রবিবার, জুলাই ২১

রনক জামান অনূদিত আর্নেস্ট হেমিংওয়ের গল্প : পর্বতশৃঙ্গে

0

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের গল্পটি ‘এন আলপাইন আইডিল’ শিরোনামে স্থান পায় তাঁর দ্বিতীয় ছোটগল্পসংগ্রহ ‘মেন উইদাউট উইমেন’ (১৯২৭) গ্রন্থে। হেমিংওয়ের সৃষ্ট অল্টার ইগো চরিত্র নিক এডামস-এর যুবক বয়সের কাহিনীগুলোর একটি এ গল্প, প্রথম প্রকাশিত হয় স্ক্রিবনার্স ম্যগাজিনে। যদিও প্রথমে বিষয়বস্তু বিবেচনায় বাতিল করেছিলেন সম্পাদক, পত্রিকার কোমলমতি পাঠকদের জন্য গল্পটি অস্বস্তিকর হতে পারে—এই অভিযোগে।


এই ভোরবেলাতেই উপত্যকাজুড়ে রোদটা তেঁতে উঠেছে।

আমাদের পিঠে ভারী কাঁধব্যাগ। সঙ্গে ঝোলানো স্কিগুলো থেকে বরফ গলে গলে পড়ছে আর স্কি’র কাঠ শুকিয়ে এসেছে। উপত্যকায় যদিও বসন্তকাল কিন্তু সূর্যের তীব্রতা গ্রীষ্মের মতোই ভয়াবহ। কাঁধের ব্যাগ ও স্কি’সমেত আমরা নেমে এলাম গালটুরের সড়কে আর তখন গির্জার আঙিনা পেরুবারকালে চোখে পড়ল একটা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া—কেবলই সম্পন্ন হয়েছে। পায়ে হেঁটে আমাদেরকে পেরিয়ে যেতে থাকা পাদ্রীটিকে সম্বোধন করলাম, ‘গ্রুস্ গট্ (দিনটি শুভ হোক)!’

তিনি জবাবে সামান্য কুর্নিশ করলেন।

‘মজার ব্যাপার কি, কোনো পাদ্রীই তোমার সঙ্গে কথা বলে না,’ জন হেসে বলে।

‘তোমার কি মনে হয় জবাবে ‘গ্রুস্ গট্’ বলতে ভালো লাগে তাদের?’

‘আসল কথা তারা কখনোই তোমাকে জবাব দেয় না,’ জন বলল।

আমরা রাস্তায় থামলাম। পর্বতচূড়া থেকে নিচে এই নতুন দুনিয়ায় গির্জার রক্ষককে দেখা গেল বেলচা হাতে কবর খুঁড়তে। কবরের পাশে, মুখে কালো দাঁড়ি ও উঁচু চামড়ার জুতো পায়ে এক কৃষক দাঁড়িয়ে। গির্জার রক্ষকটি হাঁপিয়ে উঠেছে, বেলচা থামিয়ে সামান্য বিশ্রামের ভঙ্গিতে পিঠ সোজা করে নেয়ার সময় উঁচু বুট পরিহিত কৃষকটা তাঁর হাত থেকে বেলচা নিয়ে নিজেই কবর ভরাট করতে শুরু করল—কবরের মাটি সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে থাকে সে, যেভাবে বাগানে সার ছড়িয়ে দেয় সে সমানভাবে। মে মাসের এরকম উজ্জল সকালবেলায় কবর ভরাটের দৃশ্যটি কেমন অবাস্তব ও বেমানান ঠেকছিল।

