রবিবার, নভেম্বর ২৮

ডরোথি পার্কারের গল্প : একটি টেলিফোন কল | অনুবাদ : জান্নাতুল নাঈম পিয়াল

0

প্লিজ, ঈশ্বর, ও যেন আমাকে ফোন করে। ঈশ্বর, ওকে বলো আমাকে ফোন করতে।

আমি আর কখনো তোমার কাছে কিছু চাইব না। সত্যিই চাইব না। এটা তো খুবই সামান্য একটা চাওয়া। তোমার কাছে এটা সামান্য তো বটেই। খুব, খুব সামান্য। শুধু ওকে বলো আমাকে ফোন করতে। প্লিজ,  ঈশ্বর। প্লিজ,  প্লিজ,  প্লিজ।

যদি আমি এটা নিয়ে আর না ভাবি, তাহলে হয়তো ফোন বাজবে।

মাঝেমধ্যেই এমনটা হয়। যদি আমি অন্য কিছু নিয়ে চিন্তা করি। যদি আমি একদম ভিন্ন কিছু নিয়ে চিন্তা করি। আমি পাঁচ-দশ করে পাঁচ শ পর্যন্ত গুনে দেখতে পারি। 

মাঝেমধ্যেই এমনটা হয়। যদি আমি অন্য কিছু নিয়ে চিন্তা করি। যদি আমি একদম ভিন্ন কিছু নিয়ে চিন্তা করি। আমি পাঁচ-দশ করে পাঁচ শ পর্যন্ত গুনে দেখতে পারি। এর মধ্যে হয়তো রিং বাজবে। আমি খুব আস্তে আস্তে গুনব। একদমই ছলনা করব না। এমনও যদি হয় যে মাত্র তিন শ অবধি যেতেই রিং বেজে উঠেছে, তা-ও আমি থামব না। পাঁচ শ পর্যন্ত গোনা শেষ হওয়ার আগে আমি ফোন ধরব না।

পাঁচ, দশ, পনেরো, বিশ, পঁচিশ, ত্রিশ, পঁয়ত্রিশ, চল্লিশ, পঁয়তাল্লিশ, পঞ্চাশ…

ওহ প্লিজ!প্লিজ রিংটা বাজ,প্লিজ!

এই আমি শেষবারের মতো ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছি। আর তাকাব না।

সাতটা বাজতে দশ মিনিট বাকি। ও বলেছিল, পাঁচটার সময় ফোন দেবে। ‘আমি তোমাকে পাঁচটার সময় কল দেব, প্রিয়তমা,’ এমনটাই ও বলেছিল। হ্যাঁ, আমার যতদূর মনে পড়ে,  এখানেই ও আমাকে ‘প্রিয়তমা’ বলে ডেকেছিল। আমি এ ব্যাপারে একদম নিশ্চিত। সব মিলিয়ে ও আমাকে দুইবার ‘প্রিয়তমা’ বলে ডেকেছে। একবার এখানে, অন্যবার যখন ও আমাকে বিদায় জানাচ্ছিল। তখন ও বলল, ‘গুড বাই, প্রিয়তমা।’

ও অনেক ব্যস্ত ছিল। অফিসে থাকতে বেশি কথা বলতে পারে না। তারপরও ও আমাকে দু-দুবার ‘প্রিয়তমা’ বলে ডাকল। আমি ফোন করেছি বলে ও মোটেই রাগ করেনি। আমি জানি, আমার এভাবে বারবার ওকে ফোন করা উচিত না।

ওরা এগুলো পছন্দ করে না। যখন তুমি এটা করো, ওরা জেনে যায় যে তুমি ওদের কথা ভাবছ, ওদেরকে চাইছ, আর তাই ওরা তোমাকে ঘৃণা করতে শুরু করে।

কিন্তু আমি ওর সঙ্গে তিনদিন কথা বলিনি। হ্যাঁ,তিনদিন কথা বলিনি। আর আজ ফোন করেও শুধু এটুকুই জানতে চাইলাম যে ও কেমন আছে। এমন তো যে কেউ ফোন করতে পারে। ও নিশ্চয়ই এতে কিছু মনে করেনি। নিশ্চয়ই ও ভাবেনি যে আমি ওকে বিরক্ত করছি।

