রবিবার, জুন ২৩

‘মর্জিনা খাতুনের অষ্টপ্রহর ও অন্যান্য গল্প’ : রুমা মোদক

0

২০২৩ এর বইমেলায় এসেছে আমার ৮ম গল্পগ্রন্থ ‘মর্জিনা খাতুনের অষ্টপ্রহর ও অন্যান্য গল্প’। বইটি প্রকাশ করেছে নালন্দা প্রকাশনী। ‘মর্জিনা খাতুনের অষ্টপ্রহর’ বইটির নাম গল্প। নাম গল্পের নামে বইয়ের নামকরণের একটা অসুবিধা হলো পাঠক মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে পড়তে বসে এই গল্পটি বইয়ের মান গল্প। কিন্তু লেখক হিসাবে আমি কিন্তু বইয়ে সংকলিত কোনো গল্পকেই কম গুরুত্বপূর্ণ ভাবি না। লেখক হিসেবে যেমন প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা থাকে, লেখার ক্ষেত্রেও তাই। একটি গল্প দিয়ে অন্য গল্পকে ছাপিয়ে যেতে চাই।

Ruma Modok

মর্জিনা খাতুনের অষ্টপ্রহর ও অন্যান্য গল্প | রুমা মোদক | ধরন : ছোটোগল্প | প্রকাশক : নালন্দা | প্রচ্ছদ : আইয়ুব আল আমিন | মুদ্রিত মূল্য : ২৭৫ টাকা

চরিত্রে,কন্টেন্টে,ক্রাফটে— সব দিক দিয়েই। যেমন এই ১২ টি গল্পের কথাই যদি ধরি, আমাদের নিম্ন মধ্যবিত্ত পারিবারিক জীবনের করুণ সংকটের গল্প। এই যে সংকট, গল্পটি পড়ে পাঠক ভাবিত হবেন এই পরিণতির জন্য আসলে দায়ী কে? যেমন গল্পটি লিখতে লিখতে আমি ভেবেছিলাম। আমাদের সমসাময়িক সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত ঠিক কোন সময়টিতে গিয়ে এমন নির্দয় হয়ে উঠেছে সব মানবিক বোধ গিলে খেয়ে। আমি সুলুকসন্ধান করি কিন্তু পাঠকের কাছেও জিজ্ঞাসাটি রেখে যাই। পাঠক কিন্তু গল্পটি পড়েই তার দায় শেষ করতে পারবেন না। তাঁর ভেতরে যে দমবন্ধতা তৈরি হবে তার থেকে তিনি মুক্তি পাবেন না। উদাসীন থাকতে পারবেন না। জীবনের এই নগ্নতা আরোপিত নয় মোটেই বরং আমার আপনার চারপাশের সাথে মিলিয়ে আপনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ‘দালির ঘড়ি’ গল্পটি সালভাদর দালির বিখ্যাত চিত্রকর্ম থেকে নামটি নেয়া। গল্পটিতে আমাদের ফাঁপা রাজনৈতিক পরিবেশ পরোক্ষে মূল চরিত্র। একটা নিরীক্ষা রয়েছে গল্পটিতে। কিন্তু কী চরিত্রে কী বিষয়ে— পাঠকের মনে হতে পারে এ গল্প তো আমার জানা। ‘একটি গেইম কিংবা কামিনী গাছের চারা’ গল্পটি তীব্র মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার গল্প। এর চরিত্রগুলো আমাদের একেবারেই অচেনা নয়। ‘যখন নেমেছিলো সন্ধ্যা’ গল্পটিতে লেখক পরাবাস্তবতার ছায়া পেতে পারেন। কিন্তু এর চরিত্রগুলো, বিষয় সবই আমাদের চারপাশের জল হাওয়া থেকে নেয়া। ‘কিরণবালার অন্তিম যাত্রা’ মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা গল্প। কিন্তু আমরা নিজে চেষ্টা করি মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ন্যারেটিভের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য অব্যক্ত ন্যারেটিভ আবিষ্কার করতে। তারই একটা এই গল্প। ‘মন নাই কুসুম’, ‘সান্ধ্য কফির ধোঁয়া’ গল্পগুলোও মানুষের জটিল মনের অলিগলির সন্ধান। আধুনিক জীবনে তৈরি হওয়া যে বিষয়গুলোতে তার হাত নেই, আবার তার পক্ষে অস্বীকার করাও কতোটা সম্ভব পাঠকের কাছে সেটিই বিচার্য। এরকম প্রতিটি গল্পে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাদের নিজস্ব জীবন ও জীবনবোধ নিয়ে। উচ্চবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত, যে জীবন আমাকে তাড়িত করেছে সেই জীবন আমার গল্পে উঠে এসেছে। আমি চেয়েছি বিশ্বস্ত থেকে বয়ান করতে,বাকিটা পাঠক বলবেন।

কতোটা পারি কতোটা পারি না— ব্যাপারটি আপেক্ষিক। আর লেখক হিসেবে আমার সন্তুষ্টি তো একেবারেই নেই। লিখি,লেখার পর আমার লেখার আমি প্রথম পাঠক,প্রথম সম্পাদক। বার কয়েক সাধ্যমতো কাটাকুটির পরও কিন্তু সন্তষ্ট হতে পারি না। ছাপা হয়ে যাওয়ার পরও শব্দ, বাক্য মাথায় ঠোকরাতে থাকে। এভাবে না লিখে ওভাবে লিখলে হতো। খুব সচেতন থাকি লেখায় কোনো ভাবনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয়।

‘মর্জিনা খাতুনের অষ্টপ্রহর’ বইটির প্রতিটি গল্প অন্যটি থেকে আলাদা। গল্পগুলোতে পাঠক মূল আখ্যান পাবেন। মানুষ পাবেন। মানুষের জীবন আর মনের নানা গভীর, গোপন জটিল বাঁক পাবেন। লেখক তো তাই পাঠককে দেখিয়ে দিতে চান, সাধারণ দৃষ্টিতে যা অদৃশ্য থাকে। আমার চেষ্টাও তাই।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

গল্পকার, নাট্যকার, মঞ্চাভিনেত্রী, শিক্ষক। বাংলাদেশ তার গল্পের আত্মা জুড়ে থাকে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আশা, স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গ, বেদনা ও বৈষম্যকে বিষয় করে তিনি গল্প লেখেন, যা একই সঙ্গে ডকুমেন্টেশন এবং শুধু ডকুমেন্টেশনই নয়, আখ্যান; কথাসাহিত্য। তার গল্পে জীবনের বাঁকবদল স্পষ্ট এবং অন্যদের থেকে আলাদা এক স্বর, যে-স্বর আমাদের আত্মা খমচে ধরে, বেদনাহত করে। সমকালীন বাংলাদেশ তার সমস্ত রকমের ঘা, রক্তপুঁজ নিয়ে উপস্থিত থাকে। ব্যবচ্ছেদের গল্পগুলি (২০১৫), প্রসঙ্গটি বিব্রতকর (২০১৬), গোল (২০১৮), সেলিব্রেটি অন্ধকারের রোশনাই (২০২০), নদীর নাম ভেড়ামোহনা (২০২০) তার উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত বই। মঞ্চ তার অদ্বিতীয় সত্ত্বা। গড়েছেন নাট্যদল- জীবন সংকেত নাট্যগোষ্ঠী। মঞ্চায়িত হয়- কমলাবতীর পালা, বিভাজন, জ্যোতি সংহিতা ইত্যাদি নাটক।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।