বুধবার, ফেব্রুয়ারি ২১

সাক্ষাৎকার : ‘আমার কাছে বাউল মানে যে সত্যের গান গায়’ —শ্যামলাল গোসাঁই | সাক্ষাৎকার গ্রহণ : শেখ লুৎফর

0
Shamlal Gosai

সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় শ্যামলাল গোসাঁই ও শেখ লুৎফর


শ্যামলাল বাউলের লেখা এবং তাঁর নিজের গলায় গাওয়া একটা গান আছে :

‘যেখানে ধর্ম নিয়ে ধরাধরি, মারামারি নাই,
মন চল এমন দেশে যাই।’

গান পাগল আমার আরেক ছোটো ভাই, কবি ও গীতিকার সেজুল হোসেনের মুখে প্রথম আমি তাঁর নাম শুনি এবং উপরের ওই গানটা শুনতে পাই। তারপর কনকনে শীতের এক রাতে আমাদের দেখা হয় লাউয়াছড়া স্টুডেন্ট ডরমেটরিতে। জিন্স পরা বাউল শ্যামলালের সঙ্গ-যাপনের অভিজ্ঞা ছিল আচানক। তাঁর প্রতিটা কথার মাঝে ছিল প্রজ্ঞার আলো, সাম্যের বাণী। তিনি যখন ধীর-শান্ত গলায় আর ভরাট কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন, ‘আসলে আলাদা কোনো বাণী না। পৃথিবীর সব মানুষের জন্য যে কথাগুলা সব সময় কল্যাণ বয়ে আনে, ওই কথাই আমার মতো করে গানে বলতে চাই। আমার আইডিয়াতে যদি যান, সব সময় এইগুলাই : সত্য, ন্যায় ও সুন্দর। আমার কাছে ধর্ম বলতে এই তিনটাই।’

তখন আমার মনে হয়ে ছিল, লেখালেখির মাঝে পৃথিবীর সমস্ত কবি-লেখকরাও তো এই তিনটা সত্য প্রচার করতে চান।


সাক্ষাৎকার


শেখ লুৎফর : আপনাকে তো বাউলের মতো লাগে না।

শ্যামলাল : আপনি বাহিরটার কথা বলছেন? বাউলরা তো আত্মার সাধনা করে। তবে প্রথম দিকে আমার বাহিরটাও বাউলের ছিল। খুঁজতে খুঁজতে পাইলাম নারী বাউল, দুনিয়া পাগল বাউল। আরও হাজার রকমের বাউল দেখতে দেখতে নিজের আত্মার দিকে তাকিয়ে দেখে ফেলি সাঁইজিকে। সাঁই এসেছেন শূন্য থেকে। আমিও আমার মাঝে ফিরে গিয়ে হেলাল থেকে হতে চাইলাম শ্যামলাল।

 

শেখ লুৎফর : তাহলে গত জনমে আপনার নাম কী ছিল?

শ্যামলাল : পারিবারিক নাম ছিল হেলাল আহমদ। এমনিতে সবাই শ্যামলাল ডাকে। কেউ কেউ ডাকে শ্যামলাল গোসাঁই। আমার নামের গোসাঁইয়ে চন্দ্রবিন্দু জায়গা বদল করে এসেছে দন্তসর ওপর।

 

শেখ লুৎফর : কেন?

শ্যামলাল : এইটার পিছনে একটা কারণ হলো আমার গান। গান নিয়া আমার যে পথচলা সেইটার ক্ষেত্রে আমার চিন্তা বা সাধনা। আমার গানের সব ধরনের শ্রোতা আছে। তাই আমি আমার নামের হেলাল থেকে নিয়েছি লাল আর আমার পছন্দের একটা ভাব হলো বা শুদ্ধতা হলো শ্যাম। সেখান থেকে শ্যাম নিয়েছি।

 

শেখ লুৎফর : গানে আপনি কী বলতে চান?

শ্যামলাল : আমার গানে আমি সব সময় সত্য, সুন্দর আর ন্যায়ের কথা বলতে চাই। এমন এক প্রেমবাজারের কথা আমি গেয়ে বেড়াই যেখানে সব মানুষ শুধু মানুষ। আলাদা কোনো জাতি কিংবা সম্প্রদায় নাই। আমার পৃথিবীতে ধর্মের শিকল নাই, টাকার ঝনঝনানি নাই। যেমন আমার একটা গান আছে :

‘যেখানে ধর্ম নিয়ে ধরাধরি, মারামারি নাই,
মন চল এমন দেশে যাই।’

 

শেখ লুৎফর : আপনি লেখাপড়া করেছেন কতটুকু?

