সোমবার, ডিসেম্বর ৫

শূন্যের ভেতর শূন্য : নাহিদ ধ্রুব

0

Eid Motifপাখিদের সাথে মিশে শিশুরা শিখেছে ভাষা, এখানে আকাশ হিম, এমনই হয়ে এসেছে চিরকাল। এখানে কারও কোনো নাম নেই, হোক সে পুরুষ কী নারী। নিজেদের তারা ডাকে বিষাদের সুরে, গান তাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে, আর যারা বোবা তাদেরকে করে দেওয়া হয় একঘরে। বেবিলন কিংবা রোমের গল্প এই অঞ্চলে কেউ শোনেনি কখনও। তবু, এখানে গল্প আছে। কোনো এক বোধিবৃক্ষের নিচে একদল মানুষ বসে থাকে গল্প শোনার আশায়। হয়তো তখন বৃষ্টিদিন, পৃথিবীর মানুষ যেসব গল্পকে বলে আষাঢ়ে গল্প, ওঁরাও হয়তো তেমন কিছু বলে কিংবা ওঁরা বলে ওদের জীবনের গল্প যা আমার কাছে মনে হয় রূপকথা।

অরণ্যে গিয়ে শান্তি পাব এমন সম্ভাবনা না থাকলেও, বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক’ আমার খুব প্রিয় উপন্যাস হওয়ার কারণে, আমি শেষ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম অরণ্যকে। কিন্তু, সেখানে গিয়ে দেখলাম, আমার আগেই ঐ অরণ্য দখল করে নিয়েছে একদল বিপদগামী যুবক। আমি ওদেরকে চিনতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়, ওরা ছিল আমার সহপাঠী, ওরা ছাত্ররাজনীতি করত।

এখানে আমার আসার গল্প বড়ো অদ্ভুত। ব্যক্তিগত যাতনা কিংবা স্কেপ রুট খোঁজার তাড়নায় আমি হয়তো কোনো একদিন ‘ইনটু দ্যা ওয়াইলড’ সিনেমার মতো ছুটে গিয়েছিলাম গহীন অরণ্যের কাছে। এমনই এক অরণ্য, যেখানে মরুভূমির মাঝে স্নো ফল হয়। নক্ষত্র পুড়ে যায়, এমনই এক নিষ্ঠুর পৃথিবীতে ছিল আমার বাস। অরণ্যে গিয়ে শান্তি পাব এমন সম্ভাবনা না থাকলেও, বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক’ আমার খুব প্রিয় উপন্যাস হওয়ার কারণে, আমি শেষ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম অরণ্যকে। কিন্তু, সেখানে গিয়ে দেখলাম, আমার আগেই ঐ অরণ্য দখল করে নিয়েছে একদল বিপদগামী যুবক। আমি ওদেরকে চিনতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়, ওরা ছিল আমার সহপাঠী, ওরা ছাত্ররাজনীতি করত। যখন ভাবছি বনের কাছে ক্যাম্প ফেলে আমি করব ঘাই হরিণীর অপেক্ষা, তখন দেখলাম ওরা ব্যক্তিগত স্বার্থে কেটে ফেলছে সমস্ত গাছ। ভিখিরির মতো সমস্ত জীবন পার করে যখন এসেছি সন্ত হওয়ার আশায়, তখন এসব দেখলে কার ভালো লাগে? তাই হয়তো দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষের মতো আমিও করেছিলাম প্রতিবাদ। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। ওরা পিছু নিলো আমার আর আমি ছুটতে ছুটতে, এ বন থেকে ও বনে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ক্লান্তিতে। তারপর, গ্রেগর সামসার মতো ঘুম থেকে উঠে আমি নিজেকে আবিষ্কার করেছি এই অঞ্চলে। না, আমি পোকা হয়ে যাইনি, জলে নিজের মুখ দেখে নিশ্চিত হয়েছি, যেমন ছিলাম তেমনই আছি। তবু হিসেব মেলে না, কি করে এলাম এই অঞ্চলে কে জানে! অবশ্য, এমনও হতে পারে, এই অঞ্চল এখানেই ছিল চিরকাল, পৃথিবীর মতো ব্ল্যাক হোল থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে, অরণ্যের মাঝে ওঁরা বেঁচেছিল। যদিও ওঁরা আদিবাসী নয়, শিকারের জন্য ওঁরা বাঁচে না, বরং ওঁরা বেঁচে আছে রূপকথার জন্য।

