শনিবার, অক্টোবর ৮

পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-১২

0

Shakoor Majid_Pro Picমুলারস্কির গ্রিনহাউজ
শাকুর মজিদ


যে উদ্দেশ্য নিয়ে ছিল আমাদের পোল্যান্ড সফর, তা প্রায় শেষ। আমাদের কোনো অতৃপ্তিবোধ নেই। আমরা দেখেছি লেস ওয়ালেসাকে, আমরা গিয়েছি কোপারনিকাসের বাড়ি, ফিনিক্স নগরী ওয়ারশো, দেখেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকাময় স্মৃতি জাগানিয়া হিটলারি নির্যাতনশালা আর বধ্যভূমি। দেখা হয়ে গেছে হাজার বছরের প্রাচীন শহর ক্রাকভ, লবণের খনি।

ওমর ভাই আমাদের চিত্তরঞ্জনের জন্য একটা শৈল শহরে নিয়ে যেতে চান আজ। সেখানকার ভূমিরূপ নাকি দার্জিলিংকেও হার মানাবে। সবকিছু শুনে লাভলু ভাই বেঁকে বসেছেন। কারণ সালজবুর্গে এরকম একটা জায়গা ঠিক করা হয়ে আছে আমাদের জন্য, সুতরাং এসব বাদ। আরিফ ভাইয়ের পকেট ভর্তি ডলার, তিনি মানিব্যাগের সাইজ কমাতে চাইছেন। জানতে চাইছেন এখানকার শপিং কমপ্লেক্সটি কোথায়।

আমি কেনাকাটায় নিরুৎসাহি এক ক্যামেরাপ্রিয় পর্যটক। আমার ওখানে আগ্রহ নাই। ঠিক হলো, ওরা সবাই কেনাকাটায় সময় কাটাবে। ওমর ভাই আমাকে নিয়ে কোথাও ঘুরবেন। বিকেলে সবাই এক সাথে ওমর ভাইয়ের বাসায় যাব।

দক্ষিণ পশ্চিম পোল্যান্ডের ক্যাতাভিৎসে শহর কেন্দ্র থেকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরে একটা গ্রাম আছে। গ্রামটির নাম সারনোভ। ওমর ভাই আমাকে নিয়ে ছুটেছেন এই সারনোভ গ্রামের দিকে।

দক্ষিণ পশ্চিম পোল্যান্ডের ক্যাতাভিৎসে শহর কেন্দ্র থেকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরে একটা গ্রাম আছে। গ্রামটির নাম সারনোভ। ওমর ভাই আমাকে নিয়ে ছুটেছেন এই সারনোভ গ্রামের দিকে। তার দুটো ইচ্ছা। প্রথমত পোল্যান্ডের সবচেয়ে বড়ো গ্রিনহাউজ টমেটো খামার দেখানো এবং কয়েকজন বাঙালি শ্রমিক সেখানে কাজ করে, তাদের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

খামারটির কাছাকাছি যেতেই দেখি বিশাল একটা এলাকা কাচ দিয়ে মুড়ে রাখা। এটিই মুলারস্কির গ্রিনহাউজ খামার (T. Mularski Horticulture Farm)। মুলারস্কি পরিবার ১৯৭৬ সাল থেকে এখানে এই ব্যবসা করছে। পুরো পোল্যান্ডে বর্তমানে ১২৮ একর জায়গা জুড়ে তাদের এই টমেটো তৈরির খামার। এ আয়তনটি তারা দ্বিগুন করবে কয়েক বছরের মধ্যে। গ্রিনহাউজ খামার নিয়ে আমার কৌতূহলের শেষ নাই।

আমরা ঢুকে পড়ি খামারটিতে। যতদূরে চোখ যায়, সারি সারি টমেটো গাছ।

টমেটো গাছের এমন চেহারা এর আগে দেখা হয়নি। লতানো এরকম আঙ্গুর চাষ দেখেছিলাম চিলির সানদিয়াগোতে। কিন্তু সেটা ছিল উন্মুক্ত আঙ্গুরের খেত। এখানকার এই টমেটো খেতটি একেবারেই কাচ দিয়ে ঘেরা।

এই গ্রিনহাউজটির আয়তন প্রায় ৬ লাখ বর্গমিটার। পোল্যান্ড শীত প্রধান দেশ। এখানকার প্রকৃতি বছরের প্রায় নয় মাস বরফে ঢাকা থাকে। শুধু গ্রীষ্মের এই সময়টুকুতে প্রকৃতিকে তরতাজা দেখা যায়।


