রবিবার, জুলাই ২১

তুমি আছো, চাঁদ ও সূর্যের সীমানায় : চরু হক

0
চরু হক

কবি নূরুল হকের সঙ্গে কবিক্যনা চরু হক

শুইয়ে রেখে এলাম বাবাকে নেত্রকোণার মদন থানার বালালী গ্রামে। বাবার অন্তিম ইচ্ছানুযায়ী আমার পিতামহ-পিতামহীর পাশে চির নিদ্রায় শায়িত তিনি। দীর্ঘ সতেরো দিন রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আইসিইউ বেডে থেকে, প্রায় একমাসের মতো করোনার সাথে সংগ্রাম করতে করতে দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করে চির শান্তির দেশে চলে গেছেন বাবা এখন। ২২শে জুলাই, বিকেল চারটার মতো হবে। আমি আব্বার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। দেখে মনে হলো সকাল থেকে অনেকক্ষণ কষ্ট পাওয়ার আব্বা একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। আমি আমার ভাইকে বললাম, ‘চুপ, একদম কথা বলো না। আব্বা ঘুমাচ্ছে।’ আমরা চুপচাপ আছি আব্বার পাশে।আব্বা আমাদের ফাঁকি দিয়ে চিরঘুমের দেশে চলে গেলেন, চিরকালের জন্য।

এই লেখাটি আমি লিখছি আব্বারই ছোট্ট নির্জন কক্ষটিতে বসে। সামনে রাখা প্রদীপের আলো আর আব্বার ছবি বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে— ‘কে বলে আমি নেই, এই তো আমি আছি। তোমার পাশেই আছি, মামণি।’ আব্বা তাঁর মমতাভরা সৌম্য দুই চোখ দিয়ে এখন ঠিক আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। তাঁর করুণামাখা প্রশান্ত দৃষ্টি নিয়ে।

আব্বার লেখা ‘কাল ভোরে’ এখন আমার চোখের সামনে—

‘সত্যাসত্যের ভিতর দিয়ে আমি গান গাই
…….প্রাণের হাতল ধরে অন্ধকারে জন্মলাভ করি
…….তুমি না আমার শতবর্ষের জীবন, এই রাত
…….কাল ভোরের কোনোকিছুর দিকেই
……………………আমি আর তাকাবোনা
………………………………তাকাবোনা।’

আর কোনোকিছুর দিকেই আব্বা আর তাকাবে না, সেকি হয়? বাবা যে ছিল আমার সমস্ত পৃথিবী। যে ছোট্ট মেয়েটি বাবার আঙুলে আঙুল জড়িয়ে প্রথম বেরিয়েছে পৃথিবী দেখতে, এই পৃথিবীর অবাক করা সৌন্দর্য যাঁর চোখ দিয়েই আমি দেখেছি, তাঁর সাথে শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন হবার আগের দিন পর্যন্ত; তাঁকে ছাড়া এখন আমি কিভাবে চলব! কে আমাকে নিয়ে যাবে সমুদ্রে, পাহাড়ে, পাঁচ বছরের ছোট্ট শিশুর আঙুল ধরে ধরে। আব্বা, তুমি কি দেখতে পাচ্ছো তোমার শিশু কন্যাটি এখনো শিশুই রয়ে গেছে। তুমি কি দেখতে পাচ্ছো, তোমার পরিবার, সন্তানের পাশাপাশি তোমার কতো শুভাকাঙ্ক্ষী, কত প্রিয়মুখ শোকে মূহ্যমান হয়ে আছে!

‘মৃত্যুতে আমার কোনো সমস্যা নেই
কারণ
জীবনে তো মৃত্যুই ভরা আছে
তাতেই তো বসবাস করি
তাই
মৃত্যুতে আমার কোনো গড়িমসি নেই
যখনই লগ্ন হবে তখনই পাড়ি’

