শুক্রবার, এপ্রিল ১৯

রসুইঘরের কথামৃত : হিল্লোল দত্ত

0

‘পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে নিরাপদ স্থান ছিল আমার মায়ের বাড়িটি।’ [‘আর কোনোখানে’ —লীলা মজুমদার]

অনেক দিন ধরেই আমি ভেবেছি, প্রায়ই সসংকোচে, অন্তত যখন থেকে জেন্ডারবৈষম্যের শিকার নারীদের কথা অনুভবের শক্তি হয়েছে, তখন থেকে, যে সাহিত্যে কি নারীসুলভ কিছু আছে, যাকে চলতি কথায় বলে মেয়েলি? আমার মনে হতো, ফেমিনিনিটি যে মূলত সমাজজাত, এই সদ্যলব্ধ নারীবাদী জ্ঞান থেকে, এর ওপারেও কিছু আছে যেটা একান্তভাবেই নারীদের করতলগত, যেখানে ঠিক পুরুষ হয়ে প্রবেশাধিকার মেলে না। কিন্তু চোখ রাঙিয়েছেন সিমন, কেউ নারী হয়ে ওঠে না, তাকে নারী করে তোলা হয় বলে। তাই ভয়ে থেকেছি ভুলভাল ভেবে পলিটিক্যালি ভ্রান্ত হয়ে খারিজ হয়ে যাই কি না। কিন্তু পরে দেখি, কেউ কেউ ভেবেছেন এই নিয়েও। বস্তুত অন্দরমহল তো বটেই, হেঁশেলের হাঁড়ির চারপাশে পুরুষালি আনাগোনা নিতান্তই সীমিত, সে হোক সাহিত্যে কি জীবনে। কিন্তু নারীবাদীরা চোখে আঙুল দিয়ে স্পষ্টভাবেই দেখিয়ে দিচ্ছেন, যেসব কাজ মেয়েদের বলে নাক সিঁটকান পুরুষেরা, সেগুলোর অনেকগুলোই পুরুষেরা রীতিমতো পেশাদারিভাবেই করেন, যেমন: বাবুর্চিগিরি বা দর্জিগিরি। আরেকটু এগুলে জ্যানিটর বা পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের কথাও আসতে পারে কিন্তু।

বাকবিতণ্ডা থাকুক। বলছিলাম আসলে বাঙালি লেখকদের মধ্যে নারীদের কারো কারো লেখায় কিছুটা মেয়েলি জগতের সেই রূপরসস্পর্শ মেলে, কেউ প্রতিবাদ করলে নিশ্চয় সেটা তাঁর বাকস্বাধীনতা। কিন্তু অন্দরমহলের যে বিবরণ, সেটা ছাড়াও লেখায় মায়ামমতা, আকুলতা, স্নেহপ্রেম এসবের নারীচিহ্ন কিন্তু পুরুষদের সবার লেখায় খুব সুলভ নয়। কথা হচ্ছিল বাংলার অধ্যাপনায় নিয়োজিত কামরুন নাহারের সাথে। তিনি মনে করিয়ে দিলেন, রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গের কৃষকদের নিয়ে গল্প লিখলেও তাঁদের ঘরগেরস্থালির ডিটেল খুব বিশদে আনেননি, কারণ তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় সেসবের সাথে সেভাবে ছিল না। প্রতিভা দিয়ে তিনি কল্পনার শূন্যস্থান পূর্ণ করলেও স্বীকার করেছিলেন বইকি— ‘আমার কবিতা, জানি আমি, গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী’।

রসুইঘরের রোয়াক ১

রসুইঘরের রোয়াক (প্রথম খণ্ড) | স্মৃতি ভদ্র | প্রচ্ছদ: নির্ঝর নৈঃশব্দ্য | প্রকাশক : নালন্দা | মুদ্রিত মূল্য : ৬৫০ টাকা | বইটি সংগ্রহ করতে এখানে ক্লিক করুন

