শুক্রবার, জুলাই ১৯

লুইস গ্লুকের গদ্য কবিতা ।। ভূমিকা ও ভাষান্তর : গৌরাঙ্গ মোহান্ত

0

Luise-Gluck


লুইস গ্লুক ২০২০ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যে নোবেলপুরস্কার লাভ করেন। তিনি নিউ ইয়র্কে ২২ এপ্রিল ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং শৈশবকালেই কবিতার মায়াজালে অন্তরায়িত হন। তাঁর উচ্চশিক্ষিতা মা তাঁকে বই পড়ে শোনাতেন বলে তিন বছর বয়সের আগেই গ্রিক পুরাণের মূল বিষয়গুলো তাঁর আয়ত্তীকৃত হয়ে ওঠে। লেখক হবার স্বপ্নে আচ্ছন্ন বাবা তাঁকে গল্প শোনাতেন এবং হালকা পদ্য বা ডগরেল লিখতেন। গ্লুকের পিতামহী গ্রন্থপাঠাসক্ত ছিলেন। অনুকূল পরিবেশে গ্লুক চার বছর বয়স থেকেই কবিতা পড়তে শুরু করেন; যেসব ছোটো কবিতা মনের প্রসারণ ঘটাতো সেগুলোর প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল প্রবল। বস্তুত শৈশবে তিনি কবিতায় তরঙ্গিত ক্রন্দন শুনতে পেতেন এবং ক্রমান্বয়ে নিজের জীবনকে যন্ত্রণাদীর্ণ করে তোলেন। হাই স্কুলে অধ্যয়নকালে তিনি অ্যানোরেক্সিয়ায় আক্রান্ত হন, মৃত্যুর ভেতর দিয়ে জননীর সঙ্গে তাঁর চিরবিচ্ছেদ ঘটুক তা তিনি কেনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি; মনঃসমীক্ষকের শরণাপন্ন হয়ে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করা সত্ত্বেও তিনি ডিগ্রি অর্জন করেননি। তবে কবিতার শিক্ষক হিসেবে লাভ করেন প্রসিদ্ধি। তাঁর প্রথম কাব্য ‘Firstborn’ ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ‘The Triumph of Achilles’ (1985) কাব্যের জন্য National Book Critics Circles Award এবং ‘The Wild Iris’ (1992) কাব্যের জন্য ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে Pulitzer Prize for Poetry লাভ করেন। পুরাণ, প্রকৃতি ও প্রাতিস্বিক অভিজ্ঞতার কিরণ ঢেলে গ্লুক কবিতায় বিষাদ ও নৈঃসঙ্গ্যের চিত্রপট আঁকেন। তাঁর কবিতায় মনোবিকলনের প্রভাবও লক্ষণীয়। ১৯৬৮-২০১২ কালপরিসরে প্রকাশিত এগারোটি কাব্যে চলিষ্ণু গদ্যে লিখিত কবিতা অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও ২০১৪ সালে প্রকাশিত Faithful and Virtuous Night কাব্যে ৮টি টানা গদ্যের কবিতা সন্নিবেশিত হয়। অনূদিত কবিতাগুলো এ কাব্য থেকে সংগৃহীত। বর্তমানে তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাজাংট অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।


পার্কে দম্পতি


একজন মানুষ পার্কে একাকী হাঁটেন এবং পাশে হাঁটেন একজন মহিলাও, একাকী। কীভাবে কেউ জানতে পারে? খেলার মাঠের রেখার মতো তাদের মধ্যে যেন একটি রেখা বিদ্যমান। এবং তবুও, ছবিতে তারা বিবাহিত যুগল হিসেবে দৃশ্যমান হতে পারেন, পরস্পরের প্রতি এবং একত্রে অতিবাহিত অনেক শীতকালের প্রতি তারা বীতশ্রদ্ধ। অন্য সময়ে, তারা অপরিচিত ব্যক্তি, দৈবাৎ তাদের দেখা হতে পারে। তিনি তার বই নিচে ফেলে রাখেন, তুলতে গিয়ে ঝুঁকে পড়েন, স্পর্শ করেন, দৈবাৎ, মানুষটির হাত এবং তার হৃদয় শিশুর সঙ্গীতের বাক্সের মতো তড়াক করে খুলে যায়। এবং বাক্স থেকে বেরিয়ে আসে কাষ্ঠনির্মিত ছোট্ট ব্যালে-নর্তকী। মানুষটি ভাবে, আমি এটি সৃষ্টি করেছি; যদিও সে একই জায়গায় ঘুরপাক খেতে পারে, তবুও সে এক ধরনের নৃত্যশিল্পী, নিছক কাঠের টুকরো নয়। এটি অবশ্যি বৃক্ষরাজি থেকে আগত হতবুদ্ধিকর সঙ্গীত ব্যাখ্যা করে।