সত্যি বাবা, মাত্র একমাসের মধ্যে, এত তাড়াতাড়ি, কাউকে না জানিয়ে তুমি চলে গেলে। চুপিসারে। এত চুপচাপ, এত হঠাৎ করে তুমি চলে যাবে, কেউ কি জানত? বড়ো অভিমান করে আছি বাবা আমরা সবাই তোমার উপর। বিদায় না নিয়ে তুমি চলে গেলে বাবা, ঝরা পাতা আর মরা বাতাসের পথ ধরে। এই জগতের প্রতি, জীবনের প্রতি অভিমান কি তোমারও কোথাও জমে উঠেছিল, বাবা।

চরু হক ২

কবি নূরুল হকের সঙ্গে কবিক্যনা চরু হক

নেত্রকোণা জেলার মদন থানার বালালী গ্রামে ১৯৪৪ সালের ২৫শে নভেম্বর সূর্যালোকে পদার্পণ করেন আমার বাবা। ভাটি এলাকার হাওর ও নদীবেষ্টিত এই গ্রাম অনেকটা সময়ই থাকে নীল জলরাশিতে থৈ থৈ। আষাঢ় মাসের ভাসা পানির দেশ। বড়ো দরিদ্র এই গ্রামের মানুষ। চারদিকে ছড়ানো-ছিটানো ছোটো ছোটো কুঁড়েঘর, মাঝে মাঝে দু’একটা টিনের ঘর। ভাটি এলাকার খানদানি পরিবারদের জন্য ওগুলো বরাদ্দ। এই গাঁয়েরই একটি খানদানি অথচ মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে আমার বাবা অর্থাৎ বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি নূরুল হকের জন্ম। পিতা মো. আবু সাইদ মুন্সি ছিলেন মসজিদের ইমাম। মা মজিদা খাতুন। দাদা মো. শাহানেওয়াজ মুন্সি, তাঁর বাবা মো. সলিম মুন্সি ও তাঁর বাবা মো. রওশন মুন্সি। এঁদের সকলেই ছিলেন স্বপ্রতিষ্ঠিত মসজিদের ইমাম। ইমামতির জন্য তাঁরা কেনো প্রকার হাদিয়া নিতেন না। আমার দাদা অর্থাৎ আবু সাইদ মুন্সির পূর্ব-পুরুষরা ছিলেন পীর। কবি নূরুল হক পীর বংশের সন্তান। আর তাই তাঁর রক্ত ধারায় বইছে প্রতিদিনকার জীবন-জটিলতার কোলাহল এড়িয়ে নিষ্কলুস, নির্মোহ একটি জীবন যাপন করার গভীর আকাঙ্ক্ষা। তাঁর সারাটা জীবন এক অনন্য সাধনা। নিজেকে বিকশিত করার, হয়ে ওঠার সাধনা।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মুহম্মদ নূরুল হুদা বাবার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি তাঁর বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ নূরুল হক আমাদের কবিতা জগতের এক স্বতন্ত্র নাম। গত শতকের ষাটের দশকে বাংলাদেশের কবিতায় তাঁর উজ্জ্বল আবির্ভাব।’ প্রিয় ছাত্রের প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন আমাদের সকলের পরম শ্রদ্ধেয় চিন্তাবিদ অধ্যাপক যতীন সরকার, বাংলা একাডেমির উপ-পরিচালক সরকার আমিনসহ গণমাধ্যমের বিভিন্ন গুণীজন, তাঁর বন্ধু পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, কাছের-দূরের যারা বাবাকে ভালোবাসেন এবং অনেক সুহৃদ, যাঁদের নাম আমি বলে শেষ করতে পারব না। যাঁদের কাছে আমার ঋণও কোনোদিন শোধ করতে পারব না। আমি তাঁদের প্রত্যেকের কাছে হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