শ্যামলাল : অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত রেগুলার স্টুডেন্ট ছিলাম। তো সেকেন্ড ইয়ারের পরে এসে আমার ড্রপ হয়।

 

শেখ লুৎফর : কেন?

শ্যামলাল : দ্বিতীয় বর্ষে আমাদেকে পড়াতে শুরু করে নজরুলের অগ্নী-বীণা। দেখলাম অগ্নী-বীণায় যা আছে, শিক্ষক ক্লাসে পড়াচ্ছেন তার ঠিক উলটাটা।

 

শেখ লুৎফর : কেন?

শ্যামলাল : ক্লাসের অনেক ছাত্রই মাদ্রাসা থেকে এসেছে। নজরুল তাঁর কবিতায় যা বলেছেন তা পড়ালে শিক্ষক ঝামেলায় পড়বেন। তো আমি এর প্রতিবাদ করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে আসি।

 

শেখ লুৎফর : আপনার লেখা একটা গান শোনাবেন?

শ্যামলাল : ‘চান্দের গাড়ি’ নামে আমার একটা গান আছে। শুনুন :

‘অ তুর দমের এই কল বিকল হবে, করিসনে রে জোরাজুরি,
ভাগ্যগুণে পেয়েছিস এক চান্দের গাড়ি।
অ মন ভাগ্যগুণে পেয়েছিস এক চান্দের গাড়ি,
অ তুই ভাগ্যগুণে পেয়েছিস এক চান্দের গাড়ি। (২)
শুন বলি ভাই, বেলা নাই আর, সাঙ্গ হবে ভবকারবার,
দেখে-শুনে, করলে কামাই, হবি রে তুই চাঁদ কপালে।
ভাগ্যগুণে পেয়েছিস এক চান্দের গাড়ি,
অ তুই ভাগ্যগুণে পেয়েছিস এক চান্দের গাড়ি।
তুমি বা কার, কে বা তোমার,
এইদিক ভেবে ঘোর অন্ধকার,
শ্যামলাল বলে, গুরু বিনে,
শ্যামলালে কয় গুরু বিনে,
কূল পাবিনে রাসবিহারি,
ভাগ্যগুণে পেয়েছিস এক চান্দের গাড়ি,
অ তুই ভাগ্য গুণে পেয়েছিস এক চান্দের গাড়ি,
অ তর দমের এই কল বিকল হবে, করিসনে রে জোরাজুরি,
ভাগ্যগুণে পেয়েছিস এক চান্দের গাড়ি।

 

শেখ লুৎফর : তরুণরা ইউরোপ যাচ্ছে, আরব দেশে যাচ্ছে, আর কিছু না হলেও তো আপনি লেখাপড়া শেষ করে চলনসই একটা চাকরি করতে পারতেন। কেন এই কঠিন পথ বেছে নিলেন?

শ্যামলাল : আপনি শুনলে অবাক হবেন, পরিবারের চাপে পড়ে আমিও টাকার জন্য প্রবাসে গেছিলাম। কিন্তু মেনে নিতে পারলাম না। ছয় মাস পরেই ফিরে আসি। আমার পরিবার একটা সমস্যা। প্রথাগত ধার্মিক তারা। সাদা এবং কালোর পার্থক্য কম বোঝে। আমার কোনো ইন্সট্রুমেন্ট বাসায় নিই না। ভুলে একবার একটা দোতারা নিয়ে গেছিলাম। আব্বা আছাড় মেরে ভেঙে ফেললেন। আমি অই দোতারাটা অনেক কষ্টে কিনেছিলাম।

 

শেখ লুৎফর : বিয়ে করার ইচ্ছা আছে?

শ্যামলাল : ছিল না। কিন্তু আমার চাকরিজীবী ছোটো ভাই মারা যাবার পর আম্মা একদম অসুস্থ হয়ে গেছেন। ঘরে দ্বিতীয় কোনো নারী নাই। আমি মা-বাবার সাথে কথা বলেছি। বিয়ে করলেও আমার ব্যক্তি-জীবনের কোনো বদল ঘটবে না। আমি পথের মানুষ, গান নিয়ে পথেই থাকতে চাই।

 

শেখ লুৎফর : আপনার বাড়ি তো সুনামগঞ্জ, ধিরাই উপজেলার ধিতপুর গ্রামে। এখানে এলেন কীভাবে?

