শুক্রবার, অক্টোবর ২২

শেহেরজাদ থেকে মার্কেস, জাদুবাস্তবতার নিশাচরেরা

0

আরব্য রজনীর শেহেরজাদিকে তাড়া করত জমজ দুটি ভয়, গল্পহীনতা আর মৃত্যু। যখন তোমার গল্প বলা শেষ, তখন তুমি মরে যাবে। তুমি মরে গেলে এই গল্প আর কেউ জানবে না। মার্কেস হলেন শেহেরজাদের হাজার আফসানার রাত বা হাজার মিথে ভরা গল্পের নিশিযাপনের সময়ে জন্মানো চতুর্থ শিশু, যার ডাক নাম গাবো।

আরব্য রজনীর শেহেরজাদিকে তাড়িত করেছিল দুটি ভয়: তার গল্প আর তার মৃত্যুর ভয়। এই ভয়ের জন্ম ভালোবাসায়। বাদশাহ শাহরিয়ারের নারী-বাসনার শিকার কুমারী নারীদের প্রতি ভালোবাসা, রাত শেষেই অবিশ্বস্ততার ভয়ে যাকে হত্যা করা হবে; সেই অনাগত নারীর প্রতি শেহেরজাদির ভালোবাসা। বাদশাহর শয্যায় প্রতি রাতে একজন করে কুমারীকে পাঠাতে ব্যর্থ হলে যার প্রাণ যাবে, সেই শেহেরজাদির উজির পিতার প্রতি ভালোবাসা। এবং শেষ পর্যন্ত স্বয়ং বাদশাহকে তার বাসনার বিষ থেকে বাঁচানোর ভালোবাসা। মৃত্যুর বিরুদ্ধে, বিস্মরণের বিরুদ্ধে, নিয়তির বিরুদ্ধে যা আমাদের জীইয়ে রাখে, তা তো এই ভালোবাসাই। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস গল্প বলেন এই মৃত্যুর বিরুদ্ধে, দুর্মর ভালোবাসার টানে এবং মাকোন্দো জনপদকে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে। গাবো তাই আমাদের আজকের বিধ্বস্ত বাস্তবতায় মৃত্যুর বিরুদ্ধে জীবনের, ঘৃণার বিরুদ্ধে ভালোবাসার আর বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতি-জননের পয়গম্বরদের মধ্যেকার এক বিদায়ী জন।

শেহেরজাদির দুটি ভয়ের গোড়া আসলে এক জায়গায়: যখন গল্প ফুরাবে তখনই তোমার মৃত্যু আসবে অথবা মৃত্যু আসবে তখনই যখন গল্পটা তোমার ফুরাবে। আমরা যে মরে যাইনি আজও, তার কারণ এখনও গল্পের জন্ম হয়, এখনও দৃশ্যের জন্ম হয়। শেহেরজাদি তাই এমন গল্প শুরু করে যার শেষ নাই, যার প্রতিটি বাঁকে নতুন নতুন গল্পের নহর খুলে যায়। ভাষা যেমন অনন্ত সম্ভাবনাময়, শেহেরজাদির গল্পও তেমনি এক হাজারের পরেও আরও একটির সম্ভাবনা ফলিয়ে প্রমাণ করে, কাহিনিও অনন্ত অফুরান। বিশ্বের সম্ভাব্য সব গল্প যিনি জানেন, সেই আদি বুড়ো কথকের কথা কি তোমরা শোনোনি? তার মূল গল্পটাই তো ঢং আর রং বদলে বলে যাচ্ছে বিশ্বের তাবৎ কাহিনিকার। প্রণাম সেই মাতা শেহেরজাদিকে, প্রণাম প্রপিতামহ আদি কথককে।

কাহিনিকার যেমন মায়াতুর তেমনি নিষ্ঠুর। এক হাজার একের ‘অনন্ত’ রাত্রি শেষ হলে সে শোধ নেয়। মোহ আর জাদুর পর্দা সরিয়ে বাদশাহকে মুখোমুখি করে বাস্তবতার। বলে, ‘দ্যাখো বাদশাহ, এই তিন বছরে তোমার ঔরসে আমার গর্ভে জন্মেছে তিন সন্তান। সেই সন্তানদের দিকে তাকিয়ে বাদশাহর হুশ ফেরে, অনুতাপ জাগে মনে। গল্পের জাদু এভাবে আমাদের ফিরিয়ে দেয় সেই বাস্তবে, নিজের অন্তরাত্মার মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা ভয়ার্ত ‘আমি’র কাছে। হৃদয়ে জলোচ্ছ্বাসের মতো ভালোবাসায় যেভাবে মার্কেসের ‘অব লাভ অ্যান্ড আদার ডেমনসের’ যুবক যাজক দেলাউরা নিজেকে আবিষ্কার করে, যেভাবে ‘লাভ ইন দা টাইম অব কলেরা’য় বৃদ্ধ ফ্লোরেন্টিনো অ্যারাইজা মড়কে মৃত লাশের নদীতে আবিষ্কার করে যে, আজীবন নারীর কাছে সে কী চেয়েছে আসলে, তেমনি বাদশাহ শাহরিয়ার হুশ ফিরে আবিষ্কার করে তার প্রাণের শেহেরজাদিকে।

উপন্যাস একদিকে যেমন ইতিহাসের সমান্তরাল, তেমনি উপন্যাসে আখ্যানের বিবর্তনের মধ্যেও ওই উপন্যাস-মণ্ডলের কিছু নিয়ম পাওয়া যায় যা ইতিহাসের ধারার বাইরে বিরাজ করে। রুশ উপন্যাস-তাত্ত্বিক মিখাইল বাখতিন এই নিয়মের সন্ধান করেছেন ইউরোপীয় উপন্যাসের বেলায়। বাংলা ভাষার বেলায় এই কাজ এখনও অসাধিত।

