যাযাবর বিষাদেরা
কেন ফিরে আসো বারবার?
চলে যেতে হয়, ছেড়ে তো দিয়েছি,
তবু কিছু পিছুটান শেকড়ের মতো বিধে আছে বুঝি।
এই যে হাওয়ায় ভাসা মুহূর্ত,
…………………………….ফেরিওয়ালা দিন,
…………………………….স্বর্ণরেণু মাখা বিষাদরাঙা মেঘ—
ঘুরে ফিরে কড়া নাড়ে হৃদয়দুয়ারে।
কেন?
……কেন ফিরে আসা বারবার?
আমি তো চাই না কিছু।
………………….দিয়েছি যা, তা তো তোমারই পাওনা।
…………………………….চলে যেতে হয়, চলে যাও—
দূরে,
আরও দূরে,
………………বহু দূরে যাও চলে।
যা কিছু তোমার আছে—
………………………মাটি, জল, শেকড়,
এমনকি যাযাবর বিষাদ—
সবটুকু নিয়ে চলে যাও এবার।
এই উচ্ছিষ্ট হৃদয়,
………………এই বিবর্ণ জলপদ্ম জীবন—
আর কী কাজে লাগাই…?
নিয়ে যাও,
…………….যা কিছু তোমার আছে—
…………………………………সব।
সম্পর্ক
বসে বসে ভাঙন লিখছি
সময় আর বদনামি সফর একে চলেছে
একের পর এক আছড়ে পড়া সম্পর্কের বারুদ পোড়া গন্ধ।
ঘর পোড়া গরু আর পান্তা ফুরোনো জীবন নিয়ে
যাদের অভিযোগ, তাদের ভূঁইফুঁড়ে জন্ম
নেওয়া প্রতিটা কাঁটা গাছের দিব্যি—
জীবনে সত্য বলে আসলে কিছুই হয় না,
মিথ্যে বলেও না, প্রতিশ্রুতিও না, দায়বদ্ধতাও না,
এবং
এবং তথাকথিত প্রেম বা সম্পর্ক বলেও কিছু হয় না।
শিকল—
একটা কুৎসিত শিকল, সুন্দর এবং ভিন্ন আবরণে
ঝুলছে সকলের গলায় গলায়।
বড়ো ভালো হতো,
বড়ো ভালো হয়,
আমিও যদি একটা মাতাল পাহাড়িয়া নদীর পায়ে
শিকল পরিয়ে দিতে পারতাম।
জোনাকি জীবন
কী বলব…
আমার ঘুম ছুঁয়ে শিয়রে জেগে ছিল যে রাত,
তার প্রতিটা হিংস্র শ্বাস-প্রশ্বাস
আমি কীভাবে আঁকব
শব্দ ও কথায়?
তার চেয়ে,
শুধু জেনে রেখো এই সত্যটুকু—
উঠোনে শুয়ে থাকা বর্ষার জলে
সোনালি চাঁদের স্নিগ্ধ যাতনা,
তোমাকে দিলাম ক্ষুদ্র এই জোনাকি জীবন।
মুক্তি
তোমার চোখ আমার আজন্ম ব্যাধি
পাড়ভাঙা দুঃখী নদীর মতো
চড়পড়া আমার এই বুক
যেন শতাব্দীপ্রাচীন কোনো এক দাহভূমি।
থরে থরে সাজানো সম্পর্কের শুকনো কাঠ,
প্রতিটা চিতায় একটি মাত্র লাশ।
তোমার চোখ এমন শান্ত কেন?
তোমার ঠোঁট যেন স্তব্ধ সরোবর।
হে খোদা! হে দয়াময়!
কাজলের নিচে ঘুমিয়ে থাকা
প্রতিটা ফুল, ঝড় এবং মেঘলা আকাশের দিব্যি—
যে চোখে আমি স্বর্গ দেখেছি,
যে ঠোঁটের অনর্গল বাক্যগঙ্গায় করেছি পুণ্যস্নান,
সে স্বর্গ আজ জলে ভিজে যায়,
সেই গঙ্গা আজ শুকিয়ে কাঠ—
এ আমি সহ্য করি কীভাবে?
তার চেয়ে ভালো, আগুন হও প্রিয়া,
জ্বেলে দাও,
জ্বেলে দাও এ পোড়া মুখে আগুন নিজ হাতে,
পবিত্র করো আমার এই সূচিবাইগ্রস্থ দীর্ঘ জীবন।
তোমার চোখ আমার আজন্ম ব্যাধি,
আর একটি বার চোখে চোখ রাখি—
জানি, এ ভুলও শেষ ভুল নয়।
ছায়াজন্ম
কোথায় যাই?
যে উন্মাদ লাশ রক্তচোখ পাকিয়ে
তাকিয়ে আছে আমার দিকে,
তার কাছে কীভাবে গোপন করি
নিরাময়তার অজুহাত ছুঁয়ে থাকা জ্যোৎস্নাক্লেশ—
নিশাচর শামুক জীবন এবং ছায়া প্রেমিকার ঘুম।
ভুলে ভুলে যাই কত কিছু,
কোন পথ কোন দিকে যায়,
কোন পথ মেশে কোন পথে।
আমাদের কোনো পথ বুঝি আর নেই বাকি—
সব পথ এক দিকে যায়,
সব পথ এক হয়ে যায়।
পথের শেষে কী যেন, কী আছে…?
চোখ, ঘুম, রক্ত, অজুহাত—
তার ভেতর পড়ে থাকে এক উন্মাদ লাশ।

শিলিগুড়িতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। কবিতা প্রধান আশ্রয়; পাশাপাশি বই পড়া, সিনেমা দেখা ও ভ্রমণ নিত্যসঙ্গী। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ দুটি— ‘সুন্দরের বেদনা’ এবং ‘এই মুক্তি চাইনি আমি’। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখির পাশাপাশি ‘শিলিগুড়ি জংশন’ পত্রিকার সহ-সম্পাদক হিসেবে যুক্ত। প্রিয় কবি জয় গোস্বামী।