রবিবার, আগস্ট ২৩

আমাদের নিরুদ্দেশের ট্রেন : ২য় পর্ব

0

এ বিরতি না-ফুরন্ত

ক.
বড়োরা যে কেমন! মনের ভেতরের আলাপ-সালাপ-সল্লা-টল্লা, তা কেবল বড়োরা বড়োরাই করে। সেই বলাবলির সময়ে, কখনোই ছোটোদের কাউকেই, তারা নিজেদের আশেপাশে থাকতে দেয় না। বড়োদের কথা-মথা নাকি পোলাপানদের শুনতে নাই! ওদিকে নিজেরা নিজেরা যখন কথা বলতে থাকে, তখন এমন এমন জোরে তারা একেকজনে কথা বলে রে! দেখো, তখন পোলাপানেরা, অনেকখানি আউলে থেকেও, সবই শুনে ফেলতে পারে।

নানাবাড়িতে মেহমান হয়ে থাকতে এসে, আমরা ভাই-বোনেরা তখন কেবল ইতি-মিতি চেয়ে থাকতে থাকি। এরপর আমরা কী করবো! এখানেই থেকে যাবে? নাকি আব্বা আমাদের নিয়ে আবার ট্রেনে চেপে বসবেন, আগের মতো?

সেইটাই যে হবে, অমনই মনে হতে থাকে আমাদের সবকয়জন ভাইবোনের। যদি এইখানেই আমরা থেকে যেতাম, তাহলে তো, আমাকে কোনো স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হতো এই কয়দিনে! আম্মার এই জমি কিনে ওঠার আগে, আমরা ছিলাম রংপুরে। সেখানে আমার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করে, তারপরেই, নানাবাড়ির দেশে আসা হয়েছে।

তবে একটু আউলে থেকে থেকে শুনে শুনে বুঝে যাই যে, আমাদের কেনা এই জমিটাকে বসতভিটি করে তোলার মতো মাটি ফেলার কাজ শেষ করেই আব্বা ঢাকা ছাড়বেন। এইবার অবশ্য অবশ্যই রাজশাহীতে যাওয়া লাগবে। অন্য কোনোদিকে না। অফিস এটাই চায়। কাজেই এই ট্রান্সফার অর্ডার মানতেই হবে।

আমাদের বড়োরা এই থাকা বা যাওয়ার বিষয়ে, কিচ্ছুই বলে না তাদের পোলাপানদের। তবে একটু আউলে থেকে থেকে শুনে শুনে বুঝে যাই যে, আমাদের কেনা এই জমিটাকে বসতভিটি করে তোলার মতো মাটি ফেলার কাজ শেষ করেই আব্বা ঢাকা ছাড়বেন। এইবার অবশ্য অবশ্যই রাজশাহীতে যাওয়া লাগবে। অন্য কোনোদিকে না। অফিস এটাই চায়। কাজেই এই ট্রান্সফার অর্ডার মানতেই হবে।

তখন হাসি-ঢলকাতে-থাকা গলায় আম্মাকে বলতে শোনা যায়: ‘অফিস চাইতাছে, নাকি তোমার পরানই তড়পাইতাছে রাজশাহীর লেইগা, হেইটা গায়েবের মালিকে জানে। আর জানো তুমি।’

 

খ.
শিগগির করেই মাইট্টাল-কামলাদের কাজ শুরু করতে দেখি আমরা টোনামোনা পোলাপানরা। মাইট্টাল-কামলারা অনেকজন আসে, কর্ম করার জন্য। অনেক অনেক জনে, মাটিতে কোদাল খেতলাতে থাকে। কোপ পড়তে থাকে ঘুস্সুপ ঘস্সুপ ঘস্সুর। আর, কোদালে মাটি তুলে তুলে তারা রাখতে থাকে বাঁশের পাতিতে। সেই পাতির দিকে তারা তারপর আর চেয়েও দেখে না। অন্য মাইট্টাল-কামলাদের অনেকজনে সেই পাতি মাথায় নিয়ে নিয়ে জমির পশ্চিম দিকে আগাতে থাকে, আর কিনার ঘেঁষে ঘেঁষে ফেলে যেতে থাকে।

ভিটি বান্ধার এমন বুঝি নিয়ম?