আমরা রাস্তায় থামলাম। পর্বতচূড়া থেকে নিচে এই নতুন দুনিয়ায় গির্জার রক্ষককে দেখা গেল বেলচা হাতে কবর খুঁড়তে। কবরের পাশে, মুখে কালো দাঁড়ি ও উঁচু চামড়ার জুতো পায়ে এক কৃষক দাঁড়িয়ে। গির্জার রক্ষকটি হাঁপিয়ে উঠেছে, বেলচা থামিয়ে সামান্য বিশ্রামের ভঙ্গিতে পিঠ সোজা করে নেয়ার সময় উঁচু বুট পরিহিত কৃষকটা তাঁর হাত থেকে বেলচা নিয়ে নিজেই কবর ভরাট করতে শুরু করল—কবরের মাটি সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে থাকে সে, যেভাবে বাগানে সার ছড়িয়ে দেয় সে সমানভাবে। মে মাসের এরকম উজ্জল সকালবেলায় কবর ভরাটের দৃশ্যটি কেমন অবাস্তব ও বেমানান ঠেকছিল। এছাড়া আমি কাউকেই মৃত চেহারায় কল্পনা করতে পারি না। জনকে বললাম, ‘ভাবো একবার, এরকম সুন্দর একটা দিনে আমাদের কবর হচ্ছে।’

‘ভাবতেও ভাল্লাগে না এসব।’

‘বটে,’ বললাম, ‘কাজটা অবশ্য তখন আমাদের নিজেদের করতে হবে না।’

শহরের বাড়িগুলোর পাশ ঘেঁষে আমরা সরাইখানার পথ ধরে এগিয়ে গেলাম। একমাস যাবত সিলভরেত্তার উঁচু পর্বতচূড়ায় স্কি করেছি। এখন উপত্যকায় নেমে এসে বেশ লাগছে। সিলভরেত্তায় আমাদের স্কিইং ভালোই চলেছে। কিন্তু বসন্তের এসময় স্কি স্রেফ ভোরবেলা আর সেই সন্ধ্যাবেলায় ভালো করা যায়, বরফ যখন সুন্দর থাকে। বাকি সময় সূর্যের তাপে বরফ গলে পিচ্ছিল হয়ে পড়ে—স্কি করাটাই দুষ্কর। আমরা দুজনই তাই সূর্যের উপর যারপরনাই ত্যক্ত। পর্বতচূড়ায় রোদের হাত থেকে বাঁচার উপায় নেই। একমাত্র ছায়া পাওয়া যাবে বড় বড় পাথর চাইয়ের পাশে আর হিমবাহ থেকে নিরাপদ স্থানে তৈরি কুটিরগুলোর নিচে। স্কি করা শেষে ঘর্মাক্ত শরীরে সেই ছায়ায় বসতে না বসতেই পোশাকের নিচের ঘামগুলো বরফ হয়ে জমে যায়। কুটিরের বাইরে, রোদে কালো চশমা ছাড়া বসা মুশকিল। রোদে পুড়ে কালো হতে মন্দ লাগে না শুধু সূর্যটাই যা ক্লান্তিকর। রোদের নিচে বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ নেই। ফলত এখন তুষার থেকে নেমে এসে ভালো লাগছে। সিলভরেত্তার বসন্ত ঋতুতে পাহাড়চূড়ায় স্বচ্ছন্দে অবস্থান করার পক্ষে একটু দেরিই এখন, বলতে গেলে। দীর্ঘদিন স্কি করেও ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। এখনো বরফগলা পানির স্বাদ জিভে লেগে আছে। কুটিরের চালাগুলো টিনের, সেখানে জমা বরফ গলিয়ে পানের পানি তৈরি করতে হতো আমাদের। স্বাদটা স্কিইং এর অভিজ্ঞতারই অংশ। খুশির ব্যাপার হচ্ছে, উপরে স্কি করা ছাড়াও আরো কাজ থাকে করার মতো। এখন অপ্রাকৃতিক পাহাড়ি বসন্তের এই মে মাসের সকালবেলা আমি উপত্যকায় নেমে এসে খুশি।

সরাইখানার ভেতরেই চেয়ারে বসেছিলেন ইনকিপার (সরাইখানার তত্ত্বাবধায়ক)। চেয়ার দুলিয়ে সামনের দুইপায়া উঁচিয়ে পেছনের দেয়ালে হেলান দিলেন তিনি। তার পাশে বাবুর্চি বসে ছিল।

