বৃহস্পতিবার, মে ৩০

ফিলিস্তিনি ছোটোগল্প ।। গাসান কানাফানির : বাজপাখি

0

অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আমাদের পৃথিবীটা সাজানো হয়েছিল এবং প্রতিটি জিনিস তার নিজস্ব পদমর্যাদা অনুযায়ী রাখা ছিল। ঠিক সে কারণেই আমাদের, অর্থাৎ নতুন নির্মাণ কোম্পানির প্রকৌশলীদের, সঙ্গে ভবনের প্রহরীদের এক ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সেখানে শুধু অভিবাদন ছাড়া অন্য কোনো সম্পর্ক উপস্থিত ছিল না।

‘শুভ সকাল, জাদান।’

আমি জানি, কাঠের তৈরি বসার বেঞ্চ থেকে কাঠখোট্টা উত্তর আসবে:

‘শুভ সকাল, আবদাল্লাহ্।’

এই আবদাল্লাহ্ হলাম আমরা সবাই, কেননা জাদান আমাদের প্রত্যেককেই আবদাল্লাহ্ নামে সম্বোধন করে। আমাদের সবার নাম শেখার ব্যাপারে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ বা আগ্রহ নেই। তার কাছে আমরা সবাই হলাম আবদাল্লাহ্। হে পরওয়ারদেগার, বিদেশীদের নাম স্মরণ করার বিরক্তি থেকে মুমিনদের মুক্তি দিন

প্রহরীদের কক্ষ সরু পথের শেষ প্রান্তে, যেখানে নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ চলছিল এবং যা আমাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। আমরা আগে যে ভবনে বাস করতাম, তার তুলনায় সত্যি এটি ছিল এক চমৎকার ভবন। আগের ভবনটি ছিল নোংরা এবং ইঁদুর ও প্রতিবেশীদের গাদাগাদি ছিল অসহনীয়।

এখানে, এই নতুন ভবনে আমরা সম্পূর্ণভাবে সবকিছু থেকে যোজন দূরে রয়েছি। দিন যতই যায়, ততই আমাদের মনে হয় আমরা যেন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি। আমরা আগে যেসব বাড়িতে থেকেছি, সেগুলো থেকে শুধু নয়, বরং পুরো শহর থেকে আমাদের বর্তমান বাসস্থান সম্পূর্ণ আলাদা।

এখানে, এই নতুন ভবনে আমরা সম্পূর্ণভাবে সবকিছু থেকে যোজন দূরে রয়েছি। দিন যতই যায়, ততই আমাদের মনে হয় আমরা যেন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি। আমরা আগে যেসব বাড়িতে থেকেছি, সেগুলো থেকে শুধু নয়, বরং পুরো শহর থেকে আমাদের বর্তমান বাসস্থান সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা যখন ভবনে প্রবেশ করি এবং ভবন থেকে বেরিয়ে যাই, তখন যদি প্রহরীরা আমাদের অভ্যর্থনা এবং বিদায় না জানাত, তখন নিশ্চয়ই আমাদের মনে হতো আমরা একটা ভদ্র ও মার্জিত খাঁচার ভেতর নিজেদের সমর্পণ করেছি।

সেই সব প্রহরীরা ছিল বেদুঈন। তারা মরুপ্রান্তর থেকে এসেছিল। জাদান ছিল নৈশ প্রহরী, কিন্তু তাকে দিনের বেলাও ভবনের চারপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে। তার কারণ অনেক সময় দিনের বেলা তার কোনো কাজ থাকত না। দিনের প্রহরীর নাম মোবারক। তার দেহের গড়ন বলিষ্ট, বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, গায়ের রং গাঢ় বাদামি এবং পিঠ ছিল বাঁকা। তাকে দেখলে মনে হতো সে যেন কোথাও দীর্ঘ সময় বসে থেকে এই মাত্র উঠে এসেছে। সে প্রহরীদের জন্য নির্ধারিত পোশাক পড়ত। পোশাকের রং ছিল গাঢ় নীল এবং তাতে ছিল বড়ো আকৃতির পিতলের বোতাম। চত্বরের অভ্যন্তরে একটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘরে তার ঘুমানোর ব্যবস্থা ছিল। সেখানে সে সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমাত এবং প্রতি সপ্তাহে ময়লা চাদর বদলানো হতো।