‘না, না, অবশ্যই তুমি আমাকে বিরক্ত করছ না,’  ও নিজের মুখের বলেছে। তারপর আরও বলেছে, ও আমাকে ফোন করবে।

ওর এটা বলার দরকার ছিল না। আমি ওর কাছে এটা চাইনি, সত্যিই চাইনি। আমি নিশ্চিত আমি চাইনি। আমার মনে হয় না ও আমাকে ফোন করার কথা বলেও পরে ফোন না করা হবে। প্লিজ,  ঈশ্বর, ওকে এমনটা করতে দিও না। প্লিজ দিও না।

‘আমি তোমাকে পাঁচটার সময় কল দেব, প্রিয়তমা।’

‘গুড বাই, প্রিয়তমা।’

ও এত ব্যস্ত ছিল। ওর এত কাজের তাড়া ছিল। ওর আশেপাশে এত লোকজন ছিল। কিন্তু তারপরও ও আমাকে দু-দুবার ‘প্রিয়তমা’ বলে ডেকেছে।

এই ডাকটা আমার, শুধুই আমার। এটা আমার পরম সম্পদ। যদি আর কখনো আমি ওকে না-ও দেখি, তারপরও এই ডাকটা আমার কাছে থাকবে।

না, না, তা কেন! এটা তো খুবই সামান্য ব্যাপার। এটা মোটেই যথেষ্ট নয়। কোনো কিছুই যথেষ্ট নয়, যদি আমি আর কখনো ওকে দেখতে না পারি।

প্লিজ, ঈশ্বর, আমি যেন আবার ওকে দেখতে পারি। প্লিজ, আমি ওকে অনেক বেশি করে চাই। অনেক অনেক চাই। আমি ভালো হয়ে থাকব, ঈশ্বর। আমি আরও ভালো হওয়ার চেষ্টা করব, সত্যিই করব, যদি তুমি আবারও আমাকে দেখতে দাও ওকে। যদি তুমি ওকে দিয়ে আমাকে ফোন করাও। হায় ঈশ্বর, প্লিজ এখনই ওকে দিয়ে ফোন করাও।

ঈশ্বর, আমার প্রার্থনাকে এত নগণ্য মনে কোরো না। তুমি তো ওখানে ঠায় বসে থাকো, কত শ্বেতশুভ্র তুমি, কত বৃদ্ধ। তোমার চারপাশে দেবদূতের দল, তোমার পাশ দিয়ে ছুটে চলেছে তারকারাজি। আর আমি কিনা তোমার কাছে একটা টেলিফোন কলের জন্য প্রার্থনা করছি!

প্লিজ, ঈশ্বর, হেসো না। দেখো, তুমি কিন্তু জানো না এই অনুভূতিটা কেমন। তুমি তো নিরাপদে আছো, আসীন হয়ে তোমার সিংহাসনে, নীল ঘূর্ণি বয়ে চলেছে তোমার নিচ দিয়ে। কিছুই তোমাকে স্পর্শ করতে পারে না; কেউ নিজ হাতে তোমার হৃদয়কে দুমড়ে-মুচড়ে দিতে পারে না।

এ এক যন্ত্রণা, ঈশ্বর, এ এক ভীষণ রকমের, বাজে ধরনের যন্ত্রণা। তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে না? তোমার পুত্রের দোহাই, আমাকে সাহায্য করো। তুমিই তো বলেছিলে, তাঁর নাম করে তোমার কাছে যে আর্জিই পেশ করা হোক না কেন, তুমি তা রাখবে।

এ এক যন্ত্রণা, ঈশ্বর, এ এক ভীষণ রকমের, বাজে ধরনের যন্ত্রণা। তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে না? তোমার পুত্রের দোহাই, আমাকে সাহায্য করো। তুমিই তো বলেছিলে, তাঁর নাম করে তোমার কাছে যে আর্জিই পেশ করা হোক না কেন, তুমি তা রাখবে। হায়, ঈশ্বর, তোমার একমাত্র প্রিয়তম পুত্র, যীশু খ্রীষ্টের নামে প্রার্থনা করছি, হে প্রভু, ও যেন আমাকে ফোন করে এখনই।

আমার এখন এই পাগলামি থামানো উচিত। এভাবে কিছু হয় না।

দেখো, যদি একজন যুবক একজন যুবতীকে বলে যে সে তাকে ফোন করবে, কিন্তু পরে আর না করে, তাহলে সেটা তো খুবই বাজে ব্যাপার, তাই না? কেন, এটা তো ঠিক এই মুহূর্তে, সারা বিশ্বজুড়ে ঘটে চলেছে। হায়, বিশ্বজুড়ে কী ঘটছে তাতে আমার কী? ফোনটা কেন বাজছে না? কেন এটা বাজছে না? কেন বাজছে না?