‘স্কি জিন্দাবাদ,’ ইনকিপার আমাদের দেখেই বলে উঠলেন।

‘জিন্দাবাদ,’ জবাব দিতে দিতে স্কি’গুলো দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে রেখে পিঠের ব্যাগ নামালাম।

‘উপরে কেমন ছিল?’ তিনি জিজ্ঞেস করেন।

‘চমৎকার, শুধু রোদটা একটু বেশি।’

‘হ্যাঁ, বছরের এসময় রোদটা বেশিই থাকে।’

বাবুর্চি নিজের চেয়ারে বসে ছিল। ইনকিপার আমাদের সঙ্গে ভেতরে এলেন, অফিসরুম দরজা খুলে আমাদের চিঠিগুলো বের করে দিলেন। একগাদা চিঠি ও কিছু কাগজ এসেছে।

‘চলো, বিয়ার গেলা যাক,’ জন বলল।

‘বেশ, আমরা পানের ঘরেই বসি তাহলে।’

ইনকিপার দুই বোতল বিয়ার এনে দিলে আমরা চিঠি পড়তে পড়তে আমরা বিয়ার পান করতে লাগলাম।

‘আরো বিয়ার দরকার যে,’ জন বলে। একটা মেয়ে বিয়ার নিয়ে এলো এবার, বোতল খোলার সময় স্মিত হাসলো আমাদের দিকে, বলল, ‘অনেক চিঠি জমে গেছে।’

‘হ্যাঁ, অনেক।’

‘আজ্ঞে,’ বলতে বলতে মেয়েটি কক্ষের খালি বোতলগুলো নিয়ে বেরিয়ে যায়।

‘বিয়ারের স্বাদ প্রায় ভুলতেই বসেছিলাম।’

‘ভুলি নাই,’ জন বলে, ‘পর্বতের উপরে বসে কতবার যে মনে মনে বিয়ারের কথা ভেবেছি ইয়ত্তা নেই।’

‘এখন পেয়েছি এই বেশ,’ বললাম।

‘এত দিন ধরে কোনো কাজ করা ঠিক না আসলে।’

‘সত্যিই, উপরে একটু দীর্ঘ সময় থেকেছি এবার।’

‘একটু বলছো? অনেক বেশি বলো,’ জন বলল। ‘এতদিন ধরে কোনকিচ্ছু করাই ঠিক না!’

খোলা জানালা দিয়ে আসা রোদ টেবিলের বিয়ারের বোতলে প্রতিফলিত হয়ে চকচক করে উঠল। অর্ধেক খালি বোতল। বোতলের ভেতর সামান্য ফেনা। বেশি ঠাণ্ডার কারণে ফেনার পরিমান কম, লম্বা গ্লাসে ঢাললে ফেনায়িত হয়ে উঠবে আরো। খোলা জানালা দিয়ে তুষারিত সফেদ রাস্তার দিকে তাকালাম। রাস্তার পাশে গাছগুলো জীর্ণ ধুলোমলিন।

