিয়ার। এবং সে-বিষয়ে ইতস্তত কিছু তির্যক ও উপভোগ্য মন্তব্যও তিনি করিয়াছেন। যেমন—

১. বাংলা অভিধানের ওপর মৃত কিছু স্বপ্ন নিয়ে খেলা করে/ মূর্খ হাঁস মূর্খ শালিক/ ফোস্কাপড়া নদীর ওপর দুলে ওঠে রুগ্ন ভাষা (মূর্খ হাঁস,ষড়রিপু ষড়যন্ত্র, ১৯৯৬)
২. প্রত্যহ স্বপ্নেরা দৌড়ে যাচ্ছে বাংলার ব্যর্থ সব কুস্তিগীরের দিকে (জোনাকি, শাশ্বত বীজক্ষেত, ২০০৫)
৩. এইখানে কোনো পাখি বাংলা ছন্দ শিখতে আসে না (চাঁদ, ঐ, ২০০৫)
৪. একজন ব্যর্থ লেখক ছিপ ফেলে পুকুর থেকে জলে ডোবা বাংলাভাষা এইমাত্র/ তুলে আনল (মাতৃদুগ্ধ, ছয়টি হিজলগাছ, ২০১২)
৫. ঘুম ভেঙে রাত্রিকালে দেখি, কাব্যগ্রন্থ সারাঘর একা একা হেঁটে বেড়াচ্ছে/ আর কিছু নিরীহ পিঁপড়ে মধু চাটবে বলে চুপচাপ বসে আছে (মলমূত্র,স্বপ্নগাছ; বোকা স্বপ্নগাছ, ২০১৮)

আমরাও সেই মধুলোভী পিঁপড়ার দলে। কিন্তু মধু হইতে মাধ্বী তৈয়ারের প্রযুক্তি কাল হইতে কালে বদলাইয়া যায়। আর এই কালান্তরের রেখা যে কখন টানা হইবে তাহা আন্দাজ করা কঠিন। কিন্তু তাহা একবার টানা হইয়া গেলে, রেখার এপারে-ওপারে দুস্তর ফারাক। দেশভাগের বিরহের মতোই (অবশ্য সবাইকে সে-বিরহ জ্বলায় না) কালভাগের এই বিরহও (অবশ্য সবাইকে সে-বিরহ জ্বলায় না) বুঝি অনতিক্রম্য। সেই বিরহটুকু সম্বল করিয়া, জহরেরই একটি কবিতা দিয়া এই বাচালতা থামাই—

তোমার কাব্যগ্রন্থের ভেতর আজ প্রবেশ করলাম
দু-পাশে দুটি হিজলগাছ
মাঝখানে বৃষ্টিভেজা কাব্যগ্রন্থ
সেইখানে প্রেমিকের মৃতদেহের ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
পৃথিবীর ব্যর্থ প্রেমিকা কাঁথার ওপর শিল্প করে
সেইখানে প্রেমিকার মৃতদেহের ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
পৃথিবীর ব্যর্থ প্রেমিক চারাগাছ রোপণ করে
তোমার কাব্যগ্রন্থের ভেতর আজ প্রবেশ করলাম
বৃষ্টিভেজা কাব্যগ্রন্থ
ফোঁটা ফোঁটা জল শুধু জল
ফোঁটা ফোঁটা জল শুধু জল
সেই জল স্পর্শ করে মনে মনে একটানা বলি
হিজলগাছ, তুমি এই কাব্যগ্রন্থ পারো যদি রক্ষা করো
সসম্মানে রক্ষা করো

(চারাগাছ,স্বপ্নগাছ; বোকা স্বপ্নগাছ, ২০১৮)

 

লেখাটি অতি সম্প্রতি (জানুয়ারি ২০২১) পশ্চিম বাংলা থেকে প্রকাশিত ক্রৌঞ্চদ্বীপ পত্রিকার জহর সেনমজুমদার সংখ্যায় ছাপা হয়েছে।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ১৮ ফাল্গুন ১৩৫৮, ২ মার্চ ১৯৫২, কানপুর, উত্তর প্রদেশ, ভারত। শিক্ষা : উচ্চ মাধ্যমিক। পেশা : লেখালেখি। প্রকাশিত বই : কবিতা— কলম্বাসের জাহাজ [১৯৭৭, উলুখড়, হাওড়া] হননমেরু [১৯৮০, উলুখড়, হাওড়া] পৌত্তলিক [১৯৮৩, উলুখড়, হাওড়া] অমর সার্কাস [১৯৮৯, আপেক্ষিক, হাওড়া] চক্রব্যূহ [১৯৯১, আপেক্ষিক, হাওড়া] নদীকথা [১৯৯৭, যুক্তাক্ষর, হাওড়া] আমি আলো অন্ধকার [১৯৯৯, অফবিট, কলকাতা] সাঁঝের আটচালা [২০০২, কীর্তিনাশা, কলকাতা] আধপোড়া ইতিহাস [২০০৪, কীর্তিনাশা, পুরুলিয়া] অক্ষর শরীরে মহামাত্রা পাব বলে [২০০৬, কীর্তিনাশা, পুরুলিয়া] নির্বাচিত কবিতা [২০১০, সংবেদ, ঢাকা] আখেরি তামাশা [২০১৩, ছোঁয়া, কলকাতা] ঐতরেয় [২০১৩, রূপকথা, ক্যানিং] উজানি কবিতা [২০১৪, মনফকিরা, কলকাতা] ধ্যানী ও রঙ্গিলা [২০১৫, চৈতন্য, সিলেট] কলম্বাসের জাহাজ (২য় সং) [২০১৬, রাবণ, কলকাতা] বনপর্ব [২০১৬, সংবেদ, ঢাকা] কে বলে ঈশ্বর গুপ্ত? [ধানসিড়ি, কলকাতা, ২০১৬] বাক্যের সামান্য মায়া [ভাষালিপি, কলকাতা, ২০১৭] রাক্ষসের গান [চৈতন্য, সিলেট, ২০১৭] কবিতাসংগ্রহ [প্রথম খণ্ড, রাবণ, কলকাতা, ২০১৭] ইতস্তত কয়েক কদম [কাগজের ঠোঙা, কলকাতা, ২০১৮] বাজিকর আর চাঁদবেণে [পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি., ঢাকা, ২০১৮]  দীনলিপি [শুধু বিঘে দুই, আন্দুল, ২০১৯]   গদ্য— গরুররচনা (বৈ-বই বা ই-বুক) [২০১২, www.boierdokan.comখেয়া : এক রহস্যময় বিপরীতবিহারের ঝটিকালিপি [কুবোপাখি, কলকাতা, ২০১৭] বহুবচন, একবচন [বইতরণী, কলকাতা, ২০১৮] সময়পরিধি ছুঁয়ে [ঐহিক, কলকাতা, ২০১৮  অবাক আলোর লিপি [অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, নয়াদিল্লি, ২০১৯]    নাটক— হননমেরু [মঞ্চায়ন : ১৯৮৬] অনুবাদ— আষাঢ়ের এক দিন [মোহন রাকেশের হিন্দি নাটক, শূদ্রক নাট্যপত্র, ১৯৮৪] যৌথ সম্পাদনা— অভিমান  (১৯৭৪-৯০), যুক্তাক্ষর (১৯৯২-৯৬), কীর্তিনাশা (২০০২-০৫)  ই-মেইল : gc16332@gmail.com

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।