Shakoor Majid_EP_12_P_1

মুলারস্কির এই গ্রিনহাউজে আমরা অনেক বাঙালি শ্রমিকের দেখা পেয়েছিলাম


প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষ পাল্লা দেওয়া শুরু করেছে প্রকৃতির সাথে। গ্রিনহাউজ প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি পুরো এলাকার তাপমাত্রাকে সারা বছর গড়ে পঁচিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রেখে এখানে সারা বছরই টমেটো উৎপাদন করে চলেছেন। পুরো ইউরোপের সিংহভাগ টমেটো এই কোম্পানি সরবরাহ করে থাকে।

কাচের ওপাশের সূর্যের আলোটাই শুধু এখানে প্রবেশ করে, তাপটা প্রথমে বাধাপ্রাপ্ত হয়, তারপরে একটি যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে টমেটো উৎপাদনের জন্য যতটুকু তাপ প্রয়োজন ততটুকু তাপই ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হয়।

এখানে যে টমেটো উৎপাদন হচ্ছে তা একটি ভিন্ন জাতের টমেটো। টমেটোর এই জাতটির নাম ‘স্ট্রবেরি টমেটো’। অনেকটা স্ট্রবেরির মতো আকার আর টুকটুকে লাল বলেই হয়তো তার এই নাম। থোকায় থোকায় টমেটো ধরে আছে ঠিক আঙ্গুরের মতো।

আমরা যে টমেটো গাছের পাতা দেখে অভ্যস্থ, তার থেকে এটা একটু আলাদা। অনেকটা আমাদের দেশের লাউ পাতার মতো। আর লতিয়ে বেড়ে ওঠা গাছগুলো লাউগাছের মতোই। কিন্তু এর চাষ পদ্ধতি দেখে আমাদের পানের বরজের কথা মনে পড়ে যায়। আমাদের দেশে যেমন একসারিতে পান লাগিয়ে দুদিক থেকে বাঁশের কঞ্চি পুতে সেই কঞ্চির সাথে পান গাছকে তুলে দেওয়া হয়, গোড়া থেকে পান পাতা ভেঙে নিয়ে যেমন পান গাছের ডাটাকে মাটির সাথে শুইয়ে রাখা হয়, এখানেও সেই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।

মুলারস্কির গ্রিনহাউজে প্রায় ২০০ শ্রমিক কাজ করে থাকেন। ঘরের ভেতর যারা কাজ করেন, তাদের বেশির ভাগই মহিলা। বাইরে পুরুষেরাই বেশি।

বাইরে যেটুকু তাপমাত্রা সার্বক্ষণিকভাবে এই ক্ষেতের ওপরে প্রবহমান, তার সাথে বাংলাদেশের তাপমাত্রার খুব মিল। সে কারণে বাংলাদেশি শ্রমিকেরা অনেক স্বাচ্ছন্দে এ ধরনের খামারগুলোতে কাজ করে থাকেন। পোল্যান্ডের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের এই শহরতলীতেও আমাদের দেখা মিলে যায় কয়েকজন বাংলাদেশি শ্রমিকের।

উঁচু একটা মাচার ওপর দাঁড়িয়ে আছেন এক বাঙালি। তার কাজ হচ্ছে পানপাতার মতো গজিয়ে ওঠা এই টমেটো গাছগুলোর ওপর দিকের পাতা ঠিক রাখা। কোনোটি বেড়ে গেলে তার মাথা ছেঁটে ফেলা।

এই গ্রিনহাউজ ফ্যাক্টরিতে বেশ কয়েকজন বাঙালিই কাজ করেন। এরা বাংলাদেশ থেকে আসা শিক্ষিত শ্রমিক। কেউ উচ্চ মাধ্যমিক পাশ, কেউ ডিগ্রি করেছেন। দেশে ফোন-ফ্যাক্সের দোকান ছিল, এমন একজনেরও দেখা মিলল এই কারখানায়। বেতন যা পান মোটামুটি চলে যায়। ঘন্টা হিসেবে বেতন হয়, ওভারটাইমের জন্যও আলাদা ব্যবস্থা আছে। সারা মাসে বাংলাদেশি টাকায় ২৫-৩০ হাজারের মতো হয়। যদিও ইউরোপের অন্যদেশগুলোর তুলনায় এই বেতন যথেষ্ট কম, তবে এখানে থাকা ফ্রি, খাওয়ার খরচও কম। জীবন-যাপনের অন্যান্য খরচও কম। সে হিসেবে ইউরোপের অন্যদেশ যেমন : ফ্রান্স বা ইতালিতে চাকরি করে যে পরিমান সঞ্চয় হতো, এখানে তাদের সঞ্চয়ের পরিমানটা প্রায় সমান। তবে ফাঁদে পড়ে, দালালদের খপ্পরে পড়ে যারা এখানে আসেন, তাদের এই আসার পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। এই পাঁচজন শ্রমিক জানিয়েছেন যে, গড়ে প্রায় ৭ লাখ টাকার মতো খরচ পড়েছে এখানে আসতে।