অনিবার্য পতন বা মৃত্যুর সমুখে কী চাই আমরা? সময়বোমা বিষ্ফোরিত হবার ঠিক আগের মুহূর্তে কিংবা উঁচু পর্বত থেকে পতনের রূদ্ধশ্বাস গতিপথের শেষে, যখন কোথাও কোনো আশা নাই, তখনও একটি অলৌকিকের, একটি জাদুকরী উদ্ধারের আশাই কেবল জেগে থাকে। বাস্তব যতই করুণ ও কঠিন ততই অবাস্তবের ম্যাজিকাল আবির্ভাবের চাওয়া দানা বাঁধে। এই আশা শেহেরজাদিকে বাঁচিয়েছিল, তার সেই তিন সন্তানও সেই আশারই আবাদ করে যাচ্ছে মানুষের মনোভূমে। শেহেরজাদির হারিয়ে যাওয়া সেই তিন সন্তানের এক সন্তান হলো আমাদের গাবো-গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। কেননা জগতের সব কাহিনিকারই শেহেরজাদের সন্তান। তাদের মনেও গল্প হারিয়ে ফেলার, ফুরিয়ে ফেলার মৃত্যুসমান ভয়। তাই তারা উদ্ভাবন করে যায়, বানিয়ে চলে, শুনিয়ে যায় নতুন নতুন এক হাজার এক রাত্রির গল্প। উপন্যাসতাত্ত্বিক গিয়র্গ লুকাচ থেকে শুরু করে ওয়েন্ডি বি. ফারিস তাই বলেন, ‘মৃত্যুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে আজকের গল্পকারের প্রয়োজন হলো জাদুর।’ এই মৃত্যু যেমন লেখকের, তার জৈবিক প্রজাতির এবং তার সৃষ্টির। প্রলয়ের ভবিষ্যদ্বাণীর পাশাপাশি তাই আমরা স্প্যানিশ নন্দনতাত্ত্বি হোসে ওর্তেগা ই-গাসেত থেকে শুরু করে জার্মান দার্শনিক ওয়াল্টার বেনিয়ামিনসহ অনেক পণ্ডিতকেই উপন্যাসের মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করতে শুনি।

উপন্যাসের এই পূর্বঘোষিত মৃত্যুর বিরুদ্ধেও লড়তে হয় শেহেরজাদির উত্তরাধুনিক সন্তানদের। অন্যদিকে, বাস্তবে ১৯৮৫ সালে মার্কেসের লেখা ‘চিলিতে গুপ্তাভিযান’ লেখার জন্য সেই বইয়ের ১৪,৮৪৬ টি কপি পুড়িয়ে দেয় দেশটির স্বৈরশাসক। মার্কেসকে স্বদেশে চলাফেরা করতে হয় বুলেটপ্রুফ গাড়িতে, যুগে যুগে আসন্ন মৃত্যুর মুখে লেখককে তাড়িত করে অমরত্বের বাসনা। এজন্যই তাদের উদ্ভাবন করতে হয় বাস্তবতা থেকে সমান্তরালের মায়াভূমির মায়াবী লিখন (ম্যাজিকাল রিয়েলিজম)। বাস্তবতার পেট থেকে এখানে জন্মায় জাদু, জাদুর ঘোরে আপনি তখন আবিষ্কার করেন ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’র কর্নেলের অন্তিম উপলব্ধি যে, সব শেষ হয়ে গেলে কী খেয়ে বাঁচব আমরা আমাদেরই মল ছাড়া?

এই বাস্তবে আপনাকে বিশ্বাস করতেই হবে। মার্কেসের যুক্তিটা খুবই সরল, ‘ওরা যদি বাইবেলে বিশ্বাস করে, তাহলে আমার গল্প বিশ্বাস না করার কোনো কারণ থাকতে পারে না’। তাই স্প্যানিশ বিশ্বে বাইবেলের পরে সবচেয়ে বেশি বিক্রিত গ্রন্থের নাম ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিট্যুড’। এবং সকল স্প্যানিশ বেশ্যাদের ঘরে বাইবেলের পাশাপাশি শোভা পায় মার্কেসের ‘আমার বিষণ্ন বেশ্যা’ বইটি।

 

২.
এই গল্প জগতের লাঞ্ছিত ও ভাগ্যহতদের গল্প। যখন শহরের সকল লোক সকল কিছু ভুলে যাচ্ছে, যখন জিপসি মেলাকিয়াদেসের নিয়ে আসা সংস্কৃত হরফে লেখা প্রাচীন পুঁথিটির পাঠোদ্ধার করতে করতে কর্নেল আউরিলিয়ানো বুয়েন্দিয়া বংশের শেষ সন্তান পৌঁছে যায় ওই জগতের ধ্বংসের ক্ষণে, যখন নিষিদ্ধ পাণ্ডুলিপি পড়বার দায়ে আশ্রম থেকে বহিষ্কৃত হয় তরুণ যাজক দেলাউরা, তখন লেখনী হয়ে ওঠে উপনিবেশিত ছন্নছাড়া লাতিন বিশ্বের একমাত্র অস্ত্র। কিন্তু কোথায় জন্ম এই লেখনীর?

আধুনিক জগৎ থেকে ক্লেশকর এক যাত্রার শেষে, আলেহো কার্পেন্তিয়েরের লোস পাসোস পারদিদোস (১৯৫৩) উপন্যাসের নায়ক সান্তা মনিকা ডে লা ভেনাদোসে পৌঁছে। আদেলান্তাদো সেখানে জঙ্গল কেটে কয়েকটি কুঁড়েঘরের একটি শহর পত্তন করেছে। অনামা সেই নায়ক মনে করে, কিংবা মনে করতে ভালোবাসে, এটাই সেই উপত্যকা যেখানে সময় থিতু হয়েছে; সময় আর এগোয় না যেখানে। কারণ, জায়গাটি ইতিহাসের খাতের বাইরে। তার ধারণা এখানেই সে নিজেকে ফিরে পাবে। তার ইচ্ছা হয় গ্রিক মহাকাব্য অডেসিকে ভিত্তি করে এক সাংগীতিক সৃষ্টিকর্ম রচনা করে। তাই নগরপত্তনিদারের কাছে কিছু কাগজ চায় সে। কিন্তু আদেলান্তাদোর কাছে যেটুকু আছে, তা তো নতুন শহরের আইন লিখতেই লেগে যাবে। তবু আরও একটি নোটবই তাকে দেওয়া হয়। এবং তড়িঘড়ি সেটিও ভরে যায়। বিরক্ত আদেলান্তাদো তাকে শেষ নোটখাতাটি দেয়। তখন চরিত্রটি বাধ্য হয় লেখার অক্ষর আরও ক্ষুদ্র আরও গুটিগুটি করে ফেলতে, প্রতিটি শূন্যস্থান কাজে লাগাতে। এমনকি নিজের জন্য একধরনের সাঁটলিপিও সে আবিষ্কার করে। কিন্তু তাতেও না কুলালে সে কেবলই লেখে আর মোছে। কেননা সামনে যাওয়ার কোনো পরিসর আর নাই। তাই লেখা, মোছা আর পুনর্লিখন প্রক্রিয়ায় তার পাণ্ডুলিপি মহাফেজখানার ‘রাখা’ ও ‘ফেলা’র (The economy of Loss and Gain) কসরত হয়ে ওঠে।

