সোমবার, ডিসেম্বর ৫

ফজল হাসানের ধারাবাহিক ভ্রমণগদ্য : বাইরে দূরে মিশর ঘুরে-২য় পর্ব

0

লুক্সর মন্দির : যেখানে ফারাও রাজাদের মুকুট পরানো হতো


[লুক্সর শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত লুক্সর মন্দির সম্পর্কে লেখার আগে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আমরা মন্দিরে দুবার গিয়েছি। কারনাক মন্দির পরিদর্শনের মতোই প্রথম গিয়েছি সিস্টার মাইয়ের সঙ্গে এবং দ্বিতীয়বার গিয়েছি ‘নাইল রিভার ক্রুজ’ ট্যুর প্যাকেজের অংশ হিসেবে (নাইল রিভার ক্রুজ প্রসঙ্গে পরের পর্বে আলাদা ভাবে বিস্তারিত আছে)। তাই দুবার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতি একাকার করে লিপিবদ্ধ করেছি। সঙ্গত কারণেই লেখার ভেতর প্রাসঙ্গিকভাবে সব সূত্রের কথা উঠে এসেছে।]

লুক্সর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত লুক্সর মন্দিরের কাছে পৌঁছে আমরা গাড়ি থেকে নামি এবং ট্যুর গাইড ইয়াহিয়াকে অনুসরণ করে গেটের দিকে যাই। তখন আমার ভেতরে খানিকটা উত্তেজনা এবং বাকিটা রোমাঞ্চ টগবগ করছিল। আমাদের এক পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে ইয়াহিয়া টিকেট আনতে যায়। বিদেশী পর্যটকদের জন্য টিকেটের মূল্য মিশরীয় একশ চল্লিশ পাউন্ড। টিকেট ট্যুর প্যাকেজের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাই আমাদের বাড়তি খরচ করতে হয়নি।

আমরা নিজেদের টিকেট দেখিয়ে মন্দির চত্বরে প্রবেশ করি। আমি নির্বাক হয়ে মূল গেটের দিকে তাকিয়ে থাকি। দুপাশে বিশাল দেয়াল এবং ভেতরে যাওয়ার জন্য মাঝখানে প্রশস্ত প্রবেশ পথ। আমাদের থামিয়ে ইয়াহিয়া মন্দির সম্পর্কে রীতিমতো একটা বক্তৃতা দেয়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ইয়াহিয়া শুরুতেই বিড়াল মেরেছে, অর্থাৎ মন্দিরে প্রবেশ করার আগে সে বলে দিয়েছে যে, উল্লেখযোগ্য স্থাপনার সামনে নিয়ে যাবে এবং সেই সম্পর্কে বিবরণ দিবে। তবে তার ধারাবিবরণীর মাঝে যেন আমরা কোনো প্রশ্ন না করি। তার বলার পরে আমাদের জন্য প্রশ্ন করার সুযোগ থাকবে এবং শেষে বিস্তারিত দেখা বা স্থাপনার পাশের ফলকে দেওয়া তথ্য পড়ার জন্য অল্প সময় পাওয়া যাবে, এমনকি ছবি তোলার সময়ও থাকবে।

তবে তার ধারাবিবরণীর মাঝে যেন আমরা কোনো প্রশ্ন না করি। তার বলার পরে আমাদের জন্য প্রশ্ন করার সুযোগ থাকবে এবং শেষে বিস্তারিত দেখা বা স্থাপনার পাশের ফলকে দেওয়া তথ্য পড়ার জন্য অল্প সময় পাওয়া যাবে, এমনকি ছবি তোলার সময়ও থাকবে।

লুক্সর মন্দির মিশরের সর্বাধিক সুরক্ষিত মন্দির। প্রাচীন মিশরীয় ভাষায় লুক্সর মন্দির ‘ইপেট রেসিট’ নামে পরিচিত, যার অর্থ ‘দক্ষিণের অভয়ারণ্য’। মন্দিরটি আমুন, তার স্ত্রী মুত এবং তাদের পুত্র খোন– ধর্মবিশ্বাসী এই ত্রয়ীকে উৎসর্গ করা হয়েছিল।