রোজ রোজ মাটি ফেলে ফেলে, খানাখন্দঅলা নিচা খেতটার সবখানি পশ্চিম অংশ, ক্রমে ফাঁপিয়ে তুলতে থাকে জোগালি-মাইট্টালরা। আর পুবের দিকে অনেকখানি বড়ো-মতো একটা গর্ত; নিচু হতে হতে আরও গহন নিচু হয়ে যেতে থাকে। সেই গর্তের চার কিনারাই, খাড়া হুম হুম। আর কোন সেই নিচের নিচে, তার পাতাল! ওপরের কিনার থেকে উঁকি দিয়ে দেখতে গেলে, শরীর ঝাকনা দিয়ে ওঠে। মাগ্গো মা! কেমুন নিচার নিচা, ওই খন্দের তলা!

দুপুরের খর-পটকর রইদের মধ্যেই শুধু সেই পাতালের গহনতাকে স্পষ্ট করে বোঝা যায়। সেই কারণে, শুধু সেইসময়েই আমি ওই পাতালের দিকে উঁকি দিতে যেতে থাকি।

বাড়িতে রোজ দুপুরের কালে, থাকার মধ্যে থাকি আমি, আর আমার অতি পিঠের অতি কাছের পাঁচ ভাইবোন। নানুর দেশে আম্মার যত যত বোন আছে, তারা সকলে খালি বলে, ‘এটি হইলো এমা-ডেমা-পাই-সিঁকি। অখনও মাটির লগে গুঁড়গুড়ায়। অরা ডাঙর হইতে হইতে কিয়ামত আইয়া পড়বো। ঝুনা বুজিয়ে কেমনে এই কয়টারে সামলান্তি দিবো, কে জানে।’

সেই আমরা, ঠিক দুপুরের বেলায়ই রোজ, কম-সম করে হলেও ওই পাতালেরে দেখতে যেতে থাকি। হালকা-পলকা একটু উঁকি দেই কী দেই না, পলকের মধ্যে ডরের ঝাকনা পেয়ে যাই। ডর না পাই কেমনে? আমরা ভাইবোন কয়টায়, হালকা মতো একটু উঁকি দেই কী দেই না, মাইট্টাল-কামলা মামুরা চিল্লানি শুরু করে। এমন ঝাক্কুর চিল্লানি শুরু করে! সেই চিল্লানির ঝুঙ্কার অনেক ধাক্কা দিতে থাকে আমাদের শরীরটাকে। অনেক কেমন রকমের জানি ডর পেতে থাকি আমরা। ‘আ গো মুরুব্বি মাতারিরা! অগো নানী! জলদি আহেন গো এই মুড়া। আইয়া, আপনেগো পোলাপাইনগিলিরে বাইত নেন। খন্দে আইয়া ফুচকি দিতাছে একেকটায়। পইড়া না-জানি হাত-পাও ভাঙ্গে। হোনলেন গো মা-খালারা?’

সেই চিল্লা-মাল্লা শুনে কে আগায়ে আসে? নানু আসে না। আসে আম্মা। আম্মার হাতে তালের পাঙ্খা উল্টা করে ধরা, অই দেখা যায়! তালের পাঙ্খার ডাটির বাড়ি পড়লে, শরীর না ঝল্টাত ঝল্টাত জ্বলুনি দিয়ে ওঠে। ও মা!

অনেকদিন যায়। তারবাদে একদিন, এই মাটি কাটা নিয়ে; আমাদের বড়োদের সাথে মাইট্টাল-কামলাদের কথা-বাজাবাজি শুরু হয়। বাড়ির বড়োরা মনে করতে থাকে, ওই যে পাতালের মাটি, সেই মাটি এখনও শুকনা খটফট। কাজেই আরও মাটি, কেটে তোলা যাবে। ভিটি আরও কদ্দুর উঁচা করা যাবে। খন্দের মধ্যে তো পানি উজান্তি দেয় নাই। কাজেই পাতাল দূরেই আছে।

কিন্তু মাইট্টালরা বাড়ির মুরুব্বিদের সেই কথা শুনেই, চিকির দিয়ে ওঠে। রোজই তখন। চিকির দিতে দিতে বলে, ‘না না। আপনেগো আন্দাজ হাছা না। তলের মাটি এট্টুও হুগনা না। এইদ্দেহেন, মাটি কেমুন ভিজা ভিজা। কুনসুম না জানি পাত্তালের পানি হুড়বুড়াইয়া জাগনা দিয়া দেয়! হেমুনটা অওনের আগে, আলা আর যেট্টুক মাটি কাটোন যায়! সম্ভব, আউজকাই, এক বেলার বেশি মাটি কাটোন যাইবো না।’