এই ফোন, কেন তুই বাজছিস না? বিচ্ছিরি, কদাকার একটা বস্তু! তুই যদি একটু বাজিস, তাহলে কি তোর খুব ক্ষতি হয়ে যাবে? ও না, তাতে তুই ব্যথা পাবি। জাহান্নামে যা তুই। আমি দেয়াল থেকে তোর নোংরা শেকড় টেনে ছিঁড়ে ফেলব। আমি আছাড় মেরে তোকে ভেঙে ফেলব, টুকরো টুকরো করে দেব। জাহান্নামেই যা তুই।

না, না, না। আমার উচিত এখন এগুলো বন্ধ করা। আমার অবশ্যই উচিত অন্য কিছু নিয়ে চিন্তা করা। সেটাই করব আমি এখন। ঘড়িটাকে অন্য ঘরে নিয়ে যাব। তাহলে আর আমি ঘড়ির দিকে তাকাতে পারব না। যদি আমার তাকাতেই হয়, তাহলে আমাকে হেঁটে বেডরুম পর্যন্ত যেতে হবে। আর তখন আমি করার মতো কোনো একটা কাজ পেয়ে যাব।

হয়তো আমি পরেরবার ঘড়ির দিকে তাকানোর আগেই ও আমাকে কল দেবে। আমি ওর সাথে খুব মিষ্টি করে কথা বলব, যদি ও আমাকে কল দেয়। যদি ও বলে যে আজ আমার সঙ্গে দেখা করতে পারব না, আমি বলব, ‘কেন, আচ্ছা ঠিক আছে, সোনা। কেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই ঠিক আছে সবকিছু।’

আমি ঠিক সেরকমই ব্যবহার করব, যেমনটা ওর সঙ্গে প্রথম দেখায় করেছিলাম। তাহলে ও হয়তো আমাকে আবারো পছন্দ করবে। শুরুর দিকে তো আমি সবসময়ই খুব মিষ্টি ছিলাম। হায় কপাল, কাউকে ভালোবাসতে শুরু করার আগে তাদের সঙ্গে মিষ্টি ব্যবহার করা কতই না সহজ!

আমার মনে হয়, ও নিশ্চয়ই এখনো আমাকে কিছুটা পছন্দ করে। যদি ও আমাকে এখনো খুব সামান্য পরিমাণও পছন্দ না করত, তাহলে নিশ্চয়ই আজ দু-দুবার ‘প্রিয়তমা’ বলে ডাকত না আমাকে। তার মানে এখনো সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি, যদি ও আমাকে এখনো কিছুটা পছন্দ করে, এমনকি সেটার পরিমাণ যদি অতি ক্ষুদ্রও হয়।

তাহলে দেখছ তো, ঈশ্বর, তুমি যদি ওকে দিয়ে একটাবার ফোন করাও, তাহলে আমার আর কখনোই তোমার কাছে কিছু চাওয়ার থাকবে না। আমি ওর সঙ্গে খুব মিষ্টি ব্যবহার করব, আমি খুব আনন্দিত হবো, ঠিক যেমনটা আমি আগে ছিলাম, আর তাই দেখে ও আবারো আমাকে ভালোবাসবে। তারপর তোমার কাছে আমাকে আর কখনোই কিছু চাইতে হবে না।

তুমি কি দেখতে পাচ্ছো না, ঈশ্বর? তবে কি তুমি প্লিজ ওকে দিয়ে একবার আমাকে ফোন করাবে না? তুমি কি করাবে না? প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ?