লুক্সর মন্দির নির্মাণের একাধিক কারণ প্রচলিত আছে।

লুক্সর মন্দির রাজতন্ত্রের পুনরুজ্জীবনের জন্য নির্মিত হয়েছিল। বাস্তবে হোক কিংবা কল্পনায় হোক, অনেক রাজাকে লুক্সর মন্দিরে মুকুট পরানো হয়েছিল। শোনা যায় আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট দাবি করেছিলেন যে, তাকে এই লুক্সর মন্দিরে মুকুট পরানো হয়েছিল। তবে তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, তিনি কখনো মেমফিসের (বর্তমানে কায়রো) দক্ষিণে ভ্রমণ করেননি। যাহোক, লুক্সর মন্দিরকে ‘দ্য প্লেস অব দ্য ফার্স্ট অকেশন’ বা ‘প্রথম অনুষ্ঠানের স্থান’ বলা হয়। এছাড়া এই মন্দিরেই বড়ো বড়ো উদযাপন করা হতো।


আরও পড়ুন : বাইরে দূরে মিশর ঘুরে-১ম পর্ব


আবার অনেকের ধারণা যে, ‘ওপেত উৎসব’ পালন করার জন্য মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছিল (ওপেত উৎসব সম্পর্কে পরবর্তীতে বিস্তারিত আছে)। সেই উৎসবে তৃতীয় আমেনহোতেপ তার রাজত্বের বৈধতা স্বীকার এবং তার ঈশ্বর আমন রা-এর ঐশ্বরিক আশির্বাদ কামনা করতেন। এছাড়া ঈশ্বর আমুন রা এবং দেবী মুতের মধ্যে বিবাহের বন্ধন পুনরুজ্জীবিত করারও আরেক কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিউ কিংডমের তৃতীয় ফারাও রাজা আমেনহোটেপ (খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ১৩৯০-১৩৫২) খ্রিষ্টপূর্ব ১৩৯০ সালে লুক্সর মন্দির নির্মাণ কাজ শুরু করেন। কিন্তু তিনি নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করতে পারেননি। পরবর্তীতে বিভিন্ন ফারাও রাজারা, যেমন তুতানখামুন (খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ১৩৩৬-১৩২৭), হোরেমহেব (খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ১৩২৩-১২৯৫) এবং দ্বিতীয় রামেজিস (খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ১২৭৯-১২১৩), মন্দিরের বিভিন্ন অংশ সংযোজন এবং সংশোধন ও পরিবর্ধন করে নির্মাণ কাজ শেষ করেন। মন্দির নির্মাণের জন্য তৃতীয় আমেনহোতেপ এবং দ্বিতীয় রামেজিস চুনাপাথর, বেলেপাথর, অ্যালাবাস্টার এবং গ্রানাইটের মতো ভালো গুণাবলীর সবচেয়ে শক্তিশালী পাথরগুলো বেছে নিয়েছিলেন।

জানা যায়, দ্বিতীয় রামেজিস তার নিজের খ্যাতি বাড়ানোর জন্য লুক্সর মন্দিরে অনেক স্মৃতিস্তম্ভ পুনরায় তৈরি করেছিলেন। বর্তমানে মন্দিরে সাজানো যেসব মূর্তি এবং খোদাইকরা শিল্পকর্ম দেখা যায়, সেসবের অনেক কিছুতেই দ্বিতীয় রামেজিসের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। যাহোক, লুক্সার মন্দিরের মর্যাদা শত শত বছর ধরে হ্রাস পেয়েছিল। তবে আমেনহোটেপের গৌরবের দিনগুলো আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ৩২০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে পুনরুদ্ধার করেন।

কার্নাক মন্দিরের তুলনায় আকারে ছোটো লুক্সর মন্দিরকে দিনের আলোতে যেমন দেখায়, রাতেরবেলা সম্পূর্ণ ভিন্ন (উল্লেখ্য, সিস্টার মাইয়ের সঙ্গে মেহেরুন এবং আমি সন্ধ্যার পরে গিয়েছিলাম)। মন্দিরটি রাতের আলোকসজ্জায় এক অলৌকিক আবহ তৈরি করে।