এদিক থেকে লীলা মজুমদারের প্রতি আমার বিশেষ পক্ষপাত। ঠাকুমাসুলভ স্নেহের সাথে গিন্নিসুলভ পুরুষবিদ্বেষ, মাতৃসুলভ খাওয়ানোর মমতার সাথে লিঙ্গনির্বিশেষ রম্যমিঠে তিনি যতটা অনায়াসে মিশিয়ে করতলগত করেছেন, সে এক অমর্ত্য বিস্ময় বইকি! তাঁর গল্পে এমনকি কিশোরীদের অ্যাডভেঞ্চারেরও প্রমাণ আছে, যেমনটা বাংলার কিশোরসাহিত্যে বিরলতর। মনে রাখতে হবে, তাঁরই একান্ত স্নেহের ভাইপো সত্যজিৎ, যার ছবি আঁকার দক্ষতায় তিনি নিজের ছবি আঁকাই বাদ দিয়েছিলেন, সেই তিনিই তাঁর ফেলুদার গোয়েন্দাগল্প প্রায় নারীচরিত্রবিবর্জিত করে অগুনতি মিলেনিয়াল ও জেন-জির প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন, যার বেশিরভাগ মরণোত্তর হলেও মুখোমুখি কনফ্রন্টেশন একদম ছিল না এমনও নয়, বিজয়া রায় সাক্ষ্য দিয়েছেন। বেগম রোকেয়া সেদিক থেকে অন্য ও অনন্য। তাঁর ‘অবরোধবাসিনী’ পুরুষদের হাত থেকে আসা কিছুটা কম সম্ভবপর হলেও সুলতানার স্বপ্ন একান্তই তাঁর নাড়িছেঁড়া ধন। তবে লীলা মজুমদার পাকপ্রণালির বইও লিখেছেন, আর রোকেয়া প্রচণ্ড ব্যঙ্গ ও ধিক্কার ছুড়ে দিয়েছেন বাঙালিদের, বিশেষত বাঙালি মুসলিমদের, রসনাবিলাস নিয়ে। আবেগের বাহুল্যও ছিল অনেকের। বস্তুত স্বামীবিয়োগে সাহিত্যরচনা, মূলত কবিতা, এবং কবিতাতেই আত্মনিয়োগ করা বাঙালি নারী লেখকদের এককালের কুললক্ষণ ছিল। ছিল আত্মজীবনীর মতো কল্পনাবর্জিত লেখালেখিরও যার শুরু ‘রাসসুন্দরী’ থেকে। ভাবতে অবাক লাগে নারীবাদীদের হাতে, হুমায়ুন আজাদ ও কেতকী কুশারী ডাইসন যুগপৎ, নাস্তানাবুদ হওয়া ঠাকুরবাড়ির ছোটো ছেলেটি তাঁর ‘নষ্টনীড়’ গল্পে অমলের বঙ্কিমি বাংলার সাথে সাত গোলে জিতিয়ে দিচ্ছেন সাদামাটা ভাষায় নিজেদের গ্রামের গল্পলেখক চারুকে। এর পেছনে বঙ্কিমকে একটু চিমটি-কাটার দুষ্টুমি থাকলেও তিনি নিজেই কিন্তু সরলতারই পক্ষপাতী বরাবর। আর, তিনি নিজেও কি অর্ধনারীশ্বর ছিলেন না? নইলে নারীর মনের গহিনগোপন কথা এরকম বর্ণিল আলোয় তুলে আনতেন কিভাবে?

শ্রীমতি স্মৃতি ভদ্র এই গোত্রের সাম্প্রতিকতর সংযোজন। আর দুখণ্ডের বইটির নাম ‘রসুইঘরের রোয়াক’। তাঁর স্বরটি মৃদু, সুরটি বিরহী, সংজ্ঞাটি সরল। তিনি পুরোনো দিনের গল্প বলেন, পুরোপুরি সুনীলের ‘সেই সময়’ বা ‘প্রথম আলো’র মতো জাঁকজমক করে নয় বা বিমল মিত্রের ‘বেগম মেরী বিশ্বাসের’ মতো নিটোল নিবিড় কাহিনির বুননে নয়, বরং কিছুটা কল্যাণী দত্তের ‘পিঞ্জরে বসিয়া’ বা ‘থোড় বড়ি খাড়া’র মতো মজলিসি ধরনে। আরও বেশি মিল খুঁজতে চাইলে হয়তো তুলে নিতে হবে রানী চন্দের ‘আমার মার বাপের বাড়ি’র মতোন মায়া দিয়ে ম্যারিনেট করা আর স্মৃতি দিয়ে সাঁতলানোর লেখালেখি। তবে, কেনই বা মিল খোঁজার হাঙাম? বরং সরাসরিই বলি, বইখানি একটি পাকপ্রণালির বই যার লেখাগুলো সংসারের প্রীতিময় চরিত্রগুলোর মমতা দিয়ে পুঁছে গানের সুর দিয়ে ঝেড়ে গল্প দিয়ে ভেজে স্মৃতিবেদনা দিয়ে ঠেসে অসাম্প্রদায়িকতা দিয়ে মুড়িয়ে দেশকালের টুকরো ছবি দিয়ে জুড়ুতে দেওয়া, যা রসুইঘরের রোয়াক পেরিয়ে ঠাঁই করে নিতে পারে হৃদয়ের অন্তঃপুরে।