খোলা জানালা দিয়ে আসা রোদ টেবিলের বিয়ারের বোতলে প্রতিফলিত হয়ে চকচক করে উঠল। অর্ধেক খালি বোতল। বোতলের ভেতর সামান্য ফেনা। বেশি ঠাণ্ডার কারণে ফেনার পরিমান কম, লম্বা গ্লাসে ঢাললে ফেনায়িত হয়ে উঠবে আরো। খোলা জানালা দিয়ে তুষারিত সফেদ রাস্তার দিকে তাকালাম। রাস্তার পাশে গাছগুলো জীর্ণ ধুলোমলিন। ওপাশে সবুজ মাঠ, তারপর এক জলস্রোত দেখা যাচ্ছে। স্রোতের ধারে গাছপালা আর জলঘূর্ণনের চাকার মিল। মিলের যেপাশে খোলামেলা সেখানে লম্বা একটা গাছের গুঁড়ি পড়ে আছে, ভাসছে-ডুবছে। কাছেপিঠে কাউকে দেখা গেল না। শুধু চারটি কাক মাঠের সবুজে হেঁটে বেড়াচ্ছে আর একটা কাক গাছে বসে দেখে নিচ্ছে চারপাশ। পানের ঘরের বাইরে বাবুর্চি চেয়ার থেকে উঠে হলঘর পেরিয়ে পেছনের রান্নাঘরের দিকে চলে গেল আর পানঘরের ভেতর টেবিলে রাখা শূন্য কাঁচের গ্লাসের ভেতর রোদটা ঝিলিক দিচ্ছে। জন টেবিলের উপর ঝুঁকে দুইহাতে ঢেকে মাথা রাখল।

জানালা দিয়ে দেখতে পাই, দুজন লোক সরাইখানায় উঠে আসছে। পানের ঘরে এলো তারা। তাদের একজন সেই কালো দাঁড়িওয়ালা উঁচু বুটের সেই কৃষক এবং অন্যজন গির্জার সেই রক্ষক। জানালার ধারের টেবিলে চেয়ার টেনে বসল দুজন। মেয়েটি এসে দাঁড়ায় টেবিলের কাছে কিন্তু কৃষকের ভ্রূক্ষেপ নেই মেয়েটির দিকে। সে টেবিল হাত ছড়িয়ে বসে রইলো; তার গায়ে পুরনো আর্মির পোশাক, দুই কনুইয়ের কাছে তালি।

গির্জার রক্ষণাবেক্ষণকারী লোকটি জিজ্ঞেস করে তাকে, ‘কী খাবে?’

কৃষকটি পাত্তা দেয় না।

‘কী খাবে?’

‘স্ন্যাপস,’ কৃষকটি বলে।

‘আর এক পোয়া রেড ওয়াইন,’ গির্জার লোকটি বলল মেয়েটিকে।

মেয়েটা স্ন্যাপস নিয়ে এলে কৃষক লোকটি ঢকঢক করে গিলে নিয়ে জানালার বাইরে তাকায়। গির্জার রক্ষক তাকায় ওর দিকে। আমাদের টেবিলে জন মাথা রেখে ঘুমিয়ে গেছে ততক্ষণে।

ইনকিপার এগিয়ে আসেন ঐ টেবিলের দিকে, আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে লাগলেন গির্জার রক্ষকের সঙ্গে। তখনও কৃষকটির দৃষ্টি জানালার বাইরে। ইনকিপার পানঘর থেকে চলে গেলে কৃষকটি উঠে দাঁড়িয়ে চামড়ার ছোট পকেটবই থেকে এক হাজার ক্রোনের নোট বের করে ভাঁজ খুলতে ব্যস্ত হয়। মেয়েটি আবার আসে, জিজ্ঞেস করে, ‘এইলস?’

‘এইলস,’ কৃষকটি বলে।

‘ওয়াইনের দাম আমাকে দিতে দাও,’ গির্জার লোকটি বলে।

মেয়েটা এপ্রনের পকেট থেকে মুঠোভর্তি কয়েন বের করে গুণে গুণে বাকিটাকা ফেরত দেবার পর কৃষকটি দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। ইনকিপার আবার এলেন, গির্জার রক্ষকের সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষায় আবার কথা বলতে থাকেন টেবিলের চেয়ারটি টেনে। তাকে বেশ বিরক্ত দেখাচ্ছে। ছোটখাটো গড়নের দেহ আর গোঁফসমেত গির্জার লোকটি দাঁড়িয়ে জানালার বাইরে রাস্তায় উঁকি দেয়, ‘ঐ তো যাচ্ছে সে।’

‘লোয়েন এ?’

