সোমবার, জুলাই ৪

মিসকিন : সুজন দেবনাথ

1

মায়ের আঁচল ছুঁয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে ময়না।

মা শেফালী বলেছেন, ‘এটা ইয়ারফোট। ইয়ারফোটে বাবা আসবেন আজ।’ আর তাই সাড়ে চার বছরের ময়না এখন মা ও ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকা বিমানবন্দরে। অপেক্ষা করছে জীবনে প্রথমবার পিতৃদর্শনের জন্য। জগতে সন্তানের মুখ প্রথমবার দেখার জন্য বাবাই অধীর অপেক্ষা করে। কখন আসবে সন্তান— মায়ের পেট থেকে। কিন্তু ময়নার ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো। কন্যাই বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছে। কখন বাবা আসবেন— বিমানের পেট থেকে।

ময়নার কাছে প্লেন মানে ছিল শুধু শব্দ আর গতি। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাইবোনে কাগজের প্লেনে ভোঁ ভোঁ খেলত। আজ আকাশের সেই ভোঁ ভোঁ প্লেন থেকে নামবেন বাবা।

বাবা এলেই ময়না বলবে, ‘কাইফা হালুকা!’

এটা তাঁর ভাই উজ্জ্বল শিখিয়ে দিয়েছে। সৌদি আরব ফেরত বাবাকে চমকে দিতে ভাই-বোনের এই অভিসন্ধি।

অনেকক্ষণ হলো দাঁড়িয়ে আছে তাঁরা। প্লেনের দেখাও নেই, বাবাও আসেন না। হঠাৎ এক অচেনা লোক পেছন থেকে ছোঁ মেরে কোলে নিলেন ময়নাকে। ভয় পেয়ে কেঁদে ফেলল সে। কিন্তু তার ভাই যে ভয় পায়নি— লোকটাকে বাবা বাবা বলে লাফিয়ে উঠে লাগেজ হাতে নিচ্ছে সে! মা শেফালীর আতঙ্কও একটু বিস্ময় ছুঁয়ে হাসি হয়ে গেছে। আর হাসিটা টের পেয়েই শেফালী সেটা লুকাতে ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

অনেকক্ষণ হলো দাঁড়িয়ে আছে তাঁরা। প্লেনের দেখাও নেই, বাবাও আসেন না। হঠাৎ এক অচেনা লোক পেছন থেকে ছোঁ মেরে কোলে নিলেন ময়নাকে। ভয় পেয়ে কেঁদে ফেলল সে। কিন্তু তার ভাই যে ভয় পায়নি— লোকটাকে বাবা বাবা বলে লাফিয়ে উঠে লাগেজ হাতে নিচ্ছে সে! মা শেফালীর আতঙ্কও একটু বিস্ময় ছুঁয়ে হাসি হয়ে গেছে। আর হাসিটা টের পেয়েই শেফালী সেটা লুকাতে ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সেই সাথে তাঁর আঁচলও চলে গেছে চোখে। অনেকদিন পরে প্রবাসী স্বামী দেশে এসেছেন— একটু কান্নার অভিনয় শেফালীকে করতেই হবে।

এবার পাঁচ বছর পর সৌদি আরব থেকে দেশে আসলেন সেন্টু মিয়া। বিমান বন্দরে বের হয়েই স্ত্রী-সন্তানদের পেছন থেকে চমকে দিয়েছেন। শেফালী তাঁর স্বামীর এই রসিক স্বভাবটা ভালো ভাবেই চেনেন। বিমানবন্দরেই স্ত্রী-সন্তানদের পেছন থেকে চমকে দেওয়া সেন্টু মিয়ার জন্য খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

তবু চোখ ঢেকে শেফালী বলতে শুরু করলেন, ‘দিন দিন মানুষডার বয়স বাড়ে— না কমে? দেখেন দেখি— মাইয়াডা কেমুন ডরাইছে।’

কথাটা বলার পরই চোখ বাদ দিয়ে মুখ ঢাকতে হয় শেফালীকে। সবাইকে হাসি দেখানোর সময় এখনও আসেনি। সেন্টু মিয়া এখন ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া ময়নাকে হাসানোর চেষ্টা করছেন। আর মাঝে মাঝে শেফালীর হাসি, কান্না, বিস্ময়কে দেখছেন আড়চোখে।