এছাড়াও দ্বিতীয় রামেজিস তার রাজকীয় জয়ন্তী উপলক্ষ্যে প্রবেশদ্বারে দুটি লাল গ্রানাইট পাথরের ওবেলিস্ক (সরু কারুকাজ করা পাথরের উঁচু পিলার বা স্তম্ভ) স্থাপন করেছিলেন। বাম দিকের ওবেলিস্ক এখনো তার মূল জায়গায় রয়েছে এবং রাজা দ্বিতীয় রামেজিসের নাম খোদাই করে লেখা আছে। অন্যদিকে ডান পাশের ওবেলিস্ক ১৮৩৬ সালে মিশরের তৎকালীন অটোম্যান শাসক মোহাম্মদ আলী পাশা (১৭৬৯-১৮৪৯) ফরাসী সরকারকে উপহার হিসেবে দিয়েছেন।

লুক্সর মন্দিরের মূল প্রবেশদ্বার (তোরণ বা পাইলন) সবচেয়ে সুন্দর স্থাপত্য নকশাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি দ্বিতীয় রামেজিস নির্মাণ করেছিলেন এবং তার সামরিক অভিযানের দৃশ্য দিয়ে সাজানো হয়েছিল, বিশেষ করে কাদেশের যুদ্ধে তার বিজয়। তোরণটি ১৮৮০-এর দশক পর্যন্ত বালিতে অর্ধেক চাপা ছিল। তবে যখন তা পুনরুদ্ধার করা হয়, তখন দুপাশের সামান্য কাত করা উঁচু দেয়াল পাওয়া যায়। তৎকালীন সময়ে তোরণের উপরে চারটি বিশাল দেবদারু কাঠের পতাকাদন্ড ছিল এবং সেখান থেকে বিজয়ের ব্যানার বাতাসে উড়ত। উভয় দেয়ালের সামনে ছিল দ্বিতীয় রামেজিসের ছয়টি বিশাল মূর্তি: দুটি বসে থাকা এবং চারটি দাঁড়ানো। তবে বর্তমানে দেয়ালের সামনে কেবল দুটি বসা এবং ডানদিকে মাত্র একটি দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তি রয়েছে। মন্দিরে ঢোকার সময় বাম দিকের (অর্থাৎ পূর্ব দিকের) একটি ‘দুই দেশের শাসক’ (প্রাচীনকালে মিশর দুটি আলাদা রাজ্য নিয়ে গঠিত ছিল: লোয়ার বা উত্তর ইজিপ্ট এবং আপার বা দক্ষিণ ইজিপ্ট)। এছাড়াও দ্বিতীয় রামেজিস তার রাজকীয় জয়ন্তী উপলক্ষ্যে প্রবেশদ্বারে দুটি লাল গ্রানাইট পাথরের ওবেলিস্ক (সরু কারুকাজ করা পাথরের উঁচু পিলার বা স্তম্ভ) স্থাপন করেছিলেন। বাম দিকের ওবেলিস্ক এখনো তার মূল জায়গায় রয়েছে এবং রাজা দ্বিতীয় রামেজিসের নাম খোদাই করে লেখা আছে। অন্যদিকে ডান পাশের ওবেলিস্ক ১৮৩৬ সালে মিশরের তৎকালীন অটোম্যান শাসক মোহাম্মদ আলী পাশা (১৭৬৯-১৮৪৯) ফরাসী সরকারকে উপহার হিসেবে দিয়েছেন। বর্তমানে সেই ওবেলিস্কটি প্যারিস নগরীর ‘প্লেস ডি লা কনকর্ড-এর মাঝে নিঃসঙ্গ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।


Egypt_Part 1_Episode 2_Photo_1

লুক্সর মন্দিরের প্রবেশদ্বার


মিনিট পনের পরে আমরা ইয়াহিয়ার সঙ্গে তোরণ পেরিয়ে লুক্সর মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করি, যা দ্বিতীয় রামজিসের উঠোন বা চত্বর নামে পরিচিত। উঠানের চারপাশে রয়েছে চুয়াত্তরটি স্তম্ভ এবং স্তম্ভের গায়ে ফারাও আমলের প্যাপিরাস উদ্ভিদ ও পদ্ম-কুঁড়ির নকশা করা হয়েছে। একসময় উভয় দিকের দুই সারি স্তম্ভের উপর ছাদ ছিল। এছাড়া উঠানের দক্ষিণ অংশে দ্বিতীয় রামজিসের বেশ কয়েকটি বিশাল মূর্তি রয়েছে। তার মধ্যে ফেরাউনের দুটি মূর্তি আছে, যেখানে তিনি হাঁটুর উপর হাত রেখে বসে আছেন এবং বাকিগুলো দাঁড়ানো মূর্তি। কলোনেডে ঢোকার পথে হাতের ডান দিকের মূতিতে ফেরাউনের ডান পায়ের কাছে খোদাই করা তার স্ত্রী রানী নেফারতারির ছোটো আকৃতির একটি মূর্তি রয়েছে।