‘হ্যাঁ।’

একটুপর ইনকিপার আমাদের দিকে তাকালেন—লম্বা বয়স্ক ব্যক্তি তিনি, জনকে ঘুমাতে দেখে বললেন, ‘অনেক ক্লান্ত।’
‘হ্যাঁ, খুব ভোরে উঠতে হয়েছিল,’ জবাব দিলাম।

‘নাশতা কি তাহলে দ্রুত সারবেন? ব্যবস্থা করি?’

‘যে কোনো সময়,’ বললাম। ‘কী রান্না হয়েছে?’

মেয়েটি মেন্যু নিয়ে এলে জন টেবিল থেকে মাথা তুলল। একটা কার্ডের উপর কালি দিয়ে লেখা মেন্যু—হাত ফসকে মেঝের কাঠের ফোঁকরে পড়ল।

‘মেন্যুটা ওখানে পড়েছে,’ জনকে বলি। সে তখনও ঘুম ঘুম চোখে অন্য জগতে। ইনকিপারকে বললাম, ‘আপনিও বসুন না আমাদের সঙ্গে, একসাথে পান করি।’

তিনি আমাদের টেবিলে এসে একটা চেয়ার টেনে বসতে বসতে গজগজ করতে লাগলেন, ‘এই চাষাগুলো একেকটা জানোয়ার, আস্ত জানোয়ার!’

‘শহরে আসার সময় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া চোখে পড়েছে।’

‘ওটা ঐ চাষার বউটার।’

‘ওহ!’

‘পশু, সব কয়টা চাষাই আস্ত পশু!’

‘এরকম কেন বলছেন?’

‘বললে বিশ্বাস করবেন না! আপনার বিশ্বাসই হবে না এই চাষিটা কী কাণ্ড করেছে!’

‘কী ব্যাপার বলুন তো?’

‘বিশ্বাস হবে না আপনার! ফ্রাঞ্জ, এদিকে আসুন তো,’ গির্জার রক্ষকটিকে ডাকলেন। লোকটি ওয়াইনের বোতল আর গ্লাস নিয়ে আমাদের টেবিলে এলো। ইনকিপার বললেন, ‘ইনি সেই ওয়েসবাডানেরহাট থেকে নেমে এসেছেন।’

করমর্দন করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী পান করবেন?’

‘কিছুই না,’ ফ্রাঞ্জ, অর্থাৎ গির্জার রক্ষকটি জবাব দেয়।

‘আরো এক পোয়া রেড ওয়াইন?’

‘চলবে।’

ইনকিপার বললেন, ‘আপনারা কি এখানকার আঞ্চলিক ভাষা বোঝেন?’

‘না।’

‘কী ব্যাপার?’ জন জিজ্ঞেস করে।

‘শহরে আসার সময় আমরা যে কবর ভরাট করতে দেখছিলাম সেই কৃষকটির ঘটনা বলবেন উনি।’

‘বুঝলাম না কিছুই।’

‘ঐ চাষাটা,’ ইনকিপার বলতে লাগলেন, ‘মৃত স্ত্রীকে দাফন করতে এসেছে আজ, অথচ তার বউটা মারা গেছে গত নভেম্বরে।’
‘ডিসেম্বরে,’ গির্জার লোকটি শুধরে দেয়।

‘ঐ হলো! তার বউটা মরেছে গত ডিসেম্বরে অথচ চাষাটা সম্প্রদায়ের লোকদের খবর পর্যন্ত করেনি।’

‘ডিসেম্বরের আঠারো তারিখে,’ গির্জার রক্ষক আবার বলে।

‘যাই হোক, ডিসেম্বরের আঠারো তারিখে মারা গেছে কিন্তু বরফ না কমে আসা পর্যন্ত চাষাটা তার বউয়ের মৃতদেহ কবর দিতে আনতে পারেনি।’

‘কৃষকটা পাজনাউনের সেই শেষপ্রান্তে থাকে,’ গির্জার রক্ষক যোগ করলো। ‘কিন্তু সে আমাদের সম্প্রদায়ের সদস্য।’