এভাবে কার্পেন্তিয়েরের হাতেই আধুনিক লাতিন আমেরিকার উপন্যাসের আদল কীভাবে দাঁড়িয়ে যায়। পরে, আমরা দেখব মার্কেস, ফুয়েন্তেস, য়োসার উপন্যাসে এ রকমই কিছু অসাধিত অসম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি ফিরে ফিরে আসছে। আর আসছে সভ্যতার আইন ও শাসনের বাইরে যাবার এক যাত্রা। মার্কেসের ‘শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা’ কিংবা শতবর্ষের নির্জনতা উপন্যাসেও দেখা যায় সভ্যতার পরদেশে, আইনের হাতের থেকে দূরে মাকেন্দো নামে এক গ্রাম প্রতিষ্ঠার গল্প। এই নতুন আরম্ভই যেন হয়ে ওঠে লাতিন আমেরিকার উপন্যাসের আদি আখ্যান।

তাই, আদি পাণ্ডুলিপির সমান্তরালে পাচ্ছি আদি যাত্রার বিবরণ। নদী, বন, পাহাড়ের ওপর দিয়ে। এবং আখ্যানগুলো যেন অসম্পূর্ণ। যেন পরের কেউ এসে তাকে এগিয়ে নেবে। আলেহো কার্পেন্তিয়েরের ‘এই মর্ত্যের রাজত্বে’, হুয়ান রুলফো’র ‘পেদ্রো পারামো’তে, মার্কেসের শতবর্ষের নিঃসঙ্গতাও যেন একই আখ্যানের লিখন, লেপন ও পুনর্লিখনের সাঁটলিপি। ভিন্ন ভিন্ন দেশ ও কালের মধ্যে একেকটি নতুন শুরু।

দক্ষিণ আমেরিকার উপন্যাসের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন ইয়েলের অধ্যাপক রবার্টো গঞ্জালেস এশেভারিয়া। তাঁর ভাষায় লোস পাসোস পারদিদোস (দ্য লস্ট স্টেপস) হলো সেই মহা আখ্যানের মহাফেজখানা। এ প্রক্রিয়ায় যা ঘটছে, এশেভারিয়া বলছেন,

If Carpentier’s novel is the founding archival fiction, Garcia Marquez’s is the archetypical one.

পাওয়া ও হারানো, আত্ম-আবিষ্কারের সফর, নতুন আরম্ভের মিথ আর সেই আদি অভিজ্ঞতানিচয় মিলে গঠন করে লাতিন আমেরিকার উপন্যাসের মণিমুকুর। উপন্যাসগুলো যেন লাতিন আমেরিকার নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতির কাঠামো খুঁজে ফেরার স্মৃতি। এবং অবশ্যই জীবনের নিজস্ব সংবেদ খুঁজে পাওয়ার প্রয়াস। নোবেল পুরস্কার নেওয়ার সময়ে দেওয়া ভাষণে মার্কেস সেভাবেই বলেন,

‘ঐ লাগামছাড়া বাস্তবতার সৃষ্ট সব জীব আমরা; কবি ও ভিখিরি, সুরকার ও দিব্যজ্ঞানী, যোদ্ধা ও দুর্বৃত্ত— কল্পনাশক্তির কাছে আমাদের খুব একটা চাইতে হয়নি, কেননা আমাদের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা ছিল এমন এক পদ্ধতি বা উপায় খুঁজে বের করা, যা দিয়ে আমাদের জীবনকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়। বন্ধুগণ, আমাদের নিঃনঙ্গতার আসল মানে এটাই’। (অনুবাদ: শিবাজী বন্দোপাধ্যায়)

পেয়ারার সুবাসে তিনি বলেন, ‘আমি আবিষ্কার করি যে সত্যই সাহিত্যিকতত্ত্ব হিসেবে প্রতিভাত হয়। আমরা যারা উপন্যাস লিখি তারা এই তথ্যটি প্রায়ই বিস্মৃত হই… আমার উপন্যাসের এমন একটা লাইনও খুঁজে পাওয়া যাবে না যা বাস্তবতায় প্রোথিত নয়’।

আমাদের জোর এখানে উপন্যাস বা ন্যারাটিভের এই truth bearing power বা সত্যবহনের ক্ষমতার ওপর। এটাই তাকে সাহিত্যের বলয়ে অ-সাহিত্যের গুণসম্পন্ন করে তোলে। প্রচলিত নন্দনতত্ত্বে সত্য ও কল্পনা বৈরী, যেখানে সৌন্দর্য আর জ্ঞান দুই বিপরীত আকাশের সূর্য হয়ে জ্বলে। কিন্তু এই সত্যবহ-ক্ষমতা ছাড়া শিল্প হিসেবে উপন্যাস স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারে কি? বলা দরকার, এই সত্য ইতিহাস ও দর্শনের সত্য নয়, মানবীয় অভিজ্ঞতা এবং কল্পনার আধারকে অবলম্বন করে তা আসলে ইতিহাস ও দর্শনের কাঁধে ভর করে দাঁড়িয়ে তাদের ছাপিয়ে যায়। উপন্যাস বা শিল্পের এই ট্রুথ বিয়ারিং পাওয়ার জ্ঞানতাত্ত্বিক অবদান নয়, জ্ঞানের সীমাকে পেরিয়ে যাওয়ার বাসনা নিয়ে তা জন্মায়।

সাক্ষাৎকারে যেমন বলছেন মার্কেস, ‘ভালো উপন্যাসমাত্রই বাস্তবতার রূপান্তর… উপন্যাস সংকেতের মাধ্যমে, পৃথিবী সম্পর্কে এক ধরনের ধাঁধার মাধ্যমে বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে। উপন্যাসে যে-বাস্তবতা নিয়ে কাজ করছেন তা জীবনের বাস্তবতা থেকে ভিন্ন—যদিও তা জীবনের বাস্তবতায় গভীরভাবে প্রোথিত। স্বপ্ন সম্পর্কেও এই কথা প্রয়োজ্য।’