দ্বিতীয় রামজিসের উঠানের উত্তর-পশ্চিম কোণের ভজনালয়গুলো ফারাও রানী হাতশেপসুত (রাজত্বকাল: খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ১৪৭৯-১৪৫৮) এবং অষ্টাদশ রাজবংশের ষষ্ঠ ফারাও রাজা তৃতীয় থুতমোজের (রাজত্বকাল: খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ১৪৭৯-১৪২৫) জন্য নির্দিষ্ট ছিল। মাঝখানে এবং পূর্ব দিকে আমন রা দেবতাকে উৎসর্গ করা চারটি কলাম দেখা যায়, যা দেবী মুতের পবিত্র নৌকার জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে। ভজনালয়ের দেওয়ালে ফারাওদের ছবি এবং বিভিন্ন শিলালিপি এখনো দেখা যায়।


 

Egypt_Part 1_Episode 2_Photo_2

দ্বিতীয় রামেজিসের উঠানে তার দুই মূর্তি


দ্বিতীয় রামজিসের উঠানের উত্তর-পূর্ব কোণে একটি অন্যটির উপরে নির্মিত দুটি বড়ো কাঠামো রয়েছে। সেখানে খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর দিকে কপটিক গির্জা নির্মাণ করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, রোমান শাসকরা মিশর দখল করার পরে লুক্সর মন্দিরটিও দখল করেছিল। তারা মন্দিরটি দূর্গে অন্তর্ভুক্ত করে এবং খ্রিষ্টধর্ম সাম্রাজ্যের ধর্ম হয়ে ওঠার পর তারা মন্দিরের একাংশে রোমান ক্যাথলিক গির্জায় রূপান্তরিত করে। পরবর্তী সময়ে গির্জার জায়গায় মসজিদ নির্মাণ করা হয়। কেননা নীলনদের পলি জমে সম্পূর্ণ মন্দিরটি বালির প্রায় পঁচিশ ফুট নিচে তলিয়ে গিয়েছিল এবং সেখানে গির্জার কোনো চিহ্ন ছিল না।

ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, মধ্যযুগীয় মুসলমান বসতিস্থাপনকারীরা মন্দির আশেপাশে বাড়িঘর তৈরি করে। ফাতেমী যুগে (৯০৯-১১৭১ খ্রিষ্টাব্দ) গির্জার ভিত্তির উপর মসজিদ নির্মিত হয়, যা আজো সেখানে আছে। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে দ্বিতীয় রামজিসের উঠানের খনন কাজ করার সময় মসজিদের প্রবেশপথ পূর্বদিকে, অর্থাৎ শহরের দিকে, স্থানান্তর করা হয়। মসজিদের টালির তৈরি প্রাচীন আমলের প্রবেশ পথটি এখনো উঁচু তোরণের কাছে দেখা যায়।

মসজিদটির নাম রাখা হয়েছে শেখ ইউসুফ আল-হাগাগ মসজিদ। উল্লেখ্য, শেখ ইউসুফ আল-হাগাগের আসল নাম ইউসেফ বিন আব্দুল রহিম বিন ইউসেফ বিন ইসা আল জাহিদ (জন্ম আনুমানিক ১১৫০ সাল এবং মৃত্যু আনুমানিক ১২৪৫ সাল)। তিনি ছিলেন একজন সাধু এবং বলা হয় তার হাত ধরেই লুক্সরে ইসলাম ধর্ম প্রচারিত হয়েছে। তাকে নবী করীম হযরত মোহাম্মদ (সা:)-এর বংশধর মনে করা হয়। তিনি বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন, পরে মক্কায় চলে যান এবং অবশেষে লুক্সরে বসতি স্থাপন করেন। তিনি ‘তীর্থযাত্রার পিতা’ ডাকনাম অর্জন করেন। স্থানীয় লোককথা থেকে জানা যায় যে, তিনি মসজিদটি নির্মাণ করেননি, কিন্তু পরে কর্মকর্তারা ভেঙ্গে ফেলতে উদ্যোগ নিলে তিনি মসজিদটি রক্ষা করেছিলেন।