শ্যামলাল : আমার বাবা এখানে বহুবছর ধরে আছেন। এই শহরেরই পাশে, শহরতলিতে আমাদের বাড়ি। বাবা চাষবাস করেন। সাথে ধানের ব্যাবসা করেন। আর যে বিয়ের কথা বললাম। বাধ্য হয়ে যদি বিয়ে করতে হয় তাহলেও আমার কোনো আওলাদ থাকবে না।

 

শেখ লুৎফর : আপনি মুর্শিদ ধরছেন?

শ্যামলাল : না। খুঁজতেছি। অনেকের কাছে গেছি। মন মিলে না।

 

শেখ লুৎফর : আপনার শিক্ষাগুরু আছে?

শ্যামলাল : আমার এই সংগীতের কথা যদি বলেন, গ্রামাটিক্যালি আমার সংগীত গুরু হচ্ছেন মমশ্রী দেব জুঁই। তিনি মৌলভীবাজার শহরেই থাকেন। স্থানীয় একজন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী।

 

শেখ লুৎফর : আমি ভাবতাম বাউল গান মারা যাচ্ছে। কিন্তু আপনার হাতের এই বিদেশি যন্ত্রটার সাথে বাউল চিন্তা ও লাগসই ভাষার কাজ দেখে আশার আলো দেখছি। বোঝা যাচ্ছে আপনি বাউল গানে নতুন একটা ধারার সন্ধানে আছেন। আসলেই কি আপনি বাউল চেতনায় বিশ্বাসী?

শ্যামলাল : অবশ্যই। এবং আই অ্যাম প্রেকটিসিং। আমি প্রথম থেকেই চাচ্ছি একজন বাউলের মতো জীবন-যাপন করতে। পরিচিত মানুষ আমাকে অন্যভাবে দেখে, কেউ বলে পাগল, কেউ বলে খ্যাপা।

 

শেখ লুৎফর : আপনার নাম বিষয়ে যদি আরেকটু বলতেন।

শ্যামলাল : আমি প্রথম কিন্তু হেলাল নামেই গান লিখতাম। আমার একটা বন্ধু আছে ব্রাহ্মণ। একবার তার বাসায় লক্ষ্মী পূজার অনুষ্ঠানে আমরা গান গাইতেছি। তো ওখানে সাধারণত যা হয়, যারা কীর্তন গায় তারাও থাকে। তখন কিন্তু আমি খুব শ্যামা-সংগীত লিখছি। শ্যামা সংগীতে মজে আছি। তখন আমার লেখা একটা শ্যামা-সংগীত গাইলাম :

‘এনেছি মা রক্তজবা, পূজা দেবো তোরই পায়ে,
আয় মাগো আয় আমার প্রাণ পুড়ে যায়।’

সেখানে অনেক মানুষ ছিল। গান শেষে একজন মহিলা এসে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কী?
আমার নাম হেলাল আহমেদ।
ও, তুমি মুসলিম!
হ্যাঁ। কেন?
না, এই যে কালীর গান গাইলা?
আমি বললাম, আমার ঘরেও তো মা আছেন। আমি তো আমার মায়ের গান গাইলাম। কালী মা আলাদা কোনো মা?
অইদিনের ঘটনার পর মনে হলো যে আমি তো মানুষের ভজনা করি। আমার নামটা হউক মানুষের। আমার গানের ভক্তরা হেলাল নামের কারো গান শুনতে চায় না। সবাই চায় শ্যামলালের গান।

 

শেখ লুৎফর : তো আপনি কি গিটার দিয়েই বাউল গান গাইবেন?

শ্যামলাল : সংগীতের পরিবেশ দিনকে দিন আপডেড হচ্ছে। হবে। এই দিনটা প্রায় চলেই এসেছে যে, দোতারা দিয়ে গান শুনবার লোক নাই। কিন্তু গান শোনার মানুষ আছে। এখনই অনেক ছেলেমেয়েরা দোতারা চিনে না। দশটা-বিশটা গ্রাম খুঁজে দোতারার একজন ওস্তাদ পাবেন না। তো মানুষরা গান শুনে। আমার টার্গেট তো গান। গানের মাঝে আমি সাঁইয়ের কথা শোনাতে চাই।

 

শেখ লুৎফর : গানের মাধ্যমে আপনি আর কোনো বার্তা দিতে চান?