আমার এই আগমন যেন খুব প্রত্যাশিত ছিল, ওদের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয়, আমি ছাড়া আরও বহু মানুষ এসেছে এই জনপদে। ওঁরা আমাকে গ্রহণ করল হাসিমুখে। যেহেতু ওঁরা পাখিদের ভাষায় কথা বলে, তাই কিং সোলেমান না হওয়ার বেদনা আমাকে আক্রান্ত করল। কিছুতেই করা গেল না, ওঁদের সাথে যোগাযোগ।

এখানে আসার পর, ওঁরা আমাকে মেরে ফেলতে পারত, আঘাত করতে পারত আমার পরিচয় জানার জন্য; কিংবা ওদের বিজ্ঞানীরা আমাকে নিয়ে করতে পারত গবেষণা, যদিও এমন কিছুই ঘটে না। আমার এই আগমন যেন খুব প্রত্যাশিত ছিল, ওদের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয়, আমি ছাড়া আরও বহু মানুষ এসেছে এই জনপদে। ওঁরা আমাকে গ্রহণ করল হাসিমুখে। যেহেতু ওঁরা পাখিদের ভাষায় কথা বলে, তাই কিং সোলেমান না হওয়ার বেদনা আমাকে আক্রান্ত করল। কিছুতেই করা গেল না, ওঁদের সাথে যোগাযোগ। তবু ক্ষুধাহীন এই অঞ্চলে, দিন একরকম আনন্দেই কেটে যাচ্ছিল, যেভাবে দিন চলে যায়।

তবে এখানেও আছে একজন দৈত্য। বোধিবৃক্ষের নিচে বসে জেনেছি তাঁর ইতিহাস। ঐ দৈত্য নদীর অপর প্রান্তে থাকে। সে বড়ো একা। যখন তাঁর তৃষ্ণা পায়, তখন নদীতে ভাটা আসে আর যখন সে একাকীত্বের বেদনায় কাঁদে, তখন আসে জোয়ার। এইসবের সাথে এই অঞ্চলের লোকজন মানিয়ে নিয়েছে ভালোই, বিপত্তি ঘটে যখন দৈত্য রেগে যায় তখন। দৈত্যের রাগের সাথে আসে তুফান। সে এমন তুফান, বাস্তবতা বদলে যায় এক লহমায়। কতো গাছ ভেঙে পড়ে, কতো পাখি মরে যায়। শুধুই কী তাই? এসব পাখির মৃত্যুর সাথে সাথে অনেকেই বোবা হয়ে যায়। আর এই অঞ্চলের তো এই একটাই নিষ্ঠুরতা, বোবাকে করে দেওয়া হয় একঘরে! তাই ওঁরা দৈত্যকে ভয় পায় আর তার তুষ্টির জন্য প্রার্থনা করে অপেরার সুরে। কিন্তু, মাঝেমধ্যেই দৈত্য কাঁদতে কাঁদতে রেগে যায়, আবার বোবা, আবার এক ঘরে।

কোনো এক ঝড়ের পর, একঘরে হয়ে যাওয়া এমন কারও খোঁজ নিতে যখনই গিয়েছি পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু গুহায় তখনই আবিষ্কার করেছি অদ্ভুত এক সত্য। এ এমন এক সত্য, যা খুব সহজেই বদলে দিতে পারে বাস্তবতা। মশারির মতো মাকড়শার জাল, স্যাঁতস্যাঁতে নীরবতা আর লাখ লাখ বাদুড়ের আর্তনাদ দেখে বোঝা যায়, এ গুহায় কেউ নেই, কেউ ছিল না কোনোদিন। তবে, এতো এতো বোবা হয়ে যাওয়া মানুষকে নিয়ে ওঁরা কী করে? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে দেখা গেল, গুহা থেকে দূরে পড়ে আছে কিছু হাড়, মনে মনে ভাবি, তবে কী বলি দেওয়া হলো একঘরে মানুষটাকে? বহুদিন পর ফিরে আসে সেইসব অনুভূতি যাকে পৃথিবীর মানুষেরা বলে ক্রোধ। আমি ছুটে যাই এই অঞ্চলের প্রবীণ মানুষদের কাছে। কিছুই বলি না, তবু ওঁরা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝে ফেলে আমার বেদনা। তারপর, আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় অন্য একটি গুহায়।

শূন্যের ভেতর শূন্য হতে হতে এই অঞ্চলের মানুষেরা আজ এখানে এসে দাঁড়িয়েছে, প্রবীণরা যেন আকার ইঙ্গিতে বোঝাতে চাইল এইসব। তখনও বুঝিনি পুরোপুরি তাই হয়তো ওঁরা ওঁদের শেষ ম্যাজিক স্পেলটা ব্যবহার করল, আর আমি একটা ভেঙে যাওয়া আয়নার মধ্যে দেখতে পেলাম এই অঞ্চলের ইতিহাস।