লুক্সর মন্দির নির্মাণের পর থেকেই একটি পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। পণ্ডিত এবং ইতিহাসবিদরা নির্ধারণ করেছেন যে, নির্মাণের পর থেকে আজ পর্যন্ত লুক্সর মন্দির চত্বর কমপক্ষে তিন হাজার বছর ধরে পৌত্তলিক, খ্রীষ্টান ও মুসলমানদের সক্রিয় উপাসনার পবিত্র স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।


Egypt_Part 1_Episode 2_Photo_3

লুক্সর মন্দিরের অভ্যন্তরে আল-হাগাগ মসজিদ


দ্বিতীয় রামজিসের উঠোন পেরিয়ে পরবর্তী দর্শণীয় স্থাপনা তৃতীয় আমেনহোতেপের উঠানে যেতে হলে কলোনেইড (অর্থাৎ সমান ব্যবধানে স্থাপিত স্তম্ভের বারান্দা) পেরিয়ে যেতে হয়। লুক্সর মন্দিরের প্রাচীনতম অংশের একটি অংশ এই কলোনেইড। লুক্সর মন্দিরের বিশাল শোভাযাত্রার প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করার জন্য কলোনেইড নির্মাণ করা হয়েছিল। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই তৃতীয় আমেনহোতেপ মারা যান এবং তার পরিকল্পনাটি তার নাতি তুতানখামুনে আকৃষ্ট করে। অল্প বয়সে তুতানখামুনের মৃত্যর পরে সম্পূর্ণ করার জন্য তার উত্তরসূরি রাজা অ্যায় (খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ১৩২৭-১২২৩) এবং রাজা হোরেমহেবের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। উল্লেখ্য, তৃতীয় আমেনহোটেপ পুত্র আখেনাতেনের (তুতানখামুনের পিতা) শাসনামলে উপনিবেশের একমাত্র মনোযোগ ছিল নেতিবাচক ধরণের। তাই আমুন দেবতার বিরুদ্ধে তার প্রচারণার অংশ হিসেবে তার বাবার নাম বিকৃত করা ছিল তার অন্যতম উদ্দেশ্য। তুতানখামুন যখন ক্ষমতায় এসে পুরানো শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করেন, তখন উপনিবেশের কাজ চলতে থাকে।

কলোনেইডের দৈর্ঘ্য এক শ’ মিটার এবং সেখানে সাত জোড়া ষোল মিটার (বা বাহান্ন ফুট) উঁচু স্তম্ভ রয়েছে। সেই স্তম্ভগুলো বিশাল ছাদের ভারসাম্য রক্ষা করার তৈরি। যদিও কলোননেইডটি তৃতীয় আমেনহোটেপ নির্মাণ করেছিলেন, তবে পরবর্তী ফারাও রাজারা (বালক রাজা তুতানখামুন, হোরেমহেব, প্রথম সেতি, দ্বিতীয় রামেজিস এবং দ্বিতীয় সেতি) সেখানে তাদের নাম লিপিবদ্ধ করেন। তুতানখামুন পূর্ব দিকের দেওয়ালে কারুকাজ করিয়ে নিজের নাম লিখেছিলেন এবং রাজা অ্যায়ে দক্ষিণ দিকের শেষ মাথায় কারুকাজের সঙ্গে নিজের নাম যুক্ত করেছিলেন, কিন্তু হোরেমহেব ক্ষমতায় এসে তাদের দু’জনের নাম মুছে দিয়ে নিজের নাম খোদাই করেন। জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে কলোনেইডের ছাদ ধসে পড়ে এবং দেওয়ালের পাথরের বিশাল টুকরোগুলো পরে মধ্যযুগে মন্দিরের চারপাশে বিল্ডিং নির্মাণের উপাদান হিসেবে পুনরায় ব্যবহার করা হয়।


Egypt_Part 1_Episode 2_Photo_4

লুক্সর মন্দিরের অভ্যন্তরে কলোনেইড (সারি বাঁধা বিশাল স্তম্ভ)


