রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৩

আমাদের নিরুদ্দেশের ট্রেন : ৪র্থ পর্ব

0

মলয় বাতাসে ভেসে যাবো শুধু

 

১.

আমাদের মর্গ্যান গার্লস হাই স্কুলের ক্লাস নাইনের তিন তিনটা সেকশনে, তখন কতো যে হুলস্থুল। সেই ১৯৭৩ সালে, সেই আমার সাপ্তাহিক দেশবাংলা পত্রিকাটা পেয়ে ওঠার আগের সময়ে। হুলস্থুল কেন?

আরে বাবা, হুলস্থূল না হয় কেমনে!

‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ পত্রিকা একটা নতুন জিনিস ছাপানো শুরু করছে না? ‘পত্রমিতালী চাই’ নামের একটা নতুন জিনিস। সেইখানে কতো কতো মানুষের কতো নাম আর ঠিকানা ছাপা হচ্ছে। আমার সেগুলা দেখা হচ্ছেই তো প্রতি সপ্তাহে।

কী মনে করে জানি, আব্বা ‘বিচিত্রা’ও দিতে বলে দিয়েছেন আমাদের পেপারঅলারে। সেই কারণে বাড়িতে বিচিত্রা নিয়মিতই আসছে। আচ্ছা, ‘বিচিত্রা’ যদি রাখা যায়, তাহলে ‘চিত্রালী’ কি রাখা যায় না?

‘সব্বনাশ সব্বনাশ!’ আম্মা চিলচিৎকার দিতে ছাড়ে না; “‘চিত্রালী’ পইড়া সিনেমাখোর বান্দর হওনের নিয়ত হইছে তাইলে মাইয়ার! কিয়ের চিত্রালী!” আম্মার রুষে ওঠা মানে কী আব্বারও রুষে ওঠা নয়? তখন আমি বুঝে যাই যে, শান্তিহালে কোনোদিন আমি, নিজের ঘরে বসে ‘চিত্রালী’ পড়ার কোনো উপায় পাবো না। কোনোদিনই পাবো না।

আম্মা তখন ‘চিত্রালী’তেই থামে না। ‘বিচিত্রা’ নিয়েও তাঁর কতো যে ডর। ‘এই বিচিত্রা লওনেরই বা কোন দরকার? এইটার পিছের পাতায়ও তো হেই সিনেমার আগামাথাই ছাইপ্পা থুইতাছে! আঁখির আব্বা, বিচিত্রা দিতে নিষেধ কইরা দেও কইতাছি।’

আম্মার কথাই আব্বার কথা, এটা আমরা জানি। তবে তারপরেও আব্বা কেন জানি বিচিত্রা দিতে নিষেধ দেয় না। সপ্তায় সপ্তায়, সেই আসর ওয়াক্ত যায় যায় টাইমেই, ইত্তেফাকের সাথে বিচিত্রাও আমাদের উঠানে ছিটকে পড়তে থাকে।

তো, কতো কতো পত্রমিতালী চাই-এর খয়খোঁজ তো আমিও দেখি বিচিত্রায়। কিন্তু সেইসব ঠিকানায় কি আমাদের নারায়ণগঞ্জের মতন ঝুম নিরল টাউনের সুমসুমা পাড়ার কেউ চিঠি লিখতে পারে? অই ঠিকানাঅলারা তো কোন দূরে দূরে, কোন বড়ো বড়ো টাউনে থাকা লোকসব। তাদের যারা চিঠি লিখবে, তারাও নিশ্চয়ই থাকে কোনো-না-কোনো টাউনে-মাউনে।

তো, কতো কতো পত্রমিতালী চাই-এর খয়খোঁজ তো আমিও দেখি বিচিত্রায়। কিন্তু সেইসব ঠিকানায় কি আমাদের নারায়ণগঞ্জের মতন ঝুম নিরল টাউনের সুমসুমা পাড়ার কেউ চিঠি লিখতে পারে? অই ঠিকানাঅলারা তো কোন দূরে দূরে, কোন বড়ো বড়ো টাউনে থাকা লোকসব। তাদের যারা চিঠি লিখবে, তারাও নিশ্চয়ই থাকে কোনো-না-কোনো টাউনে-মাউনে। তারাও নিশ্চয়ই সব বড়ো বড়ো ক্লাসে পড়া একেকজন! ক্লাস নাইনে-পড়া কেউ চিঠি দিলে, সেটা গোনায় নেবে নাকি! নেবেই না।