মুবারক এবং জাদানের পরিমণ্ডল থেকে আমাদের পরিমণ্ডলের যোজন দূরত্ব ছিল এবং তা সত্ত্বেও আমরা বুঝতে পারতাম, তাদের দু’জনের মধ্যে অদৃশ্য শত্রুতা ছিল, কিংবা একে অপরকে পছন্দ করত না। আমরা যখনই জানতে পেরেছি, জাদান কখনই তার নির্ধারিত পোশাক পরিধান করে না, বরং সব সময় সে ময়লা জামার উপর মোটা কাপড়ের একটা জোব্বা পড়ে এবং তাকে দেখে বোঝা যায় যে, একসময় সেই ময়লা জামার রং ছিল সাদা। আমরা আরও লক্ষ্য করেছি, মুবারকের মতো জাদান চত্বরের অভ্যন্তরে নির্ধারিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘরে ঘুমায় না। নিজের জন্য সে একটি বড়ো কাঠের বাক্স খুলে লম্বা তিন টুকরো কাঠ দিয়ে ছয় পায়ের উপর দাঁড়ানো একটি অসাধারণ বিছানা বানিয়েছিল এবং ছাগলের কালো চামড়া দিয়ে বিছানা ঢেকে দিয়েছিল। আমরা দেখেছি, সে রাতের বেলা পড়নের জোব্বা খুলে ভাঁজ করে বালিশ হিসেবে মাথার নিচে দিত এবং গায়ের উপর কোনো কিছু না দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। আমরা কখনো তাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘরে ঘুমোতে দেখিনি, অথবা কখনো তার পরনে বড়ো আকৃতির পিতলের বোতাম দিয়ে তৈরি গাঢ় নীল রঙের নির্ধারিত পোশাক দেখিনি।

জাদান সম্ভবত তার সহকর্মী মুবারককে ঘৃণা করত। আমাদের মনে হয়েছে, চমৎকার পোশাক পরিহিত জাদানকে সামনাসামনি দেখলে মুবারক নিজের মধ্যে লজ্জা অনুভব করত। কেননা জাদান তখন ভ্রু কোঁচকানো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আপাদমস্তক তাকে পর্যবেক্ষণ করত।

আমাদের ধারণা সেদিন সত্যি প্রমাণিত হয়েছে, যেদিন আমার কাছে এসে মুবারক তার জন্য কোম্পানির প্রধান বরাবর একটা অভিযোগ পত্র লেখার অনুরোধ করে।

‘কার বিরুদ্ধে অভিযোগ, মুবারক?’ আমি এমন ভঙ্গিতে প্রশ্ন করি যেভাবে একজন ইঞ্জিনিয়ার তার ছয় ধাপ নিচের কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করতে পারে।

জবাবে মুবারক বলল, ‘জাদানের বিরুদ্ধে। যখন শৌচাগার পরিষ্কার করার পালা আসে, তখন সে তা করতে অস্বীকৃতি জানায়।

‘কেন?’

‘আমি জানি না। সে আপনার আরদালীকে দিয়ে কাজ করায় এবং পারিশ্রমিক হিসেবে তাকে তিন রুপি দেয়।’

‘তাতে তোমার কি যদি ঠিক সময় মতো শৌচাগার পরিষ্কার থাকে?’