তুমি কি আমাকে শাস্তি দিচ্ছ, ঈশ্বর, কারণ আমি খারাপ ছিলাম? তুমি কি আমার উপর রেগে আছো? হায় ঈশ্বর, কিন্তু, চারিদিকে তো কত খারাপ মানুষই ঘুরে বেড়াচ্ছে। তুমি কেবল আমার সঙ্গেই এতটা নিষ্ঠুর হতে পারো না।

তাছাড়া আমি তো খুব খারাপ কিছু করিনি। অবশ্যই খুব খারাপ কিছু হতে পারে না সেটা। আমি তো কারো ক্ষতি করিনি, ঈশ্বর। কোনো কাজ কেবল তখনই খারাপ হয়, যখন তাতে মানুষের ক্ষতি হয়। আমি একটা প্রাণেরও ক্ষতি করিনি। তুমি তো সেটা জানো। তুমি জানো এটা খারাপ ছিল না। তাই না, ঈশ্বর? তাহলে তুমি কি ওকে দিয়ে আমাকে ফোন করাবে না?

ও যদি আমাকে ফোন না করে, তাহলে আমি জানব ঈশ্বর আমার উপর রেগে আছে। আমি পাঁচ-দশ করে পাঁচশো পর্যন্ত করব। এর মধ্যে যদি ও আমাকে কল না দেয়, তাহলে আমি জানব ঈশ্বর আর কখনোই আমাকে সাহায্য করবে না। এটাই হবে একটা সঙ্কেত।

পাঁচ, দশ, পনেরো, বিশ, পঁচিশ, ত্রিশ, পঁয়ত্রিশ, চল্লিশ, পঁয়তাল্লিশ, পঞ্চাশ, পঞ্চান্ন… এটা খারাপ ছিল। আমি জানি এটা খারাপ ছিল। আচ্ছা বেশ, ঈশ্বর, আমাকে নরকে পাঠিয়ে দাও। তুমি ভাবছ, আমাকে তোমার নরকের ভয় দেখিয়ে কাবু করে ফেলছ, তাই না? তোমার নরক আমার চেয়েও খারাপ।

আমার উচিত না। আমার অবশ্যই এমনটা করা উচিত না। হয়তো ও একটু দেরি করে ফেলছে আমাকে কল দিতে। তাতে এমন পাগল হয়ে যাওয়ার কিছু হয়নি। হয়তো ও আমাকে ফোন দেবেই না। হয়তো ও সরাসরি আমার সঙ্গে দেখা করতে চলে আসবে। তারপর যদি ও এসে দেখে আমি কাঁদছি, তাহলে ও খুব রাগ করবে।

ওরা চায় না তোমাকে কাঁদতে দেখতে। ও নিজেও তো কাঁদে না। ঈশ্বরের কাছে আমার প্রার্থনা, একবার যদি আমি ওকে কাঁদাতে পারতাম। ইশ, আমি যদি ওকে কাঁদাতে পারতাম, কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে গড়াগড়ি খাওয়াতে পারতাম, আর অনুভব করতে পারতাম ওর হৃদয় খুব ভারি হয়ে আছে, কষ্ট পাচ্ছে! ইশ, আমি যদি একবার ওকে নরকসম যন্ত্রণা দিতে পারতাম!

ও কখনো আমার ব্যাপারে এমন কামনা করে না। আমার মনে হয় না ও এমনকী জানেও যে ও আমাকে কেমন অনুভব করায়। হায়, ও যদি জানত! ওকে যদি আমার নিজে থেকে এগুলো জানানো না লাগত!

ওরা তোমাকে পছন্দ করে না, যখন তুমি ওদেরকে বলো যে ওরা তোমাকে কাঁদিয়েছে। ওরা তোমাকে পছন্দ করে না, যখন তুমি ওদেরকে বলো যে তুমি ওদের কারণে অসুখী। যদি তুমি ওদেরকে এগুলো বলো, ওরা ভাবে তুমি অনেক বেশি পজেসিভ, তুমি অনেক বেশি বাড়াবাড়ি করছো। আর তখন ওরা তোমাকে ঘৃণা করে। যখনই তুমি তোমার নিজের কোনো চিন্তার কথা ওদেরকে বলো, ওরা তোমাকে ঘৃণা করে। তাই তোমাকে সবসময়ই ওদের সঙ্গে ছোট ছোট খেলা খেলে যেতে হবে।

হায় রে! আমি ভেবেছিলাম আমাদের এমন কিছু করার দরকার হবে না। আমি ভেবেছিলাম আমাদের সম্পর্কটা এতটাই বড় যে আমি যখন খুশি আমার মনের কথা বলতে পারব।

কিন্তু না, আমার মনে হয়, তুমি কখনোই তা পারবে না। হয়তো কোনো সম্পর্কই কখনো যথেষ্ট বড় নয় এর জন্য।