তাই উপন্যাস প্রায়শই সংস্কৃতির ইতিহাস ও দর্শনের সমান্তরাল হয়ে ওঠে। যেমন রুশ বা ফরাসি উপন্যাস, এমনকি বাংলা উপন্যাসও। ইতিহাসের সমর্থন, ভাষার কাঠামোয় ধৃত চিন্তার অবলম্বন ছাড়াও তাই কোনো বিশেষ ভাষার বিশেষ উপন্যাস-মণ্ডলকে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সমেত শনাক্ত করা সম্ভব। উপন্যাস একদিকে যেমন ইতিহাসের সমান্তরাল, তেমনি উপন্যাসে আখ্যানের বিবর্তনের মধ্যেও ওই উপন্যাস-মণ্ডলের কিছু নিয়ম পাওয়া যায় যা ইতিহাসের ধারার বাইরে বিরাজ করে। রুশ উপন্যাস-তাত্ত্বিক মিখাইল বাখতিন এই নিয়মের সন্ধান করেছেন ইউরোপীয় উপন্যাসের বেলায়। বাংলা ভাষার বেলায় এই কাজ এখনও অসাধিত।

তাই,
Latin American novel must appear to be obsessed with Latin American history and myth.
(Myth and Archive: Echevaria)

 

৩.
কী এই লাগামছাড়া বাস্তবতার সৃষ্টিরহস্য? কোথায় এর শুরু? আমরা দেখছি লাতিন উপন্যাস এক ত্রিভূজের মধ্যে পড়ে গেছে। এর এক বাহু আইন, আরেক বাহু আর্কাইভ বা মহাফেজখানা, আর ভিত্তির বাহুটা হলো মিথ। হোসে মার্তি, কার্লোস ফুয়েন্তেস, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ছিলেন আইনের ছাত্র। মার্কেসের ‘একটি পূর্বঘোষিত মৃত্যুর দিনপঞ্জী’ উপন্যাসের কাহিনিসূত্র তিনি পান একটি খুনের মামলার ধারাভাষ্যে। মাকেন্দো গ্রাম প্রতিষ্ঠাকারী বুয়েন্দিয়াও আইনের হাত থেকেই পালাচ্ছিল। যে সারভান্তেসকে উপন্যাসের জনক বলা হয়, তিনি তাঁর বিখ্যাত ডন কিহোতে উপন্যাসের নায়কের আখ্যানটা পেয়েছিলেন মহাফেজখানায় পাওয়া এক বাক্স থেকে। তাতে ছিল এক পাগল বীরের ব্যবহার করা তরোয়াল, নাইটের পোশাক ইত্যাদি। ঔপনিবেশিক আর্কাইভ এবং আইনের দলিল-দস্তাবেজের মধ্যে পড়ে থাকা কাহিনিগুলি ছিল লাতিন উপন্যাসগুলির একটা উৎস।

কী এই লাগামছাড়া বাস্তবতার সৃষ্টিরহস্য? কোথায় এর শুরু? আমরা দেখছি লাতিন উপন্যাস এক ত্রিভূজের মধ্যে পড়ে গেছে। এর এক বাহু আইন, আরেক বাহু আর্কাইভ বা মহাফেজখানা, আর ভিত্তির বাহুটা হলো মিথ।

দ্বিতীয় উৎসের কথা মার্কেস বলছেন তাঁর নোবেল পুরস্কার ভাষণের শুরুর লাইনেই। সেটা হলো জলপথে পৃথিবী প্রদক্ষণকারী নাবিক ম্যাগেলানের সফরসঙ্গী আন্তনিও পিগাফেত্তার রচনায় বর্ণিত এক অদ্ভুত লাতিন আমেরিকার বিবরণ। ১৪৯২ সালে লিখিত ক্রিস্টোফার কলম্বাসের দিনপঞ্জিতে লেখা অদ্ভুত অভিজ্ঞতার বিবরণও জাদুবাস্তবতা নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে।  কার্পেন্তিয়েরের দুইবার ভেনেজুয়েলা ভ্রমণের ফল ছিল তাঁর ‘দি লস্ট স্টেপস’ উপন্যাস। মার্কেস বলছেন, ‘ইনডিসের বিবরণী লেখকেরা আমাদের জন্য অনেক কাহিনিই রেখে গেছেন। (আমাদের মনে পড়বে দেবেশ রায়ের তিস্তাপারের বৃত্তান্তে ভূমি দলিলের ব্যবহার কিংবা অমিয়ভূষণ মজুমদারের মধু সাধুখাঁ উপন্যাসে ইউরোপিয় পর্যটক র‌্যালফ ফিচের ভ্রমণবৃন্তান্তই শুধু না, স্বয়ং র‌্যালফ ফিচও সেখানে চরিত্র হিসেবে হাজির)। এছাড়া ছিল প্রথম যুগে নৃতত্ত্ববিদদের এথনোগ্রাফি। এসব থেকে বিখ্যাত কয়েকটি উপন্যাসের উপাদানই শুধু আসেনি, উল্টো লাতিন উপন্যাসিকেরা এইসব বয়ানকে একইসঙ্গে ব্যবহার ও চ্যালেঞ্জও করেছেন তাঁদের কাজের মধ্যে দিয়ে।

তৃতীয় উৎস হলো মিথ। মার্কেস তাঁর নানীর বলা গল্পের কথা স্বীকার করেছেন। স্বীকার করেছেন অটামন অব দি প্যাট্রিয়ার্কে ব্যবহার করা লোকশ্রুতি, প্রবাদ ও বুলির ব্যবহারের কথা। ১৯৬৬ সালে কিউবার জাতিতাত্ত্বিক অধিদপ্তর প্রকাশ করে বায়োগ্রাফিয়া ডি সিমারো নামের এক লোকগাথা। সেখানে পাওয়া যায় মন্তেজো নামে এক ফেরারি দাসের কথা। সে সর্বজ্ঞ, সর্বদেশভ্রমণকারী, সে এমনই নিঃসঙ্গ যে নিজেকে কারো কেউ মনে করে না। তার বয়ানে বর্ণিত হয় অজস্র গল্প। তার স্মৃতি হলো আদি মহাফেজখানা, তিনি যেন পুরানে বর্ণিত সেই আদি গল্পবুড়ো, দুনিয়ার তাবৎ গল্পের জনক আদি পিতামহ। এই মন্তোজোর বয়ানই কি শতবর্ষের নিঃসঙ্গতার জিপসি মেলকিয়াদেসের পাণ্ডুলিপি নয়?