এই বলে বলে তারা খন্দের তলে, পানির জাগনা পাওয়ার জন্য, বেতালা হতে থাকে। কিন্তু পানি ওঠার কোনো নমুনাই দেখা যায় না।

চুক্তি থাকে এমন যে; পাত্তালের পানি জাগনা না দেওয়া তরি, তারা মাটি কাটবো, মাটি ফেলে ফেলে ভিটি বান্ধতে থাকবো। কিন্তু তিরতিরা কইরাও যুদি পাত্তালের পানি জাগনা দিয়া দেয়, তখন কাম বন্ধ। তা সেই যেট্টুক মাটি কাটার কর্মই ততদিনে হউক গা না ক্যান, তার হিসাব মাইট্টালে দেখবো না।

সেই তখন; মাইট্টালরা নিত্য দিন ভোর ভোর এসে, মাথায় বিড়া বসায়ে তার ওপর পাতি রাখার আগে, খন্দের নিচার দিকে উঁকি দিতে ছোটে। ‘পাত্তালের পানি জাগনা দিছে? নাকি দেয় নাই! অইদ্দেহো! আউজকাও তো পানি জাগনা দিলো না। কেমুনটা লাগে!’

তারা এমন মাইট্টাল, যারা দিনকার রোজ ধরে ধরে মজুরি নেয় না। তারা চুক্তির কর্ম করে। চুক্তি থাকে এমন যে; পাত্তালের পানি জাগনা না দেওয়া তরি, তারা মাটি কাটবো, মাটি ফেলে ফেলে ভিটি বান্ধতে থাকবো। কিন্তু তিরতিরা কইরাও যুদি পাত্তালের পানি জাগনা দিয়া দেয়, তখন কাম বন্ধ। তা সেই যেট্টুক মাটি কাটার কর্মই ততদিনে হউক গা না ক্যান, তার হিসাব মাইট্টালে দেখবো না।

‘অন্য অন্য গৃহস্থবাড়ির খন্দগুলা বহুতই সু-খাসলতের। সেইখানে তিড়িবিড়ি একটু-সেকটু মাটি কাটা হয়ও না, অমনেই ঝুপঝুপায়ে পানি উঠে আসে পাতালের অতল থেকে। আর এইখানের, এই ভিটির খন্দটা কেমুন বেজাইত্তার বেজাইত্তা। এইটায় তো বহুত জিল্লতি দিতাছে! মাটি কাটা হইতাছে তো হইতাছেই। খন্দ নিম্নের তেনে নিম্নে যাইতাছে গা। তাও পানির দেখা নাই। এইটা তাইলে কুসাইদ্দা খন্দ। অপয়া। বোঝাই যাইতাছে অপয়া।’

সকালের দফার মাটি কাটা শেষ করে, মাইট্টালরা গামছার গিট্টু খুলে খুলে; বাটি নাইলে ছোটোমোটো গামলার ঢাকনা উদাম করতে থাকে। সকলের বাটি-গামলায়ই ভাত। আর কেমন কেমন দেখতে সালুন। বেগুন আলুর মাখামাখা কটকট্টা হলুদ সালুন। তারা সেই সালুন আর কড়কড়া ভাত মুখে নিতে নিতে আমাদের খন্দটাকে অমন অমন নিন্দা করতে থাকে।

সেইকথা কি নানুর কানে যায় না নাকি? খুব যায়। কুকথা কি কানে না গিয়া পারে? কিন্তু নানু মুখ কালো করে করে মাইট্টালদের কুকথাগুলা কেবল শোনে। তাদের কোনোরকম বকাবাদ্য করতে যায় না। অথচ অন্য সকলখানে, কোনো মন্দছন্দ হতে দেখা মাত্রই নানু বকা দিতে একটু যদি দেরি করে!

