রবিবার, জুন ২৩

প্ল্যাটফর্ম নম্বর শূন্য : মাহমুদ মাসুদ

0

১.
আনোরির ভেগে যাওয়ার বিষয়টা ভাবতে গেলেই হরতন অবাক হতে হতে বাতাস হয়ে যায় আর বাতাস হয়ে আকাশের দিকে উঠতে থাকে। আকাশে থাকে শাদা রঙের খণ্ড খণ্ড মেঘ। এইসব মেঘ দেখে তার লজ্জা হয়। কারণ, তার কাছে বউ ভেগে যাওয়ার বিষয়টা খুবই লজ্জার। তার মনে পড়ে তিন মাস আগের সেই সালিশের কথা, তার দুই ছেলেকে জড়িয়ে ধরে আনোরির মরাকান্নার কথা, সেই মরাকান্না দেখে তার পাথর মন গলে মিয়া বাড়ির চাপকলের ঠান্ডা পানির মতো হয়ে যাওয়ার কথা, সেই দিনের সেই সন্ধ্যার ঘটনাগুলো মুহূর্তে ভুলে যাওয়ার কথা। সেই সন্ধ্যার কথা ভাবতেই অপমানে হরতনের চোখে পানি চলে আসে। সে ভেবে পায় না রইসু মিস্ত্রি কি করে তার থেকে ভালো হতে পারে। অনেক দিক থেকে চিন্তা করেও ভেবে পায় না কোন দিক দিয়ে রইসু তার উপরে। তার পাঁচ বছরের এত প্রেম, এত ভালোবাসা, এত মায়া কি করে রইসুর তিন দিনের কাছে হেরে যায়! সে ভাবে এই বদ মিস্ত্রিরে বাড়িতে ঢোকানোই ভুল ছিল। আবার মনে হয় সে যদি বিনা কারণে সাহেবের হাট থেকে চারটা মুরগি নিয়ে না আসতো তাহলে তো আর মুরগির খোঁয়াড় বানানোর দরকার পড়তো না। খোঁয়াড় দরকার নাই মানে মিস্ত্রিরও দরকার নাই। তার মনে হয় সে যদি মাঝরাস্তা থেকে বাজারে ফেরত গিয়ে মুরগিগুলো দিয়ে আসতো তাহলেই ভালো ছিল। কিন্তু সে মুরগিগুলো বাড়িতে নিয়ে এসেছে। তারপর তার মনে হয়েছে যে একটা মুরগির খোঁয়াড় দরকার। তখন সে রইসুর কাছে যায়। রইসু হাজার টাকার বিনিময়ে একটা ফার্স্টক্লাস খোঁয়াড় বানিয়ে দিতে রাজি হয় আর পরদিনই হাতুড়ি, বাটালি, করাত নিয়ে চলে আসে। আনোরি কিছুক্ষণ পরে এসে তাকে বলে যে এই লোক সুবিধার না, চোখ খারাপ। হরতন বিষয়টি হেসে উড়িয়ে দেয়। রইসু জোরে জোরে গান গায়, ‘পেহেলি বার মিলে হ্যায়, মিলতে হি…’। তারা সেই গান শোনে। হরতন আনোরিকে জড়িয়ে ধরে আর গুনগুন করে। আনোরি কেমন একটা লজ্জা পেয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় আর হরতন দোকানের দিকে চলে যায়।

তখন সে রইসুর কাছে যায়। রইসু হাজার টাকার বিনিময়ে একটা ফার্স্টক্লাস খোঁয়াড় বানিয়ে দিতে রাজি হয় আর পরদিনই হাতুড়ি, বাটালি, করাত নিয়ে চলে আসে। আনোরি কিছুক্ষণ পরে এসে তাকে বলে যে এই লোক সুবিধার না, চোখ খারাপ। হরতন বিষয়টি হেসে উড়িয়ে দেয়। রইসু জোরে জোরে গান গায়, ‘পেহেলি বার মিলে হ্যায়, মিলতে হি…’।

