রবিবার, নভেম্বর ২৮

স্মৃতিগুলো : সাধন দাস

0

আমার বিয়ে 


রূপার পরীক্ষা মাথায় মাথায়। পড়িয়ে ফিরতে রাত গভীর হয়ে গেল। পরিবারের মান মর্যাদা পাহারা দিতে বাবা জেগে বসে আছেন। ব্যাভিচার আটকাতে বাইরের দরোজায় হুড়কো পড়ে গেছে। পাঁচিল পেরিয়ে ঘরে ঢুকতেই বাবার মুখোমুখি। মশারি ঘেরা অন্ধকার টোপে বিড়ির আগুন ঘনঘন জ্বলছে নিভছে। আগুনের আভায় দেখলাম বাবার কপালে ঘাম। আগুন জলের মাঝে আমি। বাবার পায়ের কাছে মা।

বলল— একটু নরম হও। বিয়েটা দিয়েই দাও।

বাবা অন্ধকার মুখে ফতোয়া দিলেন— মেয়ে নিজে পছন্দ করেছ। নিজেই বিয়ে করবে। আমি দায়িত্ব নেব না।

মনে হলো, বাবা নন। অন্য কেউ। যা মাইনে পাই তুলে দিই বাবার হাতে। মানিব্যাগ শূন্য, বাবা কি জানেন না! কী করি? মন্দিরে গিয়ে যদি সিঁদুর পরাতে হয়, সেও তো বিনি পয়সায় হবে না।

বাবা অন্ধকার মুখে ফতোয়া দিলেন— মেয়ে নিজে পছন্দ করেছ। নিজেই বিয়ে করবে। আমি দায়িত্ব নেব না।

মনে হলো, বাবা নন। অন্য কেউ। যা মাইনে পাই তুলে দিই বাবার হাতে। মানিব্যাগ শূন্য, বাবা কি জানেন না! কী করি? মন্দিরে গিয়ে যদি সিঁদুর পরাতে হয়, সেও তো বিনি পয়সায় হবে না। একরোখা আমি। বাবার পছন্দের মেয়ে বিয়ে করব না। গোঁ ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম।

মা বলল— মেয়েটা কাজেকম্মে লক্ষ্মী। খুব কথা শোনে।

আলো মুখে বাবা হঠাৎ বললেন— এ মেয়ে আমারও পছন্দ। পরীক্ষা শেষ হলে, যে ভাবে পারো বিয়ে করে এসো। ঘরে তুলে নেব।

অন্ধকার ভেঙে আলো জ্বেলে দিলেন। তবু ঘর ভর্তি অন্ধকার। বাবা আর কিছু বললেন না। বাথরুম গেলেন।

যেন মাথা নেই। পা পাথর। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি, জানি না। অন্ধকার চেপে ধরেছে। ঠেলে বেরিয়ে আসছি। যেন অনেক অনেক পথ হাঁটছি। তবু অন্ধকার শেষ হচ্ছে না। মা নিঃশব্দে কাঁদছে। আমার হাত চেপে ধরল। —খোকা, খেয়ে যা।

সব সমস্যার সমাধান অফিসের বস তুলসিদা, ডেপুটি ম্যানেজার; ভীষণ মিষ্টি মানুষ। হেসে বললেন— ভাবছিস কেন? আমি তোর বিয়ে দেব।

দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেল। রূপার বাবা গরিব। ভেবেছিলেন, ধার দেনা করে মেয়ের বিয়ে দেবেন। ছেলের বাবার হুঙ্কারে হলো না। গরিব মেয়ের বাবার কোনো দাম নেই। রূপাকে বললাম— পালিয়ে এসো।

রূপা এসে জায়গা নিল তুলসিদার ঘরে। তুলসিদা ভাড়া থাকেন বি কে রায়ের বাড়িতে। বাঁশ-টাঁশ এসে গেছে। বিয়ের প্যান্ডেল বাঁধা হবে। বি কে রায় বাবার বন্ধু। শুনেটুনে বললেন— বনগাঁর গোপালদা অতি সজ্জন ব্যাক্তি। ছেলে বাইরে বিয়ে করছে। নিশ্চয় বদমাস। বাঁশ যদি পুঁততেই হয় অন্য কোথাও। আমার বাড়ি থেকে এ বিয়ে হবে না।

ডেকরেটার্স ফিরে গেল। বি কে রায় গোবরডাঙার দামি লোক। তাঁর ফতোয়া সবাই মান্য করে। ঘর দিতে আর কেউ রাজি হলো না।

এই আমাদের বাংলাদেশ। এক ফোঁটা চন্দন, একগোছা ধূপের ধোঁয়া, উলু আর শঙ্খধ্বনি এক মুহূর্তে অনন্ত বিশ্বাস চাড়িয়ে গেল ভাই বোনের সম্পর্কে।

তুলসিদা গম্ভীর। মাথায় হাত। —নারে সাধন, হলো না। চল তোকে আনন্দময়ী কালিবাড়িতেই নিয়ে যাই।