ড. সরকার আমিন বাবার কিছু ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে। সেখানে বাবার কাছে তিনি জীবনে কি লক্ষ্য থাকা উচিত তা জানতে চেয়েছিলেন। প্রত্যুত্তরে স্মিত হাসি দিয়ে বাবা জবাব দিয়েছিলেন, ‘জীবনে আসলে কোনো লক্ষ্যের প্রয়োজন নেই। জীবন নিজেই একটা লক্ষ্য।’ জীবনকে উপলব্ধি করা, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে, প্রতিটি পদক্ষেপকে উৎসবের মতো আস্বাদন করাই ছিল আব্বার জীবনবোধের মূল নোঙর। ওশো রজনীশের একটি বাক্য আব্বা প্রায়ই আওড়াতেন, ‘মনে রেখো, ঝড় তোমার চারদিকে। কিন্তু তুমি ঝড় নও। তুমি থাকবে সদা-সর্বদা শান্ত, সমাহীত।’ তেমনি দেখতাম বাইরে থেকে যখনই বিক্ষুব্ধ ঘটনাবলী আকস্মিক এসে আব্বাকে চুরচুর করে দিতে চাইত, আব্বা তখনই আশ্রয় নিতেন অন্তরতম সত্তার গভীরে। হোক না বাইরে যতোই সীমাহীন ঝড়, আঘাত, ভেতরে ততোই তিনি জ্বালাতেন তাঁর শান্ত প্রদীপশিখা। কী আশ্চর্য দ্যুতি তার, কী অদ্ভুত শক্তিমান আর স্থির।


চরু হক ৩

কবি নূরুল হকের সঙ্গে কবিক্যনা চরু হক


২০২০ সালে চৈতন্য প্রকাশনী থেকে বের হলো আব্বার ‘কবিতাসমগ্র’। কবি সরকার আমিন কবিতা সমগ্র প্রকাশিত হবার পেছনে আব্বার অনুভূতি ব্যক্ত করতে বলেছিলেন। আব্বা জানান, ‘এই প্রকাশ নিয়ে আব্বা ব্যাকুল নন। কেননা, আব্বার এখনও মৃত্যু হয়নি।’ একটু পরিহাসের সুরেই বুঝি বলা কথাটা। আরও জানান, ‘তার বহু লেখা এদিকে-সেদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সেগুলোও সংগ্রহ করে একত্রিত করা প্রয়োজন। আর তাছাড়া আত্মপ্রচার আব্বার জীবনের মূল লক্ষ্য নয়। আব্বার জীবনের মূল লক্ষ্য এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের মহা-যজ্ঞের সাথে, মহাশক্তির সাথে একীভূত হওয়া। ‘

অনুজ কবি সরোজ মোস্তফার বাবাকে নিয়ে আলোচনার কিছু অংশ তুলে ধরছি। ‘খুব চুপচাপ, নিরিবিলি অন্তর্মুখী এক আশ্চর্য এক মানুষ ছিলেন কবি নূরুল হক। আমাদের কালের সবচেয়ে নির্জন এবং সময়ে চেয়ে অগ্রসর কবি হয়ে সমাজ জাগ্রত মানুষের হৈচৈ থেকে দূরে এক স্বভাব নির্জনতায় কোনো এক গানের কলি গাইতে গাইতে আপন খেয়ালে হাঁটতেন তিনি। যেন নিজেকে জানতেন তিনি। তাই নিজেতে নিজেই একাকার, নিজের সত্তার অভিমুখী। যেন মেঘ, বৃষ্টি, জল, নদী, জাম্বুরা ফুলে সুবাস সহ পৃথিবীর সবার দিকেই তাকিয়ে একটা স্নিগ্ধ ও পবিত্র হাসিতে মিশে যেতেন। কোথাও ভেঙে পড়া নেই; সর্বত্র যুক্ত হওয়া। সবাইকে নিয়ে, সবার পাশে থেকে একটা আশাবাদ ও ভালোবাসার রেণু ছড়িয়ে দেয়াই ছিল কবির কাজ।’ সেটাই প্রতিভাত হয় যখন বাবার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়—

‘যখন একটা পাখি এসে
…………………..পাঠ করতে শুরু করে
…………………..আমার কবিতার কোনো পঙক্তি
…………………..…….স্তব্ধতার দৈবছায়া ঘেঁষে,
আমি অবাক হই।
সূর্যের কলজে থেকে উদগীর্ণ হয়ে
…………………..যখন সুবে সাদিক নামে
…………………..…………………..নিঝুম ভোরবেলায়,
এবং এক ঝলক আলো এসে
………………………………..চমক দিয়ে
গুণগুণ করতে থাকে আমার কবিতার খসড়া
আমি অবাক হই।
একটি জাতির অগুণতি আত্মা
…………………..কোন শিশির ফোঁটা হয়ে
…………………..…………………..সামান্য ঘাসের তীর্থে নেমে পড়ে
এবং অনুরাগ ঢালতে থাকে
আমার শরীরের গভীরে লুকানো কেনো
…………………..কবিতার সংকলণে,
আমি অবাক হই।’