‘কি গো বুয়া? মাইট্টাল বেটাগিলিয়ে এই যে এমুন কুকতা কইতাছে, আপনে দেহি হেগো চোপা করতাছেন না? এমুন আজাইরা কুকতা নি সইজ্জ হয়! দিমু নি মুইড়া পিছা দিয়া কয়টা বাড়ি?’ আমাদের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠা যে ভগিনী, আমাদের মামার কন্যা, পরীবানু বুজি তার দাদিকে নানামতে উস্কাতে চেষ্টা দিতে থাকে।

পরীবানু বুজি অনেক কাইজ্জা-পসন্দ এক মাইয়া। নিত্যি এই মেয়েরে, যেন ঢোকে ঢোকে, কোনো-না-কোনো দুশমন খুঁজে পাওয়া লাগেই। তারবাদে বিবাদে নামা তার চাইই। প্রথমে ঠান্ডা সরল জয়-জিজ্ঞাসা দিয়ে শুরু হয় সেই বিবাদ। তারপর আচমকাই ফল্লাত করে চড়ে ওঠে পরীবানু বুজির গলা। সেই গলার চিক্কুর চিল্লানি চলতে থাকে চলতেই থাকে। একটু একটু করে তার গলা ভেঙে হ্যাড়ব্যাড়া হয়ে শেষ, তাও ফুস্সুর ফুস্সুর আওয়াজ দিয়ে দিয়ে কাইজ্জা চালাতে ছাড়ে না আমাদের বুজি।

শেষে মামানীরে রান্ধনঘর থেকে ছাইদাঁড়া হাতে নিয়ে তবড়-খবড় পায়ে আগায়ে আসতে হয়। কোনো কোনো দিন পরীবানু বুজি কাইজ্জার এমনই জোশে থাকে যে, মামানীর আসাটা তার নজরে পড়ে না। তখন আর কী। বুজি ছাইদাঁড়ার বাড়ি খেতে থাকে। খুব খেতে থাকে। খাব্বুর-খুব্বুর বাড়ি। যেদিন বুজি কাইজ্জার জোশ কম পায়, সেদিন মামানীর পায়ের আওয়াজ শুনেই সে চুল্লুত লৌড় দেয়। দিশাবিশা ছাড়া লৌড়। পেছন থেকে তার মায়ের শাসানী তারে এমন দৌড়ানী দিতে থাকে যে, সে থামাথামির কথা মনেও আনে না।

‘লৌড়াইয়া পলাইয়া তুই, নিস্তার পাবি রে কাইজ্জা-খুরনী? বাইত আইয়া ল তুই, আউজকা তর একদিন কী আমার একদিন।’ আমাদের মামানী এইমতে তখন হুঁশিয়ারি দিতে দিতে, শেষে তার শাশুড়ির দিকে ফেরে: ‘এই যে আপনের নাতিনে এমুন কাইজ্জাখোর হইতাছে, আপনে দেহেন না? আপনের চক্ষে কি খুয়া পড়ছে? এমুন কাইজ্জাখোর মাইয়ারে নি কেউঅই তাগো সংসারে নিতে আইবো!’

‘না আইলে না আইবো। তুই অহন তর চোপা বন কর, পরীবানুর মা।’ এইতাই শুনতে শুনতে মামানী মাটিতে পা-বিছায়ে বসে পড়ে, আর মিনমিনায়ে কান্দন শুরু করে।

 

গ.
তো, অই যে মাস দুয়েক হয় মাইট্টাল-কামলারা নয়া ভিটি বান্ধনের জন্য মাটি কেটে যাচ্ছে; তাদের কাজকারবার যেন বড়োই ফাঁকিজুকিতে ভরা। তারা যেন কর্মে বহুত ঢিলামি দিতাছে। সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে, পরীবানু বুজি তার গুঁড়াগাড়া ভাইবোনগুলারে ওই সত্যকথা জানান দিয়ে যায়। বিকালে ফিরেও মাটি-ফেলার কর্মরে একটা ফুঁচকি দিয়ে দেখে আসতে আলসেমি হয় না তার।

‘বেটাগিলিয়ে কি কম টেকা নিবো? কত্তাটি টেকা নিবো গা অরা। টেকা নিতে আলস্যি নাইক্কা, কিন্তুক কামে নিকি এমুন চোট্টামী দিতাছে! চোট্টা বেটারা।’ পরীবানু বুজি তখন মস্ত বড়ো কেলাসে পড়তে থাকা একজন। পুরা সে সেভেনে পড়ে। সে জ্যামিতি অ্যালজেব্রা সব পারে। অঙ্কও কিছু কম পারে না। কাজেই কামলাগো চোট্টামী সে ধরবো না তো কে ধরবো।

