শুক্রবার, এপ্রিল ১৯

নির্বাচিত দশ কবিতা : হিন্দোল ভট্টাচার্য

0

যেখানে পাখি ওড়ে না


এই যে ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছ মনের মধ্যে…আমি তোমাকেও বিশ্বাস করতে পারছি না…
সন্দেহের দরজা খুলে যে কত সিঁড়ি নেমে গেছে… হয়তো নিচেই স্বর্গ…
মাটিতে কান পাতলে এখনও সংসারের শব্দ শোনা যায়… কোনো না কোনো ঘরে
বেজে ওঠে টেলিফোন…ইসিজি মেশিন…ঘড়ি এবং স্ট্রেচার টানার শব্দ…
এই যে ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছ মনের মধ্যে… যেখানে পাখি ওড়ে না…আদিগন্ত মাঠ নেই…
দীর্ঘ কয়েকমাস লম্বা লাইনে মানুষ স্লোগান দিতে আসে…কাগজের পর কাগজ…
অক্ষরের পর অক্ষর… বোবা সেই সব লেখা…কিছুই বলে না…
এই যে আশ্চর্য একটা সময়…আমি এর অনুবাদ করতে পারছি না কিছুই…
শুধু বুকের ভিতর তৈরি হচ্ছে ফাঁকা রেলইয়ার্ড, ভূতের বাড়ির মতো হাসপাতালগুচ্ছ…


ধুলোমাটি


এমন বিচ্ছেদ ভালো, মিলনে বিরহ নেই, সিনেমাও নেই
দূরে যে ধোঁয়ার রেখা, তাকে পূর্বজন্ম মনে হয়
আমরা সেদিকে যাব, ভবিষ্যৎ বলে কিছু আর
নেই পুরুষোত্তম, বাঁধ ভেঙে জল ঢুকে গেছে।
এখন উপর থেকে সব জলমগ্ন লাগে তাই…
কারা যেন থিয়েটার করতে গিয়ে এখন নিখোঁজ।
মানুষ অভিশাপ দিতে পারে শুধু, নিজের আয়নায়
তার পর মেনে নেয়, তার জন্য পড়ে থাকে
একটি দিগন্ত যার আকাশ অস্থির হয়ে আছে।


এত বজ্র হয়ে উঠছ তুমি


লিখিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে একটি কীর্তন…এলোমেলো পদগুলির ভিতর দিয়ে
হু হু করে ছুটে যাচ্ছে হাওয়া, যেন আগুন লেগেছে কোথাও, লোকে বলছে এ বছর
বর্ষা এসেছে ঠিক সময়েই, মাঠ শূন্য, তোমায় দেখিনি কতদিন কীর্তন, অথচ খোল
বাজিয়ে চলেছি সেই কতকাল থেকে,— কত তাল শুধু তুমি সুর ধরবে বলে, রাধাভাব
গেল না আমার, তবু আগুনের আঁচ টের পাচ্ছি, দূরে গ্রাম পুড়ছে, শহর পুড়ছে,—
রাস্তা দিয়ে কারা সব যেন চলে যায় রাত্রিবেলা, আমি চিনতে পারি না, আমার তো
একফোঁটা ভালোবাসা হলেই চলে, রাতের খাবার নিয়ে অত চিন্তা করতে নেই
একবাটি দুধমুড়ি দিয়ে যেও। এত আগুন কেন লাগে বলতে পারো নিমাইপণ্ডিত?
কোথাও না কোথাও লিখিত হবে প্রেম, বৃষ্টি আসবেই, সে কী একলা বৃষ্টি যে কৃষ্ণ
আকাশ বিপজ্জনক, যেন মরে পড়ে থাকা একটি মাঠ, যেন বাঁশিতে প্রেম নেই…
এত বজ্র হয়ে উঠছ তুমি, এত বিপদসীমায় ছটফট করছে নদী…আমাকে কীর্তন করো
আর ধুয়ো দিতে আমি পারব না হে মধুসূদন, যেন আগুন লেগেছে কোথাও… যেন ঘর নেই…
আমাকে অক্ষর করো, যেন তোমাকেই লিখে বেজে উঠতে পারি জয়দেব, চৈতন্য দাও…


পাল্প ফিকশন


ওই হলুদ রঙের বাড়িটা রতনকাকার। এককালের নকশাল। ভাই সেই কবে নিরুদ্দেশ।
বাড়িতে ভারতবর্ষের মতো মা, কাউকে চিনতে পারেন না। একটা বুড়ো কুকুর রয়েছে,—
কোথাও কারো মৃত্যু হলেই টের পায়। হুহু করে কাঁদে। ওই হলুদ রঙের বাড়িটা
যত রাত হয়, মাটি ছেড়ে আকাশে উড়তে থাকে। মেঘের থেকেও উঁচু থেকে
নিচের দিকে তাকিয়ে থাকেন রতনকাকা। লোকে বলে রাতে এ পাড়ায় পুষ্পবৃষ্টি হয়।
রাতের ফুল, কারো না কারো অশ্রু আসলে। বুঝি, যেমন হারমোনিয়াম মানেই বিষাদ।