তত্ত্ব ও স্মৃতি


অনেক, অনেক আগে, আমি বাসনায় কাতর তবুও স্থায়ী অনুরক্তি গড়ে তুলতে অক্ষম, যন্ত্রণাক্লিষ্ট শিল্পী হওয়ার আগে, এরও অনেক আগে বিভক্ত দেশের সবাইকে একত্রিত করে আমি ছিলাম এক সুখ্যাত শাসক⎻এভাবে আমাকে বলেছিলেন একজন গণৎকার যিনি আমার করতল পরীক্ষা করেছিলেন। দারুণ জিনিসগুলো, তিনি বলেন, আপনার আগে, অথবা সম্ভবত আপনার পেছনে রয়েছে; নিশ্চিত হওয়া দুরূহ। এবং তবুও, তিনি আরও বলেন, প্রভেদটা কি? এ মুহূর্তে আপনি গণৎকারের হাত ধরে থাকা একজন শিশু। বাকি সব অনুমান আর স্বপ্ন।


ইউটোপিয়া


ট্রেনটি যখন থামে, একজন মহিলা বললেন, তোমাকে এটিতে উঠে পড়তে হবে। কিন্তু কী করে আমি জানবো, শিশুটি জিজ্ঞেস করল, এটি সঠিক ট্রেন? এটাই হবে সঠিক ট্রেন, মহিলা বললেন, কারণ এই হচ্ছে যথার্থ সময়। ট্রেন স্টেশনে এগিয়ে এলো; চিমনি থেকে প্রবাহিত হলো পাঁশুটে ধোঁয়ার মেঘ। তার পিতামহীকে দেওয়ার জন্য হলুদ টিউলিপগুচ্ছ আঁকড়ে ধরে, শিশুটি ভাবে, কতো আতঙ্কিত আমি। ভ্রমণের চাপ ঠেকাতে আঁট করে তার চুলে বেঁধে দেওয়া হয়েছে বিনুনি। তারপর, কোনো কথা ছাড়াই, সে উঠে পড়ে ট্রেনে, যেখান থেকে অদ্ভুত শব্দ আসে, যে ভাষায় সে কথা বলে সে ভাষায় নয়, অনেকটা গোঙানি বা কান্নার মতো।


ঘোড়া ও আরোহী


একসময়ে একটি ঘোড়া এবং তার ওপর একজন আরোহী ছিল। শরতের সূর্যালোকে কতো সুদর্শন তারা, একটি অদ্ভুত নগরীর নিকটবর্তী হয়! লোকেরা রাজপথে ভিড় করেছিল বা উঁচু জানালা থেকে ডেকেছিল। বৃদ্ধা মহিলাগণ ফুলের টবের মাঝখানে বসেছিলেন। কিন্তু আপনি যখন অন্য ঘোড়া বা অন্য আরোহীর সন্ধান করেছিলেন, আপনাকে ব্যর্থ মনে হয়েছিল। আমার বন্ধু, প্রাণীটি বলেছিল, আমাকে কেন পরিত্যাগ করো না? একাকী, তুমি এখানে তোমার পথ খুঁজে নিতে পারো। কিন্তু তোমাকে পরিত্যাগ করা, অন্যজন বলেছিল, আমার নিজের একটি অংশকে পেছনে ফেলে দেওয়া, এবং আমি কীভাবে তা করব যখন জানি না তুমি কোন অংশ?

 


কথাসাহিত্যের কর্ম


আমি শেষ পৃষ্ঠা ওলটানোর সাথে সাথে, অনেকগুলো রাতের পর, দুঃখের একটি তরঙ্গ আমাকে আচ্ছন্ন করল। কোথায় গিয়েছিল তারা সকলে, এই লোকেরা যাদের বাস্তব বলে মনে হয়েছিল? নিজের মনোযোগ ভিন্নমুখী করবার জন্য, আমি রাতে বেরিয়ে পড়লাম; সহজাতভাবে, আমি একটি সিগ্রেট জ্বালালাম। উত্তরজীবীর জ্বালানো আগুনের মতো, অন্ধকারে সিগ্রেট দীপ্যমান হলো। কিন্তু এ আলো কে দেখবে, অনন্ত নক্ষত্রের ভেতর এ ক্ষুদ্র বিন্দু? আমি কিছুক্ষণ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকলাম, সিগ্রেট দীপ্যমান হতে হতে ক্ষুদ্র, প্রতিটি শ্বাস ধৈর্যসহকারে আমাকে ধ্বংস করছে। কতো ক্ষুদ্র ছিল এটি, কতো ক্ষণিক। ক্ষণিক, ক্ষণিক, তবে আমার ভেতরে এখন, নক্ষত্ররা যা কখনো হতে পারে না।