অফিসের নিচে মিষ্টির দোকান। সেখানে বসে তুলসিদা আমাদের সমস্যার কথা বলছিলেন।

দোকানের মালিক রমেশ সরকার। বসের বন্ধু। আছাঁটা গোঁফ দাড়ি। ময়দা, মিষ্টির রস মাখা লুঙি, হাওয়াই শার্ট। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। গম্ভীর। মধ্যবয়সে তরুণ তুর্কি। এক সঙ্গে দু’ তিন সিঁড়ি পেরিয়ে দোতলায়, ব্যাঙ্কে ঢোকেন।

বললেন— মেয়েটিকে একবার দেখব।

দেখলেন। বললেন— আমার বোন নেই। রূপাকে বোন করে নিচ্ছি।

লগ্নই মাত্রই শুভ। বসের ঘরে ভাই ফোঁটার শাঁখ বাজল। উলু পড়ল। রূপা রমেশদার কপালে ফোঁটা দিল।

রমেশদা বললেন— বোনের বিয়ের দায়িত্ব আমার।

রূপাকে নিয়ে চলে গেলেন নিজের বাড়িতে। কথা দিয়ে গেলেন, তুলসিদা যখন বলেছেন, বিয়ে আজই হবে, লগ্ন মেনে। হবে না কেন! বস যে রমেশদারও বস।

রমেশদা লোকটাকে চিনি না, জানি না। বাড়িঘর দূরের কথা, কোনোদিন মিষ্টি খেতেও তাঁর দোকানে ঢুকিনি। চকিতে রূপাকে তুলে নিয়ে চলে গেলেন। এই আমাদের বাংলাদেশ। এক ফোঁটা চন্দন, একগোছা ধূপের ধোঁয়া, উলু আর শঙ্খধ্বনি এক মুহূর্তে অনন্ত বিশ্বাস চাড়িয়ে গেল ভাই বোনের সম্পর্কে। অফিসে লেজার ডেবিট ক্রেডিট করছি। উত্তেজনায় হাত পা কাঁপছে। ঘটনা হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। দাঁতে ঠোঁট কাটছি। ঠোঁট লাল হয়ে উঠেছে। সত্যি কি আমাদের বিয়ে হতে যাচ্ছে! না, আমার রূপা হারিয়ে যাচ্ছে!

 

০২.
বিয়ে, আনন্দ করব কি— ভয়ে সিঁটিয়ে আছি।

রমেশদার দোকান থেকে দই এলো ফ্রিতে। ক্যান্টিনের মাসি চন্দন বেটে, ধান, দুব্বো জোগাড় করে দিয়েছে। আর্মড গার্ড সন্তোষ ভট্টাচার্য্য বিয়ের বামুন, মন্ত্র আউড়ে; করুণাদি (কলিগ) মাথায় ধান দুব্বো, কপালে দইয়ের ফোঁটা দিয়ে নান্নিমুখ না কী বলে, তাই করে গেল। আমার দম বন্ধ অবস্থা। মুখ বুঁজে লেজার ডেবিট ক্রেডিট করে যাচ্ছি।

রমেশদার দোকান থেকে দই এলো ফ্রিতে। ক্যান্টিনের মাসি চন্দন বেটে, ধান, দুব্বো জোগাড় করে দিয়েছে। আর্মড গার্ড সন্তোষ ভট্টাচার্য্য বিয়ের বামুন, মন্ত্র আউড়ে; করুণাদি (কলিগ) মাথায় ধান দুব্বো, কপালে দইয়ের ফোঁটা দিয়ে নান্নিমুখ না কী বলে, তাই করে গেল। আমার দম বন্ধ অবস্থা

ম্যানেজারবাবুর চেম্বারে হঠাৎ চেঁচামেচি। তুমুল কথা কাটাকাটি। যুক্তি, পাল্টাযুক্তি। কাজ কর্ম শিকেয়। ব্রাঞ্চে ইন্সপেকশন চলছিল। বুড়ো ইন্সপেক্টরবাবু বলছেন, তিনি বয়োজ্যেষ্ঠ, হেড অফিসের লোক। তিনিই বরকর্তা। তুলসিদা বলছেন, বিয়ের সব দায়িত্ব তাঁর, সকাল থেকে উপোস করে আছেন, তিনিই বরকর্তা। ইন্সপেক্টরবাবু বলছেন, বরকর্তা হতে না দিলে ব্রাঞ্চের রিপোর্ট খারাপ করে দেবেন। তুলসিদা বলছেন, তিনিও ইউনিয়নের নেতা, ভুল রিপোর্ট দিলে, দেখে নেবেন। সেই ফাঁকে ম্যানেজারবাবু সুপ্রভাত স্যর আমার নামে পাঁচ হাজার টাকা স্পেশাল লোন স্যংশান করে দিলেন। টাকা পৌঁছে গেল তুলসিবৌদির হাতে। বৌদি আর করুণাদি চলে গেল হাবরা। বিয়ের শাড়ি, ধুতি, পাঞ্জাবি, ফুলের গহনা, টোপর, বিয়ের বাজার করতে। পাঁচটা বাজতে না বাজতে শাঁখ বাজিয়ে অফিসের ঝাঁপ গেল বন্ধ হয়ে। সাধনবাবুর বিয়ে!