‘সে তার মৃত স্ত্রী’কে এতদিন আনতেই পারলো না?’ জিজ্ঞেস করি।

‘না, বরফ না গলা পর্যন্ত স্কি করে আসা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। স্কি করে তো সঙ্গে মৃতদেহ আনা মুশকিল, তাই সে আজকে এনেছে দাফন করতে, এতদিন পর। গির্জার পাদ্রীসাহেব লাশের চেহারায় দিকে এক নজর তাকিয়েই চমকে যান আর সাফ সাফ জানিয়ে দেন, এই লাশের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বা দাফন তিনি করতে পারবেন না। ফ্রাঞ্জ, বাকিটা আপনি বলুন তো, আঞ্চলিকে না, শুদ্ধ জার্মান ভাষায় বলুন,’ ইনকিপার বললেন।

ফ্রাঞ্জ বলতে লাগলেন, “জানা যায় চাষার স্ত্রী হৃদরোগে মারা গিয়েছে গত ডিসেম্বরের আঠারো তারিখে। আগে থেকেই তার হৃদরোগ ছিল। চার্চে এসেও মাঝেমধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়ত। অনেকদিন হলো চার্চে আসতে দেখা যায়নি।

ফ্রাঞ্জ বলতে লাগলেন, “জানা যায় চাষার স্ত্রী হৃদরোগে মারা গিয়েছে গত ডিসেম্বরের আঠারো তারিখে। আগে থেকেই তার হৃদরোগ ছিল। চার্চে এসেও মাঝেমধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়ত। অনেকদিন হলো চার্চে আসতে দেখা যায়নি। সবাই ভেবেছে পাহাড় আর বরফ বেয়ে আসা তার জন্য কষ্টকর, এজন্য হয়ত রবিবারের প্রার্থনাতেও আসতে পারছে না। শেষে আজকে যখন লাশ আনা হলো, পাদ্রীসাহেব লাশের চেহারা দেখে তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘ওল্জ্, কী ব্যাপার? তোমার স্ত্রী কি খুব কষ্ট পেয়ে মারা গেছে?’

ওল্জ্ বলেছিল, ‘আজ্ঞে না। আমি বাড়িতে ছিলাম না, কাজ শেষে ফিরে দেখি সে বিছানায় মরে পড়ে আছে।’

পাদ্রী আবার লাশের দিকে তাকান, বাজে একটা অনুভূতি হয় তাঁর, জিজ্ঞেস করেন, ‘তাহলে লাশের মুখের এরকম অবস্থা কেমন করে হলো?’

ওল্জ্ জবাব দেয়, ‘আজ্ঞে, আমি তা জানি না।’

‘জানার চেষ্টা করো তবে!’ পাদ্রী জোর দিয়ে এই কথা বলে লাশের মুখ ঢেকে দেন। ওলজ আর কোনো কথা বলছিল না। পাদ্রী তার দিকে আবার তাকালে ওলজ কাতর চোখে বলে ওঠে, ‘জানতে চান, ফাদার?’

‘আলবৎ! আমাকে জানতে হবে, নয়তো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করা অসম্ভব,’ পাদ্রী বলেন।”

‘এই যে— এখন ঘটনার আসল অংশ—,’ ইনকিপার বক্তাকে বাঁধা দিয়ে উত্তেজিত গলায় বলে উঠলেন, ‘ভালো করে শুনুন আপনারা। ফ্রাঞ্জ, চালিয়ে যান!’