‘আমার ছোটো ফুবাজীরে না-বুঝ মানুষ পাইয়া, মাইট্টাল বেটাগিলিয়ে কর্মে এমুন নয়ছয় জোড়াইছে। এটিরে জোতা দিয়া মাইর দেওনের কাম।’

এমতে পরীবানু বহুত তড়পানি পেতে থাকে। কিন্তু সে কেলাস সেভেনে পড়লে কী; মাইট্টাল কামলাগুলির সব কয়জনের তুলনায় সে ছোটো একটা ছেড়িই তো। অইগিলির লগে কাইজ্জা করতে গেলে, সেয় জোঝাইয়া পারবো কেমনে! যুদি সেয় তার বুয়ারে লগে পায়, তাইলে ইচ্ছামতোন গালি সেয় দিতে পারে। কর্মে ফাঁকি দেওনের মজাখান, সেয় বুঝাইয়া দিতে পারে। এই ভাব-ভাবনা নিয়ে পরীবানু তার বুয়ারে কতোমতে যে উস্কানী দিতে থাকে। কিন্তু বুয়ায় কিনা বুড়া হইয়া গেছে। সেয় কোনো উস্কানীরেই কানে তোলে না।

উল্টা কয়, ‘আলো নাতিন, কামলারা যে পাতালের পানি উটুন্তি নিয়া অমুন কইতাছে, সেইটা হুদা কোনো উটকা কথা না। জানবি, সকল ফকিরও ভুয়া না, সকল জঙ্গলও খালি না। অগো কতা উড়াইয়া দেওনের কিছু নাই। খনার মায়েই অমুন কতা কইয়া গেছে।’

তাইলে এখন করা কী? পুষ্কুনী কাটা হইছে, মাটি তো বহুত তুলে ফেলা হইছে। কিন্তু পানি না-ওঠার কারণ কী! এর তো বিহিত করা লাগে।

কেমনে ওই বিহিত করা?

সেই সন্ধ্যায় মাইট্টাল-কামলারা দিনের কর্ম সেরে বিদায় নেয় একদিকে, আমাদের নানু কুপি হাতে নিয়ে নামতে থাকে আমাদের সেই পানি-না-ওঠা খন্দের তলের দিকে। খন্দের ওই ভেতর থেকে মাটি নিয়ে ওপরে ওঠা ও নামার জন্য থেবড়া থেবড়া সিঁড়িমতো করে নিয়েছে মাইট্টালরা। ওই সিঁড়িমতো বাঁকা-বোকা জায়গা দিয়ে দিয়েই তো তারা ধপর ধপ ওঠে আর নামে; আজকে অনেকদিন ধরে। নানু সেই সিঁড়িমতো ধেবড়া জায়গাগুলাতে পা রেখে রেখে নামতে থাকে। পেছনে কুলা কাঁখে নিয়ে আমাদের শহরবানু খালাম্মাও নেমে চলে।

কুলাতে আগরবাতি রাখা আছে। একটা তেলভরা ছোট্ট মাইট্টা পিদিম আছে। সাতখানা ঝুমকাজবা আছে, আর আছে এক খোরা ক্ষীর। এইগুলা সবই হলো ভোগ। মা-খাকী পাতালেরে তুষ্ট করার জন্য, এই ভোগ। পিদিমখানা জ্বলবে, যতক্ষণ তেল থাকে। বাকি সবকিছু অতি তরিজুত করে খন্দের মাটিতে রেখে মিনতি করা লাগবে। পাতাল জননী য্যান দয়া করে। পানি য্যান আহে এই রাইতের মিদেই।

পেছন থেকে পরীবানু বুজি হুড়ুম-খাড়ুম ডাক-চিক্কার দেওয়া শুরু করে। ‘ও বুয়া গো! আমারেও নেন গো লগে। আমিও হিগমু এই গুহ্যকর্ম। বুয়া গো, আমারেও নেন লগে। আহি আমি? নামোন শুরু করি? ও গো বুয়া! আমিও আমু গো! আমারে থুইয়া যাইয়েন না গো।’

নানু আর শহরবানু খালাম্মা পা তুকে তুকে অর্ধেকটা মাত্র নেমেছে, পেছন থেকে পরীবানু বুজি হুড়ুম-খাড়ুম ডাক-চিক্কার দেওয়া শুরু করে। ‘ও বুয়া গো! আমারেও নেন গো লগে। আমিও হিগমু এই গুহ্যকর্ম। বুয়া গো, আমারেও নেন লগে। আহি আমি? নামোন শুরু করি? ও গো বুয়া! আমিও আমু গো! আমারে থুইয়া যাইয়েন না গো।’