রইসু মিস্ত্রি তার কাজে খুবই পাকা। তিন দিন ধরে খুব সুন্দর করে একের পর এক কাঠের টুকরা জোড়া দিয়ে খোঁয়াড় বানিয়ে ফেলে। হরতন খুব প্রশংসার চোখে সব দেখে। এই তিনদিনের প্রথম দুই দিন রাতে যে তার বউ ঘুমাতে পারে না তা সে দেখে না। সে তৃতীয় দিন সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্তে বাড়ি এসে দেখে যে পুরো বাড়ি খালি পড়ে আছে। মনে পড়ে আজ তার শ্যালক দুই ছেলেকে তাদের বাড়ির পাশের হিল্লারিয়া মেলায় নিয়ে যাওয়ার কথা। সে আনোরিকে খুঁজতে খুঁজতে গোয়ালঘরের পেছনের দিকে যায়। গোয়ালঘরের ঠিক পেছনে তার বাড়ির সবচেয়ে বড়ো আম গাছ। তার নিচে হরতন যা দেখতে পায় তা বিশ্বাস করতে পারে না। তাকে দেখেই আনোরি শাড়ি নিচের দিকে নামিয়ে ফেলে। রইসু কোনোরকমে পাজামা তুলে দৌড় দিবে এই সময় চিলের মতো গিয়ে তার টুঁটি চেপে ধরে হরতন। সর্বশক্তি দিয়ে তুলে এক আছাড় মারে। মট করে একটা শব্দ হয়। রইসু এক গড়ানি দিয়ে উঠে আবার দৌঁড় দেয়। আনোরি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। হরতন তাকে টেনে হিঁচড়ে উঠানে নিয়ে আসে। সামনে যা পায় তা দিয়েই আঘাত করতে থাকে। আনোরির চিৎকার আর কান্নার আওয়াজে মাগরিবের আযান শোনা যায় না ঠিক করে। আশপাশের বাড়ির মানুষ ছুটে এসে আনোরিকে উদ্ধার করে আর পরের দিনই সবকিছু রাষ্ট্র করে দেয়। সালিশে কিসের বিচার করা হবে তা কেউ ভেবে পায় না। রইসুর ডান হাত এমনভাবে ভাঙে যে তার পক্ষে আর কখনো খোঁয়াড় বানানোর সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। আনোরি আধামরা হয়ে বসে থাকে আর হরতন টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া মন নিয়ে বাচ্চা দুটির হাত ধরে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হরতন বলে দেয় সে আর আনোরিকে রাখবে না। সবাই তার কথা মেনে নেয়। আনোরিও মেনে নেয়। রইসুকে একশো একাশিটা বেতের বাড়ি আর গ্রাম থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য বলা হয়। আনোরিকেও এক শ একাশি বেতের বাড়ি দেওয়ার রায় হয়। এই এক শ একাশি বেত দেবে হরতন নিজে। এই সময় দুই ছেলে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে আর আনোরি তাদের ধরে কান্না শুরু করে দেয়। আনোরির কান্নায় সবাই কাঁদে, আকাশ কাঁদে, বাতাস কাঁদে, গাছের লতাপাতা কাঁদে, এমনকি হরতনও বাদ যায় না।