মুবারক দেওয়ালের দিকে ঝুঁকে দাঁড়ায়। তার চোখেমুখে রাগের চিহ্ন ফুটে ওঠে এবং সে উত্তেজিত হয়ে ব্যাখ্যা করে বলল:

‘শুনুন স্যার, এক সপ্তাহ ধরে আপনার আরদালী শৌচাগার পরিষ্কার করতে অস্বীকার করছে। আপনি কি জানেন, জাদান কী করেছে? ঠিক আছে! আপনাকে জানানোর জন্য বলছি, সে আমাকে পাঁচ রুপির বিনিময়ে শৌচাগার পরিষ্কার করতে বলেছে।’

‘জাদান কেন নিজে তা করে না? শৌচাগার পরিষ্কার করার কাজ কি তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না?’

হ্যাঁ-সূচক ভঙ্গিতে মুবারক মাথা নাড়ে এবং হাতের ধুলা পরিষ্কার করে। তারপর সে মুখ খোলে:

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। কিন্তু আপনি কি জানেন, সে শৌচাগার পরিষ্কার করার কাজ করতে চায় না কেন? আসলে এখানে সে কাজ করতে আসেনি।’

‘তাহলে কেন এসেছে?’

মুবারক পুনরায় মাথা নাড়ে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সে নিচু গলায় বলতে থাকে:

‘আসলে আমি জানি না… কিন্তু আমার মনে হয় সে তার আত্মীয়-পরিজন ও পরিচিতদের কাছ থেকে পালিয়ে এসেছে।’

একসময় মুবারক জাদানের বেঞ্চে বসে এবং আমার দিকে সরাসরি তাকায়। তার সারা মুখে ছড়িয়ে আছে বিদ্বেষ। সে বলল:

‘অনেক দিন আগের ঘটনা। সে একটা মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। মেয়েটির চুল ছিল লাল রঙের। তাদের এলাকায় সে মেয়েটিকে কয়েকজন লোকের সঙ্গে দেখেছিল। তারা গজলা-হরিণ শিকার করতে তাদের এলাকায় গিয়েছিল।’

আমি রীতিমতো আশ্চার্য্যান্বিত। নিজেকে সামাল দিয়ে বললাম:

‘জাদান প্রেমে পড়েছিল?’

‘হ্যাঁ। গজলা-হরিণ শিকারের সময় মেয়েটি এবং লোকদের সঙ্গ দেওয়ার জন্য তাদের এলাকার শেখ তাকে দায়িত্ব দিয়েছিল। আপনি কি জানেন, তারপর কী ঘটেছিল? আসলে জাদান মেয়েটির প্রেমে পড়ে যায়। মেয়েটি যখন চলে যায়, তখন থেকেই সে আত্মভোলা।’

মুবারক ছোট্ট একটি বিরতি নেয় এবং উদ্দেশ্যহীন ভাবে মাটিতে আঁচড় কাটতে থাকে। একসময় সে বলল:

‘জানেন, লোকজন অনেক ধরনের কথা বলাবলি করেছে, এমনকি তারা বলেছে যে, মেয়েটিও জাদানকে ভালোবেসে ছিল।’

‘মেয়েটি যদি তাকে ভালোই বেসেছিল, তাহলে তারা বিয়ে করেনি কেন?’

‘লাল চুলের সুন্দরী মেয়েটি কেন একজন বেদুঈনকে বিয়ে করতে রাজি হবে? জাদান যদিও ভালো মানুষ, তবে সে নিষ্কর্মা। আপনি কি জানেন? আসলে সে তার স্ত্রীকে তালাক দিয়েছিল।’

আমি উঠে দাঁড়াই এবং পা ফেলার আগে বললাম:

‘তাহলে এখানে কেন সে কাজ করে?’