এ তো গেল ইতিহাসের মহাফেজখানার বয়ান। লাতিন আমেরিকার সেরা ফিকশন শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা একারণেও যে, এখানে কাহিনির পরতে লুকিয়ে আছে তিনটি আর্কাইভ।

বুয়েন্দিয়াদের বিশাল বাড়িতে মেলকিয়াদিসের ঘরে বসে আছে বংশের শেষ সন্তান আইরেলিয়ানো বাবিলনিয়া। ওই পরিবারের কিংবা বলা যায় একটি জাতির একশ বছরের নিঃসঙ্গতার রহস্য যে পাণ্ডুলিপিতে গুপ্তভাষায় লেখা, তা উদ্ধার করতে সে সাহায্য নেয় শেহেরজাদের বলা এক হাজার এক রাত্রির গল্প আর এনসাইক্লোপিডিয়ার। বংশের আর্কাইভের দ্বার খুলতে ব্যবহার করা হয় গল্পের আর্কাইভ আর সভ্যতার আর্কাইভালো দুটি গ্রন্থকে।

এভাবে মিথ ও ইতিহাস উপন্যাসে সহাবস্থান করে একটি ভূখণ্ডের মানবসমাবেশকে আখ্যানের মধ্যে স্ফূট করে তোলে। যে জন্য তৈরি বাস্তব ও তার বন্ধনের যুক্তিকে অস্বীকার করতে হলে ফিরতে হয় সেই ইতিহাসের ‘অরিজিনালিটিতে’; পর্দায় ঢাকা মিথ ও লোকস্মৃতিকে সক্রিয় করে তোলার মাধ্যমে। তার জন্য দরবারি ইতিহাসের এক ধাপ পেছনে গিয়ে যেমন লুপ্ত সমাজ ও চেতনের অন্তর্যুক্তিকে ধরতে হয়, তেমনি মিথ ও প্রাকৃতিক অস্তিত্বসমূহকে শৈল্পিক অস্তিত্ব করে তোলার দরকার হয়। আর সেই অস্তিত্বের শীর্ষে থাকে সামাজিক গতিশীলতা এবং ঐতিহাসিক ও প্রজাতিগত স্মৃতি।

 

৪.
ইতিহাসতত্ত্বের প্রাথমিক উপাদান লাতিন ইতিহাসে তাই ‘আর্কাই’। আখ্যায়ন বা ‘কথা’ হলো সেই প্রাথমিক উপাদান, যা থেকে সৃজিত হবে ইতিহাস ও উপন্যাস উভয়েরই কল্পনা। ইতিহাস কাকে বলছি? ‘ইতি’ মানে পূর্বের, আর ‘হা’ অব্যয়, যার পরিবর্তন আর সম্ভব না এবং ‘অসিত’— ছিল। অর্থাৎ যা ছিল এবং যা আর পরিবর্তনীয় নয়। আর ছিল আইনের ভাষ্য। আমাদের মনে আছে যে, আইন ও আখ্যানের টানাটানি একই পরিসরের অধিকার নিয়ে, সেই পরিসর হলো সমাজ ও মানুষের জীবন। ফুয়েন্তেসের ভাষায়—

The Roman legalistic tradition is one of the strongest components in Latin American culture: from Cortes to Zapata, we only believe in what is written down and codified.
Carlos Fuentes/New York Book of review, 1986

কিন্তু এ কি সাহিত্যের প্রকৃতির বাইরে চলে যাওয়া নয়? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা আসব শেষে। লেখ্য জ্ঞান (আইন, দলিল, ভ্রমণবর্ণনা, নৃতত্ত্ব, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান), লোকস্মৃতি, কল্পনা ও মিথের বিন্যাস ছাড়া লাতিন উপন্যাসকে বোঝা ও ব্যাখ্যা করা কতটা সম্ভব?

কল্পনাকে ভাঙলে পাই কল্প+না। কল্প শব্দের অনেক ক’টি অর্থের দুটি হলো বেদান্ত গ্রন্থবিশেষ এবং প্রলয়। অর্থাৎ যা শাস্ত্রবিরোধী এবং যা প্রলয়বিরোধী। এই শাস্ত্র হলো ইউরোপীয় শুষ্ক যান্ত্রিক বাস্তববাদ। আর প্রলয় হলো, তাদের তৈরি করা বিধ্বস্ত মানবজমিন। অন্যদিকে কল্পন+আ মেনে নিলে কল্পনার অর্থ হয়: অবাস্তব। যে অবাস্তব, অমানবিক জীবনে আমরা কাফকার চরিত্রের মতো বন্দী, তাকে ভাংতে চায় সেই জাদুবাস্তব, যা আমাদের আমাদের সত্যিকার বাস্তবকে বোঝার জন্য সক্ষম করবে। শেহেরজাদের বাদশাহর মতো আমাদের ফেরাবে জীবনের সত্যিকার রূপ আর মোহের দিকে।

এখানে কল্পনা বলতে জাদুবাস্তবতার ধারার লেখকেরা খেয়ালখুশির ধাতকে দাম দিচ্ছেন না। মার্কেস বলছেন সাক্ষাৎকারে, ‘বুদ্ধিবৃত্তির ডুমুরপত্র বিদায় করা যায় তখনই যখন আপনি চরম নৈরাজ্য আর অযৌক্তিকতার পথ বাতিল করবেন। এই নৈরাজ্যময় অবস্থাই ফ্যান্টাসি…কল্পনা হচ্ছে বাস্তবতা প্রকাশের হাতিয়ার মাত্র।…বাস্তবতায় সম্পর্কহীন ফ্যান্টাসি, অনেকটা ওয়াল্ট ডিজনির সৃষ্টির মতো নিখুঁত এবং সরল ফ্যান্টাসি, সবচেয়ে ঘৃণ্যবস্তু।…বাচ্চারা ফ্যান্টাসি পছন্দ করে না। তারা পছন্দ করে কল্পনা। একজন মানুষ এবং কণ্ঠস্বর অনুকরণকারী তৈরি যন্ত্রের মধ্যে যে পার্থক্য, কল্পনা ও ফ্যান্টাসির পার্থক্যও একই।’