কিছুদিন পরেই সব ঠিক হয়ে যেতে থাকে। হরতন দোকানে যায়। আনোরি ঘরের কাজকর্ম করে, রান্না বান্না করে, ছেলেদের গা ডলে গোসল করায়, খাইয়ে দেয়, গল্প শুনিয়ে গান গেয়ে ঘুম পাড়ায়। হরতন রাতে এসে খেয়ে শুয়ে পড়ে। আনোরি মাঝে মধ্যে এটা সেটা জিজ্ঞেস করে, সে হুম হাম করে উত্তর দেয়। তার টুকরো হয়ে যাওয়া মন আস্তে আস্তে জোড়া নিতে থাকে। একদিন ছেলেদের ঘুম পাড়িয়ে আনোরি রান্নাঘর গুছাতে যায়। হরতন যায় পানি খেতে। তখন হরতনের কি জানি হয় আর সে গিয়ে পেছন থেকে আনোরিকে জড়িয়ে ধরে। ভাত খাওয়ার পাটিতে শুইয়ে দেয়। হরতনের মনে হয় সে সেই প্রথম দিনের আনোরিকে ফিরে পেয়েছে। আনোরিও অসম্ভব আবেগে তার গলা জড়িয়ে ধরে। অসাধারণ এক অনুভূতি নিয়ে হরতন ঘুমাতে যায়। ঘুমের মধ্যে সে স্বপ্ন দেখে আনোরি আর সে বেড়াতে গেছে মনু নদীর ধারে। তাদের সাথে দুই ছেলে আর আনোরির কোলে ফুটফুটে এক মেয়ে। এই সময় আনোরি বায়না ধরে যে আইসক্রিম খাবে। হরতন আইসক্রিম এনে দেয়। মা ছেলেরা মিলে মজা করে খায়। হরতনও এক কামড় খায়। নদীর পাড়ে একটা আম গাছ। তারা সেই গাছের নিচে গিয়ে বসে। একটা সুন্দর নৌকা দেখে আনোরি উচ্ছসিত হয়ে উঠে। হরতনের খুব ভালো লাগে। সে খুব সুখি হয় আর তার মনে হয় জীবন অনেক সুন্দর, অনেক। ঘুম ভেঙে সে দেখে ছোটো ছেলে মুতে দিয়ে তার উপর ঘুমাচ্ছে। সে আনোরিকে ডাকে। কেউ জবাব দেয় না। সে পুরো ঘর খোঁজে, বাড়ি খোঁজে, পাড়া খোঁজে, গ্রাম খোঁজে, পাশের গ্রাম খোঁজে, খুঁজতেই থাকে। কোথাও আনোরিকে পায় না। সবাই ধরে নেয় আনোরি ভেগে গেছে, রইসু মিস্ত্রির সাথে। একসময় সেও মেনে নেয়, আনোরি ভেগে গেছে, রইসু মিস্ত্রির সাথে!

 

২.
কলিংবেলের শব্দে আমার ঘুম ভাঙে। দরজা খুলে দেখি সরকারি ডাক। মোটা একটা খাম ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। একটু ফ্রেশ হয়ে খাম খুলে দেখি ডিভোর্সের নোটিশ। ঝুমু আর আমার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখতে চায় না। এক কাগুজে সম্পর্ক আরেকটা কাগজ দিয়ে শেষ করে দিতে চায়। আমি কিছুক্ষণ দম ধরে বসে থাকি। ফ্রিজ থেকে গোল্ড হুইস্কির বোতলটা নিয়ে খালি পেটেই অর্ধেকটা শেষ করে দেই। প্রচণ্ড বমি পায়, তার সাথে পায় অপমান। ব্যাপারটা আপনারা কেউ বুঝতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে না। খুব বেশি অপমান আর খুব বেশি র মদ আমি নিতে পারি না। এখন এই দুইটাই আমার উপর সওয়ার হয়ে বসে আছে। সিদ্ধান্ত নিলাম বমি করে দেবো। কিন্তু বেসিনের সামনে গিয়ে বমি আর আসে না। গলায় আঙুল দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। গলায় আঙুল দিয়ে বমি করা শিখিয়েছিল আমার এক বান্ধবী। তার ধারণা ছিল সকাল বেলা দুই লিটার পানি খেয়ে গলায় আঙুল দিয়ে বমি করলে এসিডিটির সমস্যা চলে যায়। আমি কয়েকদিন ট্রাই করে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। আঙুল থেরাপি দিয়ে বমি করলাম। একটু ভালো লাগল, অপমানও কিছুটা কমে এলো।