‘জাদান বলেছে, এখানে সে কাজ করে না। সে আরও বলেছে যে, একজন পুরুষ হিসেবে নিছক কারণে এখানে বসে থাকে, যেমন কেউ একজন দুনিয়ার যেকোনো জায়গায় এমন ধরণের কাজ করে থাকে।

‘জাদান বলেছে, এখানে সে কাজ করে না। সে আরও বলেছে যে, একজন পুরুষ হিসেবে নিছক কারণে এখানে বসে থাকে, যেমন কেউ একজন দুনিয়ার যেকোনো জায়গায় এমন ধরণের কাজ করে থাকে। সে অনেক কঠিন সময় পেরিয়ে এসেছে এবং এখানে আরাম-আয়েশে খাচ্ছে-দাচ্ছে। এখানেই সে শান্তিতে মরতে চায় এবং তার লোকজনের কাছে ফিরে যেতে চায় না। আমার মনে হয়, জাদান একটা পাগল। আপনি কি অভিযোগ পত্র লিখবেন?’

মুবারকের প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে আমি দরোজার দিকে হেঁটে যাই। তারপর সিঁড়ি বেয়ে উপরের তলায় আমার কক্ষে প্রবেশ করি।

জাদানের সঙ্গে একান্ত পরিবেশে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলা খুবই কঠিন কাজ। তা সত্ত্বেও হতাশ না হয়ে আমি কয়েকবার চেষ্টা করেছি। প্রতিবারই তার রূঢ় ও গর্তে নিমজ্জিত চোখ আমাদের মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়াত। অবশেষে একবার আমি তার পাশে কাঠের তৈরি নিচু বেঞ্চে বসার সুযোগ পেয়েছিলাম, কিন্তু সত্যি বলতে কি, তাতে আমার মোটেও ইচ্ছে ছিল না। আমার ফিরতে দেরি হয়েছিল এবং আমি ভুলে আমার বন্ধুর বাসায় ঘরের চাবি ফেলে এসেছিলাম। তাই সেখানে বসে আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

‘আজ রাতে আমার তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাওয়া উচিৎ। কেননা আগামিকাল আমরা শিকারে যাব।’

‘শিকার?’

শীতল গলায় জাদান জিজ্ঞেস করে এবং পাতলা কাগজে তামাক গুড়া গোল করে কাগজে পেঁচানোর কাজে মনোনিবেশ করে।

‘হ্যাঁ। গজলা-হরিণ শিকার।’

‘আপনি কীভাবে গজলা-হরিণ শিকার করবেন?’

‘গাড়িতে চড়ে, স্বাভাবিক নিয়মে।’

জাদান মাথা নাড়ে এবং পুনরায় সিগারেট বানানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। একসময় সে স্বগোক্তির মতো করে বলল:

‘আপনি গাড়িতে চড়ে বেচারা গজলা-হরিণের পাল অতিক্রম করে দলছুট করবেন, তাহলে আপনাকে কয়েক ঘন্টা ব্যয় করতে হবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত গজলা-হরিণ ক্লান্ত হয়ে থেমে যায়। তারপর আপনি গাড়ি থেকে নেমে এমন ভাবে গজলা-হরিণ ধরবেন যেন আপনি কোনো মুরগী ধরছেন… ’

কথাটা অসম্পূর্ণ রেখেই জাদান সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে এবং জ্বলন্ত সিগারেটে দীর্ঘ টান দিয়ে এক মুখ নিঃশ্বাসের সঙ্গে টেনে নেয়ে বুকের ভেতর। তারপর সে আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকায় এবং দৃঢ় কন্ঠে বলে: ‘এটা অপমান।’

অকস্মাৎ আমার মনে হয়, জাদান আমাকে তিরষ্কার করছে। আমি খুব দ্রুত বললাম:

‘অপমান? তাহলে লোকজন কেমন করে গজলা-হরিণ শিকার করে? বন্দুক দিয়ে?’

‘না। তা-ও অপমান?’

‘বুঝলাম। কিন্তু তাহলে?’

জাদান বুকের ভেতর আরেকটা নিঃশ্বাস টেনে নেয় এবং সিগারেটের ভারী ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন তার কঠিন দৃষ্টি আমাকে পরখ করে। শান্ত গলায় সে বলল:

‘অবশ্যই আপনি কখনো গজলা-হরিণ শিকার করেননি, জনাব আবদাল্লাহ্, গাড়িতে চড়েও নয়, এমনকি বন্দুক দিয়েও নয়।’

‘কেন?’