ওমা! তারমধ্যেই একদিন ক্লাস নাইনের সেকশন ‘এ’ আর সেকশন ‘বি’র এই মেয়ে ওই মেয়ে খুব জোর গুঁজগুজ শুরু করে। কি? না, তারা পত্রমিতালী করে। চিঠি লেখে তারা দূরের দূরের পত্রমিতার কাছে।

সেই মেয়েদের একেকজনের চিঠির উত্তর আসে, আর টিফিনটাইমে মাঠে গোল হয়ে বসে বসে সেই চিঠি পড়ে তারা একেকজনে। একা একলা পড়ে না। নিজের নিজের বান্ধবীদের সকলেরে নিয়ে, তবেই চিঠি পড়ে চলে তারা। আর তখন কতো হাসি কতো চিৎকার! আপা স্যারেরা সেই হাসি-চিৎকারের আওয়াজ পান ঠিকই, তবে টিফিন টাইমে পোলাপাইনে এট্টু হাসি-আমোদ করলে দোষ কী! তারা কোনো দোষ দেখতে পান না।

যারা যারা ওই পত্রমিতাদের চিঠি পেয়ে চলছে, তারা কেউই আমার সেকশনের কেউ তো না। আমার বান্ধবীও তো তারা কেউ না। কাজেই পত্রমিতারা কেমন করে চিঠির উত্তর দেয়, কেমন করে সম্বোধন করে, কোন কোন কথা তারা লেখে, ইশশ! কে জানে কেমন সেটা! কতো ভালো না জানি লাগে অমন চিঠি পেতে! অনেক অনেক ভালো না লাগলে অমন অমন হাসি কি ঝুলকে ঝুলকে উঠতে পারে, টিফিন টাইমে?

‘আমাগো সেকশনের কেউ ক্যান পত্রমিতালী করে না? এই সেকশন সি-র কেউ কেন করে না?’

‘আমাগো সেকশনের কেউ করে কি না, টাইম হইলেই দেখবি তুই।’ আমার জানি-দোস্ত বকুল আমারে খুব মেজাজ দেখাতে দেখাতে বলে। কী জানি বকুলি কী বলে!

 

২.
ক্লাস নাইনের ‘এ’ ‘বি’ ‘সি’ সেকশনের ‘এ’ হলো বিজ্ঞানের স্টুডেন্টদের জন্য। ‘বি’ আর ‘সি’ হলো মানবিকের জন্য। সায়েন্সে যারা যাবে, তারা যে যেন-তেন স্টুডেন্ট হবে না, সেটা স্কুলের আপা স্যারেরা চিরদিন ধরেই জানেন। আর, তারা যে অনেক বেশি সংখ্যার স্টুডেন্ট হবে না, সেটাও তাদের একদম পরিষ্কার জানা। সেই কারণেই স্কুলে তখন সায়েন্সের জন্য খালি একটা সেকশন। আর বাদবাকি সকলের জন্য সেকশন বি এবং সি। এই দুই সেকশনের মাইয়ারা যা পারে পড়বে, না পারে না পড়বে। আর্টসের মাইয়াসকল। এগো আর ফিউচার কী!

কোনো স্যার বা আপা এমন-তেমন কোনো কথা, কিছুমাত্র মুখে আনেন না, সত্য। কিন্তু সকলের ভাবভঙ্গী কেমনে কেমনে জানি এমন-তেমন কথাই রটায়ে দিতে থাকে। ক্লাস এইটে থাকতে থাকতেই আমার সঙ্গের সকলে কেমনে পড়ার ধুম যে ফালায়। গণিতরে গণিত। বীজগণিতের ধুন্দুমার। কেন? না, নাইনে উঠলে তাদের সায়েন্স পাওন লাগবো। বাইততেনে কইছে, একেকজনেরে কইছে, সায়েন্স পাইলে আর কতা নাইক্কা। ডাক্তারি পড়াইবোই পড়াইবো। তাইলে নাইনে উইট্টা সায়েন্স না-পাইলে হইবো নি?

