রবিবার, এপ্রিল ১৪

জীবন অপেরা : সমান্তরাল জগৎ, উইশফুল থিংকিং

0

আমি বিজ্ঞানের ছাত্র। হাত দেখা, ভাগ্যগণনা, নিউমারলজি, ভবিষ্যদ্বাণী এইব্যাপারগুলো আমার কাছে অবৈজ্ঞানিক মনে হয়। তবু প্রতি শনিবার পত্রিকা খুলে প্রথমেই কাওসার আহমেদ চৌধুরীর লেখা ‘আপনার রাশি’ পড়ি। আগ্রহ নিয়েই পড়ি। যে শনিবার ওনার লেখা ছাপা হয় না— মনে হয়, সপ্তাহটা শুরু হবে না।

ভাগ্য জানার জন্য যে পড়ি তা নয়। তার গদ্য ভালো লাগে বলে পড়ি। ঝরঝরে গদ্যে যদি লেখা হয়, তাহলে হয়তো আমি টেলিফোন ডিরেক্টরিও পড়ে শেষ করে ফেলতে পারব। এভাবে পড়তে পড়তেই একদিন আবিষ্কার করলাম যে তিনি একটা বই লিখেছেন ‘ভাগ্য জানার উপায়’। বইটা কিনে এনে পড়তে শুরু করি। সেখান থেকেই  এ উপন্যাসের আইডিয়া।
কাওসার আহমেদ চৌধুরীর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

জীবন অপেরা ।। আলভী আহমেদ ।। প্রচ্ছদ : রাজীব দত্ত ।। প্রকাশক : বাতিঘর ।। প্রথম প্রকাশ : মার্চ ২০২১ ।। মূল্য : ৩৬০ টাকা

এবার অন্য আরেকটা ব্যাপারে আসি। প্যারালাল ইউনিভার্স বা সমান্তরাল জগৎ। কোয়ান্টাম ফিজিকস অসংখ্য সমান্তরাল জগতের অস্তিত্ব স্বীকার করে। রেললাইনের মতো তারা সমান্তরালভাবে বয়ে যাবে। কিন্তু কখনো তাদের মধ্যে দেখা হবে না। এক জগতের কোনো কিছু অন্য জগতে যেতে পারবে না।

এই জিনিসগুলো কেউ চাইলে আজগুবি বলে মনে করতে পারে। আজগুবি এবং অপ্রয়োজনীয়। মুভির আইটেম সংয়ের মতো। মূল ফিজিকসে জিনিসটা না ঢোকালেও চলে। কিন্তু ঢোকালে গ্ল্যামার বাড়ে। বাজার কাটতির জন্য বিজ্ঞানীরা জোর করে এসব আমদানি করেছেন বলে মনে হতে পারে।

কোয়ান্টাম ফিজিকসে বিজ্ঞানীরা বলেন, n সংখ্যক জগৎ থাকতে পারে। যেখানে n একটা অসীম সংখ্যা। এ ব্যাপারে ওয়েভ ফাংশন বের করেছেন তাঁরা। সেই ফাংশনের ল্যাব সিমুলেশনও করেছেন। সিমুলেশনের রেজাল্ট প্রমাণ করে এ রকম অসংখ্য আলাদা জগৎ থাকতে পারে। হয়তো এ জগতে আমি ঢাকায় থাকি, অন্য জগতে আমেরিকায়। আরেক জগতে উগান্ডায়। আমার আলাদা আলাদা জীবন। এ জগতে আজ বৃষ্টি। অন্য জগতে তুষার পড়ছে। এ জগতের আমি অন্য জগতে গেলে ওয়েভ ফাংশন কলাপস করবে। ভজঘট লেগে যাবে।

এগুলো নিয়ে বেশি ভাবতে গেলে মাথায় সমস্যা দেখা দেবে। গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যাখ্যা আপনি খুঁজে পাবেন না। অবশ্য ব্যাখ্যা থাকবেও-বা কীভাবে? এর যদি কোনো ব্যাখ্যা থাকত, তাহলে পৃথিবীর সব লোক বিভিন্ন মাত্রায় বিভিন্ন জীবনের মধ্য দিয়ে নেচে-গেয়ে বেড়াত। পয়সাওয়ালা মানুষ যেমন বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ায়, তারপর শেষ বয়সে এসে একটা দেশে গিয়ে থিতু হয়, ঠিক তেমনি বিভিন্ন জীবনের মধ্য দিয়ে ঘুরে বেড়িয়ে সবচেয়ে নিখুঁত জীবনটাতে গিয়ে আমরা থামতাম।