ব্যাচেলর রুরাল ডেভেলপমেন্ট অফিসার জীবন সরকারের ঘর, বরের তাঁবু। অমল রায় হেডক্যাসিয়ার, শান্তিনিকেতন থেকে পাশ করা। অতএব শিল্পকলায় তাঁর অধিকার। তিনি মালা চন্দনে বর সাজিয়ে ধুতি পাঞ্জাবি পরিয়ে মাথায় টোপর চাপিয়ে দিলেন। অফিসে বাইশ জন এমপ্লয়ি। একজন আর এম অফিসের, ডেপুটেশনে এসেছে সুভাষলাল প্রসাদ, আমার বন্ধু; আর ইন্সপেক্টরবাবু, একজনও বাদ নেই। চব্বিশজন বরযাত্রী। চব্বিশখানা রিক্সা। হৈ হৈ করে বিয়ে করতে চললাম। গোবরডাঙায় কারো জানতে বাকি নেই ব্যাঙ্কের ছেলের বিয়ে হচ্ছে। জানালায়, ছাদে, পথের দু’ধারে মানুষ কাতার দিয়েছে। ফক্কর ব্যাপারিদা গান ধরেছে, মালা বদল হবে এ রাতে…।

ভেবেছিলাম, হেরিকেন জ্বালিয়ে অংবংচং করে ঠাট্টার বিয়ে হবে। উরেব্বাস! বিয়েবাড়ি আলোয় আলো। আট দশটা হ্যাজাগ জ্বলছে সাঁ সাঁ শব্দ। মাইকে গান বাজছে। শাঁখ বাজে সানাই বাজে, ঘোমটা খোলে না। লজ্জাবতী কনে বৌয়ের নোলক দোলে না…। চাঁদোয়া টাঙিয়ে, কলাগাছ পুঁতে উঠোনজুড়ে ছাদনাতলা ঝকমক করছে। ঝলমলে মহিলা পুরুষ কুচোবাচ্চা ভর্তি, সবাই ব্যস্ত। বিয়েবাড়ি গমগম করছে। সুগন্ধ আর আনন্দের ছড়াছড়ি। তুলসিবৌদি বরের ঘরে পিসি কনের ঘরে মাসি। বর বরণ করতে এসে কপালে এমন জোর ঠোনা মারল টোপর পপাত ধরণীতলে। রমেশবৌদি খুশির হুড়োহুড়িতে আর একটু হলে রসগোল্লার বদলে চন্দনের ফোঁটাই খাইয়ে দিচ্ছিলেন আমাকে।

ভেবেছিলাম, হেরিকেন জ্বালিয়ে অংবংচং করে ঠাট্টার বিয়ে হবে। উরেব্বাস! বিয়েবাড়ি আলোয় আলো। আট দশটা হ্যাজাগ জ্বলছে সাঁ সাঁ শব্দ। মাইকে গান বাজছে। শাঁখ বাজে সানাই বাজে, ঘোমটা খোলে না। লজ্জাবতী কনে বৌয়ের নোলক দোলে না…। চাঁদোয়া টাঙিয়ে, কলাগাছ পুঁতে উঠোনজুড়ে ছাদনাতলা ঝকমক করছে।

আস্ত সরকারপাড়া ভেঙে পড়েছে বিয়েতে। আশিজন মানুষ নিমন্ত্রিত। পুকুর থেকে মাছ উঠেছে। ক্ষেতের অঢেল সবজি। দোকানের মিষ্টি, ছড়াছড়ি। বিয়ে পড়ানোর জন্যে তিনজন ব্রাহ্মণ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে। কনে পক্ষের একজন ব্রাহ্মণ একজন এ্যাসিস্ট্যান্ট। বরপক্ষে আর্মগার্ড সন্তোষ ভটচায, দুইহাতে পৈতে মালিশ করছে। উৎসবের ফূর্তিতে অনেকটাই কারণবারি খেয়ে ফেলেছে। হম্বিতম্বি শুরু করেছে, বরপক্ষের নিয়মেই বিয়ে দিতে হবে।