বইটির পাতায় পাতায় পথের মাঝে পথহারানোর দিনের কথা। সুরগুলো কানে এসে লাগে হেমন্তের ঝরাপাতার বা শীতের কুয়াশার মতোন। যা ফেলে এসেছি, যার কোল আঁকড়ে ছিলাম তা ভুলে গিয়ে বর্তমানের কর্কশ, রূঢ়, পুরুষ সময় ও জীবনের ধাক্কায় অভ্যস্ত হয়ে গেলে এই লেখাগুলো পড়ে একটু স্মৃতিবেদনায় মজে-যাওয়া নেহাৎ বিরলতর সংঘটন হবে না। কল্লোল লাহিড়ীর ‘ইন্দুবালার ভাতের হোটেলে’ও এই নস্টালজিক দেশভাগের কান্না বেজে গেছে পাতায় পাতায়, কিন্তু নগর কলকাতার কল্লোল গ্রাসও করে নিয়েছে তা বিপুল তরঙ্গ তুলে, গ্রামের বালিকাকে ছুড়ে ফেলেছে অন্যতর জীবনসংগ্রামে, যেখানে নারীর সহায় নারীরাও হয় কিন্তু। স্মৃতি সেভাবে গল্পের বা ইতিহাসের বাঁধনে লেখাগুলো বাঁধতে চাননি। এমনকি এই লেখাগুলোর জাতঠিকুজি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে যে এসব আসলে কোন কাননের ফুল। পুরো ফিকশন তো বলা যায় না, যায় না ঠিক তেমনি নন-ফিকশনও বলা। এমনকি বেল-লেত্রও নয়, নয় প্রবন্ধের ছাঁচে ঢালা। দ্বিতীয় খণ্ডের ভূমিকায় নাহার তৃণা তাই যথার্থই বলেছেন, তবে এই বইটিকে ঠিক আত্মকথা বলা হবে, না স্মৃতিকথা, নাকি কালচারাল এনথ্রপলজির শাখায় রাখা হবে, তার ভার সময়ের ওপর রইল।

রসুই ঘরে রোয়াক ২

রসুইঘরের রোয়াক (দ্বিতীয় খণ্ড) | স্মৃতি ভদ্র | প্রচ্ছদ : রাজীব দত্ত | প্রকাশক : নালন্দা | মুদ্রিত মূল্য ৫৫০ টাকা | বইটি সংগ্রহ করতে এখানে ক্লিক করুন

সময়ের বিচার নিশ্চয়ই যথাসময়ে হবে, কিন্তু পাঠকের বিচারও তো একেবারে তু্চ্ছ নয়। এই বইয়ের অতীতাশ্রয়ী দিন, যা অন্তত তিনচার দশক পুরোনো, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে মখমলমোড়ানো শৈশব। সেই শৈশব, যা আমাদের প্রিয়তম সময়, যা আমাদের অগমগোপনগহন মায়ায় পুনর্বার জড়ায়, যেখানে আমরা সব ঈর্ষাহিংসালালসা ফেলে ঝাঁপ দিতে চাই লিথির জলে, যখন রাজনীতি, সাম্প্রদায়িকতা, ভেদবুদ্ধি আমাদের মানসজগৎ আবিল করেনি, সেই শৈশবে তিনি আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যান। সেখানে খেলে বেড়ায় এক সাতআট বছরের বালিকা, যার দেখার চোখ ও শোনার কান এখনো নির্মলতম, যার হৃদয় এখনো কাকচক্ষুর মতো স্বচ্ছ, যার ভালোবাসার সুগন্ধ এখনো সর্বগ্রাসী। সেই এক্কাদোক্কাবালিকার চোখ আর কান দিয়ে তিনি আমাদের এক একটা পাকপ্রণালির গল্প শোনান। মূল রাঁধুনি সেখানে মা নন কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, বরং ঠাকুমা, যে দুজনকে উৎসর্গ করেছেন প্রথম খণ্ডটি। শাশুড়ি হেঁশেলের ভার ছেড়ে দেননি বৌমার হাতে, মা এখানে নিয়ত নীরব যোগানদাতা মাত্র। আমিষ আর নিরামিষ রান্নার ভেতর অনায়াসগতিতে গতায়াতকারী বৃদ্ধ পিতামহীর আঁচল ধরে টুলটুলে শিশুটি দেখে, মনে রাখে, আর ক্রমশ এক সংস্কৃতির ধারক হয়ে ওঠে।