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে পজিটিভিজমের (দৃষ্টবাদ) ধার ক্ষয়ে এলে নতুন নৃতাত্ত্বিক ও দার্শনিক চিন্তার বিকাশ ঘটে। ইউরোপের দেখানো পথের বাইরেও স্বতন্ত্র গন্তব্য সম্ভব এমন প্রতীতি আসে। দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধ, মানবতার বিপুল ক্ষয় ও ক্ষতি, মানুষের ভেতরকার পাশবিকতার অলঙ্ঘনীয় আধিপত্য এনলাইটেনমেন্টের অনেক বিশ্বাস ও ধারণাকে নড়িয়ে দেয়। তখনই চোখ পড়ে অঞ্চল ও তার সমাজের ‘অযৌক্তিক’ উপাদানের দিকে।

৫.
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে পজিটিভিজমের (দৃষ্টবাদ) ধার ক্ষয়ে এলে নতুন নৃতাত্ত্বিক ও দার্শনিক চিন্তার বিকাশ ঘটে। ইউরোপের দেখানো পথের বাইরেও স্বতন্ত্র গন্তব্য সম্ভব এমন প্রতীতি আসে। দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধ, মানবতার বিপুল ক্ষয় ও ক্ষতি, মানুষের ভেতরকার পাশবিকতার অলঙ্ঘনীয় আধিপত্য এনলাইটেনমেন্টের অনেক বিশ্বাস ও ধারণাকে নড়িয়ে দেয়। তখনই চোখ পড়ে অঞ্চল ও তার সমাজের ‘অযৌক্তিক’ উপাদানের দিকে। উপন্যাসের ইউরোপীয় আদিপিতারা: বালজাক, গান্ডোস, ডিকেন্স, জোলারা যে অর্থে তাঁদের সময়ের সমাজতাত্ত্বিক ও তত্ত্ববিদ, সেই অর্থের শাসন পরিহার শুরু হয়। উপন্যাস তখন অ্যাপিয়ারেন্স থেকে এসেন্সের দিকে যাত্রা করে। শিল্পের সহায় হিসেবে কমজোরি হতে থাকে বাস্তববাদের একচ্ছত্র প্রাধান্য। আজ যাকে ম্যাজিক রিয়েলিজম বলা হচ্ছে, তা আসলে সেই উনিশ শতকীয় রিয়েলিজম ও ন্যাচারালিজমের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা।

ইউরোপে যখন এভাবে মোড় ফেরা হচ্ছে, ইউরোপের যা অপর, সেই উপনিবেশিত দেশগুলোর বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের ভাবজগতেও তখন পরিবর্তন আসতে থাকে। ঔপনিবেশিকতা বিরোধিতার সূত্র ধরে, নব্যপ্রাপ্ত স্বাধীনতার আত্মবিশ্বাসে, ইউরোপীয় আধুনিকতার গড়নে আত্মনির্মাণের প্রকল্পে আস্থা নড়ে যায়। খোঁজা শুরু হয় নিজস্ব অস্তিত্বের অবশিষ্ট উপকরণগুলো, যা তখনো শতবর্ষের নিঃসঙ্গতায়, ঔপনিবেশিক অধীনতায় বিলোপ পায়নি। উপন্যাসে বি-উপনিবেশীকৃত এক ‘আমি’র আবির্ভাব সূচিত করে এই ঘটনা।

লাতিন উপন্যাসের এই ‘আমি’ নায়কটি স্প্যানিশ উপনিবেশায়নের আগে ছিল কি না, সে তর্ক রেখে দিয়েও বলা যায়, জাতীয় চৈতন্য সন্ধান ও নির্মাণের জন্য লাতিন লেখকদের ভেবে নিতে হয়েছিল সেই আমি ‘আছে’ এবং তা সম্ভব। এবং তা টের পাওয়া যায় উপনিবেশায়িত ‘আমি’ যে প্রজা তার অস্তিত্বের দ্বান্দ্বিকতার মধ্যে। একদিকে সে তার অধীনস্থতা সম্পর্কে সচেতন আবার সে কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতারই অংশ।

লাতিন উপন্যাস দেখায়, ইউরোপীয় চোখে বর্ণিত সেখানকার মানুষ ও প্রকৃতি, ভাষা ও প্রাণপুঞ্জ বস্তুনিচয় নয় কেবল, তা সজাগ ও বিকাশশীল সত্তা। সেই সত্তার সন্ধানই হলো লাতিন উপন্যাসের ভিন্ন গন্তব্য। অনেকটা সভ্যতা আবিষ্কারের প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানের মতো রোমাঞ্চকর এই উদ্ভাসন। এই প্রক্রিয়ায় আবারও দেখা পাই লস এন্ড গেইন অব মেমরির। অতীতকে পুনর্ব্যাখ্যা ও পুনঃসৃজন করার মেহনতের। কেননা, অতীতের আখ্যানপুঞ্জ থেকেই ছন্নছাড়া আত্মপরিচয় জোড়া লাগাতে হয়। সংস্কৃতির ভেতর এই পরিচয়কে খুঁজে নিতে তাই দেখি, অনেকগুলো পরস্পর জোড়-লাগা আরম্ভ। বাস্তবতার প্রত্যক্ষতাকে, সাক্ষাৎ অভিজ্ঞতার সীমা-শাসন মোকাবিলা করে তার দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসার গতিসূত্র। কেননা, বস্তুগততা, সমাজতত্ত্ব ইত্যাদির ভার উপন্যাসের কল্পনাকে এতকাল সীমিতই করে রেখেছিল, এমন উপলব্ধির উন্মেষের মধ্যেই জাতীয় আখ্যান ও জাতীয় উপন্যাসের আভাস তৈরি হয়।