মাঝরাত, বিয়ে মাঝপথে, রমেশদার বাবা মানে রূপার নতুন বাবার হঠাৎ মনে পড়ে গেছে, ক্যামেরাম্যান বলা হয়নি। বিয়ে থেমে গেল। ছোট্ ছোট্। বাজারের স্টুডিও থেকে ঘুমন্ত এক ছোকরাকে টেনে হিঁচড়ে তুলে আনা হলো। বিয়ে ফের শুরু হলো। ভয়ে সিঁটিয়ে, আমসি হয়ে যাওয়া চন্দনে চর্চিত কনের মুখ ঘেমে, পেন্ট গলে গলে পড়ছে। ছবি উঠছে। চারহাত এক করে হোমাগ্নিতে কুলো গড়িয়ে খৈ ফেলার সময়, মনে আছে, রূপার হাতের তালু চুলকে দিয়েছিলাম, যেন একটা ছবি অন্তত হাসি মুখে ওঠে।


বাড়ি ছাড়লাম 


আমায় কোলে নিয়ে মা ভিক্ষে দিতে এসেছিল।

গেরুয়াধারী সন্ন্যাসী বলেছিলেন— মা, তোমার এ ছেলে ঘরে থাকবে না।

হাউমাউ করে কেঁদে মা অস্থির। সন্ন্যাসী ফিরেও তাকাননি। তণ্ডুল নিয়ে চলে গেছেন।

নিজে হামাগুড়ি দিতে শিখলে মা চেয়েছিল, আমি যেন মায়ের হাত ধরে ঘরের ভিতরে হাঁটতে শিখি।

একটু বড়ো হলে, মা রাজপুত্তুরের সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পার হওয়ার গল্প বলতে ঠাকুমাকে বারণ করত। যদি ছেলে ঘর ছাড়ার উস্কানি পায়। ঠাকুমা অন্য গল্প জানত না। রাজকন্যা জয় করে আনার গল্পই বলত, আর মায়ের সাথে অশান্তি হতো।

একটু বড়ো হলে, মা রাজপুত্তুরের সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পার হওয়ার গল্প বলতে ঠাকুমাকে বারণ করত। যদি ছেলে ঘর ছাড়ার উস্কানি পায়। ঠাকুমা অন্য গল্প জানত না। রাজকন্যা জয় করে আনার গল্পই বলত, আর মায়ের সাথে অশান্তি হতো।

ছোটোবেলায় আমি কেবল হারিয়ে যেতে চাইতাম। একবার কোলকাতা বেড়াতে গিয়ে রাইটার্সবিল্ডিংয়ের গলিতে হারিয়ে গেছিলাম। বাবা ট্রাফিক পুলিশের সাহায্য চাইলে, ট্রাফিক ভুল নিশানা দেখিয়েছিল। মা আমাকে খুঁজে পেয়েছিল ডাস্টবিনের জঞ্জালে। বেড়াল ছানা নিয়ে খেলা করছিলাম। মানুষের শিশুতো বটেই, বেড়ালবাচ্চারও সেখানে যাওয়া নিষিদ্ধ। আর পুলিশের সামনে দিয়েই আমি বেড়াল ছানা ধরতে ছুটে গিয়েছিলাম। মা বলত, পুলিশ আর সন্ন্যাসীরা অন্ধ। মানুষকে মিথ্যে বলে, দু’জনেই ভুল পথ দেখায়। নিজের ছেলেকে নিজেই খুঁজে পাওয়ার গল্প মা জনে জনে টেনে টেনে লম্বা করে বলে বলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে অনেকদিন। এ তার ছেলে খুঁজে পাওয়া অহংকারের কান্না, ছেলেকে আগলে রাখা ক্ষমতার কান্না।

পুলিশ আর সন্ন্যাসীকে বাইরে অবিশ্বাস করলেও মায়ের মনে সন্দেহ ছিল, যদি আমি সত্যিই বিবাগী হয়ে যায়, সেই ভয়ে দিনরাত আমার চারপাশে বেড়া উঁচু আর জাব্দা করত। আদিখ্যেতা করে কপালে চুমু খেত, সুযোগ পেলেই মাথায় ফুঁ দিত, কোথাও গেলে কড়ে আঙুল কামড়ে দিত। কাল্পনিক ছেলে ধরার বিপদের কথা ভেবে মায়ের সেই আগলে রাখা ক্ষমতার কান্না, দিনদিন বেড়েই যাচ্ছিল। বাড়ি থেকে বেরুলেই মা ফেরার ওয়াদা নিত। কোথায় যাচ্ছিস? কেন যাচ্ছিস? কার সঙ্গে যাচ্ছিস? ফিরতে এতো দেরি হবে কেন? বাইরের দরজায় দাঁড়িয়ে যতোদূর দেখা যায়, দেখত। আমিও যেতে যেতে ফিরে ফিরে দেখতাম। মায়ের সাথে টান অনুভব করতাম। বন্ধুরা হাসাহাসি করত। একটু বড়ো হলে, মায়ের উপর অভিমান হতো। করুণ মুখে হাসি রেখে বলতাম– অতো দেখার কী আছে? আঁচলে বাঁধা আছি, ফিরে তো আসবোই।