রাত হলেই আমাদের মফস্বলের আকাশে কিছু কিছু বাড়ি, রতনকাকার মতো, কাঁদে।


রান্নাঘর


নিয়ন্ত্রণরেখার খুব কাছে আমাদের ভালোবাসা পড়ে আছে। কুড়িয়ে আনার কথা ছিল;
এসব বর্ষামঙ্গলে লেখা হবে না কখনও। একতলায় জল ঢুকছে। থালা ভাসছে, বিছানাও
আজ কিংবা কাল ভেসে যেতে পারে। বেড়া ভেঙে জীবন দাঁড়িয়ে আছে এককোমড় জলে।
ভিতরে বুড়ো মা, গ্যাস সিলিন্ডার। একটু উঁচুতে খিদে রান্না হচ্ছে। মশলার গন্ধ।
দূর থেকে সবকিছুই লেবানন-বেইরুট লাগে। এমনকী চতুর্থপল্লীর লেন, যেখানে কিশোরীপুজো হতো,—
আজ মুক্তাঞ্চল। নিয়ন্ত্রণরেখার খুব কাছে আমাদের ভালোবাসা পড়ে আছে। একা, নিঃস্ব।
হাসপাতালের লাইজলের গন্ধের মতো। রাতে, যখন করিডোর ফাঁকা। বাইরে বৃষ্টি।
বিমানহানার মতো বাজ পড়ছে ঘনঘন। আকাশ আরও অন্ধকার। রেডিও নীরব।
হয়তো আশ্চর্য কোনো সাবমেরিন ছুটে যাবে হাইওয়ের দিকে…


যুদ্ধবিরতি


যেন গল্প লিখতে লিখতে উঠে গেছে একজন লেখক…
আর গল্পটা থেমে আছে…সেখানে গড়ে উঠেছে একটা শহর
বাজার হাট খুব একটা সস্তা নয়…নদীও শুকিয়ে গেছে…
মাঝেমধ্যে ঝড় হয়…আরব ঘোড়ার পিঠে লুট করতে আসে যাযাবর…
যেন গল্প লিখতে লিখতে একজন লেখক হারিয়ে ফেলেছেন স্মৃতি…
কে যেন কোথায় ছিল, কার যেন কে ছিল সোহাগ
ঘন ঘন শত্রুও বদলে যায়, নতুন নতুন প্রেম আসে… মানুষ ভাবে,
সকলেই জাতিস্মর…আর মনের ভিতর কে যেন বলে ওঠে…
এসব কিছুই আদতে ঘটছে না…ওই যে বুক বাজাতে বাজাতে চলে যাচ্ছে ট্রেন
তারও কোনো পরবর্তী স্টেশন নেই…সমস্ত লিখিত আছে…
আর কেউ লিখতে ভুলে গেছে…একটিই গল্প, তাই… লেখা আছে কয়েকহাজার…


গ্রন্থ


আমি একটা বইয়ের ভিতরে ঢুকে বইটাকে বন্ধ করে দিলাম
ভিতরে সাদা রঙের আলো…একমাত্র একটি জানলা যার বাইরে গোধূলি
একটি দরজাও আছে, তা থেকে শুরু হয়ে যাচ্ছে যে রাস্তা, তা কোথাও যায় না
আর পেলাম একটি সিঁড়ি… অব্যবহৃত…যেন উত্তর কলকাতার ছাদে চলে গেছে
আর রয়েছে একটা বারান্দা, যার সামনে একটা আশ্চর্য বাগান…যাকে জঙ্গল বলতে পারো
অনেকটা উঁচুতে আছি, যেন ভেসে থাকা জাহাজ…যেন একটা মহাকাশযান অথবা
স্যাটেলাইট কোনো…বুদ্বুদের মতো কেউ কেউ সাঁতরে উঠে আসার চেষ্টা করছে…
আমি একটা বইয়ের ভিতরে ঢুকে বইটাকে বন্ধ করে দিলাম
বাইরে হয়তো ধুলো পড়বে বহুদিন…পরিত্যক্ত লাইব্রেরির ভিতর
আস্তে আস্তে এগিয়ে আসবে ক্ষুধার্ত ইঁদুর
আমি বুঝতে পারব না…