তাই ও যদি আমাকে ফোন করে, আমি ওকে বলব না যে আমি ওর জন্য কষ্ট পাচ্ছিলাম, দুঃখে ছিলাম। ওরা দুঃখী মানুষকে ঘৃণা করে। তাই ও ফোন করলে আমি এতটাই মিষ্টি ব্যবহার করব, এতটাই উচ্ছ্বসিত হব যে, ও আমাকে পছন্দ না করে পারবে না। শুধু একটাবার যদি ও আমাকে ফোন করে।

ও হয়তো আসলে ওটাই করছে। ও হয়তো আমাকে না জানিয়েই এখানে চলে আসছে। এই মুহূর্তে ও হয়তো রাস্তায় আছে। নাকি ওর কিছু একটা হয়েছে! না, ওর কখনোই কিছু হতে পারে না। আমি কল্পনাও করতে পারি না ওর সঙ্গে খারাপ কিছু ঘটেছে।

ও হয়তো আসলে ওটাই করছে। ও হয়তো আমাকে না জানিয়েই এখানে চলে আসছে। এই মুহূর্তে ও হয়তো রাস্তায় আছে। নাকি ওর কিছু একটা হয়েছে! না, ওর কখনোই কিছু হতে পারে না। আমি কল্পনাও করতে পারি না ওর সঙ্গে খারাপ কিছু ঘটেছে। আমি কখনোই কল্পনা করতে পারি না ও গাড়ির নিচে চাপা পড়েছে। আমি কখনোই কল্পনা করতে পারি না ও মাটিতে নিথর হয়ে পড়ে রয়েছে, মারা গেছে।

আমি মাঝেমধ্যে চাই ও যেন মরে যায়। এটা একটা বীভৎস চাওয়া। কিংবা এটা একটা চমৎকার চাওয়া। ও যদি মরে যায়, তাহলে ও আমার হবে। ও যদি মরে যায়, তাহলে আমাকে এই মুহূর্ত কিংবা বিগত কয়েক সপ্তাহের কথা ভাবতে হবে না। আমি তখন শুধু আমাদের আনন্দময় সময়গুলোর কথা চিন্তা করতে পারব। যখন সবকিছুই ছিল কত সুন্দর। আমি চাই ও মরে যাক। মরে যাক, মরে যাক, মরে যাক।

এটা খুবই ছেলেমানুষি হচ্ছে। কেউ তোমাকে ফোন করবে বলে সঠিক সময়ে ফোন না দিলেই তুমি যদি তার মৃত্যুকামনা করো, তাহলে অবশ্যই সেটা খুব ছেলেমানুষি।

হয়তো ঘড়িটা আজ খুব দ্রুত চলছে। আমি জানি না, আসলে হয়তো এটা ঠিকই আছে। কিংবা হতে পারে, ওর হয়তো একদমই দেরি হয়নি। যেকোনো কারণেই তো ও সামান্য দেরি করতে পারে। হতে পারে ওকে আজ অফিসে একটু বেশি সময় থাকতে হচ্ছে। এমনও হতে পারে যে ও বাসায় গিয়েছে আমাকে কল দেবে বলে, আর ঠিক তখনই কেউ একজন চলে এসেছে। আমি তো জানি, ও অন্য লোকজনের সামনে আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে স্বস্তিবোধ করে না।

হয়তো ও নিজেও চিন্তিত, খুব সামান্য পরিমাণে হলেও। আমাকে অপেক্ষা করিয়ে রাখার জন্য। এমনও হতে পারে যে ও আশা করছে আমি নিজেই ওকে ফোন করি। আমি সেটা করতে পারি। অবশ্যই ওকে ফোন করতে পারি।

কিন্তু না, আমার এটা করা উচিত হবে না। অবশ্যই আমার উচিত হবে না। হায়, ঈশ্বর! প্লিজ আমাকে দিয়ে ওকে ফোন করিও না। প্লিজ আমাকে এটা করা থেকে বিরত রাখো। আমি জানি, ঈশ্বর, ঠিক যেমন তুমিও জানো। ও যদি আমার ব্যাপারে সত্যিই চিন্তিত হতো, তাহলে ও অবশ্যই আমাকে ফোন করত। ও কোথায় আছে কিংবা ওর আশেপাশে কতজন মানুষ আছে, এসব কিছুতেই ওর কিছু যেত-আসত না। প্লিজ, ঈশ্বর, এই ব্যাপারটা আমার মাথার মধ্যেও ভালো করে ঢুকিয়ে দাও।