আচমকা জাদান এমন ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকায় যেন আমার প্রশ্নটা তাকে আহত করেছে। আমার মুখের সামনে সে দু’আঙুলের ফাঁকে সিগারেট চেপে নাড়াতে থাকে। তখন তার চোখ ঝলসে ওঠে।

‘আপনি কি কখনো মরুভূমিতে অপেক্ষায় থেকে ক্লান্তি বোধ করেছেন? গজলা-হরিণ স্বেচ্ছায় এসে কি আপনার সম্মুখে হাজির হয়েছিল? আপনার বাহুতে মাথা ঘষেছিল এবং ঘাড়ে তার দীর্ঘ নাক স্পর্শ করেছিল? আপনার চতুর্দিকে সে ঘোরাঘুরি করেছিল, বিস্ফারিত দৃষ্টি মেলে আপনার দিকে তাকিয়েছিল এবং তারপর মাথা নিচু করে চলে গিয়েছিল? আপনি কি তাই চেষ্টা করেছিলেন?’

‘না। তুমি?’

বিদ্রুপাত্বক ভঙ্গিতে জাদান বিড়বিড় করে, যেন আমার প্রশ্ন শুনতে পায়নি:

‘এবং আপনি শিকারের কথা বলছেন!’

আমি তার উদ্যত মনোভাবকে আর সহ্য করতে পারছিলাম না। তাই প্রচণ্ড ক্ষোভে চিৎকার করে বললাম:

‘তুমি না একজন শিকারী?’

‘হ্যাঁ। অনেক দিন আগে ছিলাম, আবদাল্লাহ্। সে অনেক দিন আগের কথা।’

আমি আরও এক ধাপ এগিয়ে যাই।

‘তুমি কেমন করে গজলা-হরিণ শিকার করতে?’

জাদান মন-খারাপের ভাব নিয়ে বারবার মাথা নেড়ে বলল:

‘হ্যাঁ, আপনি ধরতে পারেন, যদি সেটা মুরগী হয়। শুনুন, আবদাল্লাহ্ …’

জাদান আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকায়। তারপর সে পা উঁচিয়ে এক পা আরেক পায়ের উপর তুলে বেঞ্চে বসে এবং আমার হাঁটুতে সে তার খসখসে হাত রাখে। সেই অন্ধকার পরিবেশে মনে হয় যেন দূর থেকে কন্ঠস্বর ভেসে আসে:

‘শুনুন, আবদাল্লাহ্। কুড়ি বছর আগে আমি গজলা-হরিণ শিকার করেছি। তখন আমার একটা দূর্দান্ত বাজপাখি ছিল। ওর নাম ছিল ‘নার’। সেই সময় নার ছিল সবচেয়ে আলোচিত বাজপাখি, যার গল্প অনেক বছর এলাকার লোকজন শুনেছে। নার যখন আকাশে উড়তো, তখন তার ডানা সূর্য্যের আলো শুষে নিত এবং সে ডানা গুটিয়ে নিয়ে একখণ্ড পাথরের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ত। তখন লোকজন বলাবলি করত: ‘জাদানের বাজপাখি গজলা-হরিণ পুড়িয়ে মেরেছে।’

চারপাশে নীরবতা। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, জাদান কথা বলা বন্ধ করেছে। অন্ধকার সত্ত্বেও আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, সেই সময় তার মুখমণ্ডলে এক অপরিচিত সুখের অনুভূতি ছড়িয়ে ছিল। পুরুষ মানুষ যা খুব ভালোবাসত এবং তা অনেক আগেই