ঝুমু আমাকে ডিভোর্স দেওয়ায় যতটা না আপসেট আমি তার চেয়ে বেশি আপসেট সে অজিতের সাথে চলে যাওয়ায়। আমি কিছুতেই ভেবে পাই না অজিত কোন দিক দিয়ে আমার চেয়ে ভালো হলো। টাকা পয়সা, স্ট্যাটাস, এমনকি দেখতে শুনতেও সে আমার ধারে কাছে নেই। তার মতো দশ বারোটা আর্টিস্ট সারাজীবন পকেটে নিয়ে ঘোরার মতো সক্ষমতা আমার আছে। এরপরও ঝুমুর মনে হলো অজিত ইজ বেটার দ্যান মি! হোয়াট দা ফাক! আমি কি করব বুঝে উঠতে পারি না। ভুল মোটামুটি আমারই। নতুন বাড়ির ইন্টেরিয়র করানোর সময় একটা আইডিয়া এলো মাথায়। লিভিং রুমের দেয়ালে ভ্যান গঘের স্টারি নাইট আর মাস্টার বেডরুমে রেমব্রান্টের ডানাই এই দুইটা চিত্রকর্ম আঁকা থাকবে। এক বন্ধু অজিতের খোঁজ দিলো। ছেলেটাকে প্রথম কথাবার্তায় ভালো লাগল। কলকাতা থেকে চারুকলায় পড়ে আসা। কোনো চাহিদা নেই। টাকা যা দেবো তাই নেবে। দশ-বারো দিন সময় লাগবে বলল। আমি ওকে পনেরো দিন সময় দিলাম। ঝুমুকে বলে দিলাম ওর যা কিছু লাগে ব্যবস্থা করতে। ওই দিকে সাংহাইতে আমার এক বিজনেস ট্রিপ। কোনোরকমে সব বুঝিয়ে দিয়ে চলে যেতে হলো। সাথে নিলাম অফিসের জুনিয়র এক্সিকিউটিভ সামান্থাকে। অনেকদিন ধরেই তক্কে তক্কে ছিলাম। রাজি হয়নি প্রথমে। এই সেই করে প্রমোশনের সুবিধা, বিজনেস বোঝা এসব কথা বলে সাথে নিলাম। দশ দিন ব্যস্ততার মধ্যে কেটে গেল। সামান্থাও মোটামুটি ভালোই লাইনে এলো। এর মধ্যে ঝুমুর সাথে কথা বলার সময় হলো দুই বার। পেইন্টিং নিয়ে সে খুবই এক্সাইটেড। ক্যামেরা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে। খেয়াল করলাম তার বাম গালে রং। জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করলাম না।

ঝুমুকে বলে দিলাম ওর যা কিছু লাগে ব্যবস্থা করতে। ওই দিকে সাংহাইতে আমার এক বিজনেস ট্রিপ। কোনোরকমে সব বুঝিয়ে দিয়ে চলে যেতে হলো। সাথে নিলাম অফিসের জুনিয়র এক্সিকিউটিভ সামান্থাকে। অনেকদিন ধরেই তক্কে তক্কে ছিলাম। রাজি হয়নি প্রথমে। এই সেই করে প্রমোশনের সুবিধা, বিজনেস বোঝা এসব কথা বলে সাথে নিলাম। দশ দিন ব্যস্ততার মধ্যে কেটে গেল।