‘দ্যাখছো, দ্যাখছো কারবার! দিলো নি পিছের তেনে ডাক! দিলো নি ভেজাল বান্ধাইয়া! এই মাইয়ায় ত্তো হুদা ডাঙসাইল্লা, বিজাতের কাটোল। এই ছেড়িয়ে না-জানি বংশে কোন শনি আনে!’ শহরবানু খালাম্মা নিচাগলায় আফসোস শুরু করে। নানু কিচ্ছু যেন শোনে না, কিচ্ছু যেন বলতেও জানে না।

কেমনে বলবে! এই ব্রতে বোবামুখে থাকতে হয় যে! নানু জানে, সন্ধ্যাকালে পরীবানু তার অন্য ভাইবোনের সাথে লজিং স্যারের কাছে পড়ায় আছে। কাজেই তারে নিয়ে এই সময়ে ঝামেলা হওয়ার কিছু নাই। শান্তিমতো নানু ব্রতখানা পালন করে আসতে পারবে। এমন আশাই ছিলো তার পরানে। কিন্তু এই যে পরীবানু, সে না উইড়া যায় পইখের পাখ গোনতে জানে! সে বুঝি ধরতে পারবো না এই ব্যাপারখান! ঠিকই দেখো সে ধরে ফেলছে। অই ত্তো দেখো, তার বুজি কোন গুপ্ত কর্ম সাধন করতে যাইতাছে! সেয় তখন কি মোখ বুইজ্জা থাকবো নি?

পরীবানু তার বুয়ার সঙ্গে খন্দের গহীনে যাওয়ার হুকুম পায় না বলে চুপমুখে বেজার হয়ে বসে থাকে না তো। সে খন্দের কিনারের মাটিতে লেটকে পড়ে গোঙাতে থাকে। আমারে নিলো না গো! আমারে নিলো না। কেউ তারে সেই সন্ধ্যার কালে মাটি থেকে তোলার শক্তি পায় না। সে কোনো একটা বুঝের কথা শুনতে চায় না। কেবল গোঙাতে থাকে।

নানু ব্রত কর্ম আর শান্তিমতো সাধন করবে কেমনে। কোনো মতে পিদিমখান জ্বালায়ে, ভোগটুক রেখে মাটিরে সেলাম দেয়। তারবাদে হেচড়ে-খেচড়ে ওপরে আসে। তার নাতিনে নি এমনে বিলাপ দেয়! এমনে মাটিতে লেটকায়! আচ্ছা, সকালে তাইলে পরীবানু একাই পাতালে গিয়ে, নিভন্ত পিদিমখানারে তুলে নিয়ে আসবে নে। অইটা অমন তুলে আনারই রেওয়াজ আছে।

যুদি রাইতের মিদে পানি উইট্টা যায়?’ পরীবানুর কান্দন থামতেই চায় না।

‘তাইলে বইন আল্লার শুক্কুর। আইচ্ছা, তহন তরে জোলাভাতি খেলোনের লেইগা একটা সিকি দিমু।’ নানু কড়ার করে।

ওমা, ভোর সকালে দেখো খন্দের পাতাল যেমন শুকনা ছিলো তেমনই পড়ে আছে। পানির নামনিশানাও নাই। তাইলে তো পরীবানুর এক্ষণ নামা দরকার। মাইট্টাল-কামলারা আসার আগে আগেই নেমে গিয়ে, পিদিম আর ক্ষীরের খোরাখানা নিয়ে আসা দরকার।

নামা শুরু করার আগে আমাদের পরীবানু বুজি আমাকে চুপেচাপে ঠেলে-মেলে জাগনা করায়। ‘বুজি, ক্যান ডাকেন?’

‘আহোস না বইন, আমার লগে? পিদিমটি লইয়া আহি গা? একলা আমি অতো কিছু আনতে পারমু না।’

‘আমি যামু? আমি গেলে, নানু যুদি রাগ করে?’