সেই পৃথিবীতে প্রতিটা মানুষই হতো তার স্বপ্নের সমান বড়। নিজেকে যে জায়গায় দেখতে চায়, সেই জায়গায় সে দেখতে পেত।

‘জীবন অপেরা’ সেই অসম্ভব জীবনের গল্প। প্রেমের গল্প। উইশফুল থিংকিংয়ের গল্প। যে জীবন যাপন করা হয়নি সেই জীবনের গল্প।

সায়েন্স ফিকশন নয় এটি। বিজ্ঞানের উড়োজাহাজে আপনি চাপবেন। কিন্তু ঘুরে বেড়াবেন পৃথিবীর প্রাচীনতম অনুভূতির রাজ্যে। প্রেম এসে হানা দেবে। এ গল্প ভালোবাসার গল্প।

উপন্যাসের গল্পটা সংক্ষেপে একটু বলে দিই। বইয়ের ফ্ল্যাপে যেরকম লেখা থাকে সেরকম অল্পকথায় বলি:

সব মানুষের একটামাত্র জীবন। রফিকের জীবন দুটো। সে এক জীবন থেকে আর এক জীবনে ঢুকে পড়েছে। ব্যাপারটা অবলীলায় ঘটে গেছে। যেন ঢাকা থেকে বাসে চেপে ফরিদপুর চলে গেল। নতুন জীবনে তার জন্য শারমিন আছে।

একটা পথ বা রাস্তা যখন শুরু হয়, তখন তার দুটো মুখ থাকে। এক মুখ দিয়ে ঢুকলে আর এক মুখ দিয়ে বের হওয়া যায়। রাস্তাগুলো সেভাবেই তৈরি করা হয়। বের হবার মুখ না থাকলে সেই রাস্তাকে বলে কানাগলি। কানাগলি থেকেও চাইলে বের হওয়া যায়। পেছন দিকে হাঁটলেই হলো। যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, সেখানে ফেরা যায়।

কিন্তু ফাঁদ হলো এমন একটা জিনিস যেখানে টোপ ফেলে ভেতরে টেনে আনা হয়, পেছনে বের হবার দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়। তিল তিল করে সেখানে পচে মরতে হয়। শারমিনের লোভ দেখিয়ে রফিকের জন্য একটা ফাঁদ পাতা হয়েছিল। সে বোকার মতো এসে ফাঁদে ধরা দিয়েছে।

নাটক সিনেমায় দু-একটা পাসিং শট দেওয়ার জন্য রাস্তা থেকে লোক ধরে নিয়ে আসা হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ডিরেক্টর তাকে ক্যামেরার সামনে দাঁড়া করিয়ে দেন। তখন সেই লোকটা চোখে-মুখে বিভ্রান্ত একটা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে। কিছু না বুঝেই এমন একটা চিত্রনাট্যে অভিনয় করতে শুরু করে, যার অংশ সে নয়। রফিক নিজের সাথে সেই আনাড়ি অভিনেতার মিল খুঁজে পায়। এমন একটা জীবনে সে অভিনয় করে যাচ্ছে যে জীবন অন্য কারো। সে আসলেই ফাঁদে পড়েছে।

কিন্তু সে কি আদৌ ফাঁদ থেকে বের হতে চায়? নাকি ফাঁদে আটকা পড়াটাকেই সে সৌভাগ্য বলে মনে করে? শারমিনকে ছাড়া যে জীবন, সেই জীবন কি সে চায়?

০২.
এবার ব্যক্তিগত কিছু আলাপ করা যাক। উপন্যাস লেখার গল্প বলি। এগুলো বলা খুব জরুরি নয়। কিন্তু বলতে ইচ্ছা করছে। আর আমার যা করতে ইচ্ছা করে তা করে ছাড়ি। আমি এই রকম।

অগাস্ট মাসে প্রথম চ্যাপ্টার লিখলাম। পুরোটা উত্তম পুরুষে লেখা হলো। কিন্তু সেটা কি আদৌ কোনো উপন্যাসের শুরু বলে চালিয়ে দেওয়া যায়? পাঠক কি এরকম শুরু মেনে নেবে? সন্দেহে পড়ে গেলাম। আমার দুজন বেটা রিডার আছে— মাবরুকা আর মাইন। হালকা স্ল্যাং ব্যবহার করে বলা যায়, ‘তারা আমার বান্ধা কাস্টমার।’ লেখা ছাপানোর আগে তাদের পড়তে দিই সবসময়। দুজনকেই পিডিএফ করে পাঠালাম লেখাটা। তারা খুব উৎসাহ দিল। বলল, ভালো হয়েছে। খুব ভালো।