কিন্তু এদিকে আমার কী যে ফ্যাসাদ ঘটে। গণিত বুঝি, বীজগণিত বা জ্যামিতিও বুঝি; কিন্তু যেন তেমন তুক্ষার রকমে বুঝি না। যেন একটু সাদামাটা রকমে বুঝি। যেন অনেকখানি বেশি রকমে বুঝি ইংলিশ। বুঝি ইতিহাস আর ভূগোল। বাংলা তো কেমন যে লাগে। কেমন যে লাগে!

ওই অমন যেন-তেন হালকা-পাতলা রকমে, ওই দামি দামি সাবজেক্টগুলা বুঝি বলেই, ক্লাসে স্যার আপারা আমাকে কখনোই গোনায় ধরার একটা স্টুডেন্ট বলে মনেই করলেন না। তাঁরা জানেন তো যে, সকলেরে দিয়ে স্কুলের মুখ উজ্জ্বল করানোর আশা করা বৃথা। মুখ ঝলমলান্তি দিবে দুই চাইরজনে মাত্র।

ওই অমন যেন-তেন হালকা-পাতলা রকমে, ওই দামি দামি সাবজেক্টগুলা বুঝি বলেই, ক্লাসে স্যার আপারা আমাকে কখনোই গোনায় ধরার একটা স্টুডেন্ট বলে মনেই করলেন না। তাঁরা জানেন তো যে, সকলেরে দিয়ে স্কুলের মুখ উজ্জ্বল করানোর আশা করা বৃথা। মুখ ঝলমলান্তি দিবে দুই চাইরজনে মাত্র। বাকিরা কোনোমতে পাশ দিবে। তারবাদে এইসব মাইয়াসন্তান, অতি অবশ্যই তো যাবে চুলা গুঁতাইতে।

সেই বিশ্বাসের জোরেই কিনা কে জানে, স্কুলে আর্টসের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে রাখা আছে ‘পারিবারিক হিসাব নিকাশ’ নামের সাবজেক্ট। তুমি চাইলেও ওটা ছাড়া অন্য কোনো সাবজেক্ট নিতে পারবাই না। কেমনে নিবা! অন্য কোনো সাবজেক্ট তো নাইই।

পারিবারিক হিসাব নিকাশ সাবজেক্টের ক্লাসে মন দেওয়ার কিছু পাই না আমি। কেমনে পরোটা ভাজতে হবে, সেইটার বিস্তারিত বিবরণ জানলে আমার কোন ফল! আমি তো জিন্দিগীতেও রান্ধনকর্ম করতে যামু না। রানমুই না আমি কোনোদিন। রান্ধন অনেক কঠিন এক জিনিস। দুনিয়ার কঠিন। রান্ধনের বিষয়টা মনে হলেই আমার হাত-মুখ কম্প দিতে থাকে। শরীরটা গুলিয়ে উঠতে শুরু করে আচমকাই।

(প্রিয় পাঠক, ওই বাল্য-কৈশোরের মহা ভীতিই শেষপর্যন্ত এই আমারে, এমন একটা অকম্মা অযোগ্য দ্বিপদ করে রাখলো। রন্ধনকুশলী হওয়া তো দূর, কড়াইয়ে তেল তপ্ত হওয়ার বিষয়টাসুদ্ধ আন্দাজ করার সামর্থ্য দিলো না। ভাগ্যিস ভয় পাইছিলাম!)

সত্য হলো এই যে, রান্না বিষয়টারে আমার বড়োই বেদিশাকর কঠিন-জটিল লাগে। মাগ্গো মা বাবারে বাবা! মশলার আন্দাজ আম্মায় ঠিক করে কেমনে! তেল কট্টুক দিলে একদম যথাযথ হবে, এইটা বোঝে কেমনে সকলে! নিত্যির রান্ধনের নুনের হিসাব; নাইলে পায়েসের চিনির সংগতি—ঠিক থাকে কেমনে!

ডিম ভাজতে গেলে তারে উল্টানো যায় কোনোমতে, সেটা সত্য; কিন্তু পোচ করতে গেলে কী বিপদ! শয়তান ডিমে উল্টানি খাইতেই চায় না। উল্টা কিনা ছেবড়ে-লেবড়ে ঘণ্টমতো হয়ে যেতে চায়। কী সাংঘাতিক কঠিন এই সবকিছু!