চারপাশে নীরবতা। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, জাদান কথা বলা বন্ধ করেছে। অন্ধকার সত্ত্বেও আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, সেই সময় তার মুখমণ্ডলে এক অপরিচিত সুখের অনুভূতি ছড়িয়ে ছিল। পুরুষ মানুষ যা খুব ভালোবাসত এবং তা অনেক আগেই হারিয়ে গেছে, কিন্তু যখন সে সেই হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার কথা বলে, তখন তার চেহারার মধ্যে যে ধরনের উপলব্ধি প্রকাশ পায়, ঠিক সেই ধরণের উপলব্ধি তার চোখেমুখে ফুটেছিল। এক সময় তার কন্ঠস্বর ফিরে আসে, কিন্তু দূর্বল এবং অস্পষ্ট:

‘কুড়ি বছর আগে… আমি নারের ঢেকে রাখা চোখ থেকে চামড়ার আবরণ খুলে ফেলি এবং সে উড়ে গিয়ে শূন্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। ত্রিসীমানার মধ্যে মাত্র একটা গজলা-হরিণ ছিল এবং দূর থেকে আমি ওর গায়ের রং অনুধাবন করতে পেরেছিলাম। গায়ের রং ছিল লালচে, তবে তার সঙ্গে খানিকটা বাদামি রংও ছিল। না! ওর গায়ের রং ছিল গজলা-হরিণের মতোই, যা কখনই চোখে পড়ে না। অবশ্যই তা ছিল গজলা-হরিণেরই রং, এবং সেই ধরণের রং, যা শুধুমাত্র গজলা-হরিণেরই রং হতে পারে। নার উড়ে অনেক উপরে চলে গিয়েছিল। একসময় সে পাথরের মতো ডানা গুটিয়ে ঝাপিয়ে পড়তে শুরু করে এবং গজলা-হরিণের কিছু উপরে পৌঁছে ডানা প্রসারিত করে… এবং কয়েক পলকের জন্য শূন্যে স্থির হয়ে যায়। তারপর এক পাশে কাত হয় এবং ভূমি প্রায় স্পর্শ করার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত সে এক টুকরো কাগজের মতো নিজেকে বিস্তৃত করে। পুনরায় সে বৃত্তাকারে চক্কর খায় এবং উপরে উড়ে যায়। সেই সময় গজলা-হরিণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন তার পা কেউ মাটির সঙ্গে বেঁধে রেখেছে। আমি ভেবেছিলাম, কোনো বন্য প্রাণি শিকার করার আগে নার হয়তো তার দক্ষতা প্রদর্শন করছিল, যেমন অনেক শক্তিশালী জন্তু-জানোয়ার দক্ষতা প্রদর্শন করে। কিন্তু নার ছয় বারের বেশি তা করেছে এবং সেই সময় তার অভিব্যক্তি ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর। একসময় সে আবারও বৃত্তাকারে উড়তে থাকে এবং অবশেষে আমার কাছে ফিরে আসে। আমি দেখেছি তার প্রসারিত বিশাল ডানা, বালির মধ্যে লাগানো কাঠের বারান্দায় আলোকিত তার অহংকার এবং বন্ধ চোখ… যখন গজলা-হরিণ সরু পায়ে তার কাছে আসে, যেন কোনো হায়েনা তার আছে এসেছে।’

জাদানের কাঁধ ধরে আমি এমন ভাবে ধাক্কা দেই যেন সে জেগে ওঠে। আমার কাছে মনে হয়েছে সে ঘুমের ভেতর তলিয়ে গিয়েছিল।