কলোনেইড পেরিয়ে তৃতীয় আমেনহোতেপের উঠানে (বা কোর্টইয়ার্ড) যেতে হয়। এই উঠোন অন্য নামে পরিচিত, যেমন সান কোর্ট বা সোলার কোর্ট। উঠানের তিন দিকে জোড়া সারি বাঁধা প্যাপিরাস স্তম্ভ রয়েছে এবং চতুর্থ দিকে, অর্থাৎ উত্তর প্রান্তে, মূলত মন্দিরের প্রবেশপথ ছিল। পূর্ব দিকের স্তম্ভগুলো সংরক্ষিত রয়েছে, যেখানে এখনো মূল রঙের কিছু চিহ্ন দেখা যায়। উঠানের প্রশস্ত মাঝের অংশটি উন্মুক্ত ছিল। একসময় এই উঠানটি পুরো মন্দিরের কেন্দ্র বিন্দু ছিল এবং অষ্টাদশ রাজবংশের স্থাপত্যের একটি চমৎকার স্থাপনা হিসেবে গণ্য করা হয়।

এই তৃতীয় আমেনহোতেপের উঠানের দক্ষিণ দিক দিয়ে সামনে এগোলেই প্রথম দেখা যায় হাইপোস্টাইল কোর্ট (‘হাইপোস্টাইল’ শব্দটি অস্তিত্বহীন ছাদকে বোঝায়, যা সারিবদ্ধভাবে স্তম্ভের উপর ভর করে থাকে)। হাইপোস্টাইল হলের মেঝের পুরোটা জুড়ে রয়েছে গ্রানাইট পাথরের তৈরি বত্রিশটি প্যাপিরাস স্তম্ভ, যা আটটি স্তম্ভের চার সারিতে সাজানো। কেবল ফারাও রাজা এবং পুরোহিত মন্দিরের এই এলাকায় প্রবেশ করতে পারতেন। হাইপোস্টাইল কোর্ট পেরোলেই মন্দিরের অভ্যন্তরীণ অন্য সব স্থাপনা।


Egypt_Part 1_Episode 2_Photo_5

লুক্সর মন্দিরের অভ্যন্তরে তৃতীয় আমেনহোতেপের উঠোন


বর্তমানে হাইপোস্টাইল হলটি তার ঐতিহ্য হারিয়েছে এবং কিছুটা মলিনতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যদিও দেওয়ালে গায়ে এখনো তৃতীয় আমেনহোতেপের চিহ্ন দেখা যায়। স্তম্ভগুলোতে চতুর্থ রামজিস, রামসেস ষষ্ঠ, দ্বিতীয় রামসেস এবং প্রথম সেতির কার্তুশ (প্রাচীন মিশরীয় রাজাদের রাজকীয় বা ঐশ্বরিক নাম প্রকাশকারী একটি আড়ম্বরপূর্ণ চিত্র) রয়েছে এবং সেগুলোতে তাদের নিজ নিজ রাজত্বের সময় মেরামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

হাইপোস্টাইল হলের বাম দিকে সম্রাট অগাস্টাসকে উৎসর্গ করা ল্যাটিন শিলালিপি সম্বলিত একটি বেদী দাঁড়িয়ে আছে। একসময় পিছনের প্রাচীর (বাম ও ডানে) সংলগ্ন রানী মুতে এবং খোনসুর জন্য দুটি ছোটো তীর্থ মন্দির ছিল। তার ঠিক পিছনে মিশরের ফারাও রাজা হিসেবে চিত্রিত আমুনের তীর্থ মন্দির, যা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট পুনর্নির্মাণ করেছিলেন। হাইপোস্টাইল হলের পূর্ব দিকের দরজা পেরোলে দুটি কক্ষ রয়েছে। প্রথমটি হল তৃতীয় আমেনহোতেপের ‘জন্মকক্ষ’, যেখানে তার প্রতীকি ঐশ্বরিক জন্মের দৃশ্য রয়েছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো যে, সেখানে তার গর্ভধারণের মুহূর্তটির চিত্র দেখা যায়, যখন ঈশ্বরের আঙ্গুল রানীর আঙ্গুল স্পর্শ করেছে এবং ‘তার (ঈশ্বরের) শিশির তার (রানীর) শরীরকে পূর্ণ করে’।