কাজেই সেদিন শামসুন আপা ক্লাসে পরোটা বানানোর রীতি-কৌশল বিষয়ক অধ্যায়টা যখন পড়ানো শুরু করেন, আমি তখন খাতা খুলে তার নিচে মাসুদ রানার বইটা নিয়ে নেই। কেমন দেখো সাংঘাতিক নাম: দুর্গম দুর্গ! বইয়ের ভাষাটা যে কেমন নতুন! শুরু করা মাত্রই আমার মনে হতে থাকে যেন রোজার দিনের গরম গরম, ঝাল ঝাল আর কড়মড়া কড়মড়া ছোটো ছোটো পিঁয়াজু খেতে পাইছি! এমন স্বাদের এমন সুখেরও হতে পারে নাকি কোনো বইয়ের ভাষা! ইশ!

সেদিনের আগে পর্যন্ত আমার সম্বল ছিলো ‘দস্যু বনহুর’। নয়তো নীহার রঞ্জনের লেখা কিরীটি রায়ের বাঘা বাঘা অভিযানের গল্প। সেইসব বই দিনে দিনে স্কুলেই পড়ে, ছুটির সময়ে বকুলরে ফেরত দিয়ে দেওয়াই ছিলো নিয়ম। বইয়ের আদি মালিক বকুলের আপনা বড়ো ভাইয়ে। বই বকুলের আপনা ভাইয়ের হলে কী, ভাইয়ে ওই বইয়ে একটা আঙুলসুদ্ধা লাগাতে নিষেধ দিয়ে রাখছে বকুলিরে। খবরদার কিন্তু!

মিয়াভাইয়ে এইসব বই নিজে কিনে নেয়, না কোনো দোস্তের কাছ থেকে কর্জ আনে, সেইসবের কিছুই বকুলিয়ে জানে না। শুধু জানে, বকুলে যদি স্কুলে আসার টাইমে ওই বই সঙ্গে নিয়ে আসে আর ছুটির সময় বাড়িতে ফেরত নিয়ে যায়, তাইলে তার মিয়াভাইয়ের সাধ্য নাই যে কিছু বোঝে। তার সাধ্য নাই যে সে আন্দাজ করে, বকুলি তার বইয়ে ঠিকই হাত লাগায়। বকুলে যেমন স্কুলে থাকে, মিয়াভাইয়েও তো তেমন সমস্তদিনই থাকে বাইরে। এই এই আউট বইয়ে মিয়াভাইয়ে হাত দেয় রাইতের টাইমে। কাজেই সন্ধ্যার মধ্যে জায়গার বই জায়গায় চলে গেলে, সকল মুশকিলেরই আসান হবে।

এমন এমন আউট বই পড়ার টাইম বকুলের নাই। সে চায় কুঁশিকাঁটায় লেস বুনতে। টেবিল ক্লথে নকশা তুলতে। সেইসবই করে সে সবসময়। স্কুলেও নিয়ে আসে কুশিকাঁটা আর সুতার ফেটি। টিফিন টাইমে না বুনলে তার আঙুল নাকি ইসির-পিসির করতে থাকে। তার নাকি অস্থির লাগতে থাকে।

‘এইটা করতে যে কী আমোদটা হয়, অইটা তুই জীবনেও বুজবি না, ভুম্বলি! আল্লাপাকে তরে কিমুন আচানক ভোমলা কইরা যে বানাইছে!’ বকুল তার প্রাণের দোস্ত আঁখির জন্য এইমতে আফসোস করে নিত্য।

এটা সত্য যে, আমার জানি-দোস্ত বকুলে আমারে অনেক মায়া করে, কিন্তু ঠিক যেন ওর সমান বয়সি বলে আমারে গণ্য করে না সে। যেন আমি দেখতে ওর সমান দেখালেও, আদতে আমি কম বুঝের একজন। যেন আমি ওদের সকলের সাথে থাকাই একজন, তবে সমান বুঝ-বুদ্ধির কেউ না। যেন আমি দুধভাত কেউ।