‘আমার লক্ষ্মী মা, আমার জানু মা— তোমার লাইগা কত্ত কিছু আনছি…’

ময়নার কান্না থেমেছে। কিন্তু মুখ এখনও গোমরা। তাঁর অভিসন্ধি ভেস্তে গেছে। বাবাই তাঁকে উল্টো চমকে দিয়েছে। আর সেই চমকে কাইফা হালুকা বলার কথা ভুলে গেছে ময়না। উজ্জ্বল কয়েকবার চুপিচুপি বলে দিয়েও কোনো লাভ হয়নি।

জন্মের পর থেকে ময়না শুধু বাবার ছবিই দেখেছে। মাঝে মাঝে ফোনে কথাও বলেছে। তবু পিতৃত্বের অধিকার ষোল আনা পেতে এই অপরিচিত লোকটাকে আরও ধৈর্য্য ধরতে হবে। পিতা-কন্যার মাঝে সাড়ে চার বছরের দূরত্ব মুছে যেতে এইটুকু সময় যথেষ্ট নয়। তবে একটা অচেনা অথচ নির্ভরতার স্পর্শ ছুঁয়ে বাবার কোলেই চুপ করে আছে ময়না।

ট্যাক্সি ভাড়া করে সেন্টু মিয়া পরিবার নিয়ে রওয়ানা করলেন গ্রামের দিকে। আকাশের ক্লান্তি সন্তানদের স্পর্শের কাছে হেরে গেছে।

তাঁর বাড়ি পদ্মার ওপারে। ফেরিতে নদী পার হয়ে বাড়ি পৌঁছতে বিকেল হয়ে গেল।

বিকেলটা ঘুমানোয় আকাশ-ক্লান্তি দূর হয়েছে। বেশ ঝরঝরে লাগছিল সেন্টু মিয়ার। শেফালীর কাছে শুনলেন— পাশের বাড়ির মানিক সাহেব দেখা করতে বলেছেন। তিনি দুদিন আগে আমেরিকা থেকে এসেছেন। অতি জরুরী কথা আছে নাকি।

মানিক ও সেন্টু একই ক্লাসে পড়ত। ভালো ছাত্র ছিল মানিক। তাঁর বাবারও টাকা ছিল। তখনই বোঝা গিয়েছিল— জীবনে সে ভালোই দৌড়াবে। এখনও মানিককে দেখলেই বোঝা যায়— তাঁর দৌড় থামেনি।

অনেক বছর পর বন্ধুর সাথে দেখা। সেন্টু মিয়া ভেবেছিলেন— কোলাকুলি করবেন। কিন্তু মানিক সাহেব বসে থেকেই হ্যান্ডশেক করে বলে উঠলেন, ‘তারপর সেন্টু, সৌদিতে তো অনেক দিন আছো। আয় রোজগার তাহলে বেশ ভালোই হচ্ছে। বেশ শান্তিতেই আছো।’

মানিক তাঁকে তুমি করে বলছে। আগে তুই বলত। সম্বোধনে সময়ের দাগ লেগে গেছে। এরকম অভিজ্ঞতা সেন্টু মিয়ার অনেক হয়েছে। এটা তেমন কিছু না।

‘হ, আছি তোমাগো দোয়ায়। নবীজির দেশে থাকি। আল্লায় রাখছে— শান্তিতেই রাখছে।’

শান্তিতেই রাখছে— কথাটা বলে চুপ হয়ে গেলেন সেন্টু মিয়া। তাঁর মনে ভেসে উঠছে সৌদির কোম্পানিতে কন্ট্রাকটরের মুখ। কন্ট্রাকটর উঠতে বসতে গালি দেয়— মিসকিন। বাংলাদেশী মিসকিন।

মিসকিনের শান্তি কতটুকু?