‘তারপর কি হয়েছিল?’ আমি জিজ্ঞেস করি।

‘আমি আমার লোকজনের কাছে ফিরে যাই। প্রথমে ভেবেছিলাম, নার হয়তো সেদিন কোনো শিকার করতে চায়নি। জানেন, বাজপাখিদের নিজস্ব কিছু নিয়ম-কানুন এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু যা ঘটেছে, তা তার চেয়েও আরও বেশি ভয়ংকর। তারপর থেকে নার তার জন্য নির্মিত কাঠের তৈরি উঁচু খুঁটি ছেড়ে কখনো কোথাও যায়নি। সে গর্বিত বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। গজলা-হরিণের ছায়ায় যেন তার বাঁধা ঠোঁট ছিল, যা তাকে কাছাকাছি রেখেছিল। পুরো এক সপ্তাহ সে কিছুই খায়নি, যদিও আমি তার চোখ থেকে চামড়ার তৈরি ঢাকনা সরিয়ে দিয়েছিলাম। আমি তার সামনে মাংসের টুকরো রেখেছিলাম। সেদিকে সে একবারও তাকায়নি, এমনকি গজলা-হরিণের দিকেও নজর দেয়নি। গজলা-হরিণ তার সামনেই ছিল এবং নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থেকে তাকে পর্যবেক্ষণ করেছে। প্রতিবার আমি যখন নারকে খাবার দিতে চেষ্টা করেছি, অপ্রত্যাশিত ভাবে ততবারই গজলা-হরিণ কাছে এসে শিশুর মতো আমার চতুর্দিকে ঘুরপাক খেয়েছে। সে আমার হাতের উল্টো পিঠে গোলাপি নাক ঘষেছে, চোয়াল প্রলম্বিত করে আমার ঘাড় স্পর্শ করেছে এবং বাহুতে মাথা ঘষেছে। তারপর সে বৃত্তাকারভাবে ঘুরেছে এবং একসময় নিঃশব্দে কাঠের খুঁটির পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।’

জাদান উঠে দাঁড়ায় এবং কাঠের বেঞ্চের কাছে যায়। মরচে পড়া সিগারেটের বাক্স নিয়ে ফিরে এসে সে পুনরায় সিগারেট তৈরি করা শুরু করে। অন্ধকারে আমি তার অঙ্গভঙ্গি আলাদা করতে পারিনি, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর শুনেছি। আমার মনে হয়েছিল, দূর থেকে তার গলার স্বর ভেসে আসছিল।

‘একদিন আমি জেগে দেখি নার তার বসার কাঠের স্তম্ভের পাশে পড়ে আছে। তার বুক সংকুচিত ও পালকহীন এবং চোখ বন্ধ। আমি কোথাও গজলা-হরিণকে খুঁজে পাইনি। বাজপাখিটি মারা যাওয়ার পরে খুব সম্ভবত রাতের বেলা সে কোথাও চলে গেছে।

‘একদিন আমি জেগে দেখি নার তার বসার কাঠের স্তম্ভের পাশে পড়ে আছে। তার বুক সংকুচিত ও পালকহীন এবং চোখ বন্ধ। আমি কোথাও গজলা-হরিণকে খুঁজে পাইনি। বাজপাখিটি মারা যাওয়ার পরে খুব সম্ভবত রাতের বেলা সে কোথাও চলে গেছে।

আমি আসন ছেড়ে উঠি এবং জাদানের সামনে দাঁড়াই। সে সিগারেট বানানো শেষ করে এবং আমি দেয়াশলাইয়ের কাঠিতে অগ্নি সংযোগ করে তার দিকে এগিয়ে ধরে জিজ্ঞেস করি:

‘আমি ভেবে পাচ্ছি না, গজলা-হরিণ কোথায় গেল?’

জ্বলন্ত দেয়াশলাইয়ের কাঠির অস্পষ্ট আলোয় আমি জাদানের মুখ দেখতে পাই। তার মুখ সংকুচিত, রুক্ষ এবং আবেগহীন। হঠাৎ তার ঠোঁট নড়ে ওঠে:

‘তার গোত্রের মধ্যে মরতে গিয়েছে। গজলা-হরিণ নিজেদের গোত্রের মধ্যে মরতে পছন্দ করে। বাজপাখি কোথায় মারা যাবে, তা তারা পরোয়া করে না।’