শিশুটি শুধু রান্নার সদরঅন্দরই দেখে না, দেখে উপকরণের রং, গড়নপেটন, পায় ফোড়নের ঘ্রাণ, পাতে বসে জিভের সেতারে পায় সোয়াদের তার। এর পাশাপাশি লোকসংস্কৃতির নানান অঙ্গের কথা উঠে আসে: কখনো উৎসব, তিলসংক্রান্তি, বা ষষ্ঠীপুজো, বা বসুধারার ব্রতের মতো মেয়েলি পুজো বা লক্ষ্মীপুজো বা খোদ দুগ্গোপুজো, কখনো ভেতরবাড়ির নিত্যপুজো, কখনো হাটবার, কখনো গাঁয়ের মেলা। সেই সাথে অজান্তে, যেন বেখেয়ালেই শুষে নেয় সে আশপাশের শব্দসম্ভার। সেই শব্দ কখনো কারোর গলায় গান বা ঠোঁটের বাঁশি, কখনো শাঁখের কম্বুকণ্ঠ, কখনো রেডিওতে স্বৈরশাসকের উন্নয়নের সংবাদ কিংবা নজরুলগীতি, কখনো আজানের উদাত্ত আহ্বান, কখনো পাখির কূজন, কখনো নগরকীর্তন। নানান ইন্দ্রিয়ের একক ও যুগলমিলনের পসরা বসেছে বুঝি অক্ষরের পঙ্‌ক্তিমালা জুড়ে। আর এই সবকিছুর বাঁধনমাটি হলো মায়া। মায়া দিয়ে জড়ানো থাকে ব্রাহ্মমুহূর্তের আলো আর বাড়ির উঠোন, ঠাকুমার সদ্যস্নাত রূপ আর মায়ের কোরা শাড়ির খসখস, মণিপিসির ইংরেজি পড়ার বা না-পড়ার ক্ষণ আর দাদুর সস্নেহ গিন্নি ডাকটি। এই মধুময় পৃথিবীর ধূলিতে তবুও কখনো লাগে বিরহের ডাক, বিষণ্ণতার বাঁশি, আসে বাবার বদলির খবর, শহরে থাকার দুঃসহ দিনগুলো, স্বপ্নের ভেতর ঘুরে ঘুরে এই পরিবারের লোকেদের কাছঘেঁষার আমর্ম তৃষ্ণা, আর বাড়িযাওয়ার দিনগোনার মুহূর্ত।

সময়ের বা রাজনীতির ছাপও আলগোছে ফেলে যান শ্রীমতি স্মৃতি তাঁর মমতাক্ষরের ফাঁকে ফাঁকে। এরশাদ সরকারের ক্ষমতারোহণের বারতা ভাসিয়ে দেন তিনি রেডিওর ঘোষণায়। কিন্তু এসবই বাহ্য। মূলত তিনি বাংলার বছরের পর বছর ধরে চলে-আসা সংস্কৃতির চারপাশের টুকরোটাকরা এপ্লিকের কাজ জুড়ে জুড়ে অনেক বড়ো ক্যানভাস বানান, সেখানে ফুটে উঠতে থাকে বাংলার জ্যোৎস্না আর বাংলার বৃষ্টি, বাংলার গান আর বাংলার হাটবাজার, বাংলার নদী আর বাংলার মানুষ। এই বাংলার জনপদের হাজারবছরি দিনরাতের অজস্র উপাদান যা নগরসভ্যতা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনে আজ অবসায়িতপ্রায়, সেসবের দুর্মূল্য ছবি তিনি তুলে ধরেন হাহাকার ও ভালোবাসার তুলিতে ও রঙে। সেখানে অসাম্প্রদায়িকতা যেমন থাকে বড়ো মৃদুলয়া বায়ে, তেমনি নানান গানের সুরও মন মজায়। সেই গানের তালিকায় থাকেন স্বর্ণযুগের সন্ধ্যা, হেমন্ত, আব্বাসউদ্দীন, থাকেন লালন, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ। কখনোসখনো হিন্দিসুরও ভেসে আসে কানে ও মনে।