স্কুলে সঞ্জীব স্যারের কাছে পাটীগণিত শিখত সেন্টু। কিন্তু মিসকিনের শান্তি হিসেব করার অংক তাঁকে শেখাতে পারেননি সঞ্জীব স্যার। আর এই মুহূর্তে সেই হিসাব মানিকের কাছে দিতেও চায় না সেন্টু মিয়া। শান্তি জিনিসটা তো বায়বীয়। তো ধনী, শিক্ষিত বন্ধুর কাছে সম্মান রাখার জন্য শান্তি না হয় মিথ্যা করেই একটু আসুক এখানে। মনে হয় তাতে মাইন্ড করবে না শান্তি।

মানিক সাহেব বলে চলেন, ‘ভাবছি দেশের বাড়িটা এইবার বিক্রি করে দেব। জ্যাকসন হাইটসে একটা ফ্লাট বুকিং দিয়েছি। হাউজ লোন যত কম নিতে পারি। …এই বাড়ি কেউ দেখাশোনা করারও নাই। সেন্টু, তুমি আমার বন্ধু। তাঁর উপর প্রতিবেশী।

মানিক সাহেব বলে চলেন, ‘ভাবছি দেশের বাড়িটা এইবার বিক্রি করে দেব। জ্যাকসন হাইটসে একটা ফ্লাট বুকিং দিয়েছি। হাউজ লোন যত কম নিতে পারি। …এই বাড়ি কেউ দেখাশোনা করারও নাই। সেন্টু, তুমি আমার বন্ধু। তাঁর উপর প্রতিবেশী। তুমি কিনলে আর দূরের মানুষকে দেখাব না।’

সেন্টু মিয়া বেশ অবাক হলো। বসত ভিটা বিক্রি করে দেবে মানিক! স্কুলে সে কান্না মিশিয়ে আবৃত্তি করত রবিঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’— ‘সপ্তপুরুষ যেথায় মানুষ, সে মাটি সোনার বাড়া। দৈন্যের দায়ে বেচিব সে মায়ে, এমনই লক্ষ্মীছাড়া।’ সে কথা এখন মানিক ভুলে গেছে। সেন্টু ভোলেনি। আর দৈন্যের দায়ে তো নয়। আমেরিকায় বাড়ি কিনার জন্য সে দেশের বাড়ি বিক্রি করবে।

যাই হোক, মানিককে নিয়ে ভাবলে এখন সেন্টুর চলবে না। ভাবতে হবে মানিকের প্রস্তাব নিয়ে। প্রস্তাব নিঃসন্দেহে ভালো। বিক্রি করার জন্য প্রথমে প্রতিবেশীকেই বলেছেন। মানিকের সৌজন্য আছে। বলতেই হবে— সে একজন ভালো মানুষ।

কিন্তু অত টাকা তো সেন্টুর নেই। টাকা কিছু জমেছে তাঁর। তবে সেটা মানিকের বিশাল বাড়ি কেনার মতো নয়। এই সমস্যার সমাধানও মানিকই দিল। তাঁকে একা কিনতে হবে— এমন তো নয়। তাঁর চাচাত ভাই দুবাইতে থাকে, সম্বন্ধী থাকে মালয়েশিয়ায়। তিনজনে মিলেও কিনতে পারে।

সময় বেশি নেই। মানিককে আমেরিকায় ফিরে যেতে হবে। তাড়াহুড়ো করে সেন্টু কিনেই ফেলল বাড়ি।

নতুন বাড়িতে নতুন টেলিভিশন। খবর দেখাচ্ছে— গত তিন মাসে বাংলাদেশে রেকর্ড পরিমাণ রেমিটেন্স এসেছে। রেমিটেন্স বিষয়টা এখন বোঝেন সেন্টু। বিদেশ থেকে পাঠানো টাকাকে বলে রেমিটেন্স। অনেকদিন বিদেশে থাকায় জ্ঞানও বেড়েছে তাঁর! খবরটা শুনে একটু গর্বও হয়। এই রেমিটেন্সে তাঁর নিজের টাকাও আছে। তাঁর রক্ত জল করা টাকা। যৌবন বন্ধক রাখা রিয়েল। সেন্টু থেকে মিসকিন হয়ে পাওয়া ফরেন কারেন্সি। তবুও তিনি একজন সম্মানিত প্রবাসী।