দশ দিন পর ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে বাসায় ফিরলাম। রাত এগারোটা। ঝুমু বাসায় নেই। কেয়ারটেকারকে জিজ্ঞেস করতেই বলল, অজিতের সাথে বাইরে গেছে। আমি একটু অবাক হলাম। পেইন্টিংগুলোর কথা মনে পড়ল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। অসাধারণ কাজ হয়েছে যেন স্বয়ং রেমব্রান্ট আর ভ্যান গঘ এসে এঁকে দিয়েছেন। ফ্রেশ হয়ে বারান্দায় গিয়ে সিগার ধরালাম, হাভানা। আকাশে গোল চাঁদ। এই সময় গাড়ি এসে থামল গেটের কাছে। ঝুমু নিজেই ড্রাইভ করছে। দারোয়ান গেট খুলে দিলো। অজিত আর ঝুমু দুজনেই নামল। কি কি জানি কথা বলছে আর হাসছে। হাসতে হাসতে ঝুমু যেন অজিতের গায়ের দিকে ঝুঁকে পড়ল। হঠাৎই মাথায় রক্ত উঠে গেল। বিষয়টা এড়িয়ে যেতে চাইলাম। গোল চাঁদের দিকে তাকালাম। ঝামেলা হলো তখনই। চাঁদের দিকে তাকাতেই মাথা খালি হয়ে গেল। এক রকম দৌঁড়ে নিচে নেমে এলাম। গেটের বাইরে গিয়ে দেখলাম ঝুমু অজিতের বাহু ধরে হাসছে। প্রথমেই ঝুমুকে কষে দুইটা চড় লাগালাম। অজিত কেমন যেন ধাক্কার মতো দিল আমাকে। সর্বশক্তি দিয়ে ওর চোয়ালে ঘুষি দিতেই মুখ থুবড়ে পড়ল। ঝুমুকে টানতে টানতে বাসায় নিয়ে গেলাম। যেন এক কেয়ামতের রাত গেল। মারামারি, গালিগালাজ, ভাংচুর, কাঁদাকাটি, এই সেই। ঝুমু বলেই ফেলল সে আর আমার সাথে থাকবে না, সামান্থাকে নিয়ে কেন সাংহাই গিয়েছি তা সে জানে, এই সেই। ওই দিকে অজিত পুলিশ নিয়ে এসেছে। এটেম্পট টু মার্ডার কেস। আবার ডমেস্টিক ভায়োলেন্স। সব মিলিয়ে আমার অবস্থা আর অবস্থা নেই। এক কম বয়েসি এস আই যন্ত্রের মতো করে বলল, ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট, আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে।

ছাড়া পেলাম সাড়ে তিন দিন পর। বাসায় ফিরে দেখি ঝুমু নেই। তার কোনো জিনিসপত্রও বাসায় নেই। এমনকি বাথরুমের স্যান্ডেল জোড়াও নিয়ে চলে গেছে। শুধু কয়েকটা চুল আটকে আছে চিরুনির সাথে। গোসল করে লম্বা একটা ঘুম দিলাম। কয়েকদিন অফিস-টফিস বাদ দিয়ে এদিক সেদিক ঘুরলাম। ঝুমুকে খোঁজার চেষ্টা করলাম। কেউ বলতে পারল না। আমার সেই বন্ধুর কাছে গেলাম অজিতের খোঁজ নিতে। অজিত কলকাতা চলে গেছে। আমার ধারণা ঝুমুও সাথে গেছে। ধারণা সত্যি হতে খুব বেশি সময় নিল না। ঝুমুর এক বান্ধবী মেসেঞ্জারে এক স্ক্রিনশট পাঠাল, ঝুমু অজিতের সাথে দার্জিলিং এর এথনিক ড্রেস পরে ছবি আপলোড করেছে আর ক্যাপশন দিয়েছে, ‘যা দেখি নতুন লাগে’। মনে মনে যত ফেমিনিন গালি দেশে চালু আছে সব দিয়ে দিলাম।

কিন্তু ঝুমুর পাঠানো ডিভোর্স লেটার পাওয়ার পর মনে হলো সব শেষ। একদিকে অপমানবোধ অন্যদিকে ঝুমুর জন্য খারাপ লাগা আমাকে দীর্ঘদিন বৃষ্টি বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো মেঘের মতো করে দিলো। মনে হলো এই জীবনের কোনো মানে নেই। সামান্থা কয়েকবার ফোন দিয়ে কোথাও যেতে চাচ্ছিল, আমি গেলাম না। অফিসে গিয়ে কোনো রকম সাইন টাইন করে চলে আসি। রাতে ঘুমের ভেতরও ঝুমুর কথা মনে হয়। অসম্ভব এক দুঃখবোধ ব্ল্যাকহোল হয়ে আমাকে ভেতরের দিকে টানতে থাকে আর আমি সেদিকে ধীরে ধীরে এগুতে থাকি।