এক অপার মমতায় এই অবাক বিস্ময়কে তুলে ধরাই ছিল কবির কবিতাগুলোর মূল লক্ষ্য, যা আত্ম-প্রচারের অহমিকাতে প্রবেশ করতে পারেনা কেনো ফাঁক-ফোঁকর গলেই।

কবি নূরুল হক বাউল হতে চেয়েছিলেন। পীর বংশের সন্তান হিসেবে রক্তস্রোতে সর্বদা প্রবাহিত হতো জীবনকে জানার জানার এক ব্যাকুল পিপাসা। আর তাইতো শৈশবে কোন এক নির্জন আলোয় মোমবাতি হাতে মসজিদে মানত করেছিলেন বাউল হওয়ার জন্য, সরল জীবনের অপার্থিব সুষমায় জারিত হওয়ার জন্য।

খুব অল্পে তুষ্ট একজন মানুষ ছিলেন আমার বাবা। সবকিছুর মধ্যেই একটা পরিমিতি, সংহতি। বিলাসিতা থেকে দূরে, বহু দূরে ছিল তাঁর নির্জন আশ্রম। সেই নির্জন আশ্রমে ছিল বই আর বই, পাখির কিচির মিচির, সবুজ পল্লবিত শাখাদের সহচর্য, আকাশ ভরা আলো আর মহাজগতের প্রাণ-প্রবাহের এক চলমান উৎসব। বলতেন সবসময়, ‘কারো কাছে কখনো কোনো প্রত্যাশা করবে না। প্রত্যাশা করলেই শেষ।’ বলতেন, ‘তোমার ভেতরেই তো বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড, আনন্দের দশদিক প্লাবিত উৎস। নিজের ভেতরে ডুব দাও। দেখবে, সবগুলো দুয়ার একে একে খুলে গেছে। আর তুমি সেখানে একাকী জেগে আছো প্রাণ-পদ্ম হয়ে।’—

‘কথা বলতে হয় না কখনো
…..কথারা নিজেই
…………………..কথাহীনতার মাঝে
…………………..…………………..ডুবে গিয়
আশ্চর্য কথা হয়
ফুটে থাকে দেবতার ফুল হয়ে
ডালের মাথায়।’

—‘ফুল’ অগ্রন্থিত কবিতা।

আর তাই শতাব্দীর এই ঘোর অমানিশা আর হানাহানির মধ্যে দাঁড়িয়েও তিনি নির্বিকার একাকী জেগে থাকেন আত্মদীপ জ্বেলে—

‘হতাশ হইনি।
নরকের অভ্যন্তরে
……………এই অন্ধকারে
…………………..ঘোর অন্ধকারে
কলজে জ্বলে
…………..আলোর টুকরোর মতো।

দেখে অবাকই লাগে।
স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝখানে
…………………..রাতের গভীর তারা
…………………..যে রকম জাগে

আর ধুয়ে দেয়ে জগতের মুখ
…………………..তেমনি কোনো দীপায়ন
সঙ্গোপনে পোড়ায় আমাকে।’