তাহলে মানিক সাহেব কী? তিনিও একজন প্রবাসী।

কিন্তু তিনি তো বাড়ি বিক্রি করে টাকা আমেরিকায় নিয়ে যাচ্ছেন। তাহলে রেমিটেন্স ব্যাপারটার কী হচ্ছে? ছোট্ট মাথায় অত কিছু ধরে না সেন্টুর। তাছাড়া সে তো আদার বেপারী। মানিকের জাহাজে রেমিটেন্স কোন দিকে যাচ্ছে— সে খবরে তাঁর কিছু যায়ও না, আসেও না।

বরং মানিকের বাড়িটা কিনে বেশ আনন্দই হয়েছে সেন্টু মিয়ার। এলাকায় সম্মানও বেড়েছে। প্রথম যখন বিদেশে গিয়েছিলেন, স্বপ্ন ছিল— ফিরে এসে অতুল মুন্সীর মতো মেম্বারি করবেন। বিশ বছর বয়স সেই স্বপ্নের। এতদিনে গ্রামের মাটি বদলেছে, বাতাস বদলেছে। নেতৃত্বের যোগ্যতাও বদলেছে। এখন ঘরে ঘরে তাঁর মতো কত সেন্টু বিদেশে থাকে। কয়জন হবে মেম্বার। অত জনবল, পেশীবল তাঁর নেই। তবুও এই বিশাল বাড়িতে শুয়ে সেই স্বপ্নটা আবার ভেসে উঠতে চায়।

সেই সাথে একটা সমস্যাও দেখা দিয়েছে। এ বাড়িতে চোখ বুজলেই মানিকের জীবনের ছবি দেখতে পান সেন্টু মিয়া। মানিক সাহেব পরিবার নিয়ে স্থায়ীভাবে বাস করেন আমেরিকায়। সেন্টু মিয়া কী পারেন না— মানিকের মতো বিদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যেতে!

না পারেন না। খোঁজ তিনি নিয়েছিলেন। তাঁর মতো মিসকিনদের জায়গা নেই মরুর দেশগুলিতে। সেখানে যেতে হবে জুয়ান বয়সে। যতদিন শক্তি আছে— শক্তির রূপান্তর সূত্র মেনে দেহের বদলে রিয়াল-দিনার কেনা যায়। তারপর যেদিন কোম্পানির মনে হয়, শক্তির রূপান্তরে ঘাটতি হচ্ছে— আর ঠাঁই নেই সেই দেশে।

অথচ মানিকের জন্য বিষয়টা এমন না! বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে সেখানে সুখেই আছেন তিনি। ছেলেমেয়েরা আমেরিকায় মানুষ হচ্ছে। আহা, কত সুখ। ছেলেমেয়ের কথা ভাবতেই সেন্টুর নিজের ছেলের মুখটা মনে পড়ল।

ছেলে উজ্জ্বলের বয়স এবার ষোল হলো। ক্লাশ টেনে পড়ে। ওর জন্মের খবর পেয়ে সৌদি আরবে বন্ধুদের মিষ্টি খাইয়েছিলেন সেন্টু মিয়া। সেই খুশির মুহূর্তে কোম্পানির কন্ডাকটর বলে ফেলেছিলেন— ‘ওহ, আরেক মিসকিন এসেছে দুনিয়ায়।’

কথাটা শুনে মাথায় আগুন জ্বলে উঠেছিল সেন্টুর। তেড়ে গিয়েছিলেন কন্টাকটারের দিকে। বন্ধু বিমল তাঁকে না থামালে মারাত্মক কিছু করে ফেলতেন। অপমানকে হাসি ঠাট্টার প্যাকেটে রেখে শক্তি রিফিল করতে ভালোই শিখেছিলেন তিনি। না হলে বিদেশে কাজ করা যায় না।

তখনই চোখ বুজে শপথ করেছিলেন, ‘আমার পোলারে কোনোদিন মিসকিন হইতে দিমু না। বিদেশে পাঠামু না। আমার পোলা লেখাপড়া করব। মাজিস্টেট অইব।’

এই স্বপ্নটা এখনও দেখেন সেন্টু মিয়া। কিন্তু কয়েক বছর ধরে শেফালীর মুখে ছেলের কথা শুনে শুনে স্বপ্নটার মাঝে একটু একটু ভয় ঢুকে গেছে।