নিষিদ্ধ সংগীত


অর্কেস্ট্রা কিছু সময়ের জন্য বাজানোর পরে, এবং আন্ডান্টে, স্ক্যাটসো, পোকো অ্যাডাজিয়ো পেরিয়ে যাওয়ার পরে, এবং আগামীকাল অবধি তার প্রয়োজন হবে না হেতু প্রথম ফ্লুট-বাদক স্ট্যান্ডে মাথা রাখবার পরে নিষিদ্ধ সংগীত বলে বিবেচিত সংগীতাংশ এলো কারণ সুরকার সুনির্দিষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, এটি বাজানো যাবে না। এবং তবুও এটি অবশ্যই বিদ্যমান এবং এটিকে অগ্রাহ্য করা হবে, বাদ্যপরিচালকের সুবিবেচনায় রয়েছে একটি বিরতি। তবে আজ রাতে বাদ্যপরিচালক সিদ্ধান্ত নেন, এটি বাজানো হবে⎼ তার রয়েছে সুনামের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। ফ্লুট-বাদক চমক নিয়ে জাগেন। তার কানে কিছু ঘটেছে, এমন কিছু যা আগে কখনও অনুভব করেননি। তার ঘুম শেষ। আমি এখন কোথায়, তিনি ভাবেন। এবং তারপর নিজের বিছানার পরিবর্তে মেঝেতে শায়িত কোনো বৃদ্ধ লোকের মতো তিনি পুনরাবৃত্তি করলেন। আমি এখন কোথায়?


খোলা জানালা


একজন প্রবীণ লেখক তার গল্প শুরুর আগে একটি কাগজের টুকরোতে শেষ শব্দটি লেখার অভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন, তার পরে তিনি পৃষ্ঠার গাদা সংগ্রহ করতেন, শীতের সংক্ষিপ্ত দিবালোকে পাতলা এবং তুলনামূলকভাবে পুরো ছিল গ্রীষ্মে যখন তার চিন্তাভাবনা যুবকের চিন্তার মতো আবার বল্গাহীন, ধারণাদীপ্ত ও বিস্তারশীল হতো। তাদের সংখ্যাকে অগ্রাহ্য করে, তিনি ফাঁকা পৃষ্ঠাগুলোকে শেষের দিকে রাখতেন, এভাবে এটিকে দুর্বোধ্য করে তুলতেন। তবেই গল্পটি আসত তার কাছে, শীতে বিশুদ্ধ ও পরিমার্জিত, গ্রীষ্মে অধিকতর অবারিত। এ সকল পন্থায় তিনি স্বীকৃত গুরু হয়ে উঠেছিলেন।

তিনি দেওয়ালঘড়িহীন একটি কক্ষে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতেন, দিনের সমাপ্তি জানাতে আলোর ওপর আস্থা রাখতেন। গ্রীষ্মে তিনি জানালা খোলা রাখতে পছন্দ করতেন। তাহলে কীভাবে, গ্রীষ্মে শীতের বাতাস কক্ষে প্রবেশ করেছিল? আপনি ঠিক বলেছেন, তিনি বাতাসকে লক্ষ্য করে চিৎকার করলেন, এটিরই অভাব রয়েছে আমার, এ বিচারক্ষমতা ও আকস্মিকতা, এ বিস্ময়⎻ ওঃ, আমি যদি এটি করতে পারতাম তাহলে দেবতা হতাম! এবং তিনি পাঠকক্ষের শীতল মেঝেতে শুয়ে পৃষ্ঠাগুলোয় আন্দোলনসঞ্চারী বাতাস পর্যবেক্ষণ করতেন, লিখিত ও অলিখিতকে মিশ্রিত রাখতেন, তাদের মধ্যে সমাপ্তি।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

গৌরাঙ্গ মোহান্ত অ্যামেরিকান কবি রবার্ট ফ্রস্টের কবিতায় চিত্রকল্প ও প্রতীকের প্রয়োগ সম্পর্কে গবেষণা করে পিএইচডি অর্জন করেন। তাঁর দশটি গ্রন্থের ভেতর ‘Robert Frost : A Critical Study in Major Images and Symbols’ (2009), ‘প্রমগ্ন কবিতাবলি’ (২০১৭, ২০১৮), ‘A Green Dove in Silence : Forty Prose Poems in Translation’ (2018, 2019), ‘ঝলকে ওঠা স্বপ্নডাঙা’ (২০১৬) উল্লেখযোগ্য। দিল্লিস্থ রুব্রিক পাবলিশিং A Green Dove in Silence এবং এর হিন্দি অনুবাদ ‘এক হরা ফাখতা মৌন-সা’ (২০১৮) প্রকাশ করে। গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতা অন্যান্য পত্রিকার সাথে লন্ডনের Poetry Out Loud পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। তাঁর প্রকল্প পরিচালনা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ঢাকা ট্রানস্লেশন ফেস্টিভ্যালের তিনি একজন উদ্যোক্তা।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।