দীর্ঘশ্বাসও পড়ে। সেটা সাম্প্রদায়িক ভাগাভাগির, বা শহরায়নের অবশ্যম্ভাবী স্রোতে বানভাসির, বা হিন্দুদের জমিজমা বেচে দেশত্যাগের। সেটাও নিতান্তই মোলায়েম স্বরলিপির মন্দস্রোত। সুতীব্র বেদনা বা সুতীক্ষ্ণ অত্যাচারের কথা উঠে আসে না। কারণ, বইটি তো মূলত রান্নারই। বাঙালি গেরস্থালির একান্ত আপন ও নিজস্ব রান্নার। নারীদের হাতে সৃষ্ট ও সংস্কৃত, মধ্যযুগ থেকে বাহিত, দেশবিদেশের নানা দেশায়িত মসলায় জারিত, ঋতুভেদে এবং উপলক্ষভেদে আহৃত উপকরণে মিলিত সেই রান্নাও আজ অনেকটাই হারিয়ে গেছে ফাস্টফুড ও বিরিয়ানির প্রকট প্রাবল্যে, রেস্টুরেন্ট ও বাবুর্চির উগ্র দাপটে। সেই তুলসীমালা, হিজলদিঘি, কাদম্বিনী, আর ঝিঙেশাইল চাল, সেই ঢেঁকিঘরের ভানা ধান, ডাল আর শস্য, সেই আখের পাটালি, সেই ব্রতউপোসপারণাআলপনা, সেই পুঁথিপাঠের আসর, সেই মরিচপোড়া ঝোল, চালকুমড়োর বেশ্বরী, কাঁচকিপাতুরির বড়া, জয়দানা পায়েস, তিলের ক্ষীরশা, আর পুঁই মেটুলির চচ্চড়ি আজ আর জাদুঘরেও মিলবে না হয়তো।

অশ্রুর দুফোঁটা মুছে ফেলে তাই পুরোনো রান্নার নিয়মগুলো নতুন করে দেখাই হয়তো সেসব স্মৃতির সাথে আমাদের সেতু গড়ে দিতে পারে। বইটা পড়তে পড়তে হয়তো কখনো কিছুটা একঘেয়ে লাগতে পারে, কিছুটা গঠনের পুনরাবৃত্তির চক্রে আটকানোর। হয়তো মনে হতে পারে, রান্নার বর্ণনা মেনে করলে রান্নাগুলো ঠিকমতো ওতরাবে তো, যে-প্রশ্ন তাঁকে একবার আমি করেওছিলাম। কিন্তু এই বইয়ের সবচে বড়ো সম্পদ নিজের শেকড়ের সাথে পরিচয়, যা লুকিয়ে থাকে পরানের গহিন ভিতর। তিনি আমাদের সেই মায়ের বাড়িতে নিয়ে যান যা স্বপ্ন, ভালোবাসা আর মায়া দিয়ে মাখা নিরাপদতম আশ্রয়। দ্বিতীয় খণ্ডে কিছু রান্নার ছবি সেই পরিচয় আরও নিবিড়তর করেছে।

আর শ্রীমতি স্মৃতি ভদ্র সুভদ্রহাতে রুমাল নাড়ার সেই মধুরতর বাজিকর।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

পড়াশুনো বিজ্ঞানে। কাজকর্ম আর্থিক জগতে। আগ্রহ নতুন জীবন, বিষয়, ও বিশ্বে। অনুবাদ করতেও আগ্রহী। সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘সত্যজিৎ রায়: একশোয় ১০০’ (২০২১) প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া, ফুটবল নিয়ে এদুয়ার্দো গ্যালেয়ানোর ‘আলো-আঁধারিতে ফুটবল’ (২০২১) ইবইও প্রকাশিত হয়েছে।

error: আপনার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় ।