 

৩.
আমি বসে আছি স্টেশনের দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে। ঝুমু নাকি দেশে এসেছে। বাবার বাড়িতে আছে এখন। আমার গন্তব্য সেই বাড়ি। ইচ্ছে করেই গাড়ি নিলাম না। এরকম ছেঁড়াখোঁড়া মন নিয়ে অনেক মানুষের ভেতরে থাকতে হয়। ট্রেন আসার কথা সাড়ে এগারোটায়। এখন বারোটা। সামান্য দূরত্বে এক লোক তার ছোটো ছোটো দুই বাচ্চাকে নিয়ে বসে আছে। তার গায়ে ইস্ত্রি করা সাদা শার্ট। ছোটোজনকে সামাল দিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে তার। বড়োজন বেশ শান্ত হয়ে একটা খেলনা মোবাইল টিপছে। এক একটা বাটন টেপে আর একেক রকম গান বাজে। বেশির ভাগ গানই বোঝা যাচ্ছে না। আমার দেখতে ভালো লাগছে। লোকটার সাথে দুইবার চোখাচোখি হলো। দ্বিতীয়বার চোখাচোখি হতেই আমার দিকে দুই ছেলেকে নিয়ে আসতে থাকল। এসে বলল তার দুই বাচ্চাকে যেন একটু দেখি, অনেকক্ষণ ধরে তার বাথরুমে যাওয়া দরকার কিন্তু যেতে পারছে না। অন্য সময় হলে রাজি হতাম না। তখন রাজি হলাম। একটু পরেই লোকটা চলে এলো। কৃতজ্ঞতার হাসি দিলো। সামনে এক চাওয়ালা ঘুরঘুর করছিল। আমি সৌজন্যতা করে জিজ্ঞেস করলাম চা খাবে কি না। চা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম, বাচ্চাদের মা কোথায়? একটু ইতস্ততঃবোধ করল। তারপর বলল, মায়ের কাছেই নিয়ে যাচ্ছে। আমি তার চোখের দিকে তাকালাম আর যেন দেখতে পেলাম এই লোকও কোনো এক দুঃখবোধের ব্ল্যাকহোলে আটকে আছে।

একটু পর লোকটা আমাকে একথা সেকথার সুতা ধরে সবই বলতে থাকল। সে বলে যে তার নাম হরতন আলী। তার বউ আনোরির কথা বলে। বউকে সে কত ভালোবাসে তা বলে। রইসুর কথা বলে। আরও বলে তার বাড়ির সবচেয়ে বড়ো আম গাছের কথা, সেইদিনের সেই সন্ধ্যার কথা, সালিশের দিনে তার সবকিছু ভুলে যাওয়ার কথা, সে রাতের ভাত খাওয়ার পাটির কথা, সেই গাঢ় ঘুম আর স্বপ্নের কথা। আমি শুনলাম। শুনতে শুনতে আমার কান বন্ধ হয়ে এলো। বন্ধ কানের কাছে একঘেয়ে আর বিরক্তিকর একটা পিইইইইইইই… আওয়াজ হতে থাকল আর আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম ঝুমু আর অজিত কি কি করছে। আমি মনে মনে মরিয়া হয়ে ঝুমুকে একের পর এক কাপড় পরাতে লাগলাম আর অজিত সব কাপড় খুলতে থাকল। অসহায় দৃষ্টিতে আমি হরতন আলীর দিকে তাকালাম। আমার মনে হলো সেও আনোরিকে মনে মনে একের পর এক কাপড় পরাচ্ছে আর রইসু সব খুলে ফেলছে। আমার মনে হলো আমরা স্টেশনের একই প্ল্যাটফর্মেই নেই শুধু, জীবনেরও একই প্ল্যাটফর্মে বসে আছি যার নম্বর শূন্য। আর বসে বসে ধুতুরার বিষমেশানো চা খাচ্ছি।