পাওয়া ও হারানো, আত্ম-আবিষ্কারের সফর, নতুন আরম্ভের মিথ আর সেই আদি অভিজ্ঞতানিচয় মিলে গঠন করে লাতিন আমেরিকার উপন্যাসের মণিমুকুর। উপন্যাসগুলো যেন লাতিন আমেরিকার নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতি কাঠমো খুঁজে ফেরা। এবং অবশ্যই জীবনের নিজস্ব সংবেদ খুঁজে পাওয়ার প্রয়াস। লেখা হয়ে ওঠে বর্তমানে যাপিত স্মৃতি (অ্যাক্টিভ মেমোরি)।

কিন্তু সেই স্মৃতি তো অবসাদের, পতনের, সম্ভাব্য বিলয়ের ভবিষ্যতের। হুয়ান রুলফোর ‘পেদ্রো পারামো’ থেকে শুরু করে মার্কেসের শেষতম উপন্যাস পর্যন্ত লাতিন উপন্যাসে ফিরে ফিরে আসে এক ফলিং ফিগার। শতবর্ষের কর্নেল আউরিলিয়ানো বুয়েন্দিয়া, ‘জেনারেল ইন হিজ ল্যাবিরিন্থে’র বৃদ্ধ জেনারেল সিমন বলিভার, ‘এভিল আওয়ার’র মেয়র প্রমুখ।

আদি পাণ্ডুলিপি, পতিত কৌমপিতা, নিজের লেজ গিলতে থাকা সাপের মতো সময় ও তার গোলকধাঁধা এবং মৃত্যুর বিরুদ্ধে ভালোবাসার এই মায়াবি ব্যকরণেই তাই মার্কেসকে বুঝতে চাই, বুঝতে চাই আমাদের সেই ঝড়বৃষ্টিতে কাদায় মুখ থুবড়ে পড়া বুড়ো দেবদূত গাবোকে। সেই বুড়ো তার তরুণী অপ্সরাকে নিয়ে এই মর্ত্যের রাজত্ব থেকে উড়াল দিয়ে কোথায় যে চলে যায়! আর আমাদের জন্য রেখে যায় মানবের শ্রেষ্ঠতম গুণ যা দিয়ে সে দেবতা ও শয়তানের চাইতে শ্রেষ্ঠ হয়ে ওঠে: সেই কল্পনা। কল্পনা শব্দের মধ্যেই জাদুবাস্তবতার রহস্য ভাংবার সূত্রটিও নিহিত।

 

৬.
দিনের শেষে, যে জগতের গিঁট ছিঁড়ে গেছে, যার মন থেকে মুছে গেছে দুর্ধর্ষ সব কল্পনা, যে হারিয়ে ফেলেছে স্বপ্নজননক্ষমতা, সেই জগতে মার্কেসের মতো কথাকারেরা ফিরিয়ে আনলেন পুরাণপ্রতিম কল্পনা। ফিরিয়ে আনলেন আদিম রিপুর দুর্মর বাসনা, বাস্তবতার কারাগার ভাংবার ডাকু স্ফূর্তি আর অ-যুক্তির কৌম উল্লাস। কিন্তু দখলদার পাশ্চাত্য আর তাদের সর্বগ্রাসী সময়ের বাহিরের সেইসব লাঞ্ছিত ইতিহাসের আর এগবার বা ফিরবার উপায় নেই যখন; তখন মুসা নবীর মতো হারানো মানুষকে নিজস্ব সময়ের খাতে আবার ফিরিয়ে আনবে কে? আবার চোখে কল্পনা ফিরিয়ে দেবে কে? কে জাগাবে পাপতাপের মর্ত্যের রাজত্ব? কে উপনিবেশিকতার অভিশাপে পতিত মানুষকে ফিরিয়ে দেবে তার বন্যসুন্দর আমিত্ব? সে কাহিনিকার, মিসগাইডেড অ্যাঞ্জেল, নিঃসঙ্গ ঈশ্বর, সে উপন্যাসিক। সে বিশাল ডানা নিয়ে ঝড়বৃষ্টিতে কাদায় মুখ থুবড়ে পড়া দেবদূত, অসম্ভবে বিশ্বাস করাবার জন্য অবতীর্ণ হয়ে আবার যে উড়াল দেবে আকাশে। কিংবা সে শতবর্ষের নিঃসঙ্গতার সুন্দরী রেমেদিউস যে বাতাসের সাথে বিছানার চাদরের ডানা উড়িয়ে চলে যাবে স্বর্গে শুধু আমাদের হৃদয়ে হারানো প্রেমের প্রতি মায়া জাগাবার জন্যই যেন, যেন আমরা বিশ্বাস করি বিশুদ্ধ প্রেম আছে পৃথিবীতে।

লুপ্ত স্মৃতির পুনর্লিখন হতে থাকে তখন উপন্যাসে। এভাবে লেখা হয়ে ওঠে যাপিত বর্তমান বা ইতিহাসের স্মৃতি। ধসে যায় দার্শনিক হেগেলের সেই দম্ভ যে প্রাচ্যের মন নাই ইতিহাস নাই আমিভাব নাই। তারা বিশ্বেতিহাসের অংশ বা উপাদান মাত্র। এই নতুন ‘আমি’র সার্বভৌম আবির্ভাব, নিজস্ব ‘ছিল’র সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রত্নতত্ত্ব খুঁড়ে বের করার মিশন যেন উপন্যাসেরও হয়ে ওঠার মিশন। গ্রিসে যেমন ইতিহাস ও দর্শন একাকার হয়ে গিয়েছিল মিলনে-সংঘাতে, লাতিন আমেরিকার সাহিত্য জগতে আইন ও আখ্যান তেমনই দোহে দোহের দোসর।

মার্কেস আমাদের আত্ম’র পুনরুদ্ধারের যুদ্ধের সেই বুড়ো কর্নেল, যিনি এক আশ্চর্য সাঁটলিপিতে আমাদের কাছে চিঠি লিখে যাচ্ছেন শতবর্ষের নিঃসঙ্গতার অবোধ্য সেই পার্চমেন্ট পুঁথি যেন, যাতে লেখা আছে আমাদের ধ্বংসের ইতিবৃত্ত।