মুলারস্কির কোম্পানি কিন্তু আমাকে জানিয়েছে যে তোমাদের দেশের মানুষগুলো এই তাপমাত্রার সাথে পরিচিত। শীতের দেশের মানুষগুলো এখানে কাজ করতে চায় না। সুতরাং যতো পারো, আমাকে শ্রমিক দাও।

আমাদের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন পোল্যান্ডে নিযুক্ত বাংলাদেশি কনসাল জেনারেল। তিনি বলেন, ওরা যদি সরাসরি পোলিশ কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করে আসতে পারত, তবে টিকেটসহ কারোরই দেড়-দু’লাখের বেশি খরচ পড়ার কথা নয়। সমস্যা হচ্ছে, যোগাযোগের অভাব। এখানে যে এই চাকরি আছে এবং বাংলাদেশিদের জন্য এখানে অফুরন্ত সুযোগ, এই কথাটিই হয়তো বাংলাদেশে যারা আছেন তাদের জানা নেই। যেমন, এই মুলারস্কির কোম্পানি কিন্তু আমাকে জানিয়েছে যে তোমাদের দেশের মানুষগুলো এই তাপমাত্রার সাথে পরিচিত। শীতের দেশের মানুষগুলো এখানে কাজ করতে চায় না। সুতরাং যতো পারো, আমাকে শ্রমিক দাও। কিন্তু এখানে এসে আবার অনেকেই অতিরিক্ত আশা পোষণ করে। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর প্রতি তাদের টান থাকে বেশি, সুতরাং তারা চায় এই পোল্যান্ডকে একটা ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করতে। অথচ কেউ চাইলে কিন্তু এই পোল্যান্ডকেই তাদের মূল টার্গেট হিসাবে বানিয়ে ফেলতে পারে। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি, কেউ এখানে এসে নিরাশ হবে না।

আমরা খামারের একটা প্যাকিং সেকশনে চলে আসি। বাগান থেকে ট্রলিতে করে বয়ে আনা স্ট্রবেরির আকারের ছোটো ছোটো টমেটোগুলো এখানে যাচাই-বাছাই করার পর একেবারেই প্যাকেটজাত হয়ে সরবরাহ আর রপ্তানির জন্য তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এখানে অবশ্য বেশিরভাগ শ্রমিকই মহিলা। তারা শুধু পোলিশই নয়, রাশিয়া এবং তার আশেপাশের দেশগুলো থেকে আসা মহিলা শ্রমিকই বেশি।

আমরা ফিরে আসছি ওমর ফারুক ভাইয়ের শহর সসনোভিৎসতে। এবার গাড়িতে প্রায় একাই পাওয়া গেলো ওমর ভাইকে। আমাদের আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, পোল্যান্ডের বাঙালিদের নিয়ে।

 

পোল্যান্ডের বাঙালি
পোল্যান্ডে বাংলাদেশিদের অভিযাত্রার সূচনা সিকি শতাব্দীর বেশি সময় নয়। এক সময় বাংলাদেশ থেকে বছরে ৪টি বৃত্তি দিতেন পোলিশ সরকার। এই বৃত্তি পেয়ে বাংলাদেশের মেধাবী ছাত্ররা পাড়ি জমিয়েছিলেন আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। এরপর এদের অনেকেই থেকে যান এখানে। সেই থেকে তাদের সূচনা।

পোল্যান্ডে বাঙালিদের খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য আমরা একবার জড়ো হয়েছিলাম ওয়ারশোর এক ভারতীয় রেস্তোরাঁয়। ইংল্যান্ডে যেমন ইন্ডিয়ান রেস্টেুরেন্ট বলে যা কিছু, তার প্রায় সবই বাংলাদেশিদের। কিন্তু এখানে, এই পোল্যান্ডে এরকম কিছু নেই। ইন্ডিয়ান মানে, ইন্ডিয়ানই। বাংলাদেশি দুটো রেস্টুরেন্ট আমরা দেখেছিলাম। একটি ক্রাকভ, অন্যটি সসনোভিৎস-এ। দুটোর সাজসজ্জা, নাম এবং অলংকার ভারতকেন্দ্রিক। বাংলাদেশ নামটা এখনো সেভাবে জানা হয়নি পোলিশদের।