মা শুনত না। কলেজে পড়ার সময়, রেগেমেগে ইচ্ছে করে বাড়ি ফিরতাম দেরিতে, কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি বলতাম না। অবাধ্য হতে হতে একসময় মাকে বিরক্ত আর অসহ্য করে তুললাম। কিছু জিজ্ঞেস করলেই ঝাঁঝিয়ে উঠতাম। মা আর দুয়োরে দাঁড়াত না। আস্তে আস্তে খোঁজ খবর নেওয়া ছেড়ে দিল। কলেজ পাশ করে আমারও বাইরের টান বেড়ে গেল। আজ মামার বাড়ি। কাল পিকনিক। পরশু বন্ধুদের সাথে চাকরির পরীক্ষা— কোলকাতা, কানপুর, গৌহাটি।

সেদিন ভর দুপুর। তখন কাঠ বেকার। আড়ৎ থেকে কয়লা আনা ভুলে আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরে দেখি রান্না হয়নি। মা পুরণো শক্ত ভাত নুন লঙ্কা মেখে বাবাকে খেতে দিচ্ছে। রাগে বাবা ভাতের থালায় জলের জগ উল্টে দিলেন। আমাকে দেখেই চিৎকার করে উঠলেন— যাও, বেরিয়ে যাও। অকাল কুষ্মাণ্ড কোথাকার!

আমারও রাগ চড়ে গেল। সেই পায়েই বেরিয়ে পড়লাম নিরুদ্দেশে। মা কাঁদছিলই। নতুন করে মাকে কাঁদতে হয়নি। দু’চোখে ভর্তি জল। চরম আনুগত্যে বাবার দিকে অবনত দৃষ্টে নত ছিল। মাথা না তুলে চুরি করে মিনতি ভরা চোখে একবার আমার দিকে তাকিয়েছিল। ভয়ে মা ভুলেই গেছিল গেরুয়া সন্ন্যাসীর কথা। ‘যাসনে খোকা’ বলতেও সাহস পায়নি।

আমারও রাগ চড়ে গেল। সেই পায়েই বেরিয়ে পড়লাম নিরুদ্দেশে। মা কাঁদছিলই। নতুন করে মাকে কাঁদতে হয়নি। দু’চোখে ভর্তি জল। চরম আনুগত্যে বাবার দিকে অবনত দৃষ্টে নত ছিল। মাথা না তুলে চুরি করে মিনতি ভরা চোখে একবার আমার দিকে তাকিয়েছিল। ভয়ে মা ভুলেই গেছিল গেরুয়া সন্ন্যাসীর কথা। ‘যাসনে খোকা’ বলতেও সাহস পায়নি। হয়তো মনে মনে হিসেব কষছে, বেকার ছেলে, খাওয়াবার ক্ষমতা নেই। খেয়ে পরে বাঁচতে হলে, বাবার অধীনেই থাকতে হবে।

সাতদিন হকারি করেছিলাম, হাওড়া গয়া প্যাসেঞ্জারে। ভিজে ছোলা বিক্রি করতাম। টিনের গেলাসে ছোলামাখা নাচিয়ে হাঁকতাম— মশলা চানা। মশলা চানা। লিজিয়ে বাবু লিজিয়ে, মুফতে মিরচি।

বিক্রিবাটা হলে এক টাকা চার আনায় ডিমভাত, না হলে ভিজে ছোলা আর স্টেশনের ট্যাপে পানীয় জল খেয়ে কাটিয়ে দিতাম। খবর পেয়ে ছোটোকাকা এসে গিয়ে ধরে নিয়ে গিয়েছিল।

 

০২.
প্রেম করেছি ছাত্রীর সাথে। পাড়ায় ঢি ঢি পড়ে গেছে। মা বললো— পাড়ায় কান পাতা যাচ্ছে না।

বাবা বললেন— মেয়ে পছন্দ করেছ তুমি। যেভাবে পারো তোমার বিয়ে তুমি করে এসো। আমি দেব না। মেয়ে আমার পছন্দ। ঘরে তুলে নেব।

তুলসিদা রমেশদা আমাদের বিয়ে দিলেন। বৌ নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।

রূপার হেডমিসট্রেস বাবাকে বলে গেছেন— মেয়েটা হীরের টুকরো। কোনো ক্লাসে, কখনো, কোথাও, সেকেণ্ড হয়নি। পরিশ্রমী, বুদ্ধিমতী। ওর পড়াশুনো ছাড়াবেন না। মা সরস্বতী যাচ্ছে আপনার ঘরে। দেখবেন, ওর গুণে সংসার আলোয় ভরে যাবে।

রূপার হেডমিসট্রেস বাবাকে বলে গেছেন— মেয়েটা হীরের টুকরো। কোনো ক্লাসে, কখনো, কোথাও, সেকেণ্ড হয়নি। পরিশ্রমী, বুদ্ধিমতী। ওর পড়াশুনো ছাড়াবেন না। মা সরস্বতী যাচ্ছে আপনার ঘরে। দেখবেন, ওর গুণে সংসার আলোয় ভরে যাবে।