আমি তোমাকে বলছি না আমার জন্য কাজটা সহজ করে দাও। আমি জানি তুমি সেটা করতে পারবে না। শুধু আমাকে সত্যিটা বুঝিয়ে দাও, ঈশ্বর। আমাকে বৃথা আশা করতে দিও না। আমাকে দিও না নিজেকে নিজে এভাবে সান্ত্বনা দিতে। প্লিজ আমাকে আশা করতে দিও না, ঈশ্বর। প্লিজ, দিও না।

আমি ওকে ফোন করব না। যতদিন আমি বেঁচে আছি, কখনোই ওকে ফোন করব না। আমি ওকে ফোন দেয়ার আগে ও নরকে পচে মরুক। তোমার আমাকে শক্তি দেয়ার প্রয়োজন নেই, ঈশ্বর। আমার নিজেরই যথেষ্ট শক্তি আছে। ও যদি আমাকে চাইতই, তবে ও আমাকে পেত। ও জানে আমি কোথায় আছি। ও জানে আমি ওর জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু ও তো আমার ব্যাপারে নিশ্চিত, খুব বেশি নিশ্চিত।

আমি মাঝেমধ্যে ভেবে অবাক হই, কেন ওরা তোমাকে ঘৃণা করতে শুরু করে, যে-ই না ওরা তোমার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যায়। আমি তো ভাবতাম কারো ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া খুব ভালোলাগার একটা বিষয়।

ওকে ফোন দেয়াটা খুব সহজ একটা ব্যাপার হতো। তাহলেই আমি সবকিছু জেনে যেতাম। হয়তো ওকে ফোন দেয়াটা কোনো বোকামিও হতো না। হয়তো ও কিছুই মনে করত না। হয়তো ওর বিষয়টা ভালোই লাগত। হয়তো ও নিজেই আমাকে ফোনে পাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু কখনো কখনো এমন তো হয়ই যে কাউকে ফোনে ধরার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু পাওয়া যায় না। অথচ ওদিকে জানিয়ে দেয়া হয়, আপনার কাঙ্ক্ষিত নম্বরটি উত্তর দিচ্ছে না।

তুমি তো জানো, ঈশ্বর, এমনটা সত্যিই হয়ে থাকে।

হায়, ঈশ্বর, আমাকে ফোনের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখো। প্লিজ, দূরে সরিয়ে রাখো। আমার মাঝে সামান্য পরিমাণ হলেও গর্ব অবশিষ্ট রাখো। আমার এটার প্রয়োজন হবে, ঈশ্বর। আমার মনে হয়, শেষ পর্যন্ত এটুকুই হবে আমার শেষ সম্বল।

কিন্তু হায়, গর্ব দিয়েই বা কী হবে, যদি ওর সঙ্গে কথা না বলতে পারাকেই আমি সহ্য করতে না পারি? এরকম গর্ব তো খুবই তুচ্ছ ব্যাপার। সত্যিকারের গর্ব, সবচেয়ে বড় গর্ব তো এটাই যে কোনো কিছু নিয়ে গর্ব না করা। আমি এ কথা শুধু এ কারণে বলছি না যে আমি ওকে কল দিতে চাই। আমি আসলে চাই না। এটাই সত্যি। আমি জানি এটাই সত্যি। আমি বড় হবো। আমি যেকোনো ছোটখাটো গর্বের চেয়ে বড় হবো।

প্লিজ, ঈশ্বর, আমাকে দূরে সরিয়ে রাখো। প্লিজ, ঈশ্বর, আমাকে ফোন করতে দিও না।

আমি দেখতে পাচ্ছি না এর সঙ্গে গর্বের কী সম্পর্ক। এটা তো খুবই ছোট একটা কাজ আমার জন্য, এখানেও গর্বের প্রসঙ্গ টেনে আনা কেন? গর্ব নিয়ে এত বেশি মাথা ঘামানো কেন?