‘এট্টুও রাগ হইবো না বুয়ায়। দেহিস। চল চল, বেইল উইট্টা যাইতাছে। চলো বইনা।’

নামার সময় পরীবানু বুজি নামে আগে আগে, আমি পেছনে পেছনে। জেবড়ে-হেবড়ে দম টানতে টানতে। বুজি নেমেই পিদিমটারে খেবলে তুলে নেয়। আর ক্ষীরের খোরাটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, ‘এইটা হাতে ধইরা তুই মাটিত লেটকি দিয়া ব। বইয়া চউখ বুইজ্জা থাক।’

‘ক্যান বুজি? আমি বমু ক্যান? লন, আমরা যাই গা।’

‘আরে ছেড়ী। ব। ব। চউখ বোজ জলদি। এই যে আমিও বইতাছি।’ বুজিও বসে আমার পাশে। তারপর বলে, ‘আমি এট্টু দোওয়া পড়তাছি। চউখ বুইজ্জা দোয়া পড়তাছি। তুই চউখ খুলিস না। কতাও কইস না কইলাম। তাইলে বিপদ হইবো। চুপ থাক। চুপ।’

অনেকক্ষণ যায়। বুজির দোওয়া-পড়া শেষই হয় না। অনেকক্ষণ যায়। আমি আর কতোক্ষণ চোখ বন্ধ রাখবো! পরীবানু বুজি! ও বুজি!

বুজি কোনো কথা বলে না যে! ভয় লাগতে থাকে আমার, আর আপনা থেকেই চোখ খুলে আসে।

ওমা! বুজি তো আমার পাশে বসা নেই। বুজি এই খন্দের কোনোখানে নেই। ওমা!

‘তরে পাতাল মা-খাকীরে দিয়া আইছি। তরে ভোগ দিছি!’ দূর উঁচু থেকে বুজির গলা আমার দিকে নামতে থাকে। ‘তগো পুষ্কুনী না? তরে খাইতে পারলেই মা-খাকীয়ে তুষ্ট অইবো। এই ভোগ পাইয়াই অহন পাত্তালে, পানিরে উটতে দিবো।’

নানু! আমার চিক্কুর কি পাতালের গহীনে যেতে থাকে, না আমার পাও দুইটা মাটি মা-খাকীয়ে তার ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে! নানু গো!

আব্বা যে কেন এইখানে নিয়ে আসলো! আম্মা যে কেন খালি জিদ্দি হয়। কেন রাজশাহী গেলো না আম্মা! নানু!


আমাদের নিরুদ্দেশের ট্রেন : ১ম পর্ব


[বি. দ্র. লেখকের নিজস্ব বানানরীতি অনুসরণ করা হয়েছে।]

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

বাংলা ভাষার একজন ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও গল্পকার। আকিমুন রহমানের গ্রন্থসমূহ হলো : ‘আধুনিক বাংলা উপন্যাসে বাস্তবতার স্বরূপ (১৯২০-৫০)’, ‘সোনার খড়কুটো’, ‘বিবি থেকে বেগম’, ‘পুরুষের পৃথিবীতে এক মেয়ে’, ‘রক্তপুঁজে গেঁথে যাওয়া মাছি’, ‘এইসব নিভৃত কুহক’, ‘জীবনের রৌদ্রে উড়েছিলো কয়েকটি ধূলিকণা’, ‘পাশে শুধু ছায়া ছিলো’, ‘জীবনের পুরোনো বৃত্তান্ত’, ‘নিরন্তর পুরুষভাবনা’, ‘যখন ঘাসেরা আমার চেয়ে বড়ো’, ‘পৌরাণিক পুরুষ’, ‘বাংলা সাহিত্যে বাস্তবতার দলিল (১৩১৮-১৩৫০ বঙ্গাব্দ)’, ‘অচিন আলোকুমার ও নগণ্য মানবী’, ‘একদিন একটি বুনোপ্রেম ফুটেছিলো’, ‘জলের সংসারের এই ভুল বুদবুদ’, এবং ‘নিরুদ্দেশের লুপ্তগন্ধা নদী’।

আকিমুন রহমান ভালোবাসেন গন্ধরাজ আর বেলীফুল আর হিজলের ওড়াভাসা! আর তত্ত্বের পথ পরিক্রমণ! আর ফিকশন! ঊনবিংশ শতকের ইউরোপের সকল এলাকার গল্পগাঁথা আর এমিল জোলার কথা-বৈভব! দূর পুরান-দুনিয়ায় বসতের সাথে সাথে তিনি আছেন রোজকার ধূলি ও দংশনে; আশা ও নিরাশায়!

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।