বাবা লেখাপড়াকে খুব মান্য করতেন। বৌমাকে কলেজে ভর্তি করে দিলেন। অথচ মা দুর্বোধ্য! বিয়ের আগে রূপা যখন আমার কাছে পড়তে আসত, মা ওকে মেয়ের মতো ভালোবেসেছে। ওরা গরিব। মা’র মনে হতো, মেয়েটা হয়তো না খেয়েই স্কুলে যায়। পেট ভরে খাইয়ে স্কুলে পাঠাত। বিকেলে আসলে, কোলের সামনে বসিয়ে রুক্ষ্ম চুলে তেল মাখিয়ে, চুল আঁচড়ে, লাল ফিতে দিয়ে সাজিয়ে, একটা চুমু খেয়ে আমার কাছে পড়তে পাঠাত। সেই মেয়েই বৌমা হয়ে এলে, কী জানি কী হলো? পাশা উল্টে গেল। যে স্নেহে দয়া ছিল, সেই স্নেহে অধিকার দিতে মা রাজি হলো না। মনে মনে বিরুদ্ধতা এতো তীব্র ছিল, বরণ করে ঘরে তোলার সময় বালা টেনে হেঁচড়ে এমন পড়িয়ে দিল, হাতের ছাল চামড়া উঠে রক্ত বেরিয়ে গেল। বোনও স্কুলে পড়ে। বৌদি ননদে গলায় গলায় ভাব। এক সাথে সংসারের কাজ সারে, পড়াশোনা করে, আড্ডা মারে, সিনেমায় যায়। ওদের সমস্যা নেই।

কিন্তু সেদিন অফিস বেরুচ্ছি। রূপা সাথেই যাচ্ছে, দু’জনই ট্রেন ধরব। ও কলেজে যাবে। চারদিকে ঝলমলে রোদ্দুর। ফুরফুরে বাতাস। রান্নাঘরের বারান্দায় বাবা সকালের খাবার খেতে বসেছেন। কানের কাছে দাঁড়িয়ে মা বলল— আমার মেয়ে ছেঁচেয় বসে বাসন মাজবে আর বাড়ির বৌ ব্যাগ ঝুলিয়ে কলেজে যাবে সে হবে না।

সকালটা বিষিয়ে দিলেন মা। রেগে মেগে অস্থির বাবা আমাকে বললেন— তোদের আর থাকার দরকার নেই। বেরো তোরা বাড়ি থেকে। দিনরাত অশান্তি ভালো লাগে না।

প্রথমে ভাবলাম, বাবা তাড়াতাড়ি অফিসে, কলেজে চলে যেতে বলছেন!

মেজকাকাদের আলাদা সংসার, তবু ঘরের জানলা দিয়ে নাক গলিয়ে বললেন— হ্যাঁ হ্যাঁ ওদের বাড়ি ছাড়াই ভালো। ওরাও সুখে থাকবে। বাড়িতেও শান্তি হবে।

বুঝলাম আমাদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

মাথা নিচু করে ম্লান গলায় জিজ্ঞেস করলাম— বাড়ি ছেড়ে কোথায় যাব, বাবা?

—যেখানে খুশি। চাকরিতে ট্রান্সফার হলেও তো চলে যাবি।

একটু চুপ থেকে বাবা বললেন— পারিস তো বৌমাকে পড়াস। মেয়েটা পড়তে ভালোবাসে। হেডমিসট্রেস নীহারদি বলেছিলেন, মা সরস্বতী।

গলাটা ভারী মনে হলো। বাবা মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।

মা হিসহিসিয়ে বলল— হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই যা। মা, বোন আগুন পুড়ে জলে ডুবে মরুক। কারো দেখার দরকার নেই।

বাবা আর একটি কথাও বলেননি। যা মাইনে পাই সব তাঁর হাতে তুলে দিই। তিনি মাসের পকেট খরচা দেন।

মুখ ফুটে বলতে পারলাম না— বাবা আমি নিঃস্ব। পকেট শূন্য। থাকব কোথায়? খাব কী?

দুঃখে সেই খালি হাত পায়েই বেরিয়ে পড়লাম। উনুনের আগুন আড়াল করে মা রান্নাঘরের দরোজায় ট্রাফিক পুলিশের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। আগুনের আভা লেগে তার লালচে শাড়ি গেরুয়া রং ধরেছে। আলুথালু চুলে মাকে সন্ন্যাসীনি দেখাচ্ছে। রান্নাঘরের অন্ধকারে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে মেজোকাকিমা, মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে।