শ্যামলাল : আসলে আলাদা কোনো বাণী না। পৃথিবীর সব মানুষের জন্য যে কথাগুলা সব সময় কল্যাণ বয়ে আনে, অই কথাই আমার মতো করে বলতে চাই। আমার আইডিয়াতে যদি যান, সব সময় এইগুলাই : সত্য, ন্যায় ও সুন্দর। আমার কাছে ধর্ম বলতে এই তিনটাই।

 

শেখ লুৎফর : তাহলে তো মানব ধর্মের পথেই হাঁটছেন?

শ্যামলাল : হ্যাঁ। আপনি যখন পরিপূর্ণ মানুষ হিসাবে চিন্তা করবেন, দেখবেন আপনি একজন বাউল।

[আমি অবাক হয়ে তরুণের শ্যামলা মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। ভেবে শান্তি পাই যে, পচা পৃথিবীটাতে এখনো মানুষ আছে! তাই আমুদে, ভালোবাসায় শ্যামলালকে অনুরোধ করি, আগের কথাটা আবার বলেন।]

 

শ্যামলাল : আপনি যখন একজন মুক্ত মনের মানুষ হিসাবে চিন্তা করবেন, কোনো হিন্দু-মুসলিম হিসাবে না, একজন প্রকৃত মানুষ হিসাবে সার্বিক এই মানবতা, চোখের সামনের এই বিশ্বলোক নিয়ে যখন ভাববেন, তখন দেখবেন, দিনশেষে আপনি একজন বাউল হয়ে গেছেন।

 

শেখ লুৎফর : তাহলে বাউল মানে কী দাঁড়ায়?

শ্যামলাল : আমার কাছে বাউল মানে যে সত্যের গান গায়, সুন্দরের আরাধনা করে। এখন কে গাইবে? মানুষই তো গাইবে। প্রত্যেকটা মানুষই একদিন বাউল হবে। এই ভোগবাদী জীবনের একদিন না একদিন পতন হবে। উন্নত বিশ্বের দিকে তাকান। সেইসব দেশের সাধারণ মানুষদের দেখেন। তাদের হতাশা আজ চরমে। যদি প্রত্যেকটা মানুষ বাউল হয়ে যায় তবে কোনো সমস্যা থাকবে না। এইটা আমার বিশ্বাস। আব্দুল করিম ভাই স্বপ্ন দেখতেন, একদিন এই পৃথিবীর সব মানুষ বাউল হবে। করিম ভাইয়ের স্বপ্ন দ্বারা আমি প্রভাবিত। আমি আমার ফ্যামিলিকে দেখেছি। চারপাশ দেখছি। গোঁড়া চিন্তা থাকলে কী কী অসুবিধা হতে পারে। আসলে এইগুলা খুব ক্ষতিকারক। তাই আমি বলি গোঁড়ামি করি না। অন্ধ ভক্ত না। যত কঠিন-ই হউক, মানুষ সত্যটা জানুক। যত কুৎসিত জায়গায় হউক, মানুষ সুন্দরকে দেখুক।

 

শেখ লুৎফর : আপনাদের বংশে আরও বাউল আছেন?

শ্যামলাল : হ্যাঁ। আমার নানা ভাই। তিনি পঁচানব্বই বছর বয়সি। বাড়ি থেকে একটু দূরে, একটা ঘরে একা থাকেন। আজমির শরিফে মুর্শিদ ধরেছেন। বছরে একবার সেখানে যান। বছরে একবার আমাদের বাড়িতে ওরস হয়। অসংখ্য মানুষ তার ভক্ত। দেশের দূরদূরান্ত থেকে ভক্ত-আশেকানরা আসেন। গান হয়। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি হাতে একটা বালতি নিয়ে সব সময় ঘুরে বেড়ান। লিলু শাহ নামে তাঁকে সবাই চিনে। অনেকেই বালতি শাহ বলে ডাকেন। তাঁকে যদি আপনি জিজ্ঞেস করেন, নানু ভাই, আপনার হাতে বালতি কেন?