আইন শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি নেবার জন্য উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে পোলিশ সরকারের বৃত্তি নিয়ে আসেন তিনি। পাশ করার পর এক বছর আইন পেশায় চাকরিও করেছিলেন। কিন্তু পরে আর এ পেশায় থাকেননি। পোলিশ রমণী বিয়ে করে স্থায়ীভাবেই থেকে গেছেন পোল্যান্ডে।

ওয়ারশোর সেই ভারতীয় রেষ্টুরেন্টে যে কয়েকজন বাংলাদেশির সাথে আমদের সাক্ষাৎ হয়, তাদের প্রায় সবাই এভাবে এখানে এসেছেন। ১৯৮৫ সালে এসেছিলেন শাহজাহান [তাঁকে সম্রাট বলে ডাকেন পোলিশ বাংলাদেশি বন্ধুরা]। আইন শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি নেবার জন্য উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে পোলিশ সরকারের বৃত্তি নিয়ে আসেন তিনি। পাশ করার পর এক বছর আইন পেশায় চাকরিও করেছিলেন। কিন্তু পরে আর এ পেশায় থাকেননি। পোলিশ রমণী বিয়ে করে স্থায়ীভাবেই থেকে গেছেন পোল্যান্ডে। এখন ১৮ বছর বয়সী তার এক পুত্র। বছরে একবার দেশ থেকে ঘুরে আসেন। পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশো শহরে এখন তিনি কাপড়ের ব্যবসা করেন। মূলত কাপড় আমদানি রপ্তানি ব্যবসার সাথে তিনি যুক্ত এবং বেশ সফল।

৮৭ সালে এসেছিলেন রুবেল। কম্পিউটার সায়েন্স ও ম্যানেজমেন্টে ডিগ্রি নেবার পর এখন তিনি চীন থেকে কাপড় আমদানি এবং অন্যান্য দেশে তা রপ্তানি করেন।

ওয়ারশো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেওয়া সাইফুদ্দিনও ওয়ারশোতে বসবাস করছেন ১৯৮৯ সাল থেকেই। অর্থনীতির পড়া বিদ্যা দিয়ে তিনিও পোশাক শিল্পের ব্যবসার সাথে যুক্ত।

বগুড়ার শাহীন এবং রেজাউল করিম আছেন ১৫ বছর, শাহীন মোহাম্মদ ১২ বছর ধরে। ৭ বছর আগে পোল্যান্ড এসে মূলধারার পোলিশ সংগীত ও যস্ত্রসংগীতে দখল নিয়ে কাজ করছেন হারুনুর রশীদ। ৫ বছর ধরে আছেন মাহবুব হোসেন। কোরিয়ান কোম্পানিতে বিপনন শাখায় কাজ করেন তিনি। পোল্যান্ডে যা আয় করেন, বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেটে এ টাকা খাটিয়ে রেখেছিলেন। শেয়ার মার্কেটের দর পতনের পর এখন তার মাথায় হাত।


Shakoor Majid_EP_12_P_2

বাঙালি মালিকানায় ‘বোম্বে’ রেস্ট্রুরেন্টের সামনে পঞ্চপর্যটক


এদের মধ্যে রেস্টুরেন্টে কাজ করেন এমন একজনকে পাওয়া গেল। তার নাম রাজিব হাসান, বাংলাদেশের ব্রাক্ষণবাড়িয়ার এই তরুণ কাজ করেন একটা জাপানি রেস্টুরেন্টে।

এরা কেউই এখানে থাকার জন্য আসেননি। কিন্তু কোনো না কোনোভাবে থেকেই গেছেন। এই থেকে যাওয়াটা কেমন করে ঘটল। এমন কথার জবাব অনেক রকমের এসেছে।

কেউ বলেছেন যে, পোলিশ নাগরিকেরা খুবই আন্তরিক। পশ্চিম ইউরোপের মতো নাক উঁচু তারা নন। ওসব দেশে তারা মুখে যতোই বলুক আমাদের চামড়ার মানুষদের প্রতি এক ধরনের সুক্ষ্ম অনাচার তারা করেই থাকে, সব সময় ওগুলো চোখে পড়ে না। কিন্তু এখানে এসব একেবারেই নেই। কেউ যদি কাজ জানে তার কাজের কোনো অভাব নেই। তবে পোলিশ ভাষাটা জানা থাকতেই হবে।