দুঃখে সেই খালি হাত পায়েই বেরিয়ে পড়লাম। উনুনের আগুন আড়াল করে মা রান্নাঘরের দরোজায় ট্রাফিক পুলিশের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। আগুনের আভা লেগে তার লালচে শাড়ি গেরুয়া রং ধরেছে। আলুথালু চুলে মাকে সন্ন্যাসীনি দেখাচ্ছে। রান্নাঘরের অন্ধকারে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে মেজোকাকিমা, মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। মুখে আঁচল চাপা দেওয়া। দেখতে পেলাম, আঁচলের নিচে তিনি ঠোঁট টিপে হাসছেন! বুঝলাম, ঘটনার ব্লু-প্রিন্ট অনেকদিন ধরেই তৈরি হয়েছে। আজ অপারেশন হলো। রূপা মাথা নিচু করে মাকে প্রণাম করল। প্রণাম করতে কষ্ট হচ্ছিল। প্রথম সন্তান ওর পেটে। মায়ের আগুনচোখ রূপার দিকে। আমিও মাকে প্রণাম করলাম। মায়ের পায়ে হাত রেখে মনে মনে মিনতি করেছিলাম, মাগো তাড়িয়ে দিও না। এখন তোমাকে খুব দরকার। মুখ ফুটে বলতে পারিনি। কান্না ভেজা অস্ফুট গলায় বললাম— যাচ্ছি মা।

মা কোনো উত্তর দিল না।

মেজকাকার বাড়িতে টেপরেকর্ডার বাজছে, অকূল দরিয়ার মাঝি বাইয়া যাও রে…

 

০৩.
দুই তাড়া খাওয়া প্রাণী, রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। পিছনে বিশাল সাদা দোতলা, নিজেদেরই বাড়ি। কতোদিন ভালো করে দেখিনি, গায়ে কতো ময়লা জমেছে! কপালে সিমেন্ট জমিয়ে আঁকা উদীয়মান সূর্যের কেন্দ্রে, বড়ো বোল্ডে লেখা ‘মা’। মলিন দেখাচ্ছে। কর্ণিক তুলির মতো ধরে সিমেন্ট কেটে কেটে আমিই লিখেছি, বহুদিন আগে। ঝাপসা দেখাচ্ছে। লেখা সুন্দর বলে বাবা লিখতে সাহস জুগিয়েছিলেন। তিন মাথার মোড়ে আমাদের বাড়ি। আর আমাদের নেই। সামনে তিন দিক খোলা। হা হা স্বর্গ মর্ত পাতাল। কোনদিকে যাব?

কাল সরস্বতীপুজো। বাতাসে পবিত্র ঠান্ডা। হিমেল রোদ্দুর এসে পড়েছে বাড়ির গলিতে। ভাইবোন মিলে সরস্বতী পুজো করতাম এখানে। বাঁশ পুঁতে চট টাঙিয়ে প্যান্ডেল বানাতাম। মা কাকিমারা ইস্ত্রি করা শাড়ি বের করে দিত প্যান্ডেল সাজাতে। সবচেয়ে সরু সূঁচে খুব সাবধানে আলতো করে, যেন মায়েদের শাড়ির গায়ে যেন কোথাও আঁচড় না লাগে, শ্রদ্ধার যত্নে জুড়ে জুড়ে প্যান্ডেল সাজাতাম।

কাল সরস্বতীপুজো। বাতাসে পবিত্র ঠান্ডা। হিমেল রোদ্দুর এসে পড়েছে বাড়ির গলিতে। ভাইবোন মিলে সরস্বতী পুজো করতাম এখানে। বাঁশ পুঁতে চট টাঙিয়ে প্যান্ডেল বানাতাম। মা কাকিমারা ইস্ত্রি করা শাড়ি বের করে দিত প্যান্ডেল সাজাতে। সবচেয়ে সরু সূঁচে খুব সাবধানে আলতো করে, যেন মায়েদের শাড়ির গায়ে যেন কোথাও আঁচড় না লাগে, শ্রদ্ধার যত্নে জুড়ে জুড়ে প্যান্ডেল সাজাতাম। সেই মায়েরা ষড়যন্ত্র করে রূপাকে, আমাকেও তাড়িয়ে দিল। বাবা রূপাকে ‘মা’ ছাড়া ডাকতেন না। বলতেন,‘মা সরস্বতী’।‘মা সরস্বতী’ বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ছেলে, ছেলের বৌকে হারিয়ে মা এখন হয়তো মুখে আঁচল চাপা দিয়ে সত্যিই কাঁদছে। বৌমাকে যুদ্ধে হারানোর অহংকার আর ছেলে হারানোর পরাজিত স্নেহ মেশানো কান্না। বাংলায় ‘হারানো’ শব্দের কী দ্যোতনা!