এ গুহায় ঢুঁকে প্রথমেই মনে হয়, একদিন প্রেম এসেছিল এই গুহার বুকে। কেউ একজন ঝরনার কাছে বসে বাজিয়েছিল বাঁশি। তখন হয়তো এই অঞ্চলের মানুষেরা ছিল পৃথিবীর মানুষের মতো। ভাষা ছিল স্প্যানিশ, ফ্রেন্স, বাংলা কিংবা ইংরেজি। শূন্যের ভেতর শূন্য হতে হতে এই অঞ্চলের মানুষেরা আজ এখানে এসে দাঁড়িয়েছে, প্রবীণরা যেন আকার ইঙ্গিতে বোঝাতে চাইল এইসব। তখনও বুঝিনি পুরোপুরি তাই হয়তো ওঁরা ওঁদের শেষ ম্যাজিক স্পেলটা ব্যবহার করল, আর আমি একটা ভেঙে যাওয়া আয়নার মধ্যে দেখতে পেলাম এই অঞ্চলের ইতিহাস।

এই অঞ্চলের ইতিহাস দেখতে দেখতে মনে হলো, এ যেন মানুষের চেনা পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি। যেখানে একদিন যুদ্ধ হয়েছিল ছায়া ও প্রতিচ্ছায়ার মাঝে; আর ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এই অঞ্চলের সমস্ত স্থাপনা; প্রেম, আনন্দ বেদনার কাব্য। কিছু মানুষ তখনও বেঁচে ছিল, যারা পরবর্তীতে ছায়াকে পোষ মানিয়েছে অনুভূতি দিয়ে। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল তাদের ভাষা। তখন পাখিদের দল তাদের দিয়েছিল বর আর সেই থেকে তারা কথা বলে পাখিদের ভাষায়। কিন্তু, এই বর দেওয়ার মাঝেও ছিল একটি অনাকাঙ্ক্ষিত শর্ত। যদি, কোনো পাখি মরে যায় অনাহারে, অনাদরে, ঝড়ে কিংবা অন্য কোনো অজুহাতে তাহলে তারাও হয়ে যাবে বোবা এবং বোবা হয়ে যাওয়া মানুষদের রেখে আসতে হবে পাহাড়ে। তারা ঠিক তাই করে। পাহাড়ে বোবা হয়ে যাওয়া মানুষদের রেখে আসার পর, ঠিক কী হয় তাদের সাথে, কেউ জানে না। শুধু মাঝেমধ্যে ওখানে কেউ গেলে দেখতে পায় পড়ে আছে স্তুপ স্তুপ কঙ্কাল।

সমস্ত ইতিহাস দেখা হয়ে গেলে, প্রবীণেরা তাকায় আমার দিকে। তখন আমি কিছু কিছু বুঝতে শিখেছি ওঁদের ভাষা। ওঁরা আমাকে মুখাভিনয় করে, পাখির দেওয়া স্বরে বলে, ওঁরা বহুদিন ধরে অপেক্ষায় ছিল পৃথিবী কিংবা অন্য কোথাও থেকে আসা কোনো এক প্রাণি কিংবা মানুষের জন্য, যে তাদের পথ দেখাবে। ওঁরা বলে, ওঁরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত কিন্তু কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না যুদ্ধটা করবে কার বিরুদ্ধে, পাখি নাকি দৈত্যের? আমি কোনো উত্তর দিতে পারি না। বরং আমার মনে হয়, আমাকে আবারও খুঁজতে হবে কোনো এক অরণ্য। মনে পড়ে যায় ‘ইনটু দ্যা ওয়াইলড’ সিনেমার কথা। আমি একা একা হেঁটে যাই ঐ পাহাড়ের দিকে আর মনে মনে বলি, তোমরা যাকে দৈত্য ভাবছ, সে হয়তো পাখি আর যাকে পাখি ভাবছ সে-ই হয়তো দৈত্য।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ২ ডিসেম্বর, ১৯৯১; বরিশাল। গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় স্নাতক। পেশায় সাংবাদিক। প্রকাশিত বই : মৃত্যুর মতো বানোয়াট  [কবিতা; ২০১৭] থাকে শুধু আলেয়া  [কবিতা;২০১৯], হিম বাতাসের জীবন  [গল্প ;২০২০], উদাসীনতা, সঙ্গে থেকো; [উপন্যাস; ২০২১] ই-মেইল : dhrubonahid@gmail.com

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।