এখানে পড়াশুনা করতে এসে সবাইকেই পোলিশ ভাষা শিখতে হয়েছে। ভাষা দখলে আসার পর স্থানীয় লোকজনের সাথে ভাবের আদান প্রদানে আর কোনো বাধা থাকল না। এই অনুষঙ্গে প্রথমেই যুক্ত হয়ে যান কোনো নারী।

বাঙালি পুরুষদের প্রতি পোলিশ রমণীদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার টানকে উপেক্ষা করতে পারেননি তারা। তার দেশ-বর্ণ বা ধর্ম বিবেচনায় না এনেই এক একজন গড়ে তুলেছেন এক একটি প্রেমের মহাকাব্য। তারপর আর দেশমুখো হননি কেউ।

এদের কেউ কেউ স্ত্রীকে ধর্মান্তরিত করে মুসলমান করেছেন, কেউ করেননি। কোনোটাতেই কারো সমস্যা নেই। যে যার মতো ধর্ম পালন করছেন। বড়োদিনেও ফুর্তি করেন, ঈদেও আনন্দ।

এখন পোল্যান্ডে বাংলাদেশের জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন শ্রম বাজার। এখানে অবশ্য মিডিওকারদের জন্য তেমন সুবিধা নাই। একেবারে কম শিক্ষিত পেশীবহুল পুরুষের জন্য কাজের অভাব নাই, কাজ আছে উন্নত পেশাজীবীদেরও। পোল্যান্ডের সবচেয়ে বড়ো হাসপাতালের সবচেয়ে নামকরা ডাক্তার একজন বাংলাদেশি। কিন্তু সমস্যা হয় অর্ধশিক্ষিতদের জন্য।

এমনিতে এখন পোল্যান্ডে বাংলাদেশের জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন শ্রম বাজার। এখানে অবশ্য মিডিওকারদের জন্য তেমন সুবিধা নাই। একেবারে কম শিক্ষিত পেশীবহুল পুরুষের জন্য কাজের অভাব নাই, কাজ আছে উন্নত পেশাজীবীদেরও। পোল্যান্ডের সবচেয়ে বড়ো হাসপাতালের সবচেয়ে নামকরা ডাক্তার একজন বাংলাদেশি। কিন্তু সমস্যা হয় অর্ধশিক্ষিতদের জন্য। যারা না জানে ভালো কোনো কাজ, না পারে সাধারণ শ্রমিকের মতো কাজ করতে। এরা মূলত পোল্যান্ডে আসে পশ্চিম ইউরোপের অন্য কোনো দেশের ট্রানজিট রুট হিসাবে পোল্যান্ডকে ব্যবহার করতে।

আমাদের গাড়ি ছুটে চলে ক্যাতাভিৎসে শহরের ভেতর দিয়ে। শহরটি বেশ ছোটো, ছিমছাম। মাঝে মাঝে আমাদের আজিমপুর কলোনির মতো ১০-১২ তালা উচ্চতার কিছু এপার্টমেন্ট দেখা যায়।

ওমর ভাই বলেন, এগুলো সব কম্যুনিস্ট আমলের। কম্যুনিস্ট সরকার যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন প্রত্যেক পরিবারের জন্য ৮শ বর্গফুটের এরকম এপার্টমেন্ট বানিয়ে দিয়েছিল। তারপরও পাবলিককে সন্তুষ্ট রাখতে পারে নাই তারা। তারা বিপ্লবী হয়েছিল। লেস ওয়ালেসার হাতে হাত মিলিয়ে পতন ঘটিয়েছিল কম্যুনিজমের।

ওমর ভাই এখন আমার গাইডের ভূমিকায় অবতীর্ন হয়েছেন। ১৯ বছর ধরে যে শহর তাকে গড়ে পিটে এ জায়গায় নিয়ে এসেছে, সেই শহরের নাড়ি-নক্ষত্রের সবকিছুই তার চেনা। তার কাছ থেকে শুনি এ শহরের নানা গল্প।


ধারাবাহিকটির অন্য পর্বগুলো পড়ুন :

পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-০১
পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-০২
পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-০৩
পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-০৪
পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-০৫
পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-০৬
পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-০৭
পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-০৮
পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-০৯
পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-১০
পোল্যান্ড : লেস ওয়ালেসার দেশ ।। পর্ব-১১

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ২২ নভেম্বর, ১৯৬৫। তিনি একজন বাংলাদেশি স্থপতি, নাট্যকার, তথ্যচিত্র নির্মাতা ও চিত্রগ্রাহক। ভ্রমণকাহিনি ও জীবনী সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ২০১৮ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।