তো সেই আমার যখন খালি আউট বই পড়ার নেশা আছে, খালি আউট বই ছাড়া অন্য কিচ্ছু যখন আমার কাছে সুবিধার লাগে না; তখন বকুলি আমার জন্য আউট বইয়ের ব্যবস্থা না করে কেমনে! ‘তাগো বাইত না দুনিয়ার আউট বই, মিয়াভাইয়ে নিত্যি দেহি আনতাছে, হেটি! হেই আউটবই আনলেই ত্তো আঁখির পড়োনের নিশাটার তিয়াস মিটে।’ বকুলি সেটা বুঝে ওঠে।

‘ওইসব বইই সেয় আনবোই আনবো, তয় একটা কড়ার আছে। দিনকার বই দিনে দিনে ফিরতি নিতে হইবো বকুলিরে। তা তুমি তখন যট্টুক পড়ছো, পড়ছো। ব্যস। আর, আজকা আনা বই আবার ফিরা কালকা আনা যাবে না। আনলে আনা যাবে নয়া কোনো বই। মিয়াভাইয়ে ধইরা ফালাইলে আমার বারোটা বাজবো। বোজছস?’ বকুলি আমারে হুঁশিয়ারি দেয়। ‘কোনো বই কইলাম বাইত নেওনের নামও নিবি না। হুনলি?’

কিন্তু কেমন এক-চক্ষুঅলা লোক তারা দুইজন—আম্মা আর আব্বা! আমারে ‘দস্যু বনহুর’ একবার হাতে ধরতে দেখেই বাড়িতে এমন তছনছ লড়ালড়ি শুরু করে তাঁরা! বাবা রে বাবা! এইগুলা নাকি ভালো না! এইগুলা বই নাকি নানা কুকথা শেখায়। কী কুকথা শেখায়? আমি তো নিজেরে এইটা জিজ্ঞেস করে করে বেতালা হয়ে যাই।

এইসব আউট বই আমি বাসায় নিয়ে যাবো? আম্মা আমারে জ্যাতা রাখবে? দেখামাত্র না একটানে দুই টুকরা করবে বইটারে? মাগ্গো মা। বই ফাঁড়লে সেইটার লোকসানী বুঝি আমি সামাল দিতে পারবো! এমন তো না যে, আমাদের ঘরে বই পড়াপড়ি নাই! একটা কাচ-বাঁধানো আলমারিতে সুন্দর মতো পড়ে আছে শরৎ রচনাবলী, খণ্ডে খণ্ডে। আছে হেন ফেইরি টেল তেন রূপকথা, এই-তাই। আমি সেগুলা যখন তখন পড়ার সর্ব অধিকার রাখি। আসলে আব্বা সেগুলার সর্ব মালিকানা আমারেই দিয়ে দিছে।

কিন্তু কেমন এক-চক্ষুঅলা লোক তারা দুইজন—আম্মা আর আব্বা! আমারে ‘দস্যু বনহুর’ একবার হাতে ধরতে দেখেই বাড়িতে এমন তছনছ লড়ালড়ি শুরু করে তাঁরা! বাবা রে বাবা! এইগুলা নাকি ভালো না! এইগুলা বই নাকি নানা কুকথা শেখায়। কী কুকথা শেখায়? আমি তো নিজেরে এইটা জিজ্ঞেস করে করে বেতালা হয়ে যাই। কোনো উত্তর তো পাই না। কোন কুকথা? কী জানি এই বড়োরা কেমনে কী বোঝে!

তো, তারা নিষেধ দেয় বলে কী আমি ‘দস্যু বনহুর’ আর ‘চিত্রালী’ আর নীহাররঞ্জন পড়বো না নাকি? পইড়া একদম তুফান কইরা ফালামু। পড়মুই।

কেমনে পড়মু? সমস্তটা দিন পড়মু। স্কুলে পড়ে ফেলবো। কঠিন ক্লাসগুলায় স্যার আপার পড়ারে ফাঁকি দেবো না, এইটা ঠিক। কিন্তু সহজ ক্লাসও তো আছে রোজ রোজই। সেই ক্লাসে পড়া শুনতে থাকবে বকুলি, আর আমি খাতা খুলে লেখা করার বাহানা করতে করতে নিচে রাখা আউট বই পড়তে থাকবো।