আমরা দেখি, কত কত শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা ঘুঁচিয়ে তখন এশিয়া-আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার আপনভূমে জেগে ওঠে বিতাড়িতদের গ্রাম: মাকেন্দো, ময়নার দ্বীপ, তাৎমাটুলি, বাঁশবাদিয়া, চিকনডিহি, মালোপাড়া, কুরপালা, তিস্তাপার, কাতলাহারের বিল এবং দক্ষিণ মৈসুন্দি, ভুতের গলি। মার্কেস আমাদের আত্ম’র পুনরুদ্ধারের যুদ্ধের সেই বুড়ো কর্নেল, যিনি এক আশ্চর্য সাঁটলিপিতে আমাদের কাছে চিঠি লিখে যাচ্ছেন শতবর্ষের নিঃসঙ্গতার অবোধ্য সেই পার্চমেন্ট পুঁথি যেন, যাতে লেখা আছে আমাদের ধ্বংসের ইতিবৃত্ত। অথচ সময়ের ঝড়ে মাকেন্দোর বিলয়েরে আগে অবধি, সেই পার্থিব কেয়ামতের আগে পর্যন্ত আমরা যার পাঠোদ্ধার করতে পারি না।

এভাবেই আমরা পাঠের অন্তিমে, শেহেরজাদের প্রতিশোধের মুখোমুখি হই। আমরা আবিষ্কার করি, দাঁড়িয়ে আছি শতবর্ষের নিঃসঙ্গতার অকহতব্য এক জাদুচ্যুত মরূভূমিতে, যেখানে গল্পের জনন থেমে আছে।

গল্পের জনন থেমে থাকা ওই দশাটি সৃষ্টি করা আছে ‘একটি পূর্বঘোষিত মৃত্যুর দিনপঞ্জী’র একটি দৃশ্যে। ২৫ বছর আগে হত্যা করা হয় আরব ধনী ইব্রাহিম নাসারকে। তার সূত্র খুঁজে চলেছেন লেখক। খুঁজতে খুঁজতে তিনি চলে আসেন প্যালেস ডি জাস্টিসে। কিন্তু সেটা তখন মহাবন্যায় প্লাবিত। ছেঁড়া-ছেঁড়া নথিগুলি ভাসছে। কিছুই আর গ্রন্থিত নয় বলে কোনো কাহিনিও দাঁড়াচ্ছে না, সত্যও জানা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে ওই হত্যাকাণ্ড বিষয়ে ৩২২ টি নথি পান লেখক। কিন্তু বুঝতে পারেন মোট ৫০০ পৃষ্ঠা ছিল এই দলিলে। এখন তাঁকে ছেঁড়া-ছেঁড়া গল্পগুলি তথা নথিগুলি জোড়া লাগাতে হবে। ভাসমান নথিগুলি যতক্ষণ না মাটিতে না দাঁড়াচ্ছে ততক্ষণ তার মধ্যে সত্যের শেকড় গজাবে না। ওই বিচার প্রাসাদের গম্বুজের নিজের পানিতে যে প্রতিবিম্ব তা উল্টানো জগতের, সেই পানি দাঁড়াতে দেয় না, ভাসায়। বোর্হেস যেভাবে আলেফে উপন্যাসকে সংকুচিত করেন, তাকে ভেঙ্গে দেন, সেই ভাঙ্গা জগৎকে আবার এক করতে বসতে হয় ফুয়েন্তেস, কার্পেন্তিয়ের ও মার্কেসদের। পেদ্রো পারামোতে যেমন মৃতদের অসংলগ্ন স্বগতোক্তি জোড়া লাগিয়ে পৌঁছাতে হয় জীবনের সংকেতে।

প্যালেস ডি জাস্টিসের ছলনাময় পানিতে কিংবা মাকেন্দোকে মুছে দেওয়া বিনাশী ঘূর্ণিঝড়ে হারিয়ে যাবে মেলকিয়াদেসের লেখা গল্পগুলি? কী হবে যদি শেহেরজাদ ভুলে যায় তার সব গল্প? উর্দু সাহিত্যিক ইনতিজার হুসাইনের একটি গল্প আছে, ‘শেহেরজাদের মৃত্যু’।

সুখী সম্রাজ্ঞী শেহেরজাদের তিন সন্তান হয়েছে, হয়েছে তিনটি নাতনি। তারা একদিন তার কাছে গল্প শুনতে আসে। কিন্তু কী হয়? শেহেরজাদ মনে করতে পারে না। তার বোন দুনিয়াজাদ তাকে সাহায্য করলেও, গল্পের খণ্ড খণ্ড স্মৃতিই কেবল তার মনে পড়ে। গল্পের জাদু তাকে ছেড়ে গেছে জানার পরে শেহেরজাদ আর বাঁচতে পারে না। একদিন সম্রাটের তরবারির ভয়ে তাকে গল্প বলে বেঁচে থাকতে হয়েছিল, এখন জীবনের সুখের আবেশ তাকে গল্প ভুলিয়ে দিয়েছে।

বিস্মৃতির বিরুদ্ধে, ক্ষমতার বিরুদ্ধে গল্পই জীবনের কবচ। তাই যতক্ষণ গল্প আছে ততক্ষণই জীবন। আসো না, গল্প করি।

 

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম বগুড়ায়। প্রথম পাঠ বগুড়া মিশন স্কুলে, স্নাতকোত্তর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। কবিতা ও গল্প লেখা দিয়ে শুরু হলেও প্রতিরোধী রাজনীতিতে জড়িয়ে যান ছাত্রকালেই। পেশাগতভাবে সাংবাদিক। প্রথম আলোর নিয়মিত কলাম লেখক। কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। আগ্রহের বিষয় জাতি ও জাতীয়তাবাদ, ইতিহাস, সাহিত্য ও রাজনীতি। কবিতার বই : ‘জল জবা জয়তুন’ (আগামী প্রকাশনী, ২০১৫), ‘বিস্মরণের চাবুক’ (আগামী প্রকাশনী, ২০১৭), প্রবন্ধের বই : ‘জীবনানন্দের মায়াবাস্তব’ (আগামী প্রকাশন, ২০১৭), ‘বাসনার রাজনীতি, কল্পনার সীমা’ (আগামী প্রকাশন, ২০১৬), ‘ইতিহাসের করুণ কঠিন ছায়াপাতের দিনে’ (শুদ্ধস্বর, ২০১১), ‘জরুরি অবস্থার আমলনামা’ (শুদ্ধস্বর, ২০০৯)। অনুবাদের বই : ‘সাদ্দামের শেষ জবানবন্দি’ (প্রথমা, ২০১২)।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।