শেফালী মোবাইলে কাঁদতে কাঁদতে বলত, ‘উজ্জ্বল তো আমার কথা শোনে না। স্কুলে যাইতে চায় না। পোলায় নাকি সিগারেট খায়। হেই পাড়ার পালের ভিটায়ও যায়। ঐহানে নাকি গাঁজাও খায়। আরও খারাপ হওনের আগে অহনই কিছু করন দরকার।’

দেশে ফিরে বন্ধুদের মুখেও একই কথা শুনেছেন সেন্টু। দু’একবার চুপি চুপি গিয়েছিলেনও পালের ভিটায়। ছেলেকে দেখতে পাননি। তবে সেখানে গাঁজার আসর ছিল। ছিল কলকি ও সিরিঞ্জ। দু’একটা কনডমও চোখে পড়েছে তাঁর।

কিন্তু তাঁর সামনে তো ছেলে কোনোদিন বেয়াদবি করে না। মাথা নিচু করে ভদ্রভাবেই উত্তর দেয়। যা বলে শোনে। আবার সেন্টুর বন্ধুরা তো তাঁর কাছে নিশ্চয়ই মিথ্যা বলছেন না। তাহলে কেন এমন হলো উজ্জ্বল?

কীসের অভাবে?

উত্তর আসে শেফালির কাছ থেকেই।

বাবার শাসন, আদর কি দরকার ছিল না ওর? একটা পুরুষ অভিভাবক নেই ঘরে। শেফালী কি পারে বাইরের সবকিছু দেখতে? ঘরের বউয়ের না হয় যৌবনকে বালিশ চাপা দেওয়া ছাড়া আর উপায় নেই। ছেলের শৈশব তো সেটা মানবে না। কুঁড়ি ফোটার দিনে যত্ন না পেলে, সেই দোষ কার— ফুলের না মালির?

যতটুকু সম্ভব ঘরের দিকটা সামলেছে শেফালী। বাইরেরটা পারেনি। আর সেন্টুই তো শেফালীকে বাড়ির বাইরে যেতে কড়া নিষেধ করেছিলেন। নিষেধ শুধু মুখেই করেননি, হাতেও করেছিলেন। শেফালীর গলায় এখনো লেগে আছে সেই নিষেধের দাগ।

যতটুকু সম্ভব ঘরের দিকটা সামলেছে শেফালী। বাইরেরটা পারেনি। আর সেন্টুই তো শেফালীকে বাড়ির বাইরে যেতে কড়া নিষেধ করেছিলেন। নিষেধ শুধু মুখেই করেননি, হাতেও করেছিলেন। শেফালীর গলায় এখনো লেগে আছে সেই নিষেধের দাগ।

দাগটা দেখে এখন কষ্টই পান সেন্টু। বছর দশেক আগে তাঁর চাচা চিঠি লিখেছিলেন। শেফালী নাকি পাশের বাড়ির এক ছেলের সাথে ফুসুর ফুসুর করে। তখন মোবাইল ছিল না। থাকলে মোবাইলেই তালাক হয়ে যেত। সেন্টু নিজে গরম বালিতে ইট, পাথর মাথায় টেনে রিয়াল কামাই করেন। আর সেই রিয়াল ভেঙে শেফালী বেলেল্লাপনা করবে! এ কি সহ্য হবার কথা? তবে খোঁজ খবর নিয়ে সেই কথার সত্যতা পাননি সেন্টু মিয়া। তবু দেশে ফিরে বউরে কিছু মাইর না দিলে পুরুষালি থাকে না। আর চাচার কাছেও তো মুখ রাখতে হবে।

এখন মাঝে মাঝে শেফালীর গলার দাগটায় হাত বুলায় সেন্টু। ভাবে— নিজে কী করে মরুর বুকে একা রাত কাটিয়েছে। থাকত মেসে। ছোট্ট রুমে ছয় জন। প্রায় রাতেই কেউ না কেউ হিন্দি ছবির সিডি নিয়ে আসত। এখনকার হিন্দী ছবি তো আসলে হাফ-নীল। বিছানায় বা বাথরুমে পুরুষের গরম যৌবনকে জুড়াতে একেবারে মন্দ না। মাঝে মাঝে ফুল-নীল ছবির ব্যবস্থাও থাকত। এভাবেই কেটেছে রিয়াল আয়ের রাতগুলো।