সেই বন্দোবস্ত মাফিক সেদিনও, ‘পারিবারিক হিসাব নিকাশ’ ক্লাসে আপা পড়ানো শুরু করা মাত্র, আমি ওই নতুন জাতের বইয়ের পাতা মেলে ধরি। বকুলি শুনেছে, এই ‘মাসুদ রানা’ বই নাকি অনেক কঠিন জাতের বই, আর নাকি অনেক অনেক ভালো। তবে এই বই একদম বড়োমাইনষের বই। মিয়াভাইয়ের সমান বড়ো মানুষ ছাড়া নিকি এই বই হাতে ধরা নিষেধ আছে। বকুলি য্যান আবার এইটার পাতা উল্টাইতে না আসে! খবরদার।

এমন বই যদি দুনিয়াতে থাইক্কা থাকে, তাইলে সেইটা বুঝি আঁখির মোকাবিলা আইন্না দিবো না বকুলিয়ে? আঁখির কি জানোনের দরকার নাই নাকি যে, এমুন বইও আছে। খরাপ বই। এখন আঁখি পইড়া দেখুক, ক্যান এইটারে খরাপ কইতাছে মিয়াভাইয়ে। আঁখির কাছ তেনে বকুলি শুনলেই চলবো। তার নিজের তো পড়োনের এট্টুও গর্জ নাই।

সেইদিন ওই নয়া জাতের বইটা আঁখি খালি খুলেও সারে নাই, কেমনে জানি আপার সন্দেহ জাগনা দেয়। অই মাইয়ায় খাতায় লেখোনের নামে কী করতাছে? বান্দরামি করতাছে মোনে হইতাছে!

‘এই, এই মাইয়া! খাড়াও তুমি। দাঁড়াও তো দেখি!’ আপা হেঁকে ওঠেন।

আপা জানি কারে দাঁড়াতে বলছেন! সে দাঁড়াচ্ছে না কেন! বইয়ের অক্ষরে ঘন রকমে চোখ রাখতে রাখতে আঁখির মনে আসতে থাকে ওই কথা। আপা তো অনেক রাগ করছেন, আরে!

‘এত্তা বড়ো বেয়াদ্দব! কথা মান্যি করো না মাইয়া! ঠ্যাটা দিয়া বইসাই আছো!’ আপা রেগে চেয়ার ঠেলকে উঠে দাঁড়ান। তারপর বেঞ্চে বসা মেয়েটার দিকে আগাতে থাকেন। এদিকে বকুলি আমারে আবার কেন ঠেলা দেয় রে দেখো তো! পড়তে দিতাছেই না তো। আমি কোনোকিছুরই দিশা পাই না। অই বকুলি, গুঁতা দেস ক্যান?

এই কথার উত্তর না দিয়ে বকুলি, ফুস্সাত করে ‘দুর্গম দুর্গ’ বইটারে টেনে নিয়ে যায়। আর চুল্লুত করে নিজের সিটের নিচে ফেলেও দেয় সে বইটারে। উয়ে এমুন করলো ক্যান!

ওমা রে, আপায় দেখি আমার সামনে খাড়া! আপায় তাইলে আমারেই এতোক্ষণ এমনে ডাক দিতাছিলো! হায় হায়, আমি তো খেয়াল করি নাই।

‘এই তুমি?’ আপা কড়কড়া চোখে আমাকে দেখতে দেখতে বলেন, ‘বলো, পরোটা বানানোর উপকরণ সম্পর্কে বলো।’

পরোটা বানানোর উপকরণ সম্পর্কে আমি আবার কবে জানলাম? জানি না তো। তাইলে উত্তর দেবো কী! মাথাটা ঠান্ডা থাকলে নাইলে বলতে পারতাম যে, পরোটা বানানোর জন্য দরকার হইলো ময়দা। কিন্তু আমার মাথা কী ঠান্ডা নিকি! কই মাসুদ রানা কোনখানে ‘দুর্গম দুর্গ’, আর কোনখানে ক্লাস আর পরোটা বানানোর উপকরণ! হায় হায় রে!