আমি হয়তো ওর কথা বুঝতে ভুল করেছি। ও হয়তো আমাকেই পাঁচটার সময় কল দিতে বলেছে। ‘আমাকে পাঁচটার সময় কল দিও, প্রিয়তমা।’ ও হয়তো এটাই বলেছে। হ্যাঁ, এটা বলাই সবচেয়ে সঙ্গত ব্যাপার। হতেই পারে যে আমি ওর কথা ঠিকভাবে শুনিনি।

‘আমাকে পাঁচটার সময় কল দিও, প্রিয়তমা।’ আমি প্রায় নিশ্চিত, ও আমাকে এ কথাই বলেছে। ঈশ্বর, আমাকে এভাবে নিজের সঙ্গে কথা বলতে দিও না। প্লিজ, আমাকে এখন জানতে দাও, সবকিছু জানতে দাও।

আমি এখন অন্য কিছু করব। আমি স্রেফ চুপ করে বসে থাকব। আমি নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকতে পারি। আমি সেভাবেই বসে থাকব। কিংবা আমি পড়তে পারি। হায়, সব বই-ই তো সেইসব মানুষদের নিয়ে, যারা একে অন্যকে ভালোবাসে, সত্যিকারের ভালোবাসে, খুব মিষ্টি করে ভালোবাসে।

লেখকরা কী চায় আসলে? তারা কেন এগুলো লেখে? তারা কি জানে না এগুলো সত্যি নয়? তারা কি জানে না, ঈশ্বর, যে এগুলো মিথ্যে, ডাহা মিথ্যে? কী দরকার তাদের এসব বলে, যখন তারা জানে যে এগুলোর ফলে মানুষের যন্ত্রণাই কেবল বাড়ে? গোল্লায় যাক তারা। মরুক সবাই।

ওকে ভালোবাসি বলে কি আমি সহজ-স্বাভাবিক হতে পারব না? আমি পারব। সত্যিই বলছি, আমি পারব। আমি ওকে কল দেব, খুব সহজ হয়ে কথা বলব। তুমি দেখো, আমি পারি কি না, ঈশ্বর।

আমি বই পড়ব না। আমি চুপ করে থাকব। কোনো কিছুর ব্যাপারেই উত্তেজিত হওয়ার নেই। দেখো। ধরো, ও যদি এমন কেউ হতো, যাকে আমি ভালোমতো চিনি না। কিংবা ও যদি কোনো মেয়ে হতো। তাহলে তো আমি স্রেফ ওকে ফোন করে বলতাম, ‘অ্যাই, ঈশ্বরের দোহাই, কী হয়েছে তোমার?’ এমনটাই আমি করতাম, আর কখনোই সেটা নিয়ে এত বেশি ভাবতাম না। ওকে ভালোবাসি বলে কি আমি সহজ-স্বাভাবিক হতে পারব না? আমি পারব। সত্যিই বলছি, আমি পারব। আমি ওকে কল দেব, খুব সহজ হয়ে কথা বলব। তুমি দেখো, আমি পারি কি না, ঈশ্বর।

হায় ঈশ্বর, না। প্লিজ আমাকে দিয়ে ফোন করিও না। করিও না, করিও না, করিও না।

ঈশ্বর, তুমি কি ওকে দিয়ে আমাকে ফোন করাবে না? তুমি কি এ ব্যাপারে নিশ্চিত, ঈশ্বর? তুমি কি একটু দয়া দেখাতে পারো না? একটু নরম হতে পারো না? আমি তো এমনকী তোমাকে এটাও বলছি না যে ওকে দিয়ে এখনই, এই মুহূর্তেই, আমাকে ফোন করাও। আমি বলছি ও যেন কিছুক্ষণের মধ্যে আমাকে ফোন করে। আমি পাঁচ-দশ করে পাঁচশো পর্যন্ত গুনব। খুব ধীরে ধীরে, কোনো প্রতারণা না করে। যদি এর মধ্যে ও আমাকে ফোন না করে, তাহলে আমিই ওকে কল দেব। হ্যাঁ, আমিই দেব।

হায় ঈশ্বর, প্লিজ, দয়াময় ঈশ্বর, আমার স্বর্গের পবিত্র পিতা, ওকে দিয়েই আগে ফোনটা করাও। প্লিজ, ঈশ্বর।

পাঁচ, দশ, পনেরো, বিশ, পঁচিশ, ত্রিশ, পঁয়ত্রিশ…

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম বাগেরহাটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত। লিখতে ভালো লাগে।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।