—‘আত্মদীপ ভব’   স.আ.ছ.প.র

কন্যা হিসেবে এই আমার ব্যক্তি জীবনে দেখা কবি নূরুল হককে, যিনি একটি ঋজু জীবন যাপন করেছেন প্রতিটি মুহূর্তে এবং একটি উৎসব মুখর জীবন যাপন করেছেন আপাদমস্তক। আর সেই উৎসব মুখর জীবন-যাপনের বাহ্যিক রসদ কী ছিল? বই, অগুনতি প্রাণের ছায়া, মাটির গন্ধ আর জগতের প্রাণ-প্রবাহ। ভোলা সরকারি কলেজে বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করাকালীন ভোলার এক পীরের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তার একটি কথা আব্বা আমাদের সবসময় বলতেন। সেটি হলো, ‘সাদা সিদা খানা, পায়ে দলে চলনা, বানোয়াটকা চিজ ইস্তামাত না কারনা।’ যতদূর মনে পড়ছে এইরকমই একটা কথা।যায় অর্থ দাঁড়ায়, ‘খাবার খাবে সাদাসিদা, চলতে হবে পায়ে হেঁটে এবং কৃত্রিম জিনিস সর্বদা পরিহার করে চলতে হবে।’ আব্বা নিজের জীবনেও ঐ পীরের কথাগুলোরই পদাঙ্কসরণ করেছিলেন। আব্বার আহার-বিহার, চলন-বলন, জীবন যাপন-সবই ছিল সন্তের মতোই; সরল নিরলঙ্কার। তাঁর কবিতার মতোই নিরলঙ্কার কিন্তু হীরকদ্যুতির ন্যায় অপার্থিব বোধের আকরে পূর্ণ। তাই তাঁর কবিতার মতো সাধারণের মধ্য দিয়েই তিনি খুঁজে বেড়ান অসাধারণকে। তাঁর কাছে কবিতা ও জীবন ছিল একে অন্যের পরিপূরক। কবিতার দিকেই ফিরে আসি। প্রখ্যাত কবি ও প্রাবন্ধিক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী বাবাকে নিয়ে যে কথাগুলো বলেছিলেন, তার কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি,—

চরু হক ৪

কবি নূরুল হকের সঙ্গে কবিক্যনা চরু হক

‘নূরুল হকের কবিতার সঙ্গে এই আমার প্রথম পরিচয় এবং স্বীকার করছি, অজানা ও নতুন কেনো কবির সঙ্গে পরিচয়ের আগ্রহ তেমন একটা করি না আজকাল। কবিতা যে মনোযোগ দাবী করে, সেই মনোযোগের স্রোতে পড়েছে ভাটির টান। নূরুল হক ও তাঁর কাব্য ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’ আমার সেই অভ্যাসের বন্ধ দরোজায় আঘাত করেছে। আমি দেখেছি, কবি হিসেবে তিনি আমার কাছে এতোদিন অপরিচিত হলেও তিনি নতুন নন, বয়সের হিসেবে ও কবিতাচর্চার হিসেবে। একটা মহলে তিনি আগে থেকেই পরিচিত ও সমাদৃত, সেটাও জানার সুযোগ করে দিল তাঁর এই কাব্য। প্রথম পাঠে এই কবিতাগুলো আমাকে বারবার ফিরে পড়ার লোভ দেখিয়েছে।’ আরো লিখেছেন— ‘এই কবির আলোচনায় উদ্ধৃতির লোভ সামলানো সত্যিই কঠিন। প্রায় প্রতিটি কবিতার তন্বী দেহে এতো লাবণ্য বাঁধা আছে, কথার অতীত এতো অকথিত ভাবনা আছে, শব্দের স্পষ্টতার সঙ্গে এতো রহস্য জড়িয়ে আছে, যে আমি এই কবিতার পাঠক, কতটা বুঝলাম আর কতটা বুঝলাম না, সেই হিসেব মুলতবী রাখতে বাধ্য হই, ওই লাবণ্যের দিকে চোখ ফেরাই।’ ‘তাই প্রেম শব্দটি একবারও উচ্চারণ না করে এবং প্রেয়সীর ছবিটি সম্পূর্ণ আড়ালে রেখে, শুধু অল্প কটি কথায় নিজের অনুভূতিটা জানিয়ে দিয়ে লিখে ফেলেন অসাধরণ প্রেমের কবিতা—’

‘যে তিনটি কথা আমি
……………বলে গেছি
…………………..গোপনে তোমাকে
জীবনের দাগ ধরে
……………পথের ধূলোয়

তাই তুমি রুয়ে দিও নানা ঘাটে
…………………..যদি কেনোদিন এরা বৃক্ষ হয়,

…………………..…………………..পাতায় পাতায়
জল থাকবে, চোখ থাকবে
…………………..আর থাকবে তোমার হৃদয়।’

—‘যে তিনটি কথা’

সেই চলমানতা বইতে থাকে যখন কবি উচ্চারণ করেন লাজুক, প্রায় অনুচ্চারিত ভঙ্গীতে—

‘সমস্ত বইপত্রকে
…………..পরাভূত করে
তোমার মুখ।’

—‘স্থিরচিত্র’

বেশ কিছুদিন যাবৎ মৃত্যুভাবনা আব্বাকে খুব জর্জরিত করছিল। খুব কাছে থাকা সন্তান হিসেবে আমি বুঝি একটু-আধটু তার আভাস পাচ্ছিলাম।

‘জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে
…………………..যে বস্তু ডুবে যায়
সে কি আমি?’