‘বেয়াদ্দব মাইয়া! পড়ার নামে ঠনঠন! খালি ইস্কুলে আসুন্তি আর যাউন্তি? ধরো, কানে ধরো দুই হাতে। তারবাদে জলদি বেঞ্চির উপরে উইট্টা খাড়াও। এক্ষণ।’

আমাকে বেঞ্চির ওপরে দাঁড় করায়ে আপা তাঁর চেয়ারে ফিরে যান। আমার দুই হাত ধরে আছে দুই কানের লতি। পুরাটা ক্লাস কিনা থেকে থেকে ঘাড় ফেরাচ্ছে আমার দিকে। কী শরমের বিষয়। কষ্টে আমার চোখ ফেটে যেতে থাকে। অনেক ফেটে যেতে থাকে। তারমধ্যে বকুলি কিনা আমাকে হুশিয়ারি চালাতে থাকে: ‘খবরদার কান্দিস না কইলাম। তাইলে অন্য ছেড়িরা তরে লইয়া হাসাহাসি করবো। আমারেও কইলাম টিটকারি দিবো অরা। একদম কান্দিস না কইতাছি।’

‘হ। কান্দন কি আমার হাতে নিকি! কান্দন হইলো আমার চক্ষে। চক্ষেরা আমার কথা কোনোদিন মান্যি করছে? কোনোদিন আমার কথা কানে নেয় নাই।’

‘আঁখি বান্দরনি! কান্দন সামলান্তি দেস যুদি, তাইলে তরে একটা অনেক ভালা জিনিস দেখামু!’ বকুলে কেমন ফুঁসলানি দেয় দেখো! এইটা যে মিছা স্তোক, আমি বুঝি ধরতে পারতাছি না সেইটা?

‘এই যে দেখ, আমার পত্রমিতার চিটি আইছে।’ বকুলি ফিসফিস করেই চলে, ‘তুই না এমুন চিটি পড়তে চাস? আপায় যাওয়া মাত্র, পড়া ধরিস তাইলে। হোনছস? কান্দবি না কিন্তু!’

ওই তো বকুলির বইয়ের ভেতরে একটা ইনভেলাপ যেন দেখা যায়! বকুলেরও পত্রমিতা হইছে তবে!

ইইশ, ক্লাস শেষের ঘণ্টি বাজতে কতো দেরি!


আমাদের নিরুদ্দেশের ট্রেন : ১ম পর্ব
আমাদের নিরুদ্দেশের ট্রেন : ২য় পর্ব
আমাদের নিরুদ্দেশের ট্রেন : ৩য় পর্ব


[বি. দ্র. লেখকের নিজস্ব বানানরীতি অনুসরণ করা হয়েছে।]

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

বাংলা ভাষার একজন ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও গল্পকার। আকিমুন রহমানের গ্রন্থসমূহ হলো : ‘আধুনিক বাংলা উপন্যাসে বাস্তবতার স্বরূপ (১৯২০-৫০)’, ‘সোনার খড়কুটো’, ‘বিবি থেকে বেগম’, ‘পুরুষের পৃথিবীতে এক মেয়ে’, ‘রক্তপুঁজে গেঁথে যাওয়া মাছি’, ‘এইসব নিভৃত কুহক’, ‘জীবনের রৌদ্রে উড়েছিলো কয়েকটি ধূলিকণা’, ‘পাশে শুধু ছায়া ছিলো’, ‘জীবনের পুরোনো বৃত্তান্ত’, ‘নিরন্তর পুরুষভাবনা’, ‘যখন ঘাসেরা আমার চেয়ে বড়ো’, ‘পৌরাণিক পুরুষ’, ‘বাংলা সাহিত্যে বাস্তবতার দলিল (১৩১৮-১৩৫০ বঙ্গাব্দ)’, ‘অচিন আলোকুমার ও নগণ্য মানবী’, ‘একদিন একটি বুনোপ্রেম ফুটেছিলো’, ‘জলের সংসারের এই ভুল বুদবুদ’, এবং ‘নিরুদ্দেশের লুপ্তগন্ধা নদী’।

আকিমুন রহমান ভালোবাসেন গন্ধরাজ আর বেলীফুল আর হিজলের ওড়াভাসা! আর তত্ত্বের পথ পরিক্রমণ! আর ফিকশন! ঊনবিংশ শতকের ইউরোপের সকল এলাকার গল্পগাঁথা আর এমিল জোলার কথা-বৈভব! দূর পুরান-দুনিয়ায় বসতের সাথে সাথে তিনি আছেন রোজকার ধূলি ও দংশনে; আশা ও নিরাশায়!

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।