‘কুত্তার পেটে ঘি সয় না’— কথাটা শুনেছি এতদিন। নিজে উপন্যাস লিখতে গিয়ে হাতেনাতে প্রমাণ পেলাম। তারা এত বেশি ভালো বলল যে আমি সন্দেহে পড়ে গেলাম। মনে হলো, কোথাও কোনো একটা ঝামেলা আছে। আদৌ কিছু হয়নি বোধহয় লেখাটা। আমার লেখা এত ভালো হবার পেছনে যুক্তিগ্রাহ্য কোনো কারণ নেই। আমার কট্টর সমালোচক বন্ধু আছে দুজন— নুসরাত আর শরীফ। তাদেরকে পড়তে দিলাম। তারা নির্মম সমালোচনা করল। শরীফ খুব ক্যাজুয়ালি বলল, এইগুলান কী হাবিজাবি লিখছ? তোমার প্যানপ্যানানির চেয়ে তো ফেসবুক স্ট্যাটাস পড়া ভালো। ফেসবুক স্ট্যাটাস কাম সাহিত্য লিখছ কেন? তোমারে ক্যাডা লিখতে বলছে? এইগুলান আমারে পড়তে দিবা না। আমার ম্যালা কাম আছে। আজাইরা।

শেষের ‘আজাইরা’ শব্দটা শরীফ বলেনি। ভদ্রতা করে স্কিপ করে গেছে। কিন্তু আমি তার বিরক্তি থেকে শব্দটা অনুমান করে নিয়েছি। নুসরাত খুবই খুঁতখুঁতে স্বভাবের। তার রুচি উঁচুতে টিউন করা। সে বলল,  ঠিকই আছে। কিন্তু প্রথম চ্যাপ্টার এত বড়ো কেন? কে পড়বে? ভেঙে ছোটো করো।

আমি ভাঙলাম। শুধু যে ভাঙলাম, তা-ই নয়। পুরোটা নতুন করে শুরু করলাম। ফার্স্ট পারসনে ‘আমি’ হিসাবে উপন্যাসটা লিখব বলে ভেবেছিলাম। সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলাম। থার্ড পারসন ন্যারেটিভে লেখা শুরু হলো। সমালোচনা আমার জেদ বাড়িয়ে দেয়। সবসময় দেয়। মনে হয়, আমাকে আরো নিখুঁত হতে হবে। আমাকে পারতে হবে। হেরে গেলে হবে না।

মনে হলো, ক্যামেরায় গল্প বলেছি এতদিন। এখন কাগজ কলমে বলতে চাচ্ছি। এই তো বিষয়টা? মিডিয়াম বদলে গেছে। মূল কাজ তো বদলে যায়নি। এখনও আমি গল্পই বলব। কেন পারব না? কন্ট্রোল প্লাস এ চেপে পুরোটা সিলেক্ট করে ডিলিট করে দিলাম। নতুন করে শুরু হলো। এভাবে লিখতে লিখতে আবিষ্কার করলাম উপন্যাসের প্রথম অধ্যায় ভেবে যেটা লিখতে শুরু করেছিলাম সেটা হয়ে গেছে সাত নম্বর অধ্যায়। নবম অধ্যায় জায়গা পেয়েছে প্রথম অধ্যায় হিসেবে। কী একটা অবস্থা!

সম্পাদনা পর্যায়ে জাফর আহমদ রাশেদ, আলতাফ শাহনেওয়াজ, লুনা রুশদী, মোজাম্মেল মাহমুদের মতো গুণী কবি ও লেখকদের সাহায্য পেয়েছি। তারা পুরোটা কষ্ট করে পড়েছেন। ফাইন টিউনিংয়ে সাহায্য করেছেন। গল্পে ছিদ্র খুঁজে বের করেছেন। আমি চেষ্টা করেছি সেই ছিদ্র বুজে দিতে। লেখালেখি মস্তিস্কের ডানদিকের কাজ। আর সম্পাদনা বামদিকের। সেখানে কল্পনাপ্রবণতার কোনো জায়গা নেই। যুক্তি দিয়ে মেলাতে হয় সবকিছু। প্রশ্ন করতে হয় নিজেকে। উত্তরটাও নিজেকেই খুঁজে বের করতে হয়।