‘আমি’ কবিতার সেই জিজ্ঞাসার উত্তর আব্বা হাতড়ে বেড়াচ্ছিলেন। আমাকে বলেন যে, ‘চরু, সবাই ভাবে যে আমি ছাড়া সবাই বুঝি মারা যাবে। প্রত্যেককেই যে একদিন চলে যেতে হবে, এটা কেউ ভাবনায় আনতে চায় না।’ প্রশ্নটার সাথে একটা সকরুণ দৃষ্টি ছুড়ে দিয়েছিলেন আব্বা; যার উত্তরে শুধু আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলাম আব্বার মুখের দিকে। এর মাত্র দু’একদিন পরেই আব্বাকে নিয়ে যাত্রা করলাম হাসপাতালের দুঃসহ কালো অন্ধকারে মোড়া শ্বাসরুদ্ধকর পথে। আমার ব্যর্থতা— আমি আব্বাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম নিজ হাতে, আর ফিরিয়ে আনতে পারিনি।

হাসপাতালের বেডে চলে যাবার আগে তুমি বার বার উচ্চারণ করেছিলে, ‘আমাকে উবুড় করে রেখে আসো কোন এক নদীর ধারে /আমাকে উবুড় করে রেখে আসো কোন এক নদীর তীরে।’ তোমার কথামতোই তোমাকে শুইয়ে দিলাম বাবা বালাম নদীর তীরে, দাদা দাদীর পাশে। শান্তিতে ঘুমিয়ে গেছ বাবা, হাওর আর নদী ঝিলে মোড়া তোমার প্রিয় বালালী গ্রামে, আদিগন্ত বিস্তৃত নীল জলরাশি আর সবুজে মোড়া পরীর মতো সেই গ্রামে। ঘুমাও বাবা। কিন্তু মাত্র ক’দিন আগেই তুমি আমাকে বললে, ‘যে মৃত্যুবরণ করে, সে তো চলেই যায়। যারা থেকে যায় তাদের কষ্ট হয়।’ তোমাকে হারানোর এযে কী কষ্ট,কী দুঃসহ বেদনা, তা এখন তোমাকে কিভাবে জানাই বাবা?

তুমি বলেছিলে,

‘মৃত্যু হলে
……পৃথিবীটা ঠিকঠাক চলছে কিনা
……তা জানবো কী করে
……এই যা সমস্যা।’

তোমার অভাবে আমার, এবং আমার মতো আরও কতজনের জীবন যে স্তব্ধ হয়ে গেল বাবা, শুন্য হয়ে গেল, তা দেখে তোমার কি একটুও কষ্ট হচ্ছে না?

শুধু গ্রামের সরল মানুষের কলস্বর আর হাওড়ের মিঠা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে তোমার ওপর দিয়ে এখন। আমলকীর সবুজ ডাল তার কোমল সাদা ফুলে সাজিয়ে দিচ্ছে তোমার নতুন শয্যা। বাবা, তোমার অনাথ হয়ে যাওয়া মেয়েটির চোখের জলটুকুও রইলো তোমার চিরঘুমের পারে। তুমি, ভালো থেকো বাবা আমার। তুমি ভালো থেকো চাঁদ ও সূযের সীমানায়।

তোমাকে নিয়ে আমি
……আজ একটা অসাধারণ গান গাইব।
আমাদের গলা মিশে যাবে
………………সূর্যাস্তের রঙে।
আমার দাঁড়িয়ে থাকব
………………চাঁদ ও সূযের সীমানায়।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

কবি ও শিক্ষক। মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।