আর শেফালী? পদ্মাপারের একা ঘরে কী করে থাকে অমন যুবতী। বুকের শব্দ তো অবশ্যই কাঁদে একলা রাতে। আবার প্রবাসীর বউ দেখলে— অনেকেরই তো লালা ঝরা বেড়ে যায়। শেফালী কি পেরেছে সেই লালা থেকে দূরে থাকতে? পারলে সেন্টু ভাগ্যবান। না পারলেও আজ আর রাগ নেই তাঁর। ঘরে তো রয়েছে শেফালী। ওই জহরের বউয়ের মতো সংসার ছেড়ে পালিয়ে যায়নি অন্য পুরুষের সাথে।

অনেক ভালোবেসেই চৌদ্দ বছরের শেফালীকে ঘরে এনেছিলেন সেন্টু। চালতা ফুলের মতো মুখ। আদরের সময় চালতা ফুল বলেই ডাকত তাকে। ইচ্ছা করত— সারাদিনই দেখে মুখটা। ইচ্ছাটা বেশি ছিল বলেই মনে হয় ছয় মাসের মধ্যেই সেন্টুকে উড়াল দিতে হয়েছে সৌদি আরবের পথে। তারপর থেকে কয়েক বছর পর পর মাত্র ক’দিনের জন্য দেশে আসেন তিনি। এভাবেই কেটে গেছে বিশ বছর।

সেই চালতা ফুল শেফালী আজ চৌত্রিশ বছরের। অথচ দেখে মনে হয় পঞ্চাশ বছরের বুড়ি। মুখে মেছতা— অনেক দিনের না ঘুমানো দুটি চোখে আলো নেই। আর সেন্টু চোখ বুজলেই দেখতে পান— মরুর শহরগুলোতে ঝলমল করছে আলো। এই বিশ বছরে অনেক শহরে গিয়েছেন তিনি। সবই ঝলমলে— আলোয় ভরা। তাহলে কি শেফালীদের চোখের আলো, বুকের আলো কেড়ে নিয়েই ওই মরুভূমি ঝলমল করছে?

আলো?

আরও একটা আলো তাঁর ঘরে ছিল। বড়ো আদরের আলো। তাঁর ছোটো বোনের নাম আলো। সেন্টু বিদেশ যাবার সময় ওর বয়স ছিল বারো বছর। মা-বাবা মারা যাবার পরে এই বোনকে নিয়েই কেটেছিল তাঁর সময়। খুব সুন্দর গানের গলা ছিল আলোর।

সেই আলো আজ নেই। সেন্টু বিদেশ যাবার পর ট্যাঁরা মতি তাঁর দলবল নিয়ে হামলা করেছিল সেন্টুর বাড়িতে। তুলে নিতে এসেছিল আলোকে।

না, ট্যাঁরা মতির দলের কাছে ধরা দেয়নি আলো। দরজা ভেঙে মতি যখন আলোর ঘরে ঢোকে, ততক্ষণে তাঁর নিস্প্রাণ দেহ ওড়নায় ঝুলছে সিলিং থেকে।

আলোর কবরে চোখ পড়লেই এখনও ছলছল করে ওঠে সেন্টুর চোখ। মনে হয়, চারদিক থেকে আলো বলছে— ‘ভাইজান, তুমি দেশে থাকলে এমন হইত না। কোনোদিন হইত না।’

সেই আদরের আলো আজ শুয়ে আছে তাঁর পুরনো বাড়িতে। এই নতুন বিশাল বাড়িতে আলোর কোনো অভাব নেই।

এদিকে টাকা পয়সা প্রায় শেষ সেন্টুর। বাড়ি কিনতেই আসলে সব চলে গেছে। তার উপর অনেক দিন পর দেশে ফিরে অত কিপ্টামি করে তো চলা যায় না। এখন ফিরতেই হবে সৌদিতে। আবার শুরু হবে মিসকিন জীবন। উপায় নেই।

কিন্তু হঠাৎ খবর আসে— এই উপায়টাও আর নেই। কোম্পানি জানিয়ে দিয়েছে— তাঁর মতো বুড়োর আর প্রয়োজন নেই সেখানে। মিসকিনের বয়স হয়ে গেলে আর দাম নেই। ওই দেশে আর ঢুকতে দেবে না। আরও অনেক জোয়ান মিসকিন রেডি আছে যাবার জন্য।

কী করবেন সেন্টু। হাতে টাকা নেই। সৌদিতে ফেরার উপায় নেই। আছে শুধু নতুন কেনা বাড়িটা। এখন বাড়িটা কি বিক্রি করে দেবেন? আত্মীয় স্বজনকে জানিয়ে ধুমধাম করে উঠেছেন নতুন বাড়িতে। এক মাসের মাথায় বেচে দিবেন?