হরতন আলীর কথায় আমার এইসব মনে হওয়ার জগতে বাঁধা পড়ে, ‘খবর পাইছি সে এখন এক গার্মেনে কাম নিছে। হ্যানে যাই। পুলা দুইটারে দেইখ্যা যদি ফির‍্যা আসে। নিজের প্যাডের ধন ফালাইতে তো পারব না। কী কন?’ এই বলে একটু জিরোয়। ‘বাচ্চার কথা থাউক। এই যে তারে আমি এত বালোবাসলাম। তার কথা বাইবাও তো আসতো পারে। এইসব বালোবাসার কথা কি বুলন যায় মিয়াবাই?’

হরতন আলীর কথায় আমার এইসব মনে হওয়ার জগতে বাঁধা পড়ে, ‘খবর পাইছি সে এখন এক গার্মেনে কাম নিছে। হ্যানে যাই। পুলা দুইটারে দেইখ্যা যদি ফির‍্যা আসে। নিজের প্যাডের ধন ফালাইতে তো পারব না। কী কন?’ এই বলে একটু জিরোয়। ‘বাচ্চার কথা থাউক। এই যে তারে আমি এত বালোবাসলাম। তার কথা বাইবাও তো আসতো পারে। এইসব বালোবাসার কথা কি বুলন যায় মিয়াবাই?’ তার কথায় আমি একরকম জোর খুঁজে পাই। মৃদু আশ্বাস দিয়ে বলি, ‘অবশ্যই ফিরে আসবে ভাই।’ এই সময় এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেন আসে। হরতন বলে উঠে, ‘হায়! হায়! আমি তো বুল পেলাটফরমে। আমার ট্রেন তো ওইখানে।’ এই বলে বাচ্চা দুটোকে নিয়ে চলে যায়। ট্রেনের দরজার কাছে গিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে, ‘গ্যালাম মিয়াবাই!’ আমি হাত তুলি।

আমার মুহূর্তের মধ্যে মনে হয় হরতন আলী আর আমার প্ল্যাটফর্ম এই মাত্র আলাদা হয়ে গেল। আনোরি তার কাছে ফিরে আসবে। তার এত এত ভালোবাসার কথা নিশ্চয় আনোরি ভোলেনি। আমি ভাবি, ‘ঝুমুও নিশ্চয় আমার সেই প্রচণ্ডরকম ভালোবাসার কথা মনে রেখেছে। সেই ভালোবাসার কথা ভেবেই সে চলে আসবে।’ কিন্তু নিজের ভাবনায় কোনো জোর পাই না। দুই নম্বর লাইনেও ট্রেন চলে আসে। আমি ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়াই। আবারও মনে হয় যে আমার আর হরতন আলীর প্ল্যাটফর্ম তো এক না, আলাদা হয়ে গেছে। হরতনের আনোরি ফিরে আসার ব্যাপারে নিশ্চিত হলেও আমার ঝুমু ফিরে আসবে কি না সে ব্যাপারে আমি দ্বিধায় পড়ে যাই। ও ফিরে না এলে কি হবে না হবে তা ভেবে কোনো কূল-কিনারা পাই না। বসে পড়ি। শীতের দুপুরের মিষ্টি রোদ, মানুষের কোলাহল, হকারদের চিৎকার, ট্রেনের হুইসেল, লাইনের ঝিক ঝিক শব্দ সব কিছু মিলিয়ে আমার কাছে অস্বস্তি লাগে। বমি পায়। আমি নিশ্চিত সত্যি সত্যি বমি পাচ্ছে না। বমি করতে গিয়ে দেখা যাবে গলায় আঙুল দিতে হচ্ছে। ততক্ষণে দুই নম্বর লাইনের ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে গেছে।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামে হলেও ফেনীতে বেড়ে উঠা। পড়াশোনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে। পড়তে ভালোবাসেন। বর্তমানে একটি সরকারি দপ্তরে সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।