পাদটীকা: আরবীতে ‘নার’ শব্দের অর্থ ‘আগুন’।


Ghassan Kanafani

গাসান কানাফানি

গাসান কানাফানি আধুনিক ফিলিস্তিনি কথাসাহিত্যের অন্যতম লেখক গাসান কানাফানি (পুরো নাম গাসান ফায়িজ কানাফানি)। তিনি ছিলেন ছোটোগল্প লেখক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, পেইন্টার এবং রাজনৈতিক কলাম লেখক। তবে বিংশ শতাব্দীর আরবি ছোটোগল্পের প্রধান লেখকদের অন্যতম হিসেবে তাঁকে গণ্য করা হয়। তাঁর জন্ম হাইফা উপকূলের প্রাচীনতম শহর আক্রির এক মধ্যবিত্ত সু্ন্নী মুসলমান পরিবারে, ১৯৩৬ সালের ৮ এপ্রিল। তাঁর শৈশব কেটেছে জাফায় এবং সেখানেই তিনি ফরাসী মিশনারি স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৪৮ সালে আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের সময় তিনি এবং তাঁর পরিবার বাধ্য হয়ে উদ্বাস্তু হন এবং যাযাবর জীবনে আশ্রয় নেন লেবানন, সিরিয়া ও কুয়েতে। তিনি ১৯৫২ সালে দামাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবী সাহিত্যে পড়াশুনা করেন। তিনি ১৯৬১ সালে বৈরুতে ফিরে গিয়ে ছোটোগল্প, উপন্যাস, চিত্রনাট্য, রাজনৈতিক প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। পরবর্তীতে (১৯৭০ সালে ) তিনি পপুলার ফ্রন্ট অব প্যালেস্টাইনের মুখপাত্র হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন এবং সংগঠন থেকে প্রকাশিত জার্ণালের সম্পাদক ছিলেন। তাঁর প্রথম ছোটোগল্প ‘এ নিউ সান’ [বা নতুন সূর্য] প্রকাশিত হয় ১৯৫৭ সালে। ‘Men in the Sun’ (১৯৬২), ‘All that’s Left For You’ (১৯৬৬), ‘Umm Sa’ad’ (১৯৬৯) এবং ‘Return to Haifa’ (১৯৭০) আরবীতে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস। এ ছাড়া ইংরেজিতে অনূদিত নভেলা ও ছোটোগল্প সংকলনের মধ্য রয়েছে ‘Men in the Sun and Other Palestinian Stories’ (১৯৯৮) এবং ‘Palestine’s Children: Returning to Haifa & Other Stories’ (২০০০)। তিনি ১৯৭২ সালের ৮ জুলাই গাড়িতে পেতে রাখা ইসরায়েলি বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন। তাঁকে বৈরুতে সমাহিত করা হয়।

‘বাজপাখি’ গল্পটি গাসান কানাফানির ইংরেজিতে ‘দ্য ফ্যালকন’ গল্পের অনুবাদ। গল্পটি আরবী থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন হিলারী কিলপ্যাট্রিক। গল্পটি লেখকের ‘মেন ইন দ্য সান অ্যান্ড আদার শর্ট স্টোরিজ’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

গল্পকার, ছড়াকার এবং অনুবাদক। লেখালেখির শুরু সত্তরের মাঝামাঝি। ঢাকার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার সাহিত্য পাতায়, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক এবং অনলাইন ম্যাগাজিনে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে তার মৌলিক এবং অনুবাদ গল্প। এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে দুটি গল্পের সংকলন, চন্দ্রপুকুর (২০০৮) ও কতটা পথ পেরোলে তবে (২০১০)। এছাড়া, তার অনুবাদে আফগানিস্তানের শ্রেষ্ঠ গল্প (২০১৩), নির্বাচিত নোবেল বিজয়ীদের সেরা গল্প (২০১৩), ইরানের শ্রেষ্ঠ গল্প (২০১৪), চীনের শ্রেষ্ঠ গল্প ও নির্বাচিত ম্যান বুকার বিজয়ীদের সেরা গল্প ইত্যাদি প্রকাশিত হয়েছে।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।