ইস্কুলবাড়ি


ও পথে যাব না আর। যে পথে এসেছি এখানে। ফেলে আসা পথে আর
কখনওই ফেরা যায় না কোথাও। ঘরে ফিরছে যে খিদে, বাড়ি যাচ্ছে যে আদর,—
তারা ফিরে আসে নতুন কোথাও। যে রাস্তা সামনের দিকে যায়, তার
পিছনে ফেরা নেই। ও পথে যাব না আর। ও পথে ইস্কুলবাড়ি নেই।
আমি তো মায়ের গর্ভে যাব বলে এই এতকাল কত মহাকাব্য পেরিয়ে এলাম।
ও পথে রেডিও নেই। গ্রামাফোন রেকর্ড বাজে না। একটি গাছের গায়ে
আমিও এসেছি লিখে আমাদের নাম। এটুকুই বেঁচে থাকা। আশাবাদ। মন।
তুমি অত হিসেবের খাতা নিয়ে জীবনের মানে খুঁজো না স্যাঙাত।
আমাদের যেতে হবে। একটি সোমত্ত ছুরি বুকপকেটে রেখ।
ফেরার প্রতিটি রাস্তা বিপদসঙ্কুল। সেখানে সরাইখানা নেই।


গাড়িবারান্দা


আলোর নেশা লেগেছে চোখে, বাইরে বদলে যাচ্ছে আয়ু, চামড়ার রং—
মুখের ভাষা সংযত রাখার কৌশল এই বিদ্যুৎপ্রসবা আকাশের নেই
পৃথিবীর সমস্ত স্থাপত্যের ভিতরে থমথম করছে দুঃখ, যার কোনো গল্প নেই
বিষাদ ও বিচ্ছেদ ঘাড়ে করে লম্বা লম্বা পা ফেলে বয়স, তবু তার পূজাসংখ্যা চাই
আলোর নেশা লেগেছে চোখে, এই ঘন অন্ধকারেও, কে ডিঙিনৌকায় পাড়ি দেয়
গাড়িবারান্দার মতো ভালোবাসা ফিরে আসুক কলকাতা শহরে, আমি তার নীচে
শুধুই অপেক্ষা করব, আর পূর্বজন্ম থেকে একটি ট্রাম চলে যাবে আহিরীটোলায়…

এই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা বিকেলবেলায় আমি অপেক্ষা করব শুধুই
কোথাও যাওয়ার কোনো কথা নেই যখন, কোথাও ফেরারও নেই আর…


পথের পাঁচালী


যার দিকে তাকাই, তাকে বড়ো প্রিয়জন মনে হয়
আমিও কি তার প্রিয়, এই কথা খেয়াল থাকে না
খেয়াল থাকে না আমি তার কাছে বিপর্যয় কি না,—
অনায়াসে হাত ধরি, বলি, কিছুক্ষণ পাশে হাঁটি?
বুঝি তার গল্পে নেই বিকেলবেলার কোনো মাঠ।
আমি তো মেঘের মতো পংক্তি লিখতে চাই অনির্বাণ
আমাদের চোখেমুখে কেন এত মরুভূমি লেগে?
যেন বা গোপনে কোনো বাঘ গুঁড়ি মেরে বসে আছে…
আমাদের থেকে আরও ছিটকে গেছে কয়েক হাজার
আমাদেরই ভাই বোন বন্ধু কিংবা প্রেমিক-প্রেমিকা।
আচমকা চিঠির মতো কেউ কেউ আসা যাওয়া করে।
আমি কি তাদের কাছে নিজেকে আড়াল করে থাকা
বিপদসংকেত কোনো? মৃত্যুভয়? বাতিল পোস্টার?

আমি তো মেঘের মতো পংক্তি লিখতে চাই অ্নির্বাণ,—
পুরনো দোতলা বাসগুলো আর খুঁজেই পাই না।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ১৯৭৮। কলকাতায়। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। লেখালেখির শুরু নয়ের দশকের প্রথমার্ধে। প্রথম বই লেখালেখি, শুরুর দশ বছর পর ‘তুমি, অরক্ষিত’। এর পর একে একে বেরিয়েছে ‘তারামণির হার’, ‘তালপাতার পুথি’, ‘মেডুসার চোখ’, ‘জগৎগৌরী কাব্য’, ‘তৃতীয় নয়নে জাগো’, ‘যে গান রাতের’ প্রভৃতি।  মোট ষোলটি কাব্যগ্রন্থ, একটি উপন্যাস ও তিনটি গল্পগ্রন্থের রচয়িতা। ‘জগৎগৌরী’ কাব্যের জন্য পেয়েছেন বীরেন্দ্র পুরস্কার ও ‘যে গান রাতের’ কাব্যগ্রন্থের জন্য পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমি পুরস্কার। বর্তমানে ১০০০ বছরের জার্মান কবিতার অনুবাদে রত।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।