জীবন সরকার। মজার নাম! অফিসে আমরা রসিকতাও করি। রুরাল ডেভেলপমেন্ট অফিসার। লম্বা ছুটিতে যাচ্ছেন। তাঁর ব্যাচেলরের বাসা। দ্বিতীয় ঘরটা পড়েই থাকে। সাগ্রহে থাকতে দিলেন। ঘরখানার লাগোয়া গোয়াল। সেখানে একটা জার্সিগাভী আর তার বিচুলি ভরা মরা বাছুর থাকে। বাড়ির মালিক শিক্ষক। ওই গোয়ালে বিনিপয়সায় ছাত্র পড়াতেন। তাঁর নিজের কথায়, গরু পিটিয়ে মানুষ করতেন। টিউশনের পাট তুলিয়ে জীবনস্যার তাঁকে গরুর দুধের ব্যবসাদার বানিয়ে ছেড়েছেন। স্যারই ব্যাংকের লোনে গরুজোড়া কিনিয়ে দিয়েছেন। বাছুর মরে গেলে তার হাড় মাংস বের করে খড় ভরে খাড়া করার বুদ্ধিও দিয়েছেন। সকাল বিকেল দুধ দোহানোর সময় মরা বাছুরটাকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। মরা বাচ্চাকে মা জ্যান্ত ভেবে গা চেটেচেটে স্নেহে অন্ধ হয়ে মালিককে দুধ দেয়। বিয়ের আগে দেখতে এসেছি। বিয়ের পরে একসঙ্গে থাকতে এসেছি।

পাশেই বদ্ধজলা। মশারদল সন্ধ্যে হতেই সশব্দে বেরিয়ে এলো। রাত বাড়ছে। ঠান্ডা বাড়ছে। মশা বাড়ছে। গুনগুন গান ক্রমশঃ গোঁ গোঁ ঝড়ে বদলে যাচ্ছে। মশার হুল থেকে বাঁচতে, ঘরের কোণে ছিল টেবিল ফ্যান, উপায় না দেখে এই কনকনে ঠান্ডায় দিলাম চালিয়ে। আর ঠান্ডা থেকে রেহাই পেতে এক কম্বলে জড়াজড়ি করে দু’জন ঘরের কোণে বসে রাত কাটিয়ে দিচ্ছিলাম। অন্ধকার কিছুতেই কাটছে না। ঘরের পেছন থেকে গাভীর চোনানোর গভীর শব্দ পেলাম। ঝাঁঝালো দুর্গন্ধ। গরু নাদলো। নাদ পড়ল পেচ্ছাপের উপর। থপ থপ থ থ থ প…। মজা পাচ্ছি। দু’জন দু’জনের দিকে তাকিয়ে হাসছি। মশার কামড় সহ্য করতে না পেরে গরুটা কাতরাচ্ছে। মনে হলো খুব কষ্টে বই পড়ছে। অ… অ… আ… । মশা তাড়াতে ল্যাজ ঝাপটাচ্ছে। আমরাও ঠান্ডা আর মশার কামড়ে অস্থির হয়ে মাঝ রাত্তিরে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়লাম। ঘরের পিছনেই গোয়াল। গোয়ালের আড়ায় মরা বাছুরটা কাত হয়ে পড়ে আছে।

রূপা বলল— বেচারা মশার কামড়েই মরেছে নির্ঘাত।

গোয়ালে মুখের অর্ধেক গোবর জলে নিকিয়ে পরিষ্কার। একটা টিমটিমে বাল্ব জ্বলছে। রং-বেরঙের শাড়ি দিয়ে তৈরি হয়েছে প্যান্ডেল। বিদ্যাদেবীর আরাধনা হবে। বেদীতে সরস্বতীর সাদা মূর্তি বসে গেছে। গায়ে অজস্র মশা। প্রতিমাকে প্রায় কালো করে ফেলেছে। রূপা ভিতরে ঢুকে উঁকি মেরে দেখছে। প্যান্ডেলের অর্ন্তরাত্মায় গোবরে চোনা-কাদায় মাখামাখি হয়ে গরুটা শুয়ে আছে। গায়ে ভর্তি মশা। চোনা গড়িয়ে চলে আসছে সরস্বতীর আসনের নিচে। রূপা ফ্যাচ করে চোনায় পা ফেলে কাদা মাখামাখি হয়ে গেল। আমি আর হাসি চাপতে পারলাম না। রূপা আর আমি প্রতিমার সামনে দুই হাত জোড় করে বলে উঠলাম— নমঃভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমঃ। বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত বিদ্যা স্থানেভ্য এব চ।

রূপা ঠাকুর দেবতা বিশ্বাস করে না। আমার দিকে তাকিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুরে। নিজের পরিচয়ে তিনি বলেন, ‘না থাকলেও বা কি, এমন পিঁপড়ে তুল্য। উপলব্ধি লিখি। এমন লিখি এবং পড়ি খাটুনি উসুল করে আনন্দ নিই। লেখা পড়ে আর কেউ খুশি হলে বোনাস। বয়স সাতষট্টি। পেটের দায়ে ব্যাংকে ট্রান্সফারের চাকরি করেছি। সুদখোর সময় কাঁড়িয়ে নিয়েছে। যখন যেখানে গিয়েছি স্মৃতি আর বই সঞ্চয় করেছি। রিটায়ার্ড করে স্মৃতি লিখি, বই পড়ি।’

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।