ফ্রাঞ্জ আবার বলতে শুরু করে:

“’বেশ, ফাদার,’ ওল্জ্ বলে, ‘সব বলছি আপনাকে। ওর মৃত্যুর খবরটা সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছানো অসম্ভব ছিল। ভেবেছিলাম যতদিন না একটা বিহিত হচ্ছে ততদিন লাশটিকে বড় কাঠগুলোর ছায়ায় রেখে দিই, তাতে নষ্ট হবে না। আর সেখানেই রেখেছিলাম। কিন্তু কাঠগুলো ফুরিয়ে গেল কিছুদিন পর, ওর লাশ ততদিনে ঠাণ্ডায় জমে শক্ত হয়ে গিয়েছিল। লাশটি এরপর ঘরের ভেতরে নিয়ে আসি, দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড়া করিয়ে রাখি। ওর মুখের হাঁ খোলা ছিল। রাতে বড় বড় গাছ কেটে ক্লান্ত আর মাতাল হয়ে ঘরে ফিরতাম যেদিন, হ্যারিকেনটা ওখানেই…ওর মুখে…মানে…লাশটি হাঁ করা মুখের সঙ্গে ঝুলিয়ে দিতাম।’

‘ওল্জ্, এরকম কেন করলে?’ পাদ্রী জিজ্ঞেস করেছিলেন।

‘আমি জানি না,’ ওল্জ্ কেবল এটুকুই জবাব দিতে পারে।

‘কতবার এরকম করেছো?’

‘প্রতিবার, রাতে যখন কাঠ কাটতে যেতাম আর মাতাল হয়ে ফিরতাম, প্রত্যেকবার।’

‘খুব জঘন্য পাপ করেছো, ওল্জ্! একটা লাশ…তার সঙ্গে এরকম…তুমি কি ওকে ভালোবাসতে না?’

‘হ্যাঁ, ভালোবাসতাম,’ ওল্জ্ স্বীকার করে, ‘অনেক ভালোবাসতাম।’”

 

‘বুঝলেন তো?’ ইনকিপার এই পর্যায়ে বলে ওঠেন। ‘ঐ চাষা আর ওর বউয়ের ঘটনা পুরোটা বুঝেছেন তো আপনারা?’

‘হুম, শুনলাম।’

জন এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, ‘খাবো কী আমরা?’

‘তুমি অর্ডার করে ফেলো,’ জনকে বললাম, তারপর ইনকিপারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার কী মনে হয়, ঘটনা সত্য?’

‘আলবৎ,’ তিনি বললেন, ‘এই চাষাভুষাগুলো আস্ত পশু। কী সাঙ্ঘাতিক ঘটনা, নয় কি?’

‘এখন কোথায় গেল?’

‘আবার লোয়েন-এ গেল, আমার কলিগদের সঙ্গে মদ গিলতে। মাতাল একটা!’

‘যদিও সে আমার সঙ্গে পান করেনি,’ গির্জার রক্ষক ফ্রাঞ্জ জানায়।

‘তার বউয়ের ঘটনা জানাজানির পর সে আমার সঙ্গেও পান করেনি,’ ইনকিপার বলেন।

‘আরে,’ জন আবার বলে উঠল, ‘খাবারের ব্যবস্থা হবে কিনা?’

‘শিওর,’ বললাম।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

কবি ও অনুবাদক। জন্ম : ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৯১; মানিকগঞ্জ। রসায়ন শাস্ত্রে স্নাতোকোত্তর। সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা ‘তীরন্দাজ’ ও ‘অকালবোধন’-এ। প্রকাশিত গ্রন্থ : কবিতাগ্রন্থ : ঘামগুলো সব শিশিরফোঁটা [২০১৬, অনুপ্রাণন]; অগ্রন্থিত ওহী [২০১৯, তিউড়ি]। অনুবাদগ্রন্থ : ললিতা – ভ্লাদিমির নবোকভ [২০১৬]; ইসমাইল কাদারে’র কবিতা [২০১৭, তিউড়ি]; সেরা ২০ ছোটগল্প – আর্নেস্ট হেমিংওয়ে [২০১৮, পাঞ্জেরী]; দক্ষিণে – সালমান রুশদি [২০১৮, চৈতন্য]; আমক – স্তেফান সোয়াইগ [২০১৯, জেব্রাক্রসিং]

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।