উজ্জ্বলরে পাডাইয়া দেন ওই দেশে। ওই গাঁজাখোরের আর লেহাপড়া হইব না। অর মামারে কইলে, টাকা দিব। না দিলে নতুন বাড়ির থন ইট্টু লেইখ্যা দিমু অর মামারে।

ভাবতে ভাবতে শুনতে পান শেফালীর ঠান্ডা গলা—

‘আমি কই কী— উজ্জ্বলরে পাডাইয়া দেন ওই দেশে। ওই গাঁজাখোরের আর লেহাপড়া হইব না। অর মামারে কইলে, টাকা দিব। না দিলে নতুন বাড়ির থন ইট্টু লেইখ্যা দিমু অর মামারে।’

আর কোনো উপায় নেই সেন্টু মিয়ার। উজ্জ্বলকেই পাঠতে হবে।

শেফালীর দিক থেকে চোখ সরিয়ে পাশের ঘরে তাকান সেন্টু। ছেলেকে খোঁজে। কিন্তু কোথায় তাঁর আদরের ধন! কোথায় তাঁর ভবিষ্যৎ মেজিস্ট্রেট!

সেন্টু দেখতে পাচ্ছেন— ওই ঘরে একটা জুয়ান মিসকিন বসে টিভি দেখছে। নতুন প্রজন্মের টকবগে মিসকিন। মরুর শহরকে আরো উঁচু করতে, আরও আলোয় ভরিয়ে দিতে একটা কিশোর মিসকিন।

টিভিতে খবর দেখাচ্ছে— দেশের রিজার্ভ সর্বকালের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। সম্মানিত প্রবাসী শ্রমিকদের ধন্যবাদ জানাচ্ছেন মন্ত্রী।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

সুজন দেবনাথ একজন কথাসাহিত্যিক এবং কবি। তিনি বাংলাদেশের শরীয়তপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (আইবিএ) এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। কর্মসূত্রে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এথেন্স এবং থিম্পুতে বাংলাদেশ দূতাবাসে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি লেখালেখি শুরু করেন অব্যয় অনিন্দ্য ছদ্মনামে। এই নামে ২০১৫ সালে তার কাব্যগ্রন্থ ‘মন খারাপের উঠোন’ এবং গল্পগ্রন্থ ‘কীর্তিনাশা’ প্রকাশিত হয়। সুজন দেবনাথ একজন রবীন্দ্র গবেষক। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এথেন্স ভ্রমণ নিয়ে মৌলিক গবেষণা ‘হোমারের দেশে রবীন্দ্রনাথ’ সম্পন্ন করেছেন। তার রচনা ও পরিচালনায় গ্রিস থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে প্রথম ইংরেজী গান ‘ইটস মাদার ল্যাংগুয়েজ ডে’ প্রকাশিত হয়। ২০২০ সালে প্রকাশিত হয় তার পাঠকনন্দিত সুবৃহৎ ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’। সক্রেটিস, প্লেটো, হেরোডটাস, সফোক্লিসদের সময়ে এথেন্সে থিয়েটার, সাহিত্য, গণতন্ত্র, বিজ্ঞান, ইতিহাসশাস্ত্র, দর্শন, অলিম্পিক, চিকিৎসাশাস্ত্র এবং প্লেটোনিক প্রেমের জন্মকথা নিয়ে এই উপন্যাসটিকে গ্রিসের ‘সক্রেটিস কমিউনিটি ইন এথেন্স’ ২০২০ সালের সক্রেটিস বিষয়ক সেরা বই হিসেবে নির্বাচিত করেছেন।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।