মন্দিরের সবশেষের কক্ষটি তৃতীয় আমেনহোতেপের উপাসনার স্থান। সেখানে এখনো পাথরের ভিত্তির অবশিষ্টাংশ দেখতে পাওয়া যায়। বলা হয়, সেই পাথরের উপর আমুনের সোনার পাতের মূর্তি ছিল। যদিও কক্ষটি একসময় মন্দিরের সবচেয়ে পবিত্র অংশ ছিল, কিন্তু বর্তমানে শহরের অন্যতম ব্যস্ত রাস্তা সরাসরি পিছনের দেওয়াল ঘেষে চলে গেছে।

শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, লুক্সর মন্দির নির্মাণের অন্যতম কারণ ছিল ওপেত উৎসব উদযাপন করা।

প্রাচীন মিশরে ওপেত উৎসব ছিল একটি বার্ষিক অনুষ্ঠান, যা জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করা হতো। পণ্ডিত এবং ইতিহাসবিদরা বিশ্বাস করেন যে, প্রাচীন সময়ে মিশরীয়রা ভেবেছিল ওপেত উৎসব ফারাওদের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করত এবং একই সঙ্গে দেবতা আমুনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতাও প্রতিষ্ঠিত হতো।

প্রাচীন মিশরে ওপেত উৎসব ছিল একটি বার্ষিক অনুষ্ঠান, যা জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করা হতো। পণ্ডিত এবং ইতিহাসবিদরা বিশ্বাস করেন যে, প্রাচীন সময়ে মিশরীয়রা ভেবেছিল ওপেত উৎসব ফারাওদের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করত এবং একই সঙ্গে দেবতা আমুনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতাও প্রতিষ্ঠিত হতো। এছাড়া সেই অনুষ্ঠানে প্রথাগত রাজ্যাভিষেক হতো এবং রাজা বিভিন্ন দেবতাদের কাছ থেকে মুকুট পেতেন। সেনাপতি হোরেমহেব ওপেত উৎসবের সুযোগ নিয়ে উনিশতম রাজবংশের (খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ১২৯১-১১৮৫) শুরুতে মিশরের পরবর্তী ফেরাউন হিসেবে নিজেকে জনগণের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। প্রাচীন মিশরীয়রা ফারাও রাজাকে পৃথিবীর মাটিতে দেবতা হোরাসের জীবন্ত প্রতিমূর্তি বলে মনে করত।

আড়াই কিলোমিটার দূরত্ব অবস্থিত এই দুই মন্দিরের মাঝে একটি সরণি ছিল এবং তা কেবল উৎসবের সময় ব্যবহৃত হতো। সেই পথের পাশে তৃতীয় আমেনহোতেপ ভেড়ার স্ফিংক্সের সারি বসিয়েছিলেন। সেই অনুষ্ঠানের জন্য পুরোহিতরা কাঁধে করে দেবতা আমন, মুত এবং খোনসুর মূর্তি বহন করত এবং শোভাযাত্রা করে কার্নাক মন্দির থেকে লুক্সর মন্দিরে নিয়ে আসত। রাস্তার মাঝে আচার-অনুষ্ঠানের জন্য শোভাযাত্রা থামত।

লুক্সর মন্দির দেখার পালা সাঙ্গ করার আগে একটা কথা মনে হয়েছে। মন্দিরটি মিশরীয় প্রাচীন স্থাপনার মধ্যে অন্যতম সেরা সংরক্ষিত স্থাপনা। প্রচুর সংখ্যক কাঠামো এবং খোদাই করা ভাস্কর্য এখনো অক্ষত আছে, যা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য যথেষ্ট।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

গল্পকার, ছড়াকার এবং অনুবাদক। লেখালেখির শুরু সত্তরের মাঝামাঝি। ঢাকার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার সাহিত্য পাতায়, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক এবং অনলাইন ম্যাগাজিনে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে তার মৌলিক এবং অনুবাদ গল্প। এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে দুটি গল্পের সংকলন, চন্দ্রপুকুর (২০০৮) ও কতটা পথ পেরোলে তবে (২০১০)। এছাড়া, তার অনুবাদে আফগানিস্তানের শ্রেষ্ঠ গল্প (২০১৩), নির্বাচিত নোবেল বিজয়ীদের সেরা গল্প (২০১৩), ইরানের শ্রেষ্ঠ গল্প (২০১৪), চীনের শ্রেষ্ঠ গল্প ও নির্বাচিত ম্যান বুকার বিজয়ীদের সেরা গল্প ইত্যাদি প্রকাশিত হয়েছে।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।