তিনি বলবেন, একবার তো যুদ্ধ কইরা দেশটা স্বাধীন করছি। তবু এই দেশে অনেক নষ্ট রক্ত রয়ে গেছে। যেখানে এই অবৈধ রক্ত দেখি, পানি মাইরা জায়গাটা পরিষ্কার করে দেই।

তিনি আমার দীক্ষাগুরু। তাঁর কাছ থেকে আমি এই পথের সন্ধান পেয়েছি।

 

শেখ লুৎফর : আপনার লেখা আরেকটা গান হোক।

শ্যামলাল :
‘ও তুমি পাশে থাকিয় রে বন্ধু, দূরে না যাইয়,
ভালোবাসিয় রে বন্ধু, ভুলে না যাইয়।
অ রে এই বুকেতে প্রেমের আগুন, তুমি নিভাইয়,
তুমি আমারও মনে প্রেমের নৌকা দৌড়াইয়।
এই বুকেতে কত জ্বলা জানে না কেহ,
ভাগ্য লয় না জোড়া, আমার পুড়া এই দেহ।
বন্ধু হইয়া তুমি আমায় ভালোবাসিও,
তুমি আমার মনে প্রেমের নৌকা দৌড়াইয়।
পাড়াপড়শি খারাপ বলে, নেয় না সঙ্গে করি,
দিনেরাইতে প্রাণ বন্ধুয়ার প্রেমানলে পুড়ি।
কুকিল হইয়া তুমি আমায় কাছে ডাকিয়,
তুমি আমার মনে প্রেমের নৌকা দৌড়াইয়।
প্রেম করা নয় দোষের বন্ধু তোমার সনে,
এই পাগল মন জানলেও বন্ধু ওরা নাহি জানে।
শ্যামলালের এই পুড়া দেহ আর না পুড়িয়,
তুমি আমার মনে প্রেমের নৌকা দৌড়াইয়।

 

শেখ লুৎফর : বেঁচে থাকার জন্য কোনো জীবিকা আছে?

শ্যামলাল : মৌলভীবাজারের একটা পত্রিকায় কাজ করি।

 

শেখ লুৎফর : চলে?

শ্যামলাল : চলে যায়। আমার চাহিদা খুব কম। সকাল-সন্ধ্যা দুই বেলা ভাত খাই। পায়ে হেঁটে অফিসে যাই। একটা থেকে তিনটা, এই দুই ঘণ্টা লাঞ্চ টাইম। তখন এক কাপ চা খেয়ে মনু নদীর নির্জন চরে চলে যাই। বসে বসে গান গাই। হাতে গান আসলে মোবাইলে লিখি। আমার চাহিদা খুব সামান্য। মাসে বিশদিন কাজ করলে বিশদিনের বেতন নেই। এক টাকাও বেশি না।

 

শেখ লুৎফর : অফিস পালানো দিনগুলো কোথায় কাটান?

শ্যামলাল : মানুষের মাঝে গান নিয়ে বেড়াই। আমার হৃদয়ের কথা দশজনকে শোনাতে চাই। কেউ শুনে, কেউ গালি দেয়।

 

শেখ লুৎফর : বাউল গানের জগৎ তো ছোটো হতে হতে নাই হয়ে যাচ্ছে। চারদিকে শুধু কট্টর মানুষের ভিড়।

শ্যামলাল : আমি, ফাহাদ ভাই, সেজুল ভাই যখন এক সাথে বসে গান গাই, আলাপ করি তখন এই বিষয়ে প্রায়ই কথা হয়। গান নিয়ে চারদিকে অনেক মাতামাতি আছে। গানের পরিবেশ রক্ষা করার নামে অনেক সংগঠন আছে। তবু আমরা গানের জমিন রক্ষা করতে পারছি না। আপনার মতো আমিও গানের পরিবেশ নিয়া হতাশ। কোনদিন জানি গানের সময় শেষ হয়ে যায়!

 

শেখ লুৎফর : গান বিষয়টা আরেকটু খোলাসা করবেন?

শ্যামলাল : বর্তমানে বাজারে নানা ধরনের গান আছে। এদের অধিকাংশই আমোদ-ফুর্তির জন্য। এইসব গান আমাদের সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে কোনো গভীর প্রভাব ফেলতে অক্ষম। এইগুলাকে আমি গান বলি না। আমার কাছে গান মানে জীবনের কথা বলবে, সার্বজনীন সুন্দরের কথা বলবে, মানবতার কথা বলবে।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম ময়মনসিংহরে গফরগাঁওয়ে ১৯৬৬ সালে। বিএসসি সম্পন্ন করে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত আছেন। র্বতমানে থাকনে সুনামগঞ্জে। প্রকাশতি গল্পের বই: ‘উল্টারথে’ [২০০৮], ‘ভাতবউ’ [২০১৩] ‘অসুখ ও টিকনের ঘরগিরস্তি’, [২০১৭]। উপন্যাস: ‘আত্মজীবনের দিবারাত্রী’ [২০১১], ‘রাজকুমারী’ [২০১৯]।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।
Ad_Icchesrabon-02