পুরো প্রক্রিয়ায় বার বার পান্ডুলিপি পরিবর্তন হয়েছে। প্রকাশনা জগতে পছন্দের এক মানুষ আছে আমার— রুম্মান তার্শফিক। সে নানা পরামর্শ দিয়েছে। এই সাহায্য ও সহযোগিতা না পেলে হয়তো আমি আত্মবিশ্বাস পেতাম না। বই আকারে প্রকাশের সাহস হতো না। বাতিঘরের দিপঙ্কর দাসের হাতে তুলে দেবার বদলে আমার ল্যাপটপেই পড়ে থাকত পাণ্ডুলিপি।

উপন্যাসটা লেখার সময় আমার একজনের কথা খুব মনে পড়েছিল। আমাদের বাশার স্যার। ফিজিকস পড়াতেন। ক্যাডেটে কলেজে তখন আমরা ক্লাস নাইনে পড়ি। ক্লাসে একদিন বাশার স্যার পড়ালেন, W = F×S
অর্থাৎ, কাজ = বল × সরণ
সরণ যদি শূন্য হয়, তুমি যত চেষ্টাই করো না কেন, সেটা কাজ হবে না।
কাজ = বল × ০ = ০
কথাটার ভেতরের অর্থও তিনি আমাদের বুঝিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তুমি যতই দেয়াল ধরে ধাক্কাধাক্কি করো না কেন, দেয়াল যদি না নড়ে সেটাকে কাজ বলা যাবে না।
আমার গোটা জীবনের সারমর্মই বোধহয় এই নির্মম কথাটা।

কিছু হবে না জেনেও যারা দিনের পর দিন চেষ্টা করে যায়— সেই সব মানুষের জন্য এই উপন্যাসটা উৎসর্গ করেছি।

বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন রাজীব দত্ত। বাতিঘর (বাংলামোটর) থেকে বইটা প্রকাশিত হচ্ছে এই মার্চে। ২০২১ বইমেলায়। প্রি-অর্ডারও করা যায় বাতিঘরের ই-কমার্স সাইট থেকে। দারুণ ব্যবস্থা।

বিজ্ঞাপন
প্রিয় লেখক, ২০২১ গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত আপনার বইটি নিয়ে লিখুন ‘আমার বই’ বিভাগে। লেখা পাঠান আমাদের ইমেইলে। সঙ্গে আপনার এবং বইয়ের পরিচিতিমূলক তথ্য এবং ছবি। লেখা পাঠানোর মেইল : editor.sreebd@gmail.com

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

আলভী আহমেদ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ কৌশলে স্নাতক। পেশাগত জীবনে যন্ত্রপাতির খটমট বিষয়ে না গিয়ে বেছে নিয়েছেন অডিও ভিজুয়াল ফিকশন নির্মাণ। টেলিভিশন মিডিয়ার জন্য নাটক রচনা ও পরিচালনা করেন। সিনেমার বড় পর্দায়ও অভিষেক হয়েছে। লেখালেখি তার নেশা। নিজের নাটক, সিনেমার জন্য গল্প, চিত্রনাট্য লিখতে গিয়ে তার লেখার অভ্যাস গড়ে উঠেছে। আলভী আহমেদ হারুকি মুরাকামির তিনটি উপন্যাস অনুবাদ করেছেন—'নরওয়েজিয়ান উড', 'হিয়ার দ্য উইন্ড সিং' এবং 'পিনবল, ১৯৭৩'। বইগুলো বাতিঘর থেকে প্রকাশিত হয়েছে। তার অনুবাদে প্রকাশিত হয়েছে, মুরাকামির গল্প সংকলন, 'কনফেশনস অব আ সিনেগাওয়া মাংকি'। প্যারালাল ইউনিভার্সের ওপর তার প্রথম মৌলিক উপন্যাস 'জীবন অপেরা' ২০২১-এ প্রকাশিত হয়েছে। ১১ জন নিঃসঙ্গ মানুষকে নিয়ে লেখা 'ব্লাইন্ড স্পট' তার প্রথম গল্পগ্রন্থ। ইংরেজিতে লেখা তার পেপারব্যাক গল্পগ্রন্থ 'ঢাকা ড্রিমস' অ্যামাজনে ফিকশন বেস্ট সেলার ক্যাটাগরিতে শীর্ষে ছিল তিন সপ্তাহ।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।